Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৩

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৩

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৩
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎সন্ধ্যার আজানের ধ্বনি ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে, আকাশের বুক থেকে কেউ বিষণ্ন সুরে মানুষের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত ব্যথা, সমস্ত গোপন আর্তনাদকে ডেকে নিচ্ছে নিজের কাছে। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের শেষ আলোটুকু নিভে আসছে এবার। কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলোও অন্ধকারের ভেতর রং হারিয়ে ফেলেছে ঠিক। চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা যেন। সেই নীরবতার মাঝখানে পাশাপাশি বসে আছে ইখতিয়ার আর মুগ্ধা।
‎পাশাপাশি,তবু কত দূরে।
‎তাদের বসার মাঝখানের পার্থক্যটা হয়তো এক হাতেরও কম। কিন্তু সেই অল্প দূরত্বটুকু যেন বছরের পর বছর জমে থাকা অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি, কান্না আর না বলা কথার সমান দীর্ঘ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কেউ কথা বলছে না।
‎কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। শুধু বাতাস বয়ে যাচ্ছে তার ধর্মে।

‎মুগ্ধা চোখ বন্ধ করে বসে আছে। তার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত লাগছে।যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে হৃদয়টা। ইখতিয়ারের দুঃখে তার বুক জ্বলছে কেন ? সে বুঝতে পারছে না তার কী করা উচিত।
‎রাগ করবে? কাঁদবে? অভিমান করবে? নাকি ইখতিয়ারকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত?
‎কিছুই বুঝতে পারছে না মুগ্ধা। কয়েক ঘণ্টা আগেও সে ভেবেছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষটার নাম শেখ ইখতিয়ার আহমেদ।
‎যে নিজের স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে রাখে। যে তার চোখের জল দেখে না। যে তার কষ্ট বোঝে না।
‎কিন্তু এখন …
‎এখন মনে হচ্ছে সে যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষকে দেখেছে। একজন ভাঙা মানুষকে।
‎এক আহত মানুষকে।
‎একজন মানুষকে, যে বছরের পর বছর নিজের বুকের ভেতর এক আকাশসম বিষাদ বহন করে বেড়াচ্ছে।
‎কখনও কখনও কিছু মানুষকে বাইরে থেকে দেখে বিচার করা যায় না। কারণ তারা হাসে।
‎কথা বলে। স্বাভাবিক মানুষের মতোই তাদের বিচরণ। অথচ তাদের বুকের ভেতর এমন কিছু যুদ্ধ চলে, যার শব্দ পৃথিবীর আর কেউ শুনতে পায় না। কেউ হয়তো বুঝতেও চায় না।
‎ইখতিয়ারও তেমনই।
‎মুগ্ধার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল গত চার মাসের প্রতিটি মুহূর্ত।
‎ইখতিয়ারের নির্লিপ্ততা। তার এড়িয়ে যাওয়া।
‎তার নীরবতা। তার মাঝরাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা, তার একাকিত্বতা।

‎একজন মানুষ যে নিজের অপরাধবোধের নিচে চাপা পড়ে থাকে, তার পক্ষে আরেকজনকে ভালোবাসাও কত কঠিন!
‎মুগ্ধার চোখের কোণে জল জমল।আজ প্রথমবারের মতো ইখতিয়ারের জন্য কষ্ট হচ্ছে তার। নিজের জন্য নয়। শুধু ইখতিয়ারের জন্য।
‎একটা মানুষ কতটা কষ্ট পেলে নিজের সমস্ত অনুভূতি তালাবদ্ধ করে ফেলতে পারে?
‎কতটা ভেঙে গেলে কারও কাছে আশ্রয় চাইতেও ভয় লাগে?
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। পাশে বসে থাকা মানুষটার দিকে তাকাল। ইখতিয়ার সামনে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তার চোখের নিচের কালচে ছাপ, চোয়ালের টান আর নিঃশ্বাসের ভারই বলে দিচ্ছে ভেতরে কত বড় ঝড় বইছে।
‎সেই মুহূর্তে মুগ্ধার ভীষণ ইচ্ছে হলো তার হাতটা ধরে তাকে ভরষা দিতে। কিন্তু শব্দগুলো গলায় এসে আটকে গেল।
‎কারণ কিছু ব্যথা এত গভীর হয় যে সেগুলো স্পর্শ করার আগেই মানুষ ভয় পেয়ে যায়।
‎অনেকক্ষণ পর সে নিজেকে সামলে নিল।
‎গভীর একটা শ্বাস নিল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
‎”বাড়ি যাব।”

