Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪০

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪০

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪০
তোনিমা খান

মর্ত্যধ্যামে প্রভাতের আলো কেবল ফুটছে। সেই সাথে মর্ত্যধ্যামে থাকা প্রতিটা জীবন তাদের সুখ দুঃখের পান্না খুলে বসেছে, কোথাও কোনো হিসেব নিকাশে ভুলচুক হলো কি-না!
জীবনের কঠিন মোড়ে থাকা তপোবন সিকদার তৃতীয়বারের জীবনের সাথে দ্বন্দ্বে জিতে গিয়েছে। আঁখি খোলার সাথে সাথে সৃষ্টিকর্তার কাছে আর্জি জানিয়েছে, ছোট্ট এই জীবনে সৃষ্টিকর্তা যেন আর কোনো কঠিন মোড়ে তাকে দাঁড় না করায়।
নাসারন্ধ্রে অতিপ্রিয় আতরের সুগন্ধটি ফুরফুরিয়ে ঢুকতেই ফর্সা ছেলেটির নিটোল আঁখিদ্বয়ের ঘন পল্লব নড়ে উঠল। কোল বালিশের পরিবর্তে অতি প্রিয় একটা জায়গা অনুভব হতেই আলগোছে কচ্ছপের ন্যায় ঘষতে ঘষতে লেপ্টে যায় বাবার বুকে। তানশান ঘুমের মাঝেই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বাবার পেট। আলসেমাখা কণ্ঠে ডেকে ওঠে,

–“পাপা!”
তপোবন আদুরে দেহটিকে আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিয়ে কম্ফোর্টার দিয়ে ঢেকে নিলো। আদুরে স্বরে বলল,
–“জি, পাপা।”
–“সকাল হয়ে গিয়েছে, পাপা?”
–“বহুক্ষণ!”
–“আরেকটু ঘুমাই?”
–“আজান শেষ হয়েছে মাত্র। এখন না উঠলে জামায়াত মিস হয়ে যাবে।”
বাবার বুকে মুখ লুকানো ছেলেটি বদ্ধ নেত্রেই পুনরায় আবদার করে বলল,
–“প্লিজ পাপা। আরেকটু ঘুমাই।”
–“মাম্মা আমাদের জন্য ওয়েট করছে, আব্বু।”
ছোট্ট একটু বাক্যই যথেষ্ট ছিল তানশানের আলসেমি পুরোদস্তুর কাটিয়ে দিতে। বাম হাতে মাথা ঠেকিয়ে বসা তপোবন স্মিত হাসল। ছেলেকে ওঠানো তার জন্য দুই মিনিট এর ব্যপার।
বাবার বুক থেকে মুখ তুলল তানশান পিটপিট করে চেয়ে বলে,
–“চলো, নামাযে যাই। মাম্মা অপেক্ষা করছে।”
তপোবন মাথা নুইয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় ছেলের ললাট বরাবর। বলল,
–“চলো।”

কিন্তু পরক্ষণেই তানশানের মনে পড়ল তার জীবনে আরো একজন নারী আছে। সে বাবার পানে চেয়ে শুধায়,
–“পাপা, মিমি? মিমির কষ্ট কি কমেছে? সে আমার সাথে আগের মতো কথা বলবে?”
তপোবন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–“সেটা তোমার মিমির কাছেই জিজ্ঞেস করো।”
বলতে বলতেই তপোবন দৃষ্টি ফেললো সদ্য দ্রুত কদমে ঘরের দরজা থেকে ঢোকা এক পরিপূর্ণ স্নিগ্ধ রমনী পানে। আপাদমস্তক উষ্ণ আবরণে পেঁচিয়ে রেখেছে। মুখটুকু ব্যতীত কিছু দেখা যাচ্ছে না। সদ্য স্নানের কারণে শীত আর ভালোবাসার দ্বন্দ্বে নারীটি বাজেভাবে পিষ্ট হচ্ছে।
তানশান উজ্জ্বল দৃষ্টি ফেলল কাবার্ড খুলে নিজ কর্মে মগ্ন রূপকথার পানে। চোখমুখ ঠিকরে আনন্দ উপচে পড়ছে। সে বিছানা থেকে নেমে হড়বড়িয়ে বলল,
–“আপনি আমাদের সাথে কেন রাগ দেখাচ্ছেন? আমরা তো আপনাকে ভালোবাসি।”
পাঞ্জাবি টুপি হাতে রূপকথা শ্রান্ত নয়নে ফিরে তাকায় উদগ্রীব ছেলেটির দিকে। ক্ষীণ স্বরে শুধায়,
–“তোমরা আমায় ভালোবাসো?”
সহসা চুপসে গেল ছেলেটির সকল উদগ্রীবতা। তপোবন মৃদু হেসে বিছানা গুছিয়ে নিচ্ছে, মা ছেলের দ্বন্দ্বে সে পড়বে না কখনোই।
রূপকথা ম্লান হাসল তানশানের চুপসে যাওয়া দেখে।
বলল,

–“আমি কারোর সাথে রাগ করিনি। তাড়াতাড়ি ওযু করে আসো। জামায়াত মিস হয়ে যাবে।”
তানশান নিজের উপর বেজায় বিরক্ত হয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। সে কেন খোলামেলা কথা বলতে জড়তা অনুভব করে? কেন বলতে পারল না—যে ভালো না বাসলেও তাকে সবসময় কাছে চায়, হাসিখুশি পাশে চায়। আর এটাই যে তার মিমির প্রতি তার সুপ্ত ভালোবাসা তা বুঝল না তানশান।
তপোবন বিছানা গোছাতে গোছাতে গলা খাঁকারি দিলো। অথচ মেয়েটি তা শুনেও ভীষণ নির্দয়তার সাথে উপেক্ষা করে এক ছুটে ছেলের চেঞ্জিং রুমে চলে গেল।
তপোবন কাঁধ ঝাঁকালো। সকাল সকাল এই লুকোচুরি ঠিক কোন কারণে তা বোধগম্য হলেও, একটু বিরক্ত করতে ভালোই লাগছে।
তানশান মিনিটের মাঝে ওযু করে এসে পাঞ্জাবি, সোয়েটার পড়ে নেয়। রূপকথা হেঁটে গিয়ে তার মাথায় টুপি পড়িয়ে দিলো। বিষয়টা অপছন্দ হলেও তানশান প্রসন্ন হলো। অন্তত মিমি আগের মতো তার সাথে আচরণ তো করছে।
সে আরেকটু আবদার করে বলল,

