দুইজনাতেই পর্ব ২৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
ভোর বেলায় প্রথমে ঘুমটা ভাঙ্গল সাক্ষ্যরই। দ্বিতী তখনও ঘুমে। ঘন্টা কয়েক আগে গোসল সারার কারণ স্বরূপ চুলগুলোও ভেজা। একদম ছোটখাটো আদুরে পুতুলের মতোই গুঁটিয়ে আছে দ্বিতী। মুখটা দেখাচ্ছে বাচ্চা মতো পিচ্চি একটা মেয়ের মতো। সাক্ষ্য চেয়ে চেয়ে হাসে। নরম গাল, কোমল ঠোঁট এবং বন্ধ চোখের পাতায় আঙ্গুল বুলিয়ে হেসে ফেলল সে। দ্বিতীর ভেজা চুলের কারণে নিজের টিশার্টটা ও ভিজে বুকে লেপ্টে আছে। তবুও পাল্টাল না । ওভাবেই নিজের বুকের মধ্যে পড়ে থাকা আদুরে মুখটাকে পরখ করতে করতে হুট করে হুশ এল। চেয়ে দেখল ঘড়ির কাটায় তখন সকাল নয়টা। উঠতে হবে। সাক্ষ্য নড়চড় করে ধীর গলাতেই ডাকল দ্বিতীকে,
“ দ্বিতী, শুনছেন? ”
ঘুমকাতুরে দ্বিতী কপাল কুঁচকাল খুব করে। এত ভোরে তাকে ডাকা হবে কেন? ঘুম ভাঙ্গবে ও কি? দ্বিতীর সত্যিই ঘুম ভাঙ্গল না। বরং ছোট্ট পাখির ছানারা যেমন ওম খুঁজে আরো আরাম করে ঘুমায় ওভাবেই ঘুমাল ও সাক্ষ্যর দিকটায় ঘেষে। সাক্ষ্যর ফের হাসি আসল। দ্বিতীর ডান গালে হাত রেখে আলতো করে ডেকে বলল,
“ নয়টা বাজে মিসেস এহসান। আপনার আবার আজ রিসিপশন। ”
দ্বিতী খুব বিরক্ত হয়ে সরু চোখে চাইল চোখমুখ কুঁচকে নিয়ে। তখনও চোখে ঘুম তার। ঘুমের ঘোরে হয়তোবা বুঝলও না এটা সাক্ষ্য। শুধু আবদারের সুরে বলল নরম গলায়,
“ আরেকটু ঘুমাই? আমার ঘুম হয়নি তো। ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলে ঘুম জড়ানো স্বরটা শুনে। কিভাবে বলছে, ঘুম হয়নি। অথচ জেগে থাকলে এই দ্বিতীই তুলকালাম বাঁধাত। গলার স্বর থাকত ঝগড়ার ন্যায়। দৃষ্টি থাকত তীক্ষ্ণ। সাক্ষ্য হাসে। ভ্রু নাচিয়ে বলে,
“ ঘুম হয়নি? ”
“ না, আরেকটু ঘুমাব আমি। ”
সাক্ষ্য হেসে এবারে কপালে পড়া এলোমেলো চুলগুলো কানে গুঁজল। তারপর মুখ এগিয়ে আচমকাই চুমু খেল দ্বিতীর কপালে, গালে এবং উঁচু নাকে। বিড়বিড় করে বলল,
“ ঘুমকাতুরে মিসেস এহসানের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য আজকের মতো সরি। ঘুমান তাহলে। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য উঠল। পরনের টিশার্টটা ঠিকঠাক করে ধীর পায়ে ওয়াশরুমে গেল। অতঃপর ফ্রেশ হয়ে ফিরেও যখন দেখল দ্বিতী একইভাবেই হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে তখন সাক্ষ্য চেয়ে থাকল। জানালা ভেদ করে আসা মৃদু আলোতে ঘুমের মধ্যে চোখ মুখ কুঁচকে নিতেই সাক্ষ্য এগিয়ে গেল। জানালার পর্দাটা টেনে দিল মুহূর্তেই যাতে দ্বিতীর মুখে আলো না আসে। সাক্ষ্য রুমটা আবছায়ার মতো মুদৃ আলোতে ভরা রুমটা করে তারপরই বের হলো। তাও ধীর পায়ে। যাতে আওয়াজ নাা হয়। অবশেষে দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়েও একপলক উঁকি দিয়ে চাইল। অতঃপর মনে মনে আওড়াল,