‎কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইখতিয়ারের বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।
‎সে মুখ তুলে তাকাল। চোখে মুখে এমন এক বেদনা, যা দেখে যে কারও বুক কেঁপে উঠবে।
‎আজ সে সব বলে দিয়েছে।
‎বছরের পর বছর ধরে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা প্রতিটি ক্ষত খুলে দেখিয়েছে। এখন তার ভেতরটা অদ্ভুত ফাঁকা লাগছে। যেন দীর্ঘদিন ধরে কাঁধে বয়ে বেড়ানো একটা পাহাড় নামিয়ে রেখেছে।
‎কিন্তু পাহাড় নামিয়ে রাখার পরও ক্লান্তি তো যায় না।বরং আরও বেশি অনুভব হয়।
‎এই মুহূর্তে তার ভীষণ ইচ্ছে করছিল কেউ তাকে জড়িয়ে ধরুক। শুধু একবার। খুব শক্ত করে।
‎তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিক।

‎মানুষ কখনও কখনও শিশু হয়ে যায়। সবচেয়ে শক্ত, দৃঢ় মানুষটাও। যখন তার ভেতরের সমস্ত দেয়াল ভেঙে পড়ে, তখন সেও একটু আশ্রয় খোঁজে। একটু ভরসা খোঁজে।
‎ইখতিয়ারও খুঁজছিল।
‎কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারল না। কারণ সে যে চাইতে শেখেনি । ভাগ্য বারবার তার হাত খালি করে দিয়েছে। তাই চাওয়ার সাহসটুকুও অনেক আগেই মরে গেছে। সে শুধু মুগ্ধার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। নীরবে।
‎অপলক। তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল।
‎একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক থেকে।
‎মনে হলো কেউ যেন তার বুকের ভেতর ছুরি ঘুরিয়ে দিল। তবু সে হাসার চেষ্টা করল। ক্লান্ত একটা হাসি।
‎ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে।
‎তার লম্বা শরীরটা হঠাৎ আজ অনেক বেশি ক্লান্ত লাগছে। যেন বহু বছরের যুদ্ধ শেষে ফিরে আসা কোনো সৈনিক।যে জিতেছে না হেরেছে, সেটাও সৈনিক জানে না। শুধু জানে সে ক্লান্ত। খুব ক্লান্ত।

‎ইখতিয়ার গভীর স্বরে বলল,
‎”চল… দিয়ে আসছি।”
‎মুগ্ধা কোনো উত্তর দিল না। শুধু মাথা নাড়ল।
‎তারপর সেও উঠে দাঁড়াল। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। সন্ধ্যার আলো তখন প্রায় নিভে এসেছে।
‎রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলছে।
‎তাদের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে পথের ওপর।
‎দুটি ছায়া। পাশাপাশি হাঁটছে।
‎তবু একে অপরকে ছুঁতে পারছে না।

‎বাইকটার কাছে এসে দুজন থামল।
‎ইখতিয়ার সামনের সিটে বসল। মুগ্ধাও ধীরে ধীরে পেছনের সিটে উঠে বসল। ইখতিয়ার ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
‎তারপর নিজের সমস্ত কষ্ট, সমস্ত প্রত্যাশা আর সমস্ত অপূর্ণতা বুকের গভীরে আবার গুছিয়ে রেখে বাইকের স্টার্ট দিল। পরক্ষণেই গর্জে উঠল ইঞ্জিন।
‎নিস্তব্ধ সন্ধ্যার বুক চিরে বাইকটা সামনে ছুটে চলল। আর মুগ্ধা? সে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল ইখতিয়ারের পিঠের দিকে।
‎“যার রক্তে মেশানো বিচ্ছেদ আহাজারি, হৃদয় অসংখ্য টুকরো খন্ডিত। তাকে কি ভালোবাসা দিয়ে আবার জোড়া লাগানো যায়? নাকি কিছু ক্ষত সারাজীবন রক্ত ঝরিয়েই যায়?”
‎রাত ঠিক আটটা।
‎শেখবাড়ি তখন নিজের চিরচেনা আমেজে ভরপুর। কোথাও টেলিভিশনের শব্দ, কোথাও কারও হাসি, কোথাও আবার চায়ের কাপের টুংটাং আওয়াজ। পুরো বাড়িটা যেন দিনের ব্যস্ততা শেষে আরাম করে শ্বাস নিচ্ছে।
‎অথচ বাড়ির এক কোণে, নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে বসে আছে ইশতিয়াক। তার বিছানার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নয়টা প্র্যাকটিক্যাল খাতা।

