পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৫
ঈশিতা রহমান সানজিদা
নূরের চোখের পাপড়ি ঘন, তবে এই মুহূর্তে চোখের আকার কেমন তা ঠাওর করতে পারলো না আজমাঈন। কেননা মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিয়েছে। ডান গালে কালো কুচকুচে তিল, শুষ্ক ঠোঁটে গোলাপি আভা। এছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান নয়। নূরের পরনে সাদা গাউনের সাথে লাল রঙের ওড়না। ওড়না মাথায় দু প্যাচ দেওয়া। মেয়েদের সব সৌন্দর্য থাকে চোখে এবং চুলে। সেটাই ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। এই মেয়েকে কি উপমা দেওয়া যায়? তার জন্য আকাশ পাতাল ভাবতে হবে। কিছুক্ষণের দেখায় উপমা দেওয়া কষ্টসাধ্য। নূরের জন্য তো অসম্ভব। নূরের ওড়না ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে আঙ্গুলে পেঁচিয়ে নেয় কিছুটা। তবে নূরের জায়গা পরিবর্তন হয়না। সে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়, ছেলেটা এতক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখ নামিয়ে বেশ বুঝতে পারছে নূর। ওর এখন কি করা উচিত তাও বুঝতে পারে না। অগত্যা দাঁড়িয়ে থাকে। আজমাঈন ঘাড় কাত করে তাকায়, মৃদু হাসিতে শরীর দুলে ওঠে। আস্তে করে বলে,’বসো।’ নূর দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বসে। হাতের বোতলের উপর নিজের সমস্ত বল প্রয়োগ করে। আজমাঈন ওড়না ছাড়ে না। নূর কি এজন্য ওকে অসভ্য ভাবছে? ভাবলে ভাবুক, তাতে কি আসে যায়। হাজবেন্ড ই তো, আর মুখচোরা মেয়েটা তো কাউকে কিছু বলতেও পারবে না। আজমাঈন বলে,’অঙ্গীকারপত্র, প্রতিশ্রুতি, প্রার্থনার শক্তি কতটুকু জানো?’
ওর সহধর্মিণী তো জবাব দিতে জানে না। খামোখা প্রশ্ন করার মানেই নেই। ভাবলো এরপর প্রশ্ন করার দরকার নেই। নিজ থেকেই বললো,’গতকাল পর্যন্ত তোমার ঘরে আসার অনুমতি ছিলো না আমার। আর আজ দেখো!! তোমার ওড়না ধরে বসে আছি। মৃত্যু ব্যতীত আর কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।’
একটু থেমে বলে,’তবে তুমি যদি চাও তাহলে আমাকে বের করে দিতে পারো। আফটার অল তোমার হক আছে, যা চাইবে তাই দিতে বাধ্য আমি। এবার বলো তোমার চাওয়া কি?’
এই প্রশ্নটা আজ পর্যন্ত কেউ করেছে কিনা তা মনে পড়ছে না নূরের। ওর আব্বু তো প্রশ্ন করেনি, না চাইতেই সবকিছু এনে দিয়েছে। এছাড়া কেউ ওর কোন চাওয়া জানতে চায়নি। তাই এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারলো না। এবার আজমাঈন মনক্ষুণ্ণ হয়। মেয়েটা কি একটা কথার জবাব দিবে না? সে বলে উঠে,’আমার সাথে কথা বলতে তোমার ভালো লাগছে না বোধহয়! আমি কি চলে যাব?’
শ্বাস ঠেলে বের করে দিয়ে কথা বলে নূর,’নাহ, তেমন কিছু না। আসলে আমি বুঝতে পারছি না কি বলা উচিত। বেশিরভাগ ভুলভাল কথা বলে ফেলি। তাই,,!’
