Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৩
তোনিমা খান

ছলনা, বিশ্বাসঘাতকতা, পাশবিকতা—আশা, ভালোবাসা আর একটা উজ্জ্বল দিনের অপেক্ষায় কেটে গিয়েছে আরো কিছু দুঃসহনীয় দিন।
সময়ের বিবর্তনে একই ছাদের নিচে আজ এক অদ্ভুত দৃশ্যকাব্য রচিত হচ্ছে।
একই ঘরের একজোড়া কপোত কপোতী জীবনসঙ্গী থেকে মন্থর গতিতে অচেনা হতে শুরু করেছে।
আর একজোড়া কপোত কপোতী অচেনা থেকে জীবনসঙ্গী হয়ে উঠছে।
আতরের তীব্র আভিজাত্যময় সুগন্ধে তখন তন্দ্রাগ্রস্থ আঁখিদ্বয় আলতো নড়ে উঠল। অনুভূত হয় মসৃণ ত্বকে অনবরত ছুঁয়ে যাওয়া কিছু স্নিগ্ধ অনুভূতির জীবন্ত ছোঁয়া। রূপকথার ঘুম জড়ানো ওষ্ঠকোনা ক্ষীণ বেঁকে যায় চিরচেনা অনুভূতির মালিককে চিনতে পেরে।
ঠিক আরেকবার পুরুষালী রুক্ষ ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে গেল মেয়েটির ডান গাল। কিন্তু তবুও নারীটির কোনো প্রকার উদ্বেগ না দেখে পুরুষটি এবার স্পর্শের প্রখরতা বদলে নিলো। নরম মসৃণ গালে রুক্ষ দাঁড়ি যুক্ত গালের ক্ষিপ্র ঘর্ষণ লাগতেই রূপকথা আর্তনাদ করে উঠল,

–“তানশানের পাপা, বিরক্ত করছেন কেন?”
হাতের ওপর ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে থাকা তপোবন স্মিত হাসল স্ত্রীর ব্যথাতুর চাহনি দেখে। ঝুঁকে গিয়ে ঘুম জড়ানো স্নিগ্ধ মুখটির ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“শুভ সকাল, মুরুব্বি‌। উঠুন, আজান দিয়েছে।”
রূপকথা বালিশে মুখ ডুবিয়ে দিল। ওষ্ঠকোনে লাজমাখা হাসি‌। ইদানিং তার প্রতিটি প্রভাতের প্রারাম্ভ হয় এমনি উষ্ণ স্পর্শের দ্বারা। সে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
–“শুনেছি।”
–“আজান শুনেও এত আলসেমি?”
–“আমি একটু পরেই উঠতাম।”
–“একটু পরে না, বলুন এখুনি উঠছি। আজ থেকে কলেজে যেতে হবে।”
বলেই তপোবন মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। পুতুল সাইজের মেয়েটিকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে একটা চাদর আর এক জোড়া জুতা এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“ফাস্ট! নামায নিয়ে ঝিমাতে নেই।”
রূপকথার ঘুম ভেঙ্গে যায়। শুধায়,

–“কলেজে কেন যাব?”
তপোবন কোমরে হাত দিয়ে শান্ত দৃষ্টি ফেলল মেয়েটির পানে। ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
–“ঘুম এখনো কাটেনি? কলেজে কেন যায় মানুষ?”
রূপকথা বিরোধ করল,
–“আমি কলেজে যাব না। বাড়িতে বসে যা পারি তাই পড়ব। আর পরীক্ষার সময় গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসব।”
–“এগুলো মোটেই হবে না। নিয়মিত কলেজে যেতে হবে, পড়াশুনা করতে হবে আর দিনশেষে একটা ভালো রেজাল্ট আনতে হবে, রূপকথা।”
রূপকথা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“আমি কলেজে গেলে ঐ লোকটা আবার ঝামেলা করবে আর আম্মা সে আবার আমায় ভুল বুঝবে।”
তপোবন স্মিত হাসল। দৃঢ়তার সাথে বলল,
–“যার স্বামী তার পাশে আছে, তার কিসের এত ভয়? চুপচাপ নিশ্চিন্তে পড়াশুনায় মনোযোগী হও। কে কি করল, ভাবলো এগুলো তোমায় দেখতে হবে না, আমি আছি তো।”
রূপকথার সকল ভয়, দুশ্চিন্তা ওখানেই অবসান ঘটে। যার স্বামী তার পাশে থাকে তাকে ধরণীর কেউ হারাতে পারে না। সে রাজি হলো কলেজে যাওয়ার জন্য।
তপোবন ওযু করে এসে পাঞ্জাবি আর শাল নিয়ে তৈরি হয়ে গেল। ফেব্রুয়ারীর শেষ প্রায়। শীত এখন অতিশয় সহনশীল, অন্তত তার জন্য!
রূপকথা ঝিমুতে ঝিমুতে গিয়ে ওযু করে আসে। পড়াশুনা শেষ করে রাত একটায় ঘুমিয়ে এখন ওঠা কিছুটা কষ্টকর।
তপোবন ছেলের ঘরে গিয়েও ঘুম ভাঙানোর পদ্ধতি হিসেবে নিজের রুক্ষ দাঁড়িগুলোকেই ব্যবহার করল। ফর্সা গালে বাবার ক্ষিপ্র একটা ঘর্ষণ অনুভব হতেই তানশান বিরক্তিতে আর্তনাদ করে উঠল,