“ অদিতি আন্টির একমাত্র মেয়ে সত্যিই খুব ঘুম পাগল। ”
সাক্ষ্য এর মাঝেও বার কয়েক রুমে এসে ঘুরঘুর করে গিয়েছে। বউকে দেখে গিয়েছে বারকয়েক। এর মধ্যে টুকটাক কাজ যা আছে বা ব্যস্ততা মিটিয়েছে। এত বড় একটা অনুষ্ঠান যেহেতি ব্যস্ততা তো থাকবেই।
অবশেষে দ্বিতীর ঘুমটা ভাঙ্গল বেলা সাড়ে এগারোটা। বিয়ে বাড়িতে নতুন বউ হিসেবে বিয়ের পরদিন এত বেলা করে উঠা কি খুবই ভালো? দ্বিতী এই বিষয়টা বুঝে উঠল না তখনও। ঘুমঘুমে চোখে চোখ মেলে তাকাতেই সর্বপ্রথম সাক্ষ্যর হাসি দেখা গেল। বাঁকা হাসি। শুধাল
“ গুড মর্নিং মিসেস এহসান। ঘুম ভালো হলো? ”
দ্বিতী মিনমিনে চোখে চাইল। বোধহয় শরীর জুড়ে রিনরিনে একটা ব্যথায় কপাল কুঁচকে এল তার। সাক্ষ্য ফের আবারও বাঁকা হেসে, ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ আরেকটু ঘুমান। ঘুম হয়নি তো। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়। নিজের এলোমেলো চুলগুলো দুই হাতে আলগোছে খোঁপা করল উঠে বসে। অতঃপর বালিশের কাছ থেকে ওড়নাটা টেনে নিয়ে গলায় জড়াতেই মনে পড়ল রাতে সে শাড়ি পরেছল। হালকা গোলাটি রাঙা সুতির একটা শাড়ি। আর বর্তমানে তার পরনে আছে একটা কামিজ। দ্বিতীর অসুবিধা হলো না রাতের কথা মনে পড়তে। আচমকা দুয়েক কদম সরে গিয়ে সে কপাল কুঁচকাল। তড়িঘড়ি করে ঘড়িতে সময় দেখতে গিয়েই চোখে পড়ল প্রায় বারোটার কাছাকাছি সময়। এতোটা সময়? এতোটা সময় সে ঘুমিয়েছিল ভাবতেই দ্বিতীর চোখজোড়া কাঁদো কাঁদো হয়ে লাল হয়ে গেল যেন। রাগে দুঃখে দাঁত চেপেই সাক্ষ্যর দিকে তাকিয়েই বলে উঠল,
“ দাঁত কেলিয়ে এমন হাসার মানে কি? জোকার লাগছে আমাকে? ”
“ একদমই না। আমার ঘরনী লাগছে। তা বলুন, সব ঠিক? শরীর সুস্থ? ঠিকঠাক আছেন? ”
কথাগুলো ঠোঁটে হাসব রেখেভ বলতে বলতে দ্বিতীর কপালে হাত রাখল সাক্ষ্য। ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা নবয়ে দ্বিতীর চোখে চোখ রাখতেই দ্বিতী কপাল কুঁচকাল। ছেলেমানুষ হয়ে ঢয় করছে? নাকব দ্বিতীর কাছেই ঢং মনে হচ্ছে এসব? ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ যা মনে করাতে চাইছেন তা আমার মনে আছে। অযথা ঢং করবেন না। ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল ঠোঁট বাঁকিয়ে। একপাশে ঠোঁট এলিয়ে বলে উঠল,
“ কি মনে আছে? আমাকেও বলুন। ”
দ্বিতী চোখ ছোট ছোট করে চাইল। তার কব লজ্জায় আরক্ত হওয়া উচিত? নাকি সাক্ষ্যর এসব খোঁচা মতো কথা শুনে রেগে যাওয়া উচিত? দ্বিতী ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়ে প্রসঙ্গ ঘুরাতে বলল,
“ জেগে জেগে কি এতোটা সময় মজা নিচ্ছিলেন? ডাকেননি কেন আমাকে? ডাকা উচিত ছিল না? ”
সাক্ষ্য ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে জানাল,
