Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার শেষ পর্ব

অপরাহ্নে উপসংহার শেষ পর্ব

অপরাহ্নে উপসংহার শেষ পর্ব
তোনিমা খান

সাতশত ত্রিশ দিনের বিবর্তনে ধরণীতে ঘুঙুরের রিনিঝিনি শব্দের ছদ্মবেশে প্রেমের আনাগানো। সমীরণে রজনীগন্ধার মিষ্টি সুবাস ছেয়ে আছে। গাড়ির দরজা খুলতেই তানশান চোখ বন্ধ করে নিলো। লম্বা শ্বাস টেনে নাসারন্ধ্রে টেনে নিলো রজনীগন্ধার মিষ্টি সুবাস। ফিসফিসিয়ে বলল,
-ইটস স্মেল লাইক ইউ, সুনেহরা।
বুকে ছোট্ট একটা থাপ্পড় পড়তেই তানশান চোখ খুলে তাকায়। কোলে থাকা তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটি ইঁদুরের ন্যায় ছোট্ট ছোট্ট দাঁত বের করে হাসল। আধো স্বরে বলল,
-ভাউচান।
ঠোঁটের উপরিভাগে কালচে হালকা খোঁচা খোঁচা গোপ নিয়ে তানশান স্মিত হাসল। মুখ নামিয়ে ছোট্ট কপাল বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

-ইটস ভাইজান।
-ভাউচান।
জেদি মেয়েটি নিজস্বতায় অটল রইল। তানশান দ্বিরুক্তি করল না। পাশ ফিরে ড্রাইভারের কোলে থাকা ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-এসো, ভাইজান।
তিন বছরের ছোট্ট তাশফিন জুসের স্ট্র থেকে মুখ বের করে ভাইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ল। ড্রাইভার বলল,
-তানশান বাবা, একা দু’জনরে রাখতে পারবা?
তানশান একহাতে ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
-বিগত তিন বছর যাবৎ এমন অজস্র দিন আমি একাই ওদের সামলেছি, আঙ্কেল। চিন্তা করবেন না।
তাশফিন হাঁটতে পছন্দ করে। তাই তানশান তার হাত ধরে দাঁড় কারলো। কিন্তু তাথৈ ভাইয়ের শার্টের কলার চেপে ধরে ঠাটিয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে আছে। যার মানে সে নামবে না। হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পরিহিত বোনের পিঠে হাত রেখে তানশান আশ্বস্ত করে বলল,

-তোমায় নিচে নামাচ্ছি না আলসে মেয়ে। রিল্যাক্স!
বোনকে কোলে আর ভাইকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তানশান ধীর কদমে হাঁটতে হাঁটতে খুলনা ইউনিভার্সিটির কাঙ্খিত প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালো। যেখানে ঘুঙুরের রিনিঝিনি শব্দে ধরণী অদ্ভুত ছন্দে নৃত্যরত। একদল লাল শাড়ি পরিহিত মেয়ে তাদের ডান্স টিচারের মুদ্রা অনুসরণ করে সময়ে অসময়ে লতার ন্যায় বেঁকিয়ে যাচ্ছে। তবে তানশানের দৃষ্টি ডান্স টিচারের লাবণ্যময় মুখপানে। চোখেমুখে বিমুগ্ধতা।
দীর্ঘক্ষণ প্রাকটিস শেষে ডান্স টিচারটি ছুটে গিয়ে পাশের সিমেন্টের উপর বসল। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের পানি পান করতে লাগল। তানশান ভাই-বোনকে নিয়ে ঠিক ডান্স টিচারের পাশে গিয়ে বসল। ভাইকে ছেড়ে দিলো। তাশফিন মাঠে থাকা ঘাসের ভেতর ফুটে থাকা ভৃঙ্গরাজ ফুলের দিকে ঝুঁকে গেল।
ভাইকে দেখতে দেখতে তানশান গলা খাঁকারি দিলো। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘর্মাক্ত নারীটির পানে চেয়ে বলল,

-কেমন আছো?
তবে নারীটি কোনোরূপ বাক্যব্যয় করল না বরং পানি খাওয়াতেই মনোযোগ দিলো। তানশান বলল,
-আজ সাতান্ন দিন আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। প্রেক্ষিতে একটা সিঙ্গেল ওয়ার্ড তো শুনতেই পারি, তাই না?
এবারেও নীরবতা। তানশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-তিন বছর আগে আমার করা আচরণের জন্য আমি দুঃখিত, সুনেহরা। কিন্তু আমি মন থেকে লজ্জিত নই ওই কাজের জন্য। সেদিন আমার ব্যবহারের কারণে তোমার ইগো হার্ট হয়েছিল। যার কারণে তুমি পড়াশুনায় মনোযোগী হয়েছিলে। আর তাই তোমার এসএসসি, এইচএসসি তে জিপিএ ফাইভ ছিল। এমনকি তুমি এখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। আ’ম রিয়্যালি প্রাউড অফ ইউ। আমি ওই বয়সে কোনো ভুল করে নিজের এবং তোমার উভয়ের ভবিষ্যত নষ্ট করতে চাইনি। তাই ওটা ইচ্ছাকৃত ছিল। তবে সেই কাজে ভালো লুকিয়ে থাকলেও, খারাপ ও ছিল। আর সেটা হলো তোমায় হার্ট করা। যার জন্য দুঃখিত!
এতবড় একটা কৈফিয়ত শোনার পরেও পাশের নারীটির কোনো সাড়াশব্দ পেল না তানশান। সে এবার গম্ভীর মুখে সোজাসাপ্টা বলল,

– আমি তোমার সাথে সব ঝামেলা ঠিক করতে চাই, সুনেহরা। তখন তোমায় প্রশ্রয় দেয়া আমার কাছে অনুচিত মনে হয়েছে কিন্তু এখন! আমার মনে হয় আমি অনুভূতির ভার নেয়ার জন্য প্রস্তুত। তুমি কী চাও আমার সাথে বাকি জীবনটা পার করতে? যদি হ্যাঁ হয় তবে বলো।
সুনেহরা এবার পানি ছেড়ে ব্যাগ থেকে একটা মাফিন কেক হাতে নিলো। হাঁক ছেড়ে বলল,
-তুলি, তিতলি কেক খাবে?
শাড়ি পরিহিত বারো তেরো বছরের তুলি তিতলি মাথা নেড়ে বলল,
-খাবো।
-এখানে এসো।
বলেই সুনেহরা ব্যাগ থেকে পনেরোটার মতো কেক বের করে তুলি তিতলির হাতে দিয়ে বলল,
-সবাইকে দাও।
তাশফিন ভীষণ কৌতুহলী হলো সুনেহরাকে কেক দিতে দেখে। সেও ছোট ছোট কদমে এগিয়ে গিয়ে সুনেহরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। সুনেহরা আড়চোখে তাকালো আড়াই ফুটের বাচ্চাটির দেখে।
থমথমে মুখে বলল,
-কী?
তাশফিন শুধু হাত বাড়িয়েই খান্ত! আর কিছু বলছে না। সুনহেরা এবার মৃদু তিরস্কারের সাথে বলল,
-আলের গরু আগেরটা যেদিকে যায় পেছনেরটাও সেদিকে যায়। মুখ নেই? কথা বলতে পারো না? কী চাই, মুখে বলো।
তানশান ভ্রু কুঁচকে নিলো সুনেহরার কথায়। আলের গরু আগেরটা বলতে যে তাকে বুজিয়েছে আর পেছনেরটা বলতে তার ভাইকে বুঝিয়েছে তা বেশ বুঝল। সে থমথমে মুখে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল,

-হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট, ভাইজান?
তাশফিন ভাইয়ের পানে চেয়ে বলল,
-গিভ মি।
তানশান বুঝেগেল ভাই কেক চাচ্ছে। সে বলল,
-ও তোমার হাতে থাকা কেক চাচ্ছে।
সুনেহরা মৃদু আশ্চর্য হয়ে বলল,
-বাপরে, এ দেখি ইংলিশ ম্যান। তো এটা মুখে বললে কী সমস্যা? এই নাও।
সে নিজের হাতেরটা দিয়ে বলল। তানশান বলল,
-দিও না। ও এগুলো খায় না। নষ্ট করে ফেলে দেবে।
-আমার জিনিস নষ্ট করবে। তাতে কারোর কিছু যায় আসার কথা না।
সুনেহরা গম্ভীর মুখে বলল।‌ তানশান খুশি হলো। অবশেষে এতদিন বাদ একটু কথা বলেছে। তবে এটা যে ভাইয়ের কারণে তাও বুঝল। মনে হলো প্রথমবারের জন্য ভাই বোনকে এনে দিয়ে ভালোই হয়েছে। কিন্তু সে জানত না, তার এই ভাবনা অচিরেই ভুল প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।
সে আরো কিছুক্ষণ কথা বলার চেষ্টা করল কিন্তু সুনেহরা তার কোনো কথারই উত্তর দিলো না। সে বিশ্রামের নামে তাথৈ এর মতো স্ট্র দিয়ে জুস চুষে খাচ্ছে।
এবার তানশান ধৈর্য হারা হলো। তার হাতে মাত্র দু’দিন সময়। সে কী করবে ভেবে না পেয়ে ভীষণ লেইম একটা কাজ করে বসল। প্রেম বিষয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকা মানুষটা যখন প্রেম করতে আসে তখন সেটা ভীষণ অপ্রীতিকর হয়।

তানশান বোনকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে হঠাৎ করেই পকেট থেকে ফোন বের করে সুনেহরার সামনে তুলে ধরল। সুনেহরা ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেয়েটিকে দেখল। তানশান মেয়েটিকে জেলাস করানোর জন্য বলল,
-ওর নাম তানিশা। আমার সাথে ইঞ্জিনিয়ারিং এর ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং করেছিল। ও আমায় পাগলের মতো ভালোবাসে। তুমি যদি আজকে কোনো জবাব না দাও তবে আমি ওর প্রপোজাল একসেপ্ট করে নেব।
তানশান ভেবেছিল এর থেকে দারুণ উপায় আর কিছু হতেই পারে না। সে ভীষণ আশা নিয়ে সুনেহরারর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য তাকালো। কিন্তু যেই প্রতিক্রিয়া পেল তা ছিল বিস্ময়কর! তানশানের মুখে এক ছটা আঠালো তরল ক্ষিপ্রবেগে আঁছড়ে পড়তেই তানশান হতভম্ব হয়ে গেল।
মুখে হাত ঘষে তানশান হতভম্ব, অবিশ্বাস্য অনুভূতি নিয়ে চোখ খুলে তাকালো। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
-হোয়াট দ্য…!
সুনেহরার রাগান্বিত স্বরে বলল,
-এইসব ফালতু জোকস আমার সামনে করতে আসবি না। ফুট এখান থেকে!
তানশান ফুঁসতে থাকা মেয়েটিকে কিছু বলতে যাবে তার মাঝেই কেউ রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,
-ভাউচান! টু….টুমি মাই ভাইচানকে মেয়েছো কেন ব্যাড গাল?
তানশান‌ আরেকদফা চমকে উঠল যখন রাগান্বিত তাথৈ নিজের হাতে থাকা প্লাস্টিকের জুসের জারটা ছুঁড়ে মারল সুনেহরার গা বরারব। তানশান চেঁচিয়ে উঠল,

-তাথৈ!
সুনেহরা হতভম্ব হয়ে তাকালো একবার নিজের ভেজা বক্ষস্থল পানে আর একবার তাথৈ এর দিকে। হতভম্ব সুরে বলল,
-তুমি, আড়াই ফুটের একটা টমাটু আমার গায়ে জুস ছুড়েছ? তোমার কত বড় সাহস!
তাথৈয়ের ফুলকো গালদুটো ততক্ষণে লাল হয়ে উঠল। সে ঘাড় সমান চুলগুলো ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আঙুল তুলে রাগান্বিত স্বরে বলল,
-মাই ভাউচানকে মেয়েছ কেন ব্যাড গাল? বকা, বকা, বকা! ইউ ডাট্টি গাল!
সুনেহরা বিস্ময় সামলে শাড়ি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তানশানের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলল,
-বাহ, নিজের কূটনী বোন নিয়ে এসেছিস আমায় শায়েস্তা করতে, তাই না? আর যদি দুই ভাই বোনকে এই মুখো দেখি তবে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।
বলেই সুনেহরা গটগট করে হেঁটে চলে গেল নিজের স্টুডেন্টদের কাছে। তানশান মাথা হেঁট করে বসে রইল। তাথৈ তড়িঘড়ি করে ভাইয়ের কাছে গেল। ছোট ছোট হাত দিয়ে ভাইয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,
-ব্যাড গালকে বকে ডিয়েচি। দুঃক পায় না। ব্যতা ভানো! ব্যতা ভানো।
তাথৈ ফটাফট দু চারটে চুমু দিলো ভাইয়ের গালে। তানশান ক্লান্ত দৃষ্টি ফেলে বোনের কথা বোঝার চেষ্টা করল। ব্যথা বাড়িয়ে দিয়ে বলে ব্যথা ভালো হয়ে যাবে। সে থমথমে মুখে বলল,

-তুমি কী ভাইজানের ঘর সংসার হতে দেবে না? এটা কী করলে? বড়দের গায়ে জুস ছুড়েছ কেন? পাপা কাউকে মারতে বারণ করেছিল না?
ভাইয়ের গম্ভীর গলায় তাথৈ মুখ ফুলালো। চঞ্চলতা মিইয়ে গেল। তাশফিন ততক্ষণে কেকটা গুঁড়ো গুঁড়ো করে মাটিতে ফেলে দিয়ে এখন ঘাস ছিঁড়ছে। সেভাবেই বলল,
-তাতৈ ব্যাড গাল।
তানশান ভাইয়ের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বোনকে কোলে তুলে নিলো। গম্ভীর গলায় বলল,
-আমার প্রবলেম আমি সলভ করেই নিতাম তুমি কেন নাক গলাতে গেলে, হ্যাঁ? সুনেহরা এখন তোমায় ব্যাড গার্ল বলবে না? সেটা কী আমার ভালো লাগবে?
ভাই ধমক দিতেই তাথৈয়ের থুতনি ঠেকল বুকে। চোখে পানি টলটল করতেই দেখতেই তানশান বেজায় বিরক্ত হয়ে বলল,
-অপরাধ করে আবার সিমপ্যাথি কালেক্ট করা হচ্ছে? তোমরা মেয়েরা এত কেন ক্রিটিক্যাল? ও মাই গড!
তাথৈ এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তানশান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে তাকে বুকে জড়িয়ে অজস্র আহ্লাদ আর চুমুর বিনিময়ে কান্না থামালো। কান্না থামতেই সে চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল,
-স্যরি, ভাইজান আর বকা দেব না।
তাথৈ ফুপাতে ফুপাতে বলল,

-ইত ওকে।
তানশান হেসে উঠল। বোনের এলোমেলো চুলগুলো হাতের কব্জিতে থাকা ব্যান্ড দিয়ে পনিটেল বাঁধতে বাঁধতে বলল,
-অপরাধ করবে তুমি আর স্যরি বলব আমি। বাহ্! তুমি কী আমায় প্রাকটিস করাচ্ছো ভবিষ্যতে একজন ভালো জীবনসঙ্গী হওয়ার জন্য?
তাথৈ বুঝল না ভাইয়ের কথা। তানশান তার চুলগুলো বেঁধে দিতেই তাথৈ এর অন্যরকম এক সৌন্দর্য ফুটে উঠল। তানশান মাশাআল্লাহ বলে সুরা পড়ে ফুঁ দিলো বোনের গায়ে।
সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের লক্ষ্মী ভাইয়ের দিকে তাকায়। যে স্বভাব আচরণে পুরোটা তার কার্বন কপি। বলল,
-তাশু, চলো। পাপা যাই।