–“ওহ্ পাপাআআ, ডোন্ট ডিস্টার্ব!”
মুহুর্তেই লাল হয়ে যাওয়া ছেলের গালে হাত বুলিয়ে তপোবন আদুরে গলায় বলল,
–“ওঠো আব্বু, মাম্মা অপেক্ষা করছে।”
–“উঠছি পাপা।”, তানশান অলস কণ্ঠে বলল।
তানশান অলসতা কাটিয়ে উঠে পড়ে। রোজকার নিয়মানুযায়ী কেউ এসে টুপি, পাঞ্জাবি আর সোয়েটার ধরিয়ে দিল। তানশান মৃদু হেসে শুধায়,
–“আজ কলেজে যাবেন?”
রূপকথা ভ্রু নাচিয়ে বলল,
–“যদি না যাই?”
–“না গেলে আপনি ফেইল করবেন। আর আমায় সবাই ফেলুদার ছেলে বলবে।”
ইদানিং খুব‌ অবলীলায় তানশান নিজেকে রূপকথার ছেলে হিসেবে বলে বেড়ায়! রূপকথা স্মিত হেসে বলল,
–“ফেইল করলে দোষ আমার না, আমার টিচারদের। মানে তোমার আর তোমার পাপার।”
তপোবনের ভ্রু উঁচিয়ে গেল। বিছানা গোছাতে গোছাতে বিদ্রুপ করে বলল,

–“তানশান তোমার মিমিকে বলে দাও, পরীক্ষার খাতায় আমি আর তুমি না, সে লিখবে। শিক্ষক কি এখন পরীক্ষার খাতায় ও লিখে দিয়ে আসবে?”
তানশান ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
–“পাপা যেভাবে যাই হোক, লস আমাদেরই। তার চেয়ে বরং জোর করে করে পড়াতে হবে।”
তপোবন হেসে উঠল ছেলের কথায়। রূপকথা মুখ ছোট করে বলল,
–“হয়েছে হয়েছে, আমি পড়াশুনা করব মনোযোগ সহকারে। আর কলেজেও যাব।”
–“আজ যাবেন সত্যি?”
–“হুম।”
–“থ্যাংক গড! আমার এতদিন একা একা লাগত।”, তানশান হাঁফ ছেড়ে বলল। তপোবন রূপকথা মলিন মুখে তাকায় ছেলের পানে। অবশেষে সকল পার্থক্য, জড়তা ছাপিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গী হয়ে উঠতে পেরেছে।
সেদিন সোমবার। সুখময় সময়গুলো কর্পূরের ন্যায় বাতাবরণে মিলিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছে। এমন ভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে যেন সুখগুলো নিছকই কোনো ভ্রম ছিল।
সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে নাস্তা সহ দুপুরের রান্নার সব‌ জোগাড় করে রূপকথা বড়সড় এক নিঃশ্বাস ফেলল।
জবা নিজেও একটা লম্বা শ্বাস ফেলে তাকায় রূপকথার পানে। বিমুগ্ধ চিত্তে বলে ওঠে,
–“আফনে অনেক ভালো বড় ভাবিজান।”
রূপকথা কোমর থেকে আঁচল খুলতে খুলতে শুধায়,

–“কেন?”
–“আমার আর রোজ আফার পর আফনেই আছেন যে মাইজ্জা ভাবিরে এত ভালোবাসেন। আর সবাই তো শুধু কাজ আর দায়িত্ব চাপাইয়া দিতে জানে শুধু।”
জবা ম্লান হেসে বলল। গত রাত থেকে মৌনতা একটু বেশিই অসুস্থ। তবুও ইমরোজ আর নির্জনা বেগমের কারণে এক রত্তি বিশ্রাম তার জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি।
আজ সকালেও উঠতে পারেনি, আর না রূপকথা উঠতে দিয়েছে। বরং নাস্তা সহ যতটুকু পারছে সব কাজ নিজেই করে রেখেছে।
রূপকথা মৃদু হেসে বলল,

–“একসময় সে আমায় আগলে রেখেছে এখন আমি তাকে আগলে রাখব—এটাই তো পরিবার।”
পরপরই বলল,
–“আপা, আপনি শুধু ভাতটা রান্না করে রাখবেন আর আমি এসে তরকারি রান্না করব। তানশানের পাপা কলেজে ফোন করে শুনেছে আজ দু’টো ক্লাস হবে মাত্র। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব।”
জবা পাণ্ডুর মুখে বলল,
–“তা মাইজ্জা ভাবিজান শুনলে হইছে। দেখবেন একটু পরেই উড়তে উড়তে আইসা রান্না করতে শুরু করবে।”
–“রান্নাঘরে ঢুকতে দেবেন না।”
–“আফনের শাশুড়ির মাতায় বাজ পড়বে বারোটার মইধ্যে রান্না না হইলে।”
রূপকথা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে তড়িঘড়ি করে কিছু খেয়ে নিলো। কলেজের সময় হয়ে গিয়েছে। জীবনের এমন জটিল মুহুর্তে রয়েছে যেখানে দু’টো দিকেই সমান পরিশ্রম না দিলে হয়তো কোনোকিছু হাতছাড়া হয়ে যাবে।
তপোবন তৈরি হয়ে ব্যস্ত কদমে নিচে নামে। অফিসে যাওয়ার তাড়া আছে তার। সে খাবার ঘরে ঢুকতেই দেখলো রূপকথা তড়িঘড়ি করে বের হচ্ছে।