–“একটু ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে দিন। গাল টানটান করছে।”
রূপকথা কপাল কুঁচকালো। কেননা কিয়ৎকাল পূর্বে আরো একজন তার কাছে এমনি আবদার করেছে। সে বিদ্রুপ করে বলল,
–“বাবা ছেলে নামাযে যাচ্ছো নাকি মডেলিং করতে যাচ্ছো? এমনিতেই তোমরা আমার থেকে ফর্সা। আমি তো তবুও তোমাদের মতো এত সারাদিন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করি না।”
তপোবন ভ্রু নাচিয়ে বলল,
–“আমাদের তো বউ আনতে হবে, তাই সুন্দর করে সেজেগুজে থাকতে হবে। তোমার তো আর তা লাগবে না।”
কী অদ্ভুত কথা! রূপকথা বড়সড় নেত্রে তাকায়।
–“আপনাদের বউ আনতে হবে মানে?”
তানশান কপাল কুঁচকে তাকায় বাবার দিকে। দু’জনের চাহনি দেখে তপোবন বোকাসোকা হেসে বলল,
–“আরে আমি তানশানের কথা বলছি। তার জন্য বউ আনতে হলেও তো আমাদের পরিপাটি থাকতে হবে।”
রূপকথা চোখমুখ কুঁচকে বলল,
–“সে চিন্তা আপনার করতে হবে না। আপনার ছেলে আগে থেকেই সব প্রস্তুত করে রেখেছে।”
কী লজ্জাজনক পরিস্থিতি! তানশান তেতে উঠল বাবা মায়ের উপর।

–“পাপা? মিমি? হাউ সিলি! জামায়াত মিস হয়ে যাবে, চলো।”
বলেই লাজুক ছেলেটি ত্রস্ত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তপোবন হেসে উঠল ছেলের লাল হয়ে যাওয়া দেখে। সেও শাল জড়িয়ে ঘর থেকে বের হতে যায়। কিন্তু বের হয়েও তপোবন পুনরায় দুই পা পিছিয়ে আসে।
কাপড় হাতে রূপকথা কোনা চোখে তাকায়। মিনমিনে স্বরে শুধায়,
–“কিছু ভুলে গিয়েছেন?”
তপোবন মাথা নেড়ে বলল,
–“হ্যাঁ, গুরুত্বপূর্ণ কিছু।”
–“কী?”
প্রশ্নটি প্রশ্নের জায়গায়ই থেকে গেল। তপোবন মাথা নুইয়ে ঝট করে মেয়েটির অধর বরাবর আলতো অধর ছুঁইয়ে দিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“শুভ সকাল, মুরুব্বি।
সেটা ছিল ছোট্ট মেয়েটিকে সকাল সকাল আরেকদফা লাজে রাঙা করার প্রক্রিয়া। আড়ষ্ট রূপকথা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফের কোনা চোখে তাকায়। লম্বা লম্বা কদমে বেরিয়ে যাওয়া লোকটির দেহ তখনো দুলছে হাসির তালে। সেই হাসিতে লাজে রাঙা মেয়েটির ঠোঁটের কোনেও আলতো হাসি ফুটে উঠল।
প্রতিদিন ফজর নামাযের শেষে কাঙ্খিত জায়গাটিতে, কাঙ্খিত মানুষটির কাছে দশ মিনিট বসার অভ্যাস হলেও আজ খানিক ব্যতিক্রম ঘটলো। আজ দশ মিনিট কেন বিশ মিনিট হয়ে গেলেও বাবা নড়ছে না মায়ের কবরস্থান থেকে।
দাদুভাইয়ের সাথে হাঁটা হাঁটি করা তানশান ডাকলো বাবাকে।
–“পাপা, পার্কে যাবে না?”
কবরস্থানের ভেতর কাঙ্খিত জায়গাটি আরেকটা সিমেন্টের বেরিবাঁধ দিয়ে বেষ্টিত। স্থবির তপোবন সেখানেই পা গুটিয়ে বসা। ছেলের ডাকে ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকায়। ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“তুমি দাদুভাইয়ের সাথে হেঁটে আসো। পাপা এখানে একটু বসি।”
–“ওকে।”, তানশান দাদুভাইয়ের সাথে হাঁটতে চলে যায়। কবরস্থানের এড়িয়াটা বেশ নির্জন থাকে। তপোবন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে রাখা খানিক উঁচু জায়গাটির‌ দিকে। ক্ষীণ স্বরে শুধায়,
–“রেগে আছো?”
অপরপ্রান্ত থেকে বরাবরের মতোই কোনো জবাব আসল না। তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“জীবনের কঠিন মোড়ে দ্বিতীয়বার ঘুড়ে দাঁড়ানোর জন্য আমার শক্তি হয়েছিলে, দেখো আমি আজও সেই শক্তিতে বলীয়ান। আমি আবারও হাসছি, আমি আবারও ভালোবাসছি, আমি আবারও কারোর চোখে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেখছি—কিন্তু তবুও বুকের এক কিনারায় ছোট্ট একটা দুঃখরা দলা পাকিয়ে আছে। যেগুলো প্রচন্ড সুখের মাঝেও অসহনীয় যন্ত্রণা দেয়। এটা সহ্য করা আরো কঠিন পূর্বা! জীবন আরেকটু সহজ হতেই পারত!”
তপোবন হাত বাড়িয়ে আলতো ছুঁয়ে দেয় দূর্বা ঘাসগুলো। কণ্ঠনালী থেকে আর কিছু বের হচ্ছে না। জীবনের কোনো কোনো পর্যায়ে পিছু ফিরে তাকাতেও সাহসের প্রয়োজন হয়।
তারা বাড়ি ফিরে আসে। তপোবন আর তানশান গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে যায়। তকদির সিকদার শুধায়,

–“কী হলো ভেতরে যাবে না?”
তপোবন পেছনে হাত বেঁধে বলল,
–“আরেকটু হাঁটি, আব্বু। তুমি যাও।”
তকদির সিকদার মাথা নেড়ে চলে গেলেন। তানশান আলসেমাখা কণ্ঠে শুধায়,
–“এখন কোথায় যাবে?”
–“তোমার মিমিকে ডাক দেই, একসাথে শহর ঘুরে দেখি। তোমার মিমির মন ভালো হয়ে যাবে।”
তানশান গম্ভীর গলায় বলল,
–“দিস ইজ আ গুড আইডিয়া।”
তপোবন স্মিত হাসল। পকেট থেকে ফোন বের করে রূপকথাকে ফোন দেয়। রিসিভ হতেই শুধাল,
–“ঘুমাচ্ছো?”
বিছানায় পা গুটিয়ে বসে আছে রূপকথা। বলল,
–“নাহ।”
–“তবে পুরো প্যাকেট হয়ে নিচে এসো।”
–“কেন?”
–“রিকশায় করে ঘুরে আসি তিনজন।”

রূপকথার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বিনা বাক্য ব্যয়ে তৈরি হয়ে নিচে যেতেই দেখলো বাবা ছেলে রিকশায় চড়ে বসে আছে। খোলা রিকশা হলেও কিছুটা ইজি বাইকের মতো। পেছনে দুজন সামনে একজন, তিনজন সহজেই বসা যায়। এগুলো খুলনাতে নতুন বের হয়েছে।
শীত প্রায় সহনশীলতার পর্যায়ে থাকলেও সকালটুকু একটু বেশি শীত থাকে। রূপকথা গিয়েই তানশানের হাতটা হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
–“ঠান্ডা হয়ে আছে। হাত মোজা পড়লে কি হয়?”
তপোবন ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–“টুপি, হাত মোজা এগুলো সে পড়ে না। এগুলো পড়লে নাকি তাকে চোর ডাকাত দেখায়।”
–“যতসব আজগুবি কথা! হাত পকেটে ঢোকাও।”, রূপকথা ধমকে বলল। তানশান নীরবে পকেটে হাত ঢুকিয়ে রাখে। রূপকথা পেছনে বসতেই তপোবন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় দৃষ্টি চুরি করতে থাকা নারীটির দিকে। সকাল থেকে এমনি চঞ্চলতার সাথে দৃষ্টি চুরি করে আসছে। সে মৃদু হেসে বলল,