তাশফিন নীরবে এসে ভাইয়ের বুকে লেপ্টে গেল। তানশান দু’জনকে নিয়েই জোরে জোরে হাঁটা দিলো। একটু কষ্ট হলেও, কোনো ব্যাপার না। সন্ধ্যা নেমেছে। দাদু বলে এই সময় বাচ্চাদের বাইরে না রাখতে। যদিও সে কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। কিন্তু এই দুটো প্রজাপতিকে সুস্থ সবল দেখার জন্য সে সব করতে রাজি।
সে বাসায় এসে নামাজ পড়ল মাগরিব এর। তাশফিন ঘুমে ঢুলছে তবুও ভাইয়ের ট্যাব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার আগ্রহ কমছে না। আর তাথৈ? সেই মহা দুষ্টু রমনীটি নামাজ পড়তে থাকা ভাইয়ের গলা ধরে ঝুলছে। আবার সিজদায় গেলে পিঠে চড়ে বসে থাকছে। দশ মিনিটের নামাজ আধা ঘন্টা লেগে গেল তানশানের।
সন্ধ্যা হয়ে যেতেই তড়িঘড়ি করে ছেলের ঘরে ঢোকা রূপকথা হেসে ফেলল। মোনাজাতরত ভাইয়ের গলা ধরে ঝুলে মেয়ে ঝুলছে। সে হাসি থামিয়ে ধমকে বলল,
-এই দুষ্টু মেয়ে, এদিকে এসো। ভাইজান নামাজ পড়ছে। তুমি তাকে বিরক্ত করছ কেন?
তানশানের নামাজ শেষ। সে মায়ের দিকে ফিরে তাকালো।

-শপিং শেষ?
-হ্যাঁ, দেখোতো এগুলো পছন্দ হয় কিনা।
শাড়ি পরিহিত রূপকথা তিনটা ব্যাগ তার বিছানায় রেখে বলল।
-পরে দেখি, মা। ঘুম পেয়েছে।
তানশান ক্লান্ত স্বরে বলল। রূপকথা এগিয়ে আসল। গালে হাত রেখে বলল,
-কী হলো, শরীর খারাপ লাগছে? চুল ভেজা কেন? সুনেহরার সাথে দেখা করেছ?
-করেছি। এসে গোসল করতে হয়েছে।
-গোসল করতে হয়েছে কেন? আর সুনেহরা কী বলেছে?
-বলেনি বরং কী করেছে তাই বলো।
-কী করেছে?
-সুনেহরা আমার উপর জুস ছুঁড়ে মেরেছে আর তোমার পাজি মেয়ে তার উপর পাল্টা জুস ছুঁড়ে মেরেছে। মাঝখান থেকে আমার সাজানো গোছানো সব পরিকল্পনা শেষ।
রূপকথা হতভম্ব হয়ে বলল,

-তাথৈ, সুনেহরার গায়ে জুস ছুঁড়ে মেরেছে?
-হুম, আর রেগে রেগে আঙুল তুলে কী বলেছে জানো? টুমি মাই ভাউচানকে মেরেছ কেন?
তানশান হাসছে। রূপকথা কঠিন চোখে তাকালো মেয়ের দিকে।
-এই মেয়ে, তুমি বড় আপুর গায়ে জুস ছুঁড়ে মেরেছ? একটা মাইর দেব এখন?
মায়ের রাগান্বিত স্বরে তাথৈ সরব ঠোঁট উল্টাতে উল্টাতে ভাইয়ের দিকে তাকালো। তানশান জায়নামাজ রেখে এসে তাকে কোলে নিয়ে বলল,
-বকো না। আমি বকেছি। একদফা কেঁদেছে তারপর আবার আমাকে দিয়েই স্যরি বলিয়েছে।
যতক্ষণ না স্যরি বলেছি, ততক্ষণ কেঁদেছে।
রূপকথা হেসে উঠে বলল,
-এত প্রশ্রয় দিও না। বড় হলে আরো উগ্র হয়ে যাবে।
তানশান হেসে বলল,
-হবে না। পাপা আছে না।
-তোমার পাপা, মেয়ের বেলায় বোবা হয়ে যায়।
-আমাদের পরী যে!
তানশান বোনকে কাঁধে তুলে নিয়ে বলল।
রূপকথা বলল,

-বার্গার এনেছি তোমাদের জন্য। খেয়ে নাও। তারপর ঘুমিয়ে পড়ো। ওদের দাও।
তারা তিন ভাই বোনই ফাস্টফুড লাভার। বাইরে গেলে একটু আনতেই হয়। তানশান বলল,
-থাকুক, একসাথে খাই। তুমি চেঞ্জ করে আসো।
-ক্লান্ত লাগছে তোমায়। ওরা বিরক্ত করবে।
-ঘুমের কারণে ক্লান্ত লাগছে। ওদের ও ঘুম পেয়েছে। চিন্তা করো না, খেয়ে তিনজন ঘুম দেব।
-আচ্ছা।
রূপকথা চলে গেল। তপোবন গাড়ি রেখে উপরে আসতে একটু দেরি হলো। হঠাৎ গাড়িতে কেমন সমস্যা দেখা গিয়েছে।
তারা দু’দিন বাদ সৌদি আরব যাচ্ছে। ওমরাহ পালন করতে। এবং বাচ্চাদের নিয়েই যাচ্ছে। পবিত্র ঘরের সামনে সন্তানদের একসাথে দেখা এক ধরণের স্বপ্ন তার জন্য।
সে সতেরো বছরের অভ্যাস অনুযায়ী আগে ছেলের ঘরে উঁকি দিলো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ঘুমবাতির আলোয় স্পষ্ট তিনটি মুখ। দুই ভাইবোন বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এই দৃশ্য বিরল নয় বরং রোজকার দৃশ্য। তবুও তপোবনের তৃষ্ণা মেটে না।
সে রুমে ঢুকতেই রূপকথা জিজ্ঞাসা করল,
-বাচ্চারা ঘুম?
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
-ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরার নাম করে চেপে ধরে দু’জন ঘুম।
রূপকথা তার পাঞ্জাবি এগিয়ে দিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

-আপনি কী জানেন আমার পরবর্তী ক্লাস শুরু হবে কবে থেকে?
-নাহ, খোঁজ নেব।
-আচ্ছা।
তপোবন পাঞ্জাবি খুলতে গিয়েও ফিরে তাকালো পরিপূর্ণ গিন্নির বেশে কাজ করতে থাকা মেয়েটির পানে। ডাকল,
-রূপকথা?
-জি।
রূপকথা ফিরে তাকায়। তপোবন হঠাৎ হঠাৎ কিছু অদ্ভুত প্রশ্ন করে। আজ ও তেমনি এক অদ্ভুত প্রশ্ন অরল। ধিমি কণ্ঠে শুধাল,
-আফসোস হয়?
রূপকথার একটু সময় লাগল প্রশ্নের মানে বুঝতে। বুঝতেই মৃদু হেসে বলল,
-আরো অনেক বেশি খুশি হয়েছি। আল্লাহ যা করেন আমাদের ভালোর জন্য করেন। আমি কখনো তার সিদ্ধান্তের উপর আঙুল তুলি না। নিজেকে একজন ব্যস্ত ডাক্তার হিসেবে দেখার চেয়ে একজন আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার আর একজন মা হিসেবে দেখা আমার জন্য সুখকর। আমি খুশি।
তপোবন স্মিত হাসল। রূপকথা মেডিকেল এ চান্স পায়নি। তার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে অত কঠোর পরিশ্রম করা সম্ভব হয়নি দু’টো দুধের শিশু নিয়ে। তবে সে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিল। আজ দুই বছর হতে চলল। স্বামীর অনুসরণ করে সেও আর্কিটেকচার বিষয়ের উপর পড়াশুনা করছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো তার ছেলেও বুয়েটে আর্কিটেকচার বিভাগেই চান্স পেয়েছে। গোটা পরিবার আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হবে। ভেবেই নিজমনে হেসে উঠল তপোবন।

