মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৪
jannatul firdaus mithila
“ পরপারে ফের দেখা না হওয়া অব্ধি, এই আমি নামক অভিশাপের কাছ থেকে তোর কোনো মুক্তি নেই পিচ্চি!”
হুটহাট নতুন সম্বোধনে ভড়কায় সপ্তদশী! বিস্ময়ের অসারতায় ডুবেছে তার সচল মস্তিষ্ক। কানে বোধহয় এখনো বাজছে নির্দয় মানবের শান্ত কন্ঠস্বর! সপ্তদশী নড়চড় বাড়ালো। ক্ষুদ্র বদনখানি রূঢ় মানবের রুক্ষ হাতের বাঁধন হতে মুক্ত করার প্রয়াসে মত্ত থেকে নাক কুঁচকে তিতিবিরক্ত কন্ঠে বলল,
“ যার সান্নিধ্যে প্রতিটি মূহুর্ত কাটে বিষাক্ততায়, তার সাথে পরপারে দেখা করার প্রসঙ্গ আসে কোত্থেকে? আল্লাহ করুক! আগামী ছ’মাস পর এই প্যালেস নামক জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবার পর, দ্বিতীয়বার আপনার মতো জালিমের মুখ দর্শনও যাতে আমার করতে নাহয়।”
যুবকের বাদামী চোখদুটোর তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিষ্পলক ভঙ্গিতে সপ্তদশীর পেল্লবিত মুখখানার পানে নিবদ্ধ! তার বাহাতের শক্ত বাঁধনে বন্দী সপ্তদশীর কোমল বাঁকান কোমর। ডানহাতের মুঠোয় শক্ত করে আটকান তলোয়ারের ধাতব হাতল। যুবক হাসল এবার। ধারালো ক্যানাইন দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল পিয়ার্সিং করা নিম্নাংশের ঠোঁট! নিরবে চোখদুটো খানিক ক্ষীণ করে নিয়ে মুখটা এগিয়ে আনল মাহি’র মুখপানে। সপ্তদশী দাঁত কিড়মিড় উঠে তক্ষুনি! এক ঝটকায় মুখটা ঘুরিয়ে নেয় অন্যত্র। বিরক্তিতায় চোখ খিঁচে নিশ্বাস টানতেই আচানক তার কানের লতিতে লেপ্টে গেল যুবকের খাঁড়া নাকের উষ্ণ ছোঁয়া! ভড়কায় মাহি। একমুহূর্তে হিম কান্ডে স্থির হলো তার সর্বাঙ্গ। বেচারীর দম আঁটকালো কন্ঠনালীর ডগায়! অক্ষিপুটের সঙ্গে কুঁচকে গেল মুখ। তার কানের কাছে যুবকের উষ্ণ নিশ্বাসের ঝাপ্টা দোল খাচ্ছে ভীষণ। ব্রিটিশী সুন্দর নাকের ডগাটা এলোপাতাড়ি ছুঁয়ে দিচ্ছে সপ্তদশীর কোমল ত্বক। মাহি কাঁপছে এবার! কন্ঠ ফুঁড়ে বেরুচ্ছে না একটি শব্দও। বেচারি টালমাটাল! অসারতায় ডুবে থাকা তার হাতদুটো যুবকের বুকের কাছে উঠে এসে সজোরে ঠেলতে গেলেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো রূঢ় মানবের রহস্যময় বাঁকা কন্ঠ!
“ কাউকে এতবেশী ঘৃণা করতে নেই মেয়ে! কেননা ভাগ্য বড়ো কুচুটে জিনিস! দেখা গেল তুই যাকে এমুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করছিস, একটা সময় তাকেই চোখে হারালি!”
মস্তিষ্কটা তড়াক করে জ্বলে উঠল মাহি’র। কাঁপা কাঁপা বদনখানি অনড় হলো মুহুর্তেই। চোখদুটো আরও খানিকটা কুঁচকে নিয়ে, মেয়েটা কেমন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াল,
“ অসম্ভব!সেটা আপনার স্বপ্নে হবে বিস্ট! বাস্তবে নয়।”
ফের বাঁকা হাসল রূঢ় মানব। দক্ষ কূটকৌশলী কায়দায় নিজ নাকের ডগাটা আলতো করে সরিয়ে আনল মেয়েটার মসৃণ কপোলে। সপ্তদশীর সুশ্রী গৌরবর্ণা ডান গালটায় তীব্র ঘর্ষণ চালাচ্ছে নির্দয় মানবের বেহায়া নাকের ডগা! সে অপ্রসন্ন কান্ডে দূর্বল হচ্ছে বোকা মানবী। ভয়ে, অস্বস্তিতে কাঁপছে ভীষণ! যুবক আড়দৃষ্টে দেখল সব। দৃঢ় চোয়ালে তেজী ভাব বসিয়ে তক্ষুণি ডানহাত থেকে তলোয়ারটা এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলল অদূরে। মুহুর্তেই ঝনঝনিয়ে উঠল ধারালো অস্ত্রখানা। সে শব্দের তীব্রতায় সিটিয়ে গেল মাহি। যুবক আলগোছে জোর বাড়াল হাতের। ডানহাতের রুক্ষ আঙুলের চাপে আচানক আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম চোয়াল। সেথায় আগ্রাসী চাপ বসিয়ে মেয়েটার নতমুখখানা সামান্য উঁচিয়ে তুলে, রাশভারী কন্ঠে শুধালো,
“ অসম্ভব? এটা আবার কী? এমন কোনো শব্দ আমার ডিকশনারিতে আজ অব্ধি স্থান পায়নি বান্দীর মেয়ে। যা একবার আমার মুখ দিয়ে বেরুবে, তা শেষ অব্ধি আমার কল্যাণে ঘটবেই ঘটবে। কজ ইউ্য নো নাহ? অসাধ্যকে সাধন করাই অধীর রায়ের কাজ!”
