অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৬
তোনিমা খান
প্রতিবছর শীতের প্রকোপ খুলনা শহরের উষ্ণ আবহাওয়ার সাথে পেরে না উঠলেও, এই বছর শীত দূর্দান্তভাবে উষ্ণতাকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রয়োজন ব্যতীত কাকপক্ষী দেখা যায় না প্রভাতের কুয়াশামাখা ধরণীতে।
সৃজা আর সুপ্তি দুই বোন। বাবা নেই, মা নিয়েই তাদের একাকী জীবন। এরপর পুরুষ মানুষ ব্যতীত তাদের এই কুল-কিনারাহীন, একাকী বিলাসী জীবনের ভরসা হয়ে ওঠে একাধিক পুরুষ মানুষ-ই! নোংরা এই জীবনযাপন-ই তাদের এখন কম্ফোর্টজোন হয়ে গিয়েছে। তবে দেড় বছর হলো তাদের এই বিলাসী জীবনে একাধিক পুরুষ নয় বরং একজন পুরুষ ই যথেষ্ট। আর সেটা হলো ইমরোজ সিকদার। সৃজার সংসার থেকে শুরু করে তার সখ আহ্লাদ সব সে-ই পূরণ করে। এর জন্যই কখনো বিবাহে আগ্রহ না পাওয়া সৃজাও বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। উৎকট শব্দে একের পর এক বেজে চলা কলিং বেলের শব্দে কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যায় সৃজার। সে রাগে হুঁশ হারিয়ে দরজা খুলেই দিল এক বিশ্রী গালি।
কিন্তু সম্মুখে কেউ নেই। তবে যা আছে তা বিস্ময়কর! একতলা দালানটির দরজার সামনে সেজে থাকা দশ বারোটা বড় বড় লাল গোলাপের তোড়া দেখে সে তব্দা খেয়ে গেল। মনোমুগ্ধকর অপ্রত্যাশিত সেই দৃশ্যে সে চেঁচিয়ে বলল,
–“কে এখানে? এগুলো কার?”
একবার, দু’বার.. এভাবে কয়বার ডাকতেই গেটের আড়াল থেকে একজোড়া ধূসর চোখ বেরিয়ে আসল। সৃজা হকচকিয়ে গেল সদ্য পরিচিত এক মুখ দেখে।
অস্ফুট স্বরে বলে,
–“এরোজ!”
ততক্ষণে সুগঠিত সুদর্শন দেহের পুরুষটি সাদা গোলাপের তোড়া হাতে গেট পেরিয়ে ঢুকেছে। সৃজা নিজের হতভম্বের রেশ কাটিয়ে মেকি সৌজন্য হেসে বলল,
–“এরোজ স্যার, আপনি এখানে কি করছেন?”
সুবিশাল এক পুরুষালী দেহ! অথচ পড়নে কালো শর্টস আর কালো একটা হুডি। প্রকৃতিতে একবার চোখ বুলিয়ে সৃজার মনে হলো সে ভিন্ন গ্রহের এক সুদর্শন প্রাণীকে দেখছে। শীতে সে রীতিমতো কাঁপছে অথচ সম্মুখের পুরুষটি নির্বিকার।
এরোজ থমথমে মুখে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় ঠিক সৃজার সম্মুখে। সৃজার কপাল কুঁচকে গেল এরোজ তার অতি সন্নিকটে এসে দাঁড়াতেই। সৃজা থতমত খেয়ে এক পা পিছিয়ে গিয়ে শুধায়,
–“আপনি এখানে কেন এরোজ স্যার? আর এই ফুলগুলো কি আপনি এনেছেন?”
–“পছন্দ হয়েছে?”
জলদগম্ভীর কণ্ঠে সৃজা চোখে চোখ রেখে কৌতূহলী গলায় শুধায়,
–“হ্যাঁ?”
এরোজ জবাব দিল না, প্রগাঢ় চোখে দেখে সম্মুখের নারীটিকে। কিয়ৎকাল বাদ ধিমি কণ্ঠে বলে উঠে,
–“আপনি খুব সুন্দর!”
–“মানে?”, সৃজা হতবাক হয়ে শুধায়।
এরোজ পলক ফেলল। উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে হাতের ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“দুঃখিত!”
–“কিসের জন্য?”
–“ভুলে গিয়েছেন দেখছি! আপনার চেহারার মতো আপনার মনটাও সাদা, লাইক ব়্যাডিশ।”
–“ব়্যাডিশ? মানে মূলা? আপনি আসলে কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
–“ফুলটা গ্রহণ করলে খুশি হতাম। আমি জানি আপনার কাছে এই ফুলের সৌন্দর্য ভীষণ নগণ্য, তবুও আমার মনের শান্তির কারণেই এগুলো আনা।”
এরোজের মনোমুগ্ধকর দৃষ্টি থেকে চোখ সরিয়ে সৃজা বোকার ন্যায় ফুলের তোড়াটা হাতে নিল।
–“কিন্তু এই ফুল, স্যরি এসব কিসের জন্য?”
এরোজ পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
মৃদু অনুশোচনার সাথে বলল,
–“সেদিন রাতে আমি ড্রাঙ্ক ছিলাম। আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য আমি দুঃখিত! আমার একদমই উচিত হয়নি। এরপর থেকেই আমার ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে। তাই সকাল সকাল ছুটে এসেছি ভেতরের অস্থিরতা কমাতে। এখন আমার মনে হচ্ছে আমি সফল। আপনার স্নিগ্ধ চেহারাটা দেখেই আমার বুকটা শান্ত হয়ে গিয়েছে।”
সৃজা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল এরোজের পানে। একটা মানুষ কত সুন্দর করে কথা বলতে জানে! সে প্রগাঢ় হেসে তড়িঘড়ি করে বলল,
–“কোনো সমস্যা নেই। এত দুঃখিত বলতে হবে না।”
–“সমস্যা নেই মানে কি? অবশ্যই সমস্যা আছে। এত সুন্দর নারীকে দুঃখ দেয়ার অপরাধে আমার কঠিন প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত। কিন্তু আমার হাতে সময় খুব নেই। তাই কঠিন প্রায়শ্চিত্ত না করতে পারলেও ছোট কিছু এনেছি আপনার জন্য।”
সৃজা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই এরোজ পকেট থেকে একটি ছোট মখমলের বাক্স বের করল।
ঢাকনাটা খুলতেই ভেতরের হিরার আংটিটা সকালের রোদে তীব্র দ্যুতি ছড়ালো। সৃজার চোখের মণি জোড়া সেই আলোর ছটায় মুহূর্তেই থমকে গেল।
এরোজ আংটিটা তার দিকে আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
–“সুন্দরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য সাধারণ ফুল যথেষ্ট নয়। যদিও আমি জানি আপনার সৌন্দর্যের কাছে এই ঠুনকো হিরের পাথরের উজ্জ্বলতা কিছুই না, তবুও আমার পক্ষ থেকে এই ছোট উপহারটি নিয়ে ‘স্যরি’টা একসেপ্ট করে নিন।”
সৃজা অপলক মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল আংটিটার দিকে। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধায়,
–“হিরের আংটি? এটা আপনি আমার জন্য এনেছেন?”