–“আপনার হাতটাও দিন মুরুব্বি, গরম করে দেই।”
রূপকথা আড়চোখে চেয়ে বলল,
–“প্রয়োজন নেই।”
বরাবরের মতই তপোবন শোনেনা তার মুরুব্বির কথা। শালের আড়ালে মেয়েটির হাত দুটো মুঠোবন্দী করে নিয়ে বলল,
–“আমরা প্রয়োজনের জন্য কিছুই করি না। যা-ই করি না কেন একে অপরের স্বস্তি আর সুখের জন্য করি, বুঝলেন মুরুব্বি?”
সকাল সকাল এই বাক্যগুলো খুব একটা বোধগম্য হলো না রূপকথার। সে ডুবে আছে অনুভূতির নবরূপে। পুরুষালী উষ্ণ স্পর্শে মুহুর্তেই রূপকথার ছোট্ট হাতের শীতলতা পালালো। অনুভব করল, জীবনের সকল দুঃখ ভুলে হাসিমুখে চলতে হলে এমন একটা ভরসাস্থল-ই যথেষ্ট! রূপকথা ও সকল অপ্রাপ্তি গুলো ভুলে, প্রাপ্তি গুলো আঁকড়ে বাঁচবে।
খুলনা ছোট্ট একটা শহর। তবে আনন্দ, জৌলুস, আধুনিকতা সবকিছুতে সমৃদ্ধ। শহরের সকল সুবিধা থাকলেও, অসুবিধা গুলো এখানে দেখা যায় না। দেখা যায় না ঢাকার মতো হাড়ভাঙা জ্যাম।
বাবা ছেলের সাথে শান্তিপ্রিয় পুরো শহরটা ঘুরে ঘুরে দেখলো রূপকথা।

জীবনে চলারপথে সর্বদা আদুরে স্নিগ্ধ মানুষের সাথে দেখা হওয়াটাকে এরোজ কখনোই তার সৌভাগ্য মনে করে না। বরং এটাকেই নিজের সবচেয়ে দূর্ভোগ বলে অভিহিত করে।
অতি মন্থর গতিতে এক অমোঘ অধিকারবোধের সাথে কেউ কম্ফোর্টার সরিয়ে খরগোশের ন্যায় ঢুকে গেল এরোজের প্রশস্ত বুকে। চার হাত পায়ে বক্ষমাঝে লেপ্টে গিয়ে রুক্ষ দাঁড়ি যুক্ত গালটিতে গাল ঠেকিয়ে দিলো এক ঘষা। সহসা আবছা তমসাবৃত্ত কামড়াটি আন্দোলিত হলো কারোর খিলখিলিয়ে হাসির মিষ্টি শব্দে। তন্দ্রাচ্ছন্ন পুরুষটির ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে গেল সেই হাসির শব্দে।
নায়েল হাসতে হাসতেই ফের এরোজের দুই গাল ধরে নিজের গালের সাথে ঘষা দিলো। ততক্ষণে এক জোড়া ধূসর গভীর নেত্র থেকে ঘুম ছুটে গিয়েছে। পুরুষালী চোখে ছোট্ট চোখটি এঁটে যেতেই নায়েল ঘাড় কাত করে গাল ভরে হাসল। ঝট করে মাথা নুইয়ে ঠোঁটে একটা শব্দ করে চুমু দিয়ে বলল,
–“হাই! গুড মর্নিং! আমি তোমাল আগে উথেছি। ইউ লেজি বয়!”
মস্তিষ্ক সচল হতে দুই মিনিট সময় নেয়া এরোজের নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক আজ থমকে গেল আরো কয়েক মুহূর্তের জন্য। সৃষ্টিকর্তা কখনোই তাকে এত সুন্দর সকাল অনুভব করার সৌভাগ্য দেয়নি। কেউ তাকে এত ভালোবেসে ঘুম থেকে ওঠায়নি।
সে ফাঁকা ঢোক গিলে শুধায়,

–“তুমি এখানে কেন?”
এরোজের বুকের উপর ব্যাঙের মতো উঠে বসা নায়েল লম্বা চুলগুলো হাত দিয়ে বারংবার সরিয়ছ দিতে দিতে বলল,
–“ঘুম ছেছ, তাই তোমাল কাছে এসেছি।”
–“কেন এসেছ?”
অদ্ভুত প্রশ্নে নায়েল কপাল কুঁচকে বলল,
–“এসেছি।”
–“কেন?”
নায়েল এবার রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
–“ইচ্চে হয়েছে।”
এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলে হাত বাড়িয়ে বেড সাইড ড্রয়ারটা খুলে একটা ক্ল ক্লিপ বের করল। ইশারায় মেয়েটিকে কাছে ডাকলো।
নায়েল বাধ্যগত মেয়ের মতো তার বুকে কনুই ঠেকিয়ে নুইয়ে গেল। এরোজ ঘন কালো কেশগুলোকে ক্ল ক্লিপ দিয়ে আঁটকে দিতে দিতে বলল,

–“এখন সোজা এই ঘর থেকে বের হবে। আমি ঘুমাবো।”
নায়েল তেতে উঠল,
–“সালাদিন এত ঘুমায় না, পঁচা ছেলে!”
–“আমি ঘুমাই। তুমি ডিস্টার্ব করবে না।”
–“আচ্ছা, ঠিক আছে। আমায় একটা চকলেট দাও তবে, আমি চলে যাচ্ছি।”
এরোজ দ্বিরুক্তি করল না। ড্রয়ার থেকে একটা চকলেট দিল। নায়েল অসন্তোষের সাথে বলল,
–“একটা? আলো কয়টা দাও। মাম্মাও খেতে চায়। মাম্মা অসুত্ত!”
করুণ আবদার। এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলে ড্রায়ার থেকে পুরো বক্সটাই বের করে তার হাতে দিয়ে বলল,
–“নাও।”
–“ওয়াও! কত চকলেট! থ্যাংকু ব্যাড বয়।”
নায়েলের কার্যসিদ্ধি হয়ে গিয়েছে। সে খু্শিতে আটখানা হয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে দৌড়। এরোজ ফের কম্ফোর্টার টেনে চোখ বুজলো। আঁধারে লুকিয়ে গেল গড়িয়ে পড়া নোনাজল গুলো। আফসোসের সুরে আবদার করে বলে,