তড়াক চোখ খুলল মাহি। ঘাড় বাকিয়ে স্তম্ভিত দৃষ্টে একমুহূর্ত তাকিয়ে রইল রূঢ় মানবের পানে। মেয়েটার সহসা ঘুরে তাকানোয় যুবকের বিচক্ষণে মস্তিষ্কে হুট করেই বেজে উঠল একখানা প্রশ্ন! তার ভ্রু-দ্বয় কুঞ্চিত এপর্যায়ে। মুখটা হয়েছে গম্ভীর! সে কেমন ক্ষুদ্র চোখে মেয়েটার পানে তাকিয়ে থেকে, কন্ঠে একরাশ সন্দিগ্ধ ঝাঁঝ ঢেলে জিজ্ঞেস করল,
“ তুই নাকি অসুস্থ?”
আকাশ থেকে টপকানোর ভঙ্গিমা ধরল মাহি। আশ্চর্য কন্ঠে তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো,
“ এতবড় তরতাজা মিথ্যে কথাটা বলতে একটুও বাঁধছে না আপনার?”
সহসা তীক্ষ্ণ হলো মুগ্ধের বাদামী চোখদুটোর দৃষ্টি। যে দৃষ্টির অন্তরালে সত্য উন্মোচনের প্রখর প্রয়াস বিদ্যমান। বিচক্ষণ মানব একে-একে দু-মিলালো মনে মনে। দৃঢ় চোয়ালখানা শক্ত করে ফুটিয়ে, ঘাড় বাঁকাল এদিক-ওদিক। সপ্তদশী হা হয়ে দেখল শুধু! তার বাকশূন্য জিভ ঠেলে ঠোঁটের ডগায় কথা পৌঁছানোর আগেই যুবক ঘটায় আরেক কান্ড! নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় তক্ষুনি একহাতে মেয়েটাকে তুলে নিলো কাঁধে। এহেন অতর্কিত কান্ডে হকচকায় বোকা মানবী। তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নিয়ে ভড়কানো কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়েঁ,
“ একি! আপনি আমায় কাঁধে তুললেন কেনো?”
তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর করবার যাচ্ছে তা-ই স্বভাব মাফিয়া বিস্টের নেই। মেয়েটাকে নিজ প্রশস্ত কাঁধে ঝুলিয়ে রেখে, সে কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগার গুঁজেছে ঠোঁটের ফাঁকে। সদ্য জ্বালানো লাইটারের আগুনটুকু দু’হাতের আবদ্ধতায় বাতাসের ঝাপ্টা হতে বাঁচিয়ে – কুচিয়ে সিগারের শেষভাগে ধরিয়ে, মুখভর্তি ধোঁয়া টানল যুবক। অতঃপর গমগমে গলায় আওড়াল,
“ ছাঁদে থেকে কি এমন ঝান্ডা গাড়বি বান্দীর মেয়ে?”
সহসা মুখ কুঁচকে গেল মাহি’র। তিক্ততা ছেয়ে গেল কন্ঠায়! মেয়েটা কেমন ঝাঁঝ দেখিয়ে পরমুহূর্তেই বলল,
“ নিচে নামান বলছি। আমার পা আছে, আমি হেঁটে যেতে পারব।”
কথাটা কানে তুলেনি মুগ্ধ। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে পায়ে গতি টেনে, সিগার ফুঁকতে ফুঁকতে নির্লিপ্ত কন্ঠে শুধালো,
“ আমি এখনো মরিনি রে বান্দীর মেয়ে! বাঁদরের মতো ধেই ধেই করে নেচে-কুঁদে পাদু’টোকে নিশ্চয়ই ব্যথা করেছিস! সো এবার চুপচাপ পড়ে থাক কাঁধে!”
সপ্তদশী বুঝে গেল — লোকটাকে আর বাড়তি কিছু বলে লাভ নেই। ব্যর্থতায় সে চুপচাপ পড়ে রইল মানবের কাঁধে। কিয়তক্ষন পেরুতেই তার মনের কোণে উত্থাপিত হলো একখানা সাহসী প্রশ্ন। তৎক্ষনাৎ শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলল মাহি। আমতা আমতা করে পরিশেষে মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া বাক্যটুকু জিভের ডগায় এনে আওড়াল,
“ আপনার ক-কি হয়েছে? কোরিয়া থেকে ফিরে এসে এমন বিহেভ করছেন কেনো আপনি?”