–“কারোর আত্মসম্মানে আঘাত দেয়ার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না, মিস সৃজা। তাই এই ঠুনকো উপহারটুকু গ্রহণ করলে আমি খুশি হতাম। না করবেন না, প্লিজ।”
–“কিন্তু এত দামী উপহার আমি কি করে নিতে পারি?”
–“কারণ আপনি আর আপনার ক্ষমা এর থেকেও দামী। এটা না নিলে আমি ভাববো আপনি আমায় ক্ষমা করেননি।”
সৃজার লোভী মনটা তৃষ্ণার্তের মতো আংটিটা লুফে নিতে চাইলেও, মুখে একটা কৃত্রিম জড়তা এনে সে আলতো করে হাসল। কাঁপা হাতে বাক্সটা গ্রহণ করতে করতে সুনিপুণ অভিনয়ে বলল,
–“এসবের একদমই প্রয়োজন ছিল না স্যার। তবে আপনার জেদ আর এই সুন্দর উপমাটার পর আর না করতে পারলাম না। আপনার স্যরি এক্সেপ্টেড।”
এরোজ স্মিথ হাসল। কৌতূহলী গলায় শুধায়,
–“আপনার মা কোথায়? সে সুস্থ আছে এখন?”
–“হ্যাঁ হ্যাঁ, মা এখন সুস্থ আছে। আপনি ভেতরে আসুন, স্যার।”
–“না, আজ থাক।”
–“সে কি! আপনি ভেতরে না আসলে আমি ভীষণ লজ্জিত হব, স্যার।”
এরোজ নির্নিমেষ চেয়ে রইল অতি মিষ্টভাষী মেয়েটির দিকে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“দয়া করে ‘আপনি’ বলবেন না। শুধু এরোজ!”
সৃজা মুগ্ধ হয় তার আচরণে। বিমুগ্ধ চিত্তেই হঠাৎ বলে উঠল,
–“আপনাদের অফিসে কাজ করছি আজ দুই বছর। কিন্তু এই দুই বছরে আপনার ব্যাপারে যতটুকু শুনেছি, তার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। আপনি যেমন সুপুরুষ আর সুদর্শন, তেমনি আচরণ ও অমায়িক।”
–“এখন কি আপনার মুখে আমার নামটা শোনার একটু সৌভাগ্য হবে?”, এরোজের জড়ানো কণ্ঠে সৃজার বুকটা ধড়াস করে উঠল। পুরুষালী ঘুম জড়ানো কণ্ঠ আকর্ষণীয়। কিন্তু এই পুরুষটির কণ্ঠ একটু বেশিই আকর্ষণীয়। সে নিজেকে মনে মনে শাসায় আর দমায়।
মেকি হেসে বলে,
–“ইয়াহ, এরোজ। আমার দিনটা এত সুন্দর করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। প্লিজ নেক্সট টাইম দেখা হলে আমরা একসাথে বসে অন্তত একটা কফি খাবো।”
–“আপনি চাইলে, নেক্সট টাইমটা আমরা শীঘ্রই ডিসাইড করতে পারি।”
–“সত্যিই?”
–“ইয়াহ। আমার নাম্বার নিন।”
বলেই এরোজ ফোন বের করে নিজের নাম্বার দিল। সৃজাও হাসিমুখে বলল,
–“আমার নাম্বার ও নিন।”
–“দরকার নেই, আমার কাছে আছে।”
–“আমার নাম্বার আপনি কোথায় পেলেন?”
এরোজ বিগলিত হেসে বলল,
–“পছন্দের মানুষের নাম্বার থাকবে না এটা কেমন কথা? আজ আসছি। হ্যাভ আ নাইস ডে, বিউটিফুল লেডি।”
বলেই এরোজ পা বাড়ায়। সৃজা লজ্জিত কণ্ঠে পিছু ডেকে উঠল,
–“এরোজ, প্রথমবার আমার বাড়িতে এসেছেন অথচ ঘরে ঢুকলেন না। এটা কেমন দেখায়?”
শর্টসের পকেটে হাত গুঁজে এরোজ ফিরে তাকায়। মৃদু হেসে বলল,
–“আসব, শীঘ্রই আসব। তবে যেদিন আসব সেদিন আপনাকে নিয়েই যাব।”
–“মানে?”
এরোজ পুনরায় হাসল। চোখে চোখ রেখে বলল, –“আমার অপেক্ষায় থাকবেন, আমি আবার শীঘ্রই আসব।”
বলেই এরোজ গটগট করে বেরিয়ে যায় গেট থেকে। সৃজা বোকার মতো তাকিয়ে রইল। তার কেন মনে হলো এরোজের কথাগুলো তাকে প্রেমময় বার্তা পাঠাচ্ছে? কেন মনে হলো তার প্রতি এরোজের অন্যরকম মনোভাব আছে?
নিজের ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হয় সৃজা। ওদিকে ইমরোজকে যে এতদিন যাবৎ চাপ দিচ্ছে সুপ্তিকে ঐ বাড়ির বউ বানানোর জন্য। তবে তাদের সম্পর্কটা অন্তত একটু সহজ হবে।
এমন ভাবনা থাকলেও সেটা অসম্ভব!
গাড়ি পর্যন্ত আসতেই এরোজের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মস্তিষ্কের শিরা উপশিরা দপদপ করছে। সে স্বশব্দে গাড়ির দরজা আঁটকে সিটে মাথা এলিয়ে দিল। বদ্ধ নেত্রে কয়েকটা লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিসিয়ে বলে,
–“তুই এমনটা কি করে করতে পারিস, ইমরোজ!”