নূরের চেহারায় জড়তা মেশানো। কথা বলতে গিয়ে কতবার গলায় আটকে গেছে বোঝেনি। আজমাঈন বলে,’পানি খেয়ে নাও। ভালো লাগবে।’
পানি পান করার পর আজমাঈন বললো,’আমি তোমার ভুলভাল কথাগুলো শুনব, এতে আমার খুব একটা অসুবিধা হবে না। এবার বলো তোমার চাওয়া কি? যা চাইবে তাই পাবে।’
নূর উঠে দাঁড়ায়, আজমাঈন কথার মাঝে ওড়না ছেড়ে দিয়েছে। পানির বোতলটা যথাস্থানে রেখে ঘুরে দাঁড়ায়। একটু এগিয়ে এসে বলে,’চাওয়ার মাঝে যখন ইচ্ছে চলে আসবে তখন চাইব। ইচ্ছে তীব্র হলেই চাওয়ার কারণ আসে। ততদিন নাহয় অপেক্ষা করি।’
আজমাঈন ভেবেছিল মেয়েটি কথা জানে না, কিন্তু এতো গভীরতা মিশিয়ে উত্তর দিবে ভাবেনি। মাথা নামিয়ে মুচকি হাসে।
নূরের ঘুম ভাঙল তীব্র অ্যালার্মের শব্দে, এতো শব্দ হলো যে ধড়ফড়িয়ে ওঠে, হাত দু’টো জড়ো হয় বুকে। রুমের লাইট তখনও জ্বলছে। নূরের মনে পড়লো রাতে লাইট অফ করা হয়নি। আজমাঈন নিজ থেকে অন রেখেছে, কারণ অবশ্য জানে না। কিন্তু এখন ওর পুরো মনোযোগ অ্যালার্মের উৎপত্তিস্থল। ঘুম জড়ানো মুখটা কুঁচকে এলো আজমাঈনের। উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলো, মাথা তুলে চোখজোড়া হাল্কা খুলতেই আলো এসে ধাক্কা দিলো। কয়েক সেকেন্ড বাদে চোখ পুরোপুরি খুলতেই নূরকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে ঝট করে উঠে বসলো। বোধদয় হলো যে সে এখন কোথায় আছে। ত্রস্ত হাতে ফোনের অ্যালার্ম অফ করে দিলো। নূর আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে আছে, এটা কি ছিলো? মনে হচ্ছে কোন জন্তু জানোয়ারের বিচ্ছিরি ডাক। আজমাঈন লজ্জায় পড়ে গেল। মনে ছিলো না, নাহলে অ্যালার্ম দিতো না আজ। ধরা যেহেতু পড়ে গেছে তাই নিজের হয়ে সাফাই গাইলো আজমাঈন,’সরি!! ফজরের সময় ঘুম ভাঙতেই চায় না।’
নূর ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করে,’ওটা কিসের শব্দ ছিল?’
আজমাঈন বুঝলো মেয়েটা ভয় পেয়েছে। এজন্যই আব্দুল আঙ্কেলের বকাবকি সহ্য করতে হয়। ও বললো,’আমিও জানি না, আমার এক ফ্রেন্ড রেকর্ড করে পাঠিয়েছে। বলেছে এই শব্দে ঘুম ভাঙবেই।’
নূর দ্রুত বিছানা ছাড়লো, ওয়াশ রুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিলো। এমন ভয়ানক শব্দ কখনোই শোনেনি। আজমাঈনের বদৌলতে তা শোনা হয়ে গেল। আজমাঈন বোকার মতো পা ছড়িয়ে বসে আছে, খাটের সাথে হেলান দিয়ে ওয়াশ রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে সে। কি একটা ঘটনা ঘটে গেল!! নিজের উপর বিরক্ত লাগছে খুব।
নূর বেশ সময় নিয়ে তারপর বের হলো। নিজেকে শান্ত করলো, নামাজ পড়লে দুদণ্ড শান্তি মিলবে। ও বের হতেই আজমাঈন উঠে দাঁড়ায়। ওযু করে আসতেই দেখতে পায় বিছানার উপর পাঞ্জাবি রাখা। নতুন মনে হচ্ছে। হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখলো, লাইট লেমন কালারের পাঞ্জাবি সাথে সাদা রঙের পাজামা। পাঞ্জাবি পরে বের হলো, ফয়েজ ঘুমাচ্ছে। ওকে টেনে নিয়ে গেল সাথে। এখন তো দু’জনের শ্বশুর বাড়ি, শুধু সম্পর্ক উল্টে গেছে। তাতে তো বন্ধুত্ব কমেনি।