–” আমার নাহয় আকড়ে ধরার অধিকার নেই কিন্তু তুমি তো আরেকটু জেদ দেখিয়ে থেকে যেতে পারতে।”
ঘুম ভাঙার পর থেকেই ইমরোজ থম মেরে বসে আছে। মৌনতা সতর্ক দৃষ্টি ফেললো তার চিন্তিত মুখপানে। শুধায়,
–“কিছু হয়েছে? অফিসের বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত আছেন?”
–“নাহ, কিছু না।”, ইমরোজের ধিমি কণ্ঠ। অফিসের লোকসান নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা না থাকলেও তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে সৃজা আর এরোজের সখ্যতা। এরোজ কেন গতকাল সৃজার সাথে দেখা করার জন্য অফিসে গেল? আর সেখান থেকে কোথায় গেল তারা? ফোন ও ধরছে না সৃজা। রাগে গজগজ করতে লাগল ইমরোজ।
মৌনতা ঊর্ধ্বশ্বাস সামলায়। ব্যথা সহ্য করতে করতে ক্লান্ত বদন এবার অসহ্য হয়ে পড়েছে। শুধায়,
–“ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল? কি বলেছে?”
–“কোন ব্যপারে?” ইমরোজ কপাল কুঁচকে শুধায়। মৌনতা শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো।
বৈবাহিক জীবনের দূরবস্থা মনে পড়তেই খারাপ লাগা অনুভব হলো না। শান্ত স্বরে বলল,
–“আমার শারীরিক সমস্যার কারণে ডাক্তার দেখিয়েছিলাম।”
ইমরোজের ললাট মসৃণ হলো। বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,

–“নাহ, দেখি আজ যোগাযোগ করব। এই প্রথম দেখলাম কোনো ডাক্তারের রিপোর্ট দিতে এতদিন লাগছে।”
–“কেন কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
ইমরোজের প্রশ্নে মৌনতা ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“ব্লিডিং হচ্ছে।”
ইমরোজের ললাট ফের কুঁচকে গেল। সেও খেয়াল করেছে ইদানিং মৌনতার ব্লিডিং হচ্ছে। সে মিহি স্বরে বলল,
–“আচ্ছা আমি দেখছি। দরকার পড়লে আজ কথা বলে ঔষধ নিয়ে আসব।”
মৌনতা মাথা নেড়ে সায় জানায়। শুধায়,
–“নাস্তায় কি খাবেন?”
–“যাই দাও না কেন, জবার হাতের কিছু যেন না থাকে।” , ইমরোজ বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল। মৌনতা নিরুত্তর নিচে নামে। ইমরোজ তার হাতের রান্না খুব পছন্দ করে!
ইমরোজ ঢরে ঢুকেই দ্রুত ফোন দিলো সৃজাকে। এবার রিসিভ হলো। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,

–“সৃজা, এতক্ষণ ফোন ধরছিলে না কেন?”
–“ব্যস্ত ছিলাম।”
–“কিসে?”
–“সব কথা তোমায় বলতে হবে?”
–“অবশ্যই বলতে হবে।”
–“কেন?”
–“কেন মানে? তুমি ভুলে যাচ্ছো আমি তোমার কি হই? আমায় বলবে না তো কাকে বলবে?”
সৃজা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তুমি আমার কিছু হও না, ইমরোজ। তোমার তো সেই যোগ্যতাই নেই।”
–“কথার সুর বদলে যাচ্ছে, সৃজা। আমি তোমার কেউ নই তো কি এরোজ তোমার সব?”
–“একদম বাজে কথা বলবে না, ইমরোজ।”
–“কেন বলব না? তোমার সাথে ও দেখা করতে এসেছিল কেন?”
সৃজা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–“আমার এখন আফসোস হচ্ছে বুঝলে, আমি তোমায় না ভালোবেসে এরোজকে ভালোবাসলে ভালো হতো। ও অন্তত জেন্টলম্যান আর দায়িত্ববান। ও আমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছিল পুলিশ স্টেশনে করা খারাপ ব্যবহারের জন্য।”
ইমরোজের ভ্রু টানটান হয়ে গেল তার কথায়। এরোজ আর ক্ষমা? সে অস্থিরতা লুকিয়ে বলল,

–“বাহ্, এক দেখায় এত গুণগান?”
–“যে প্রশংসার হকদার সে এক দেখাতেই পায়, আর যে অযোগ্য সে দেড় বছরেও পায় না।”
–“হোয়াট ডু ইউ মিন সৃজা?”
–“কিছুই মিন করছি না। শুধু এতটুকু বলব—যেদিন আমায় প্রাপ্য সম্মান দিতে পারবে, সেদিন অধিকার দেখাতে এসো।”
সৃজা ফোন কেটে দিলো। ইমরোজ চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ল। এরোজ কেন সৃজার সাথে আগ বাড়িয়ে দেখা করবে, ক্ষমা চাইবে? কোনোভাবে কি ওর সৃজাকে ভালোলেগে গিয়েছে? আর ভাবতে পারে না ইমরোজ।
তপোবন বাড়ি ফেরার পথে পরিবারের সবার জন্য নেহারি আর নান নিয়ে আসল। একসাথে খাবে। গেট পেরোতেই শাশুড়ির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রূপকথা আড়ষ্ট হয়ে গেল। ছেলের একহাত আঁকড়ে ধরে চলতে থাকা তপোবন পা থামিয়ে মেয়েটির মিইয়ে যাওয়া দেখল। আলগোছে হাত বাড়িয়ে দিলে রূপকথা চোখ তুলে তাকায়। তপোবন মৃদু হেসে স্থবির মেয়েটির হাত নিজ উদ্যোগে আঁকড়ে ধরলো। বলল,
–“বাড়ির বড় বউ সবসময় মাথা উঁচু করে থাকবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে, নিজের অধিকার নিজে স্থাপন করবে—এটাই তাকে মানায়। এমন মিইয়ে যাওয়া তাকে মানায় না। তাই মাথা উঁচু করো।”
রূপকথা মৃদু হাসল। তপোবন স্ত্রী সন্তানের হাত ধরেই এগিয়ে যায় মা বাবার কাছে। সালাম দিয়ে বলল,
–“আম্মা, আব্বু নাস্তা নিয়ে এসেছি আসুন একসাথে খাই।”
তকদির সিকদার ভীষণ খুশি হয় তপোবন, রূপকথা তানশানকে একত্রে একদম নিসংকোচে চলতে দেখে। হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে শুধায়,

–“কি এনেছো?”
–“গরম গরম নেহারি আর নান দাদুভাই।”, তানশান উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল।
–“আজ তো বেশ খানাপিনা হবে তাহলে। যাও তোমরা গিয়ে বসো, আমরা চা টা শেষ করে আসছি।”
তকদির সিকদার আনন্দিত কণ্ঠে বললেন। নির্জনা বেগম নিরুত্তর চা এ চুমুক দিচ্ছে। রূপকথাকে দেখেও যেন দেখছে না। তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“তাড়াতাড়ি এসো আব্বু, একটু জরুরী কথা আছে।”
–“হ্যাঁ আসছি।”
তপোবন মাথা নেড়ে ঘরে ফিরে রান্নাঘরে ঢুকলো। সে জানে সকাল সকাল উঠেই কেউ নিজ দায়িত্ব পালনে তৎপর হয়ে পড়ে।
ঘেমে নেয়ে একাকার মৌনতা সকলকে চা দিয়ে সকালের নাস্তা তৈরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তপোবন ত্রস্ত পায়ে ঢুকেই বলল,

