অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৪ (২)
তোনিমা খান
ভরা ক্লাস রুম। টিচার তখন গুরুত্বপূর্ণ টপিকের উপর আলোচনা করছিল। জীবনে সদ্য যুক্ত হওয়া প্রেমময় পিছুটান গুলো ভুলে রূপকথা পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শিক্ষকের কথা শুনছে। পেছনের দরজা থেকে লাগাতার ডেকে যাওয়া মেয়েটির আকুতি মিনতি তার কোনো কানেই প্রবেশ করছে না। করবেই বা কেন?
সিনিয়র হয়েছে দেখে কি মাথা খেয়ে নিয়েছে? ক্লাস রেখে তাদের ডাকে সাড়া দিতে হবে? দেবে না সে! তখন বাজে এগারোটা চল্লিশ! কলেজে এসেছে থেকে তৃশান নামক এক যুবকের তলব আসছে তার জন্য। জিজ্ঞাসা করলে কারণ বলছে না।
হঠাৎ করেই ক্লাসের নিবিষ্টতা ভঙ্গ হলো কারোর আওয়াজে! ক্লাসের সকল শিক্ষার্থীরা তাকায়, দরজায় দাঁড়ানো আঘাতপ্রাপ্ত রক্তমাখা কপাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তৃশানের পানে। ক্লাস টিচার অভ্যস্ত তৃশানের এমন রূপে। সে গম্ভীর গলায় শুধায়,
–“কি হলো তৃশান তুমি এখানে কেন?”
তৃশানের দৃষ্টি অস্থিরভাবে খুঁজছিল কাঙ্খিত রাগান্বিত মুখটি। খুঁজে পেতেই ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। টিচারের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–”তৃতীয় কলামের প্রথম সাড়ির পরীর মতো দেখতে মেয়েটাকে লাগবে, স্যার। আমার রিলেটিভ! ক্লোজ! নিয়ে যাই?”
শিক্ষক সহ সকলে সোজা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রূপকথার দিকে। রূপকথা হকচকালো সকলের চাহনি নিজের দিকে দেখে। শিক্ষক গম্ভীর গলায় বলল,
–“তাড়াতাড়ি যাও, ক্লাস টাইম নষ্ট হচ্ছে!”
রূপকথা স্তম্ভিত হয়ে বসেই রইল। তন্মধ্যেই তৃশান একহাতে রক্তাক্ত কপাল চেপে গটগট করে ভেতরে ঢুকে গেল। এবং সকলের সামনে থেকে রূপকথার হাত ধরে বেরিয়ে এলো। যেতে যেতে শিক্ষককে প্রফুল্ল হেসে বলল,
–“থ্যাংকস আঙ্কেল!”
আঙ্কেল শুনেই টিচার রাগান্বিত চোখে তাকায় তৃশানের পানে। প্রিন্সিপাল স্যারের বেপরোয়া এই ছেলে একটু বেশিই বেপরোয়া। বাড়াবাড়ির শেষ পর্যায়ে থাকায় সকলে চুপচাপ গলধঃকরন করে তার বেপরোয়া ভাব। নয়তো কলেজ আওয়ারে ব্যক্তিগত সম্পর্ক টানা তারা মোটেই বরদাস্ত করে না। তাই তো প্রিন্সিপাল স্যার আজ পর্যন্ত মুখ ফুটে কখনো বলেনি যে তৃশান তার ছেলে। এই ক্ষোভের কারণেই তৃশান বাবাকে ‘প্রিন্সিপাল স্যার’ বলে ডাকে।
নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েও যখন রূপকথা তার হাত ছাড়াতে ব্যর্থ হয় তখন অনিচ্ছাকৃত এক জোরে কামড় বসায় তৃশানের কব্জি বরাবর। তৃশান চোখ মুখ কুঁচকে সেই কামড়ের ব্যথা সহ্য করে নেয় একটা টু শব্দটিও করলো না, আর না রূপকথার হাত ছাড়লো। ব্যর্থ রূপকথা পরপুরুষের ছোঁয়া সহ্য করতে না পেরে ছটফট করতে করতে চেঁচিয়ে উঠল,
–“আপনার সাহস কি করে হয় আমার গায়ে হাত দেয়ার? আপনি একটা উশৃঙ্খল, বেয়াদব ছেলে। আমি কিন্তু এবার বাধ্য হবো প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে বিচার জানাতে।”
-“তোমার প্রিন্সিপাল স্যার আমার বাপ! এগুলো শুনতে শুনতে তার কান এখন সাউন্ড প্রুফ হয়ে গিয়েছে। যাই বলো তার কানে যাবে না।”
তৃশান লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে অন্যভবনে ঢুকলো। চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে কোত্থেকে যেন! তৃশান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় হাত ছাড়ানোর প্রচেষ্টায় ব্যকুল মেয়েটির দিকে। চক্ষুশীতল হয়ে আসে। মেয়েটি কি জানে সে গত দুই রাত কিভাবে ছটফট করেছে এই রাগান্বিত মুখটি দেখার জন্য? কতটা ব্যাকুল ছিল সকাল হওয়ার জন্য? গতদুইদিন রূপকথা কলেজে আসেনি। আর এই দুইটাদিন পুরো ক্যাম্পাস কেমন শূন্য লাগছিল। মনে হচ্ছিল তার কলেজে আসার একটামাত্র কারণ হলো এই মেয়েটি।
সকাল থেকে কতবার লোক পাঠিয়েছে ডাকার জন্য কিন্তু ঘাড় ত্যাড়া মেয়ে যায়নি। তার জন্যই তো দ্বন্দ্বের মধ্য থেকে ছুটে এসেছে ব্যক্তিগত গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে।
একটি খালি ক্লাসরুমে ঢুকে তৃশান রূপকথার হাত ছেড়ে দিলো। হাত ছাড়া পেতেই রূপকথা তেড়ে যায় তার কাছে। রণমূর্তি ধারণ করা আঁখি দ্বারা দগ্ধ হয় তৃশানের হাসিমাখা মুখ।
–“আপনি কি শুরু করেছেন? এভাবে আমার পিছে পড়েছেন কেন? কি চান? আমি এমন উশৃঙ্খলতা পছন্দ করি না। আপনি যদি এমন করতে থাকেন তবে আমায় অন্য কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে—যা আপনার জন্য মোটেও আনন্দদায়ক হবে না।”
সিঙ্গেল টেবিলের উপর রাখা স্যানিটাইজার, ব্যন্ড এইড, অয়েনমেন্ট আর তুলোর মধ্য থেকে তৃশান তুলা তুলে নেয়। তুলা কপালে চেপে চেয়ারে আয়েশ করে বসতে বসতে শুধায়,
–“গত দুদিন যাবৎ ফোন দিচ্ছি রিসিভ করোনি কেন?”
রূপকথা আশ্চর্য হয় তার কথা শুনে। সে দেখেছিল আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে কিন্তু সে তপোবন আর মা ব্যতীত কারোর ফোন রিসিভ করে না।
সে আশ্চর্য হয়ে শুধায়,
–“আপনি আমার নাম্বার পেলেন কি করে? আর আমায় ফোন দিলেন কোন সাহসে?”
–“যেই সাহসে তোমায় এখন ভরা ক্লাস থেকে তুলে নিয়ে আসলাম?”, তৃশানের গা ছাড়া কণ্ঠ। পরপরই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“সকাল থেকে ডেকে যাচ্ছি আসোনি কেন? চাইছো কী?”
–“আপনি চাইছেন কি? আপনি আমায় ডাকবেন-ই বা কেন? আর আমি আসবোই বা কেন?”