আজমাঈন আজই চলে যাবে। সকালের নাস্তা শেষ করে দেরি করলো না। ফয়েজ ওকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে এলো। আসার আগে নূরের সাথে দেখা হয়নি আজমাঈনের, তবে মৌখিক বিদায় আগেই জানিয়েছিল। আজমাঈন সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে। নূর তখনও বিছানা গোছায়নি। ছেলেটা রুমে থাকলে কেমন অস্থির অস্থির লাগে। এখন নিজের ইচ্ছে মতো সবকিছু করা যাবে। ব্ল্যাঙ্কেট হাতে নিয়ে আপনমনে ভাজ করতে লাগলো। আজ নতুন স্মেল আসছে ব্ল্যাঙ্কেট থেকে, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নিলো। আজমাঈনের আতরের গন্ধ, কি মনে করে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল নূর। গত রাতের আগেও সে একা ছিল, আর এখন ওর নামের পাশে আরেকটি নাম জড়িয়ে গেছে। বিষয়টা মানতে অদ্ভুত লাগছে নূরের। এই রুমে আরেকটা মানুষের গন্ধ বিরাজ করছে। বিছানা গুছিয়ে, বালিশ ও কুশন গুলো সাজিয়ে রাখলো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে আজমাঈনের ঘড়িটা পড়ে আছে। তার নিচে একটি খাম চাপা দেওয়া, ছেলেটা নিশ্চয়ই ফের কোন চিঠি রেখে গেছে। খামে একটা চেক, টাকার অঙ্কের পরিমাণ দেখে বুঝলো যে আজমাঈন মোহরানা পরিশোধ করে গেছে। তবে এক খানা চিরকুট দিতে ভোলেনি সে। চার ভাঁজের চিরকুট খুলতেই কলমের আঁচড় গুলো স্পষ্ট হয়।
‘পরিশেষে আমার ধারণা ভুল হলো, যখন দেখলাম তোমার চোখের দিকে তাকানো আস্ত একটা ভুল। অবশ্য তোমাকে দোষ দেওয়া যায় না। ভুলটা তো আমি করেছি, তাই শাস্তি মঞ্জুর করে নিলাম। তবে এই অধমের উপর একটু সদয় হও প্লিজ। তোমার পূর্ণ চোখের দর্শনের অপেক্ষায় আছি।’
নূর চাইলেও কখনো এমন চিঠি লিখতে পারবে না। আজমাঈনের দেওয়া সকল চিঠি সে যত্ন করে রেখেছে, একেবারে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখার মতো। ঘড়িটাও সযত্নে তুলে রাখলো। বাথরুমে আজমাঈনের পাঞ্জাবি ঝুলছে, গতকাল বিয়েতে পরেছিল। সেগুলো ধুয়ে ছাদে মেলে দিয়ে আসলো।
বেলা গড়াতেই রাশেদ সাহেবের ফোন এলো। নূরকে জরুরি তলব করেছেন, নতুন একটা প্রজেক্ট এসেছে। সেখানের ডিজাইন গুলো দেখাতে হবে। তবে আজ যাওয়ার দরকার নেই। আগামীকাল গিয়ে দেখে আসবে। নূর তাড়াহুড়ো করে ম্যাকবুক খুলে বসলো। নিজের ডিজাইন বুকটা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ওটা শেষ করতে পারলে কাজ সহজ হয়ে যাবে।
কাজ শুরু করার আগেই ফোন বেজে উঠল। আজমাঈন শিকদার কল করেছে। তিন চার সেকেন্ড ফোন বাজার পর রিসিভ হলো। আজমাঈন আগেভাগেই সালাম দিলো,’আসসালামুয়ালাইকুম!’
