Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১
রিদিতা চৌধুরী

“হেই ইউ বোচা নাক, স্ট্যান্ড আপ!”
​হঠাৎ ধমকের সুরে ভেসে আসা কথাটা শুনে রিদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ দুটো গোল গোল করে এদিক-ওদিক তাকাল সে। এই মেয়ে তোমাকে বলছি! রিদি মনে মনে চরম অবাক হলো। তাকে বলছে মানে? তার নাক কি বোচা নাকি? লোকটার সাহস তো কম নয়! প্রফেসর হয়েছে বলে কি ক্লাসরুমের সবার সামনে যা খুশি তাই বলতে পারবে? আশ্চর্য!
​রিদির ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে আবার সেই গমগমে, গম্ভীর কণ্ঠস্বর ক্লাসরুমের দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ফিরে এল—

“হোয়াটস দ্য প্রবলেম? ক্যান্ট ইউ হিয়ার মি?”
​পুরো ক্লাসের সবকটা চোখ এখন রিদির দিকে। ভয়ে, আড়ষ্টতায় রিদি কোনোমতে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। তোতলামো স্বরে বলল, “আ… আমাকে বলছেন, স্যার?”
​ওপাশ থেকে ড্যাশিং, গম্ভীর চেহারার প্রফেসর ডক্টরের কণ্ঠস্বর আরও এক ধাপ চড়ে গেল, “ইয়েস ইউ! টেল মি দা ফর্মুলা আই ওয়াজ টিচিং জাস্ট নাউ?”
​রিদি এবার কাঁচুমাচু মুখ করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। কী করে বলবে সে? এতক্ষণ তো তার মন ক্লাসের ব্ল্যাকবোর্ডে ছিল না। পাশে বসা জানের বান্ধবী সুমির সাথে অনর্গল ফিসফিস করে বকবক করে যাচ্ছিল। রিদিকে এভাবে মাথা নিচু করে চুপ করে থাকতে দেখে প্রফেসর সৌহার্দ্য চৌধুরীর কপালে বিরক্তির ভাঁজ আরও চওড়া হলো। তীব্র এক ধমক দিয়ে বললেন:

​”গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস!”
​অপমানে, রাগে আর লজ্জায় রিদির চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। পুরো ক্লাসের সামনে এই অপমান সে মেনে নিতে পারছে না। কাঁপা হাতে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে, চোখের জল আড়াল করতে করতে কোনো রকমে ক্লাসরুম থেকে প্রায় ছুটে বের হয়ে গেল সে।
​রিদি বেরিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে বিড়বিড় করে বলল, “এটা নাকি ডাক্তার হবে! যার ক্লাসেই মনোযোগ নেই। স্টুপিড!”
​দেশের সেরা কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার সৌহার্দ্য চৌধুরী। সদ্য বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছে সে। এই মেডিকেল কলেজেই প্রফেসর প্লাস কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে জয়েন করেছে মাত্র এক সপ্তাহ হলো।
​সৌহার্দ্য দেখতে যেমন সুদর্শন, তেমনই লম্বা-চওড়া গঠন। সারাক্ষণ এক শান্ত, গম্ভীর ভাব মুখে লেগে থাকে। কথা বলে ভীষণ মেপে এবং কম, কিন্তু কাজের বেলায় সে এক চুলও ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। প্রখ্যাত সারহান চৌধুরী ও শাহেদা চৌধুরীর একমাত্র ছেলে সে। তার ব্যক্তিত্বের আলোয় পুরো মেডিকেল কলেজ যেমন মুগ্ধ, তেমনই তার কড়া মেজাজের ভয়ে তটস্থ।
​অন্যপক্ষে, রিদিতা খান রিদি এই মেডিকেল কলেজেরই প্রথম বর্ষের এক সাধারণ ছাত্রী। গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ হলে কী হবে, চোখ-মুখে এক অদ্ভুত মায়াবী টান আছে। উচ্চতায় কিছুটা খাটো বলে দেখতে ঠিক যেন একটা ছোট্ট, মিষ্টি পুতুলের মতো।