পাদু’টো চলমান মুগ্ধের। মেয়েটাকে কাঁধে নিয়ে মাত্রই প্রবেশ করল এলিভেটরে। নির্বিকার ভঙ্গিতে দু’হাত পকেটে গুঁজে শুধালো,
“ কেমন বিহেভ করছি বান্দীর মেয়ে?”
উত্তর সাজাতে ব্যস্ত মাহি! খানিকক্ষণ অস্থিরতায় কামড়াল নিজ ঠোঁট। অতঃপর মনের কোণে একরাশ সাহস সঞ্চয় করে মিনমিনিয়ে বলল,
“ এককথায় অদ্ভুত! বারবার বারণ করা স্বত্বেও ছুঁয়ে দিচ্ছেন আমায়।”
সহসা গালের ভাঁজে জিভ ঠেলে বাঁকা হাসল রূঢ় মানব। ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা সিগার শুদ্ধই রাশভারী কন্ঠে শুধালো,
“ তোকে নিশ্চয়ই এখানে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার জন্য আনিনি বান্দীর মেয়ে!”
ভ্রু গোটায় মাহি। ললাটের চামড়ায় গোটাকতক সন্দিগ্ধ ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ মানে?”
এপর্যায়ে বাহাতটা পকেট থেকে বার করল মুগ্ধ। ঠোঁটের ফাঁক হতে সিগারটা আলগোছে নামিয়ে এনে কুটিল কন্ঠে আওড়াল,
“ তোর শান্তির স্থায়িত্ব খুব একটা বেশি নেই বান্দীর মেয়ে! বড়জোর আর মাত্র ১৮ দিন।”
থমকায় মাহি। উদ্বিগ্ন মন তার ভাবতে বসল — ১৮ দিন পর ঠিক কি হতে চলেছে। আর শান্তি? তার কোন শান্তির কথা বলল নির্দয় লোকটা? বহুক্ষণ ভেবেও কূল কিনারার নাগাল পায়নি সপ্তদশী। অবোধ্য বিবমিষায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ এর অর্থ কি বিস্ট? আর মাত্র ১৮ দিন পর কি হবে? আপনি কি করতে চাচ্ছেন আমার সঙ্গে?”
গা-ছাড়া ভাব ধরল মুগ্ধ। ঠোঁটের কাছে সিগার টেনে এনে শুধালো,
“ নাথিং!”
যুবকের এহেন প্রতিত্তোরে দাঁত খিঁচল মাহি। বিতৃষ্ণায় বলে বসল,
“ আপনি ভীষণ খারাপ বিস্ট!”
দাঁতের সনে ঠোঁট পিষল রূঢ় মানব। ততক্ষণে এলিভেটর এসে দাঁড়িয়েছে তিনতলার প্রশস্ত করিডরের সম্মুখে। এলিভেটরের আবদ্ধ কাঁচের দুয়ারটা খুলে যেতেই বাইরে পা রাখল মাফিয়া বিস্ট। দু’হাত ফের পকেটে গুঁজে গমগমে গলায় শুধালো,
“ ওয়েল, আই নো দ্যাট! এবার নতুন কিছু বল বান্দীর মেয়ে!”
মুখ কুঁচকিয়েছে মাহি। পাথুরে মানবের সনে আর কথা বাড়াবে না বলে পণ করেছে মনে মনে। গাল ফুলিয়ে পড়ে আছে যুবকের কাঁধে।
“ সামনে থেকে সরে যা এলেক্স! এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে!”
সম্মুখে পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামপুরুষ বাঁকা হাসল কেবল। বাহাতে ধরে রাখা বন্দুকখানার ধাতব নলটা ফের দাবালো এডউইনের পেট বরাবর। শক্ত চোয়ালে চিড়বিড় কন্ঠে শুধালো,
“ বাড়াবাড়ির দেখলি কি রাস্কেল? এ-তো সবে শুরু।”
চোয়াল শক্ত হলো এডউইনের। মুখাবয়বে ছেয়ে গেল অদৃশ্য আগুন। গম্ভীর পুরুষ দাতঁ কটমটিয়ে তক্ষুনি এক আগ্রাসী থাবায় চেপে ধরল এলেক্সের চোয়াল। কন্ঠে আগুন ঢেলে যে-ই না কিছু আওড়াবে ওমনি তার আনমনে দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল অদূরের তিনতলার করিডর পানে। মুহুর্তেই থমকায় এডউইন! পরিবর্তন নামল তার সম্পূর্ণ মুখমণ্ডলে। হাতের থাবা আলগা হলো বেশ। ঠোঁটের কোণে আচমকা লেপ্টে গেল এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ। এলেক্স ভ্রু গোটায় এডউইনের এরূপ ভাবভঙ্গিতে। শ্যামপুরুষ তৎক্ষনাৎ নিজের চোয়ালখানা এডউইনের হাত থেকে এক ঝটকায় ছাড়াল। অতপর নিজেও এডউইনের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল করিডর পানে। আর ওমনি এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য অক্ষিপুটে ধরা খেতেই মস্তিষ্ক ফাঁকা হলো এলেক্সের। বিস্ময় লেপ্টে গেল সম্পূর্ণ মুখাবয়বে! দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের কাঁধে এক সাধারণ মেয়েমানুষ পড়ে আছে, আর রুশদী কিং কি-না নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটছে? অবিশ্বাস্যতায় বুদ হয়েছে এলেক্স! নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছেনা মানব। পেছন থেকে তক্ষুনি একখানা হাত এসে আচানক আঁকড়ে ধরল তার কাঁধ। কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ দাবার গুটি কিন্তু উল্টে গিয়েছে এলেক্স! স্বয়ং রুশদী কিং ওরফে মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার যে-ই মেয়েকে নিজ কাঁধে উঠিয়েছে, তাকে সাধারণ ভাবার অসাধারণ ভুল করো কি করে? ঘটে বুদ্ধি নেই?”