বাকি কথার জবাব না দিলেও সালামের জবাব দেওয়া আবশ্যক। মৃদু গলায় নূর বলে,’ওয়ালাইকুম আসসালাম।’
‘যাক, অন্তত সালামের জবাব পেলাম। আমার সাথে তেমন কথা বলতে হবে না তোমার। আসলে আম্মু কথা বলতে চাইছে। তুমি কি কথা বলবে?’
আশ্চর্য হলো নূর, সে কি মুখের উপর বলবে যে কথা বলবে না! এর জন্য অনুমতি নেওয়ার কি দরকার। মুখে বললো,’হ্যাঁ।’
তাহমিনা ফোন হাতে পেয়েই এক প্রকার লাফিয়ে উঠলো। ফোন কানে ধরে উঠে চলে গেলেন। নূর সালাম দিতেই তাহমিনা বলেন,’ওয়ালাইকুম আসসালাম! ভালো আছো?’
‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি ভালো আছেন?’
‘আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো, গতকাল তোমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম। আমার ছেলেটা দিলো না। আজ কথা বলে ভালো লাগছে। একদিন এলে, মুখে কিছুই তুললে না। এবার তোমার বাবাকে নিয়ে এসে ঘুরে যাও, সবার সাথে দেখা হলে ভালো লাগবে।’
মায়ের এমন উদ্ভট কথায় চমকে উঠে আজমাঈন। এখন নূর আসবে কিভাবে? আয়োজন করে ওকে না আনলে আসবে কেন? কিন্তু মা তো তেমন কিছু ভেবে বলেনি। তাহমিনা নূরের সাথে এটা সেটা নিয়ে আলোচনা করছে। এরমধ্যে তানাজ এসে জুটেছে। সে নতুন ভাবিকে দেখেনি, কথাও বলে নি। মায়ের থেকে ফোন নিয়ে সে কিছুক্ষণ কথা বলে। আজমাঈনের ফোন নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। তারপর কি কথা বলেছে জানে না আজমাঈন। আশ্চর্য পরিবার ওর, কথা শেষ করে যে ফোনটা দিবে সে জ্ঞান কারো নেই। অগত্যা সোফায় বসে রয়েছে সে। আজমল শিকদার ফিরলো এক গাদা বাজার নিয়ে। নিশ্চয়ই বড় মেয়ে ধমকে পাঠিয়েছে। নাহলে শিকদার সাহেব একসাথে এত বাজার করবে, অসম্ভব! আজমাঈন টিটকারী কেটে বলে,’কি ব্যাপার? সূর্য বুঝি পশ্চিমে উঠেছে। নাহলে শিকদার সাহেব এত টাকা খরচ করে জানতেই পারতাম না।’
আজমল শিকদার রাগে গজগজ করে উঠলেন,’এত ভারি ব্যাগ বহন করছি কোথায় এসে ধরবে। তা না করে ভজন গাইছিস।’
কথাটা আমলে নিল না আজমাঈন। সোফায় পা তুলে বসলো। ছেলের এমন কাজ দেখে ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে ছুটলেন। ফ্রিজ থেকে পানি বের করে খেয়ে শ্বাস ফেলেন। বড় মেয়ে এসেই রান্নাঘরের সবকিছু চেক করেছে। বলেছে রোজ রোজ বাজার না করে একসাথে সপ্তাহের বাজার করতে। তাহলে সুবিধা হবে। নাহলে গার্মেন্টস সামলাবে নাকি নিত্যদিন বাজার করবে। কর্মীদের ঈদ বোনাস দিয়ে ছুটি দিয়েছেন। অফিস খুললে ছেলের বিয়ের মিষ্টি খাওয়ানো লাগবে। কতগুলো টাকা লাগবে হিসাব কষছেন গত রাত থেকে। ছেলে তো তার জমি গুলো খেয়ে বসে আছে। এখন হোটেলের কাজ কতদূর করেছে কে জানে।
ছেলের পাশে বসে বলেন,’হোটেল চালু করবি কবে? নাকি শুরু হওয়ার আগেই ডাউন হয়ে গেছে?’