তৃশান খিক খিক করে হেসে উঠল মেয়েটির অবাক কণ্ঠে। চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিয়ে এক নিবিষ্ট দর্শকের ন্যায় তাকায় স্নিগ্ধ মুখপানে। উদাসীন কণ্ঠে বলে,
–“ভালোবাসা শেখানোর আহ্বান জানিয়ে আবার অবুঝের মতো আচরণ করা হচ্ছে? নারী মানেই ঝামেলা! তবুও এই ঝামেলা ঝেলতে বড্ডো সুখ! রূপকথার রাজ্যে ভালোবাসা শিখতে এসেছি; শেখাবেন না?”
–“আপনি কিসব কথা বলছেন?”, রূপকথা অপ্রস্তুত কৌতুহলী গলায় শুধায়। লোকটার কথাগুলো কেমন পরিচিত মনে হলো!
–“বাদ দাও এসব কথা, ব্যক্তিগত গ্রাম্য ডাক্তারের চিকিৎসা সেবা না পেলে এই রক্ত পড়া বোধহয় থামবে না। তাড়াতাড়ি পরিস্কার করে ব্যন্ড এইড লাগাও।”, তৃশান চিকিৎসা সামগ্রী দেখিয়ে বলল। রূপকথাকে তখনো রাগে ফোঁস ফোঁস করতে দেখে সে খেকিয়ে উঠল,
–“কি হলো ক্লাসে যাওয়ার ইচ্ছে নেই?”
রূপকথা অসহায়ত্ব, রাগে ফেটে পড়ল। পন করল তপোবন আসলে বলবে এই উশৃঙ্খলতার কথা, তাতে সে যা-ই মনে করুক না কেন! সে কিয়ৎকাল বাদ থমথমে মুখে ব্যন্ড এইড টা হাতে নেয় উগ্র হাতে সেটি কপালে চেপে দিলে তৃশান কঁকিয়ে উঠল ব্যথায়,
–“পাষাণ মেয়ে! আমার রক্তক্ষরণে তোমার বুকে ব্যথা অনুভব হবে; এমন দিন যদি না আসে তবে আমার নাম তৃশান না।”
সহসা কপালের ব্যন্ড এইড টার উপর থাকা আঙুলগুলো আরো রুক্ষভাবে দেবে গেলো ক্ষততে। তৃশান কঁকিয়ে উঠতে গিয়েও হেসে ফেলল। উদাসীন কণ্ঠে বলে,
–“সেদিন সাহায্য করেছিলাম, অন্তত সেই সাহায্যের খাতিরেও তো একটু মানবতা দেখাতে হয়।”
রূপকথার মনে পড়ে সেদিনকার অপ্রিতিকর ঘটনা। হাতের গতিবিধি ততক্ষণে নম্রতা ধারণ করেছে। তৃশান হাসলো রাগের আড়ালে থাকা নরম মনের আভাসে। অন্তরালে ততক্ষণে প্রবেশ করে এক প্রেমময় জগতে; যেখানে শুধু তার আর এই রাগান্বিত মেয়েটির আনাগোনা!
ব্যন্ড এইড লাগিয়ে রূপকথা গটগট করে বেরিয়ে আসে কক্ষটি থেকে। তবে একটা গলি পার হতেই তার আঁখি দ্বয় বৃহৎ আকৃতির ধারণ করলো। হকিস্টিক হাতে একদল যুবক ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে আসছে তার দিকে। এহেন আ’ত’ঙ্ক জর্জরিত পরিস্থিতিতে রূপকথার প্রচুর রাগ হলো তপোবনের উপর। এই তার পরিচিত কলেজের নমুনা?এটাই তার সেইফটি? অসহ্য! রূপকথা দ্রুত উল্টোদিকে ছুটতে লাগল। তৃশান কক্ষ থেকে বের হতেই রূপকথাকে আবার নিজের দিকে ছুটে আসতে দেখে সে কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“কি হলো আমার জন্য মন খারাপ হচ্ছে? আমার ব্যথা কমে গিয়েছে, চিন্তা করো না।”
রূপকথা তৃশানকে ক্রস করতে করতে চেঁচিয়ে বলে,
–“অভদ্র, পাগল লোক দৌড়ান নয়তো হাড়গোড় আস্ত থাকবে না।”
–“মানে?”, তৃশানের কথা শেষ হতে না হতেই সমস্বরে চিৎকার ভেসে আসলো সন্নিকট থেকে। তৃশান চোখ বড়বড় করে তাকায় নিজের বিরোধীদলীয় ছেলেপেলেদের দিকে। বিলম্বহীন রূপকথার পথ ধরে ছুটতে লাগল। পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে,
–“আরে মেয়ে আগে বলবে না?”
পলকের মাঝে রূপকথার সাথে গতি মেলালো তৃশান। রূপকথা ছুটতে ছুটতে ঘাড় কাত করে তাকায়। চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“এরা কারা? এখানে কি মারপিট হচ্ছে?”
তৃশান দৌড়াতে দৌড়াতে বলে,
–“হুঁ।”
–“কেন?”
–“আমাকে মারার জন্য। এখন পালাও মেয়ে নয়তো তুমিও আস্ত থাকবে না। তোমার জন্যই আমি মারপিটের মধ্য থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। যার জন্য ওরা আমায় খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসেছে। কু//ত্তা//র বাচ্চাদের দেখে নিচ্ছি। আপাতত তোমায় সেইফ করি!”
তাদের কথার মাঝেই একটি বিকট চিৎকার তাদের ধ্যানচ্যূত করে। তাদের পূর্ণ আকর্ষণ কেড়ে নেয় অতি নিকটে একটি দ্রুতগতিসম্পন্ন হকিস্টিক রূপকথার দিকে তেড়ে আসতে দেখে। রূপকথা দাঁড়িয়ে পড়ে। ভয়ে মাথা আঁকড়ে চিৎকার করে ওঠে সে। কিন্তু সেই হকিস্টিকের ভয়ঙ্কর আঘাত একটুও ছুঁতে পারলো না রূপকথাকে। শক্ত এক বলয় তাকে রক্ষা করে আঘাত থেকে। তৃশানের মাথা বরাবর আঘাত লাগতেই তৃশানের চোখের সামনে সব ধোঁয়াশা হয়ে উঠল। তবুও নিউরনে নিউরনে ছুটে বেড়াচ্ছে মেয়েটিকে সেইফ করতে হবে। পিছু ঘুরে দূর্বল পায়ে একটা লাথি দিলো আঘাত করা ছেলেটিকে।
অতঃপর রূপকথার হাত আঁকড়ে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ে। বদ্ধ একটি খালি কক্ষে যখন প্রবেশ করলো রূপকথা আর তৃশান তখন বুকভরা নিঃশ্বাস ফেললো।
ঘেমেনেয়ে একাকার রূপকথা মুখ আঁকড়ে ধরে বসে পড়ে চেয়ারে। তৃশান নিজেকে সামলাতে পারলো না মেঝেতে সটান হয়ে শুয়ে পড়ে। ঘাড় পিঠ আর অল্প একটু মাথার সংস্পর্শ করে হকিস্টিকটি তাই বেঁচে গিয়েছে। নয়তো মাথায় মেজর আঘাত লাগলে খবর ছিল!
রূপকথা নিজেকে ধাতস্থ করে তাকায় তৃশানের দিকে। মানবিকতার কারণে শুধায়,
–“আপনি ঠিক আছেন?”
নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত তৃশান বদ্ধ নেত্রে ফিচলে কণ্ঠে বলে,
–“তোমার জন্য আজ মরতে যাচ্ছি; অন্তত মরার আগে একটু সেবা তো করতেই পারো অকৃতজ্ঞ মেয়ে!”
রূপকথা কচ্ছপের গতিতে এগিয়ে আসে তৃশানের কাছে। মাথার পূর্বের আঘাত থেকে রক্ত বের হচ্ছে। সে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
–“অনেক রক্ত বের হচ্ছে কপাল থেকে। আপনার কাছে কি কোনো রুমাল হবে? নয়তো এভাবে করে বিপদ হয়ে যাবে।”
–“পকেটে খোঁজ!”, তৃশান বদ্ধ নেত্রে বলল। ব্যথায় তার নেত্র সহ কণ্ঠ সংকুচিত হয়ে আসছে।
রূপকথা পকেট খুঁজে রুমাল পেল। সেটা মাথায় বেঁধে দিলো দ্রুত। তৃশান আধো আধো চোখ খুলে তাকায়। মেয়েটির মুখে এখন আর রাগ নেই। বাঁধা শেষ হতেই তৃশান আদেশের সুরে বলে,
–“রুমের অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও। এখান থেকে বের হলেই অন্য ভবনে ঢুকতে পারবে।”
রূপকথা এভাবে আঘাতপ্রাপ্ত একটা মানুষকে রেখে যেতে দ্বিধাবোধ করছিল। কিন্তু সে থাকতেও পারল না। তৃশান তাকে জোরপূর্বক বের করে দেয়।
সেই ঘটনা চাপা পড়ে গেল! সেই দ্বন্দ্বের কি হলো , তৃশানের কি হলো তা জানে না রূপকথা!
টিফিন পিরিয়ডে হালকা কিছু খেয়ে সে বকুলতালায় এসে বসলো। সাথে নৈমি নূর সহ আশেপাশে আরো ক্লাস ফিলোরা রয়েছে। ঘন্টা পড়তে এখনো দশ মিনিট। হালকা বাতাস, মিষ্টি, তেজ হীন রোদের সোনালী আভায় চারিদিক আলোকিত—সহনীয় রৌদ্রজ্জ্বল পরিবেশ। বাতাসে সৌন্দর্য বর্ধনকারী ফুলের সুগন্ধ। বেশ উপভোগ্য পরিবেশটাকে পা দুলিয়ে দুলিয়ে উপভোগ করছে রূপকথা। কিয়ৎকাল বাদ এক চঞ্চল ক্ষিপ্ত কণ্ঠ ভেসে আসল,
–“এই তুমি না আমার টমাটুর টাকার বার্গার খেয়েছিলে? আমি আজ পর্যন্ত টমাটুর টাকায় একটা ললিপপ খেতে পারিনি আর তুমি বার্গার খেয়েছো? কে গো তুমি অজ্ঞাত মহামানব?”
রূপকথা কপাল কুঁচকে নিজের বাম পাশে তাকায়। কোমড়ে হাত দিয়ে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। পড়নে ইউনিফর্ম! চোখেমুখে আহ্লাদ, আভিজাত্যের ছোঁয়া।কথার মাঝে টমাটু নামক সম্বোধন শুনে বুঝতে বাকি রইল না এটাই তার ছেলের চিঠি প্রেরক! সে কপাল কুঁচকে খানিক গম্ভীর মুখে বলল,
–“তুমি কে?”
সুনেহরা কপাল কুঁচকে নিলো। পাল্টা রাগান্বিত স্বরে বলল,
— তোমার শত্রু! আমার টমাটুর সাথে কোনো মেয়ের সংযোগ রয়েছে মানে সে আমার শত্রু! সেই মোতাবেক তুমি আমার শত্রু। এখন জলদি বলো আমার টমাটু তোমায় বার্গার কেন খাইয়েছিল?”
রূপকথা থমথমে মুখে বলল,
–“আমার খিদে পেয়েছিল তাই!”
সুনেহরা বিরক্ত হলো অসন্তোষজনক জবাবে। বিরক্তি নিয়ে বলল,
–“আমি যদি খিদের জ্বালায় শুকিয়ে টিকটিকি হয়ে রাস্তায় গড়াগড়িও খাই— তবুও ঐ গোমড়া মুখো টমাটু আমায় একটা কলা পর্যন্ত খাওয়াবে না। তাই সোজাসাপ্টা বলো ওর সাথে তোমার কি সম্পর্ক—যে একদম আহ্লাদ দেখিয়ে বার্গার খাইয়েছে?”
রূপকথা সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
–“আমি ওর মা!”
সুনেহরার কপাল জড়সড় হয়ে একাকার হয়ে গেল। এক কান রূপকথার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–“দুঃখিত! আমি শুনতে পাইনি। আবার বলোতো? আমি, মা শুনেছি! কান আমার গিয়েছে বুঝলে? যাবেই না কেন? চৌদ্দ পার করে পনেরো তে পড়েছি এখন পর্যন্ত একটা প্রেম করতে পারিনি, বিয়ে তো দূর। বাচ্চাকাচ্চার ম্যা ম্যা ডাক কবে শুনব?এই চিন্তায় চিন্তায় আমার একটা কিডনি অকেজো হয়ে গিয়েছে। আরেকটা কিডনি নিয়ে বেঁচে আছি শুধু টমাটুর জন্য! এখন কান দুটোও যাচ্ছে।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে বলল,
–“তুমি অনেক বেশি কথা বলো!”
–“টমাটুও বলে! সেটা বড় কথা নয়, এটা সবাই’ই বলে। তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও। টমাটু তোমার কি হয়?”
–“ছেলে হয়!”
–“আশ্চর্য! তুমি আমাকে চপল ভাবতে পারো কিন্তু বোকা নয়। তানশান তোমার ছেলে! হি হি হাউ ফানি! ওর তো মা নেই। মানে আমার শাশুড়ি নেই। আহা কি আনন্দ! আমায় দিয়ে কেউ কাজ করাবে না।”
–“আমি মজা করছি না। আমি ওর মা!”, রূপকথার দৃঢ় কণ্ঠে সুনেহরার চোখ খুলে পড়ার উপক্রম! সে উদগ্রীব, উৎসুক কণ্ঠে শুধায়,
–“তুমি সত্যি বলছো? ইউ মিন সৎ মা? তারমানে কি তুমি আমার টমাটুর উপর অত্যাচার করো? আমি শুনেছি সৎ মায়েরা সন্তানদের সাথে ভালো আচরণ করে না। দেখো এমনটা হলে কিন্তু আমি টমাটুকে বিয়ে করে ঘর জামাই বানিয়ে রাখব।”
রূপকথা শুকনো একটা ঢোক গিললো অসহ্য সেই শব্দটি শুনে। তন্মধ্যেই সে হকচকালো তানশানের শক্ত কণ্ঠে।
–“হচ্ছে কি সুনেহরা? বাড়াবাড়ির একটা সীমা থাকে!”
সুনেহরা চমকে তাকায় তানশানের পানে। চঞ্চল পায়ে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
–“আরে সে কি বলছে? সে নাকি তোর মা? এটা কি সত্যি?”
