Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৭

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৭

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৭
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

বাড়ির পুরো পরিবেশ এখন থমথমে হয়ে আছে। পাত্রপক্ষ ফিরে গিয়েছে অপমানিত হয়েই। তবে তারা কোনো অভিযোগ করেননি কিংবা কোনো সিনক্রিয়েট করেননি। শুধু চলে যাওয়ার পূর্বে ছেলের বাবা বলেছেন,
“ঘরেই যদি ছেলে-মেয়েদের সম্পর্ক থাকে তাহলে বাহিরে আর পাত্র খোঁজার কী দরকার ভাই? শুধু শুধু আমাদের ডেকে এনে অপমান করলেন।”

চাচ্চু দেখলাম এ কথায় ভীষণ অপমানবোধ করেছিলেন এবং অনেক আকুতি-মিনতি করেই তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।
পাত্রপক্ষরা চলে যাওয়ার পরও এই বাড়ির মানুষজন ছাড়া ছোটো চাচ্চু ,ছোটো চাচিমনি আর সিনথিয়া আপুও আছে। আমি কারো দিকেই মুখ তুলে তাকাতে পারছি না। কিছু না করেও নিজেকে কেন এরকম অপরাধী মনে হচ্ছে আমি তাও বুঝতে পারছি না।
বাড়ির সবাই এত চুপচাপ যে, আমার আরো বেশি ভয় লাগছিল। বাড়ির সবাই কি এখন আমাকেই ভুল বুঝবে? আমি যেই ভয়টা পাচ্ছিলাম, তার অনেকখানি বোধ হয় সত্যি হওয়ার পথে। ছোটো চাচ্চু রাহাত ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোর যদি প্রিয়তাকে আগে থেকেই পছন্দ ছিল তাহলে আমাদের আগে বললি না কেন? তাদের সামনে এই হাঙ্গামাটা করার কী দরকার ছিল?”
এবার দেখলাম বড়ো চাচ্চুও বললেন,
“তোকে আমি আগেই বারবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, কাউকে পছন্দ করিস কিনা। তখন তো অস্বীকার করেছিস। তাহলে আজ কেন আমাদের মান-সম্মানটা এভাবে নষ্ট করলি?”
রাহাত ভাই বেশ শান্ত কণ্ঠেই জবাব দিলেন,
“তুমি তখন আমার বিয়ে নিয়ে কথা বলছিলে। প্রিয়র বিয়ে নিয়ে নয়। আমার মনে হয়েছিল, প্রিয় এখনো অনেক ছোটো। ও অনার্সে উঠলে তখন আমি বাসায় বিয়ের কথা বলব।”
“কতদিনের সম্পর্ক তোদের মধ্যে?” জিজ্ঞেস করলেন চাচিমনি।
রাহাত ভাই বললেন,
“আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি প্রিয় জানতোও না যে, আমি ওকে পছন্দ করি।”
“আমরাও তো এতদিন এটাই জানতাম। কখনো তো দেখিনি তোকে ওর সাথে ভালো ব্যবহার করতে, ভালো করে দুটো কথা বলতে। সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এসেছিস। তাহলে এখন তোর হঠাৎ কী হলো? ওসব কি তাহলে অভিনয় ছিল?”

রাহাত ভাই দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, অভিনয় ছিল। আমি প্রিয়কে আগে থেকেই পছন্দ করি, ভালোবাসি। কিন্তু ওর বয়স কম। এই আবেগের বশে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুল করে। আমি চাইনি, প্রিয়ও একই ভুল করুক। আমার মনে হতো, যদি কখনো ও আমার ওপর ফল করে ,প্রেমে পড়ে তাহলে ওর ক্যারিয়ার নষ্ট হবে। ও ঠিকঠাকমতো পড়াশোনা করতে পারবে না। নিজের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে না, যেটা ওর জন্য খুবই প্রয়োজন। ওর দুকূলে নিজের আপন বলতে কেউ নেই। ওর পায়ের নিচের মাটিটা শক্ত করা খুব প্রয়োজন ছিল। তাই আমি সবসময় ওর প্রতি কঠোর ছিলাম। আর এখন তো তোমরা এমনভাবে দুজনের পেছনে পড়ে গেলে যে, সত্যিটা সামনে না এনে আর পারলাম না।”
চাচিমনি বসা থেকে উঠে গেলেন। বললেন,