–“এতক্ষণ কি করছিলে? কলেজের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“জি হয়ে গিয়েছে, আমায় পাঁচ মিনিট দিন আমি তৈরি হয়ে আসছি।”
–“খেয়েছো?”
–“জি, খেয়েছি।”
বলেই রূপকথা ছুটলো। বাবা ছেলে তৈরি হয়ে বাইরে বসে ছিল। স্ত্রী-সন্তানকে স্কুল-কলেজে নামিয়ে দিয়ে তপোবন সোজা অফিসে যায়। সকালের দায়িত্বগুলো সবসময়ই তার থাকে কেননা ইমরোজের ঘুম ভাঙে দেরিতে।
ওদিকে মৌনতার জগতে যেন অন্য সুরে বাজছে। যেখানে ভয়, বিচ্ছেদ, অবসাদ আর যন্ত্রণার ছড়াছড়ি।
ভেজা চুল, রুক্ষ শুষ্ক ত্বক, চাপা ভাঙা রুগ্ন মুখ, চোখের নিচে পড়া কালসিটে দাগগুলো স্পষ্ট আরশিতে। আরশির দিকে উদাসীন নেত্রে তাকিয়ে ব্রাশ করতে থাকা মৌনতা বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।
উদাসীন চিত্তে ব্রাশটা মুখ থেকে বের করলে অন্তঃস্থল স্তিমিত হয়ে এলো। দৃষ্টি স্থির হয় রক্তে রঞ্জিত হয়ে থাকা সাদা ব্রাশটির দিকে।

দাঁতের গোড়া থেকে প্রতিদিন এমনি একটু আধটু রক্ত বের হলেও আজ রক্তের পরিমাণ বেশি। শরীরে এক অসহ্য অবসাদ ভর করেছে।
সে দূর্বল দেহে ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলল। ইমরোজ খোঁজ নিয়েছে, ডাক্তার নাকি খুলনাতেই নেই।
সে ঠিক করল, আজ রোজের সাথে অন্য ডাক্তারের কাছে যাবে। স্বামী নামক মানুষটা তো সাথে থেকেও নেই। কিন্তু এই ভঙ্গুর শরীর নিয়ে গোটা সংসারের ভার বইতে যে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তৃশানের গতকাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তবে পড়াশুনা শেষ হওয়ার আনন্দের চেয়েও প্রিয়তমাকে দেখার অধিক ব্যাকুলতা তার মাঝে। তার ‘ফেইরিটেইল’ আজ বহুদিন পর কলেজে এসেছে। এটা শোনামাত্র কাঁচা ঘুম ছেড়ে সে এক প্রকার ছুটলো কলেজে। অনেক লুকোচুরি হয়েছে, আজ সে সোজাসাপ্টা জানিয়ে দেবে—ওই রাগী মেয়েটিকেই সে সারাজীবনের জন্য চায়। প্রয়োজনে তপোবন ভাইজানের সাথেও কথা বলবে।
কলেজ প্রাঙ্গণে তখন ছুটির ঘণ্টা বেজে গিয়েছে। স্কুলের ছোট বাচ্চাদের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির কারণে ইদানীং দু-একটি ক্লাসের বেশি হচ্ছে না। ক্রিকেট ছাড়া আর কোনো খেলায় আগ্রহ নেই বলে তানশান এসবের ধারেকাছেও নেই।
আজকের দুটো ক্লাস শেষ করে রূপকথা যখন নূর আর নৈমির সাথে দ্রুত পায়ে গেটের দিকে যাচ্ছিল, তখন চারপাশ প্রায় স্বল্প মানুষের আনাগোনা। হঠাৎ করেই একদল বখাটে ছেলে তাদের পথ আটকে দাঁড়াল। রূপকথা হকচকিয়ে গেল। নূর ভ্রু কুঁচকে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,

–“এক্সকিউজ মি! এভাবে পথ আগলে দাঁড়ালেন কেন?”
জুম্মা নূরের কথায় পাত্তাই দিল না। সে সরু চোখে রূপকথার দিকে তাকিয়ে থেকে সন্দিহান কণ্ঠে শুধাল,
–“তুমিই রূপকথা, তাই না?”
রূপকথা কপাল কুঁচকে মিহি স্বরে উত্তর দিল,
–“হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কে?”
জুম্মা আর তার সহযোগীরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বিশ্রীভাবে দাঁত বের করে হাসল। জুম্মা টিপ্পনী কেটে বলল,
–“তোমার বয়ফ্রেন্ডের বন্ধু আমরা। সেদিন তৃশান তোমাকেই বাঁচিয়েছিল, না? বাহ! দারুণ প্রেম তো তোমাদের!”
তাদের অট্টহাসিতে কলেজ প্রাঙ্গণ ভারী হয়ে উঠল। রূপকথার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখেমুখে ফুটে উঠল তীব্র ঘৃণা ও ক্রোধ। সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—”কে আমার বয়ফ্রেন্ড? এসব কী আবোলতাবোল বকছেন?”
—”কেন, ভুলে গেলে নাকি? ক’জন বয়ফ্রেন্ড তোমার? তৃশান কত নম্বর বয়ফ্রেন্ড তোমার?”
রূপকথা এখন আর এই ছ্যাঁচড়া ছেলেদের ভয় পায় না। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—”মুখ সামলে কথা বলুন, নয়তো পরিণাম ভালো হবে না।”
—”পরিণাম আর খারাপ কে করবে? ওই তৃশান? আরে, আমরা তো একটু পরিচিত হতে চাইছি। এসো আমাদের সাথে, একটু কথা বলি।”

