Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৫

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৫

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৫
মহাসিন

‎রাতের ঘড়ির কাঁটা এখন ঠিক দশটা ছুঁয়েছে। ডাইনিং টেবিলে ভাত তরকারির গরম ভাপ উঠছে। মৌসুমী বেগম প্লেটে ভাত বেড়ে চুপচাপ বসে আছেন। পাশে তার স্বামী রুবেল আর ননদ রিদি বেগম খাবার খাচ্ছেন।
‎কিন্তু টেবিলের দুটো চেয়ার খালি। মৌসুমী বেগম সেই কখন থেকে গলা ফাটিয়ে ডাকছেন।
‎শাপলা শিখাকে কিন্তু ওরা খেতে আসছে না।
‎ওদের আসার নাম গন্ধ নেই। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল মৌসুমী বেগমের। চেঁচিয়ে উঠলেন,
‎”শিখা, খেতে আসবি নাকি তোদের দুইজনের খা_বা_র কুকুরকে দিয়ে দেবো?”
‎ধমক শুনে দুই বোন দৌড়ে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে চেয়ার টেনে বসে পড়ল। শাপলা হাসি হাসি মুখ করে বলল,
‎”এই তো এসে গেছি মা।”

‎মৌসুমী বেগম বড় বড় চোখ করে তাকালেন। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
‎”এখন খেতে আসার সময় হলো বুঝি? এখন আর খেতে দেবো না।”
‎রুবেল মাঝে পড়ে বললেন,
‎”থা তো। দিয়ে দাও। ছোট মানুষ, খিদে লেগেছে ওদের।”
‎মৌসুমী বেগম ঝাঁঝিয়ে উঠলেন,
‎”ওরা এখন আর ছোট নেই। এক একটা পা _জি হয়েছে।”
‎রাগে গজগজ করতে করতে মৌসুমী বেগম দুই মেয়ের প্লেটে ভাত তুলে দিলেন। শিখা ভাত মাখতে মাখতে চোখ তুলে বলল,
‎”মা, একটা কথা বলবো?”
‎মৌসুমী বেগম ভ্রু কুঁচকালেন,
‎”তো বল তোকে ধরে রাখছে কে?”
‎”বলবো, তবে চিৎকার করতে পারবে না কিন্তু।”
‎মৌসুমী বেগম ধমক দিলেন,
‎”এমন কোনো কথা বলবি না, যে চিৎকার করতে হয়।”

‎শিখা মুখ বাঁকালো,
‎”ধ্যাত, এমন করো কেন?”
‎রুবেল স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
‎”তুমি এমন করো কেন, হ্যাঁ? ওকে বলতে দাও তো।”
‎তারপর মেয়ের দিকে ফিরে নরম গলায় বললেন,
‎”তুই বল মা।
‎শিখা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল,
‎”মা, আমি আর শাপলা মহুয়া আন্টির বাসায় বেড়াতে যেতে চাই।”
‎শুনেই মৌসুমী বেগমের চোখ মুখ লাল হয়ে গেল। রাগে গজগজ করতে করতে বললেন,
‎”বেড়াতে যেতে হবে না।”

‎শাপলা আস্তে করে বলল,
‎” মা, অনেক দিন তো হলো কোথাও যাই না। এমন করো কেন? গেলে কি হবে?”
‎রুবেল সমর্থন দিলেন,
‎”ঠিক আছে, যাক না। ওদেরও তো বেড়াতে ইচ্ছা হয় নাকি।”
‎মৌসুমী বেগম এক কথার মানুষ। শক্ত গলায় বললেন,
‎”না। কোথাও যেতে পারবে না। ওদের পড়াশোনা আছে।”
‎শাপলা বলল,
‎”কয়েকটা দিন পড়াশোনা না করলে কি হবে মা? এমন তো না যে কয়েকটা দিন পড়লেই আমরা শিক্ষামন্ত্রী হয়ে যাবো।”
‎কথা শেষ হতেই মৌসুমী বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
‎”চুপ! একটা কথাও বলবি না। আমি বলছি না মানে না।”

