প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৬
রোজ ও রুশা
জাওয়াদ খান ধীর পায়ে বন্ধুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর মাথাটা নিচু করে ফেলল। কণ্ঠ ভারী হয়ে এসেছে, চোখদুটো ভরে উঠেছে অপরাধবোধ আর অনুশোচনায়। নিজের বন্ধুকে বিশ্বাস না করে, তার চোখের ভাষা না পড়ে, তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য আজ সে ভীষণ লজ্জিত।
তবুও তার মন জানে— যত ভুলই হোক, যত দূরত্বই তৈরি হোক, জিহানকে সে কোনোদিন শুধুমাত্র একজন বন্ধু হিসেবে ভাবেনি, জিহান ছিল তার ভাইয়ের চেয়েও বেশি কিছু , তার জীবনের সবচেয়ে আপন জন । সেই বন্ধুত্বের বন্ধন থেকে সে এত বছরেও বের হতে পারেনি। বরং বন্ধুকে হারানোর যন্ত্রণা তাকে প্রতিদিন ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিয়েছে।
সেদিন রাগ, অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝির ঝড়ে সে যা করেছিল, তার পেছনেও ছিল ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের তীব্র আঘাত। নিজের স্ত্রী আর সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে ঘিরে এমন একটি পরিস্থিতি সে নিজের চোখে দেখেছিল, যা তাকে বিচলিত করে দিয়েছিল। তার ওপর জিহানের মুখের স্বীকাউক্তি তাকে আরও বেশি ভেঙে দিয়েছিল। সবকিছু মিলিয়ে সে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল, সম্পর্কটাকেই শেষ করে দিয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে বুঝতে পেরেছে, কিছু সম্পর্ক রাগে ভাঙা যায়, কিন্তু হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায় না। বন্ধুত্ব ঠিক তেমনই একটি সম্পর্ক। তাই আজ সমস্ত অহংকার, অভিমান আর ভুলের বোঝা নামিয়ে রেখে জাওয়াদ নিজেই জিহানের সামনে মাথা নত করল।
কারণ সে জানে, ক্ষমা চাওয়া ছোট হওয়া নয়। আর সত্যিকারের বন্ধুর কাছে মাথা নত করতে কোনো লজ্জা নেই। বরং সেটাই প্রমাণ করে— রক্তের সম্পর্কের বাইরেও কিছু মানুষ থাকে, যারা হৃদয়ের গভীরে চিরকাল আপন হয়ে থাকে।
“ একবার… শুধু একবার কি আমাদের একটা সুযোগ দেওয়া যায় না? এই দুই ভাইবোনকে বিশ্বাস কর। এটাই প্রথম… আর এটাই শেষ। আমাদের একটু তোদের কাছে থাকার সুযোগ দে, তোদের ভালোবাসার মাঝে বাঁচার সুযোগ দে ভাই ।
কেবিন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তখনই ধীর অথচ কঠিন কণ্ঠে বলে ওঠে জিহান তালুকদার —
“ জীবনে ভুল মানুষ আর অবিশ্বাসী মানুষ থাকার চেয়ে একা থাকাই ভালো।
— কথাটা শুনে সবাই চুপ হয়ে যায়।কাজল খান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাইয়ের কথার উপর আর কিছু বলার সাহস হয় না। এ যেন এডভোকেট এম এল এ কাজল খান নয়, এ হচ্ছে জিহান তালুকদারের ছোট পুতুল কাজল রেখা। জাওয়াদ খানের পিচ্চি কিশোরি রূপবতী বউ।
— এদিকে হেরা তখনও মাকে জড়িয়ে ধরে আছে। বাবা মাকে কাছে পেয়ে যেনো একটুকরো জান্নাত পেয়েছে সে। কিন্তু বাবার অভিমান যে পাহাড় সমান তা খুব ভালো বুঝতে পারছে সে। রাগ করাটা যে স্বাভাবিক ভুঝতে পারে তাও ভেজা চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে ওঠে—
“ আব্বু… প্লিজ। তুমি বাবা আর আম্মুকে ক্ষমা করে দাও।
মেয়ের কথা শুনে জিহান তালুকদারের বুকটা হুহু করে ওঠে। চোখের কোণের পানি মুছে মেয়ের মাথায় হাত রেখে শান্ত গলায় বলে—
“ মা রে, তুই এসব বলিস না। আমি তোকে কখনো তাদের থেকে দূরে রাখব না। একজন তোকে জন্ম দিয়েছে আরেকজন তোকে নতুন জীবন দিয়েছে। কিন্তু আমরা দুই ভাইবোন যেমন ছিলাম… তেমনই থাকব। যেখানে বিশ্বাস ভরসা নেই সেখানে থেকে কি করবো বল।
কাজল খানের দিকে তাকিয়ে স্নেহ ভরা ক্লান্ত সুরে বলে —
” চল বোন, অনেক হয়েছে। এই দমবন্ধ করা শহরে আর না… এবার আমরা চলে যাব আমাদের শান্তির নীড়ে।
কথাগুলো বলেই কাজল খানের হাত ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। হঠাৎ থেমে নাভানের সামনে দাঁড়ায় জিহান তালুকদার। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—
“শেহতাজ… তুই কি এখানেই থাকবি, নাকি আমাদের সঙ্গে যাবি?
নাভান কোনো উত্তর দেয় না।
সে শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে তাদের চলে যাওয়ার দিকে… যেন বুকের ভেতর হাজারটা না-বলা কথা জমে আছে।নাভান কিছু বলে না, কাকে ছেড়ে কার কাছে যবে । একদিকে মা আরেকদিকে বাবা,আরেক দিকে মামা আরেক দিকে ফুপি। না এবার তাকে মাঠে নামতে হবে!