মস্কো; রাশিয়া!
Skuratov Coffee শপ! ট্রান্সপারেন্ট কাঁচের দেয়াল লাগোয়া একখানা গোলাকার টেবিলে গা ঘেঁষে বসে আছে মায়াঙ্ক। নিজ চিরচেনা খোলসে আবৃত যুবক, ক্ষনে ক্ষনে চুমুক বসাচ্ছে কফির কাপে। নীলরঙা সানগ্লাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চোখদুটো তার, কাঁচের দেয়াল গলিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে অদূরের Embassy Of Bangladesh এর অফিস পানে। মাঝেমধ্যে ডানহাতের কব্জি উল্টে দেখছে স্থানীয় সময়।
সময় কতটুকু পেরুলো কে জানে! অপেক্ষায়িত যুবক এখনো বসে আছে আগের ন্যায়। অদূরের এম্ব্যাসির সদর দরজাটা খুলল এরইমধ্যে। সেখান থেকে এক রাশিয়ান তরুণী বেরিয়ে এলো হাসিমুখে। তার হাতে দুটো কাগজ এবং একখানা প্যাকেট! তাকে দেখামাত্রই শীরঁদাড়া সোজা হলো মায়াঙ্কের। সে কেমন ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে গেল বসা ছেড়ে। তড়িঘড়ি করে কফি-শপ থেকে বেরিয়ে এসে পা বাড়াল তরুণীর পানে। তরুণী হাসছে মিটমিটিয়ে! সুশৃঙ্খল ব্যস্ত যুবক নিজ দু’হাত হুডির পকেটে গুঁজে এগোচ্ছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবার পথে আচানক পকেট থেকে হাত বের করে এনে, তরুণীর হাতে থাকা কাগজপত্রগুলো এক খাবলায় ছিনিয়ে নেয় মায়াঙ্ক। তার পায়ের গতি জোরালো! তরুণীও না থেমে চলে গেল উল্টোপথে। হাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেয়ে মায়াঙ্ক এবার পা বাড়ায় অদূরের ফোনবুথের দিকে। শূন্য ফোনবুথ হওয়ায় খুব একটা অপেক্ষা করতে হয়নি মানবের। গটগট পায়ে বুথে প্রবেশ করে ফোন তুলল কানে। পকেট হাতড়ে একখানা রুবল বের করে, তা ঢোকাল ফোনের পাশের শূন্যস্থানে। তক্ষুনি অন হলো ফোনটা। মায়াঙ্ক কোনরূপ কালবিলম্ব না করে দক্ষ আঙুলে বোতাম চাপল ফোনের বোর্ডে। অতি-পরিচিত একখানা বাংলাদেশি নম্বর টুকে কল লাগায় কমান্ডার। রিং হচ্ছে! সেই সঙ্গে বাড়ছে যুবকের অস্থিরতা। অস্থিরতায় বিরবির করে আওড়াচ্ছে,
“ পিক আপ দ্য ফোন রোদ!”
ঢাকা ; বাংলাদেশ। স্থানীয় সময়ঃ- রাত ১২টা বেজে ১৪ মিনিট!
অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের নিচে ঢেকে থাকা ছাঁদে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্র। দুশ্চিন্তায় একহাত পকেটে গুঁজে, অন্যহাতে অনবরত ফুঁকছে সিগারেট। তার ঠায় দৃষ্টি আপাতত অদূরের অন্ধকার ফাঁকা রাস্তায় নিবদ্ধ। এহেন নিরবতায় মুদে থাকা পরিবেশে আচমকা বাগড়া দিয়ে বসল শ্যাম সুদর্শনের ফোনটা। সে কেমন পকেটের অভ্যন্তরণে লুকিয়ে থেকে কর্কশ শব্দে কেঁপে উঠছে দেখো! রৌদ্র ভ্রু গোটায়। তিতিবিরক্ততায় মুখ কুঁচকে ফোনটা পকেট হাতড়ে বের করে এনে সম্মুখে দাঁড় করাতেই দেখল — রাশিয়ান নম্বর! ওমনি ব্যস্ততা বাড়ল মানবের। চটজলদি কলের রিসিভ অপশনে আঙুল চেপে ফোন চাপল কানের পাশে। অস্থির গলায় শুধালো,
“ মায়াঙ্ক?”
“ হুম!”
ফোনের ওপাশে থাকা গম্ভীর পুরুষের ছোট জবাবে সন্তুষ্ট নয় রৌদ্র। গম্ভীর মুখে কেমন অনবরত প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ তোর ফোনে কি হয়েছে? বহুবার ট্রায় করেছি। একটাবারও কল ঢুকল না। শোন, কাগজগুলো কালেক্ট করেছিস? আগে বল পৌঁছেছে তো কাগজগুলো?”