দশ মিনিট ধরে নিজেকে কোনোমতে সামলাতে ব্যর্থ হয়ে এরোজ ব্যতিব্যস্ত হয়ে নিষিদ্ধ পানীয়ের বোতলটা হাতে নেয়। ঢকঢক করে অর্ধেকটা খেলে চোখের সামনে সবটা হালকা ঝাঁপসা হয়ে আসে। উত্তেজনা দমে যায় মন্থর গতিতে। ওভাবেই বদ্ধ নেত্রে পড়ে রয় সিটে মাথা এলিয়ে। ধীরস্থির মস্তিষ্ক শান্ত হয়, মৃদু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়।
নিমগ্ন মস্তিষ্কের মানসপটে কারোর হাসিমুখ ভেসে উঠতেই চোখের কার্নিশ সিক্ত হয়। কিন্তু হাসিমুখটি কান্নায় বদলে যেতেই অসহনীয় পীড়ায় কার্নিশদ্বয় থেকে অশ্রু গড়ায়।
জীবনের কঠিন এই পর্যায়ে এসে এরোজ উপলব্ধি করে— প্রিয় মানুষটিকে অন্যের সাথে সুখে থাকতে দেখা যতটা যন্ত্রণাদায়ক, তার চেয়েও অধিক যন্ত্রণাদায়ক তার চোখে অশ্রু দেখা।
অশ্রু গুলো তখন অবারিত। ক্ষীণ স্বরে আওড়ায়,
–“আমি আজ ও আপনার হাসিমুখ ভুলতে পারি না। আপনাকে কাঁদতে দেখা আমায় ভীষণ পীড়া দেয়। আপনার প্রতিটা তপ্ত অশ্রু আমার হোক, বিনিময়ে পৃথিবীর সকল সুখ আপনার হোক।”
সৃজা তখনো অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে আছে হাতের আংটিটির দিকে। সুপ্তি ঘুম ছেড়ে খুঁটে খুঁটে দেখে বলল,
–“এটা কি সত্যি হিরের? চলো চেক করিয়ে নিয়ে আসি।”
–“হ্যাঁ, চেক তো করাবোই। নয়তো কোন মাতাল একটা অচেনা মেয়েকে স্যরি একসেপ্ট করানোর জন্য হিরার আংটি দেয়?”
–“হতে পারে ইমরোজ ভাইজানের মতো এরোজ ও ধনী! দিতেই পারে।”
–“তা পারে.. কিন্তু একটা অচেনা মেয়েকে? ইমরোজ গতকাল বলল, এরোজ বিয়ের জন্য রাজী হচ্ছে না। এমনকি ও আগ্রহ ও দেখায়নি পাত্রী কে? সেক্ষেত্রে আমাদের চেনার কথা না।”
–“যদি এটা হিরার হয় তবে?”, সুপ্তি প্রবল উত্তেজনা নিয়ে শুধায়। সৃজা উজ্জ্বল দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“তবে আমাদের সব ঝামেলা একবারে চুকে যাবে সুপ্তি। এরোজকে যে করেই হোক বিয়েতে রাজী করাতে বলব ইমরোজকে। আমরা দু’জন হব সিকদার বাড়ির পুত্রবধূ! আমাদের আর টাকার জন্য কোনো চিন্তাই করতে হবে না। সারাজীবন পায়ের উপর পা তুলে খাবো, ঘুরব।”
–“একদম ঠিক বলেছ।”, সুপ্তি আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল। দু’জনের চোখেই নিজেদের এই অনিশ্চিত দুরবস্থা চিরতরে দূর করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা!
বোনের গম্ভীর মুখটি দেখে নিঝাম ঠোঁট উল্টে বলল,
–“রেগে গেলে নাকি? দেখো আমি না জেনে বুঝে কোনো কথা বলছি না। তোমার ঘরটা আমার কাছে এলোমেলো লাগছে। আর এর একমাত্র কারণ তোমার পুত্রবধূরাই। এটা তুমি মানো আর না মানো।”
নির্জনা বেগমের মোটেই পছন্দ নয় এমন ধরণের কুলক্ষণে কথাবার্তা। কিন্তু এটাও সত্য নিঝাম পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো কথা বলে না। তাই সে গাম্ভীর্যতা ভেঙে শুধায়,
–“এমন কেন মনে হলো তোর?”
–“তোমার বড় বউমা— তার কথা কি বলে বোঝাতে হবে? উঠতি বয়সের মেয়েকে তুমি কি দেখে আনলে? তপোবন তো কঁচি বউ পেয়ে দিন দুনিয়া ভুলে বসেছে। কিন্তু বাস্তবতা তো তুমি আমি জানি। বউকে পড়াশুনা করানো, পর পুরুষের মাঝে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া, এটা কতটুকু ভয়ঙ্কর তা কি তুমি জানো না?”
–“জানি বলেই তো আমি কখনো চাইনি বড় বউমাকে পড়াশুনা করাতে। তপোবনের সাথে তো জোরজবরদস্তি করতে পারি না আমি।”, নির্জনা বেগম চাপা আক্রোশের সাথে বললেন।
–“তবে ভোগান্তিতে পড়ার জন্য তৈরি থাকো। একদিন দেখবে স্বামীর টাকায় পড়াশুনা করে কোনো যুবক ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে।”
–“অলক্ষুণে কথা কেন বলছিস, নিঝাম? এগুলো বলার জন্যই কি এসেছিস? দু’টো ভালো কথা তো বলতে পারিস।”
–“আমি তোমাকে সাবধান করছি শুধু!”
–“আমি যথেষ্ট সাবধান আছি। আমি আর কাউকে এই সংসারে ভাঙন সৃষ্টি করতে দেব না, নিঝাম। ঐ এক রত্তি মেয়েকেও না।”
–“সাবধান থাকলেই ভালো। আর মৌনতা! ওর কথার সুর তো আমার ভালো লাগল না। আগে কত চঞ্চল, সেজেগুজে পরীর মতো থাকত। আর এখন মরা মরা লাগছে। হাতে কানে গলায় থাকে না কিছু।
ইমরোজের ব্যাপারে তো আমরা সবাই কম বেশি জানি! এমন চলাফেরা করলে বেশিদিন তোমার ছেলে ঘরমুখী থাকবে না।”, নিঝাম ভীষণ গুরুগম্ভীর গলায় বলল।
নির্জনা বেগম উদাসীন হলেন। বোনের দিকে তাকিয়ে মৃদু উৎকণ্ঠা নিয়ে বললেন,
–“এটা ঠিক বলেছিস! আমার কেন জানি মনে হয় ওদের মধ্যে কোনোকিছু ঠিক নেই। ইমরোজকে ঘর সংসারের প্রতি উদাসীন লাগছে।”
–“ঘরের বউ অমন উদাসীন, মৃত মানুষের মতো চলাফেরা করলে কোন পুরুষ ঠিক থাকে? আমরা তো কত সেজেগুজে টিপটপ থেকে স্বামী হাতের মুঠোয় রেখেছি। ওয়াহেদকে আমি এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল হতে দেইনা। আর সেখানে মৌনতা!”