–“মৌন, আজ আর নাস্তা বানানোর প্রয়োজন নেই। ভাইজান নিয়ে এসেছি। এসো সবাই মিলে একসাথে নাস্তা করি।
মৌনতার চোখেমুখে স্বস্তি ছেয়ে গেল। মৃদু হেসে বলল,
–“আচ্ছা ভাইজান, আসছি।”
–“আসছি না এসো। এই শীতে তুমি এমন ঘেমে আছো কেন?”
মৌনতা আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বলল,
–“আমার সবসময় এমনি ঘাম হয়, ভাইজান। বুঝে উঠতে পারি না কিছু। বেশ ক’দিন যাবৎ এমন হচ্ছে।”
–“সেই যে ডাক্তার দেখালে তা কি বলল? কিছু তো বললে না ভাইজানকে।”
–“ডাক্তার এখনো রিপোর্ট দেয়নি,ভাইজান।”
মৌনতার এহেন কথায় তপোবন অবাক হয়ে গেল। অবাক কণ্ঠে শুধায়,
–“একটা রিপোর্ট দিতে এতদিন? ডাক্তার মশকরা করছে নাকি? তুমি ইমরোজকে বলোনি এক্সট্রা পে করে তাড়াতাড়ি রিপোর্ট আনাতে?”

–“বলেছি ভাইজান। বলল, আজ কথা বলবে।”
–“কি অদ্ভুত!”, তপোবন বিড়বিড় করে আওড়ায়।
খাবার ঘরে যেতেই রূপকথাকে টেবিল সাজাতে দেখে মৌনতার চোখেমুখে বিস্ময় ছুঁয়ে গেল
সে ছুটে গিয়ে তার হাত আঁকড়ে ধরে শুধায়,
–“ঠিক আছো? শরীর ভালো লাগছে এখন?”
মৌনতা চোখ তুলে তাকায় অতি স্নিগ্ধ মুখপানে। আঁধারের সাথে সাথে সকল পাশবিকতা, অপবিত্র স্পর্শগুলোকে কেউ একজন সযত্নে মুছে দিয়েছে—স্মরণ হতেই মৃদু হাসল সে। আশ্বস্ত করে বলল,
–“আমি ঠিক আছি ভাবি।”
মৌনতা বুকে জড়িয়ে নেয় ছোট্ট মেয়েটিকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“সব ভুলে যাও। কিছু হিসাব নিকাশ আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। এই নিকৃষ্ট মানুষগুলোকে শাস্তি দেয়ার তুমি আমি কেউ না। ঐ উপর ওয়ালা আছেন তো, সে যথোপযুক্ত শাস্তি দেবেন।”
রূপকথা ছলছল নেত্রে মাথা নাড়লো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“জি ভাবি, উপর ওয়ালা সকলকে তার প্রাপ্য দেবেন।”
মৌনতার মুখে হাসি ফুটে উঠল। রোজ রূপকথা কে দেখেই ছুটে এএস জড়িয়ে ধরল। হড়বড়িয়ে বলল,

–“বড় ভাবি, বড় ভাবি সব ভুলে যাও। আমরাই তোমার সব। আমরা থাকতে আর কেউ তোমার চারিধারে ঘেঁষতে পারবে না। আর কেউ তোমায় কষ্ট দিতে পারবে না।”
রূপকথা অশ্রুভেজা নয়নে হেসে ফেলে। তার একটা শক্তিশালী ভরসাস্থল হলো এই সুন্দর পরিবারটি। যেখানে সবাই ভালো থাকার উপায় খোঁজে।
আজকের প্রভাতটা কেন যেন অস্বাভাবিক সুন্দর আর সুখময় হলো সিকদার পরিবারের জন্য। আজ খাবার টেবিলে জবা আর মাজেদা সহ পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্যদের দেখা গেল। প্রত্যেকের হাসিমাখা মুখ, মজাদার খাবার, মৃদুমন্দ গল্পগুজবে। আর ছোট্ট নায়েল! মৌনতার মুখেও আজ প্রগাঢ় হাসি কেননা টেবিলের মাঝ বরাবর বসা বাবা-মেয়ে এক প্লেটে টুকুর টাকুর করে নেহারি দিয়ে নান খাচ্ছে। ইমরোজ ছিঁড়ে ছিঁড়ে দিচ্ছে আর নায়েল তা হাসিমুখে নিয়ে খাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পরপর অতি খুশিতে বাবার গালে চুমু দিচ্ছে।
শত কষ্টের পরেও এতটুকু সুখ মৌনতার জন্য এক ঝুলি প্রেরণা হয় দুঃসহনীয় সংসারের ভাল বহন করার জন্য।
তকদির সিকদার আর নির্জনা বেগম মুগ্ধ নয়নে নিজেদের পরিপূর্ণ সুখী পরিবারটাকে দেখে। আবেগে আপ্লুত হয়ে বলে,

–“আমার পরিবারটা কত সুন্দর তাই না তপোবন? আমরা সবাই এমনি একসাথে ভালো থাকব সবসময়।”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“জি আব্বু। আমরা সবসময় সবাই এভাবেই সুখী থাকব। সবাই একসাথে খাবার খাবো, একে অপরের পাশে থাকব।”
সুদৃঢ় সংকল্প! কিন্তু আদৌও কি এই সংকল্প দীর্ঘস্থায়ী হবে না-কি এটাই ছিল এই সুখী দেখতে দুঃখী পরিবারটার ধ্বংস হওয়ার পূর্বে একটা শেষ মিলনায়তন।
তপোবন খেতে খেতে বাবা মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
–“আম্মা, আব্বু যেটা বলতে চাচ্ছিলাম তোমাদের। তোমরা ইমরোজের বলা সেই মেয়েটাকে আজ দেখে আসো গিয়ে। পছন্দ হলে আর সব ঠিকঠাক থাকলে আজকেই পাকা কথা বলে আসবে।”
উপস্থিত সকলের মাঝে আশ্চর্যের রেশ দেখা গেল, শুধুমাত্র এরোজ ব্যতীত। সে নীরবে খাচ্ছে। তকদির সিকদার কপাল কুঁচকে বলল,

–“আমরা দেখে কি করব? যে সংসার‌ করবে তার দেখতে হবে।”
–“হ্যাঁ, আব্বু। এরোজ ও দেখবে। সবাই মিলে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।”
–“তা তোমার ভাই কি যাবে?”
–“যাবে না কেন? সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে যাওয়ার জন্য।”, তপোবন স্মিত হেসে বলল।
ইমরোজ তখনো কপাল কুঁচকে তাকায় ভাইয়ের দিকে। শুধায়,
–“তোমরা সুপ্তিকে দেখতে যাবে?”
–“হ্যাঁ।”
ইমরোজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে উদগ্রীব কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“সত্যি? তাহলে তোমাদের হান্ড্রেড পার্সেন্ট পছন্দ হবে। সুপ্তি খুব ভালো আর সুন্দর মেয়ে।”
এহেন কথায় সকলে খুশি হলেও মৌনতা খুশি হতে পারল না। তার কেন মনে হয়, সৃজা এই পরিবারে তার অস্তিত্ব দৃঢ় করতে চাইছে? ক্ষণকালের সুখটুকু আবার কঝথাও উধাও হয়ে গেল। আরেকদফা অসহনীয় যন্ত্রণায় মৌনতা দরদর ঘেমে উঠল।