মায়াঙ্ক তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর করেনি। হাতে থাকা কাগজপত্রের পানে এক পলক সরু দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে গমগমে গলায় প্রতিত্তোর করল,
“ হুম পেয়েছি! সবটা ঠিকঠাক মতো দিয়েছিলি তো?”
বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস ছাড়ল রৌদ্র। আকাশের পানে দৃষ্টি তাক করে আনমনে শুধালো,
“ মাহি’র ছবি, জন্ম নিবন্ধনের কাগজ, চাচ্চুর এনআইডি কার্ড, সবই দিয়েছি! তুই চেক করে দেখ। আর শোন মায়াঙ্ক, যত তারাতাড়ি পারিস — মাহি’র পাসপোর্ট রেডি করে ফেল। একবার মির্জা সায়ান মুগ্ধের কারাগার থেকে ওকে বের করে আন শুধু, তারপর ওকে দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ আমার।”
ওপাশে থাকা গম্ভীর মুখো পুরুষ তক্ষুনি কপাল গোছালো। রৌদ্রের মুখনিঃসৃত বাক্যে টুক ধরে বাজখাঁই কন্ঠে বলে উঠল,
“ এই নাম উচ্চারণ করছিস কেনো?”
ভড়কায় রৌদ্র। মায়াঙ্কের ওমন কথার জের ধরতে না পেরে অবোধ্য ছাপ লেপ্টালো তার সুদর্শন মুখখানায়। কন্ঠে নামল সন্দিগ্ধ গাম্ভীর্যের ছাপ! সে কেমন ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ মানে? কোন নামের কথা বলছিস তুই?”
এহেন প্রতিত্তোরে খানিক বিরক্ত হলো মায়াঙ্ক। হুডির ছাতার আড়ালে আশেপাশে সর্তক দৃষ্টি বুলিয়ে চাপা স্বরে বলল,
“ এই যে বারবার মির্জা সায়ান, মির্জা সায়ান বলছিস! এই নাম উচ্চারণ করছিস কেনো?”
হতভম্ব বনে গেল রৌদ্র। বিভ্রান্তিতে ডুবে থেকে কপাল কুঁচকে শুধালো,
“ স্ট্র্যাঞ্জ! যেই ছেলে মাহি’কে তুলে নিয়ে গেল, তার নাম উচ্চারণে আবার এতো রাখঢাক কিসের?”
তক্ষুনি আকাশ থেকে পড়ল মায়াঙ্ক। বিস্ফোরিত আকার ধরেছে তার চোখদুটো। মাথায় জ্বলে উঠেছে এক পশলা আগুন। ছেলেটা কেমন তিতিবিরক্ত কন্ঠায় চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়াল,
“ হেভ ইউ্য গোন মেড রোদ? যেই ব্যক্তি ৩১ বছর আগে মা-রা গিয়েছে, সে কিভাবে আমার সানবার্ডকে তুলে আনবে রাশিয়ায়? যত্তসব পাগলের প্রলাপ!”
এহেন কথায় যারপরনাই নেই, হতবাকতার শীর্ষে পৌঁছাল রৌদ্র। বিস্ময়ে আলগা হলো তার চোয়াল। হতবাক কন্ঠফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ হোয়াট দা হেল আর ইউ্য ট্রায়িং টু সে মায়াঙ্ক? মুগ্ধ নিজেকে মির্জা সায়ান মুগ্ধ বলে পরিচয় দিয়েছে সবার কাছে। এখন তুই কি-না বলছিস এ নামের লোক ৩১ বছর আগেই মা-রা গিয়েছে? এটা কি করে সম্ভব? তাছাড়া সে কেন একজন মৃ ত ব্যক্তির নাম ব্যাবহার করল?”
উদ্বেগ বাড়ল মায়াঙ্কের। বিচক্ষণ মস্তিষ্কে জন্মালো অন্য প্রশ্ন। রৌদ্রের ওমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, সে উল্টো বলে বসল,
“ পৃথিবীতে এতো নাম থাকা স্বত্বেও, অধীর রায় কেনো একটা সময়ের মোস্ট ওয়ান্টেড আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংস্টারের নাম ইউজ করল নিজের নামের সঙ্গে? যে ব্যক্তির নাম মুছে দেওয়া হয়েছে সকল অনলাইন পোর্টাল থেকে, সে ব্যক্তির নাম নিয়ে এহসান পরিবারের মেয়েকে তুলে আনার রিজনটা কী? এ আবার কোন নতুন গোলকধাঁধা রোদ? আমরা কি তবে ভুল মরিচীকার পেছনে ছুটেছি এতদিন?”
সহসা একইরকম চিন্তায় কুপোকাত রৌদ্র! নতুন তথ্যে হাসফাস করছে সুদর্শন। অস্থিরতায় অস্থিতিশীল পায়ের কদমে উল্টো ঘুরতেই আচানক তার দৃষ্টি কাড়ল, ছাঁদের সম্মুখ দুয়ারের কোণে গা সিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অবয়বের দিকে। মুহুর্তেই স্থবির হলো রৌদ্র। কান থেকে ফোনখানা নামিয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠ উঁচিয়ে ডাক পাড়ল,
“ কে ওখানে?”