তানশান বাঁকা চোখে তাকায় সর্বদা মায়ের বেশে ঘুরঘুর করা চঞ্চল মানুষটা কেমন মিইয়ে গিয়েছে।
–“কি হলো বলছিস না কেন? সে তোর মা নয় তাই না? মজা করেছে আমার সাথে।”
পুনশ্চঃ সুনেহরার উদগ্রীব কণ্ঠে তানশান কিছু বলতে যাবে তার আগেই তানশানের কর্নদ্বয় ছুঁয়ে গেল এক মাতৃস্নেহ মাখা হুমকি।
তানশান কপাল কুঁচকে তাকায় সদ্যই নিজের ডান পাশে ছুটতে ছুটতে আসা রমনীর পানে। রূপকথা চাপা স্বরে শাসিয়ে বলল,
–“বুঝে শুনে জবাব দাও, আমার কাছে কিন্তু এখনো ছবিগুলো আছে। তুমি চাইলে আমি আরামসে সময় নিয়ে তোমার বাবাকে দেখাবো।”
তানশান থমথমে মুখে তাকায় চোখে হাসতে থাকা নারীটির দিকে। যে কি-না উদগ্রীব বদনে অপেক্ষারত তার জবাব শোনার জন্য। তানশান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সুনেহরার পানে। গম্ভীর গলায় বলল,
–“মা!”
রূপকথার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠল। ঝুঁকে যাওয়া শিরদাঁড়া মাতৃত্বের জোরে সোজা হয়ে গেলো। সুনেহরা আশ্চর্য কণ্ঠে শুধায়,
–“কিভাবে সম্ভব?”
তানশানের দৃষ্টিতে কঠোরতা ভর করে, আজ সকাল থেকেই মাইন্ডসেট করেছিল সুনেহরাকে কিছু কড়া কথা বলবে। আর কোনো প্রশ্রয় দেবে না। আর যাই হোক বাবার সামনে নত শির হতে হয় এমন কোনো কাজ সে করতে পারে না, আর না করার চিন্তাও করতে পারে। বাবা জুড়েই তো তার সবকিছু!
মিমির গত কয়েকদিনের কাজে সে এতটুকু বুঝতে পেরেছে এই ছোট্ট জিনিসগুলো যদি বাবা দেখে তবে সে খুব লজ্জিত হবে। দিনশেষে বাবার চোখেও যদি চোখ রাখতে না পারে— তবে সে কোথায় যাবে? সে কঠোর গলায় বলল,
–” সব বিষয়ে তোমার এমন নাক গলানো আমার অপছন্দ, সুনেহরা। সে আমার মা এতটুকুই যথেষ্ট তোমার জন্য। কেন, কিভাবে, অত্যাচার তোমার এসব নিরর্থক কথায় তোমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু সামনের মানুষটার মনে এটা বিরূপভাবে আঘাত হানতে পারে। আশাকরি পরের বার থেকে আমার কোনো বিষয়ে তোমার হস্তক্ষেপ আমি দেখব না। আর আর এটা আমার লাস্ট ওয়ার্নিং নয়তো আমি হেড টিচারকে জানাতে বাধ্য হবো। আর তাতেও যদি তুমি না শুধরাও—তবে আমি এই স্কুল ছেড়ে দেবো!”
বড্ডো রুক্ষ শোনালো তানশানের কণ্ঠ। সর্বদা প্রানোচ্ছ্বল , হাসিখুশি থাকা মেয়েটি আচমকা এহেন রুক্ষতা সহ্য করতে পারলো না। কেননা আজ পর্যন্ত তানশান হুমকি ধমকি দিলেও সেটা খুবই স্বাভাবিক ভাবভঙ্গিমা কিংবা বিরক্তি নিয়ে বলে। কিন্তু এখন? চোখেমুখে কেন এতো ঘৃণা ভাব, বিতৃষ্ণা? তানশান কি তাকে ঘৃণা করে? সে টলমলে আঁখি নিয়ে শুধায়,
–“তুই কি আমার ওপর রেগে আছিস? আমি ইচ্ছাকৃত বলিনি এগুলো। আমি শুনেছি সৎ মায়েরা ভালো হয় না, তাই…”
–“সেটা আমার ব্যপার! তোমায় এটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।”
–“কেন হবে না? তুই আমার টমাটু! তোকে আমি ভালোবাসি। তোর কষ্ট আমি দেখতে পারি না।”
তানশান চোয়াল শক্ত করে তাকায়। রূপকথা দেখে মুহুর্তেই লাল হয়ে ওঠা মুখশ্রী। তানশানের বিরক্তি আর রাগের পার্থক্য এতদিনে সে বেশ ভালো করেই চেনে। সে অবাক হলো আচমকা এমন করায়। সুনেহরার টলমলে চোখের দিকে এক পলক তাকিয়ে সে দ্রুত তানশানের বাহু চেপে ধরল। চাপা স্বরে বলে,
–“কি হচ্ছে কি তানশান? এমন আচরণ করছো কেন? আমি ওর কথায় কিছু মনে করিনি। ও যা বলেছে ঠিকই তো বলেছে।”
তানশান ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় রূপথার পানে। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–“না ঠিক বলেনি। কারোর বিষয়ে না জেনে ও এমন কথা বলতে পারে না। আর না ও আমায় নিয়ে এত পজেসিভনেস দেখাতে পারে। আমি এই অধিকার কাউকে দেইনি।”
পরপরই সুনেহরাকে ধমকে বলল,
–“এই মেয়ে! ফারদার এমন পাকনামো করবে না আমার সাথে। ছোট্ট একটা মেয়ে পড়াশুনা বাদ দিয়ে সারাদিন এসব বাজে কথা মাথায় নিয়ে ঘোরো, আবার আমাকেও ডিস্টার্ব করো! আর কখনো যেন তোমায় আমার আর আমার পরিবারের আশেপাশে না দেখি।”, বলেই তানশান রূপকথার থেকে নিজের বাহু ছাড়িয়ে নিয়ে গটগট করে চলে যায়। রূপকথা হতভম্ব হয়ে তাকায় সুনেহরার পানে। যার চোখ থেকে ইতিমধ্যেই অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। সে এগিয়ে যায় সুনহেরার কাছে। অনুতপ্ততা নিয়ে সুনেহরার মাথায় হাত রেখে আদুরে গলায় বলে,
–“আরে মিষ্টি মেয়ে কাঁদে কেন? ও আমার উপরে একটু রেগে আছে তাই এমন আচরণ করেছে তোমার সাথে। তুমি কষ্ট পেও না। ও রাগ করলে দিক দিশা হারিয়ে ফেলে। ওর হয়ে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।”
সুনেহরা কিয়ৎকাল এক দৃষ্টিতে তানশানের গমনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ব্যস্ত হাতে চোখের পানি মুছে নিয়ে রূপকথার দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হেসে বলল,
–“স্যরি আন্টি, তুমি হয়তো আমার কথায় কষ্ট পেয়েছো। আমি তোমায় কষ্ট দেয়ার জন্য বলিনি। আমায় ক্ষমা করে দেবে। আর তানশানের কোনো দোষ নেই। আমিই ওকে অনেক বিরক্ত করি! আমার ওপর রেগে যাওয়া স্বাভাবিক। আমি কিছু মনে করিনি। আমার ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে, আমি আসি হ্যাঁ!”
