Mad for you 2 part 21
তানিয়া খাতুন
আগের দিনের মতো সারাদিন কাজ খুঁজে নিরাশ হয়ে রাস্তায় হাঁটছিল ক্ৰিশ। চোখ দুটো সোজা রাস্তার দিকে থাকলেও তার মন ডুবে ছিল গভীর চিন্তায়।
দশ দিনের মধ্যে আজকের রাত পেরোলেই তিন দিন কেটে যাবে।
বাকি সাত দিনের মধ্যে সে আদৌ কোনো কাজ খুঁজে পাবে ?
তার ওপর আবার একটা থাকার মতো বাড়িও খুঁজতে হবে…
ক্ৰিশের গভীর ভাবনা ভাঙল হঠাৎ কর্কশ এক বাইকের হর্নের শব্দে।
বিরক্ত হয়ে সে পেছনে তাকাতেই দেখল, নীল তার ঠিক সামনে এসে বাইক থামিয়েছে।
ক্ৰিশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীল দৌড়ে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
ক্ৰিশ যেন এমন কিছুর জন্য একদমই প্রস্তুত ছিল না। ভীষণ বিরক্ত হয়ে সে নীলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো।
ঠিক তখনই নীলের মুখ থেকে একটি নাম বেরিয়ে এল—
— “ক্ৰুশ ভাইয়া…”
শব্দ দুটি যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল ক্ৰিশের হৃদয়ে।
তার সমস্ত শরীর মুহূর্তের মধ্যে স্থির হয়ে গেল।
হাতের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেল।
মনে হলো যেন সে এই পৃথিবীতেই নেই।
যেন থমকে দাঁড়াল।
চারপাশের সমস্ত শব্দ মিলিয়ে যেতে লাগল ধীরে ধীরে।
শুধু সেই দুটি শব্দই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তার কানে—
“ক্ৰুশ ভাইয়া…”
ক্ৰিশ নীলের কাঁধ ধরে তাকে নিজের সামনে দাঁড় করাল।
তার চোখে তখন অবিশ্বাস, বিস্ময় এবং এক অদ্ভুত আতঙ্কের ছাপ।
কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
— “কি বললি? আর একবার বল…”
নীলের চোখ-মুখ উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল। ফিসফিস করে সে বলে,
— “অনেক খুঁজেছি তোকে, ক্ৰুশ ভাইয়া… অনেক খুঁজেছি। কিন্তু তুই আমার সামনে থাকলেও আমি তোকে চিনতে পারিনি…”
ক্ৰিশ যেন ভাষা হারিয়ে ফেলল আর কোনো কথা বলতে পারল না।
তার মস্তিষ্ক তখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।
কিন্তু হৃদয় যেন অনেক আগেই সত্যিটা জেনে গেছে।
সে ধীরে ধীরে নীলের মুখের দিকে তাকাল।
চোখ…নাক…চোয়ালের গঠন…
কোথাও যেন পরিচিত কিছু আছে।
তবুও তার মন পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছিল না।
হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়ল তার।
অতীতের বহু পুরোনো একটি স্মৃতি।
শৈশবে নীলাদ্ৰের ডান হাতের শিরার কাছে বড় বড় কয়েকটি জড়ুল ছিল।
সেই চিহ্নগুলো খুবই বিরল ছিল।
ক্ৰিশ এক মুহূর্তও দেরি করল না।
তাড়াতাড়ি নীলের শার্টের হাতা গুটিয়ে দিল।
তার হাত কাঁপছিল।
চোখে ভাসছিল হাজারো আশঙ্কা।
যদি ভুল হয়?
যদি এই নীল নীলাদ্ৰ না হয় ?
তাহলে?
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
হাতের শিরার কাছেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই পরিচিত বড় বড় জড়ুল।
একটুও বদলায়নি।
ক্ৰিশের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
তার দৃষ্টি আর পরিষ্কার রইল না।
বুকের ভেতর জমে থাকা বছরের পর বছর ধরে চাপা কষ্ট, অপেক্ষা আর শূন্যতা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।
সে কোনো কথা না বলে নীলকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল।
এমনভাবে জড়িয়ে ধরল যেন এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে দিলে মানুষটা আবার হারিয়ে যাবে।
দুজনের বুকের ভেতর জমে থাকা অসংখ্য প্রশ্ন, কষ্ট, অপেক্ষা আর শূন্যতা একসঙ্গে ঝড় তুলতে লাগল।
ক্ৰিশের কাঁপা ঠোঁট থেকে শুধু একটি কথাই বেরিয়ে এল—
— “নীলাদ্ৰ… সত্যিই তুই?”