‎ইশতিয়াক কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল খাতাগুলোর দিকে। মনে হলো বিছানায় খাতা নয়, নয়টা বিষধর সাপ ফণা তুলে বসে আছে।
‎তার বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। এমন দীর্ঘশ্বাস, যেন কোনো বৃদ্ধ কৃষক সারাবছরের ফসল বন্যায় ভেসে যেতে দেখে ফেলেছে।
‎বিকেলে যখন স্নিগ্ধা মিষ্টি হাসি মুখে খাতাগুলো ধরিয়ে দিয়েছিল, তখনও সে ব্যাপারটার ভয়াবহতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। এখন করছে।
‎খুব ভালোভাবেই করছে। ইশতিয়াক ধীরে ধীরে একটা খাতা তুলে নিল।
‎দুই পৃষ্ঠা উল্টাল। তারপর আরও দুই পৃষ্ঠা।
‎তার মুখের রং বদলাতে শুরু করল।
‎মনে হলো শরীর থেকে ধীরে ধীরে সমস্ত রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে। এটা প্র্যাকটিক্যাল? নাকি কোনো মহাকাব্য? এত লেখে মানুষ? এত কেন লিখতে হবে? সেইতো ছিঁড়ে দিবে।

‎ইশতিয়াক খাতাটা আবার বিছানায় ছুড়ে ফেলল।
‎তারপর দুই হাত কোমরে দিয়ে ছাদের দিকে তাকাল। তার মনের ভেতর রাগ এমনভাবে বাড়ছে, যেন প্রেসার কুকারের ভেতর আটকে থাকা বাষ্প।
‎আর একটু হলেই সিটি বাজবে।
‎মেয়েটার মনে কি একটুও দয়ামায়া নেই? একটুও না? পুরো নয়টা প্র্যাকটিক্যাল! নয়টা!
‎যেন ইশতিয়াক মানুষ না, ফটোকপি মেশিন।মুহূর্তের জন্য ইশতিয়াকের মাথায় অভিশাপ দেওয়ার ইচ্ছে জাগল। স্নিগ্ধার কপালে কখনো বর জুটবে না!পরক্ষণেই নিজেই আঁতকে উঠল।
‎না না না! এটা বলা যাবে না।
‎স্নিগ্ধার বর না জুটলে তো নিজের কপালেও বউ জুটবে না। তাহলে তো নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারার মতো অবস্থা। সে দ্রুত অভিশাপ পরিবর্তনের চেষ্টা করল।
‎আচ্ছা, স্নিগ্ধার কপালে দজ্জাল শাশুড়ি জুটুক!
‎কথাটা মনে আসতেই আবার থমকে গেল।
‎ধুর! তার নিজের মা তো দজ্জাল না।
‎বরং পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মায়েদের একজন।
‎তাহলে আবার নিজের মাকেই অপমান করা হয়ে যাচ্ছে। কী বিপদ!
‎একটা মানুষকে ঠিকমতো অভিশাপও দেওয়া যাচ্ছে না। সব ঘুরেফিরে নিজের গায়েই এসে পড়ছে।
‎ইশতিয়াক বিরক্ত হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফেলল।