পরদিন তানশান একই সময় অপরাহ্নের আগ মুহূর্তে খুলনা ইউনিভার্সিটি পৌঁছাল। তবে আজ তাথৈ নামক বুলডোজার সাথে নেই। যে কথা শোনার আগেই প্রতিক্রিয়া দেখাবে। আজ সাথে তাশফিন রয়েছে।
সুনেহরা আজ ও তাদের দেখে রেগে গেল। সে আজ ও গিয়ে তার পাশে বসল। কোনোরূপ বাড়তি কথা না বলে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-পোরশু দিন আমাদের ফ্লাইট। আমার হাতে সময় খুব কম, সুনেহরা। এরপর আর তোমার সাথে দেখা করার কোনো সুযোগ পাব না। অবশ্য দেখা করার কারণ তো থাকতে হবে।
সুনেহরা ঘাড় ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। হাতের মুঠোয় পানির বোতল। তানশান তার প্রতিক্রিয়া দেখতে পারছে না। সে আবার বলল,
-চলে যাওয়ার আগে আমি শুধু একটাবার তোমার জবাব শুনতে চাই, সুনেহরা। যদি ‘হ্যাঁ’ হয় তবে বাকি পুরোটা জীবন তোমার টমাটু তোমার হবে। আর যদি ‘না’ হয় তবে আমি আর কখনো তোমায় বিরক্ত করব না।
দু’জনের মাঝে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। তানশান জবাবের অপেক্ষা করতে করতে ফিরে তাকায় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকা মেয়েটির পানে। বলল,

-আমি কিন্তু তোমার নীরবতাকে ‘না’ ভেবে নেব। আর কখনো তবে আমাদের দেখা হচ্ছে না, তাই তো?
সহসা তার কর্নদ্বয় শীতল হলো ফুপানোর শব্দ ভেসে আসতেই। তানশান স্মিত হাসল। অদূরে চেয়ে বলল,
-কাঁদছ কেন?
সুনেহরা ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলল,
-চলে যা। যেখানে ইচ্ছে চলে যা, আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি তোকে আর ভালোবাসি না।
তানশান হাসল। বলল,
-আমি বুয়েটে চান্স পেয়েছি। আর দু’দিন পর আমাদের সৌদি আরবের ফ্লাইট। ওমরাহ পালন করতে যাব। আসার পরে পুরোদস্তুর ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। খুলনায় আসার সুযোগ হবে না তেমন। প্লীজ সময় ওয়েস্ট করো না। জীবনটা ছোট্ট। যেই সময়গুলো চলে যাচ্ছে তা আর ফিরে আসবে না। পরে আফসোস হবে, কেন জীবন আরেকটু লম্বা হলো না।
সুনেহরা নীরবে কেঁদে যাচ্ছে। তানশান ফের বলল,

-আমি কী তবে চলে যাব?
সুনেহরা নীরব। তানশান এবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
-তবে থেকে যাই তোমার হাতটি ধরে?
ফুঁপানোর আওয়াজ এবার বাড়লো। তানশান জবাব পেয়ে গেল। ভাইকে একহাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আরেকহাতে সুনেহরার কোলে থাকা হাতটি নিজের মুঠোয় পুরে নিলো। সুনেহরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। তানশান মৃদু হেসে বলল,
-এই যে ধরলাম। একদম জীবন, মৃত্যু, পুলসিরাত, হাশর পার করে জান্নাত পর্যন্ত একসাথে যাব।
সুনেহরা নির্বাক, নিস্তেজ মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে নিজের প্রিয় নীলাভ ধূসর চোখদুটির পানে। অস্ফুট স্বরে বলল,
-তোর বোন কূটনী, আমায় অত্যাচার করবে।
সরব তানশান হো হো করে হেসে উঠল মেয়েটির বাচ্চা বাচ্চা কথায়। হাসতে হাসতে বলল,
-আমি জানি, তার ভাবি আরো কূটনী। ঠিক দু’জনে টক্কর দিয়ে টিকে যাবে।
সুনেহরা ভরসা পেতেই চোখের পানি মুছে নিলো। বলল,

-হ্যাঁ, আমিও অনেক কূটনীপনা জানি।
তানশান আবার হেসে উঠল শব্দ করে। হাসতে হাসতে বলল,
-আমার বোন কিন্তু আমার কলিজা।
সুনেহরা সরু চোখে তাকায়। বলে,
-আর বউ?
তানশান স্মিত হেসে বলল,
-আমার হৃৎপিণ্ড!
সুনেহরার হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। এই কী সেই হাদাভোদা ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টটি?
সম্পর্কগুলোর সকল জটিলতা চুকে গেল। জীবনের লহমাগুলো মসৃণতার সাথে বহমান। পবিত্র কাবা ঘরের থেকে কয়েকফুট দূরে পা গুটিয়ে বসে আছে তপোবন এবং রূপকথা। তার ঠিক দুই হাত সামনে বড় ভাইয়ের কাঁধে চড়ে আর হাতের আঙুল ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাথৈ তাশফিন।
তানশান ফিরে তাকালো তপোবনের ঠিক ডান পাশে সাদা কাপড়ে আসন পেতে বসে থাকা ছোট পাপার পানে। বলল,

-নায়েল, ভাইজানের কাছে এসো।
ক্লান্ত নায়েল বাবার কোলে শুয়ে পড়ল। নাকচ করে বলল,
-আ’ম টায়ার্ড, ভাইজান।
-ওকে।
তানশান ভাই বোনের সাথে খেলতে লাগল। মৌনতা এরোজের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে মেয়ের দিকে হাত বাড়ালো।
-কী হয়েছে আমার মায়ের? মন খারাপ হয়েছে না-কি?
নায়েল হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। এরোজ কৌতুহলী হয়। মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বলল,
-কেন মন খারাপ হয়েছে আমার মায়ের?
নায়েল তার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে মলিন সুরে বলল,
-আল্লাহর কাছ থেকে তানশান ভাইজানের মতো ভাই বোন এনে দাও না, পাপা।
দুই বছর! দুই বছরে অনেক কিছু বদলেছে। নায়েলের ‘র আর ল’ এর দ্বন্দ্ব মিটেছে। ছোট পাপা থেকে সে পাপা হয়ে উঠেছে। নায়েলের একছত্র বাজে অভ্যাস তার পাপা।
এরোজ আর মৌনতা মলিন হেসে বলল,
-ওই যে সামনে আল্লাহর ঘর। এখানে বসে মন থেকে কিছু চাইলে আল্লাহ কখনো ফিরিয়ে দেয় না। তুমি আল্লাহর কাছে বলো, আল্লাহ প্লীজ আমার মাম্মাকে সুস্থ করে দাও আর আমায় একটা ভাই-বোন দাও। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের রহমত দান করবেন।
নায়েল তৎক্ষণাৎ হাত তুলে আল্লাহর কাছে চাইল।
তপোবন আর রূপকথা ছলছল নয়নে ছোট্ট সুখী পরিবারটিকে দেখছে। ভেতরে ভেতরে প্রার্থনা করল, সৃষ্টিকর্তা যেন আরেকটি রহমত দিয়ে তাদের সুখকে পরিপূর্ণ করে দিক। ছোট্ট নায়েলকে খালি হাতে না ফেরায়।
এরোজ সুখ হারানোর ভয়ে দুই বছর আগে যে দেশ ছেড়েছিল তারপর আর আসেনি। এবার তাদের সৌদি আসার খবরে এরোজ বলল, তারাও আসবে। দেখাও হয়ে যাবে, রবের সান্নিধ্যেও আসা হবে।
তানশান ভাই বোনকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাবা মায়ের কাছে চলে এলো। এরোজ বলল,

-আব্বু, তাশু আর তাথৈকে দাও।
তানশান তাদেরকে এরোজের কোলে দিয়ে নিজে বাবার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল। তপোবন ছেলের মাথায় হাত গলিয়ে দিয়ে কাবার দিকে ফিরে তাকালো। দৃষ্টিতে অজস্র প্রশ্নরা অশ্রু হয়ে ছোটাছুটি করছে।
তার দুষ্টু স্ত্রীটি কেমন আছে? অন্য নারীকে ভালোবাসার কারণে সে কী এখনো রাগে মুখ ফুলায়?
কাঁধে কেউ ঝিমিয়ে পড়তেই তপোবন সচকিত হয়। ঝাঁপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই রূপকথার ঘুম জড়ানো আঁখি নজরে আসে‌। সে মৃদু হেসে নিজের বাম পা দেখিয়ে বলল,
-এখানে ঘুমিয়ে পড়ো।
রূপকথা সতর্ক চাহনিতে চেয়ে বলল,
-এখানে?
-হুম। তানশান ঘুমাচ্ছে দেখো।