ট্রে হাতে রূপকথার উদাসীন চিত্ত সরব কেঁপে উঠল নিঝামের কথাগুলো কর্ণগোচর হতেই। নিঝামের প্রত্যেকটা কথা অদ্ভুত লাগলেও, তার অন্তঃস্থল অস্থির হয়ে পড়ল ‘ওয়াহেদ’ নামটি শুনে। তাদের পুরো পৃথিবীটা যে ওলটপালট হয়ে আছে এই একটা নামের কারণেই। কিন্তু এটা নিছকই রূপকথার মনের ভ্রম! দুনিয়াতে অজস্র ওয়াহেদ থাকলেও, সবাই তার বাবা নয়। তার বাবা তো পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধ এক সত্তা! যে কি-না সৃষ্টিকর্তার কঠোর সিদ্ধান্তে কোথাও হারিয়ে গিয়েছে।
মানুষটা কেমন আছে? কোথায় আছে? আদৌও কি জীবিত আছে? রূপকথার চোখ ছলছল করে উঠল।
ইচ্ছে করে না রুমের ভেতরে এগিয়ে যেতে। তবুও যেতে হয় অতিথি আপ্যায়ন করতে।
যেতে যেতে ভাবে মৌনতাকে নিয়ে সদ্য বলা কথাগুলো। তবে কি স্বামীকে ধরে রাখাই মৌনতা ভাবির সুখময় জীবনের একমাত্র দুঃখ? মানুষটার সকল দুঃখের কারণ কি তবে খালা শাশুড়ির বলা কথাগুলো? রূপকথা ভাবতে পারে না আর। ছোট্ট মস্তিষ্ক ভাবতে চায় না চরিত্রহীনতা কতটা বিদঘুটে যন্ত্রণাদায়ক হয়!
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তো ধরে রাখার সম্পর্ক নয়। বরং আজীবন নিজেদের চক্ষু আর নিয়ত পবিত্র রেখে থেকে যাওয়ার সম্পর্ক। তবে কেন পবিত্র সম্পর্কটিতে এই ঘৃণ্য কথাগুলো আসে?
রূপকথা কক্ষে ঢুকতেই নিঝাম আর নির্জনা বেগম নিজেদের সামলে নিলেন। নির্জনা বেগম রূপকথাকে এক পলক দেখে খানিক কঠিন গলায় বলল,
–“তোমায় যেন ঘরে এসব ফকিন্নিদের মতো চলাফেরা করতে না দেখি। আমার ছেলের বউদের রানীর মতো সাজিয়ে রাখার সামর্থ্য রয়েছে আমার। আমি যেন আর না দেখি, একজন অতিথি আসলে তার সামনে তোমরা এভাবে বের হও।”
নিঝাম ও উপদেশ দিয়ে বলল,
–“আমি নাহয় খালা শাশুড়ি, কিছু মনে করলাম না। কিন্তু অন্য মানুষ? সমাজে তোমার শ্বশুর-শাশুড়ির একটা সম্মান আছে। রক্ষা করার দায়িত্ব তোমাদের। আশা করি বড়দের কথা মেনে চলবে।”
রূপকথা শুকনো ঢোক গিলে নীরবে মাথা নাড়ল। পরপরই নিঝাম প্রফুল্ল হেসে বলল,
–“কাল তোমার খালু বিদেশ থেকে আসছে। আপার সাথে আমাদের বাড়িতে যাবে বুঝেছ? যদিও সে আসবে তোমায় দেখতে। তবুও আপার সাথে যাবে কিন্তু!”
রূপকথা এবার ও মাথা নাড়ল শুধু। মস্তিষ্কে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে চরিত্রহীন শব্দটি জুড়ে ঘৃণ্য সব অসংলগ্ন চিন্তা-ভাবনা! শাশুড়িরা কেন বলল, স্বামীকে ধরে রাখতে হয়? এতদিন যেই সংসার জীবনকে সে সহজ করে তুলছে, আদতেই কি তা সহজ? না-কি কঠিন?
রূপকথার মলিনতা আরও প্রগাঢ় হলো। খাবার দিয়ে পুনরায় রান্নাঘরে এসে তাকায় সন্ধ্যার নাস্তা বানাতে ব্যস্ত মৌনতার দিকে। সাহস করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, মানুষটা ভালো আছে তো? কিন্তু সাহসে কুলায় না।
শুধু জিজ্ঞেস করে,
–“ভাবি ঠিক আছেন তো?”
মৌনতা হকচকালো রূপকথার আচমকা প্রশ্নে। অপ্রস্তুত হেসে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“আমার আবার কি হবে? খালামনিকে খাবার দিয়ে এসেছো?”
–“জি ভাবি।”
— “কথা শুনিয়েছে নাকি?”
–“না ভাবি।”
–“ছোট খালামনি একটু অন্য রকমের বুঝলে। দুই কথা বললে কিছু মনে করবে না। তার জীবনের একমাত্র মানেই হলো, কিভাবে সেজেগুজে পটের বিবি হয়ে স্বামীকে ধরে রাখা যায়।”
–“কেন? এমন চিন্তা কেন করে? স্বামী কি ধরে রাখার জিনিস? কাউকে ধরে রাখা যায়?”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
–“স্বামী ধরে রাখার জিনিস নয়, আর না ধরে রাখা যায়। কিন্তু কোন মেয়ে চায় বলোতো —যে তার সংসারটা ভেঙে যাক কিংবা তার স্বামী তার চোখের সামনে অন্য নারীকে ভালোবাসুক!”