চঞ্চল কণ্ঠে বলেই সুনেহরা একপ্রকার ছুটে পালিয়ে যায় সেখান থেকে। ক্লাসরুমে নয় বরং একদম কলেজ গেটের দিকে। রূপকথা ভরহীন দেহে ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কি থেকে কি হয়ে গেল! এমন পরিস্থিতি তার কামনীয় ছিল না। নিজেকেই দোষারোপ করতে লাগল রূপকথা।
নিজের ক্লাসরুমে শক্ত হয়ে বসা তানশান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হোয়াইট বোর্ডের দিকে। চোখে বাবা মায়ের স্বপ্ন, বাবার আদর্শ, মায়ের উচ্চ আকাঙ্ক্ষা, বাবার একমাত্র ছেলে হওয়ায় সদ্য যুক্ত হওয়া কারোর দায়িত্ব! তার যে জীবনে বহুদূর যেতে হবে। বহু দায়িত্ব তার! সে এই ঠুনকো আনন্দ আর আবেগে গা ভাসাতে পারে না। কখনোই না! এটা নিতান্তই কৈশোরের পরিবর্তনের ফল— যা তাকে বিপথে পরিচালিত করছে।
রূপকথার বয়সটাই বোধহয় সবকিছুতে বাড়াবাড়ি করার। হোক সেটা ভালোবাসা কিংবা অভিমান। পুরো একদিন পার হয়ে গেলেও তপোবন রূপকথাকে একটা ফোন দেয়নি। দিনশেষে রূপকথা জোরপূর্বক কারোর জীবনে মানিয়ে নেয়া এক অবহেলিত সত্ত্বা ব্যতীত কিছুই না। কতশত অসংলগ্ন চিন্তা করতে করতে রূপকথা দিন পার করল। অভিমান আঁকড়েই সে নিজের ঘরেই পড়ে ছিল পুরোটা সময়। তবে এটাই যেন তার মাতৃত্বে প্রশ্ন তুলে বসলো।
রাত তখন দশটা। শাশুড়ির মেজাজের স্বীকার না হওয়ার তাগিদে ঘরের কাজ গুছিয়ে নিলো।
তখনি নির্জনা বেগম ভারী দেহ টেনে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন,
–“তানশানকে খাইয়েছো তুমি?”
রূপকথা অবাক হলো,
–“নাহ, তানশান কি খায়নি এখনো?”
নির্জনা বেগম তীর্যক দৃষ্টি ফেলল। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
–“সেটা তুমি আমায় জিজ্ঞেস করছো? ও কোচিং থেকে এসে নিচে নামেনি। তোমার সেদিকে খেয়াল আছে? নাকি এখনো সব মৌনতার উপর ভরসা করে হাওয়ায় নাচো তুমি? মৌনতা এত অসুস্থতার পরেও তানশানের খোঁজ নিয়ে সন্ধায় খাবার দিয়ে এসেছে। আর তুমি জানোই না তোমার ছেলে খেয়েছে কি-না!”
রূপকথার আজ আর একটুও খারাপ লাগল না শাশুড়ির কথা। বরং হতবাক হলো নিজের কর্মকান্ডে! যেই ছেলে সারাক্ষণ সুযোগ পেলেই তাকে শাসন করে বেড়ায়, সেই ছেলে সন্ধ্যা থেকে একটাবার পড়ার জন্য তাগিদ দেয়নি। আর সে খেয়ালই করেনি!
সে দ্রুত খাবারের প্লেট নিয়ে উপরে ছুটলো।
কাঙ্খিত দরজাটি নির্দ্বিধায় খুলে ভেতরে ঢুকতেই অন্ধকারে মিলিয়ে যায় দৃষ্টি। কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
এত তাড়াতাড়ি তো তানশানের ঘরের আলো নেভে না। রূপকথা কপাল কুঁচকে দরজা চাপিয়ে ঘরের আলো জ্বালালো। হঠাৎ করেই কর্নকুহর সচকিত হলো কারোর মৃদু কাতরানোর শব্দে।
সে দ্রুত পায়ে কমফোর্টারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছেলেটির মুখের ওপর থেকে কমফোর্টার সরিয়ে দিতেই লালচে ফোলা ফোলা বিবর্ণ মুখ ভেসে উঠল।
বক্ষস্থল মুচড়ে ওঠে রূপকথার ফ্যাকাশে মুখটি দেখতেই। একাধারে কাঁপছে আর কাতরাচ্ছে। সে কপালে হাত দিলে অনুভব করে তপোবন সিকদারের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বাবা কেউ হতে পারে না।
অনুভব করে তার চেয়ে নিকৃষ্ট সত্ত্বা জগতে আর হতে পারে না।
ছেলেটির শরীরের মাত্রারিক্ত তাপে পুড়তে লাগল রূপকথার হাত সহ অন্তঃস্থল।
কতক্ষণ যাবৎ এভাবে জ্বরে ভুগছে? খুব কষ্ট হয়েছে কি? তাকে ডেকেছে নিশ্চয়ই কিন্তু পায়নি হয়তো। চোখদুটো টলটল করে উঠল।
বাতাবরণে ঘৃণ্য ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সৎ মা! হ্যাঁ, কথায় কথায় চারিপাশে শুধু এটাই ধ্বনিত হয়। অদৃশ্য নিন্দুকেরা ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
“সে সৎ মা! তাই তো এতটা সময় না দেখে থাকতে পেরেছে। নিজের সন্তান হলে সে এই অবহেলা করতে পারতো?”
নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মায় রূপকথার। সত্য তো এটাই, আজ যদি তানশান তার অংশ হতো তবে কি এতোটা অদেখা করতে পারতো না। নিজের মাতৃত্বের নড়বড়ে এই আচরণে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ছোট্ট মেয়েটির অন্তঃপুর। বক্ষস্থলে আর্তনাদ করে উঠল “সে সৎ মা নয়।”
সবেগে আঁকড়ে ধরে ছেলের মুখটি। অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে শুধায়,
–”তানশান আব্বু! চোখ খোলো! খুব কষ্ট হচ্ছে আব্বু? তানশান?”
কোনো ফিরতি জবাব আসে না তানশানের। রূপকথা কম্ফোর্টার সরায় গা থেকে। গেঞ্জির আড়ালে হাত রাখলে পৃষ্ঠদেশ আঠালো ভাব অনুভব হয়। কয়েকদফা জ্বর উঠেছে আর ছেড়েছে এটা তারই নমুনা। এখন আবার জ্বর উঠেছে। সে ছুটে গিয়ে আরেকটা কম্ফোর্টার নামায়। সেটাও কম্পনরত ছেলের গায়ে জড়িয়ে দেয়। দ্রুত বাটিতে করে পানি আর রুমাল নিয়ে তানশানের পাশে বসে। মাথায় জলপট্টি দিলেই ছেলেটির কম্পন বাড়ে ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে। ঘোর ভাঙে। জড়ানো কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
– পাপা? পাপা তুমি এসেছো?”
– পাপা আসেনি তানশান। আমি মা!”, তিরতির করে কেঁপে ওঠা ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে ধরে বলল রূপকথা। সর্বদা সর্বদা তার ছোট টিচারের বেশভূষায় ঘোরা গম্ভীর মুখের ছেলেটা কেমন কাতরাচ্ছে। এটা যে তার জন্য কাম্য নয়।
বেহুঁশ প্রায় তানশানের বিস্মিত কণ্ঠে আওড়ায়,
– “মাম্মা?”
রূপকথা মাথা নেড়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–“ হ্যাঁ মাম্মা!”
–“আমার তো মাম্মা নেই।” তানশান বাচ্চাদের মতো ঠোঁট নেড়ে বলে। রূপকথার সকল দৃঢ়তা ফিকে পড়ল সেই জড়ানো কণ্ঠে। তবুও হার না মানা জেদি কণ্ঠে বলে,
– আছে তানশান, মাম্মা আছে। এই তো মাম্মা।,
জোরপূর্বকের মা হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা যে রূপকথা ব্যর্থতাকে আগলে ধরেই আগাচ্ছে। আর সেই ব্যর্থতাই দিনশেষে তার সঙ্গী হয়। তানশান দূর্বল দৃষ্টি মেলে তাকায় রূপকথার পানে। নাকোচ করে বলে,
– না আপনি মাম্মা নন। মাম্মাকে তো নিয়ে গিয়েছে আল্লাহ। আল্লাহ কেনো এমন করে আমার সাথে? আমি তো কখনো তার অমান্য হইনা! কোন খারাপ কাজ করি না, কারোর সাথে খারাপ ব্যবহার করি না তবে কেন আল্লাহ আমায় শাস্তি দেয়?