‎রিদি বেগম পাশ থেকে বললেন,
‎”গেলে কি সমস্যা?”
‎মৌসুমী বেগম মুখ ঘুরিয়ে নিলেন,
‎”না। ওরা যেতে পারবে না।”
‎শিখা এবার জেদ ধরে বসল,
‎”না, আমি যাবোই।”
‎মৌসুমী বেগম একটু নরম হলেন।
‎”কত দিনের জন্য যাবি?”
‎”২৫ দিন।”
‎”না, মাত্র ১৫ দিনের জন্য যেতে পারবি।”
‎শিখা শাপলা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলল,
‎”আচ্ছা ঠিক আছে।”
‎এরপর সবার খাওয়া শেষ হলো। থালা বাসন সরিয়ে যে যার ঘরে চলে গেল। ডাইনিং টেবিলে শুধু পড়ে রইল মৌসুমী বেগমের রাগ আর দুই বোনের চাপা হাসি।

‎ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই। জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলো বিছানার একপাশে পড়েছে। শাপলা শিখা দুই বোন পাশাপাশি শুয়ে আছে। দুজনের চোখে ঘুম নেই।
‎শাপলা পাশ ফিরে ফিসফিস করে বলল,
‎”এই আপু, সত্যি সত্যি ওই ছেলেটার বউ হওয়ার অভিনয় করবি তুই?”
‎”হুঁ”
‎শাপলার কপালে ভাঁজ পড়ল।
‎”আমরা তো ছেলেটাকে চিনি না, জানি না। এমনকি ওর নাম পর্যন্ত জানি না। ছেলেটার যদি কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থাকে?”
‎শিখা আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
‎” আরে না। এমন কিছু হবে না। কালকে ছেলেটার সাথে সরাসরি কথা বলবো।”
‎বলেই শিখা ফোন হাতে নিল। বিরের নাম্বারে কল দিল। রিং হতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
‎”হ্যালো, কে আপনি?”
‎শিখা হাসি চেপে বলল,
‎”এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন? আমাকে আপার বউ হওয়ার কথা বলেছিলেন। আমি সেই।”
‎ওপাশ থেকে একটু থেমে উত্তর এলো,
‎”ও আচ্ছা। তা কি সিদ্ধান্ত নিলেন?”
‎” সরাসরি বলবো। কালকে সেই বটগাছের নিচে দেখা করি?”
‎”কয়টায়?”
‎”সকাল ১০টায়।”

‎বির স্বাভাবিক কন্ঠস্বরে আওড়ালো,
‎”আচ্ছা ঠিক আছে, তাই হবে।”
‎একটু থেমে বির আবার শুধালো,
‎”তা কি করেন এখন?”
‎”এই তো শুয়ে আছি। আপনি?”
‎”আমিও শুয়ে আছি। খাবার খেয়েছেন?”
‎”হ্যাঁ। আপনি?”
‎”আমিও খেয়েছি।”
‎আবার নীরবতা। তারপর শিখা গলা খাঁকারি দিয়ে আসল কথায় এলো,
‎”তা আমি যদি আপনার বউ হওয়ার অভিনয় করি, তাহলে কত টাকা দিবেন?”