“বেশ ভালো। ভালো লাগল। তোদের জন্য শুভকামনা।”
একে একে সবাই ড্রয়িংরুম থেকে চলে গেল। কেবল আমি পাথরের মতো বসে আছি। সামনে রাহাত ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“কাঁদবে না। এখানে কাঁদার মতো কিছু হয়নি।”
আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললাম,
“আপনি কেন এমন করলেন?”
“কী করেছি? কিছুই তো করিনি।”
“আপনার জন্য এখন সবাই আমাকে ভুল বুঝতেছে। এমনিতেও তো আমার আপন কেউ নেই। যারা ছিল তাদেরও আপনি আমার থেকে কেড়ে নিতে চাচ্ছেন।”
রাহাত ভাই ফ্লোরে আমার পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসল। আমার কোলের ওপর হাত রেখে আমার হাত ধরে বলল,

“আমি কি তোমার আপন নই?”
আমি কান্নারত কণ্ঠেই রাগ মিশিয়ে বললাম,
“না। যেই মানুষ আমার ক্ষতি চায় সে আমার আপন কেউ হতে পারে না।”
“আমি তোমার ক্ষতি কেন চাইব প্রিয়? বাড়ির মানুষজন হয়তো কিছুদিন রাগ করে থাকবে আমাদের ওপর। তারপর দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে আবার আগের মতো। তুমি শুধু একটু শান্ত হও। আমার ওপর ভরসা রাখো। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
আমি রাহাত ভাইয়ের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,
“কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবাসি না।”
আর মুহূর্ত সেখানে না থেকে আমি রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দিয়েছি। সে অনেকবার পিছু ডেকেছে, দরজায় নক করেছে। রেসপন্স না পেয়ে একসময় নিজেই ক্ষান্ত হয়ে গেছে।

পরেরদিন সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারলাম, কোনো কিছুই আর আগের মতো নেই। হৃদি ছাড়া কেউই আমার সাথে কথা বলছে না। চাচ্চু একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে নাস্তা খাচ্ছেন। চাচিমনি মুখ থমথমে করে রেখেছেন। চুপচাপ আমাকে নাস্তার প্লেট এগিয়ে দিলেন। রাহাত ভাই বিষয়টা খেয়াল করে বললেন,
“তোমরা এমন কেন করছ?”
কেউ কোনো জবাব দিল না। রাহাত ভাই এবার দ্বিগুণ রাগ নিয়ে বলল,
“কথা কেন বলছ না? এমন কী অপরাধ করে ফেলেছি আমরা? আর কোনো অপরাধ যদি করেও থাকি, তাহলে সেটা আমি করেছি। তোমরা প্রিয়র সাথে কেন কথা বলছ না?”
চাচিমনি তখন বললেন,