– খারাপ ব্যবহার করো! তুমি তোমার মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করো। মাকে মা বলে ডাকো না। , রূপকথা চোখের পানি মুছে শক্ত কণ্ঠে বলে।
তানশানের দূর্বল মুখটিতে উদ্বিগ্নতা ছেয়ে যায়। শুধায়,
–“কে আমার মা?”
রূপকথা আবারো দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–“আমি।”
–“আপনি?”
–“ হুঁ।”
–“আল্লাহ কি এর জন্য আমার উপর রেগে আছে?”
রূপকথা থমথমে মুখে বলল,
–”জানিনা। তবে কাউকে কষ্ট দিতে হয় না। কিন্তু তুমি আমায় কষ্ট দাও।”
–“আমি আর কষ্ট দেবো না আপনাকে।“
তানশান বাচ্চাদের মত মাথা নেড়ে উদ্বিগ্নতা নিয়ে বলল। রূপকথা অশ্রুসিক্ত নয়নে মৃদু হেসে শুধায়,
–“আর কষ্ট দেবে না?”
-“ নাহ!”, তানশান ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল।
–“তবে সবসময় মা বলে ডাকবে। মায়ের সবকথা শুনবে।”, তানশান বাধ্যগত ছেলের মতো বলে,
–“ঠিক আছে।”
– তবে ডাকো।, রূপকথা উৎসুক কণ্ঠে বলে। চোখেমুখে উপচেপড়া উৎসুকতা। ছেলেটা একটু সহজভাবে গ্রহণ করে নিলেই পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই তাকে সৎ মা বলে অভিহিত করার।
বদ্ধ নেত্রে তানশান একদম অনুভূতিহীন যন্ত্রের মতো করে বলল,
–“ মা।”
রূপকথা অশ্রুভরা নয়নে চেয়ে বলল,
–“ এভাবে নয়। বলো, মা আমার কষ্ট হচ্ছে।”,
রূপকথার কথার প্রেক্ষিতে, তানশান কলের পুতুলের মত বলল,
–“এভাবে নয়? তবে কি বলব? মা আমার কষ্ট হচ্ছে। হ্যাঁ, আমার তো খুব কষ্ট হচ্ছে। পাপা কেন আসছে না? পাপাকে একটু আসতে বলুন না!”
ঘোরগ্রস্থ তানশান একা একা বলতে লাগল। রূপকথা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। ঠোঁটের কোনে বিষাদের হাসি। চারিপাশে অদৃশ্য সেই নিন্দুকেরা পুনরায় আমোদিত হয় আর বলে বেড়ায়,
–”জোরপূর্বক মা হওয়া যায় না। আর না শোনা যায় মা ডাক। “মা” যে কঠিন এক সম্বোধন আর কঠিন এক সত্ত্বা। সবাই হতে পারে না। তুমি সৎ মা! তুমি সৎ মা!”
চোখের কার্নিশ অবমুক্ত তখন! রূপকথা ঘন ঘন মাথা নেড়ে অসহায়ত্ব ভরা ক্রন্দনরত গলায় বলে ওঠে,
–”না, আমি সৎ মা নই। আমি শুধু মা!”
কিন্তু হায়! বাস্তবতা যে তাকে সবসময় এই ঘৃণ্য কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কেন? বাস্তবতা কি জানে? তার কাছে মাতৃত্ব কত শুদ্ধ, স্নিগ্ধ এক অনুভূতি? তবে কেন তারা তার অন্তঃস্থলের মাতৃত্বকে সৎ মা বলে কলুষিত করে?
মা এবং সৎ মায়ের সেই বোঝাপড়ায় হেরে যাওয়া মেয়েটি সব ক্লেশ দূরে ঠেলে খাবারের প্লেট হাতে তুলে নেয়। ঠোঁটের কোনে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলে গলাধঃকরণ করে ক্লেশগুলোকে।
স্নেহের কণ্ঠে বলে,
–“আব্বু, ওঠো। খাবার খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।”
–“খাবো না, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। পাপা কোথায়? পাপাকে নিয়ে আসুন।”, তানশান কাতরাতে কাতরাতে বলল।
রূপকথা অবুঝ হয়ে পড়ে। কি করবে? একাধারে ছেলেটা কাঁপছে। ওষুধ ও তো খাওয়াতে হবে। সে ফোন হাতে নেয়। অভিমান ভুলে তপোবনের নাম্বারে ফোন দিলেও ফোন ঢোকে না। ছেলেটা তখনো পাপা পাপা করে যাচ্ছে।
নিরুপায় রূপকথা, জোরপূর্বক তানশানকে কয়েক লোকমা খাইয়ে, ওষুধ খাওয়ায়। তারপর দু’টো কম্ফোর্টার দিয়ে ছেলেটাকে ভালোকরে জড়িয়ে দেয়। মাথার কাছে বসে, নিজের কোলে মাথাটা তুলে নিয়ে জলপট্টি দিলো আর মাথায় হাত বুলাতে লাগল।
আর সর্বদা পিতৃ স্নেহের স্বাদ পাওয়া ছেলেটি প্রথমবার মাতৃস্নেহ সহ সেই নরম স্পর্শে দৈহিক কষ্ট ভুলতে মরিয়া হয়ে ওঠে। নিজের সকল দৈহিক কষ্ট মায়ের জিম্মায় রেখে, কিছুক্ষণের মাঝেই তানশান ঘুমিয়ে পড়ে। ছেলের দেহের কম্পন থামতেই রূপকথা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
মাকে দেখতো তাদের জ্বর হলে সরিষার তেল মাখতো হাতে পায়ে। সেও ভাবলো তেল মালিশ করবে তানশানের হাতে পায়ে। কিন্তু স্থানচ্যুত হতে গেলেই ঘুমন্ত ছেলেটি হতচকিত ভয়ার্ত দেহে লাফিয়ে ওঠে। তড়িৎ গতিতে রূপকথার হাত জড়িয়ে ধরে। আতঙ্ক জর্জরিত কণ্ঠে ঝরঝরিয়ে কেঁদে উঠে বলে,
–“মাম্মা, মাম্মা যেও না। আমায় ছেড়ে যেও না। আমার খুব মনে পড়ে তোমায়। তোমার আদর পেতে ইচ্ছে করে। চলে যেওনা মাম্মা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, দেখো এখানে এখানে খুব ব্যথা করছে। তুমি যেওনা!”, তানশান নিজের মাথা দেখিয়ে বলল।
সদ্য শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুবিহীন আঁখিদ্বয় পুনরায় ভিজে উঠল ছেলেটির আর্তনাদ ভরা অনুনয়ে। মায়ের জন্য কতটা তরপায় তা যে অবচেতনে বেরিয়ে আসছে।
সে দ্রুত বেহুঁশ প্রায় ছেলেটিকে নিজের সাথে আগলে নেয়। মাথায় ঘন ঘন হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত করে বলে,
–“মাম্মা, এখানেই আছি তানশান। কোথাও যাচ্ছি না। শান্ত হও, এই যে মাম্মা তোমার পাশেই আছি। মাথার ব্যথা দূর করে দিচ্ছি এখনি।”
তানশান আধো আধো নয়ন মেলে শুধায়,
–“কোথাও চলে যাবে না তো?”