‘তোমার মাথার তার ডাউন হবে কিন্তু আমার স্বপ্ন না। কিছু কাগজপত্র করা বাকি আর রিসেপশনের কাজ বাকি আছে।’
আজমল শিকদার মাথা নেড়ে বলেন,’দিনে কত টাকা আয় হবে তাহলে?’
‘তোমার কত হয়?’
আজমল শিকদার উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,’কথা ছোঁয়ানো যায়না। বেয়াদব, বাপের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, সেই আদব কায়দা মা শেখায়নি।’
এত কথা তাহমিনার কানে না গেলেও নিজেকে নিয়ে বলা কথা ঠিকই শুনতে পেলেন। ব্যস, শুরু হয়ে গেছ ঝগড়া। আজমাঈন ওখান থেকে সরে পড়লো।
পরদিন সকাল বেলা, নূর রেডি হচ্ছে। রাশেদ সাহেব অপেক্ষা করছেন। তার পরিচিত একজনের বাসায় যাবেন। একটা ফ্ল্যাটের ডিজাইন করতে হবে। মেয়ের জামাই কে গিফট দেওয়ার জন্য ফ্ল্যাট কিনেছেন ভদ্রলোক, একটা গাড়িও দিয়েছেন। এছাড়াও মেয়ের ঘরবাড়ি সাজিয়ে দিয়েছেন। টাকা পয়সা অনেক, অবশ্য জামাইয়ের কম কিছু নেই। বড়লোক জামাইকে খুশি করতে দামি জিনিসপত্র না দিলে কেমন দেখায়। এসব নিয়েই আলোচনা করছেন রাশেদ সাহেবের সাথে। নূর খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে। তার হঠাৎ করেই আজমাঈনের কথা মনে পড়লো। রাশেদ সাহেব চাইলেই আজমাঈনকে অনেক কিছু দিতে পারতেন। কিন্তু আজমাঈন কিছুই চায়নি, তার খুশি কেবল নূরের সাক্ষাৎ। তাও নূর ঠিকমতো দিলো না। না মন খুলে একটু কথা বললো। আজকালকার যুগে একজন আজমাঈন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, আর নূর তা সহজেই পেয়ে গেছে। ছেলেটা ওর জন্য অনেক ত্যাগ করছে। এসব ভাবনা নূরের মাথায় জেঁকে বসলো। সে ঠিকঠাক কাজ করতে পারলো না, ছেলেটা একদিনেই কেমন মাথা ধরে ফেলেছে।
রাতে রেহানা এলো নূরের ঘরে। নূর তখন এশার নামাজ শেষ করে উঠেছে, ম্যাকবুকে মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছে। মা’কে দেখে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। রেহানা বিছানায় বসে বলেন,’বসো। তোমার সাথে কিছু কথা আছে।’
নূর বসলো। রেহানা তার বক্তব্য রাখলেন,’সব কিছু পেরিয়ে তোমাকে বিয়ে দিয়েছেন তোমার বাবা। সামনের মাসে তোমার রেজিস্ট্রি হবে তারপর ও বাড়িতে নিয়ে যাবে শুনলাম।’
সিদ্ধান্তটা আজমাঈন এবং রাশেদ সাহেব মিলে নিয়েছেন। মূলত নূরকে সহজ করার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া। এ বিষয়ে নূর অবগত। রেহানা ফের বলতে লাগলেন,’দেখো মেয়েদের স্বামীর ঘরই আসল ঘর। সব মেয়েদের যেতে হয়। বাবার বাড়িতে তাদের হক সামান্য। তোমার ভাইয়ের কথা তো অজানা নয়, তোমরা দুই বোন চলে যাওয়ার পর সাইমনের ভরসায় আমাদের থাকতে হবে। হুট করে কিছু হয়ে গেলে ওরাই প্রথম দেখবে। তোমরা থাকবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এজন্য তোমার বাবার যা কিছু আছে তা তো