বলেই জুম্মা অসভ্যের মতো রূপকথার কবজি চেপে ধরলো। রূপকথা হতভম্ব হয়ে গেল। নূর আর নৈমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক প্রকাণ্ড আঘাত লাগল জুম্মার বাহুতে। সেই আঘাতের তীব্রতায় জুম্মা ছিটকে পড়ল অনেকটা দূরে।
রূপকথা সহ জুম্মার বন্ধুরা চমকে ওঠে রণমূর্তী তৃশানকে দেখে। কিন্তু কেউ কিছু বলা আর করার মতো কোনো সুযোগ পায় না। ক্রোধে ফুঁসতে থাকা তৃশান হকিস্টিক দিয়ে দেদারসে মাটিতে লুটিয়ে পড়া জুম্মাকে পেটাচ্ছে।
জুম্মার সহযোগীরা তৃশানের এই উগ্র রূপ দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। দুই পক্ষের মধ্যে একটা অলিখিত সমঝোতা থাকলেও আজ তৃশান যেন সব সীমানা ছাড়িয়ে উন্মাদ হয়ে উঠেছে।
জুম্মা যখন প্রায় নিথর, তখন তৃশানের বন্ধুরা তাকে জোর করে টেনে সরাল। ধমক দিয়ে বলল,
—”কী করছিস তৃশান? মরে যাবে তো ও!”

তৃশান হাঁপাচ্ছে। ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পুনরায় জুম্মার কলার চেপে ধরল। চিৎকার করে বলল,
—”ওর সাহস হয় কী করে রূপকথার গায়ে হাত দেওয়ার? শি ইজ মাই গার্ল! ডোন্ট ইউ ডেয়ার লুক এট হার।”
তৃশানের সেই বজ্রকণ্ঠের রেশ কাটতে না কাটতেই ভিড়ের আড়াল থেকে ভেসে এলো এক কিশোরের গম্ভীর ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর,
—”শি ইজ মাই মাদার! ইউ ডোন্ট ডেয়ার লুক এট হার।”
বিস্ময়ে বিমূঢ় তৃশান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক বাবার প্রতিচ্ছবি এক কিশোর। তানশানের চোখমুখ রাগে লাল হয়ে আছে। রূপকথার ঘর্মাক্ত মুখে মুহূর্তেই এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
তৃশান কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—”কী বললে তুমি?”
তানশান দৃঢ় পায়ে এসে রূপকথার পাশে দাঁড়াল। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“সে আমার মা। তার দিকে চোখ দেয়ার দুঃসাহস করবে না।”
তৃশান কি অবাক হবে তার থেকেও অবাক হচ্ছে আশেপাশের সকলে।
তৃশান হেসেই ফেলল। জামার কলার ঠিক করে এগিয়ে এসে বলল,
–“মজা করছো, তানশান? তুমি এখনো ছোট, এসবের মধ্যে এসো না। তোমার রিলেটিভসের কিছু হবে না, আমি তাকে দেখে রাখব। যাও, বাসায় যাও।”

তানশান এক চুল নড়ল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে নিজের করা ভুলটি শুধরে বলল,
—”উনি আমার কোনো রিলেটিভ নন চাচু, উনি আমার মা! তুমি কি কানে কম শোনো? আর উনাকে দেখার জন্য আমি আর পাপা আছি।”
তৃশানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। সে অধৈর্য হয়ে বলল,
—”কী আবোলতাবোল বলছো তানশান? ও তোমার মা হবে কী করে? হোয়াট রাবিশ!”
তৃশানের কথার মাঝেই রূপকথা অটল কণ্ঠে বলল,
—”আমি ওর মা, এটাই সত্যি। আর আপনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। কেন বা কীভাবে, সেই কৈফিয়ত আপনাকে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। তানশান, চলো!”
তৃশান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে দিশেহারা হয়ে রূপকথার পথ রোধ করে দাঁড়াল। ধরা গলায় বলল,

—”তার মানে তুমি বলতে চাইছো তুমি তপোবন ভাইয়ের স্ত্রী? অসম্ভব! হাউ ইজ দিস পসিবল? তুমি ভেবে কথা বলছো?”
–“আমি ভেবেচিন্তে সজ্ঞানে বলছি, আমি তপোবন সিকদারের‌ স্ত্রী আর তানশানের মা।”, রূপকথার দৃঢ় কণ্ঠ।
–“আশ্চর্য! এটা কি করে হতে পারে? সে আমার থেকেও কত সিনিয়র তুমি জানো? কোথায় সে আর কোথায় তুমি? বয়সের ফারাক দেখেছো? এই রূপকথা প্লিজ, তুমি আমায় বলো এইসব মিথ্যা, তুমি মজা করছো।”, তৃশান উন্মত্তের ন্যায় বলে। সে বিশ্বাস-ই করতে চাইছে না তার পুরো অনুভূতিটা একটা ভুল ছিল!
রূপকথা ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে জনসম্মুখে মজা করার মতো মতিভ্রষ্ট আমার হয়নি। আমি তপোবন সিকদারের স্ত্রী আর তানশানের মা—এটাই সত্যি। কেন কিভাবে আপনাকে কেন বলব? দয়াকরে আমার জীবনটা আর জটিল বানাবেন না, আপনার কারণে আমাকে ইতিমধ্যে অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে। আর ওনাদের বারণ করে দেবেন এরপর থেকে কলেজে কেউ যেন আপনি জড়িত কোনোকিছুতে আমায় সামিল না করে।”
বলেই রূপকথা তানশানের হাত ধরে দ্রুত কদমে সেখান থেকে চলে আসে। আর সদ্য অঙ্কুরিত তীব্র অনুভূতিতে দগ্ধ ছেলেটি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