“তুই কী করছিস না করছিস সেসব বিষয়ে কি আমরা কেউ কোনো কথা বলেছি? বলিনি তো। তাহলে আমরা কার সাথে কথা বলব না বলব সেটাও আমাদের ব্যাপার। তুই বলার কে?”
রাহাত ভাই সঙ্গে সঙ্গে একটা গ্লাস ফ্লোরে ছুঁড়ে মারলেন রাগে। আমি আর হৃদি ভয়ে কেঁপে উঠলেও চাচ্চু আর চাচিমনি একদম নির্বিকার রইলেন। যেন কিছুই হয়নি। রাহাত ভাই উঠে আমার হাত ধরে বললেন,
“চলো। খেতে হবে না এখানে।”
আমি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললাম,
“আমি এখানেই চাচ্চু, চাচিমনির সাথে খাব।”
“তুমি দেখতে পাচ্ছ না তারা তোমার উপস্থিতি পছন্দ করছে না?”
“আমি তো করছি।”
তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
“অপমান সইতে সইতে গায়ে গণ্ডারের চামড়া হয়ে গেছে না? চলো বলছি!”
তিনি আমাকে এক প্রকার টেনে-হিঁচড়েই নিয়ে গেলেন। গাড়িতে বসেও আমি কাঁদছিলাম। সত্যি বলতে চাচ্চু আর চাচিমনির এরকম অপরিচিত ব্যবহার আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। খুব কষ্ট হচ্ছিল। এতদিন যাদের আদর, ভালোবাসা পেয়ে এসেছি এখন কী করে তাদের দেওয়া কষ্ট মেনে নেব?
রাহাত ভাই গাড়িতে একটা কথাও বললেন না। চুপচাপ ড্রাইভ করে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামালেন। ভেতরে গিয়ে নিজের মতো খাবার অর্ডার দিলেন। কারণ তিনি হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন, আমি কী খেতে চাই জিজ্ঞেস করে কোনো লাভ নেই।
তিনি টিস্যু এগিয়ে দিলেন চোখ মোছার জন্য। আমি টিস্যু নিলাম না। এরপর তিনি নিজেই চোখ মুছিয়ে দিলেন আর বললেন,

“সরি।”
ভেজা দুচোখ মেলে আমি তাকালাম তার দিকে। তিনি বললেন,
“আমার জন্য এখন তোমাকে এত কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। আমি সব ঠিক করে দেবো।”
আমি জবাব দেইনি তখন কোনো। জানিনা এরপর আর কী হবে বা আদৌ কিছু ঠিক হবে কিনা। এভাবে গত চারটা দিন কেটে গেলেও বাড়ির পরিবেশ স্বাভাবিক হয়নি। হৃদি ছাড়া কেউ আমার সাথে কথা বলে না। এদিকে রাহাত ভাই কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু আমি তার সাথে কথা বলি না। জীবনটা হঠাৎ-ই যেন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। আমার এখন কলেজে যেতেও ভালো লাগে না। কারো সাথে মিশতেও ভালো লাগে না। বাড়িতে থাকলেও স্বস্তি পাই না। পরিচিত মানুষদের অপরিচিত রূপ কি মেনে নেওয়া যায়? নিজেকে ব্যস্ত রাখতেই মূলত কলেজে যাই, ক্লাস করি। তবে বেশিরভাগ সময়ই আমার সময় কাটে উদাস হয়ে। বন্ধুদের এখনো এসব ঘটনার কিছুই বলিনি। কারণ দিনশেষে ওরা আমার ফ্রেন্ড। আমার পক্ষই নেবে। আমার পক্ষ নিতে গিয়ে ওরা যদি চাচ্চু আর চাচিমনিকে নিয়ে কোনো কটু কথা বলে তাহলে সেটা আমি সহ্য করতে পারব না। মূলত এসব কথা ভেবেই আমি সমস্ত কিছু ওদের কাছ থেকে চেপে গেছি।
আজ বাইরে খুব বৃষ্টি। সকাল থেকে টিপটিপ করে পড়লেও এখন বেশ মুষলধারেই বৃষ্টি হচ্ছে। ওদের বাস আগে চলে এসেছে বলে ওরা বাসে উঠে গেছে। আমি রিকশার জন্য ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টি হলে যানবাহনের সংকট থাকবেই থাকবে। জীবন ছাতা নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,