তানশান সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছে বাবার পায়ে। রূপকথা ও মৃদু হেসে তপোবনের অন্য পায়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তপোবন দু’জনের মাথায় হাত রাখল। এরোজ তাশফিন আর তাথৈকে কোলে নিয়ে মেয়েকে বলল,
-আমাদের ও একদিন আল্লাহ এমনি রহমত দান করবেন। দেখে নিও। আল্লাহ পারেন না এমন কিছু নেই।
নায়েল গাল ভরে হাসল।
পবিত্র কাবা শরীফের সামনে সাক্ষী হলো কিছু নিখাদ ভালোবাসার দৃশ্য। যেই ভালোবাসা সমাজের তৈরি সকল দুঃখের শেকলভেঙে আজ সুখের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
পরিশিষ্টঃ
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস রুমে থমথমে পরিবেশ বিরাজমান। ডেস্কে কনুই ঠেকিয়ে মুখে হাত দিয়ে বসা বস পিটপিট করে দেখছে সম্মুখের দু’জন ইমপ্লয়িকে। নীরবতা ভেঙে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-কী চাই?
এহেন অযৌক্তিক প্রশ্নে তেইশ বছরের সুঠামদেহী সুশ্রী গড়নের ইমপ্লয়িটি রাগে ফেটে পড়ল। পাশেই মেরুন রঙা জামদানি শাড়ি পরিহিত আর হালকা স্বর্ণালংকারে আবৃত পূর্ণবয়স্ক নারীটির পানে চেয়ে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,

-মাম্মা, দেখেছ পাপা কী বলছে? সে আমার দুই মাসের বেতন আঁটকে রেখে বলছে, কী চাই?
আঠাশ বছরের রূপকথা থমথমে মুখে ছেলের দিকে তাকায়। রাগান্বিত স্বরে বলল,
-তোমার মাত্র দুইমাস আর আমার চার মাসের বেতন জমা এই ভন্ড বসের কাছে।
বসের রূপে থাকা তপোবন বোকাসোকা হেসে বলল,
-তোমাদের কোনো খরচ কী আঁটকে আছে? আমায় বলো। সবই তো পূরণ হচ্ছে। আরো লাগলে এই নাও আমার কার্ড। তবুও তোমরা কেন বেতনের জন্য মাছের বাজার বসিয়ে রাখো।
সেই কিশোর তানশান এখন বড় হয়েছে। ইন করা সাদা শার্টে আবৃত সুদর্শন মুখটিতে পুরুষালী সৌন্দর্য ফুটেছে। গালে উঠেছে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। সে বাবার কথার প্রেক্ষিতে বিরোধ করে বলল,
-নো পাপা, আই ডোন্ট নিড ইয়োর মানি। আই নিড মাই মানি।
তপোবন একই রকম রসিকতা আঁকড়ে বসে আছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। সে বলল,

-এই যে রোজ রোজ পাপার কাছে এসে একদফা তর্কবিতর্ক করো এটা কিন্তু বেশ ইনজয়েবল। আমি ইনজয় করছি! আর কিছুদিন ক্যারি অন করাই যায়।
রূপকথা এবার তেতে উঠল,
-আপনার ইনজয় এর কাঁথা পুড়ি! আমাদের কী পূরণ হচ্ছে না হচ্ছে তা আপনার দেখার বিষয় নয়। আমাদের বেতন চাই। নয়তো আমরা চাকরি থেকে রিজাইন নিয়ে নেব। সোজা কথা!
তপোবন বড় বড় নেত্রে তাকালো।
-বাব্বাহ! কী হুমকি! দিচ্ছি দিচ্ছি।
তপোবন আর কিপ্টামো করল না। কাউকে ফোন দিয়ে কিছু বলল। তন্মধ্যেই তানশানের ফোনে মেসেজ পেল। তার বেতন এসেছে। সে বলল,
-থ্যাংক ইউ! এমন কিপ্টা বসের থেকে এত সহজে বেতন বের হবে তা আমি কল্পনা করতে পারি নি। অল ক্রেডিট গোজ টু মাম্মা।
তানশান বিদ্রূপ করে বলল। তপোবন ও পাল্টা বিদ্রূপ করে বলল,

-আজ আমার তর্ক করার মুড নেই তাই দিয়ে দিলাম। ডোন্ট গিভ হার ক্রেডিট। নয়তো আমিও দেখিয়ে দিতাম মাসে বারো দিন কাজ করে ত্রিশ দিনের বেতন নেয়া কাকে বলে।
বাবার কথায় তানশান ফিক করে হেসে উঠল। সে তার ব্যক্তিগত পড়াশুনা আর কাজ থেকে লম্বা একটা ছুটি পাওয়ায় বাবার অফিসে দুইমাস সময় দিয়েছে। যেখানে তার মাও পড়াশুনা শেষ করে বিগত এক বছর যাবৎ কর্মরত।
সে অফিস থেকে বের হতে নিলে তপোবন বলল,
-তানশান, ভাই বোনকে দেখো তো কোথায় আছে। এখানে দিয়ে যাও।
-জি পাপা।
সে বাবার অফিস থেকে বেরিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে নাগা মরিচ লেখা একাউন্টটিতে মেসেজ করল,
-আধা ঘন্টা পর আড়ং এ থেকো।
এরপর সে অফিস জুড়ে খুঁজতে লাগল কাঙ্খিত দুই প্রজাপতিকে। একজনকে পেল মেজো পাপার ডেস্কে। ইমরোজের বুকে মাথা রেখে তাশফিন মনোযোগ সহকারে তার কাজ দেখছে। তানশান তাকে দেখে বলল,

-তাশু, ভাইয়া বাইরে যাবো। সাথে যাবে?
তাশফিন নীরবে ইমরোজের হুইলচেয়ার থেকে নেমে গিয়ে বলল,
-মেজো পাপা, ক্যান আই গো?
ইমরোজ মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রেখে বলল,
-যাও আব্বু।
তানশান ভাইকে নিয়ে বোনকে খুঁজতে বের হলো। আয়াকে জিজ্ঞেস করল বোন কোথায়। আয়া বলল,
-একজন সুন্দরী ম্যাডাম আছে না? তার সাথে বসে মেকআপ করছে।
তানশান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে কাঙ্খিত ডেস্কে যায়। অফিসের সবচেয়ে সুন্দরী বয়স্ক নারীটি আসলে মেকআপ সুন্দরী। আর তাথৈ আসলেই তার কাছে বসে মেকআপ করে।
সে ব্লাশ দেয়া গাল দেখে বলল,
-ইউ আর লুকিং সো আগলি, বোনু্।
তাথৈ মুখ ছোট করে নিলো। বলল,
-আগলি দেখাচ্ছে?
-প্রচুর।
তাথৈ সরব এদিক ওদিক তাকালো। তানশান ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকে পকেট থেকে ওয়েট টিস্যুর প্যাকেটটা বের করে এগিয়ে দিলো। তাথৈ খপ করে তা টেনে নিয়ে পুরো মুখ মুছে ফেলল। তার ভাষ্যমতে, তার ভাই যা বলে সব ঠিক। সে মুখ মুছতেই তানশান বলল,

-দ্যাটস মাই বিউটিফুল বোনু। আর কখনো এসব মেকআপ করবে না, ওকে?
-ওকে।
-এসো,পাপার কাছে যাবে। ভাইজানদের একটু কাজ আছে।
তাথৈ নীরবে ভাইয়ের হাত আঁকড়ে ধরল।
রূপকথা তখনো অফিসরুমে বসে তর্ক বিতর্ক করে যাচ্ছে স্বামী রূপী বসের সাথে।
-আপনি তানশানের বেতন দিলেন আমার বেতন দিলেন না কেন?
তপোবন ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-বললাম তো, বসকে একটু খুশি করো। বেতন দিয়ে দিচ্ছি।
রূপকথা চোখমুখে কুঁচকে আওড়ালো,
-ছিঃ, লুচু বস!
তপোবন হো হো করে হেসে উঠে নারীটির চেয়ার টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসল। রূপকথা চেঁচিয়ে উঠল,
-এই এই, বস ইমপ্লয়ির সাথে অশ্লীলতা করছে।
তপোবন হাসতে হাসতে বলল,