আজ অফিসে দারুণ ব্যস্ততা। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁইছুঁই। তপোবন দ্রুত কদমে বাড়ি ফিরল। ফেলে যাওয়া একটা ফাইল নিয়ে বের হতে হতে হাঁক ছেড়ে মৌনতাকে ডাকলো।
জবার কথামতো মৌনতাকে পাওয়া গেল রান্নাঘরে। তপোবনের ডাকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল সে।
–“জি ভাইজান।”
তপোবন উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,
–“মৌন, ইমরোজের কোন বন্ধু বিপদে পড়েছে? কোথায় গিয়েছে ও? অফিসে এই সপ্তাহ কত কাজের চাপ, অথচ ও নেই। এই সপ্তাহে সাতক্ষীরার প্রজেক্ট শেষ হবে। আমি তো একা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি।”
মৌনতার কপালে ভাঁজ পড়ল, চোখের কোণে ঘনিয়ে এলো সংশয়।
–“বন্ধু বিপদে পড়েছে মানে? ভাইজান, তার তো অফিসের কাজেই আজ যশোরে যাওয়ার কথা ছিল না? সে তো সকাল সাতটার সময় যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।”
তপোবন হতবাক হয়ে গেল,

–“যশোর? অফিসের কাজে? কি উল্টাপাল্টা কথা! ওর সাতক্ষীরায় যাওয়ার কথা তাও এই সপ্তাহের শেষে।”
পরপরই তপোবন চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
–“কিন্তু তার চেয়েও অদ্ভুত কথা হলো, ও আমায় গতকাল বলেছে, ওর কোনো বন্ধু বিপদে পড়েছে তার কাছে যেতে হবে দুইদিনের জন্য। ও দু’জনের কাছে ভিন্ন কথা কেন বলল?”
মৌনতা নিজেও চাপা ভয়, অস্থিরতায় ঘেমে উঠল। ইমরোজ মিথ্যা কথা বলল কেন? আর বিগত দিনগুলোতে কেন ইমরোজ এত প্রাণবন্ত ছিল? এগুলোর সাথে কি কোনোভাবে সৃজা জড়িত ছিল? কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব?
সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

–“ভাইজান একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন না সে কোথয় আছে? কেন আছে?”
মৌনতার ফ্যাকাশে মুখ আর অস্থিরতা দেখে তপোবন নিজেকে কিছুটা সামলে নিল। গতকাল রাতে রোজ বলল, মৌনতা ভালো নেই। কেন নেই সে জানে না আর না তাকে কেউ খোলামেলা বলে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মেয়েটির মাথায় অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত রেখে বলল,
–“চিন্তা করো না, আমি দেখছি ও কোথায় আছে?”
তপোবন তাকে হাসিমুখে আশ্বস্ত করলেও পর মুহূর্তেই তার চোখমুখ কেমন শুকনো হয়ে গেল।
সাতক্ষীরায় কনস্ট্রাকশন সাইটে ফোন দিয়ে শুনলো, ইমরোজ সেখানে যায়নি।
তবে ও কোথায় গিয়েছে? কোথাও কি সে কিছু অদেখা করে ফেলছে? সে কি তবে ভাইদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিতে গিয়ে কোনো বড় ভুল করে ফেলল?
প্রশ্নরা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এরোজ কেন সৃজার মতো একটা মেয়েকে বিয়ে করতে এতটা মরিয়া? আর কেনই বা ইমরোজ সেই বিয়ের প্রসঙ্গে এমন অদ্ভুত আচরণ করছে? দুশ্চিন্তার ভার বইতে না পারে না তপোবন। তৎক্ষণাৎ তার বিশ্বস্ত এক লোকের কাছে ফোন দিল।
রিসিভ হতেই থমথমে মুখে বলল,

–“রাশেদ, আমায় একজনের বিষয়ে কিছু তথ্য চাই। একটু দ্রুত জোগাড় করে দিতে পারবে? কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে যাচ্ছে এইসব।”
রাশেদ তার আর তকদির সিকদারের রাজনৈতিক সব মারপ্যাঁচ সামলায়। সে বিনম্র কণ্ঠে বলল,
–“জি স্যার বলুন, কার সম্পর্কে?”
তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“ইমরোজ।”
রাশেদ হতচকিত হয়। অস্ফুট স্বরে বলে,
–“ইমরোজ স্যার?”
–“হুঁ, ইমরোজ। ও কোনোভাবেই যেন এটা না জানতে পারে বুঝেছো?”
–“জি স্যার, বুঝেছি।”
–“একটু তাড়াতাড়ি করো, রাশেদ।”
তপোবন তাকে আনুষাঙ্গিক আরো কিছু তথ্য দিয়ে এরোজকে ফোন লাগালো।
সকাল থেকে এরোজ ও বাড়িতে নেই। তিনবার রিং হওয়ার পরে ফোনটা রিসিভ হলো। তপোবন আদেশের সুরে বলল,

–“এরোজ, আধা ঘন্টার মধ্যে অফিসে আসবে। আধা ঘন্টার মধ্যে অফিসে না দেখলে কিন্তু খারাপ হয়ে যাবে।”
তবে আধা ঘণ্টা লাগল না, এরোজ পনেরো মিনিটের মাথায় হন্তদন্ত হয়ে অফিসে এলো। তার অবিন্যস্ত চুল আর রক্তাভ চোখের অস্থিরতা তপোবনকে বিচলিত করে। কক্ষে ঢুকেই এরোজ মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করল,
— “সৃজা কোথায়, ভাইজান?”
তপোবন কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
— “শান্ত হ আগে। কী হয়েছে তোর?”
— “কিছু হয়নি। আগে বলো সৃজা কোথায়? ওর বাড়িতে তালা, অফিসেও নেই!”
— “ও তো পরশু এক সপ্তাহের জন্য ছুটি নিয়েছে।”
–“কি বলে ছুটি নিয়েছে?”
–“ব্যক্তিগত সমস্যা বলেছিল।”
–“আর ইমরোজ? ও কোথায়? সকাল থেকে তো ওকেও দেখছি না?”
তপোবন গম্ভীর স্বরে জানালো,