​বাইরে থেকে রিদিকে চঞ্চল মনে হলেও, তার জীবনের পেছনের গল্পটা ভীষণ বেদনার। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক দুর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যায় সে। আশ্রয়হীন হওয়ার উপক্রম হলে, বাবার এক পরম বন্ধুর ছেলের সাথে তড়িঘড়ি করে তার বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, সেই নামমাত্র স্বামী বিয়ের পরপরই রিদির মুখের দিকে একবার না তাকিয়েই পাড়ি জমায় বিদেশে।
​গত চারটে বছর কেটে গেছে। নামমাত্র শ্বশুরবাড়িতে পড়ে আছে রিদি। কিন্তু যে মানুষটার নামের কবুল করছে সে মানুষটা, এই দীর্ঘ চার বছরে সে একটিবারের জন্যও রিদির কোনো খোঁজ নেয়নি। স্বামীহীন একাকীত্ব আর অবহেলা বুকে চেপেও রিদি স্বপ্ন দেখছে ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু আজকের দিনের শুরুটা তার জীবনের চাকা কোন দিকে ঘুরিয়ে দেবে, তা বোধহয় রিদির এখনও অজানা।

দৌড়াতে দৌড়াতে এসে কলেজের মাঠের এক কোণায় জবুথবু হয়ে বসে পড়ল রিদি। বুকের ভেতর থেকে দলা পাকিয়ে আসা কান্নাটা আর চেপে রাখতে পারল না সে। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
​পরক্ষণেই সুমি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে রিদিকে জড়িয়ে ধরল। ব্যাকুল গলায় বলল, “আরে বোকা, কাঁদছিস কেন এভাবে? ওই বেয়াদব প্রফেসরটা তো এমনিই আস্ত একটা খবিশ! তুই তো কাল প্রথম দিন আসিস নি, আসলে দেখতি কী হম্বিতম্বিটাই না দেখাল! সায়েম আর পৃথাকে তো কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল ক্লাসের মধ্যে। ভয়ে আজ ওরা কলেজে আসেওনি। তোকে তো শুধু ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছে, এত ভেঙে পড়ার কী আছে?”
​রিদি কোনো উত্তর দিল না। ওড়নার কোণা দিয়ে চোখের পানিটা মুছে টলমলে পায়ে উঠে দাঁড়াল। সুমির দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসার চেষ্টা করে বলল, “আমি যাইরে সুমি। আজ বাড়িতে অনেক কাজ ফেলে এসেছি। দেরি হলে ছোট মা খুব বকাবকি করবে।”

​সুমি বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলল, “আশ্চর্য রিদি! তুই কি ওই বাড়ির কাজের লোক নাকি রে? তোর সাথে এমন ব্যবহার করে কেন? কেন, তোর শ্বশুর-শাশুড়ি কিছু বলেন না?”
​একটা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে গেল রিদির। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওনাদের কোনো দোষ নেই রে সুমি। ওনারা অনেক ভালো মানুষ। ওনাদের জন্যই আজ আমি এইটুকু পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু যৌথ পরিবারে থাকতে হলে তো অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। কী অদ্ভুত কপাল দেখ আমার—যার সাথে বিয়ে হয়েছে, তার চেহারাটা পর্যন্ত কোনোদিন চোখে দেখিনি। অথচ দিন-রাত শ্বশুরবাড়িতে শুনতে হয়, বাড়ির বউয়ের নাকি এমন হতে হয়, তেমন হতে হয়! একেই বলে পোড়া কপাল!”
​সুমি স্তব্ধ হয়ে গেল। রিদির মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে তার বুকটা হাহাকার করে উঠল। এমন একটা ফুটফুটে, নিষ্পাপ মেয়ের ভাগ্যে এত কষ্ট কেন লিখেছে বিধাতা? সুমির মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে, রিদির ওই পলাতক জামাইটাকে খুঁজে বের করে কষে কয়েকটা থাপ্পড় মারতে! কিন্তু ভাবনার মাঝেই রিদি তাকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল।