-এই বস যে ইমপ্লয়ির স্বামী তা কী ভুলে গিয়েছে ইমপ্লয়ি? যাক ব্যাপার না। আসুন‌ মনে করিয়ে দেই।
পরমুহূর্তে রূপকথা ঠিক তার শাড়ির ন্যায় রক্তিম বরন ধারণ করল ওষ্ঠদ্বয়ে লেপ্টে যাওয়া ভেজা স্পর্শের টানাপোড়েনে। তাদের মাঝে নেমে আসা নীরবতায় শব্দ তুলে দরজায় নক করল কেউ।
-পাপা আসব?
রূপকথা সরে যায়। দ্রুত মুখাভঙ্গি ঠিক করে। আজ এত বছরেও অনুভূতির কোনো কমতি নেই তাদের দাম্পত্য জীবনে। তপোবন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
-এসো।
অনুমতি পেতেই তিন বাচ্চা উঁকি দিয়ে চাইল। তপোবন হেসে ফেলল তিনটি স্নিগ্ধ মুখ উঁকি দিতে দেখে। তানশান বলল,
-এইযে তোমার পরী, পাপা। মেকআপ করা শিখেছে। বারণ করে দিও। ওইসব প্রডাক্ট মুখের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে দেবে।
তপোবন গম্ভীর মুখে মেয়েকে বলল,

-দিস ইজ ভেরি ব্যাড, আম্মিজান।
তাথৈ হেলেদুলে হেঁটে গিয়ে বাবার পেটের সাথে মুখ লাগিয়ে বলল,
-স্যরি।
তপোবন তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
-ইটস ওকে। আর ওগুলো মুখে দেবে না ঠিক আছে? তোমার স্কিন বার্ন করবে।
-ওকে।
রূপকথা ছেলেদের বলল,
-তোমরা কোথায় যাচ্ছো?
তানশান ভাইয়ের হাত ধরে বলল,
-আড়ং এ যাচ্ছি মা।
-আড়ং এ কী করবে?
-তাশুর ফতুয়া কিনব কিছু আরো কিছু গিফট কিনব।
-আচ্ছা। কিন্তু তাশুর টিশার্ট শার্ট অনেক আছে। এখন ফতুয়া দিয়ে কী করবে ও?
-টিশার্ট, শার্টে অনেক গরম লাগে। যা গরম পড়েছে ফতুয়া পরে আরাম পাবে। ওই দেখো ওর গলা লাল হয়ে গিয়েছে।
রূপকথা ছেলের গলা দেখল। সত্যিই লাল হয়ে আছে। আজ সারাদিন প্রচুর গরম ছিল। তপোবন বলল,

-ওকে স্কিনের ডাক্তার দেখাতে হবে। একটু এদিক সেদিক হলেই গায়ে ব়্যাশ উঠে যায়।
-হুম। আমরা যাই তবে।
তপোবন বলল,
-যাও, কিন্তু কাজ শেষে তোমার নানুর বাসায় যাবে।
তানশান পিছু ফিরল। বলল,
-পারু নানু?
তপোবন হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। বলল,
-হুম, আজ ওখানেই খাবো। বিকালটা ওখানে কাটিয়ে রাতে বাসায় যাব।
তানশান হেসে বলল,
-আচ্ছা।
পারু নানুর কাছে যাওয়ার কথা শুনেই তাথৈ উল্লাসে ফেটে পড়ল। পাখির ন্যায় কিচিরমিচির কণ্ঠে বলল,

-পাপা, মাম্মা আমরা পারু নানুর কাছে যাব এখন?
তপোবন কোলে থাকা মেয়ের গালে ঠোঁট চেপে দিয়ে বলল,
-হুম, তুমি কী হ্যাপি?
তাথৈ উৎসাহিত কণ্ঠে বলল,
-অনেক।
রূপকথা ব্যাগ থেকে একটা আপেল বের করলে বাথরুম থেকে ধুয়ে আনল। মেয়ের হাতে দিয়ে বলল,
-যেতে এখনো কিছুক্ষণ লাগবে তার অগে এটা খেয়ে নাও।
তাথৈ মুখ কুঁচকে বলল,
-আপেল পঁচা।
রূপকথা গম্ভীর মুখে বলল,

-কোনো দুষ্টুমি না তাথৈ।
-আচ্ছা, বকো না। আপেলটা খেয়ে নাও মা। পাপা তোমায় একটা পিকাচু কিনে দেব একটু পর।
-সত্যি?
-একদম।
তাথৈ ফটাফট আপোল খেয়ে নিলো। তার পুতুলের খুব শখ! রূপকথা রেগে গেল,
-এগুলো করে ওকে বিগড়ে দিচ্ছেন আপনি। প্রয়োজনের অধিক কোনোকিছু দেয়া উচিৎ নয় বাচ্চাদের।
তপোবন মিহি স্বরে বলল,
-আমি ছাড়া আর কে আছে যে ওদের শখ পূরণ করবে? এমন করো না। মেয়েদের জীবন অনেক কঠিন হয়। যতদিন ও আমার বুকে আছে ততদিন জগতের সব সুখ ওকে দেব আমি। পরের ছেলের উপর আমার কোনো বিশ্বাস নেই। আমি মারা যাওয়ার আগে আমার মেয়ের বর্তমান ভবিষ্যৎ সব সিকিওর করে রেখে যাব। যেন জীবনে কোনোদিন তাকে সমস্যায় না পড়তে হয়।
রূপকথা শ্রান্ত নিঃশ্বাস ফেলল। মুখটা অচিরেই কালো হয়ে গিয়েছে। থমথমে মুখে বলল,

-এই ধরণের কথা বলবেন না।
তপোবন হেসে উঠল স্ত্রীর হঠাৎ মূর্ছা যাওয়া দেখে। হাত বাড়িয়ে মেয়েটির হাত আঁকড়ে ধরল। উল্টোপিঠে চুমু দিয়ে বলল,
-আপনার সাথে আমার পথচলা দীর্ঘ হোক, মুরুব্বি।
রূপকথা মলিন সুরে বলল,
-হোক।
তানশান আড়ং এ পৌঁছাতেই দেখল কফি রঙের আবায়ায় আবৃত একটি মেয়ে ঘুরে ঘুরে পোশাক দেখছে। সে ডাকল,
-সুনেহরা।
আবায়া পরিহিত মেয়েটি ফিরে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই তানশান স্মিত হাসল। পাঁচ বছর আগে সেদিন যখন বলেছিল মেয়েটিকে নিয়ে জান্নাত পর্যন্ত যেতে চায়, সেদিনের পর থেকে সে নাচগান ছেড়ে দিয়ে আবায়া পরা শুরু করে। এই ব্যাপারে তানশান কখনোই তাকে কিছু বলেনি। কিন্তু সুনেহরা নিজ থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর তানশান শুধু সম্মান করছে তার সিদ্ধান্তকে।
সুনেহরা তাশুর নাক চেপে দিয়ে বলল,

-এত দেরি হলো কেন?
তাশফিন নাকমুখ কুঁচকে বিরক্তিকর শব্দ করল। তানশান ভাইয়ের বিরক্তি দেখে বলল,
-পাপার এই অভ্যাস তোমার মধ্যে কোত্থেকে এলো কে জানে? আমার ভাই বোন দুইটার নাক তীরের মতো লম্বা বানিয়ে দিয়েছ তুমি।
সুনেহরা বলল,
-এটা আমার হক। কার জন্য কী কী কিনবি?
-নায়েল, ছোট মা, ছোট পাপা, তাশু তাথৈ আরো স্পেশাল একজনের জন্য।
-ছোট চাচু কী আসবে?
-হ্যাঁ, আগামীকাল দুপুর বারোটায় ল্যান্ড করবে।
-কতদিনের জন্য?
-একমাস।
-আর এই স্পেশাল একজন কে?
-কাল দেখবে।

তারা শপিং করল মন ভরে। শপিং শেষে একটু খাওয়া-দাওয়া করে তানশান তিনটা ব্যাগ সুনেহরার হাতে ধরিয়ে দিলো। সুনেহরা ভ্রু কুঁচকে নিলো। তানশান স্মিত হেসে বলল,
-এভাবে তাকাচ্ছ কেন? আমার নিজের ইনকামের টাকা দিয়ে কিনেছি।
সুনেহরা আর কথা বাড়ালো না। ব্যাগ তিনটা নিয়ে নিলো। বলল,
-নিজের ইনকাম?
-হুম। দুই মাস পাপার সাথে অফিসে কাজ করেছি।
-আচ্ছা।
-কাল কখন যাবে আমাদের বাড়িতে?
-যখন যেতে বলবি।
-আমি এগারোটার দিকে নিতে আসব।
-আচ্ছা।
তানশান সুনেহরাকে ড্রপ করে পারমিতার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাল।
দরজা খুলতেই পারমিতার হাস্যোজ্জ্বল মুখটি দেখে তাশফিনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে আদুরে গলায় বলল,
-পারু, নানু আই মিসড ইউ।
পারমিতা হাঁটু গেড়ে বসে তাশফিনকে বুকে জড়িয়ে নিলো। আদুরে গলায় বলল,

-আমিও তোমায় খুব মিস করেছি নানুভাই। চলো, নানুভাই তোমার পছন্দের পুডিং করেছি।
তাশফিন লেগে বসল নানুর বুকে। তার দু’জন নানু। দু’জন ই তাদের কাছে আরামদায়ক দুটি কোল। পারমিতা ছোট নাতিকে ছেড়ে বড় নাতির দিকে তাকালো। কোমড়ে হাত দিয়ে উচ্চতায় দীর্ঘ নাতিকে দেখে হতাশ হয়ে বলল,
-এমন খাম্বা কি-না আমার নাতি ভাবা যায়? আমার বয়স ই বা কত হয়েছে?
তানশান হো হো করে হেসে উঠে তার গালে চুমু দিয়ে বলল,
-তুমি তো আমার সুন্দরী নানু।
পারমিতা তার পিঠে চাপড় মেরে ভেতরে ঢুকল। তানশান দু’দিন পরপর এখানে আসে ভাই-বোন নিয়ে। গতকাল ও এসেছিল। অথচ আজকে সবাই এমনভাব করছে যেন শতবর্ষ পর তাদের দেখছে। ভালোবাসা এমনি! সময়ের পরিক্রমায় গভীর থেকে গভীর হচ্ছে শুধু।
তানশান ঢুকে দেখল বাবা আর নানাভাই একসাথে নামাজ পড়ছে। সেও ওযু করে তাদের সাথে দাঁড়িয়ে গেল। ভাই, বাবা, নানুকে দেখে তাশফিন ও ছোট একটা জায়নামাজ নিয়ে ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।
রূপকথা আর পারমিতা সেই দৃশ্য মুগ্ধ চোখে দেখল। পারমিতা ছলছল নেত্রে চেয়ে বলল,
-তোদের দেখলে আমি সব দুঃখ ভুলে যাই।
রূপকথা তাকে জড়িয়ে ধরল। পারমিতা চোখ মুছে বলল,
-আমার নানুমনি কোথায়?
-দেখো তোমার রান্নাঘরেই পাবে।
পারমিতা হেসে রান্নাঘরে যেতেই দেখল আট বছরের তাথৈ পিঁড়িতে বসে আচারের কৌটায় হাত ঢুকিয়ে আচার খাচ্ছে। মেয়েটা আচার প্রিয়। আর পারমিতার হাতের আচার একটু বেশিই প্রিয়। সে হেসে উঠল কিন্তু রূপকথা ধমক দিলো।

-তাথৈ বাটি নেই? এমন করে খাচ্ছো কেন?
তাথৈ চেটেপুটে খেতে খেতে বলল,
-এভাবে খেতে মজা মাম্মা।
-ওকে খেতে দে। বিরক্ত করিস না। তুমি খাও নানুমনি। আআমি আরো বানাচ্ছি। পাঠিয়ে দেব বাসায়।
-ওকে নানু।
তাথৈ গাল ভরে হেসে বলল। দিনটুকু সেখানেই কেটে গেল। রাতে তপোবন পারমিতা আর শ্বশুরকে নিয়েই নিজের বাড়িতে গেল। আগামীকাল যে উৎসব। বাড়িতে সব মেহমান আসবে, মিলনায়তন হবে।
পরদিন সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি এসে হাজির হলো যখন এরোজ দীর্ঘ পাঁচ বছর দেশে পা রেখেছে। আগেরবার এক ভীতু এরোজ দেশ ছাড়লেও এবার ফিরে আসা এরোজের মুখশ্রী দৃঢ় বিশ্বাসে অটল।
চল্লিশ বছর বয়সী আজ ও আগের মতোই তাগড়া সুঠামদেহী চাচাকে নিজেদের বাড়ির আঙিনায় দেখে তানশান বুকে আঁছড়ে পড়ল।

-আই মিসড ইউ, ছোট পাপা।
এরোজ তার চুলের গোছায় চুমু দিয়ে বলল,
-আমার তানশান! চাচাকে ছাড়িয়ে গিয়েছ লম্বায়।
তানশান হেসে বলল,
-আমি পাপাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছি ছোট পাপা।
এরোজ একে একে পরিবারের সবার সাথে আলিঙ্গন করল।
তকদির সিকদার বললেন,,
-আমার দাদুমনি কোথায়?
এরোজ ফিরে তাকায় গাড়ির পানে। হাত বাড়িয়ে দিতেই ফ্লোরাল ফ্রক পরা বারো বছরের একটি পরীর মতো দেখতে মেয়ে বেরিয়ে এলো। তানশান আদুরে গলায় বলল,

-নায়েল!
-আই মিসড ইউ ভাইজান।
নায়েল তানশানের বুকে আঁছড়ে পড়ল। পরিবারের সকলে লাইন বেঁধে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। নায়েল সকলের সাথে আলিঙ্গন করল। নির্জনা বেগম লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রূপকথার হাত ধরে। সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,
-আমার ছোট দাদুভাই কোথায়, এরোজ?
এরোজ গাড়ি থেকে মাথা বের করে বলল,
-বাবু দুধ খাচ্ছে, আম্মা। দুই মিনিট অপেক্ষা করুন।
হ্যাঁ, বাবু। এরোজের সদ্য জন্মানো ছেলে। রবের ঘরের সামনে গিয়ে বলা নায়েল আবদারটি ফেলে দেননি আল্লাহ। নায়েলকে খালি হাতে ফেরায়নি। মৌনতার ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল মা হওয়ার। তবে পাঁচ বছর পর সেই সম্ভাবনা আরো বেড়েছে। এবং আজ পাঁচ বছরের মাথায় তাদের কোল আলো করে এসেছে তার ছেলে ‘নোবিতা’
এই নাম নায়েলের দেয়া। ডোরেমন তার প্রিয় কার্টুন কি-না!

ঠিক দুই মিনিট বাদ গাড়ি থেকে একজন সুস্থ সবল, সুশ্রী গড়নের লাবণ্যময়ী নারী বেরিয়ে আসল। যার কোলে ছোট্ট এক ফুটফুটে নবজাতক। মৌনতা! রুগ্ন, কঙ্কালের ন্যায় দেহ আর একবুক দুঃখ, বিশ্বাপঘাতকতা উপহার নিয়ে যে চিরতরে বেরিয়েছিল এই বাড়ি থেকে, সে আজ পরিপূর্ণ হয়ে ফিরেছে আবার সেই বাড়িতে। পার্থক্যটা শুধু আজ তার জীবন সুখে ভরপুর। সে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, চেহারায় মাতৃত্ব আর এক যত্নে থাকা সুখী স্ত্রীর লাবণ্য এসেছে‌।
রূপকথার চোখ ছলছল করে ভঙ্গুর দুঃখি মানুষটাকে সুখী হতে দেখে। পরপরই তাকায় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের দিকে। তার মা হেরে গেলেও মৌনতা জিতে গিয়েছে। নিলীমা ম্লান হাসল মেয়ের চাহনি দেখে। কে বলেছে সে হেরে গিয়েছে? সে এক বিজয়ী মা। আর এটাই তার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিজয়।
তার শুকতারা আর নিহাম পুরোদস্তুর পড়াশুনা করে মানুষের মতো মানুষ হচ্ছে। তার সন্তানেরা কোনোদিন হারবে না তাদের জীবনের কাছে এতটুকুই তার সুখ।
এরোজ স্ত্রী সন্তান নিয়ে এগিয়ে যায় বাড়ির ভেতরে।

বাড়িতে ঢুকেই এরোজ আঁছড়ে পড়ল তপোবনের বুকে। তপোবনের চোখ ধাঁধিয়ে গেল তার সুখী এরোজকে দেখে। মুহুর্তেই ঘরময় সুখ নেমে এলো। রোজ আঁছড়ে পড়ল তার প্রিয় মৌন বউয়ের বুকে। পাশেই তৃশান দাঁড়িয়ে আছে তাদের এক বছরের মেয়ের হাত ধরে। সকল ভালোবাসা, অ-ভালোবাসার সংজ্ঞা ছাপিয়ে তারা সুখী হয়েছিল। ভালোবাসাকে ভয় পাওয়া রোজ ও কারোর ভালোবাসার উন্মাদনায় নিজেকে খুইয়ে বসেছে। এখন সে আর ভালোবাসতে ভয় পায় না।
যদিও তারা প্রতি বছর কানাডায় গিয়েছে। তবুও রোজ আজ ও তার মৌন বউয়ের জন্য একই রকম পাগল।
সবার সাথে আলাপ আলোচনা শেষে এরোজ তাকায় এক কিনারায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকা সুনেহরার পানে। হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলে,

-এই কী আমাদের পুত্রবধূ নাকি?
সুনেহরা লাজে রাঙা হয়ে উঠল পুত্রবধূ সম্বোধনে। দুই বাড়ির সবাই জানে তারা একে অপরকে ভালোবাসে। তবুও তার লজ্জা লাগে। তপোবন এগিয়ে গিয়ে সুনেহরার হাত ধরে কাছে নিয়ে আসল। বলল,
-হুম, এই হলো আমার পুত্রবধূ সুনেহরা।
এরোজ বলল,
-এসো এসো, ছোট পাপার কাছে এসো। আমার বয়স-ই বা কত হয়েছে। তুমি এর মধ্যে আমায় শ্বশুড় বানিয়ে দিলে? সো স্যাড!
উপস্থিত সকলে হেসে উঠল তার কথায়। সুনেহরা তার সাথে দেখা করে এসে তানশানের পাশে বসতে গেল ওমনি তাথৈ ছুটে এসে ভাইয়ের কোলে চড়ে গেল। সুনেহরা দাঁতে দাঁত চেপে তাকালো। কিছুটা জেদ ধরেই তানশানের হাত ধরল। ওমনি তাথৈ তার হাতটা ঠেলে সরিয়ে দিলো। থমথমে মুখে বলল,
-ডোন্ট টাচ! মাই ভাইজান।
সুনেহরা এবার কাঁদো কাঁদো চোখে তানশানের দিকে তাকালো। ক্ষেপে গিয়ে বলল,
-এমন কূটনী ননদ থাকলে আমার এ জীবনে আর এক হালি টমাটুর মা হওয়া লাগবে না।
তানশান মুচকি মুচকি হেসে বলল,

-গত সপ্তাহে আমায় মাইর দিয়েছ, সেটা ও দেখেছে। ওর ভাইজানকে যে মারে তাকে ও সহ্য করতে পারে না।
পরপরই সে বোনের উদ্দেশ্যে বলল,
-বোনু, সুনু ভাবি ভাইজানকে ভালোবাসে।
-ভালোবাসে?
-হুম।
-কিন্তু সুনু তোমায় মার দিয়েছে। আমি দেখেছি।
-ও স্যরি বলেছে।
-স্যরি বলেছে?
-হুম।
-কিসি দিয়েছে?
তাথৈ কৌতুহলী গলায় শুধাল।
তানশান আড়চোখে তাকালো মেয়েটির পানে। তাদের ভাই বোনের কাছে রাগ ভাঙানোর একমাত্র মাধ্যম কিসি। তাই এটা এখন একটা নিয়ম হয়ে গিয়েছে। সুনেহরা চটপট করে বলল,
-দেব না-কি কিসি?
তানশান সরব চোখ গরম করে তাকালো। সুনেহরা দাঁত কেলিয়ে ঠোঁট দেখিয়ে বলল,

-একটা দেই।
তানশান কঠিন স্বরে বলল,
-ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু ডু দিজ!
সহসা সুনেহরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। দোতালার স্তম্ভের আড়ালে থাকা হুইলচেয়ারে বসা মানুষটা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সোফায় বসা মৌনতার কোলে থাকা নবজাতকটির দিকে। যার মুখশ্রী অবিকল এরোজের মতো।
ওই দৃষ্টিতে শুধুই আফসোস, আক্ষেপ, যন্ত্রণা, স্মৃতির আনাগোনা। সে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
-কিছু দৃশ্য মৃত্যুর থেকেও অধিক যন্ত্রণাদায়ক।
সরোবর বাড়িটিতে স্বর্গীয় সুখ নেমে এলো। চারিদিকে শুধু সুখের ছোঁয়া। কিন্তু দোতালার ওই একটা ঘরে সাত বছর আগে নামা দুঃখের ছায়া আজ ও কমেনি। বরং সুখের সাথে পাল্লা দিয়ে ইমরোজের দুঃখরা বেড়েছে। উপলব্ধি করেছে এই জীবনে মৌনতাকে হারানো তার জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি ছিল। যেই শাস্তির তিক্ততায় সে আজীবন নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিয়েছে। এই জীবনে কেউ মৌনতা হতে পারবে না, কেউ মৌনতার মতো ইমরোজকে ভালোবাসতে পারবে না। তাই ইমরোজ জীবনকে জীবনের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে। এই হুইলচেয়ার, কাজ আর ঘরে ফিরে মেয়ের ছবি দেখা এটাই তার জীবন।
দরজায় কেউ নক করতেই ইমরোজ বলল,

-দরজা খোলা।
নায়েল চাপিয়ে রাখা দরজাটি খুলে ধীর কদমে ভেতরে ঢুকল,
-পাপা?
ইমরোজ চকিতে ফিরে তাকায়। আখিদ্বয় বেয়ে এক নিমিষেই ফোয়ারার ন্যায় অশ্রু গড়াতে লাগল বারো বছরের নায়েলকে সচক্ষে দেখে। ইমরোজ হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠতেই নায়েল এগিয়ে গেল। বাবার বুকে লেপ্টে গিয়ে বলল,
-আই মিসড ইউ পাপা।
ইমরোজ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-পাপা তোমার জন্য প্রতিনিয়ত গুমড়ে মরেছি নায়েল। পাপার সাথে একটু দেখা করতে ইচ্ছে হয় না?
কিছু কান্না দুঃখ প্রকাশে ব্যর্থ হয়। ইমরোজ ও সেই ব্যর্থতা অনুভব করতে পারল তীব্রভাবে। নায়েল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখন সে সব জানে, সব বোঝে। এবং সব বুঝেই সে সবাইকে তার প্রাপ্য দেয়।
একটি দিন—একটি জীবন। দিনের শুরুটা যেভাবেই হোক না কেন আমাদের অপরাহ্নের কথা একটু হলেও চিন্তা করতে হয়। নয়তো অপরাহ্নে আফসোস ব্যতীত কিছুই থাকবে না।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৭

দিনের শুরুতে আপনি যেই কাজ করবেন, দিনের শেষে অপরাহ্নে আপনি ঠিক সেই ফলাফল ই পাবেন।
তপোবন, রূপকথা, মৌনতা, এরোজ, ভেবেছিল প্রভাতের শুরুতেই তাদের জীবন উপসংহার টেনে নিয়েছে। কিন্তু তারা জানত না অপরাহ্নে আরো একটি উপসংহার তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। যেই উপসংহারের নাম অপরাহ্নে উপসংহার!

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here