–“কোনো মেয়েই চায় না।”
–“এটাই মূল কারণ। তাই সে অমন করে। সে তার স্বামীকে এক মুহূর্তের জন্য ও চোখের আড়াল করে না, জানো? মাঝেমধ্যে বিদেশে যেতে হয় কাজের সূত্রে, সেখানেও সাথে সাথে যায়। তবে এই প্রথমবার খালু একা বিদেশে গিয়েছে।”
রূপকথা নীরবে শুনল। তবে তার মোটেই ভালো লাগল না এই কথাগুলো। অক্ষীপটে ভেসে ওঠে তপোবনের নির্মল মুখটি। মানুষটাকে দেখে তার কখনো মনে হয়নি যে, তাকে ধরে রাখতে হবে। কিন্তু তার এই জীবনে স্বামীর ভালোবাসা পাওয়া খানিক বিতর্কিত বিষয়— এতটুকু সে বুঝতে পারে।
এক জীবনে দুইজনকে ভালোবাসা কঠিন। কিন্তু সে তো কখনো কারোর ভালোবাসাই পায়নি। তার হিসেবটা কে করবে?
নিজের প্রশ্নগুলো রবের দুয়ারে রেখে মলিন হেসে রূপকথা ছেলের আর নায়েলের স্যান্ডউইচ বানাতে শুরু করলো। ভালোবাসা না পেলেও কারোর ঘৃণা অন্তত পেতে না হয়। তানশান অন্তত তাকে কখনো সৎ মা বলে ঘৃণা না করুক।
রাতে তপোবন যখন ফিরল তখন রূপকথাকে ঘুমন্ত পেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল তপোবন। নিজের ভালোই যেই মেয়ে এখনো বোঝে না, সে কি করে এই ভরা সংসারের সকল ভার নিতে চায়? পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পড়াশুনার বয়সে সে স্বামীর সাথে রাগ দেখিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
সে হাত মুখ ধুয়ে ছেলের কাছে চলে গেল। তানশান বই খাতা বের করে বলল,
–“মিমি পড়তে আসবে না?”
তপোবন বই দেখতে দেখতে বলল,
–“মিমির সাথে কথা হয়নি তোমার?”
–“সন্ধ্যায় হয়েছিল, এরপর আর হয়নি। তার মন খারাপ মনে হয়েছিল।”
–“হুঁ, মন খারাপ ই।”
–“কেন?”
তানশান ভীষণ কৌতূহলী গলায় শুধায়। তপোবন চোখ তুলে তাকায় ছেলের জড়তা বিহীন মুখপানে। এখন আর রূপকথার প্রসঙ্গে তানশানের মাঝে কোনোরূপ বিরূপ প্রভাব দেখা যায় না। সে মৃদু হেসে বলল,
–“তা তো জানি না। তুমি নাহয় তোমার মিমির থেকে জেনে নিও। এখন এই ম্যাথগুলো করে দেখাও আমায়। আর মিমিকে একটু শাসন করবে বুঝলে! পড়াশুনায় তার একটুও মন নেই।”
তানশান উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকায় বাবার পানে। ভীষণ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলে,
–“পাপা, তার আর আমার পরিস্থিতি এক রকম নয়। সে সেদিন বলেছে, সে নাকি এই বাড়ির বউ। তার কাঁধে অনেক দায়িত্ব থাকে। তাই সে পড়তে পারে না। কিন্তু আমাদের তো কোনো কাজ থাকে না। তুমি এক কাজ করো, দাদুমনিকে বলে তার দায়িত্বগুলো কমিয়ে দাও।”
তপোবন মুগ্ধ চিত্তে শুনল ছেলের কথা। মৃদু হেসে বলল,
–“তুমি তো ঠিক বলেছো। আচ্ছা, পাপা দেখছি বিষয়টা।”
–“ওকে পাপা।”, তানশান হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলে পড়ায় মনোযোগী হয়।
রাত বাড়ে। তীব্র ঝাঁঝালো দূর্গন্ধময় তমসাচ্ছন্ন নিস্তব্ধ ঘরটিতে গুমড়ে মরছে অব্যক্ত ক্লেশ গুলো। তখনি তমসা ভেদ করে একফালি চাঁদের আলোর ন্যায় আলো ছড়িয়ে দিয়ে বদ্ধ দরজাটি হাট করে খুলে দিল কেউ।
অন্ধকারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা পুরুষটির চোখমুখ কুঁচকে গেল আকস্মিক সেই আলোর ঝলকানিতে।
ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠে,
–“কে ওখানে?”
–“আমি।”, অতি পরিচিত মোহনীয় কণ্ঠে এরোজের ক্ষিপ্রতা মিলিয়ে যায়। সকাল থেকে ঘরে ঢোকার পরে এই প্রথম কেউ ঘরে ঢুকল।
আলোর তীব্রতা অসহ্য লাগতেই চোখ বন্ধ করে নেয়। শুধায়,
–“কেন এসেছো?”
–“ঘুমাতে, লাইট জ্বালাও।”, নায়েল এর সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তিতে প্রচন্ড অধিকারবোধ। এরোজ উপেক্ষা করে সেই অধিকারবোধ। বলে,
–“আমি গতকাল রাগারাগী করেছিলাম। তোমার ভয় লাগছে না আমার কাছে আসতে?”
–“উঁহু, লাইট জ্বালাও। আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। ঘলে খুব গন্ধ!”
পুরুষটির অন্তঃস্থল উদগ্রীব হয়ে পড়ে অভাবনীয় জবাবে। উদগ্রীব হয়ে শুধায়,
–“ভয় করছে না কেন?”
নায়েল বিজ্ঞদের মতো করে বলল,
–“তুমি আমাল সাথে কখনো লাগ দেখাও না, আমি জানি। তাই আমি ভয় পাই না তোমায়।”
এরোজের উদগ্রীবতা মিলিয়ে গেল তার জবাবে। নির্জীব কণ্ঠে বলে,
–“তোমার মতো করে কেউ আমায় বোঝে না।”
নায়েল শুনল না সেই ক্ষীণ কণ্ঠ। বিরক্ত হয়ে বলে,
–“লাইট জালাচ্চো না কেন? কি গন্ধ! এয়াল ফেশ দাও তালাতালি।”
–“এখান থেকে চলে যাও মেয়ে।”, এরোজের রুক্ষ কণ্ঠে নায়েল নীরব হয়ে গেল। শুধায়,
–“কেন?”
–“তুমি আমায় অনেক জেনে যাচ্ছ, যেটা ঐ ওপর ওয়ালা সহ্য করবে না। আবার বাজেভাবে আমায় আঘাত করবে। আমার আর ক্ষমতা নেই আঘাত সহ্য করার।”
–“কি বলছো?”, নায়েল অবুঝ কণ্ঠে শুধায়।
–“চলে যাও এখান থেকে। আমি বকবো কিন্তু!”