সাইমনের প্রাপ্য। তবুও তোমার বাবা ব্যবসা তোমাকে দিয়েছেন। তখন কিছু বলিনি, বললেও তিনি শুনতেন না। এখন সবকিছু তোমার হাতে। ঢাকায় থেকে আসা যাওয়া করতে তোমার ই সমস্যা হবে। তাই আমি চাইছি ব্যবসা টা তোমরা দুই ভাইবোন মিলে সামলাও। ও এখানে থাকুক, তুমি মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করলে। এখন তোমার বাবার মাথা ঠান্ডা আছে, তুমি বুঝিয়ে বললে শুনবেন।’
নূর সবটাই শুনলো, রেহানা এই প্রথম কিছু চেয়েছে। নূর নিজেকে ধাতস্থ করলো। মনের মধ্যে সব কথা সাজিয়ে বললো,’এই প্রথম কিছু চাইলে আম্মু, কিন্তু আফসোস আমি দিতে পারলাম না।’
মেয়ে নাকচ করবে একথা স্বপ্নেও ভাবেনি রেহনা। তিনি নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলেন। নূর বললো,’যদি কোনোদিন মন থেকে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, তাহলে তোমার এই চাওয়া পূরণ করতাম বিশ্বাস করো। তাছাড়া ভাইয়ার জন্য আব্বু আমার চেয়েও বেশি কিছু করেছে, সে ধরে রাখতে পারেনি। ভাইয়া বিপদে পড়লে আমি অবশ্যই সাহায্য করব। কিন্তু ব্যবসা শেয়ারে করব না। এটা এখন আমার স্বপ্ন, এই স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। সবশেষে, আমি দুঃখিত।’
রেহানা কড়া গলায় বলেন,’তোমার স্বামী যদি না চায়? সে যদি তোমাকে বিজনেস করতে বাঁধা দেয়?’
‘সেটা আমাদের দুজনের ব্যাপার। আমি তার সাথেই এই ব্যাপারে আলোচনা করব।’
রেহানা হতাশ হলেন, তবে মেয়ের কথা পুরোপুরি ফেলে দেওয়া যায়না আবার ছেলেকেও সুখি দেখতে চান। তিনি আর কিছু না বলে রুম ত্যাগ করেন।
নূর আর এক মুহূর্তও দেরি করে না, সে আজমাঈন কে ফোন করে। আজমাঈন তখন ডিনার করছে সবার সাথে। ফোন পকেটে ছিলো, বেজে উঠতেই পকেট হাতড়ে ফোন বের করেই থ মেরে গেল। কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। আইশা ভাইকে ঠেলা দিয়ে বললো,’হা করে হাওয়া না গিলে ফোন ধরো।’
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৪
আজমাঈন প্লেট ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। আজমল শিকদার হায় হায় করে উঠলেন,’এ্যাই এ্যাই ভাত খেয়ে যা।’
আজমাঈন ঘাড় ফিরিয়ে বলে,’তোমার ভাত তুমি খাও, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম কল আসছে।’
আজমল শিকদার ফ্যালফ্যাল করে ছেলের চলে যাওয়া দেখলেন। কি বদমাইশ হয়েছে ছেলেটা। তিনি দিনে হাজারবার কল করলেও এমন কথা বলেনি। এখন বিয়ের একদিন যেতে না যেতেই এই অবস্থা।
আজমাঈন এঁটো হাতেই লনে আসলো। ফোন তখনও বাজছে। রিসিভ করতেই নূরের রিনরিনে কন্ঠস্বর ভেসে এলো। আজমাঈন সালামের জবাব দিলো। তারপর বললো,’রেহনুমা জান্নাত, নূর।’
এমন আদুরে গলার ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য হলো না নূরের। কথার খেই হারিয়ে ফেলল তৎক্ষণাৎ।