— “ওকে আমিও খুঁজছি। আমার কাছে বলল বন্ধু বিপদে পড়েছে, অথচ মৌনতাকে বলেছে ও না-কি অফিসের কাজে যশোর যাচ্ছে। এই মিথ্যাচারের কারণ বুঝতে পারছি না আমি।”
এরোজের অস্থিরতা এবার আতঙ্কে রূপ নিল। সে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
–“আমার নাম্বার ব্লক করা, বাড়ি তালাবদ্ধ। তবে কি সৃজা আমায় ইচ্ছাকৃত এভয়েড করছে?”
তপোবনের কর্ণগোচর হয় সেই শঙ্কা মিশ্রিত কণ্ঠ। সে কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“সৃজা তোর নাম্বার ব্লক করেছে?”
চোখেমুখে অজস্র চিন্তা নিয়ে এরোজ আতঙ্কমিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
–“তিনদিন ধরে সৃজা আমার নাম্বার ব্লক করে রেখেছে, ওর ঘরের কাউকেও পাওয়া যাচ্ছে না, ভাইজান।”
তপোবন তার ঘাড়ছ হাত রেখে শুধায়,
–“তোর চোখেমুখে ভয় কেন, এরোজ? আমায় সত্যি করে একটা কথা বলতো এরোজ, তুই সৃজাকে বিয়ে করার জন্য এত উদগ্রীব কেন? অন্তত আমায় এটা বলবি না, ওকে তোর ভালোলাগে।”
এরোজ নিরুত্তর চোখ তুলে তাকায়। তপোবন ফের শুধায়,
–“তোর মাথায় কি চলছে এরোজ? কেন করছিস এগুলো? আমার কেন মনে হচ্ছে কোনোকিছু ঠিক নেই।”
এরোজ চোয়াল শক্ত করে বলল,

-“কোনোকিছু ঠিক নেই, ভাইজান। আমি নিশ্চিত সৃজা আর তার পুরো পরিবারের গায়েব হয়ে যাওয়ার পেছনে তোমার আদরের ইমরোজের হাত রয়েছে। বিশ্বাস করো, চোখের সামনে আর একটা ঘর ভাঙলে আমি একটাকেও ছেড়ে কথা বলব না। তোমার ভাই আর সৃজা দু’টোকেই কবরে পুঁতে রেখে আসব।”
তপোবন বিস্ফোরিত নয়নে তাকায়। অস্ফুট স্বরে বলল,
–“সৃজা আর ইমরোজ মানে?”
এরোজ এক তিক্ত তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— “তোমার এই অন্ধ বিশ্বাস দেখে অবাক হচ্ছি। তুমি এমনভাবে তাকাচ্ছ যেন আমি তোমার সাধু ভাইয়ের নামে মিথ্যে রটাচ্ছি। সেই ভাই? যার বিয়ের আগ পর্যন্ত একাধিক নারীসঙ্গ ছাড়া দিন কাটত না। তুমি কি ভেবেছো, বিয়ের পর সে একদম ‘পবিত্র’ হয়ে গিয়েছে?”
তপোবন আদোতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কেননা বিয়ের আগে ইমরোজ আর তার জীবন যতটাই অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকুক না কেন, বিয়ের পর সেই সকল অন্ধকার আলোয় পরিণত হয়েছে মৌনতা আর নায়েলের আগমনে। ইমরোজের জীবনে তো মৌনতা আর নায়েলের আগমনের পর কোনো অভাব ছিল না। যে মানুষটা নায়েলের জন্মের পর আনন্দে ঝরঝর করে কেঁদেছিল, সেই ভাইকে কি করে সে সন্দেহ করবে?

–“এটা কি করে হতে পারে, এরোজ? আমি কেন এমন একটা মানুষকে সন্দেহ করতে যাব, যার জীবনে সুখের কোনো কমতি নেই? আ…আমি… আশ্চর্য…”
তপোবনের কথারা জড়িয়ে যাচ্ছে। এ যেন সেই ত্রিশ বছর আগেরকার সেই বিদঘুটে বিশ্রী পরিস্থিতি আবারও পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের সেই অপহ্য দহন, যখন সে জানতে পেরেছিল তার মা তাদের ফেলে অন্য পুরুষের হাত ধরে পালিয়েছে।
বিদঘুটে সত্য হজম করতে না পারা ভাইয়ের দিকে এক পলক ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে এরোজ ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার প্রতিটি কদমে আজ ভীষণ তাড়া। ছোট্ট নায়েলকে—এরোজ না হতে দেয়ার তাড়া।
তপোবন পিছু ডাকলো।
–“এরোজ! কোথায় যাচ্ছিস?”
দিক দিশেহারা ভাইকে ছেড়ে এরোজ বেরিয়ে যায়।
তার যাওয়ার কিয়ৎকাল বাদেই রাশেদের ফোন আসে। কর্ণগোচর হয় কিছু তিক্ত ঘৃণ্য সত্য! ভাইয়ের প্রতি অগাধ অন্ধ বিশ্বাসের জন্য আফসোসে জর্জরিত তপোবন ধপ করে বসে পড়ে চেয়ারে। চোখের সামনে হঠাৎ করেই সব ঝাঁপসা হয়ে আসে। কর্ণকুহরে আন্দোলিত হয় মায়ের ফেলে যাওয়ার পর দুই ভাইয়ের নিষ্পাপ ক্রন্দনরত চেহারা। সে বিশ্বাস-ই করতে পারল না, নিজে চরিত্রহীনতার বিদঘুটে ভিক্টিম হয়েও কি করে ইমরোজ নিজের স্ত্রী সন্তানের সাথে এমনটা করতে পারল?
পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে যাওয়া তপোবন নিজেকে সামলে পুনরায় রাশেদকে ফোন লাগায়। শক্ত কণ্ঠে বলে,
–“রাশেদ, তোমার কাছে দুই ঘন্টা সময় যেকোনো মূল্যে ইমরোজকে খুঁজে বের করবে।”
কিন্তু তপোবন বোধহয় তখনো বুঝতে পারেনি তার অন্ধ বিশ্বাস একটু বেশিই দৃঢ় ছিল। যেই অন্ধকারের দৃঢ় সামিয়ানায় চিড় ধরতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।