–“না, যাব না। তুমি আমায় বকবেও না।”
–“কে বলেছে?”
–“আমি জানি, তুমি লূপাঞ্জেলকে খুব ভালোবাসো। বকা দেবে না।”
নায়েলের কণ্ঠে ভরপুর আত্মবিশ্বাস। এরোজ ম্লান হাসে, ছোট্ট মেয়েটি তার দূর্বলতা জেনে গিয়েছে। ত্যক্ত নায়েল এবার করিডোর থেকে ঠিকরে আসা আলোয় হাতরাতে হাতরাতে বিছানায় উঠে গেল। এবং এরোজকে বাজেভাবে পরাস্ত করতে তার সবচেয়ে দূর্বল জায়গা বেছে নিল নায়েল। সুবিশাল বক্ষটি খুঁজে বক্ষমাঝে লেপ্টে যেতেই এরোজের রুক্ষতা মিলিয়ে গেল। তাড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতাও নেই, আগলে নেয়ার ক্ষমতাও নেই। কি বিদঘুটে মুহূর্ত!
নায়েল দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরে আদেশ করে বলল,
–“তোমাল মুখে গন্ধ, ঘলে গন্ধ। যাও বাশ কলে আসো। মাউত ওয়াশ কলবে থিন্তু। আল বেছি বেছি এয়াল ফেশ দেবে বুঝেছো? যাও যাও।”
এরোজ তবুও নির্বিকার অনঢ় শুয়ে বিছানায়। মাথা ফেটে যাচ্ছে ব্যথায় তবুও আদেশ উপেক্ষা করার সাধ্য নেই।
–“কি হলো তালাতালি যাও।”
–“যাচ্ছি, আম্মাজান।”, এরোজ দূর্বল কণ্ঠে বলে বিছানা ছেড়ে নামে। ব্রাশ করলো, মাউথওয়াশ করলো, পুরো ঘর থেকে খালি বোতলগুলো গুছিয়ে বিনে ফেলে ঘর পরিষ্কার করে এয়ার ফ্রেশ দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অতঃপর এগিয়ে যায় ঘুম জড়ানো চোখে অপেক্ষারত ছোট্ট মেয়েটির দিকে।
এরোজ হাত বাড়িয়ে দিতেই নায়েল বিছানা ছেড়ে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
–“ঘুমি ঘুমি পেয়েছে। গল্প বলো।”
এরোজ ছোট্ট কপালটিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ভাঙা কণ্ঠে বলল,
–“এতক্ষণ ঘুমাওনি কেন? আজ পাপার সাথে ঘুমাওনি?”
নায়েল বুকে মুখ গুঁজেই দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“পাপাল কাছে ঘুমাইনি। পাপা ছুধু লাগ দেখায়। আমাল ভয় কলে। আমি তোমাল কাছেই ঘুমাব।”
এরোজের ললাটে ভাঁজ পড়ে। শুধায়,
–“পাপা তোমার সাথে শুধু রাগ দেখায়?”
–“হুম, পাপা মাম্মাকেও লাগ দেখায় আমাকেও লাগ দেখায়। একটুও ভালোবাসে না।”
এরোজের চোখদুটো কঠিন হয়ে আসে। এগুলো কি শুধুই বিরক্তি নাকি তৃতীয় পক্ষের বিরূপ প্রভাব? চোয়াল শক্ত হয়ে আসল তার। ঘড়ির দিকে তাকালে ঘোর কাটে। রাত একটা বাজে।
সে নায়েলকে দোল দিতে দিতে বলল,
–“আমিও তো রাগ দেখাই, আমায় ভয় পাও না?”
নায়েল চোখ মেলে তাকায়। গাল ভরে হাসির তালে ধূসর নেত্রদ্বয় চকচক করছে বাচ্চা মেয়েটির। সে হাসিমুখে বলে,
–“তুমি তো কখনো আমায় লাগ দেখাওনি। কিন্তু তুমি সবাল সাথে লাগ দেখাও কেন বলোতো?”
এরোজ স্মিত হেসে শুনল পাঁকা মেয়েটির কথা। ঘন পল্লবে আবৃত ধূসর নেত্রদ্বয়ের পাতায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“ঘুমাও পাকা বুড়ি।”
এরোজ তাকে নিয়ে হাঁটতে লাগল। প্রশস্ত বক্ষে চাঁদের ন্যায় গুটিয়ে শুয়ে থাকা নায়েল একটা সময় ঘুমিয়ে পড়ল। এরোজ তাকিয়ে রইল বক্ষমাঝে লেপ্টে থাকা একটু সুখের দিকে। যেই সুখ তার কাছে দুঃস্বপ্নের ন্যায়.. সেই সুখকে ইমরোজ কি করে এতটা যন্ত্রণা দিতে পারে?
ফের মাথার শিরা উপশিরা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো প্রদাহে এরোজ ত্রস্ত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
সোজা বড় ভাইয়ের ঘরের সামনে গিয়ে থামে। মাঝরাতে কারোর তলবে তপোবন হন্তদন্ত হয়ে দরজা খোলে। তানশান ঠিক আছে তো? কিন্তু দরজা খুলতেই এরোজের বিধ্বস্ত মুখশ্রী ভেসে উঠল। তপোবন তাকায় ভাইয়ের বুকে শুয়ে থাকা নায়েলের পানে। চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
–“বিয়ে করব, ভাইজান।”
কাঁচা ঘুম ভাঙা তপোবন বোকার ন্যায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের দিকে। গতকালকেই না একদফা ভাঙচুর হলো, বিয়ে করবে না বলে?
গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগ কাঁধে তুলে নেয় তানশান। লম্বা লম্বা কদম ফেলে রূপকথার সাথে পা মেলালো। সর্বদা মায়ের বেশে ঘুরে বেড়ানো নারীটির হঠাৎ এমন চুপসে যাওয়ায় বিচলিত দৃষ্টি ফেলল। ইতস্ততা নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
–“আপনার কি মন খারাপ?”
রূপকথা চলন্ত অবস্থায় না বোধক মাথা নাড়ল।
তানশান গম্ভীর গলায় বলল,
–“মুখে বলছেন মন খারাপ না, অথচ আচরণে বুঝাচ্ছেন আপনার ভীষণ মন খারাপ। আপনি অদ্ভুত!”