সুমি শুধু তাকিয়ে রইল ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে।
​কলেজ থেকে ফিরে দম ফেলার ফুসরত পায়নি রিদি। সংসারের সমস্ত কাজ গুছিয়ে, রান্নাবান্না শেষ করে সবাইকে খাইয়ে-দাইয়ে যখন সে নিজের ঘরে ফিরল, তখন শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই কখন যেন চোখটা লেগে এসেছিল।
​হঠাৎ করেই ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে আসা এক কর্কশ চড়া গলায় রিদির ঘুমটা ভেঙে গেল। শ্বশুরের গলার আওয়াজ পেয়ে সে ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠল। ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে সিঁড়ির কাছে আসতেই তার পায়ের পাতা দুটো যেন মেঝেতে জমে গেল।
​ড্রয়িং রুমের সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসে আছে এক যুবক। আর কেউ নয়—তাদের কলেজের সেই নতুন, অহংকারী প্রফেসর সৌহার্দ্য! রিদি অবাক চোখে দেখল, তার শ্বশুর সারহান চৌধুরী যাকে তীব্র গলায় ধমকাচ্ছেন, সে আর কেউ নয়, এই সৌহার্দ্যই। অথচ লোকটা কেমন নির্বিকার! যেন এই ধমক, এই চিৎকার তাকে স্পর্শই করছে না। পাশে বসে শাশুড়ি শাহেদা চৌধুরী পরম স্নেহে সৌহার্দ্যর পিঠে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বাড়ির বাকি সদস্যরা পাথরের মতো নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
​”কী হলো, উত্তর দিচ্ছ না কেন?” সারহান চৌধুরীর রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, “আজ এক সপ্তাহ হলো দেশে এসেছ, অথচ বাড়ি ফিরলে আজ? তুমি কি ভুলে গেছ তোমার একটা বউ আছে? এই বাড়িতে কারো প্রতি তোমার কোনো দায়িত্ব আছে?”

​এতক্ষণে সৌহার্দ্য তার নীরবতা ভাঙল। চরম উদাসীন আর ঠান্ডা গলায় বলল, “সব সময় তোমার ইচ্ছেগুলো আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া বন্ধ করো, বাবা। আমি এই বিয়ে মানি না। ওই মেয়ে যদি এই বাড়িতে থাকে, তবে ওকে আমার সামনে আসতে বারণ করবে। খুব শীঘ্রই আমি ডিভোর্সের কাজকর্ম শুরু করে দেব।”
​কথাটা বলেই সে সোফা ছেড়ে উঠে সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল।
​সৌহার্দ্যকে ওপরে আসতে দেখে রিদি চট করে নিজের মাথার ওড়নাটা টেনে ঘোমটা দিয়ে রুমে ঢুকে গেল। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তার আর বুঝতে বাকি রইল না—এই নাক-উঁচু, বেয়াদব লোকটাই আসলে তার সেই স্বামী, যে তাকে বিয়ের পর ফেলে চলে গিয়েছিল এবং যার কোনো খোঁজ সে জানত না।
​বিছানায় মুখ গুঁজে হুহু করে কেঁদে উঠল রিদি। বুকের ভেতরটা চুরমার হয়ে যাচ্ছে তার। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! কলেজে যার কাছে অপমানিত হতে হলো, সে-ই তার জীবনের অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার দাবিদার? রিদি খুব ভালো করে বুঝে গেল, এই কঠিন হৃদয়ের মানুষটা তাকে কোনোদিনও নিজের করে মেনে নেবে না।
​পরদিন ভোর পাঁচটা। প্রতিদিনের অভ্যাসমতো রিদি খুব ভোরে উঠে নামাজ শেষ করল। সবার জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করে সে ছাদে গেল গাছে পানি দিতে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় গাছে গাছে পানি দিতে দিতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল ছাদের এক কোণায়।

​কেউ একজন খালি গায়ে পুশ-আপ করছে। ঘামে ভেজা চওড়া পিঠ আর পেশিবহুল শরীরটার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করতেই রিদির চিনতে দেরি হলো না—ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, সৌহার্দ্য।
​রিদি ভয়ে ও সংকোচে তাড়াহুড়ো করে নিজের মাথার ঘোমটাটা আরও টেনে নিল। কোনো রকমে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য যেই না পা বাড়িয়েছে, অমনি পেছন থেকে ভেসে আসল এক গম্ভীর, গমগমে কণ্ঠস্বর—
​”হেই ঘোমটাওলি দেড় ব্যাটারি! দাঁড়াও…”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here