এই প্রথম কাজল খান ও জিহান তালুকদার বহু বছর পর তাদের গাজীপুরের বাড়িতে এসেছে। কাজল খান জানতো নাভান বাড়ি করেছে, সে বাড়িতে তার আসা হয়নি। আজ ভাইকে সাথে করে নিয়ে এসেছে। তারা আসতেই রহিম চাচা সবাইকে ঘরে নিয়ে গেল। সাথে ছিল এডভোকেট কাজল খান-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট তন্নি। রুমে ঢুকেই তন্নি এক এক করে কাজল খানের ঘর দেখিয়ে দিল। কার রুম কোনটা, কোথায় কী আছে—সব বিস্তারিত বুঝিয়ে দিল সে।
এই বাড়িটার প্রতিটা কোণায় যেন নাভান-এর ছোঁয়া লেগে আছে। বাড়ির ডিজাইন থেকে শুরু করে সাজসজ্জা—সবকিছুই তার নিজের পছন্দে করা। যেন পুরো বাড়িটাই তার মনের প্রতিচ্ছবি। সে ছাড়া এই বাড়ির কোনো কিছুই যেন পরিপূর্ণ না। আর নাভানের নিজের রুমটা তো একেবারেই আলাদা—একটা রহস্যে ঘেরা জায়গা। খুব কম মানুষই সেখানে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে।
এদিকে হেরা মাকে ফিরে পেয়ে আবেগে ভেঙে পড়েছে। এতদিনের জমে থাকা শূন্যতা, কষ্ট আর অপেক্ষা যেন এক মুহূর্তে চোখের পানিতে গলে যাচ্ছে। কিন্তু মাকে ফিরে পেলেও বাবার না থাকা তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা করে দিচ্ছে। জীবনটা কেন এত এলোমেলো হয়ে গেল—সেই প্রশ্নটাই বারবার তাকে কষ্ট দিচ্ছে। তবুও তার মনে একটাই জেদ, যেভাবেই হোক সে তার বাবা-মাকে আবার এক করবে। তার জন্য যদি ওই অসভ্য গিটার ওয়ালার সাথে কথা বলতে হয় তাই করবে।
সবাই এখন জাওয়াদ খান-এর বাসায় এসেছে। গাজীপুরের জায়গা বিক্রি করে দেয়া হয়েছিলো আর সেই ভিটা নাভান ডাবল টাকা দিয়ে নিজের নামেই করে নিয়েছে।
তৌহিদা তালুকদার ফ্রেশ হয়ে ভাই এর সাথে বসেছে। হেরা মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। এতদিন পর এই শান্তিটুকু যেন তার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে। আর একটু দূরে বসে আছে জাওয়াদ খান । মুখভরা চিন্তা, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। এত অল্প সময়ের মধ্যে এত কিছু ঘটে গেছে যে, সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না কোনটা সামলাবে।
সে তো ভেবেছিল কাজল খান অবশেষে তাকে মেনে নিয়েছে। কারণ এতদিন পাশাপাশি কাজ করেছে তারা, একসাথে লড়েছে সবার আড়ালে। সেইদিন রাতে কাজল খান মেসেজ এর কথা বলে দিয়েছিলো অনেক টেকনিক খাটিয়ে। তার পর থেকে আড়ালে একসাথে লড়াই ও সামনে না মেনে নেয়ার নাটক । জাওয়াদ খান, সে মন থেকে খুশি ছিল। মনে হচ্ছিল এবার হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু উলটপালট হয়ে গেল।
আজ দুই দিন হয়েছে। এই দুই দিনে জাওয়াদ খান বন্ধুর কাছে গিয়েছে,হেরাও তার আব্বুকে বুঝিয়েছে। কিন্তু লাভ হয় নি। এদিকে আপাতত নাভান চুপ সে তার কাজে বেস্ত আছে। আজও হেরাকে নিয়ে সকালে গিয়েছিলো গাজীপুরে। সাথে রোজ রুশা,ঝিনুক ও গিয়েছিলো । কিন্তু কোনোভাবে জিহান তালুকদারের মন গলাতে পারে নি। বিকেল ৫ ট সন্ধ্যার আজান দিবে একটু পর।
জাওয়াদ খান চুপচাপ বসে ছিল। সামনে তৌহিদা জিহান তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে ভাই -এর দিকে তাকায়। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক কষ্ট আর অভিমান জমে আছে। ভারী গলায় সে বলে ওঠে—
“ আমি সত্যিই ভেবেছিলাম এবার সব ঠিক হবে… কিন্তু ভাগ্য বোধহয় আমাদের একটু বেশিই পরীক্ষা নিতে ভালোবাসে।”
জাওয়াদ খান মুখ ভার করে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীর গলায় বলে ওঠে—
“ কি করবি ভাবছিস এখন…?
কথাটা শুনতেই ঘর জুড়ে যেন আরও ভারী নীরবতা নেমে আসে। তৌহিদা-জিহানের মুখটা মুহূর্তেই নিচু হয়ে যায়। চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ছে, থামছেই না। সে শক্ত করে মেয়েটাকে জাপটে ধরে আছে, যেন ভয় হচ্ছে আবার হারিয়ে ফেলবে। কাঁপা হাতে মেয়ের হাত চেপে ধরে হঠাৎ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কান্না মিশ্রিত গলায় বলে ওঠে–
“ ভাই… আমি কিছু জানি না… কিছুই জানি না। যেভাবেই হোক আমাদের ক্ষমা চাইতেই হবে। মাথা নত করতেই হবে। আমরা যে অপরাধ করেছি… এটা ক্ষমার যোগ্য না। বিশ্বাস কর, ভুলটা আমাদেরই ছিল ভাই… পুরোপুরি আমাদের…”
কথা বলতে বলতেই তার গলা ভেঙে আসে। বুক চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে।
“ সেদিন…(থেমে ধির গলায়) সেদিন আমরা কাজল রেখাকে ওইভাবে রেখে চলে এসেছিলাম। আর আমার পিপি… (কান্না ভেজা গলায়) আমার ছোট পিপিকেও ফেলে এসেছিলাম। ও কত কাঁদছিল আমার পিছন পিছন… শুধু চাইছিল আমি ওকে নিয়ে যাই। ওর হাত দুটো আমার কাপড় আঁকড়ে ধরেছিল… কিন্তু আমি… আমি ওকে সরিয়ে দিয়েছিলাম…”
তৌহিদা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
“ আমি পাপ করেছি ভাই… আমি অনেক বড় পাপ করেছি। সেদিন যদি আমি না ছুটে আসতাম, তাহলে তুইও আসতি না। সবকিছু অন্যরকম হতে পারত। আমি শুধু একজনের না সবার মন ভেঙেছি। দুইটা মানুষকে আলাদা করেছি। দুইড়া ছোট্ট শিশুর মনে আঘাত করেছি…
হেরা অবাক হয় ! নাভান আর সে দুজন দুজনের জন্য এতো পাগল ছিলো ছোট বেলায়? কই তার তো কিছু মনে নেই। তৌহিদা জিহান নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করতে করতে বলতে থাকে —
“ আমার শাস্তি হওয়া উচিত ভাই। আমি যদি আজ তাদের সামনে মাথা নত করি তাও কম হবে। আমি যে পাপী… আমি নিজের হাতে একটা সংসার ভেঙেছি… দুইটা শিশুর কান্না উপেক্ষা করেছি…”
হেরা মায়ের কোল থেকে মাথা উঠিয়ে বলে—
‘ আমি কান্না করেছি? কই আমার তো কিছুই মনে নেই ।
জাওয়াদ খান নড়ে চড়ে বসে। নাভানের সাথে তার বিয়ের কথা হয়েছিলো এটা জানে সে। কিন্তু সত্যি সত্যি যে, সেই বাচ্চা বয়সে কবুল পরিয়েছিলো। তার দুই মা । তা তো তার অজানা। হ্যাঁ সেদিন হয় নি রেজিস্টার, হয় নি আইনি কোনো কিছু, না হয়েছে অনুষ্ঠান। শুধু হুজুর এনে কবুল পরিয়ে মেয়ের কান্না আটকিয়েছিলো দুই পরিবার।
ঠিক তখনই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা নাভানকে দেখে হঠাৎ থমকে যায় তৌহিদা- জিহান।
কয়েক সেকেন্ড সে শুধু তাকিয়েই থাকে। তারপর যেন নিজেকে আর সামলাতে পারে না। ছুটে গিয়ে নাভানকে জাপটে ধরে ভেঙে পড়ে কান্নায়।
“ আমার আব্বাজান…! আমার পিপি!