‎কয়েক সেকেন্ড পর সে আবার মাথা তুলল।
‎প্র্যাকটিক্যালগুলো এখনও বিছানায় একইভাবে পড়ে আছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
‎মনে হচ্ছে খাতাগুলো তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে।
‎”আয় ইশতিয়াক, আমাদের লিখে দেখ!”
‎তার মাথা আরও গরম হয়ে গেল। সে সাহস সঞ্চয় করে একটা কলম হাতে নিল।
‎তারপর লেখা শুরু করল। চার লাইন। মাত্র চার লাইন।
‎ব্যস। হাত ব্যথা। ঘাড় ব্যথা। মেরুদণ্ড ব্যথা। মস্তিষ্ক ব্যথা। সম্ভব হলে আত্মাও ব্যথা হয়ে গেছে যেন।
‎ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে কলম নামিয়ে রাখল।
‎দশ মিনিট বিশ্রাম নেওয়া দরকার। খুব জরুরি।
‎চার লাইন লেখা কোনো সহজ কাজ নয়।
‎এটা একটা শিল্প। একটা সাধনা। একটা ত্যাগ।
‎এই ত্যাগের পর বিশ্রাম তো প্রাপ্য। সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। দুই মিনিট পর মোবাইল হাতে নিল।
‎আরও দুই মিনিট পর ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল।

‎তার চোখে তখন এমন অসহায়ত্ব, যেন এক কাপ চা হাতে নিয়ে কেউ তাকে হঠাৎ এভারেস্টে উঠতে পাঠিয়ে দিয়েছে। সে ধীরে ধীরে মাথা পেছনে ঠেকাল। চোখ বন্ধ করল।
‎মনে মনে হিসাব কষল। এই গতিতে লিখলে হয়তো আগামী ঈদের আগে একটা শেষ হবে। দুটো শেষ হতে কোরবানি ঈদ। চারটা শেষ হতে নতুন বছর।
‎আর নয়টা শেষ হতে…
‎না, আর চিন্তা করল না। কারণ সেই হিসাব করতে গেলে হয়তো ক্যালেন্ডারের নতুন সংস্করণ বের করতে হবে। অথচ স্নিগ্ধার পরিক্ষা জুলাইতে।
‎ঠিক তখনই বিছানার পাশে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
‎”হতচ্ছাড়ি কলিং…”
‎ইশতিয়াকের মুখ এমনভাবে কুঁচকে গেল, যেন তার সামনে গরম ভাতের বদলে করলার জুস এনে রেখেছে। বিরক্ত মুখে ফোন কানে তুলেই বলে উঠল,
‎”বাল, কী করতে ফোন দিছিস রে?”
‎ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর মুগ্ধার কণ্ঠ ভেসে এলো,
‎”তোর চ’ল্লিশা খাব তাই।”
‎ইশতিয়াক বিরক্তিতে গজগজ করতে করতে মুখ ফসকে বলে ফেলল,
‎”সে ব্যবস্থা তোর বোন করে দিছে।”
‎কথাটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো শরীর জমে গেল ইশতিয়াকের। মনে হলো আত্মা শরীর ছেড়ে অর্ধেক বের হয়ে আবার ভেতরে ঢুকে গেছে।
‎সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের জিভে কামড় দিল।
‎ইন্নালিল্লাহ!
‎এটা সে কী বলে ফেলল! ওপাশে মুগ্ধার কণ্ঠ এবার সন্দেহে ভরে উঠল।

‎”কি হইছে? কি বললি?”
‎ইশতিয়াকের মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
‎মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরের বিরক্ত মানুষটা উধাও হয়ে গেল। জন্ম নিল পৃথিবীর সবচেয়ে ভদ্র, সবচেয়ে নিরীহ, সবচেয়ে মিষ্টভাষী ইশতিয়াক।
‎গলায় মধু ঢেলে সে বলল,
‎”কিছু না ভাবি। কিছুই হয় নাই। তুমি কি করতে ফোন দিছো গো?”
‎কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার আদুরে স্বরে যোগ করল,
‎”ভাইয়ার জন্য মন কাদতেছে? ওরে ফোন দিব?”
‎মুগ্ধার বিরক্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,
‎”না। ভাইয়ারে ফোন দিতে হবে না। ভাইয়ার ঘরে উঁকি দে।”
‎ইশতিয়াক একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েও পারল না। কারণ পরের কথাটা শুনেই আবার বুক ধড়ফড় শুরু হলো।
‎ইশতিয়াকের ভ্রু সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল।
‎”কেন?”
‎”যা বলতেছি কর।”
‎”কিন্তু”