রূপকথা ঠোঁট কামড়ে না বোধক মাথা নাড়লো। তানশান দূর্বল হেসে পুনশ্চঃ রূপকথার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে। রূপকথা নিষ্পলক দেখে কোলের মাঝে গুটিয়ে যাওয়া ছেলেটিকে। তার মাতৃত্বের অনুভূতি কে আরো গাঢ় করে দিয়ে তানশান দু’হাতে তার কোমড় জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় ফিসফিসিয়ে বলে,
–“আমার মাম্মা!”
সেই ছোট্ট দুটি স্নিগ্ধ শক্তিশালী শব্দ কর্নকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই মেয়েটি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছেলেটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
–“হ্যাঁ, তোমার মাম্মা!”
আজকের দিনের জন্য রূপকথার মাতৃত্ব—বয়স, পরিস্থিতি, সৎ মা নামক কলুষিত শব্দটিকে ছাড়িয়ে জিতে চায়। মা হতে কি বয়স লাগে? না লাগে না! শুধু অন্তরে শুদ্ধ পবিত্র মাতৃত্ব থাকতে হয় আর থাকতে হয় ইচ্ছা। বয়স তো শুধু সংখ্যা মাত্র!
থাকুক না বয়সের সেই ক্ষীণ অদ্ভুত পার্থক্য! তবুও দিনশেষে তাদের মাঝে এভাবেই সুপ্ত গভীর মা ছেলের সম্পর্ক থেকে যাবে। যেটা প্রকাশ পাবে, এমনি কোনো অসুস্থাতার ঘোরে কিংবা একে অপরের ক্লেশ নিঃশেষ করতে!
সেই রাত রূপকথা সেভাবেই হেডবোর্ডে হেলাল দিয়ে টুকরো টুকরো ঘুমিয়ে কাটায়। কিছুক্ষণ পরপর ছেলেটা বারবার নড়েচড়ে উঠতো, কাঁতরাতো। মাঝরাতে যখন জ্বর পুরোপুরি ছেঁড়ে যায়, তখন তানশানের ঘেমে ওঠা শরীর মুছিয়ে তারপর শেষ রাতে একটু ঘুমায় রূপকথা।
তবে সেই ক্ষণিকের ঘুম যখন ভেঙে গেল, তখন ভাঙে গেল তার স্নিগ্ধ মাতৃত্বের স্বপ্ন ও। রাতের সেই মাতৃসম্বোধন সহ ভালোবাসা সবটা তানশানের অবচেতনের অংশ ছিল!
সকাল হতেই সেটা মিলিয়ে গেল বিদঘুটে সম্পর্কের আড়ালে। রূপকথা তবুও হার মানে না, আশাহত হয় না। মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলে পুনশ্চঃ নেমে পড়ে জোরপূর্বক মা হওয়ার লক্ষ্যে।
সকাল আটটা। তানশান বই থেকে মুখ না তুলেই বলল,
–“আর খাবো না।”
–“আর দুই লোকমা আছে। না খেলে ভাতটুকু অপচয় হবে।”, রূপকথার নিমীলিত কণ্ঠে তানশান আর কথা বাড়ায় না, মুখ এগিয়ে দেয়। দীর্ঘদিনের অত্যাচারে ছেলেটা ইদানিং বোধহয় তার কাছে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় বাধ্যগত হয়ে যাচ্ছে। রূপকথা ম্লান হেসে দ্রুত আরেক লোকমা তুলে দেয়।
–“সকালে উঠেই বই পড়তে বসার কোনো প্রয়োজন ছিল? শরীরের এই অবস্থা!”
রূপকথার কথায় তানশান গম্ভীর ভারী গলায় বলল,
–“আমি আপনার মতো ফাঁকিবাজ নই। গতকাল রাতে কিছু পড়তে পারিনি, একটু পর আমার একটা সি.টি রয়েছে। সেটা এটেন্ড করতে হলে আমায় পড়তেই হবে।”
রূপকথা মিহি স্বরে বলল,
–“আজ ও স্কুলে যাওয়া লাগবে? জ্বর এখনো ছাড়েনি, মাথা ব্যথাও নিশ্চয়ই এখনো আছে।”
–“ক্লাস টেস্ট মিস করা পাপা পছন্দ করে না। এই ছোট ছোট ক্লাস টেস্টগুলো আমায় ফাইনাল পরীক্ষার জন্য শক্তভাবে প্রস্তুত করে।”
রূপকথা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মৌনতা ভাবির দিকে তাকানো যায় না। তাই আজ কলেজে যেতে চাইছিল না। কিন্তু অসুস্থ ছেলেকে একা ছাড়ার সাহস ও নেই। অগত্যা তাকেও যেতে হবে কলেজে।
প্লেটে তখনো অর্ধেকটা খাবার রয়েছে। এই খাবার না খাইয়ে রূপকথা যাবে না। কিয়ৎকাল বাদ শুধায়,
–” তোমার পাপার সাথে কথা হয়েছিল?”
তানশান হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো।,
–” হুঁ, পোরশু রাতে।”
–“কেমন আছে?”
রূপকথার এহেন প্রশ্নে তানশান মুখ তুলে তাকায়।
–“কেন আপনার সাথে হয়নি?”
রূপকথা ম্লান হেসে না বোধক মাথা নাড়লো। তানশান ফের শুধায়,
–“যাওয়ার পর থেকে একবারও কথা হয়নি?”
–“উঁহু!”
তানশান পুনশ্চঃ বইয়ে মুখ গুঁজলো।
কৈফিয়ত দিয়ে বলল,
–“পাপা, একটু সমস্যায় ছিল। বলেছিল সুযোগ পেলে ফোন দেবে। হয়তো ব্যস্ত আছে কিন্তু দেবে।”
রূপকথা নিরুত্তর শুধু মাথা নাড়লো। তানশান পড়তে পড়তে খেতে লাগল। কিন্তু দুই লোকমা মোটেই শেষ হচ্ছে না দেখে, সে ভ্রু কুঁচকে তাকায় রূপকথার দিকে। গম্ভীর গলায় শুধায়,
–“আপনার দুই লোকমা শেষ হয়নি এখনো?”
রূপকথা বোকাসোকা হেসে প্লেট দেখিয়ে বলল,
–“এবার সত্যি সত্যি দুই লোকমা আছে। না খেলে অপচয় হবে। অপচয় সয়তানের কাজ! আল্লাহ নারাজ হবে।”
তানশান সরু দৃষ্টিতে তাকায়। অতিষ্ট হয়ে শুধায়,
–“আপনার পড়াশুনা নেই? সারাদিন এমন মায়ের বেশে টো টো করে বেড়ালে হবে? এগুলো করার সময় পাবেন কিন্তু পড়ালেখার সময় আর পাবেন না। তখন খারাপ রেজাল্ট করবেন আর স্কুল, কলেজের সবাই বলবে তানশানের মা ফেলুদা! তখন আমার নাক কাটা যাবে। আমি লজ্জা পাবো, পড়াশুনায় মনোযোগী হন।”
নিজের কথায় নিজেই থমকালো তানশান। রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সদ্য মা বলে অভিহিত করা ছেলেটির পানে। তানশান অপ্রস্তুত এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“তাড়াতাড়ি দিন। শেষ করে রেডি হবেন কলেজে যেতে হবে।”
রূপকথার ঠোঁটের কোণা দীর্ঘায়িত হয়। মৃদু হেসে বলল,
–“গতকাল আমি অনেক পড়াশুনা করেছি। তুমি ফিজিক্স সেকেন্ড পেপারের যেই চ্যাপ্টার করতে দিয়েছিলে সব করেছি। রাতে খাতা দেখবে আর নতুন কিছু করতে দেবে।”
তানশান মাথা নেড়ে সায় জানালো। রূপকথাকে তপোবন পড়ালেও এই পড়া নেওয়া এবং দেওয়ার দায়িত্ব তানশান করে। চর্চাও সে করায়।
রূপকথা আলগোছে আরেক লোকমা তুলে দিলে তানশান নীরবে মুখে তুলে নেয়। পুরোটা খাইয়েই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রূপকথা। একদিনের জ্বরের কারণেই সুস্বাস্থ্যবান ছেলেটার চোখেমুখে কেমন রুগ্নতা চলে এসেছে। বাবার অনুপস্থিততে তার কাছেই তো এই আমানতটি রাখা। সে যদি আমানতের খেয়ানত করে তবে ঐ যে আকাশে তারা হয়ে যে তাদের দেখছে, তার যে খুব কষ্ট হবে। আর যাই হোক কারোর মাতৃত্ব ক্ষুন্ন হতে দেবে না সে!