এরোজ চোখ তুলে থাকায় অত্যন্ত আনন্দিত ভাইয়ের দিকে। বিদ্রুপের হাসিতে ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায়। পরমুহুর্তেই চোখেমুখে ফুটে ওঠে হিংস্রতা, চোখের সামনে নায়েলের হাসিমাখা নিষ্পাপ মুখটা না ভাসলে এই মুহূর্তে পিটিয়ে দেহের সকল উদ্দামতা ছাড়িয়ে দিতো।
তকদির সিকদার ছোট ছেলের দিকে কোনাচোখে চেয়ে বলল,
–“তবে কি সবাই রাজি?”
–“হ্যাঁ, আম্মা কি বলেন?”
তপোবনের কথায় নির্জনা বেগম ছোট ছেলের উদাসীন মুখপানে চেয়ে বললেন,
–“এরোজ যেভাবে- যাকে নিয়ে খুশি হবে আমি তাতেই খুশি। আমার কোনো আপত্তি নেই।”
–“ব্যস! তবে তো হয়েই গেল। আমরা তবে আজকেই যাচ্ছি।”, ইমরোজ অতি হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল।
এরোজের শান্ত মুখ অবলোকন করে তপোবন মিহি স্বরে বলল,
–“হ্যাঁ। আমি চাচ্ছি বিষয়টা একটু তাড়াতাড়ি হোক। তুই একটু তাদের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করে রাখিস।”
–“হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। তুমি চিন্তা করো না আমি সব ঠিক করে রাখব।”
ইমরোজ আনন্দে আত্মহারা হয়, মৌনতা অসহনীয় দহনে ছটফট করতে থাকে আর এরোজ এই সকল ভয়কে মুছে ফেলার পরিকল্পনা করে। কিন্তু আদৌও জানে না তার পরিকল্পনা চরিত্রহীন নামক ঐ পশুদের রুখতে পারবে কি-না! নাকি তারা আরও উস্কে দিচ্ছে পাপাচারে লিপ্ত মানুষ রূপী লোভী পশুদের।
এক তলা একটি বাড়ি। বাড়িটিতে একটু আধটু শৌখিনতার ছোঁয়া। তবে অযত্নের কারণে সেই শৌখিনতাটুকুও চাঁপা পড়ে যায়। মৌনতা ম্লান দেহে বাড়িটির কোনা কোনা অবলোকন করছে।

–”এ কি মৌনতা? তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো!”
কারোর অতিরঞ্জিত হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে মৌনতা ঘাড় ঘুরিয়ে থাকায়। সবুজ রঙা শাড়ি সাথে স্লিভলেস ব্লাউজ যার পৃষ্ঠদেশ বেশিরভাগই উন্মুক্ত, খোলা চুল। চোখেমুখে কৃত্রিম সাজসজ্জা! সৃজার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে মৌনতা। চোখে চোখ রাখে স্মিত হেসে দাম্ভিকতার সাথে গম্ভীর গলায় শুধায়,
–”মিস সৃজা, তাই তো?”
সৃজার ভ্রু উঁচু হয়ে গেল মৌনতার সরব বদলে যাওয়া চেহারার আদল দেখে। দামী শাড়ি, সাথে গা ভরতি গহনায় মূর্ছা যাওয়া দৈহিক সৌন্দর্য চাপা পড়ে গিয়েছে। মৌনতাকে নিয়ে তার মনে হিংসা এতটাই প্রখর যে, মৌনতার ভঙ্গুর দেহ নজরে এলো না। এলো তার আভিজাত্য! সে কৃত্রিম হেসে বলল,
–”হ্যাঁ।”
মৌনতা শুকনো ঢোক গিলে বলল,

–”আমি আপনার বসের স্ত্রী! আপনি একজন বেতনপ্রাপ্ত কর্মচারী। আপনি আমি কোনো বান্ধবী নই। তাই এরপর থেকে ঠিক করে সম্মোধন করবেন। হিসেব মতো আপনার উচিৎ আমায় ম্যডাম ডাকা।”
মৌনতার অস্বাভাবিক দৃঢ় কণ্ঠে বলা কথায় অপমানে সৃজার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। তবুও সে অপমানটা কোনরকম হজম করে নিলো। জোরপূর্বক হেসে বলল,
–”আমরা আত্মীয় হতে যাচ্ছি। আমি সেই সম্পর্কটাকে বিবেচনা করেছি।”
–”হতে যাচ্ছি, হইনি।”, মৌনতার পুনশ্চ দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
–”মৌন, এখানে কি করছ?”
ইমরোজের কণ্ঠে সৃজা জ্বলন্ত চোখে তাকায় তার দিকে। ইমরোজ ইশারায় ভ্রু নাচালো!
মৌনতা মৃদু হেসে ইমরোজের দিকে তাকায়। এগিয়ে গিয়ে দু’হাতে তার হাতটি আঁকড়ে ধরে হাসিমুখে বলে,
–”মিস সৃজার সাথে পরিচিত হচ্ছিলাম, ইমরোজ।”
ইমরোজ এক পলক মৌনতার দিকে তাকায়। নম্র কণ্ঠে বলে,

–”আম্মার কাছে গিয়ে বসো।”
–”আপনিও চলুন।”, মৌনতা কথায় ইমরোজ বিনা শব্দে তার সাথে চলে গেল। সৃজা রাগে ফেটে পড়ল সেই দৃশ্যে।
দিনশেষে মৌনতা দেখিয়ে দিল তাদের মাঝে সে এক ঘৃণ্য তৃতীয় ব্যাক্তি! তার কোনো অধিকার নেই ইমরোজের উপর। কিভাবে তার চোখের সামনে ওর হাত ধরল! কিন্তু ও? ও তো এভাবে সবার সামনে ইমরোজের উপর অধিকার দেখাতে পারে না!
ইমরোজ এক বেলার মাঝে সব তৈরি করে ফেলল। তকদির সিকদার, তানশান আর তপোবন বাদে পরিবারের সবাই এসেছে সৃজাদের বাসায়।
সুপ্তি হা হয়ে দেখছে সোফার এক কিনারায় কঠিন অবয়বটির দিকে। চোখেমুখে আভিজাত্য, ফর্সা, হ্যান্ডসাম পুরুষটির প্রশংসা যতটা না আপার মুখে শুনেছে তার থেকেও দ্বিগুণ! দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় চোখেমুখে শুভ্র পরিপাটি এক ছাপ।
সে চাপা স্বরে বোনকে বলল,