নীলও আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়েই দুই ভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
চারপাশের কোলাহল, মানুষের ভিড়, গাড়ির শব্দ—সবকিছু যেন তাদের কাছে হারিয়ে গেল।
কারণ বহু বছরের বিচ্ছেদের পর আজ ভাগ্য অবশেষে দুই ভাইকে আবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
কলেজ ক্যাম্পাসের এক কোণে, পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল রুহি।
তার দৃষ্টি স্থির হয়ে ছিল কলেজের প্রধান ফটকের দিকে।
মাঝে মাঝেই সে অকারণে সেদিকে তাকাচ্ছিল, যেন কোনো অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষায় আছে।
যেন হঠাৎ করেই পরিচিত একটা বাইক গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকবে, আর তার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অস্থিরতা এক মুহূর্তে মিলিয়ে যাবে।
কিন্তু প্রতিবারই তাকে হতাশ হতে হচ্ছিল।
পাশেই বসে ছিল সিমরান।
সে একনাগাড়ে কিছু একটা বলে যাচ্ছিল—কিন্তু রুহির কানে তার একটাও কথা ঢুকছিল না।
তার মাথার ভেতর কেবল একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল।
ক্ৰিশের বলা সেই দশ দিনের সময়সীমার মধ্যে আজ নবম দিন চলছে।
আর এই কয়েক দিনে একবারের জন্যও তার সঙ্গে দেখা হয়নি রুহির।
প্রতিদিন কলেজে এসে সে ক্ৰিশকে খুঁজেছে।
কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পায়নি।
প্রথম প্রথম ভেবেছিল হয়তো কোনো কাজে ব্যস্ত আছে।
কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, তার অস্থিরতা তত বেড়েছে।
তাঁদের বাড়ির সামনে ক্ৰিশের বাইকটাও নেই।
মনে হচ্ছিল মানুষটা যেন হঠাৎ করেই পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে গেছে।
রুহির বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে উঠল।
সে অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই সিমরানের কণ্ঠস্বর তার কানে এলো।
— “কিরে? কী ভাবছিস এত?”
রুহি চমকে উঠে।
নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলে,
— “হুম… হ্যাঁ… বল, শুনছি তো।”
সিমরান ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
— “মিথ্যা বলিস না। আমি এতক্ষণ ধরে কী বললাম, কিছু বলতে পারবি?”
রুহি অপ্রস্তুত হয়ে হালকা হেসে ফেলল।
তারপর কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ধীরে ধীরে বলে,
— “আচ্ছা শোন… তুই আমার একটা কাজ করে দিতে পারবি?”
সিমরান কৌতূহলী হয়ে বলে,
— “কী কাজ?”
রুহি একটু ইতস্তত করে তারপর নিচু গলায় বলে,
— “আমি একটু আগে কমন রুমে আমান ভাইয়াকে দেখেছি।
তুই কি একটু গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসতে পারবি, ক্ৰিশ.. মানে উনি কোথায় আছেন?”
কথাটা বলতে গিয়েও তার গলায় দ্বিধা স্পষ্ট ছিল।
মনে হচ্ছিল, নিজের অস্থিরতাটা কাউকে বুঝতে দিতে চাইছে না।
— “আসলে ওখানে অনেক ছেলে আছে। তুই তো জানিস, আমি ওভাবে…”
বাকিটা আর শেষ করতে পারল না।
সিমরান তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ করেই ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
সে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
— “বুঝেছি, বুঝেছি। আর কিছু বলতে হবে না।”
রুহি অবাক হয়ে তাকাল।
— “কী বুঝলি?”
— “তোর এখন জিজুর জন্য মন উথাল-পাথাল করছে। তাই না?”
রুহির গাল সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে উঠল।
— “সিমরান!”
— “আরে বাবা, লজ্জা পাচ্ছিস কেন? গত কয়দিন দিন ধরে তোকে দেখছি। কলেজে এসেই প্রথমে গেটের দিকে তাকাস, তারপর পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়াস। ভাবিস আমি কিছু বুঝি না?”