তৎক্ষনাৎ অবয়বের নড়চড় বাড়ল। ধীরে ধীরে আলোর বিপরীতে ছুটতে লাগল সে। রৌদ্রও থামেনি। যুবক তক্ষুনি পায়ের গতি বাড়িয়ে হাওয়ার বেগে ছুটে এলো ছাঁদের দরজার কাছে। দ্রুত পদে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে খেয়াল করল — কেউ একজন গায়ের ওপর একখানা কালো রঙা শাল পেঁচিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। রৌদ্র থামল এবার। মুহূর্ত ব্যয়ে ওপরের সিঁড়ি থেকে একলাফে নেমে এসে হাজির হলো গা ঢাকা অপরাধীর পানে। তক্ষুনি পায়ের গতিতে রুখ পড়ল অপরাধীর। সুদর্শনের তেজীয়ান বেড়াল চোখদুটোর অদৃশ্য আগুনের তীব্রতা তার পানে তাক হতেই থমকে গেল সে। রৌদ্র একমুহূর্ত স্থবির থেকে, পরক্ষণেই সম্মুখের ব্যক্তির গা থেকে একটানে খুলে আনল শালটা। আর ওমনি অক্ষিপুটের সম্মুখে অতিপরিচিত একখানা মুখ দৃশ্যমান হতেই যুবকের কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ তুমি?”
গায়ে একখানা দামী স্যুট! পায়ে এঁটেছে দামী ব্যুট। আজ ভীষণ পরিপাটি কায়দায় সেজেছে এডউইন। হাতে একখানা কালো রঙা স্যুটকেস নিয়ে হাঁটছে সে। প্যালেসের নিচ তলার সরু করিডর ছেড়ে লাউঞ্জে পা রাখতেই তার নজর গিয়ে ঠেকল অদূরের ডাইনিং স্পেসের দিকে অগ্রসর হতে থাকা ডঃ হায়ার পানে। মেয়েটা কেমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে! তার এহেন অদ্ভুত হাঁটার ভঙ্গিমা দেখে ভ্রু গোছালো এডউইন। তৎক্ষনাৎ কন্ঠ উঁচিয়ে গমগমে স্বরে ডাকল,
“ হায়া!”
সহসা থমকে দাঁড়ায় হায়া। ডাকের উৎস খুঁজতে ঘাড় বাকিয়ে যেই দেখল এডউইনকে ওমনি ঘাড় নুইয়ে গেল বেচারির। দৃষ্টি লুকলো অবিন্যস্ততায়! এহেন কান্ডে ভ্রু দ্বয়ের মাঝে ভাঁজের ছাপ গাঢ় হলো এডউইনের। পায়ের গতি হলো অগ্রসর। দামী ব্যুটজুতোর মড়মড়ে শব্দ তুলে, গম্ভীর মানব এসে দাঁড়ালো হায়া’র মুখোমুখি। গম্ভীর সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কি হয়েছে তোমার পায়ে? এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছ কেনো?”
অভ্যন্তরে ভড়কায় হায়া। নুইয়ে রাখা ঘাড়টা আরও খানিকটা নুইয়ে নিয়ে আমতা আমতা স্বরে বলল,
“ ক-কোথায় এডউইন? এমন কিছু না তো!”
দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো এডউইনের। রূঢ় কন্ঠে ফের বলল,
“ তারমানে আমি ভুল দেখেছি বললে?”
সহসা আঁতকে উঠে হায়া। তড়িঘড়ি করে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে এডউইনকে শুধরে বলে ওঠে,
“ না না! আমি তা বলিনি। আমি আসলে…একটু অসুস্থ। পেট ব্যথা করছে তাই হয়তো…”
বাকিটু শেষ হবার ফুরসত পেলোনা পারস্য সুন্দরী। এর আগেই তার সম্মুখে হাত উঁচিয়ে বাঁধ সাধল এডউইন। মেয়েটার কথার মাঝে বাহাত ঢুকিয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে বসল,
“ থাক হয়েছে! ঔষধ খেয়ে নিও।”
শুনল হায়া। বাধ্যতায় ঘাড় কাত করল একটুখানি। এডউইন কেমন গম্ভীর মুখেই সরে গেল সেখান থেকে। এদিকে একজোড়া রাগান্বিত চোখ যে সে-ই কতক্ষণ ধরে এ দুই মানব-মানবীর কথোপকথন দূর থেকে দেখল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, সে খবর থোড়াই আছে তাদের! মিলা নামক তরুণীর মলিন মুখখানায় ছেয়েছে রাজ্যের আধার। তার হাতদুটো খামচে ধরেছে জামার দুপাশের অংশ। রাগান্বিত কন্ঠ বিরবির করে আওড়াল,
“ এটা ঠিক করোনি হায়া! ইউ্য উইল পে ফর দিস।”