নিজের ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে রূপকথা আরেকবার ফোনটি দেখে নেয়। নাহ্! কারোর ছোট্ট একটা বার্তাও নেই। সদ্য প্রেমে পড়া মনটিতে বিরূপ প্রভাব পড়লো না। তবে ঐ যে মন! অবুঝ! একটু ভালোবাসা, এটেনশন, যত্ন পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। খেয়ালে-বেখেয়ালে একটু খোঁজ নিলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো? হয়তো এতটা মধুরতা এখনো তাদের সম্পর্কে আসেনি, এই বুঝ দিয়েই নিজের কাজে মগ্ন হয়। বড়ো শিক্ষককের অনুপস্থিতিতে ছোট শিক্ষক তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। তাই পড়াশুনায় ফাঁকিবাজি করা দুস্কর!
মাঝেমধ্যে রূপকথা ভাবনায় পড়ে, এই পড়াশুনার গতিতে সে কি ডাক্তার হতে পারবে তো!
সে কলেজের পোশাক পড়ে তৈরি হতেই তার ফোনটা বেজে উঠল স্বশব্দে। সে চকিতে ফোনটা হাতে নিলে আননোন নাম্বার দেখে ফের আশাহত হলো। সে ফোনটা রেখে দিতে গেলে একটা মেসেজ আসলো। তার ভ্রু কুঁচকে যায় মেসেজটি দেখে।
–“রূপকথা, আমি তপোবন ফোন রিসিভ করো।”
রূপকথা তড়িঘড়ি করে ফোন রিসিভ করলো। তবে কণ্ঠে মোটেই প্রকাশ পেল না তার ভেতরকার উত্তেজনা।
অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসলো শ্রান্ত কণ্ঠ।
–“কেমন আছো?”
–“আল্লাহ যেমন রেখেছে।”, দ্বায়সারা কণ্ঠে তপোবনের ঠোঁটের কোনা বেঁকে যায়। মনটা মেয়েটিকে একটু বেশিই চিনে ফেলেছে। মনে হয়েছিল, এই অযোগ্য মানুষটার ফোন না পেয়ে কেউ ভীষণ অভিমান করবে।
সে মিহি স্বরে শুধায়,
–“রাগ করেছো?”
রূপকথা ঠোঁটে ঠোঁট চাপে। উপচেপড়া বিষন্নতা লুকিয়ে বলে,
–“আমার রাগ করায় কারোর কিছু যায় আসে না। আমি জোরপূর্বক আঁছড়ে পড়া এক পরগাছা। যাকে সবাই জোরপূর্বক মানিয়ে নিচ্ছে। আমি বুঝি! আপনি বলুন কেন ফোন দিয়েছেন?”
পরপরই বলে,
–“ওহ্, আপনি ঠিক ধারণা করেছিলেন। তানশানের জ্বর এসেছিল গতকাল রাতে। এখন একটু সুস্থ আছে। আপনি যদি তাকে একটু বুঝিয়ে বলতেন— যে আজ স্কুলে না যেতে তবে ভালো হতো। সে আমার কথা শুনছে না।”
রাগ করেনি অথচ কণ্ঠে ভরপুর ক্রোধ! তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ছেলের সাথে কথা বলেই রূপকথাকে ফোন দিয়েছে। সে কৈফিয়তের সুরে বলল,
–“পোরশু রাতে আমার ফোনটা চুরি হয়ে যায়, রূপকথা। এক স্টাফের ফোন দিয়ে শুধু তানশানকে ফোন দিয়ে খোঁজ নিয়েছিলাম। আর এখানে আসার পর থেকে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। দুই দু’বার এক্সিডেন্ট হতে হতেও বেঁচে গিয়েছি। গতকাল রাতে নতুন ফোন কিনে আসার সময় ও এক্সিডেন্ট করতে গিয়ে কোনোভাবে বেঁচে গিয়েছি। পায়ে ব্যথা নিয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আর ফোন দেয়ার সুযোগ হয়নি। স্যরি রূপকথা!”
রূপকথার চোখ ছলছল করে উঠল। কণ্ঠ আনমনে নরম হয়ে আসে। থমথমে মুখে বলে,
–“এখন ঠিক আছেন?”
–“হ্যা, ব্যথা কমেছে অনেকটা।”
–“এগুলো তো কোনোভাবে একটু ফোন করে বলা যেতো। অসম্ভব তো ছিল না।”
তপোবন স্মিত হেসে আলসেমাখা কণ্ঠে বলল,
–“ইদানিং বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে বুঝলে। কাউকে ফোন দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রেমালাপ করতে ইচ্ছে হয়। কারোর কণ্ঠ শুনলে ইচ্ছে হয় কাজ ফেলে তার কণ্ঠই শুনি। কিন্তু এগুলোর কিছুই করতে পারছি না, কারণ বউ আমার ছোট্ট! তাকে এখনো আরেকটু বড় হতে হবে। তাই নিজেকে একটু দমাচ্ছিলাম।”
ক্রোধ অশ্রুতে জর্জরিত মেদহীন ফর্সা মুখটিতে হঠাৎ লাজ ফুটে উঠল। চাইলেও আর রাগ দেখাতে পারল না রূপকথা, আর না পারল কথোপকথন বাড়াতে। ঠাস করে মুখের ওপর ফোন কেটে দিয়ে সে চুপটি করে বসে রইল।
তন্মধ্যেই ফোনের মেসেজ অপশনে অজস্র হাসির রিয়্যাক্ট ভেসে আসলো তপোবনের নাম্বার থেকে। রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। এই বাবা ছেলে যে ভীষণ ধুরন্ধর তা বুঝতে বাকি রইল না। কি করে তাকে কথার ছলে ফাঁসাতে হবে তা বেশ ভালো করে জানে!
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৪
তপোবন হাসতে হাসতে হোটেল রুমের বিছানা থেকে নামে। নামতেই পায়ে ব্যথা অনুভব হলো। চোখমুখ কুঁচকে তাকায় নিজের পায়ের দিকে। চোখেমুখে সরব চিন্তা হানা দেয় এমন লাগাতার দূর্ঘটনা কি কাকতালীয় নাকি ইচ্ছাকৃত! এই জীবদ্দশায় তার কোনো শত্রু থাকার কথা না। কিন্তু যখন থেকে বাবার রাজনীতিতে বাবাকে সাপোর্ট দিচ্ছে তখন থেকেই জীবন কিছুটা ক্রিটিক্যাল হয়ে যাচ্ছে! সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। চিন্তাটা উপেক্ষা করতে না পেরে কাউকে ফোন লাগায়।