রুহি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
আসলে প্রতিবাদ করার মতো কোনো যুক্তিই তার কাছে ছিল না।
কারণ সিমরান যা বলছে, সবই সত্যি।
সে সত্যিই ক্ৰিশ কে খুঁজছে।
প্রতিদিন।
প্রতিটি মুহূর্তে।
সিমরান মুচকি হেসে তার কাঁধে হাত রাখল।
— “বসে থাক। আমি এখনই জেনে আসছি।”
কথাটা বলে সে কমন রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
রুহি তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার চোখ চলে গেল কলেজের মূল ফটকের দিকে।
বুকের ভেতর অজানা এক অস্থিরতা ক্রমশ বাড়তেই লাগল।
মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল—
“আপনি কোথায় আছেন, ক্ৰিশ? একবারও কি আমার কথা মনে পড়ছে না আপনার?”
তার হৃদয়ের গভীরে জন্ম নিল এক অদ্ভুত শূন্যতা, যার নাম হয়তো অপেক্ষা।
কমন রুমটা তখন ছাত্রদের কোলাহলে মুখর হয়ে আছে। কেউ ক্যারাম খেলছে, কেউ আড্ডায় ব্যস্ত, আবার কেউ মোবাইল ফোনে ডুবে আছে। পুরো ঘরজুড়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।
সবার মাঝখানে একটি চেয়ারে বসে ছিল আমান।
মাথা নিচু করে ফোনে কী যেন দেখছিল সে। চারপাশের কোনো কিছুতেই তার বিশেষ মনোযোগ ছিল না।
ঠিক সেই সময় কমন রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল সিমরান।
ভেতরে উঁকি দিয়েই সে মুখ কুঁচকে ফেলল।
এতগুলো ছেলের মাঝে দাঁড়িয়ে আমানকে ডাকতে তার ভীষণ অস্বস্তি লাগলো। সে একবার ভেতরে তাকায়, আবার পিছু হটার কথা ভাবে।
— “উফ! এখন ওনাকে ডাকব কীভাবে?” মনে মনে বিড়বিড় করল সে।
কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করার পর হঠাৎ তার চোখে পড়ল দরজার পাশে পড়ে থাকা ছোট্ট একটা ইটের টুকরো।
সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় এক বুদ্ধি এলো।
সে নিচু হয়ে টুকরোটা তুলে নিল।
তারপর লক্ষ্য স্থির করল আমানের দিকে।
— “একটু লাগলেই তো ঘুরে তাকাবে…”
পরের মুহূর্তেই সে ইটের টুকরোটা ছুড়ে মারল।
কিন্তু তার ধারণার চেয়ে নিশানা অনেক বেশি নিখুঁত হয়ে গেল।
টুকরোটা সোজা গিয়ে ঠাস করে আমানের কপালে লাগল।
কপাল চেপে ধরে বিরক্ত মুখে দরজার দিকে তাকায় আমান।
রাগে তার ভ্রু কুঁচকে গেছে।
আর তাকাতেই চোখে পড়ে সিমরানকে।
সিমরানও বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা একটু বেশি হয়ে গেছে।
ভয়ে ঢোক গিলে সে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
আমান চেয়ার ছেড়ে উঠে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে এল।
সিমরান কয়েক কদম যাওয়ার আগেই তার সামনে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়াল সে।
দু’হাত বুকের সামনে গুটিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
— “মারলে কেন?”
সিমরানের মুখ শুকিয়ে গেল।
— “আ… আসলে…”
— “আসলে কী?”
— “আমি তো ইচ্ছে করে মারিনি। আমি ক্ৰিশ ভাইয়ার খোঁজ করছিলাম…”
ক্ৰিশের নাম শুনে আমানের মুখের ভাব কিছুটা বদলে গেল।
— “ক্ৰিশের সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক?”
সিমরান তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।
— “না না, আমার না! আমার ফ্রেন্ড রুহি… সে জানতে চেয়েছে।”
— “ক্ৰিশের খোঁজ আমিও করার চেষ্টা করছি। ওর ফোনও বন্ধ। কোথায় আছে, এখনও জানতে পারিনি।”
সিমরানের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে গেল।
আমান আবার বলে,
— “এক কাজ করো, তোমার ফোন নম্বরটা দিয়ে যাও। ক্ৰিশের কোনো খবর পেলে তোমাদের জানিয়ে দেব।”
কথাটা শুনেই সিমরানের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সে হাত বাড়িয়ে বলে,
— “আপনার ফোনটা দিন।”
আমান পকেট থেকে ফোন বের করে দিল।
সিমরান দ্রুত নিজের নম্বর সেভ করে দিল।
তারপর ফোন ফেরত দিয়ে বলে,
— “খবর পেলেই জানাবেন কিন্তু। রুহি খুব চিন্তা করছে।”
কথাটা বলেই সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।
প্রায় দৌড়ে কমন রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সিমরান চলে যাওয়ার পর আমান কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল।
নতুন সেভ হওয়া নম্বরটার দিকে তাকিয়ে সে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “যাক আব্বু, তোমার জন্য অন্তত তোমার শালির নম্বরটা তো পেলাম!”