“ অদিতি আন্টির মেয়ের নাকি ঘুম হয়নি। আরেকটু ঘুমাবে। এই পর্যায়ে আমি কি তাকে জোর করেই ঘুম থেকে তুলে দিতাম? ”
“ কে বলেছে আরেকটু ঘুমাবে? ”
“ সাক্ষ্য এহসানের ওয়াইফ। ঘুমঘুম স্বরে বাচ্চাদের মতো বলেছে, ঘুম হয়নি তো। ঘুমাব আরেকটু। ”
দ্বিতী এই পর্যায়ে চুপ হয়ে গেল। লজ্জা হচ্ছে তার। না চাইতেও সে রাগ রাগ ভাবটা পুরোপুরি ধরে রাখতে পারছে না। ফর্সা গাল আরক্ত হয়ে উঠেছে। সাক্ষ্য সে আরক্ত গাল পরখ খরেই ঠোঁট চেপে হেসে বলে উঠল,
“ তা ম্যাম, ঘুম হয়নি কেন? ”
দ্বিতীর এই পর্যায়ে ইচ্ছে সাক্ষ্যর এই ঢংকে নদীতে ছুড়ে ফেলতে। ছেলেমানুষ হয়ে কত ঢং করে। কত ঢং! দ্বিতী ফোঁসফাঁস শ্বকস তুলেই বলল,
“ জানেন না? ”
“ জানি? ”
“ নাটক কম করবেন। আমায় ডাকেননি এখন দাঁত কেলিয়ে হেসে রাগাবেন না। সহ্য হচ্ছে না। ”
সাক্ষ্য আরো বেশি হাসল৷ ঠোঁট কামড়ে হেসে দ্বিতীকে পরখ করছিল। অন্যদিকে দ্বিতী ভাবছে এত বেলা অব্দি ঘুমিয়ে বাইরে বের হবে কি করে সে? সবাই বুঝে যাবে কিছু? দ্বিতীর মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে এল। এমনিতে খুব চঞ্চল হলেও এসব বিষয়ে সে খুবই লজ্জাবতী। বিশেষ বড়দের সামনে। ছিহ ছিহ! বড়রা সব কি ভাবছে? দ্বিতী কেন ঘুম থেকে উঠল না তাড়াতাড়ি? দ্বিতী যখন এসব ভাবনায় মশগুল ঠিক তখনই সাক্ষ্য গতকাল রাতের বিছানা সাজানো ফুলের পাপড়িগুলো দেখল। কেমন নুইয়ে কালচে হয়ে গেছে। বিছানা থেকে রুমের এককোণে ঝুড়িটায় ঠাঁই হয়েছে। ভোরের আগে গোসল সেরে, বিছানা ঠিক করে ফুল আর পাপড়িগুলো দ্বিতীই রেখেছে ঝুড়িতে। সাক্ষ্য সেগুলো পরখ করেই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ ইশশ! আপনার শখের ফুল আর পাপড়ি গুলো। এত পছন্দ হয়েছিল যে আমায় সোফায় অব্দি পাঠিয়ে দিলেন। অথচ এভাবে দুমড়ে মুঁছড়ে ফেলে দিতে পারলেন? মায়া হলো না? ”
দ্বিতী এই পর্যায়ে এমনভাবে চাইল যে সাক্ষ্যকে আজই খতম করে দিবে।একটা লোক এত নাটকবাজ কেন হবে? কেন? দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ হচ্ছে, অনেক মায়া হচ্ছে। কিন্তু আপনার মতো ধূর্ত লোকের জন্য তো আর রাখতে পারলাম না ওদের ভালোভাবে। ”
সাক্ষ্য ফের পকেটে গুঁজে জবাব দিল,
দুইজনাতেই পর্ব ২৭
“ আপনার দায় নেই বলছেন? ”
“ দায় যারই থাকুক, আপনি যে খুব ভালো মানুষ নন স্বীকার করুন। ”
“ ভালো হয়ে লাভটা কি বলুন? এর চাইতে শুনুন রাগ না করে। আপনার যখন ডেকোরেশনটা ভালোই লেগেছে তখন নাহয় আপনার জন্য আরো কয়েকবার ফুল আনিয়ে সাজাতে পারি। কি বলুন? ”
শেষের কথাটা সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়েই বলল। চোখে হাসির রেশ স্পষ্টই। যেন দ্বিতীকে এভাবে একটার পর একটা কথা বলে তার চেয়ে খুশি আর কেউ হচ্ছে না।