পৃথিবীতে এমন মেয়ে খুবই কম রয়েছে যারা ‘ডিভোর্সী’ এই তকমাটাকে ভয় না পায়, ঘৃণা করে না। কেউ চায় না এই তকমাটা নিয়ে বাঁচতে।
স্বামীর ঘর করতে চাওয়া, সন্তানের মাথার উপর বাবার আশ্রয় অটল রাখার জন্য কত নারী নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যায়। মৌনতাও এই দলের-ই অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু মেয়েটি এই চাওয়ায় এতটাই নিমগ্ন হয়ে গিয়েছে যে এর সীমানা জানে না। জানত না, সহ্যেরও একটা শেষ সীমানা থাকে। যেমন থাকে জোয়ারের পর ভাটার টান।
স্বামী, সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করতে চাওয়ার ও একটা সীমা রয়েছে। তবে মৌনতা এই সীমা সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই তো এখনো ঐ মানুষটার পথ চেয়ে রয়েছে, যে কবে তার পথ থেকে হারিয়ে গিয়েছে।
সংসার আগলে রাখার এক আদিম নেশায় মৌনতা ভুলেই গিয়েছিল—যে তরী ছিদ্রযুক্ত, তা কেবল ডুবাতেই জানে, বাঁচাতে নয়।
সে জানেই না, তার অগোচরে কী পাশবিক জঘন্য খেলায় নিমগ্ন ইমরোজ! এত নিকৃষ্ট পরিকল্পনার পরেও রেহাই দেয়নি মেয়েটিকে। রোজকার মানসিক এবং শারীরিক যন্ত্রণা দিতে কার্পণ্য করেনি। আর সংসার বেঁচে যাওয়ার আশায় মেয়েটি নীরবে সেগুলো সহ্য করে যায়।

মা বলে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার কথা কাউকে বলতে নেই, মেয়েদের ধৈর্য্য সহ্য নিয়ে চলতে হয়। এই বাক্য দুটি মানতে মানতে আজ মেয়েটি ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত। সে জানে না তার এই ক্লান্তির কারণ এবং এর পরিণতি কি হবে!
তখন দুপুর সাড়ে বারোটা। একদফা বমি করে টলটলে নেত্রে মৌনতা নিজের ঘরে বসে মেডিকেল রিপোর্ট ঘাঁটছে। সকাল থেকে ভঙ্গুর শরীর যেন আরো ভেঙে পড়ছে। শ্বাস নিতেও ইদানিং কষ্ট হয়। কাঙ্খিত ডাক্তারের নাম্বারটি পেতেই, সে কল দেয়। ডাক্তারের এসিস্ট্যান্ট ফোন ধরতেই সে শুধায়,
–“ডাক্তার কবে আসবে খুলনাতে?”
তবে জবাবটি শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না মৌনতা। –“ডাক্তার খুলনাতেই আছে, ম্যাম।”
মৌনতা বিমুঢ় হয়ে শুধাল,

–“ঢাকাতে গিয়েছিল না? কখন এসেছে?”
–“ম্যাম, স্যার ঢাকাতে বিগত এক মাসেও যায়নি। আগামী মাসে যাবেন।”
মৌনতা ভেঙে আসা শরীর আর মনে স্বামীর একের পর এক মিথ্যাচার সহ্য করার ক্ষমতা ফুরিয়ে এসেছে। সে উদাসীন চিত্তে তাকিয়ে রইল ফোনটির দিকে।
অসুস্থ শরীর, বিধ্বস্ত মস্তিষ্কে চলা অজশ্র প্রশ্ন, চিন্তা, ক্লেশের টানাপোড়েন নিয়ে মৌনতা সিঁড়ি পর্যন্ত আসতেই দেহ ক্রমশই ভর শূন্য অনুভব হতে লাগল। শরীর ঘামছে। ব্লাউজ ভিজে উঠছে। হৃদপিণ্ডের গতি ক্রমশ অনিয়ন্ত্রিত। ভারসাম্য হারানো মৌনতা কোনোমতে সিঁড়ির রেলিংটা খামচে ধরল। মাথা নুইয়ে বুক ভরে বাতাস নেওয়ার চেষ্টা করল সে, কিন্তু পৃথিবীটা তখন ঝাঁপসা হয়ে আসছে। তন্মধ্যেই কারোর ক্ষিপ্র পায়ের শব্দ পেতেই সে সরব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ঝাঁপসা চোখে এরোজকে দেখে সে কোনোমতে মাথায় কাপড় টানলো।
বরাবরের মতো এরোজ নত মস্তকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। কাঁধ দিয়ে কানের কাছে ফোনটা চেপে ধরে কাউকে কড়া সুরে আদেশ দিচ্ছে,

— “সৈকত, আমি নম্বর দিচ্ছি, এটা ট্র্যাক কর। তুই নিউমার্কেটের তিন নম্বর গেটে থাক, আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে আসছি।”
এরোজ পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই মৌনতার সমস্ত শক্তি যেন উবে গেল। সিঁড়ি বেয়ে নামতে গেলেই সামনের সবকিছু ধূসর হয়ে গেল। দীর্ঘ দেড় বছরের একাকী লড়াই আর ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে ক্লান্ত শরীরটা আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। অন্তঃস্থল থেকে একটা শেষ দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মৌনতা দেহ ভর ছেড়ে দিল—অজানা, নিরুদ্দেশ গন্তব্যে। যেখানেই নেই কোনো সঙ্গী, আগলে রাখার মতো শক্ত বাহু।
যেই কণ্ঠনালী থেকে সর্বদা হাসির শব্দ শুনতে এরোজের কর্নদ্বয় প্রশান্তি লাভ করে, সেই কণ্ঠ থেকে অসহনীয় ব্যথাতুর দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ শুনতেই এরোজের কর্ণদ্বয় সচকিত হয়। ব্যস্ত কদম হঠাৎ করেই থেমে গেল। কারোর অদ্ভুত আর্তনাদের শব্দে সে বিলম্বহীন পিছু ফিরে তাকায়। কয়েক মুহূর্ত আগের সেই স্থির মানুষটি সেখানে নেই। তার বদলে সিঁড়ি বেয়ে একটি নিথর দেহ গড়িয়ে পড়তে দেখে এরোজের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।
ঝড়ের গতিতে আঁছড়ে পড়া হৃদপিণ্ড বিদীর্ণ করা আতঙ্কে সে চিৎকার করে উঠল,

–“ভাবি?”
হাতের ফোনটা অনাদরে ছিটকে পড়ে মেঝেতে। হতভম্ব এরোজ হাওয়ার গতিতে ছুটলো অচেতন দেহটিকে আগলে নিতে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মাঝে ছাব্বিশটা সিঁড়ি অতিক্রম করেও এরোজ কাঙ্খিত মানুষটিকে ধরতে পারে না।
মৌনতার অচেতন দেহ তখন নিচ তলার মেঝে ছুঁয়ে যাবে, ঠিক শেষ মুহূর্তে দু’টো হাত বাজপাখির মতো তাকে ছোঁ মেরে আগলে নিল।
এরোজের গগনবিদারী চিৎকার করে ডেকে উঠল, –“আম্মাআআ!”
এরোজ এক পলক তাকায় উঁচু সিঁড়িটির দিকে
অন্তস্থল আ’ত’ঙ্কে থরথরিয়ে কাঁপছে। সে কোনোমতে ঢোক গিলে নিজেকে সামলায়। কম্পিত হাতে মৌনতার গালে চাপড় মারে।
–“ভাবি? ভাবি? শুনতে পাচ্ছেন? ভাবি?”
মৌনতার কোন জবাব আসে না। এরোজ অস্থির চিত্তে মৌনতার মাথা হাতাতে লাগল। কিন্তু কোথাও তরল কোনো কিছুর আভাস না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারল না।
হঠাৎ করেই মৌনতার নাক সহ ঠোঁটের কোনা থেকেই সরু এক রক্তের স্রোত বেরিয়ে আসে। এরোজের অন্তরাত্মা তখন হিম হয়ে আসে।

–“কি হলো এরোজ? চিৎকার করলে কেন?”
বলতে বলতেই নির্জনা বেগম এগিয়ে আসে বসার ঘরেই। কিন্তু চোখে বাঁধা দৃশ্যটি দেখে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।
–“মেজো বউ মা? এরোজ মেজো বউমার কি হয়েছে?”
রক্তের সেই সরু লাইন যেনো ক্রমশই ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করছে। এরোজ হন্তদন্ত হয়ে মৌনতাকে পাঁজাকোলা করে তুলতে তুলতে বলল,
– “সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছেন আম্মা! নাক, মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে!”
চিৎকার চেঁচামেচিতে জবা সহ মাজেদা আর রূপকথা হতবিহ্বল হয়ে ছুটে এলো বসার ঘরে।
নির্জনা বেগম আ’ত’ঙ্ক জর্জরিত হয়ে এরোজকে বলে,
–“এরোজ, আগে ওর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করো। এই জবা পানি নিয়ে আয়।”

মায়ের কথায় এরোজের বাড়ন্ত পা থমকায়। হঠাৎ করেই ভুলে বসেছিল, মানুষটার উপর এত অধিকার দেখানো তার অনুচিত।
সহসা এরোজের সকল উদ্বেগ একটা শুকনো ঢোকের আড়ালে লুকিয়ে গেল। সে শুকনো ঢোক গিলে মায়ের কথামতো মৌনতাকে সোফায় শুইয়ে দেয়। কিন্তু যখনই সে মৌনতার পায়ের নিচ থেকে হাত বের করে। তার পৃথিবী থমকে যায়, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায় নিজের রক্তমাখা হাতটি দেখে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪২

সে নিজের হাত থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চমকে তাকায় মৌনতার পানে। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতেই সে দ্রুত নুইয়ে গিয়ে মৌনতাকে কাত ফেরায় এবং সে অবাক হয়ে যায় মানুষটার পুরো নিম্নদেশ রক্তে ভিজে জবুথবু হয়ে আছে। এরোজ আর্তনাদ করে উঠলো,
–“আম্মাহ! কত রক্ত!”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৪