–“এই সেই এরোজ? এ তো অসম্ভব হ্যান্ডসাম। কোথায় তোমার ইমরোজ আর কোথায় তার ছোট ভাই।”
সৃজা দাঁতে দাঁত চাপল সুপ্তির মুখে এরোজের প্রশংসায় তাও আবার ইমরোজকে টেনে। সে দাঁত খিচে বলল,
–“এরোজ দীর্ঘদিন যাবৎ বিদেশে থাকায় অতিরিক্ত হ্যান্ডসাম।”
–“আর তোমার ইমরোজ এক বাচ্চার বাপ!” বলেই সুপ্তি চাপা স্বরে হেসে উঠল। সৃজা কঠিন চোখে তাকায় বোনের দিকে।
রূপকথা আর নির্জনা বেগম মুখ বিকৃত করে সুপ্তি আর সৃজাকে দেখছে। দুটোর একটাও যে তাদের মতো শালীন, উচ্চবিত্ত পরিবারের সাথে যায় না। পোশাক আশাকের কি বাজে ধরণ! সুপ্তির পড়নে টু পিস। একটা জিন্স আর একটা কূর্তি। তবুও নির্জনা বেগম দাঁত কামড়ে হাসিমুখে বসে রইল। এরোজের হয়তো এমন মেয়েই পছন্দ!
এসেছে থেকে সৃজা নামের মেয়েটা তা্য গায়ের সাথে লেগে বসে আছে। অতিরিক্ত শ্রদ্ধা, আপ্যায়ন দেখাচ্ছে। সেগুলো সে কৃত্রিম হেসে সহ্য করে যাচ্ছে। তার যেকোন মূল্যে এরোজকে সঠিক পথে আনতে হবে। শুনেছে আজকালকার ছেলেরা নাকি এইসব মেয়েদের মাঝে আগ্রহ পায়। দেখা দেখির পুরো সময়টাতে সৃজা, সুপ্তি এবং তাদের মায়ের সাথে ইমরোজ ও আপ্যায়নে সামিল হয়েছে। যেন তারা ইমরোজের পরিবার! মৌনতা তখন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। রোজ ভ্রু কুঁচকে তাকায় মৌনতার দিকে। এসেছে থেকেই মৌনতা কেমন যেন করছে। হাঁসফাঁস করছে, দূর্বল দেখাচ্ছে তাকে। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করে,

–”কি হয়েছে মৌন বউ? শরীর খারাপ করছে?”
হঠাৎ করেই জ্বর আসে মৌনতার। তাপমাত্রায় দেহ পুড়ে যাওয়ার উপক্রম! মাথা জাগিয়ে রাখতে পারল না। সে রোজের কাঁধে মাথা এলিয়ে দেয়। দূর্বল কণ্ঠে বলে,
–”আমার শরীরটা ভালো লাগছে না ,রোজ।”
–“আরেকটু অপেক্ষা করো মৌন বউ। আমরা একটু পরেই বাসায় চলে যাবো। এই কোন ছাপড়িকে দেখতে পাঠিয়েছে ভাইজান? দেখেই তো রাগ লাগছে। এর সাথে আমরা এক ঘরে বসবাস করব কি করে?”
মৌনতা চুপ করে বসে রইল। নায়েল এরোজের দুই পায়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। তখনি এরোজ থমথমে মুখে বলে ওঠে,
–”তোমাদের হয়েছে? আমায় বাড়ি যেতে হবে তাড়াতাড়ি!”
ইমরোজ আগ্রহের সাথে বলে,
–”হ্যাঁ যাবি। কিন্তু তার আগে সুপ্তির সাথে একবার আলাদা করে কথা বল। দু’জনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো হবে। আম্মার তো নিশ্চয়ই সুপ্তিকে পছন্দ হয়েছে? আম্মা তোমার কি মতামত?”
নির্জনা বেগম কৃত্রিম হেসে বলল,
–”এরোজের মতামত থাকলে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমার একমাত্র চাওয়া শুধু, আমার এরোজ ভালো থাকুক। তাতে জীবনসঙ্গী যেই হোক না কেন!”
সৃজার মুখশ্রী চকচক করে উঠলো্। সৃজা আর তার মা আনন্দে আলিঙ্গন করে। ইমরোজ আমোদিত কণ্ঠে বলে,
–”তাহলে তো হয়েই গেল। সৃজা, তুমি এরোজ আর সুপ্তিকে নিয়ে পাশের ঘরে দিয়ে আসো।”
–”সুপ্তি কেন যাবে?”, কথার মাঝেই এরোজের গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সকলে উৎসুক নজরে তাকায় তার দিকে। ইমরোজ উপহাসের সুরে বলে,

–”সুপ্তি যাবে না তো কে যাবে?”
–”সৃজা।”
আচমকা এরোজের কথায় সকলে চমকে তাকায় তার দিকে। মৌনতা সরব মাথা তুলে রোজের কাঁধ থেকে। ইমরোজ পিটপিট করে তাকালো ভাইয়ের দিকে, অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–”কি বললি?”
এরোজ ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বলল,
–”আমি সুপ্তিকে নয় সৃজাকে বিয়ে করতে চাই। আমি তাকে ভালোবাসি।”
সৃজা আর তার মা হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকায় এরোজের দিকে। সুপ্তি তখনো অবুঝপানে তাকিয়ে আছে এরোজের দিকে।
কিন্তু ইমরোজ নিতেই পারল না এহেন সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি। সে মৃদু গর্জে উঠে বলল,
–”হোয়াট রাবিশ, এরোজ? সৃজা? সৃজাকে কিভাবে বিয়ে করতে পারিস তুই? তুই তো সুপ্তিকে দেখতে এসেছিস।”
এরোজ প্রগাঢ় হাসল ভাইয়ের কথায়। সে মোহনীয় চাহনিতে তাকায় সৃজার দিকে। তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত অবলকন করতে করতে মিহি স্বরে বলে,

–”বড় বোন রেখে ছোট বোন বিয়ে করাটা দৃষ্টিকটু! আর যার বড় বোন এত সুন্দর আর আকর্ষনীয়, তার ছোট বোনের বিয়ে এত সহজে হবে বলে মনে হয় না। তাই তো, আমি এই সুন্দরী রমনীটিকে নিজের রানি করতে চাই, যেন আমার শালিকার বিয়েটা তাড়াতাড়ি হয়।”
সৃজার মাঝে হঠাৎ করেই লজ্জা হানা দেয় এরোজের মোহনীয় কণ্ঠে করা প্রশংসায়। সে তবে ঠিকই ধারণা করেছিল এতদিন। এরোজের চোখ অন্য কিছু বলে! সে আগেও বুঝেছিল এরোজের মনে তার জন্য সফট কর্নার আছে।
কিন্তু ইমরোজ সে আকাশচুম্বী রাগ সামলাতে না পেরে রীতিমতো কাঁপছে। নির্জনা বেগম কপাল কুঁচকে তাকায় মেজো ছেলের দিকে। দাম্ভিকতার সাথে বলে,
–”কি হলো তুমি এমন করছ কেন, ইমরোজ? এরোজ তো ঠিকই বলেছে। আর এরোজ সৃজাকে পছন্দ করে জানলে আমি কখনো সুপ্তির কথা বলতাম-ই না। তাদের যদি সমস্যা না থাকে তবে আমরা সৃজাকেই আমার বাড়ির বউ করতে চাই। এতে তো সমস্যার কিছু নেই।”
পরপরই সৃজার মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,