‎”নয়তো স্নিগ্ধার ব্যাপার দেখছি আমি।”
‎এই একটা বাক্য যথেষ্ট ছিল। ইশতিয়াকের সমস্ত যুক্তি, তর্ক, ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মান মুহূর্তেই মাটিতে গলে গেল। সে এমন দ্রুত সোজা হয়ে বসল, যেন সেনাবাহিনীর প্যারেডে কমান্ড শুনেছে।
‎”না না, যাচ্ছি তো!”
‎ফোন কেটে দেওয়ার সাহস হলো না। বরং তড়িঘড়ি ভিডিও কল অন করল।
‎তারপর বিড়বিড় করতে করতে ঘর থেকে বের হলো। মনে মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছে
‎”ভালোবাসা মানুষকে কোথায় নামায়! প্রেমের মায়েরে বাপ”

‎করিডোর পেরিয়ে ইখতিয়ারের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল সে। দরজাটা পুরো বন্ধ নয়। হালকা ভেজানো। এক চিলতে ফাঁক আছে বোধ হয়।
‎ইশতিয়াক ভিডিও কল অন রেখেই ব্যাক ক্যামেরা সেই ফাঁকের দিকে ধরল। আর নিজে?
‎নিজে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একদম ভদ্র ছেলের মতো।
‎পরপুরুষের ঘরে সে কেন উঁকি দেবে? কোনো দরকার আছে? স্নিগ্ধার ঘর হলে বিষয়টা ভেবে দেখা যেত। কিন্তু এটা তো অন্যের বরের ঘর।
‎যার বর, সেই উঁকি দিক। সে শুধু মোবাইল ধরে আছে। এই ঢের।
‎বাকি দায়িত্ব প্রযুক্তির। ওপাশে মুগ্ধা স্ক্রিনের দিকে তাকাল। আর পরক্ষণেই তার বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। ঘরের আলো মৃদু।
‎স্নান করে এসেছে ইখতিয়ার।
‎শরীরে সাদা তোয়ালে জড়ানো। নাভির পর থেকে যার অবস্থান। ভেজা চুল থেকে এখনও ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছে। কিছু চুল কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে লেগে আছে।
‎সদ্য ধোয়া মুখে কোনো ক্লান্তির রেখা লুকানো নেই।
‎বরং সবকিছু স্পষ্ট। তীক্ষ্ণ চোয়াল।
‎উঁচু নাসিকা।

‎ভেজা ত্বকের ওপর আলো পড়ে এমন একটা আভা তৈরি করেছে, যেন সাদা মার্বেলের মূর্তির ওপর কেউ নরম আলো ফেলে রেখেছে।
‎কিন্তু তার চেয়েও বেশি চোখে পড়ল অন্য কিছু।
‎মানুষটার ক্লান্তি।
‎ইখতিয়ার বিছানার কিনারায় বসে আছে। দুই কনুই হাঁটুর ওপর। দুই হাতের মাঝে মাথা গুঁজে।
‎কিন্তু বিশ্রাম নিতে পারছে না।
‎মুগ্ধার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
‎স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ কেমন ঝাপসা হয়ে এলো। ঠিক তখনই—
‎ঘরের ভেতর থেকে গভীর, ভারি একটা স্বর ভেসে এলো।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২২

‎”ইশতিয়াক।”
‎ইশতিয়াক প্রায় লাফিয়ে উঠল। তার হাত থেকে ফোন পড়ে যাওয়ার উপক্রম। মনে হলো হৃদপিণ্ডটা গলা দিয়ে বের হয়ে আসবে।ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল সে। আর দেখল—
‎ইখতিয়ার মাথা তুলে সোজা দরজার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই কালো, তীক্ষ্ণ চোখদুটো স্থির হয়ে আছে তার ওপর। ইখতিয়ার সরু চোখে তাকিয়ে থাকল।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here