তার কণ্ঠে এতটা ভাঙন ছিল যে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দ হয়ে যায়।
‘ বাবা তুই এসেছিস। মায়ের মতো তোর ছোট বাবার মতো তোর পিপিকে ক্ষমা করিস না! করিস না ক্ষমা। … জানিস বাবা, আমি শাস্তি পেয়েছি । তোর কান্নার থেকেও আমি বেশি কেঁদেছি। প্রতি রাতে কেঁদেছি। তোদের কষ্টের কথা ভেবে। আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে গেছে প্রতিনিয়ত …”
নাভানের শার্ট শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে–
“ তুই আমাকে ক্ষমা করিস না। তোর ছোট-বাবার মতো তুইও ঘৃণা কর আমাকে। আমি তোর আর তোর পরি বউ কে আলাদা করেছি। তোর কোলে ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় তর পরি বউকে কেড়ে নিয়েছিলাম নিষ্ঠুর এর মতো ।
নাভান চোখ বন্ধ করে ফেলে। সেই মুহুর্তের কথা মনে হলে দম বন্ধ হয়ে আসে। পরি বউ কে ছাড়া যে সে প্রতি সেকেন্ডে ছটফট করেছে।
“ আমি জানি, আমি ক্ষমার যোগ্য না। কিন্তু বিশ্বাস কর বাবা… আমি তোদের কষ্টের কথা ভেবে প্রতিটা দিন মরেছি। প্রতিটা রাতে মনে হয়েছে আমার নিজের বুকের ভেতর কেউ আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে।
নিজের ফুপিকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে নাভানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকে এই মানুষটাকে সে কখনো “ফুপি” বলে ডাকেনি। তার কাছে তৌহিদা জিহান মানেই ছিল — পিপি মনি …
এই ডাকের মাঝেই ছিল আলাদা একটা মায়া, আলাদা একটা সম্পর্ক।
ছোটবেলায় ঘুম না এলে এই মানুষটাই তাকে বুকে নিয়ে গল্প বলত। অসুস্থ হলে সারারাত পাশে বসে থাকতো, যত্ন নিতো । আর আজ সেই মানুষটাই তার সামনে মাথা নিচু করে কাঁদছে… নিজেকে পাপী বলছে।
নাভানের চোখ নরম হয়ে আসে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে তৌহিদার দু’গাল নিজের হাতে তুলে নেয়। তারপর কপাল কুঁচকে একটু রাগ দেখানোর ভঙ্গিতে বলে ওঠে —
“ তুমি শান্ত হও পিপি মনি … শান্ত হও। কে বলেছে তোমাকে আমি ক্ষমা করিনি?
তৌহিদা হতভম্ব হয়ে তাকায়।
নাভান এবার মুচকি হেসে বলে–
“ ক্ষমা না করলে এত কিছু করতাম নাকি? তুমি কি ভাবো আমি এমনি এমনি সব সামলেছি?
ঘরে থাকা সবাই চুপ করে তাদের দেখছে।
নাভান একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে–
“ আর একটা কথা বলি পিপি মনি ?”
তৌহিদা কাঁপা গলায় বলে–
“ কি বাবা…?
নাবানের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে–
“ তুমি কিন্তু আমার শাশুড়ী মা হয়ে গেছো।
মুহূর্তেই তৌহিদা জিহান অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে।
“ মানে…?
নাভান এবার একটু ঝুকে বলে উঠে–
” ছোটবেলায় কবুল বলিয়ে ছিলে ? তখন তো কিছু বুঝতাম না। এখন বুঝি। তাই হিসাব করে দেখলাম তোমার যে ঘাড় ত্যাড়া মেয়ে একে কেউ টেকেল দিতে পারবে না। আর তোমাদের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে এই ঘাড় ত্যাড়া মেয়েকে আবার বিয়ে করে নিয়েছি।
— কথাটা ফিসফিস করে বলেছে দেখে কেউ শুনতে পায় নি। কান্নার মাঝেও বোন কে একটু স্বাভাবিক হতে দেখে জাওয়াদ খান পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলেন। নাভান এবার আবার তৌহিদার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে ওঠে—
“ পিপি মনি … একটা কথা মনে রাখবে। তুমি ভুল করেছো, হ্যাঁ। তুমিও কিন্তু আমাদের কম ভালোবাসো নি । আমি যদি রাগ করেই থাকতাম, তাহলে আজও তোমার সামনে দাঁড়িয়ে ‘পিপি মনি ’ বলে ডাকতাম না।”
তৌহিদার চোখ আবার ভিজে ওঠে।
নাভান আলতো করে নাভানের মাথায় হাত রাখে।
“ আমার ছোটবেলার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ছিল তোমার কোল। তাই নিজেকে এত দোষ দিও না। আমরা সবাই ভুল করি… কিন্তু সবাই তো আর ভুল বুঝে অনুশোচনা করতে জানে না।
” কিন্তু শেহতাজ তোর মা আর তোর মামা তো মনে হয় না মানবে না এই জীবনে,, আমাদের দুই ভাই বোন কে।
নাভান সোফার গায়ে হেলান দিয়ে বসে তার পিপি মনিকে নিয়ে । মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব, চোখেমুখে অদ্ভুত এক দখলদারিত্ব। আর তার ঠিক সামনেই রানীর মতো গুটিসুটি মেরে বসে আছে হেরা। মুখ ফুলিয়ে রেখেছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ সে-ই। মায়ের আদর খাচ্ছিলো সে মন ভরে তাতে ভাগ বসাতে এই লোক এসেছে। রাগে ফুসফুস করছে হেরা।
হঠাৎ নাভান গম্ভীর স্বরে বলে উঠল—
“ যাও, আমার জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আসো।”
হেরা যেন শুনেও শুনল না। মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। যেন কথাটা তার জন্য বলা হয়নি।
নাভান এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“ কি বলেছি, কানে যায় নি ? যাও, পানি নিয়ে আসো।
সবার সামনে এমন ধমক খেয়ে হেরা কেঁপে উঠল। চোখ বড় বড় করে তাকাল নাভানের দিকে। মুহূর্তেই তার ভেতরের আগুন জ্বলে উঠল। কিন্তু কিছু বলল না। শুধু কটমট করতে করতে উঠে দাঁড়াল।
চারপাশে বসে থাকা সবাই মুখ চেপে হাসছে। কেউ আবার মজা নিয়ে দৃশ্যটা দেখছে। আর হেরা মনে মনে নাভানকে একশটা বকা দিতে দিতে কিচেনের দিকে চলে গেল।
কিচেনে ঢুকেই গজগজ শুরু করল সে—
“ সবার সামনে ধমক দেয়! কি মনে করে নিজেকে? যেন আমি ওর চাকরানি! হুকুম করবে আর আমি মাথা নত করে শুনবো?
গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে আবার বিড়বিড় করল—
“ ঠিক আছে, বাবা-মাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আমার জন্য অনেক কিছু করেছে। আমি সেটা অস্বীকার করছি না… কিন্তু তাই বলে আমার উপর খবরদারি করবে কেন? আমি কি ওর হুকুমের দাসী নাকি?নাকি তা ঘরের বউ?
তার কণ্ঠে রাগ থাকলেও ভেতরে কোথাও এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব কাজ করছিল।
নাভানের প্রতি কৃতজ্ঞতা আছে। অস্বীকার করার উপায় নেই। মানুষটা অসম্ভবভাবে তাকে আগলে রেখেছে, তার ভাঙা পরিবার ফিরিয়ে দিয়েছে, তার চোখের কান্না মুছে দিয়েছে। কিন্তু তারপরও… তারপরও সেই সত্যিটা হেরা ভুলতে পারছে না। যে সত্য জানার পর থেকে তার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে গেছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে রুশা টিটকারি মেরে বলল—
“ তুই কি নিজেকে এখনো সিঙ্গেল দাবি করছিস নাকি?
হেরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“ কেন? আমি কি মিঙ্গেল নাকি?”
রোজ আর রুশা দু’জনেই হো হো করে হেসে উঠল।
রোজ মজা করে বলল—
“ কবুল বলার পরেও কেউ যদি নিজেকে সিঙ্গেল ভাবে, তাহলে তাকে কি বলে জানিস?
রুশা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“ আমার তো মনে হয় আমাদের হেরা পাখি এখনো নিজেকে কুমারী বউ হিসেবেই চালিয়ে যাচ্ছে।
রোজ সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল—
“ হুম! কবুল হয়েছে, বিয়ে হয়েছে, জামাই সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে… তবুও ম্যাডাম এখনো ভাবছে সে কারো বউ না।
দু’জনের কথা শুনে হেরা চোখ কুঁচকে তাকাল।
“তোদের দুইজনের অবস্থা কি খুব ভালো? তোরা তো ঠোঁটের কুমারীত্ব হারিয়েছিস। তার মানে কি তোরা মিঙেল। আমি তো জানি বিয়ের পর এসব করে আর তোরা সিঙ্গেল অবস্থায় ওইসব করেছিস।
কথাটা শুনে রোজ আর রুশা দু’জনেই একদম চুপ।
নাভান পিপিমনি ও তার বাবার সাথে কথা বলে চলে যেতে উদত্য হয়,তখন হেরা পানির গ্রাস নিয়ে আসে নাভান এর সামনে। নাভান পানি পেয়ে ঢক ঢক
করে খেয়ে হেরার ওড়না দিয়ে মুখ মুছে চলে যায়। হেরা সবার সামনে বিব্রতকর অবস্থায় পরে যায়। এদিক সেদিক তাকিয়ে চলে যায় নিজের রুমে।
হেরার দিনগুলো এখন অদ্ভুত শান্তিতে কাটছে। বহু ঝড়ঝাপটার পরে জীবনে যেন একটু স্বস্তির ছোঁয়া এসেছে। সকালগুলো এখন আর আগের মতো ভারী লাগে না, তবুও মনের ভেতর জমে থাকা কিছু দুশ্চিন্তা তাকে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে দিচ্ছে না।
কাজল খান জিহানকে নিয়ে ঢাকায় এসেছে আইনি ঝামেলা সামলানোর জন্য। কাজের খাতিরে আপাতত ঢাকাতেই থাকতে হবে—এই সিদ্ধান্তে জিহান তালুকদারও সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু তৌহিদা আর জাওয়াদের সাথে যোগাযোগ করার প্রশ্ন উঠলেই জিহান যেন গুটিয়ে যায়। নিজের ঠকে যাওয়া আর অনুশোচনার দেয়ালে নিজেকেই বন্দি করে রেখেছে সে।
হেরা এখন দুই বাড়ির মাঝেই সময় কাটায়। কখনো কাজল ভিলায়, কখনো জাওয়াদ খানের বাড়িতে। দুই পরিবারকেই সমান সময় দেওয়ার চেষ্টা করছে সে। কতবার বাবাকে বুঝিয়েছে—
“বাবা… আমি যদি কখনো ভুল করি, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে না? আমি তো তোমারই ভালোবাসার মানুষ। তোমার মেয়ে হয়ে যদি কোনো ভুল করে ফেলি, তুমি কি একবারও আমার দিকে তাকিয়ে বলবে না— ‘আচ্ছা, আরেকটা সুযোগ দিচ্ছি’?
আম্মু একটা ভুল করেছে , তাকে কেন এত বড় শাস্তি দিচ্ছো আব্বু ? মানুষ তো ভুল করেই… কিন্তু নিজের মানুষদের কি সেই ভুলের জন্য সারাজীবন দূরে ঠেলে রাখতে হয়? অনেক বছর তো দূরে থেকেছো সবাই।
তুমি তো এখনো মাকে ভালোবাসো, আমি জানি। আর দেখো সুন্দরী মা তো বাবাকে খুব ভালোবাসে। তোমার জন্য সুন্দরী মা কিছু বলছে না। বাবা নিজের বন্ধুত্বকে অবিশ্বাস করার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে করে প্রতিনিয়ত ছটফট করছে। তোমার চোখের অভিমানটা আমি বুঝি, কিন্তু সেই অভিমানের আড়ালেও যে এত বছরের ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, সেটাও আমি দেখি আব্বু। একবার শুধু একবার আম্মু আর বাবাকে ক্ষমা করে দেখো না… দেখবে সব আগের মতো হয়ে যাবে। আমাদের পরিবারটা আবার হাসবে, আবার বাঁচবে। আমি তোমার কাছে আর কিছু চাই না আব্বু। শুধু এই একটা আবদার— আমার আম্মুকে আর দূরে রেখো না। তোমরা দু’জন একসাথে থাকলে তবেই তো আমার পৃথিবীটা পরিপূর্ণ লাগবে…।
কিন্তু জিহান তালুকদার মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বুকভরা অভিমানটা এখনও গলতে চায় না তার। এত বছর ধরে জমে থাকা কষ্ট কি এত সহজে মুছে যায়? কাজল খান-এরও তো অভিমান আছে। সেও তো ঠকেছে… খুব আপন একজন মানুষের কাছ থেকেই ঠকেছে।
তার শুধু একটাই আক্ষেপ—
“একবার… শুধু একবার যদি আমাকে বিশ্বাস করতে জাওয়াদ। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে যদি একটাবার আমাকে পড়তে পারতে, তাহলে আমাদের এতগুলো জীবন থেকে এত বছর চলে যেত না ভালোবাসা ছাড়া। বিশ্বাস না-ই করতে পারলে , কিন্তু অন্তত এটুকু তো ভাবতে পারতে , কাজল রেখা এমন কিছু কখনও করতে পারে না। সেই না-পাওয়া বিশ্বাসটাই আজও বুকের ভেতর কাটার মতো বিঁধে আছে। তবুও দেখো ভালোবাসা কমেনি।
বরং সময়ের সাথে সাথে আরও গভীর হয়েছে।
অভিমান আছে, দূরত্ব আছে, নীরবতা আছে… কিন্তু ভালোবাসা?
সেটা এখনও আগের মতোই তীব্র।
শেষমেশ সবকিছু ভাগ্যের উপরই ছেড়ে দিয়েছে কাজল খান।
ভেবে নিয়েছে—
“দেখা যাক, সামনে কী হয়…।
কিন্তু সত্যিটা হলো, সে আজও ভীষণভাবে মিস করে জাওয়াদ খান-কে।
এই মানুষটার জন্য কতটা পাগলামি করেছে, সেটা একমাত্র সে নিজেই জানে। আর ওই মানুষটাও তো তার জন্য কম পাগলামি করেনি।
বয়স বেড়েছে, সময় বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে…
কিন্তু তাদের মাঝে থাকা সেই খুনসুটি, সেই রসিকতা— একটুও কমেনি।
এই তো, ছেলেমেয়েদের জন্য নিজেকে কতটা বদলে ফেলেছিল জাওয়াদ খান। অথচ এত বয়স হবার পরও সে এখনও সেই যুবক বয়সের মানুষটাই রয়ে গেছে।
জাওয়াদকে নিয়ে নতুন প্রজন্মের “ক্রাশ” টাইপ কথা, মজা— সবই তার কানে এসেছে। আর সেসব শুনে অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে তার।
মনে মনে শুধু একটাই কথা বলে—
“এই মানুষটার চেহারা যদি আরও কুৎসিত হয়ে যায়, তবুও আমার ভালোবাসা এক বিন্দুও কমবে না।
এক যুগ পেরিয়েও যখন ভালোবাসা কমাতে পারিনি, তখন চেহারা দেখে কি ভালোবাসা কমে যাবে নাকি ? আমি তো মন দেখে ভালোবেসেছিলাম…।
আর সত্যিই তো—
আজও কাজল খান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে জাওয়াদ খানের দিকে।
তাদের এই বয়সের ভালোবাসাটা ভীষণ পবিত্র।
দেখলে বোঝাই যায় না, তারা মধ্যবয়স পার করে ফেলেছে। এখনও যেন একে অপরের চোখে সেই আগের মানুষটাই রয়ে গেছে।
ছেলের কথায় চুলে কালারও করেছে জাওয়াদ খান । আর তাতেই যেন মানুষটা আরও অন্যরকম সুন্দর হয়ে উঠেছে।
কাজল খান চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
লোভ হয়… ভীষণ লোভ হয় । আবার আগের মতো করে মানুষটার পাশে দাঁড়াতে, কথা বলতে, ভালোবাসতে।
কিন্তু কোথাও একটা অদৃশ্য বাধা এসে তাকে থামিয়ে দেয়। অভিমান আর ভালোবাসার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দূরত্বটা আজও কেউ পেরোতে পারেনি।
এসবের মাঝেও হেরা আপাতত বাবা-মায়ের সাথে সময় কাটাতেই বেশি মন দিচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া এতগুলো বছর যেন একসাথে পূরণ করতে চাইছে সে।
কিন্তু অন্যদিকে পরিস্থিতি ভালো নয়।
তৌহিদা- জিহান কান্নাকাটি করতে করতে অসুস্থ হয়ে যায় , মায়ের অসুস্থতায় হেরা ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেছে। হেরা কতবার বাবার কাছে মায়ের হয়ে ক্ষমা চেয়েছে! নিজে মাথা নত করে দাঁড়িয়েছে! তবুও কেন সবকিছু এত জটিল হয়ে আছে?
আর তার সেই সুন্দরী মা—যিনি সবাইকে এক সাথে সামলে নেন—তিনি পর্যন্ত ভাইয়ের কথার উপরে একটা কথাও বলছেন না। এই নীরবতাই যেন হেরাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছে।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঠিক করে ফেলল—, আজ কাজল ভিলায় যেতেই হবে।নাভানের সাথে কথা বলতেই হবে।২ জোড়া মানুষকে যেভাবেই হোক মেলাতেই হবে।
সকাল তখন প্রায় নয়টা।
অধীর আর সৃজন কোথাও বেরিয়েছে। কাজল খান জিহান তালুকদারকে নিয়ে কোনো কাজে বাইরে গেছে।
পুরো বাড়িটা আজ অস্বাভাবিক চুপচাপ।
হেরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। যেন কোনো নিষিদ্ধ জায়গায় ঢুকতে যাচ্ছে সে।
পা টিপে টিপে নাভানের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজাটা হালকা ভেড়ানো। দ্বিধাভরা হাতে একটু ঠেলতেই দরজা খুলে গেল।
হেরা ভেবেছিল নাভান হয়তো রুমে । কিন্তু রুমে এসে নাভানের টিকিটা ও দেখতে পাচ্ছে না । অথচ দারোয়ান চাচা স্পষ্ট বলেছিল, “বড় সাহেব বাসাতেই আছেন।
সাবধানে ভেতরে ঢুকতেই চারপাশ দেখে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইল সে।
এই রুমে একবার এসেছিল ঠিকই… কিন্তু সেটা ছিল গভীর রাত। তখন সে অসুস্থ ছিল, চারপাশ দেখার মতো পরিস্থিতিই ছিল না।
আজ দিনের আলোয় রুমটা যেন একদম অন্যরকম লাগছে।
” অপূর্ব।
দেয়ালের গ্রে -কালারের কনট্রাস্ট, বুকশেলফের পাশে সাজানো গিটার, জানালার ফাক দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের রোদ—সবকিছু মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মায়াবী আবহ।
ঘরটাকে দেখে হেরার সত্যিই নাচতে ইচ্ছে করছিল।
সে ধীরে ধীরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে রাখা একটা ছবির ফ্রেম চোখে পড়তেই কৌতূহল নিয়ে হাতে তুলে নিল। ছবিটা নাভানের
বাইকের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এলোমেলো চুল, ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি, চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। হেরা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
ছবিটা হাতে নিয়ে খুটিয়েখুটিয়ে দেখছে। বুঝাই যাচ্ছে কিছুদিন আগের এই ছবিটি । এই পোশাক… এই হেয়ারস্টাইল… সেই বাইকটা।
কিন্তু ছবির মানুষটার দিকে তাকিয়ে আজ তার মনে অন্যরকম অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।
এই রুক্ষ, বিরক্তিকর, অহংকারী ছেলেটার আড়ালে কি সত্যিই অন্য একটা মানুষ লুকিয়ে আছে?
হেরা বুঝতে পারে না।
মনটা চাইছে—সব অভিযোগ ভুল হোক। সবাই ভুল বুঝুক তাকে। নাভান এমন না হোক।
কিন্তু আবার মনে পড়ে যায় কত কথা…
“ অহংকারী অসভ্য গিটারওয়ালা মেয়েবাজ…গেম খেলে…কারও সাথে সিরিয়াস না…”মেয়েদের আড়ালে সম্মানহানী করে।
হেরা মাথা ঝাঁকিয়ে সব ভাবনা সরাতে চাইল। ছবিটা আবার জায়গামতো রাখতে যাবে—
ঠিক তখনই—
ওয়াশরুমের দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ।
হেরা চমকে পিছন ফিরে তাকাতেই—
“ আআআআ!
চিৎকার দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে।
নাভান ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। খালি গায়ে, ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, শুধু একটা টাওয়েল জড়ানো কোমরে। হেরার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে।
নাভান হেরাকে দেখে একটুও বিচলিত হলো না । বরং এমন ভাব যেন, সে জানত এখানে হেরা আসবে । আর তাকে দেখে এমন ভাবে চেঁচাবে। নাভান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে হেরাকে সামনে রেখে রুমের ভিতর নিজের কাপড় বদলাতে থাকে। তার এমন একটা ভাব যেন সে চেঁচাচ্ছে এতে নাভান মজা নিচ্ছে। আর হেরা চেচালেই কি? তারা স্বামী স্ত্রী এক রুমে থাকতেই পারে। কেউ কিছু বলবেনা আর না কিছু মনে করবে। তার জন্য ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে নাভান হেরার সামনেই চেঞ্জ করতে থাকে। কিন্তু হেরা তো চোখ বন্ধ করে চেচাতেই থাকে। হেরা চোখ বন্ধ করেও আঙুলের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখে নাভান কি করছে । আর তাকিয়েই আবার—
“ ইয়া আল্লাহ!”নাউজুবিল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ।
নাভান দাঁত চেপে বলল–
” হর্ণ বাজাচ্ছো কেন? তোমার হর্ণের শব্দে ভাবছো সবাই ছুটে আসবে।
হেরা চোখ বন্ধ রেখেই কাঁপা গলায় বলল—
“ আপনি… আপনি… এভাবে আমার সামনে কাপড় পাল্টাচ্ছেন কেন?!”লজ্জা করে না একটা মেয়ের সামনে নিজের কাপড় পাল্টাতে ছি ছি।
নাভান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“এটা আমার রুম। আমার রুমে আমি যা ইচ্ছে করতে পারি। এভাবে চিৎকার করছো কেন তুমি ?
বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে বলে উঠল নাভান।
নাভান নির্বিকার ভঙ্গিতে কাপড় চেঞ্জ করছিলো। যেন কিছুই হয়নি। হেরা প্রথমে নাভান কে খালি গায়ে দেখে চেচিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। ভেবেছিলো নাভান তার চেচানো দেখে মুখ চেপে ধরবে। বা তারাতারি কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে যাবে। কিন্তু না এই লোক তাকে সামনে রেখে লজ্জাশরম এর মাথা খেয়ে পেন্ট পরছে। হাত সরাতেই এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখে হেরার চোখ বিস্ফোরিত হওয়ার উপক্রম। আবার এখন কেমন নির্লজ্জর মতো কথা বলছে। হেরা রাগান্বিত স্বরে বলে–
“ ছি! আপনি এত নির্লজ্জ? একটা মেয়ের সামনে এভাবে কাপড় চেঞ্জ করছেন কীভাবে?
নাভান শর্টস পড়ে একটা জিন্স প্যান্ট নিয়ে টাওয়ালের উপরদিয়ে পড়ছে তারপর টাওয়াল খুলে প্যান্টে চেইনলাগাতে লাগাতে বলতে লাগে—
“ মেয়ে? কোথায় মেয়ে?
চারপাশে তাকানোর ভান করে আবার হেরার দিকে তাকাল সে।
হেরা হতভম্ব। তারপর রাগে গাল লাল হয়ে উঠল–
“ কেন? আমি কি ছেলে মানুষ নাকি ?
নাভানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটল।
“দেখতে তো মেয়েদের মতোই লাগে… তবে আসল ব্যাপারটা তো এখনো ট্রাই করা হয়নি।
হেরা কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না কথার মানে। তারপরই চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“ মানে?! এমন নির্লজ্জের মতো আচরণ করছেন কেন আপনি?”
“ মানে কিছু না,”
নাভান কাঁধ ঝাঁকাল।
“ নিজের বউ সামনে থাকলে শুধু কাপড় চেঞ্জ করা না, খালি গায়ে জন্মদিনের ড্রেস পরেও থাকা যায় মিসাইল গার্ল।
“ ছিঃ! আপনি আসলেই একটা অসভ্য, নির্লজ্জ মানুষ!”
“এই ডায়লগটা অনেক শুনেছি,”
ঠান্ডা স্বরে বলল নাভান।
“ মুখস্থ হয়ে গেছে। নতুন কিছু থাকলে বলো।”
হেরা দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে নিল।
“ আপনি কাপড় চেঞ্জ করেন তারপরচোখ খুলবো। আপনার লজ্জা না থাকতে পারে কিন্তু আমার আছে।
” হয়েছে খুলতে পারো।
চোখ খুলেই আবার থমকে গেল সে। লোকটা এখনও খালি গায়ে। বুকের পেশিগুলো স্পষ্ট, চোখে সেই দাম্ভীক হাসি। যেন ইচ্ছে করেই তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে।
হেরা বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে তাকাল।
“ আপনাকে এর জন্য অসভ্য লাগে আমার!”“আপনাকে দেখলেই বিরক্ত লাগে আমার!
নাভান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।
“ বিরক্ত? “নাকি নার্ভাস হও? এডাল্ট চিন্তাভাবনা আসে তোমার?
“ আপনার মতো মানুষের সামনে নার্ভাস হব আমি?।আর এসব চিন্তাভাবনা তো ভুলেও নয়।
“ ও আচ্ছা…” নাভান মাথা নাড়ল। “তাহলে তাকাও আমার দিকে।
সে আরও কাছে ঝুঁকে এল।
“দেখি তো, সত্যিই তোমার কোনো এডাল্ট চিন্তাভাবনা আসে নাকি আমার হট বডি দেখে?”
হেরা পিছিয়ে যেতে চাইল।
“কেন আপনার দিকে তাকাব আমি?”
“ কারণ, , “তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে শেহতাজ খান নাভান। তোমার একমাত্র বর। তাও হট, বর।
শেষ কথাটা বলার সময় তার চোখে এমন এক অধিকার ফুটে উঠল, যেটা হেরার বুক কাঁপিয়ে দিল।
“ বাজে কথা বলা বন্ধ করুন।”“আপনি একটা জঘন্য অসভ্য লোক।
“ বাজে কথা কোথায় বললাম?
হেরা এবার আর সহ্য করতে পারল না।
“ আপনাকে কতবার বলব? এই বিয়ে আমি মানি না! মানি না, মানি না!
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সবকিছু উল্টে গেল।
এক ঝটকায় নাভান হেরাকে টেনে বিছানায় ফেলে দিল। নিজের শরীরের ভার দিয়ে আটকে ফেলল তাকে। দু’হাত শক্ত করে চেপে ধরল মাথার পাশে।
হেরা স্তব্ধ।
নাভানের খালি গা। গরম নিঃশ্বাস এসে লাগছে গলায়, কানে। পুরো শরীর কেঁপে উঠল হেরার।
নাভান মুখ নামিয়ে কানের পাশে ফিসফিস করে বলল—
“ কি যেন বলছিলে? ডিভোর্স?” তাই না মিসাইল গার্ল।
নাভান যেন এই দিনটার অপেক্ষাই করছিল। কবে হেরা কে একা পাবে আর কবে তাকে শাস্তি দিবে। নাভানের হঠাৎ আচমকা আক্রমণে , হেরা চোখ বন্ধ করে ফেলল। বুক ধরফর করছে। সে জানত নাভান অসভ্য… কিন্তু এতটা ভয়ংকরভাবে অধিকার ফলাতে পারে, সেটা ভাবেনি।
সে তো এসেছিল বাবা-মার কথা বলতে। অথচ এখন নিজেই আটকা পড়েছে এই মানুষের কাছে।
হঠাৎ নাভানের কণ্ঠস্বর বদলে গেল। ঠান্ডা, ভারী, বিপজ্জনক।
“ ডিভোর্স শব্দে কয়টা অক্ষর আছে জানো?”“ডিভোর্স শব্দটা মুখে নেওয়ার আগে হাজারবার ভাববে, মিসাইল গার্ল ”
হেরা চুপ।
নাভান আরও ঝুঁকে এল।
তার আঙুলের চাপ আরও শক্ত হলো।
“এটাই ফার্স্ট ওয়ার্নিং, মিসাইল গার্ল ”
সে ধীরে ধীরে হেরার দিকে ঝুঁকল।
“ নাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।”“এটাই ফার্স্ট ওয়ার্নিং।”“পরেরবার যদি ডিভোর্স শব্দটা তোমার মুখ দিয়ে বের হয়…”তাহলে তোমাকে এমনভাবে নিজের করে নেব…যে তুমি নিজেই ভুলে যাবে, আমাকে ছাড়া অন্য কোনো জীবনও ছিল।
এক মুহূর্ত থেমে খুব নিচু স্বরে বলল—
“Got it, পরি বউ ?
নাভান ইচ্ছে করেই মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে আনল হেরার কানের কাছে । তার গরম নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল হেরার কান। ঠোঁটের হালকা স্পর্শে পুরো শরীর যেন বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠল হেরার। মুহূর্তেই বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বেড়ে গেল।
আর নাভান?
সে সেই কাঁপুনি খুব ভালো করেই টের পেল। ঠোঁটের কোণে ধীর, বিপজ্জনক এক হাসি ফুটে উঠল তার।
হঠাৎ করেই ঝুঁকে হেরার কানের লতিতে হালকা কামড় বসিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“ কি ব্যাপার মিসাইল গার্ল ? এত কাপছেন কেন? আমি তো এখনো কিছুই করিনি । এডাল্ট ভাবে ছুই ও নি … শুধু আমার নিঃশ্বাসটাই ছুঁয়েছে তোমায়।
হেরা কেঁপে উঠে চোখ বড় বড় করে তাকাল। মুখ লাল হয়ে গেছে লজ্জায়, রাগে, অস্বস্তিতে।
“দে…দে,, দেখুন… আমার লাগছে…”
কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল তার।
নাভান আরও কাছে এগিয়ে এল। এতটাই কাছে যে হেরার মনে হচ্ছিল নিজের হৃদস্পন্দনও লোকটা শুনে ফেলবে।
“এইটুকুতেই এমন অবস্থা?
তার কণ্ঠটা ভারী হয়ে উঠল–
“ আমি যদি সত্যি তোমাকে ছুঁই… তাহলে কি করবে মিসাইল গার্ল ”
হেরা দ্রুত সরে যেতে চাইল। কিন্তু নাভানের দু’হাত তার দু হাত দিয়ে বিছানায় আরো চেপে ধরে। পালানোর পথ নেই। সেই মুহূর্তেই হেরার চোখ গিয়ে আটকে গেল নাভানের খোলা শরীরে।
ফর্সা গায়ের রঙের উপর তীক্ষ্ণ সিক্স-প্যাক, ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, বুকের একপাশে ঠোঁটের ট্যাটুটা যেন তাকে আরো ভয়ংকর সুন্দর করে তুলেছে।
হেরা অন্যমনুস্ক হয়ে তাকিয়ে রইল।
মুহূর্তেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে বিড়বিড় করল—
“ ভয়ংকর সুন্দর…”
নাভান হেরার ঠোঁট নাড়ানো দেখে
তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গারো হয়ে উঠল।
সে ধীরে ধীরে উঠে টি-শার্টটা গায়ে তুলতে তুলতে বলল—
“এভাবে তাকিয়ে থাকলেও কিন্তু ভুল বুঝবো না আমি।
হেরা লজ্জায় গলা শুকিয়ে ফেলে। নাভান মিনি ফ্রিজ থেকে এক গ্রাস ঠান্ডা পানি বের করে হেরার সামনে ধরে । হেরা পানি দেখে চিন্তাভাবনা না করে ঢক ঢক করে খেয়ে ফেলে। নাভান শুধু হেরার দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজেকে স্বাভাবিক করে হেরা বলে উঠে—
“ আ… আসলে আমি একটা কথা বলতে এসেছিলাম…”
“ বলো ।
“ মা খুব কান্নাকাটি করছে… আপনি কিছু একটা করুন না। বাবা কারো কথাই শুনছে না।
নাভানের চোখ মুহূর্তেই বদলে গেল। গভীর, স্থির।
“ হুম। ঠিক তোমার মতো।”
“ মানে?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই নাভান হঠাৎ হেরার হাত টেনে নিজের দিকে নিয়ে এল। হেরা পুরোপুরি তার বুকের সাথে গিয়ে ধাক্কা খেল। হেরা বিরক্ত হয় এবার। বার বার এই লোক তাকে এমন ভাবে চেপে ধরছে কেনো।
“ আমাকে টানছেন কেন?”
নাভান নিচু স্বরে বলল—
“একই রক্ত তো। জেদও একই। এই যে আমায় মানো না বলছো। আবার কি সব চিন্তাভাবনা করছো মনে মনে ?
হেরা ঠোঁট ফুলিয়ে তাকাল।
“দেখুন, আমাকে তাদের সাথে মিলাবেন না। তারা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবেসে বিয়ে করিনি।
নাভান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“ বিয়ে ভালোবেসে করো আর না করো… বিয়ে তো হয়েই গেছে। এখন না হয় একটু ভালোবাসতে শিখো।
হেরা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“ আমি আপনাকে ভালোবাসি না।”আর না বাসবো!
“ কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা সেটা জানতে চাও?
হেরা থেমে গেল। নাভান মুচকি হাসে হেরা নাভানের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে —
“ ভালোবাসেন আমায়!
“তোমার মতো মেয়ের প্রতি আমার কোনো কিউরিসিটি নেই। তুমি তো আমার লেভালের নয়। তাই তোমাকে ভালোবাসা যায় না। জাস্ট অধীকার ফলানো যায়।
কিন্তু মনে মনে বলে—
“তোমাকে নিয়ে আমার কোনো কিউরিসিটি নেই, অক্সিজেন।
কৌতূহল তো মানুষ তাকে নিয়েই অনুভব করে, যে এখনও অপরিচিত। আর তুমি… অনেক আগেই আমার অভ্যাস হয়ে গেছ। আর লেভেল ? “তুমি আমার লেভেলের নও ঠিকি কারন তোমাকে আমি কখনো নিজের সমান ভাবিনি, নিজের বলেই ভেবেছি।”“তুমি কোনোদিনই আমার লেভেলের ছিলে না।
কারণ আমার সমান কাউকে আমি আমার পাশে রাখতাম না …আর তোমাকে?”
একটু থেমে গভীর চোখে তাকায় হেরার রাগী মুখের দিকে।
“তোমাকে তো আমি নিজের নিচেও পড়তে দিই না। আমার মাথায় রাখি। বোকা হরিনী।
নাভান কে হাসতে দেখে হেরা এবার সত্যিই রেগে গেল।
“ তাহলে এসব কথা বলতে আসবেন না। আর শুনে রাখুন, আমি আপনাকে কখনো মেনে নেব না। এই বিয়ে শুধু নামের বিয়ে।
নাভান চুপচাপ তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিটা এত গভীর ছিল যে হেরা নিজেই অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“তুমি আমাকে যতটা সহজ ভাবো… আমি ততটা সহজ না মিসাইল গার্ল ।”
হেরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“আপনি উপরে যেমন দেখান, আসলে তেমন না। আপনি অনেক গভীর জলের মাছ।
নাভান হেসে ফেলল।
গভীর, ধীর একটা হাসি।
“ গভীর জলের মাছ না হলেও… গভীর সমুদ্রের নিলতিমি হতে পারি।
“ মানে?
নাভানের চোখ হঠাৎ অদ্ভুত নরম হয়ে গেল।
“ নিল তিমিরা জানো তো? সঙ্গী হারালে বাঁচতে পারে না। ভেসে উঠে মৃত্যুকে বেছে নেয়।
হেরা কথাটার মানে বুঝল না পুরোপুরি। শুধু বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন অদ্ভুত ভাবে কেপে উঠল।
সে কিছু বলার আগেই নাভান তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। নিচে কাজের মেয়েরা ঘোরাঘুরি করছে দেখে হেরা অস্থির হয়ে উঠল।
“ ছাড়ুন! দেখছে তারা। কি ভাববে?”
নাভান কোনো উত্তর দিল না।
সোজা গিয়ে বড় সোফাটায় বসে হেরাকে নিজের কোলের উপর টেনে বসিয়ে নিল। হেরা লজ্জায় ছটফট করতে লাগল।
“ আগে তো ছিলেন অহংকারী এখন অসভ্য নির্লজ্জ গিটার ওয়ালা ! ছাড়ুন বলছি!”
নাভান এবার তার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“এত নড়াচড়া করো না… আমার ধৈর্য খুব কম তোমার প্রতি বরাবর । এডাল্ট ফিল চলে আসে ।
হেরার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
নাভান ধীরে ধীরে তার কপালের চুল সরিয়ে দিল। তারপর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল—
“ তুমি জানো? তোমার এই রাগী মুখটা দেখলেই আমার সব নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যায়।”
হেরা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
কারণ সেই মুহূর্তে নাভানের চোখে সে এমন কিছু দেখল…যেটা ভয়ংকরও, আবার অসম্ভব মায়াময়ও।
হেরা অস্বস্তিতে ছটফট করছিল। নিচে কাজের মানুষজন যাতায়াত করছে, আর এই মানুষটা নির্লজ্জের মতো তাকে নিজের কোলের উপর বসিয়ে রেখেছে!
“ আপনি কি শুরু করেছেন বলুন তো? দেখছে সবাই কি ভাবছে বলুন তো?
হেরা বিরক্ত গলায় বলতেই নাভান নির্বিকার মুখে তার কোমর আরও শক্ত করে টেনে নিল।
“ ভাবতে দাও।”
“ আপনার লজ্জা না থাকলেও আমার আছে।”
নাভান এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিটা এত গভীর যে হেরা নিজেই অস্থির হয়ে গেল।
“ তোমাকে লজ্জা পেতে দেখতেও ভালো লাগে।”
হেরা চোখ নামিয়ে ফেলল। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। নাভানের এতটা কাছে থাকলে তার সব সাহস যেন কোথায় হারিয়ে যায়।
নাভান এক হাত দিয়ে তাকে আরও একটু নিজের দিকে টেনে নিল। তার দৃষ্টি এখনও হেরার মুখেই আটকে।
“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন…?”
হেরা নিচু স্বরে বলতেই নাভানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
“দেখছি… মানুষ এত সুন্দর রাগ করে কিভাবে।”
“ আমি রাগ করছি না।”
“ তাহলে?”
নাভান ঝুঁকে এল আরও একটু।
“ ভয় পাচ্ছো?”
হেরা উত্তর দিল না। শুধু অনুভব করল নাভানের আঙুল ধীরে ধীরে তার হাতের উপর ছুয়ে যাচ্ছে। সেই স্পর্শে বুকের ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে উঠছে।
নাভান এবার খুব ধীরে বলল—
“ তুমি জানো মিসাইল গার্ল … তোমাকে কাছে পেলে আমার ভিতরের সব শান্তি শেষ হয়ে যায়। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার কি জানো? এই অশান্তিটাকেই এখন সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।”
হেরা চুপ করে রইল। তার চোখের পাতা কেঁপে উঠছে বারবার। নাভান সেই কাঁপুনি দেখেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকল
“ উফ! অসহ্য মানুষ একটা।”
হেরা এবার সত্যিই উঠে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু নাভান এক হাতে তাকে আটকে রেখে সোফার সাথে হেলান দিল।
“এক মিনিটও শান্ত হয়ে বসতে পারো না?”
“ আপনার পাশে? পারি না।”
কথাটা শুনে নাভানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল। যেন হেরার এই বিরক্তিটাও তার ভীষণ প্রিয়।
সে ধীরে ধীরে হেরার কানের পাশ থেকে এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল।হেরা সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“ ড্রামা করবেন না প্লিজ।”
“আমি?”
নাভান নিচু স্বরে হেসে উঠল।
“ ড্রামা তো তুমি করো। মুখে বিরক্তি… অথচ পালিয়ে যাও না।”
হেরা থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
তারপর দ্রুত বলল—
“ কারণ আপনি ছাড়ছেন না।”
“ ছেড়ে দিলে চলে যাবে?”
প্রশ্নটা এত ধীরে, এত অদ্ভুতভাবে বলল নাভান যে হেরার বুক কেঁপে উঠল।
সে চোখ তুলে তাকাতেই দেখল নাভান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই চোখে কোনো দুষ্টুমি নেই এবার… বরং অদ্ভুত নরম কিছু। হেরা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
“ আপনি আজকাল খুব অদ্ভুত কথা বলেন।”
নাভান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল—
“ তুমি সামনে থাকলে আমি স্বাভাবিক থাকতে পারি না।”
হেরার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
কিন্তু সে মুখ শক্ত রেখেই বলল—
“এটা কি আমার সমস্যা?”
“হুম।”
নাভান মৃদু হেসে তার আঙুলে হেরার হাতের আঙুল জড়িয়ে দিল।
“পুরোটাই তোমার সমস্যা।”
হেরা বিরক্ত দেখানোর চেষ্টা করলেও নিজের হাতটা আর সরাল না। বরং অদ্ভুতভাবে বুকের ভিতরটা নরম হয়ে আসছিল। এই মানুষটার স্পর্শ কেন যেন ধীরে ধীরে তার সমস্ত রাগ গলিয়ে দেয়।
নাভান সেটা বুঝতে পেরেও কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর হঠাৎ খুব নিচু স্বরে বলে উঠল—
“ তুমি জানো? সারাদিন এত মানুষ, এত কাজ… কিন্তু দিন শেষে মাথায় শুধু একটা মুখই ঘোরে।”
হেরা এবার সত্যিই চুপ হয়ে গেল।
কারণ সে জানে, নাভান সরাসরি কিছু বলছে না… তবুও প্রতিটা কথায় যেন তাকে ঘিরেই সবকিছু।
মুহূর্তটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল।
হেরা নিজেকে সামলে নিয়ে জোর করে বিরক্ত গলায় বলল—
“ আপনি না একদমই ভালো না।”
নাভান হালকা ঝুঁকে এল তার দিকে।
“ তবুও এই খারাপের কাছে থাকতে হবে।
কথাটা শুনে হেরার বুকটা ধক করে উঠল।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল যাতে নাভান তার ঠোঁটের কোণে জমে ওঠা অকারণ হাসিটা দেখতে না পায়।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
নাভান বিরক্ত চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে কল রিসিভ করল। দু-একটা কথা বলেই কল কেটে দিল।
তারপর ধীরে ধীরে হেরাকে নিজের কোল থেকে নামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“ কাজ আছে। বের হতে হবে।”
হেরা সাথে সাথে মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
“ তাহলে যান। কে আটকেছে?
নাভান শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে তার দিকে তাকাল। সেই চেনা ঠান্ডা ভাবটা আবার মুখে ফিরে এসেছে। কিন্তু চোখে এখনও নরম একটা ছায়া রয়ে গেছে। নাভান কেনো এমন করে কাছে টানছে। ভালোবাসলে একটা কথা ছিলো। প্রতিবার বলে তার প্রতি নাকি কিউরিসিটি নেই,তার লেভেলেই নাকি নেই সে। তাহলে কেন বারবার এমন করে কাছে টানছে। আসলেই তাহলে প্রিয়র কথা সত্যি। জোর করে মেয়েদের নিজের মৌহে ফেলে ব্যাবহার করে শেষে ছুড়ে মারে।
হেরাকে ভাবতে দেখে নাভান এগিয়ে এসে হেরার থুতনিটা আলতো ছুঁয়ে দিল।
“ রাগ করে থাকো। তোমাকে এই মুখে সবচেয়ে সুন্দর লাগে।”
বলেই সে চলে যেতে নিল।
দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল।
পিছনে না তাকিয়েই ধীরে বলল—
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৫
“ আর হ্যাঁ… অন্য কারও সামনে এতটা নরম রাগ করবে না। এটা আমার অধীকার।
হেরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
” রাগ আবার নরম হয়!
হেরা বির বির করতে থাকে..
লোকটা নিজের অনুভূতি কখনো স্পষ্ট করে বলে না… কিন্তু প্রতিটা কথায় এমন এক অধিকার থাকে, যেটা শুনলে বুকের ভিতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে।