–”কি হলো সৃজনা আপা, আপনার কি কোনো সমস্যা আছে? বড় মেয়ে রেখে ছোট মেয়ে বিয়ে দেয়ার বিষয়টা একটু দৃষ্টি কটু্। তুমি কিছু মনে করো না সুপ্তি! আমার মনে হয় সৃষ্টিকর্তা তোমার জন্য আরো ভালো কিছু ভেবে রেখেছে।”
সুপ্তির চোখমুখ লাল হয়ে উঠল উপচেপড়া উল্লাস মিলিয়ে গিয়ে।
আর চাপা উল্লাসে ফেটে পড়া মৌনতাও আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে শাশুড়ির সাথে সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
–”হ্যাঁ হ্যাঁ আম্মা ঠিক বলছেন। ছোট ভাইজানের সাথে সৃজাকে বেশ মানাবে।”
ইমরোজ ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় মৌনতার দিকে। কিন্তু সে রাগ প্রকাশ করতে পারল না। রাগের বশে কোন বোকামি করে বসলে তার সবকিছু হাতছাড়া হয়ে যাবে। সে ইশারায় সৃজাকে বলে, বিয়ের জন্য না করে দিতে।
এরোজ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ধীরপায়ে গিয়ে দাঁড়ায় সৃজার সামনে। স্মিত হেসে নম্র কণ্ঠে বলে,
–“আমার চোখের দেখা সবচেয়ে অনন্য ,সুন্দরী এই নারীটি ব্যতীত আমি অন্য আর কাউকে বিয়ে করবো না। লাভ এট ফার্স্ট সাইড কাকে বলে আমি জানি না, সৃজা। তবে প্রথমদিন আপনাকে দেখে আমি এতটুকু বুঝতে পেরেছি, স্ত্রী হবে তো এমন। যাকে দেখলে বুকের বা পাশ স্পন্দন করতে ভুলে যাবে, যাকে এক পলক দেখলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেখতে ইচ্ছে হবে।
যাকে কষ্ট দিলে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। সৃজা উইল ইউ ম্যারি মি? এই এরোজ সিকদারের ছোট্ট রাজত্বের রানী হবেন? না বলবেন না, না বললে তুলে নিয়ে যাব। এই সুন্দরী নারীটিকে আমি আমার পাশ ছাড়া আর অন্য কারোর হতে দেখতে পারব না।”

সৃজার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল এরোজ। চোখেমুখে তার প্রেমময় ভাবভঙ্গিমা। সৃজা অবাক চোখে তাকায় জীবনে প্রথমবার কারোর থেকে এত সুন্দর এবং সম্মানের সাথে প্রস্তাব পেয়ে। সে কারোর রানী হবে? কি করবে সৃজা? ইমরোজ তো তাকে সম্মানের সাথে দুনিয়ার সামনে আনতেও পারছে না। কারোর দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়ার থেকে সম্মানের সহিত কারোর রানী হওয়া ঢের ভালো।
এমন সুদর্শন , স্টাব্লিশড একজন পুরুষকে বিয়ে করলে সব দিক থেকে তার জীবনের মানে বদলে যাবে।
সে আর কিছু ভাবলো না অনতিবিলম্বে রাজি হয়ে গেল। মৃদু হেসে বলল,
–“যেই পুরুষ আমায় নিজের রানী করতে চায় নিঃসন্দেহে সে কোনো মহাপুরুষ! আমাদের চারপাশে তো কাপুরুষে ভরপুর! আমি এমন পুরুষকে কি করে ফিরিয়ে দেই! আমি আপনাকে আমার রাজা করে রাখব। আমি রাজি এরোজ!”

–“এই না হলো এরোজের কুইন।”, এরোজ বাহ্বা জানিয়ে বলল। সৃজা মাথা নেড়ে হাসিমুখে বলল,
–“ইয়েস আ’ম ইয়োর কুইন এন্ড ইউ আর মাই কিং!”
ইমরোজ বিস্ফোরিত নয়নে তাকায় সৃজার দিকে। সংলাপে কাপুরুষটি যে তাকেই বলা হয়েছে, সেটা বুঝতে বাকি রইল না। তবুও সে একটা শব্দ ও উচ্চারণ করতে পারলো না।
নির্জনা বেগম তিরস্কার করলো ছেলেকে আর সৃজাকে। কেমন বয়স্কদের সামনে প্রেমময় কথা বলে যাচ্ছে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে দ্রুত বলল,

–“তাহলে তো হয়েই গেল। আমি আজকেই পাকা কথা বলে যেতে চাইছি, আপা। আপনার আপত্তি না থাকলে।”
সৃজনা হতবুদ্ধি’র ন্যায় মাথা নেড়ে সায় জানায়। মেয়ের কর্মকান্ড যে কিছুই সে বুঝতে পারছে না।
সুপ্তি রাগে দুঃখে অপমানে গটগট করে বসার ঘর থেকে চলে যায়।
ইমরোজ তখনো ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৃজার দিকে। সৃজাও তাকিয়ে কুটিল হাসল। এখন ইমরোজ বাবুর উচিৎ শিক্ষা হবে। যেই কাজ সে দেড় বছরেও করতে পারেনি, সেই কাজ তারই ছোট ভাই নিমিষেই করে দেখাবে। সে বউ হবে সিকদার বাড়ির বউ আর সেটাও সম্মানের সাথে।
এদিকে মৌনতার জ্বর পালিয়েছে। সে আনন্দে রীতিমতো কাঁপছে। বারবার কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে এরোজের দিকে। জীবনে প্রথম মানুষটার কাজে এতো ভালোলাগা কাজ করছে তার। সে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে এরোজের কাছে। আর কখনো তার নামে বাজে কথা বলবে না। মনে মনে এমন কত-কি ঠিক করলো মৌনতা! তার সংসার বেঁচে যাচ্ছে এর থেকে সুখের আর কি হতে পারে! আর তার এই সুখের কারণ এরোজ!
কথাবার্তা পাকা হলে, নির্জনা বেগম সাথে করে না সোনার আংটিটা বের করে। মৃদু হেসে সৃজাকে বলে,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৯

–“হাত দেও।”
সৃজা হাত বাড়াতেই এরোজ সেই হাতটি ধরে ফেললো। নির্জনা বেগম আর সৃজা প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় এরোজের দিকে। এরোজ মোহনীয় চাহনিতে তাকায় সৃজার দিকে। মিহি স্বরে বলে,
–“আমার স্ত্রীকে আমি সবচেয়ে বেস্ট জিনিস দেবো। আর সেটা যদি হয় বিয়ের আংটির মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু, তাহলে তো কথাই নেই। আমি সৃজাকে ডায়মন্ডের আংটি পড়িয়ে নিজের বাগদত্তা হিসেবে ঘোষনা করব। আপাতত এটা রাখো। এইসব ঠুনকো সোনা এই হাতে মানাবে না। এই হাতে তো মানাবে অমূল্য কোনো রত্ন!”
সৃজা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। মোহিত নয়নে তাকায় এরোজের দিকে। ছেলেটা যে ক্ষণে ক্ষণে তাকে মুগ্ধ করছে। সে ছলছল নয়নে তাকায় এরোজের দিকে। কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪১