Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৯

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৯

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৯
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

বাইরে আজ এত বৃষ্টি! কবে যে এই আষাঢ় মাসটা শেষ হবে! আমি তাড়াহুড়ো করে আজ বের হয়ে গেছি। ঘুম থেকে উঠতে দেরি করে ফেলেছি আজ। তাই নাস্তাও করতে পারিনি। রাহাত ভাইকেও দেখলাম না আজ। আমার অবশ্য এতে অত মাথাব্যথাও নেই। সময়মতো কলেজে যেতে হবে, তার সবচেয়ে বড়ো কারণ হচ্ছে আজ আমার একটা ক্লাস টেস্ট আছে।
বৃষ্টির মধ্যেই আমি ছাতা ছাড়া বের হয়ে গেছি। পেছন থেকে তখন চাচ্চুর কণ্ঠ পেলাম। চাচ্চু হন্তদন্ত হয়ে ছাতা নিয়ে দৌঁড়ে এসেছেন। আমার মাথায় ছাতা ধরে বললেন,

“বৃষ্টি হচ্ছে দেখছিস না?”
আমি চুপ করে তাকিয়ে আছি। সেই ঘটনার পর থেকে চাচ্চু এই পর্যন্ত আমার সাথে আর কথা বলেননি। এমনকি সামনে বসে একসাথে খাবার খাওয়া সত্ত্বেও আমার মুখের দিকে তাকাননি। এতটাও অপরিচিত ব্যবহার করেছিলেন আমার সাথে। সেই জায়গা থেকে আজ এতদিন বাদে পুরনো চাচ্চুকে ফিরে পেয়ে এবং তার যত্নে আমার দুচোখ ভরে উঠেছে মুহূর্তেই।
চাচ্চু কিন্তু আমার সাথে বেশি কথা বলেনি। বাড়ির সামনে থেকে নিজেই একটা সিএনজিতে উঠিয়ে দিয়েছে। ভাড়া আর ছাতা আমার হাতে দিয়ে বললেন,
“সাবধানে যাস।”
যদিও চাচ্চু ভীষণ গম্ভীর হয়ে ছিলেন, তবে আমার মনটা আজ এত বেশি ভালে হয়ে গেছে যে আমি বলে বোঝাতে পারব না। খুশিতে বোধ করি আজ ক্লাস টেস্টটাও খুব ভালো দিয়েছি। এমনকি ক্লাস শেষ করে বন্ধুদের আজ ট্রিটও দিয়েছি।

আমরা এসেছি আজ ধানমণ্ডির ওজ ক্যাফ রেস্টুরেন্টে। এখানে আমরা মাঝে মাঝেই আসি। আমাদের কতশত আড্ডার স্মৃতি এখানে জমে আছে তার কোনো হিসাব নেই। আকাশ বার্গারে কামড় বসিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী উপলক্ষে ট্রিট দিচ্ছিস বললি না তো?”
আমি স্ট্র দিয়ে জুস খেয়ে বললাম,
“ট্রিট দিচ্ছি চুপচাপ ট্রিট নে। এত কিছু জেনে কী করবি?”
সায়রা তখন বলল,
“না, না দোস্ত! এ কেমন কথা? আমরা কারণটা জানব না?”
সুমন বলল,
“তুই কি প্রেমট্রেম করছিস নাকি?”

“তোকে আজ অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি খুশি লাগছে। ঝটফট বল তো আসল কারণটা কী?” বলল মিতু।
আসল, নকল কোনো কারণই আমি ওদের বলতে পারিনি। কারণ ওরা এখনো আমার সাথে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলি জানে না। তাই উলটাপালটা ভুজুংভাজুং বলে আমি কথা ঘুরিয়ে নিয়েছি। তবে আমার আজকের এত খুশির রেশ যে খুব বেশি সময় স্থায়ী হবে না এটা আমি ক্ষুণাক্ষরেও ভাবিনি।
বাসায় ফিরেছি খুশি মনেই। প্রতিদিনের মতোই খেয়েদেয়ে ঘুম দিয়েছি। সন্ধ্যায় উঠে পড়তে বসেছি। কিন্তু বাড়িটা আজ বেশ ফাঁকা লাগছে। এত খুশি ছিলাম যে রাহাত ভাইকে নিয়ে সেভাবে ভাবার ফুরসতই হয়নি। হৃদি রাতে খাওয়ার জন্য ডাকতে এলো। আমি বই বন্ধ করে খেতে গিয়ে দেখি রাহাত ভাই নেই। ভাবলাম হয়তো এখনই আসবে। কিন্তু না! খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। তবুও সে আসছে না। তবে কি সে বাসায় নেই?
আমি দোনোমোনো করে খাওয়া শেষ করে তার রুমে উঁকি দিয়ে দেখি, রুম ফাঁকা। সাহস করে হৃদির রুমে গিয়ে হৃদিকে জিজ্ঞেস করলাম,

“রাহাত ভাই এখনো বাসায় আসেনি?”
“ভাইয়া তো অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে গেছে জানো না?”
আমি ঠোঁট উলটে বললাম,
“ওহ আচ্ছা! জানতাম না। তুই ঘুমা।”
আমি নিজের রুমে চলে এসেছি। রাহাত ভাইকে প্রায়ই ঢাকার বাইরে যেতে হয় অফিসের কাজের জন্য। আগে যে তিনি কখনো আমায় বলে যেতেন বিষয়টা এমন না। কিন্তু এবার কি যাওয়ার পূর্বে তার আমাকে বলা উচিত ছিল না? পরক্ষণেই মনে হলো, আমি তার থেকে এসব কেন আশা করছি? মন বলল, কারণ সে আমাকে ভালোবাসে। সত্যিই তো! এ কেমন ভালোবাসা? যাওয়ার আগে একটাবার বলে গেল না। আবার এই পর্যন্ত একটা মেসেজ, কলও দিল না! না দিক। না দিলেই বরং ভালো। যেই কয়টা দিন এই বাসায় আছি দূরে দূরেই থাকুক তিনি।

তবে আমার এই আত্মসংযম এবং এটিটিউডও বেশিক্ষণ টেকেনি। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরই ভীষণ হাসফাস লাগছিল। আমি অদ্ভুতভাবে তাকে মিস করতে শুরু করলাম তখন থেকেই। খাবার টেবিলে তাকে না পেয়ে আবার অস্থির হতে শুরু করলাম। আজও বাড়ির সামনে তার গাড়িটা নেই। কলেজে প্রতিদিন এখন সে-সে-ই নামিয়ে দেয়। কিন্তু গতকাল ছিল না ,আজও নেই। গতকাল বিষয়টা গায়ে না লাগলেও আজ ভীষণ গায়ে লাগছে। বোধ করি বুকেও লাগছে। কেমন যেন একটা চিনচিনে ব্যথা! এই ব্যথা রইল আমার সারাটাদিন। সবকিছু এত বেশি তেতো আর বিরক্ত লাগছিল যে আমার কারো সাথেই কথা বলতে ভালো লাগছিল না। হাসাহাসি তো অনেক দূরের বিষয়!
বাড়িতে ফিরে আজ আমি খেতেও পারিনি। এমনকি ঘুমাতেও না। মনটা খুব ছটফট করছিল। মন চাচ্ছিল আমি নিজেই একবার কল করি। কিন্তু কে জানে কোন অভিমানে আমি সেই কলটাও করতে পারলাম না। তবে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম তার ফিরে আসার।

সন্ধ্যায় পড়তে বসেছিলাম। কিন্তু পড়াশোনা কিছুই হচ্ছিল না। চোখ বইয়ের দিকে থাকলেও মন পড়ে ছিল রাহাত ভাইয়ের দিকে। হঠাৎ করেই ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠল। আমি তড়িঘড়ি করে ফোন হাতে নিয়ে ভীষণ হতাশ হলাম। সীম কোম্পানী থেকে মেসেজ এসেছে। মন এখন যেন আরো উতলা হতে লাগল। অদ্ভুত, আমার এত কান্না পাচ্ছে কেন? নিচে গাড়ির শব্দ শুনে আমি দৌঁড়ে বারান্দায় গেলাম। অবশেষে তিনি তাহলে এসেছেন!
কিন্তু! বারান্দায় গিয়ে দেখি ছোটো চাচ্চুর গাড়ি। তার মানে তিনি আসেননি! এবার আর কান্না আসেনি, কান্না করেই ফেলেছি। এত বাজেভাবে আমি তার মায়ায় ফেঁসে গেছি তাহলে? এবার ফোনের রিংটোন বাজছে। আমি একছুটে দৌঁড় লাগালাম রুমে। আমাকে তো নাম্বারে সচরাচর কল করে না কেউ। বন্ধুরা সবাই অনলাইনেই কল করে। চাচ্চু আর চাচিমনিও তো বাড়িতে। তাহলে নিশ্চয়ই রাহাত ভাই কল করেছেন! সারাদিন পর তার এখন মনে পড়েছে আমার কথা?

ফোন হাতে নিয়েই আমার হাসি হাসি মুখটায় অন্ধকার নেমে এলো। জিপির অফিস থেকে কল এসেছে। প্রকৃতি কি আজ মজা নিচ্ছে আমার সাথে? আমার দুঃখে খুব সুখ পাচ্ছে? আমার অবস্থা হঠাৎ করেই এত নাজুক হয়ে গেল যে আমার নাওয়া-খাওয়া, পড়া সব বন্ধ হয়ে গেল। হৃদিকে যে জিজ্ঞেস করব, তিনি কবে আসবেন তাও লজ্জায় পারছিলাম না। ও পরে আবার কী না কী ভেবে বসে!
এইযে আমি জানি, তিনি আমাকে কল, মেসেজ করছেন না তবুও আমি ফোনে কোনো কল, মেসেজ এলে আশা নিয়ে চেক করি যে তারই কোনো কল, মেসেজ! হতাশ হবো জেনেও গাড়ির শব্দ শুনলেই উদগ্রীব হয়ে বারান্দায় চলে যাই যে, হয়তো তিনি এসেছেন। এভাবে হতাশ হতে হতে আমার মনে অভিমানের পাহাড় জমে গেছে। আমি এখন আশা করতেও ভয় পাচ্ছি। এটাও বুঝে গেছি যে, তার সব অভিনয় ছিল। করুণা করেছে আমাকে। তাই বলে ভালোবাসার অভিনয় করার কী দরকার ছিল?
আজ তিনটাদিন ধরে আমার খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিক নেই। শরীর দুর্বল হয়ে গেছে। হৃদি জোর করে নিয়ে গেল খাওয়ার জন্য। আমি মনমরা হয়ে চুপচাপ খাবার নাড়াচাড়া করছি। আবার গাড়ির শব্দ। ইচ্ছে তো করছে দৌঁড়ে গিয়ে দেখি। কিন্তু আমি জানি, এবারও আমাকে হতাশ হতে হবে।
“মা, জলদি খেতে দাও তো। খুব খিদে পেয়েছে।”
আমি চমকে পেছনে তাকালাম। রাহাত ভাই এসেছে! চাচিমনি বললেন,
“হাত-মুখ ধুয়ে আয় আগে।”

আমি হঠাৎ-ই যেন অনুভূতিহীন হয়ে গেছি। মাথা কাজ করছে না। তবে বুঝতে পারছি, আমার মন ভীষণ খুশি হয়ে গেছে। পেটের মধ্যে প্রজাপতি উড়ছে। হৃদির, আর চাচ্চুর খাওয়া শেষ। ওরা চলে গেছে। আমি এখনো খাবার নাড়ছি। রাহাত ভাই একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে খাচ্ছেন। আমার সাথে কোনো কথাও বলছেন না।
চাচ্চু রুম থেকে চাচিমনিকে ডাকছিলেন বিধায় চাচিমনি রুমে গেলেন শুনতে। আমাকে বললেন,
“টিস্যুর প্যাকেটটা ওকে দে।”
রাহাত ভাইয়ের খাওয়া শেষ। টিস্যু আমার এদিকে। আমি টিস্যু এগিয়ে দিলাম তাকে। সে টিস্যু না নিয়ে আমার ওড়না দিয়ে হাত আর মুখ মুছে বললেন,
“সবাই শুয়ে পড়লে ছাদে এসো।”
আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে তিনি চলে গেলেন। তবে আমার হুশ আসার সাথে সাথে তীব্র রাগ-অভিমানও হলো। মানে একদম যা তা? তিনদিন কোনো খোঁজ-খবর নেই। আর এখন এসে প্রেম দেখানো হচ্ছে? যাব না আমি ছাদে! এবং সত্যি সত্যিই আমি ছাদে যাইনি।
রাত প্রায় তিনটা হবে তখন। ঘুম মাত্র আসতে শুরু করেছে। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো তখন। আমি ভেতর থেকেই জিজ্ঞেস করলাম,

“কে?”
কোনো জবাব এলো না। আবার নক করার শব্দ হলো। দুবার, তিনবার, চারবার… আমি এবার বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দেখি রাহাত ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কোনোকিছু না বলেই আমার হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“ছাদে আসতে বলেছিলাম। আসলে না কেন?”
“কেন যাব?”
“কথা আছে তাই।”
“তিনদিন যখন কথা বলার প্রয়োজন হয়নি, তখন এখনো কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে তো আমার মনে হয় না।”
তিনি মুচকি হেসে বললেন,

“তুমি কি এতে কষ্ট পেয়েছ?”
“কষ্ট পাব কেন?”
“তাহলে কি অভিমান করেছ?”
“না।”
“রাগ?”
“কোনোটাই না।”
“আমার তো মনে হচ্ছে তিনটাই হয়েছে তোমার সাথে।”
“আপনি রুম থেকে চলে যান।”
“রুম থেকে বের করে কী হবে? মন থেকে তো আর বের করতে পারবে না।”
“আপনি আমার মনে নেই।”
“তার নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি। যাক, আমি তাহলে সাকসেস,”
“মানে?”
“আমি ইচ্ছে করেই তোমাকে বলে যাইনি এবং কোনো যোগাযোগ করিনি। দেখতে চাচ্ছিলাম, তুমি কোনো যোগাযোগ করো কিনা। তুমি অস্থির হও কিনা আমার জন্য। যখন দেখলাম, যোগাযোগ করছ না তখন সত্যিই খুব হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু এখন সামনে থেকে তোমার প্রতিক্রিয়া দেখে মনে আর কোনো দুঃখ, হতাশা নেই। এখন আমিও জানি যে, তুমি আমাকে ভালোবাসো।”

আমি ‘না’ বলতে যাব তার আগেই উনি আমার ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে আমাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললেন,
“উঁহুম!, কোনো মিথ্যা বলতে হবে না। সত্যিটা তুমি না জানলেও আমি জানি। তিনদিন আমার নিজেরও খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু এখন নিজেকে খুব হ্যাপী লাগছে।”
আমি তার হাতটা সরিয়ে দিলাম। তিনি পকেট থেকে প্রায় অর্ধমৃ’ত একটা বেলীফুলের গাজরা বের করে বললেন,
“সেই দুপুরে কিনেছিলাম! তাই শুকিয়ে গেছে। দেখি, ঘুরে দাঁড়াও তো।”
“কেন?”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৮

তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে আমাকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালেন। তারপর গাজরাটি আমার চুলের বেণীতে সুন্দর করে পেচিয়ে আবার সামনে ঘুরিয়ে দাঁড় করালেন। বাচ্চাদের যেভাবে আদর করে গাল ধরা হয় তিনি সেভাবেই আমার গাল ধরে, বাম চোখ টিপ দিয়ে সুরেলা কণ্ঠে এক লাইন গান গাইলেন,
“এই ফাগুনী পূর্ণিমা রাতে,
চল পলায়ে যাই…”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here