— “ইনশাআল্লাহ, সরাসরি বউ বানিয়েই ছাড়ব।”
রাতের খাবারের সময় পুরো পরিবার ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত হয়েছে।
টেবিলজুড়ে নানা রকম খাবার সাজানো, কিন্তু পরিবেশে সেই স্বাভাবিক উষ্ণতা নেই। যেন অদৃশ্য কোনো উত্তেজনা সবার মনে ছড়িয়ে আছে।
রুহির আম্মু প্রায় জোর করেই রুহিকে ধরে এনে চেয়ারে বসিয়েছেন।
গত কয়েকদিন ধরে মেয়েটা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে না। খাবার সামনে নিয়ে বসে থাকে, কিন্তু দু-চার লোকমার বেশি মুখে তুলতে পারে না।
মা হিসেবে তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন মেয়ের মনের অবস্থা।
রুহি কিছু বলুক বা না বলুক, তার চোখের ভাষা তিনি পড়তে পারেন।
কিন্তু বুঝলেও তার হাতে তো কোনো সমাধান নেই।
রুহি প্লেটের ভাত নিযে শুধু নাড়াচাড়া করছিল।
খাওয়ার প্রতি তার বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই।
পাশেই কুটুস নিজের জগতে মগ্ন হয়ে খেয়ে যাচ্ছে।
চারপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই।
হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এলো পরিচিত একটি বুলেট বাইকের শব্দ।
শব্দটা কানে আসতেই রুহির শরীর কেঁপে উঠল।
তার হাত থেমে গেল।
পরের মুহূর্তেই সে হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
সমীর সাহেব সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় বললেন,
— “কী হয়েছে? উঠে দাঁড়িয়েছ কেন? বসে খাও।”
রুহি নিজের কাজেই নিজে লজ্জা পেয়ে গেল।
সবাইয়ের দৃষ্টি তার ওপর।
মাথা নিচু করে আবার বসে পড়ল সে।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—
“না… উনি হবেন না। আমি শুধু শুধু ভাবছি…”
কিন্তু ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান দরজার দিকে তাকিয়ে সমীর সাহেবের হাত থেমে গেল।
তারপর একে একে সবার দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ক্ৰিশ।
পরিপাটি পোশাক, চোখে দৃঢ়তা, আর হাতে একটি ফাইল।
গত কয়েকদিনের ক্লান্তির চিহ্ন থাকলেও তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস আজ স্পষ্ট।
ক্ৰিশ ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
প্রথমে সে রুহির আম্মুর সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে সালাম করল।
— “আসসালামু আলাইকুম, আম্মু।”
রুহির আম্মু কিছুটা বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর সালামের জবাব দিলেন।
ক্ৰিশ কোনো ভূমিকা না করে হাতে থাকা ফাইলটি ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখল।
তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— “আপনার দেওয়া শর্ত আমি পূরণ করেছি। এখানে তার সমস্ত প্রমাণ আছে।”
সে ফাইলের ওপর হাত রেখে আবার বলে,
— “কাজের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। থাকার জন্য বাড়ির ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। সব কাগজপত্র এই ফাইলের ভেতরে আছে।”
— “তাই আমি আমার স্ত্রীকে নিতে এসেছি।”
কথাটা বলেই সে রুহির দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টি যেন কয়েক দিনের সমস্ত অপেক্ষা, অভিমান আর আকুলতা একসঙ্গে প্রকাশ করে দিল।
রুহির বুক কেঁপে উঠল।
সে অবচেতনভাবেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
ধীর পায়ে হেঁটে ক্ৰিশের পাশে এসে দাঁড়াল।
মুহূর্তের মধ্যেই যেন তার সমস্ত ভয় দূর হয়ে গেল।
ক্ৰিশ পাশে আছে, এটাই যথেষ্ট।
সমীর সাহেব দৃশ্যটা দেখলেন।
তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন,
— “আমি আমার মেয়েকে নিয়ে যেতে দেব না।”
— “ও এখানেই থাকবে।”
রুহির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
ক্ৰিশের চোখও সরু হয়ে এলো।
সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।
যেন নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।
কিন্তু তার ধৈর্যের বাঁধ এবার ভাঙতে শুরু করেছে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— “বউয়ের বাপ, আমার মাথা বিগরাস না।”
— “তুই যেই স্কুলে পড়েছিস, আমি সেই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলাম।”
কুটুসের হাতের চামচ মাঝ আকাশে থেমে গেল।
রুহির আম্মু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন।
আর রুহি বুঝতে পারছে, ক্ৰিশের রাগ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
ক্ৰিশ আঙুল তুলে বলে,
— “তাই আমার সামনে কোনো চালাকি করার চেষ্টা করিস না।”
— “সত্যি কথা বলছি, সব খুলে বলব আমি।”
তার ঠোঁটের কোণে হালকা বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটে উঠল।
— “আমি ক্ৰিশ খান।”
— “আর আমি খোলাখুলি কথা বলতে খুব ভালো পারি।”
সমীর সাহেব যেনো কিছু টা ভয় পেলেন , তাঁর মুখ দেখে তা বোঝা গেল……….