রূপকথা ভ্রু কুঁচকে নিল। ঘাড় কাত করে তাকায় বাবার কপি পেস্ট ছেলেটির পানে। থমথমে মুখে বলে,
–“সবসময় বাবার মতো আচরণ করবে না।”
তানশান ঠোঁট উল্টে বলল,
–“পাপার মতো আচরণ কোথায় করলাম?”
–“মাত্রই। তোমার পাপাও না বলতেই মনের সব কথা বুঝে যায়, যেটা বিরক্তিকর।”
সরব গম্ভীর ছেলেটি গা দুলিয়ে হেসে উঠল। কোণা চোখে চেয়ে বলল,
–“আপনি চাইল্ডিশ! আপনার চোখমুখ দেখলে যে কেউ বলে দেবে আপনার মন খারাপ।”
–“কেন আমার চোখমুখে কি লেখা আছে আমার মন খারাপ?”
–“আপনি ভীষণ ঝগড়ুটে! বাদ দিন, এসব বুঝবেন না আপনি। রেগে আছেন কেন বলুন? গিফটের জন্য? আপনি পড়া শেষ করেছেন আমি অনেক খুশি হয়েছি। কিন্তু গতকাল তো বের হওয়া হয়নি তাই গিফট কিনতে পারিনি।”
–“গিফট চাই না আমার।”
–“তবে মন খারাপ কেন তাই বলুন।”
–“আমার মন খারাপ হলে তোমার কি? তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। দু’দিন ধরে তোমায় কেউ জ্বালায়নি।”
–“এটাই তো সমস্যা! আপনি আমায় বিরক্ত করেননি কেন?”, তানশান তৎক্ষণাৎ জবাব দিয়ে নিজেই ভড়কাল। রূপকথার দৃষ্টি সরু হয়ে আসে। তানশান সরু চোখের নারীটিকে দেখে বোকাসোকা হেসে বলল,
–“হঠাৎ একজন মানুষের বদলে যাওয়া আচরণ অনেক ভয়ঙ্কর হয়।”
বদ অভ্যাস গড়তে ক্ষীণ সময়-ই যথেষ্ট হয়। তানশান ও ব্যতিক্রম নয়। সে খুব দ্রুতই ‘মিমি’ নামক বদ অভ্যাসে নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলতে বাধ্য হয়। কিন্তু আত্মস্থ করার থেকেও ত্যাগ করা হয়তো বেশি কঠিন। তাই তো সে হারাতে ভয় পায়। এমনকি ইদানিং সে রূপকথার করা আচরণগুলোকেও হারাতে ভয় পায়।
রূপকথার মুখটা ছোট হয়ে গেল। তানশান কি এটা ভাবছে যে— সে বদলে গিয়েছে? সে অভিমান ভুলে নম্র কণ্ঠে বলল,
–“মা এমন ভয়ঙ্কর আচরণ কখনো করব না, তানশান।”
তানশান লজ্জা পায় এমন কথাগুলোতে। তাই আজও চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“তবে কেন মন খারাপ করছেন?”
রূপকথা আনত মুখে বলল,
–“হঠাৎ এমনি মন খারাপ হচ্ছে খুব। বাবা-মাকে খুব মনে পড়ছে।”
–“কিন্তু আপনার তো বাবা নেই।”
বলেই তানশান জিভ কাটলো। ইতস্ততা নিয়ে বলল,
–“না মানে…”
রূপকথা মৃদু হেসে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
–“আমার বাবা নেই এর জন্যই মন খারাপ হয়। তোমার মাথার উপর একজন শক্ত ছায়া আছে, কিন্তু আমার মাথার উপর কেউ নেই।”
তানশান অবাক হয়ে গেল তার কথায়। বিরোধ করে বলল,
–“কে বলেছে নেই? আমি আর পাপা আছি তো!”
তানশানের দৃঢ় কণ্ঠ। রূপকথা মলিন মুখ ছলছল করে উঠল সেই দৃঢ় কণ্ঠে। বলল,
–“আমি তো জোরপূর্বক তোমাদের জীবনে আছি। আমি জানি তোমরা আমার কারণে বিরক্ত হও। তুমি জোরপূর্বক আমায় সহ্য করো।”
টলটলে চোখদুটো থেকে অশ্রু গড়ালো বলে। তানশান অস্থির হয়ে পড়ল। সে যে কাউকে কাঁদতে দেখতে পারে না। সে থমথমে মুখে বলল,
–“আপনি বেশি বোঝেন। কেউ কাউকে জোরপূর্বক মানিয়ে নিতে পারে না। তার কোনোকিছু ভালো লাগে বলেই সে চায় মানুষটা থেকে যাক।”
রূপকথা অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
–“তুমিও আমায় জোরপূর্বক সহ্য করো না?”
–“মোটেই না।”
–“আমায় ভালোবেসে সহ্য করো?”
এবার আর মুখচোরা গম্ভীর ছেলেটি সাথে সাথে জবাব দিতে পারলো না। কোণা চোখে তাকালো ছলছল চোখের নারীটির দিকে।
তানশান চুপসে যেতেই রূপকথার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল। সে ভেজা গলায় বলল,
–“তুমি মিথ্যা বলেছো এতক্ষণ! ভালোবেসে নয় জোরপূর্বক আমায় সহ্য করছো, তাই না? কেউ আমায় ভালোবাসে না।”
ক্রন্দনরত গলায় বলেই রূপকথা গটগট করে নিজের ক্লাসের দিকে চলে গেল। তানশান বিমর্ষ চোখে তাকালো সেদিকে। অস্ফুট স্বরে বলে উঠে,
–“কান্না করে দিল আমার কারণে?”
তার অন্তঃস্থল বিষন্নতায় আচ্ছন্ন হয়। কি করে বলবে, সর্বদা একা থাকতে পছন্দ করা ছেলেটি মিমি নামক মানুষটা আশেপাশে থাকলে কতটা আনন্দ অনুভব করে। প্রতি সন্ধ্যায় অপেক্ষা করে কখন তার ঘরে তার পড়াশুনার সঙ্গী আসবে!