‎বির একটুও না ভেবে বলল,
‎”২ লক্ষ টাকা।”
‎শিখা নাক কুঁচকালো,
‎”না, কম হয়ে যায়।”
‎বির হাসল,
‎”আচ্ছা, কাল এ নিয়ে কথা হবে।”
‎”ঠিক আছে।”
‎এই বলে শিখা কল কেটে দিল।
‎শাপলা পাশ থেকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিল।
‎”তুই যেভাবে ছেলেটার সাথে কথা বললি, মনে হলো তোর প্রেমিকের সাথে কথা বলছিস।”
‎শিখা লজ্জা পেয়ে বালিশে মুখ গুঁজে বলল,
‎”ধ্যাত, কি সব বলছিস!”
‎শাপলা দুষ্টু হাসি দিল,
‎”ছেলেটা কিন্তু সুন্দর আছে। তোর সাথে হেব্বি মানাবে।”

‎”উফ্,এসব কথা বলা বন্ধ কর তো।”
‎”সত্যি বলছি। ছেলেটা অনেক সুন্দর। আমি কিন্তু ক্রাশ খেয়েছি।”
‎শিখা ভ্রু তুলল,
‎”কেন, তুই ক্রাশ খাবি কেন হ্যাঁ?”
‎শাপলা মুচকি হেসে বলল,
‎”হ্যাঁ, তাই তো। আমি কেন ক্রাশ খাবো? ক্রাশ তো খাবি তুই।”
‎”তোর কাছে সব আজেবাজে কথা।”
‎”ছেলেটা কিন্তু সেই।”
‎”হইছে হইছে। এবার ঘুমা তো।”
‎এরপর দুই বোন পাশ ফিরে শুলো। বাইরে ঝিঁঝি পোকার ডাক। ঘরের ভেতর চাপা হাসি আর ফিসফিসানি মিলে রাতটা আরও গভীর হলো। ধীরে ধীরে দুজনেই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেল।
‎সময় গলে গেল রাতের আঁধারের মতো। রাত তার সমস্ত নীরবতা নিয়ে চলে গেল। আর ভোরের আলোয় দিনের আগমন ঘটলো।

‎পৃথিবীর বুকে সূর্যের সোনালি কিরণ ছড়িয়ে পড়েছে। গাছের ডালে ডালে পাখিরা কিচিরমিচির করে নতুন দিনের গান ধরেছে।
‎কিন্তু শাপলা শিখা দুই বোন এখনো ঘুমের রাজ্যে মগ্ন। ওদের জগতে আলো আঁধারের কোনো খবর নেই।
‎হঠাৎ দরজায় ধাক্কা। মৌসুমী বেগমের গলা ভেসে এলো,
‎”এই শিখা, শিখারে! আর কত ঘুমাবি? এবার ঘুম থেকে ওঠ। কয়টা বাজে তার খেয়াল আছে? সাড়ে নয়টা বেজে গেছে।”
‎ধমক শুনে দুই বোন লাফিয়ে উঠল। চোখ ডলতে ডলতে বিছানা থেকে নামল। তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে খাবার খেয়ে দৌড়ে এসে বসার ঘরের সোফায় ধুপ করে বসে পড়ল।
‎শিখা চোখ টিপে ফুপ্পি রিদি বেগমের দিকে তাকাল। গলা নরম করে বলল,
‎”ফুপ্পি, আমি আর শাপলা একটু বাইরে যাবো?”
‎রিদি বেগম পত্রিকা ভাঁজ করতে করতে বললেন,
‎”না। কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। তোর মা জানতে পারলে কিন্তু চিৎকার শুরু করবে। তোর মায়ের চিৎকার শুনতে শুনতে আমার কান প চে গেছে। আর চিৎকার শুনতে চাই না।”

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৪

‎‎শিখা ফুপ্পির হাত ধরল। আদুরে গলায় বলল,
‎”প্লিজ ফুপ্পি। তুমি মাকে মিথ্যা বলে দিও।”
‎রিদি বেগম কপট রাগ দেখালেন,
‎”পারবো না।”
‎”প্লিজ ফপ্পি।”
‎শেষমেশ রিদি বেগম হার মানলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
‎”ঠিক আছে। তবে তাড়াতাড়ি চলে আসবি।”
‎অনুমতি পেয়েই দুই বোন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ওড়না ঠিক করে, দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে রোদ ঝলমল করছে, আর ওদের বুকের ভেতর প্রজাপতি উড়ছে।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৬