“আজ অন্তত আর বৃষ্টিতে ভিজো না। জ্বর চলে আসবে।”
আমি মলিন হাসলাম। জীবন বলল,
“আসছি।”
“হেঁটেই যাবে নাকি?”
“হ্যাঁ, আজ মনে হলো একটু বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় হেঁটে দেখি কেমন লাগে!”
“আমিও হাঁটি তোমার সাথে?”
জীবন এমন একটা রিয়াকশন দিল যে আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। অবান্তর কিছু বলে ফেললাম নাকি? আসলে মনটা এত বিষন্ন হয়ে আছে যে কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তখন জীবনের ইচ্ছেটা শুনে মনে হলো, বৃষ্টিতে হাঁটলে বোধ হয় ভালো লাগবে। জীবন বিস্মিত হয়ে বলল,
“শিওর?”
“হ্যাঁ, যদি তোমার কোনো সমস্যা না থাকে।”
“না, না! আমার কেন সমস্যা থাকবে? বরং আমার আরো ভালো হলো। বৃষ্টিতে হাঁটার একটা সঙ্গী পেলাম।”
আমি এবারও প্রত্যুত্তরে ম্লান হাসলাম। জীবনও হেসে বলল,
“চলো তাহলে হাঁটি?”
“হুম।”

দুজনে পাশাপাশি হাঁটছি। পিচঢালা পরিষ্কার পথ। কোথাও বা ভাঙা রাস্তায় একটুখানি কাদাপানি। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ। সব মিলিয়ে মন্দ লাগছিল না। কিন্তু তবুও কেন জানি আমি স্বস্তি পাচ্ছিলাম না কিছুতেই। মনের অশান্তি ভাবটা দূর হচ্ছিল না।
“তুমি কি কিছু নিয়ে চিন্তিত?”
জীবনের প্রশ্ন শুনলেও বুঝিনি অন্যমনস্ক ছিলাম বিধায়। বললাম,
“কী?”
“কিছুদিন ধরেই তোমাকে খুব চিন্তিত আর উদাস লাগছে। এখনো লাগছে। আগের মতো প্রাণোচ্ছল ভাবটা আর নেই তোমার মাঝে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো?”
আমি এক বুক হাহাকার নিয়ে বললাম,
“এতিমদের কখনো সব ঠিক থাকে না, জীবন। এক সময় না এক সময় সব কিছু ঠিকই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।”
“কী হয়েছে প্রিয়তা? এত কেন ভেঙে পড়েছ? তুমি চাইলে আমার সাথে সবকিছু শেয়ার করতে পারো। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। আর কিছু না হই, অন্তত আমরা বন্ধু তো হতেই পারি?”

“নতুন করে বন্ধু হওয়ার কিছু নেই। তুমি আমার বন্ধুই। তবে আমার ভেতরের ঝড়গুলো কাউকে বলার মতো নয়। আর বলেও লাভ নেই। কারণ এর সলিউশনও তুমি দিতে পারবে না।”
“অন্তত তোমার মন তো হালকা হবে।”
“মাঝে মাঝে ভারী মন বয়ে বেড়ানোও মন্দ না। নিজের ধৈর্য সম্পর্কে ধারণা করা যায়।”
“তুমি বলতে না চাইলে আমি কিছুতেই জোর করব না। তবে দোয়া করি, তোমার মনের সকল অশান্তি দূর হয়ে যাক। আল্লাহ্ তোমার সহায় হোক।”
জীবনের বাসা আমার বাসার আগে হলেও, আজ আমাকে ও আমার বাসা পর্যন্তই এগিয়ে দিয়ে গিয়েছে। ওর বাসার সামনে থেকে অবশ্য আমরা রিকশা নিয়েছি। কারণ এতদূর আর হাঁটতে পারছিলাম না।
বাড়িতে ফিরে আমি গোসল করলাম আগে। মোটামুটি বৃষ্টির পানিতে ভালোই ভিজেছি বলে ঘুম ঘুমও পাচ্ছিল। চোখদুটোকে আর কষ্ট দেইনি। ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিয়েছি।