ছেলে আর স্ত্রীর ছুটির সময় হয়ে আসতেই তপোবন নিজের পড়নের পোশাক ঠিকঠাক করে নিজেকে গুছিয়ে নিল। অভিমানী ছোট্ট স্ত্রীর মান ভাঙাতে সদ্য আনিয়ে রাখা ফুলের তোড়াটাও নিয়ে নিল। বেরিয়ে যেতে যেতে পরিচিত এক মধ্যবয়সী ইমপ্লয়িকে দেখে মৃদু ইতস্ততার সাথে শুধালো,
–“নাহিদ, শোনো তো।”
নাহিদ নামক লোকটি দ্রুত এসে বলল,
–“জি স্যার, বলুন।”
কালো প্যান্ট, কালো শার্ট, গুটিয়ে রাখা আস্তিন আর হাতে ঝুলতে থাকা এক সোয়েটার সমেত নিজেকে দেখিয়ে তপোবন বলল,
–“আমায় কেমন লাগছে?”
নাহিদ অপ্রস্তুত মৃদু হেসে ফেলল। বলল,
–“গতানুগতিক পোশাকে বাইরে যেকোনো পোশাকে আপনাকে অসাধারণ লাগে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে না, আপনার নিজের কাঁধ সমান এক ছেলে আছে।”
–“ধুর! এত অবান্তর প্রশংসা শুনতে চাইনি, নাহিদ। কোনোরকম আরকি সুন্দর লাগলেই হয়েছে। এক বাচ্চার বাপ বোঝাবে না কেন? আমি তো বুক ফুলিয়ে বলি, আমার নিজের সমান এক সুদর্শন ছেলে আছে।”
বলেই তপোবন হেসে উঠল। নাহিদ ও হাসল। জিজ্ঞেস করে,
–“কোনো স্পেশাল কিছু, স্যার?”
–“তানশান আর তার মিমিকে আনতে যাব। কিন্তু তানশানের মিমি রেগে আছে। তাই একটু রাগ ভাঙানোর চেষ্টা আরকি।”
নাহিদ সহ সকলেই জানে স্যার দ্বিতীয়বার জীবন শুরু করেছে। সে মৃদু হেসে বলল,
–“উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক, স্যার। কিন্তু এই নারীদের অভিমান ভীষণ প্যারাদায়ক, সহজে ভাঙে না।”
নাহিদ বলেই ত্যক্ত নিঃশ্বাস ফেলল। তপোবন হো হো করে হেসে উঠল তার কথায়। রসিকতার সুরে বলল,
–“মনে হচ্ছে তুমি বাজে অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ, নাহিদ।”
নাহিদ ঘাড় চুলকে বলল,
–“তা একটু আধটু অভিজ্ঞ, স্যার।”
তপোবন হেসে বলল,
–“আচ্ছা যাও কাজ করো, আমি যাই। তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে নয়তো।”
তপোবন প্রসন্ন মনে বেরিয়ে আসে অফিস থেকে। চোখেমুখে মৃদু অনুভূতির আধিপত্য! মনে মনে ঠিক করলো ছোট্ট মেয়েটির ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেবে। অভিমান গুলোকে আর প্রশ্রয় দেবে না।
নব্য সূচনার স্নিগ্ধ অনুভূতিকে আরেকটু বিশেষ করে গাড়ির ব্যাকসিটে কিনে রাখা শাড়িগুলো। মেয়েটি উপহার পেলে ভীষণ খুশি হয়।
ছুটির ঘণ্টাটা বাজতেই রূপকথা প্রতিদিনের মতো স্কুলের প্রধান ফটকের পাশে এসে দাঁড়াল তানশানের অপেক্ষায়। আজও তার একটা ক্লাস হয়নি, এর জন্য সকলের একসাথে ছুটি দেয়া হয়েছে।
জনসমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে মেইন গেট সংলগ্ন এড়িয়াতে। রূপকথা অলস নয়নে সেই ভিড়ের মাঝে ছেলেকে খুঁজছিল। মানুষের মুখ দেখতে দেখতে অলস সময় কাটানোর সেই মন্থর মুহূর্তগুলো হঠাৎ থমকে গেল এক তীব্র বিস্ময়ে।
শান্ত শ্রান্ত মুখাবয়বে খেলে গেল অস্থিরতার এক ঝড়ো হাওয়া। দুচোখে অবিশ্বাস্য বিস্ময়।
বছরের পর বছর যাকে কল্পনায় আগলে রেখেছে, যাকে প্রতিটা প্রার্থনায় অক্ষত দেখতে চেয়েছে, সেই মানুষটিই আজ রক্ত-মাংসের শরীরে দাঁড়িয়ে!
রূপকথা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। হাতের তালু দিয়ে সজোরে চোখ রগড়ালো সে। এটা কি মরীচিকা? কোনো অলীক বিভ্রম নয় তো?
কিন্তু না! ওই তো সেই অমলিন পিতৃস্নেহ মাখানো চোখের দৃষ্টি, ওই চেনা ভুবনভোলানো হাসি, হাঁটার সেই চিরচেনা ভঙ্গি আর ঋজু দেহভঙ্গি।
হৃদপিণ্ডটা যেন বুকের পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। পুনরায় হারিয়ে ফেলার ভয়ে রূপকথা নিজের সমস্ত শক্তি নিংড়ে ভিড়ের মাঝেই আর্তনাদ করে উঠল,
–“আব্বুউউউ!”
কিন্তু অজস্র মানুষের কলকাকলিতে সন্তানের সেই হাহাকার মেশানো ডাক অগোচরেই মিলিয়ে গেল। রূপকথার গাল বেয়ে তখন আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে ভিড় ঠেলে পাগলের মতো এগিয়ে যেতে চাইল, ঠিক তখনই বাহুতে কারো স্পর্শ আর মৃদু ধাক্কায় থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে।
ছোট্ট নিহাম থতমত খেয়ে ক্ষমা চাওয়ার জন্য মাথা তুলতেই রূপকথাকে চিনে ফেলল সে। এক গাল হেসে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫ (২)
–“স্যরি ভাবি!”
রূপকথা বিমূঢ় হয়ে নিহামের দিকে তাকাল। কিন্তু তার বিস্ময়ের ঘোর নিমিষে আতঙ্কে রূপ নিল, যখন দেখল নিহাম তাকে পাশ কাটিয়ে দৌড়ে গিয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির হাত চেপে ধরল। গভীর অধিকারবোধ নিয়ে নিহাম লোকটিকে জড়িয়ে ধরল।
মুহূর্তেই রূপকথার চোখের সামনের রঙিন পৃথিবীটা ধূসর পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করল। পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। অন্তরাত্মা তখন ডুকরে কেঁদে উঠে শুধু একটাই প্রার্থনা করছে—সবটা মিথ্যা হোক, সবটা নিছক ভ্রম হোক!