ঠিক সেই মুহূর্তেই—
একটা বেসুরো, কষ্ট করে বাজানো সিটির শব্দ ভেসে এলো।
সবাই চমকে শব্দের উৎসের দিকে তাকাল।
কুটুস দুই আঙুল মুখে ঢুকিয়ে প্রাণপণে সিটি বাজানোর চেষ্টা করছে।
সিটি ঠিকমতো না বাজলেও তার উচ্ছ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই।
চোখ বড় বড় করে ক্ৰিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
— “জিওওও জিজু! কী দিলে!”
বলে সে নিজেই হাততালি দিতে শুরু করল।
— “এই তো চাই! একদম সিনেমার হিরোর মতো এন্ট্রি!”
রুহির লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে হলো।
রুহির আম্মু ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছেন।
আর ক্ৰিশ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে কুটুসের দিকে তাকিয়ে আছে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই কুটুসের হাসি উধাও হয়ে গেল।
কারণ সমীর সাহেব তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
সেই দৃষ্টি দেখে কুটুসের বুক ধক করে উঠল।
কুটুস এক ঢোক গিলে ফেলল।
তারপর মুহূর্তের মধ্যে মাথা নিচু করে প্লেটের দিকে তাকাল।
যেন জীবনে কোনো সিটি বাজায়নি।
যেন এইমাত্র যা ঘটেছে তার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।
ভাত নাড়তে নাড়তে বিড়বিড় করে বলে,
— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ… মানুষ একটু খেতেও পারে না শান্তিতে…”
কিন্তু সমীর সাহেবের মুখের কঠোরতা একটুও কমল না।
তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— “কুটুস…”
— “জি আব্বু?”
— “আর একটা শব্দ করলে তোমার খাবার বন্ধ করে দেব।”
কুটুস সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল।
— “না আব্বু! আমি তো কিছুই বলিনি। আমি তো ভাত খাচ্ছি।”
বলে সে এমন ভাব করতে লাগল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভদ্র ও নিরীহ ছেলেটি সে-ই।
কিন্তু টেবিলের নিচে লুকিয়ে লুকিয়ে সে ক্ৰিশের দিকে বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল।
যার অর্থ একটাই—
“জিজু, আপনি চালিয়ে যান। আমি আপনার পক্ষেই আছি!”
ক্ৰিশ আর একটি কথাও বলল না।
যা বলার, সে ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছে।
নিজের প্রতিশ্রুতি সে রেখেছে। কাজের ব্যবস্থা করেছে, থাকার জায়গার ব্যবস্থা করেছে, আর সেই সবকিছুর প্রমাণও সবার সামনে তুলে ধরেছে।
এখন আর তর্ক করার কোনো ইচ্ছে তার নেই।
সে শান্ত মুখে রুহির দিকে তাকাল।
এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখে চোখ পড়ল।
সেই দৃষ্টিতেই যেন হাজারো না-বলা কথা বিনিময় হয়ে গেল।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল।
রুহি একবার তার আব্বুর দিকে তাকাল, তারপর আম্মুর দিকে।
মায়ের চোখ ভিজে উঠেছে।
Mad for you 2 part 20
তিনি কিছু বললেন না, শুধু মৃদু মাথা নাড়লেন।
সেই নীরব সম্মতি পেয়েই রুহি কাঁপা হাতে ক্ৰিশের হাত ধরল।
মুহূর্তের মধ্যেই ক্ৰিশ তার আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল জড়িয়ে নিল।
তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