ঘুম ভেঙেছে মাগরিবের নামাজের আগেই। আমি উঠেছি তার মিনিট দশেক পরই হয়তো আজান দিয়েছে। নামাজ পড়ার মন বলল, চাচিমনির সাথে আমার সরাসরি কথা বলা উচিত। আমি সোজা চাচিমনির রুমে গেলাম। দেখি চাচিমনিও মাত্র নামাজ পড়ে উঠেছেন। আমাকে একবার দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। জায়নামাজ রাখতে রাখতে চাচিমনি গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কিছু বলবি?”
আমি এবার নিজেকে ভেঙেচুরে চাচিমনির কাছে গিয়ে পা জড়িয়ে ধরে বললাম,
“এভাবে কথা না বলে আমাকে আর শাস্তি দিও না চাচিমনি! আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার নিজের মা থেকেও নেই। বুঝ হওয়ার পর থেকে মা হিসেবে আমি তোমাকেই জেনে এসেছি। তোমার আদরে, ভালোবাসায়, যত্নে বড়ো হয়েছি। এখন তোমার অবহেলা ,মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আমি সহ্য করতে পারছি না চাচিমনি। আমি ভুল করলে, অন্যায় করলে আমাকে বকো, মা’রো, কা’টো তবুও এভাবে দূরে সরিয়ে রেখো না। তোমার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত কোরো না। তুমি যা বলবে আমি তা-ই শুনব। যা করতে বলবে তা-ই করব।”

“এই বাড়ি থেকে চলে যা।”
আমি থমকে গেলাম মুহূর্তেই। মনে হলো ভুল কিছু শুনেছি। কান্নাভেজা চোখে আমি মাথা তুলে তাকালাম চাচিমনির দিকে। চাচিমনি আমার দুই বাহু ধরে আমাকে উঠিয়ে দাঁড় করালেন। শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“তোকে আমি আমার মেয়ে হিসেবে মেনে নিতে পারব প্রিয়তা ,কিন্তু ছেলের বউ হিসেবে না। তুই বাসায় থাকলে রাহাতের সঙ্গে তোর সখ্যতা বাড়বে। রাহাতের চোখের বাইরে চলে যা। তাহলে ধীরে ধীরে ওর মাথা থেকেও তুই বেরিয়ে যাবি।”
“আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেই তুমি খুশি?”
“হ্যাঁ, তবে তুই চিন্তা করিস না। তোকে বানের জলে ভাসিয়ে দেবো এটাও ভাবিস না। কলেজের কাছেই আশেপাশে কোনো হোস্টেলে কিংবা মেয়েদের মেসে তোকে তোর চাচ্চু উঠিয়ে দেবে। মাসে মাসে সব খরচ তুই পেয়ে যাবি। প্রতি সপ্তাহে আমি আর তোর চাচ্চু তোর সাথে দেখা করতে যাব। কিন্তু তুই এই বাসায় আর আসবি না।”
আমার মনে হলো এই কয়েক সেকেন্ডই আমি পাথর হয়ে গেছি। হঠাৎ কান্নাও বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো অনুভূতিই টের পাচ্ছি না। গালে লেপ্টে থাকা চোখের পানিটুকু মুছে বললাম,
“ঠিক আছে। চাচ্চুকে বলো সব ব্যবস্থা করতে। তোমরা খুশি হলেই আমি ভালো থাকব।”
চাচিমনি আর কিছু বললেন না। আমি টলতে টলতে নিজের রুমে চলে এলাম। চুপচাপ কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইলাম। রাহাত ভাই বাসায় এলেন তখন। সোজা আমার ঘরেই বোধ হয় এসেছেন। দরজা খোলাই ছিল। তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে আদরমাখা কণ্ঠে নাম ধরে ডাকলেন,

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৬

“প্রিয়!”
আমি টলমলে দৃষ্টি মেলে মাথা তুলে তাকালাম। রাহাত ভাইয়ের পরনে সাদা শার্ট। বৃষ্টিতে ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। মাথার চুল থেকেও টপটপ করে পানি পড়ছে। বৃষ্টিতে ভিজেছেন কেন তিনি? পরক্ষণে আমার চোখ গেল তার হাতের দিকে। তিনি ভেজা শরীরে রুমে ঢুকে ফুলের তোড়াটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“আষাঢ়ের প্রথম দোলনচাঁপা আমার প্রিয়র জন্য।”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here