রাতের আধারে ডুবেছে রাশিয়ার Kronstadt অঞ্চল। বাঁদিকের অন্ধকারাচ্ছন্ন সাইড রাস্তার আশেপাশে লোক সমাগম শূন্যের কোঠায়! এহেন অন্ধকার রাস্তায় নির্বিঘ্নে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। কব্জি উল্টে তাকিয়ে আছে নিজ কব্জিসন্ধিতে আঁটকে থাকা কৃত্রিম আলোয় পরিপূর্ণ ঘড়ির কাঁটার পানে। রাত ন’টা বেজে ২৩ মিনিট। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির আগমনের কথা ছিল আরও ১০ মিনিট পূর্বে। অথচ তার এখনো কোনো খোঁজ খবর নেই! এহেন দায়িত্বহীনতা দেখে মেজাজ খিচল এডউইনের। একহাতে ধরে রাখা স্যুটকেসের হাতলে আরেকটু চাপ বসিয়ে যুবক গতি টানল পায়ের। অন্ধকারে দু-কদম হাঁটতেই আচানক পেছন থেকে নিক্ষিপ্ত হলো গাড়ির হেডলাইটের আলো। মুহুর্তেই দাঁড়িয়ে পড়ল এডউইন। সহসা শরীর ঘুরিয়ে তাকাল পেছনে। একখানা ল্যাম্বরগিনি নিরবে এগিয়ে আসছে। অসাধারণ গতি থামিয়েছে রাস্তার অপজিটে। এডউইন সরু দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সেদিকে। কিয়তক্ষন বাদে গাড়ির ব্যাকসিট থেকে নেমে এলেন এক ভদ্রবেশী অভদ্র লোক। মুখভর্তি হাসি তার, সদ্য ছাঁটাই করা চোয়ালখানা হেডলাইটের আলোয় চিকচিক করছে কেমন। ভদ্রলোক দ্রুত পায়ে ছুটে এলেন এডউইনের নিকট। গালভর্তি হাসি টেনে প্রথমেই নিজ কর্মে লজ্জিত হবার সুরে বলে উঠলেন,
“ সরি মিস্টার! খুব ওয়েট করালাম মনে হচ্ছে?”
এডউইন গা করল না। গম্ভীর মুখে চোয়াল শক্ত করে স্রেফ বলল,
“ আই জাস্ট হেইট দোস কাইন্ডা পিপলস হু ওয়েস্ট মা’ই টাইম।”
সহসা দাঁতের চাপায় জিভ বসালেন ভদ্রলোক। নিজ ভুল স্বীকার করে ফের আওড়ালেন,
“ এক্সট্রিমলি সরি মিস্টার! বাট আই হেভ আ সারপ্রাইজ ফর ইউ্য।”
ভ্রু গোটায় এডউইন। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ বাট আমি এখানে সারপ্রাইজ নিতে আসিনি থমাস। আমি এসেছি ডিল ফাইনাল করতে।”
রহস্যময় বাঁকা হাসলেন থমাস। আলগোছে চোখ থেকে খুলে আনলেন চশমাটা। বাঁকা দৃষ্টিতে এডউইনের মুখপানে তাকিয়ে থাকতেই আচানক অদূরের গাড়ির কাছ থেকে ভেসে এলো এক অতিপরিচিত কন্ঠ!
“ ডিল তো আমরা ফাইনাল করব এডউইন! তাও তোমার সঙ্গে — পারসোনালি!”
ভড়কায় এডউইন। সহসা নেত্র ঘোরায় গাড়ির পানে। হেডলাইটের আলোয় মৃদু সমতায় দেখা যাচ্ছে এক যুবকের অবয়ব! গাড়ির কাছে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সে। পায়ের গতি ঠায় তার। এডউইন চোখ ছোট করল। এরইমধ্যে হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন এগিয়ে এসে এক ধাতব নলের তীব্র আঘাতে থেঁতলে দিল এডউইনের পিঠ। মুহুর্তেই ব্যথার তীব্রতায় বেচারার হাতের মুঠো থেকে ছিটকে পড়ল স্যুটকেসটা। হাঁটু দুটো নিজেদের অবস্থান ঠেকাল মাটিতে। পেছন থেকে অগণিত আঘাত এখনো বর্ষে যাচ্ছে এডউইনের পিঠে। থেঁতলে যাচ্ছে পিঠের হাড়, মা ং স! সর্বাঙ্গে বসেছে আঁচড়। তাজা লোহুর উপস্থিতিতে ভেসে যাচ্ছে এডউইনের গা। তবুও গম্ভীর মানব হাল ছাড়েনি। স্যুটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একখানা রিভলবার বের করে এনে, অনবরত গুলি ছুড়ল সামনে – পেছনে। এতে কারো গায়ে লাগল কি-না কে জানে! আচমকা আরেকটা ধাতব নলের তীব্র আঘাত এসে মুষড়ে পড়ল এডউইনের গাল বরাবর। এহেন অতর্কিত আক্রমণে তক্ষুনি জমিনে ছিটকে পড়ে এডউইন। গালের চামড়া জ্বলছে তার। ব্যথার তীব্রতায় অবশ হচ্ছে শরীর। ভিন্ন রঙা ঝাপসা চোখদুটোর ক্ষীণ স্পষ্টতায় বড্ড কাছে দৃশ্যমান হলো কিছু পরিচিত মুখ! নিক দাঁড়িয়ে আছে তারই সম্মুখে। যুবকের হাতে একখানা ধাতব নল! সে কেমন ঠোঁট পিষে হাসছে দেখো। এডউইন রয়েসয়ে শোয়া ছেড়ে উঠতে নিলেই নিক বসালো আরেক ঘা। তক্ষুনি আরেকধাপ মুষড়ে গেল এডউইন। মাথাটায় বড্ড আঘাত পেয়েছে গম্ভীর পুরুষ। ওদিকে নিক কেমন বাঁকা হেসে একহাঁটু নামিয়ে বসল এডউইনের মুখের কাছে। ঘাড় বাকিয়ে অতি শান্ত ভঙ্গিতে হাতে থাকা ধাতব নলের আগাটুকু এডউইনের সম্পূর্ণ মুখাবয়বে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
“ মনস্টারকে না জানিয়ে আমাকে মে’রে দ্য লায়োন গ্রুপের গ্যাংস্টার হতে চেয়েছিলি এডউইন? চু চু চু! সো স্যাড! নিজেকে বড়ো তিসমার খাঁ ভাবিস নাকি?”
বলতে বলতেই আচমকা শক্ত হাতে এডউইনের মাথার তালুর চুলগুলো খামচে ধরে নিক। চোখেমুখে আগুন লেপ্টে চিড়বিড় কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ইউ্য বাস্টার্ড! একমাত্র মনস্টারের রাইট হ্যান্ড বলে তোকে ছাড় দিয়েছিলাম এতদিন। নাহলে তোর মতো চুনোপুঁটিকে মা-রা খুব একটা বড়ো বিষয় না আমার জন্য। বাই দা ওয়ে, আজ নাহয় তুই মর! এন্ড ট্রাস্ট মি, খুব শীঘ্রই তোর সাথী হিসেবে মনস্টারকে পাঠাব আমি।”
এহেন কথায় না চাইতেও ফোকলা হাসল এডউইন। জমিনে গা লুটিয়ে পড়ে থেকে দূর্বল কন্ঠে থেমে থেমে আওড়াল,
“ নাইস ড্রিম নিক! মনস্টারকে কেন? পারলে তার একটা বা**ল ছিঁড়ে দেখাস।”
সহসা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে উপস্থিত সকলে। নিকও তাল মিলিয়েছে সবার সনে। হাসার একফাঁকে নিক কেমন কুটিল কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ইউ্য নো না এডউইন? মানুষকে মা’রে তার দূর্বলতা। এন্ড ফাইনালি, মনস্টারেরও একটা দূর্বলতা রয়েছে! শত হলেও দিনশেষে সে মানুষ। দূর্বলতা থাকবেই তাই না? দেখা যাক — মনস্টারের দূর্বলতাই মনস্টারের মৃত্যুর কারণ হয় কি-না! ”
আঁতকে উঠে এডউইন। এতবড় একটা গোপন সত্যি নিকের কন্ঠে শুনে হতভম্বতায় ডুবেছে সে। নড়চড় বাড়িয়েছে শরীরের। নিক হাসল। তক্ষুনি পা ঘুরিয়ে চলে গেল গাড়ির কাছে। দু’হাতে সামান্য তালি বাজাতেই কোত্থেকে যেন ছুটে এক বহর গার্ডস। সকলের হাতে স্নাইপার! একযোগে রাস্তার একপাশে সারিবদ্ধ আকারে দাঁড়িয়েছে তারা। স্নাইপারের ধাতব নল ঠেকিয়েছে এডউইনের পানে। ততক্ষণে সিগার ধরিয়েছে নিক। মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সকলকে হুকুম ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ ফায়ার!”
মুহুর্তেই স্নাইপারের রিংয়ে আঙুল ঢুকল সবার। একযোগে অগ্নিসীসা যেইনা ছুঁড়বে এডউইনের দিকে ওমনি কোত্থেকে যেন হাওয়ার বেগে ছুটে এলো একখানা কালো রঙা হাই বুলেট প্রুফ এসইউভি। গাড়িটা এসেই থামল এডউইনকে ব্লক করে। অদূরের সবাই ভড়কায় এহেন কান্ডে। নিক তৎক্ষনাৎ ফের আদেশ ছুড়ল,
“ ফায়ার কর!”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৩ (২)
মুহুর্তেই অগ্নিসীসার তুমুল বর্ষণে গর্জে উঠল চারপাশ। সবগুলো গু লি এসে বাঁধ সাধল কালো রঙা এসইউভির গায়ে। গাড়ি ভেদ করে একটা গুলিও ঢোকবার সাধ্যি পাচ্ছে না। এদিকে হুট করেই এডউইনের সামনে গাড়িটার ব্যাক সিটের দুয়ার খুলে গেল। সে-ই সঙ্গে খুলল গাড়ির মালিকের পাশের দরজা! পরক্ষণেই দৃশ্যমান হলো ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগার চেপে রাখা মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার! একহাতে তার গাড়ির স্টিয়ারিং, ডান পায়ের লাগামে গাড়ির দরজা খোলা! এডউন হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল কেবল। ওদিকে রূঢ় মানব তখন বাজখাঁই কন্ঠে বলল,
“ চাল ওঠ বান্দীর ছেলে! গাড়িতে বস।”
