লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৬
নুসাইবা আরা নুরি
-আরে ধুর তোর কথায় কষ্ট পাই নি।নিজের ভাগ্য যেখানে মন্দ সেখানে অতীত তো কষ্টের হবেই।
-থাক বাদ দে চল ভেলপুরি খাই। ওই দেক ভেলভুরি।
-হুম চল।
ইরু শ্রেয়সী কে নিয়ে রাস্তা পার হয়ে ভেরপুরির ঠেলার কাছে যায়।তারপর দোকানদার মামাকে ভেলপুরি দিতে বলে দুই প্লেট।বলে পাশে থাকা প্লাস্টিকের টুল টেনে নিয়ে বসে ইরু আর শ্রেয়সী।তারপর আবারো গল্প শুরু করে দেয়।
মেহেরাজের মাথায় আগুন জলছে।হ্যা সে বিয়ে বিয়েতে রাজি ছিলনা।এমনকি মেয়েটার মুখ না দেখে ফেলে রেখে চলে গেছিলো।তাই বলে কি মেয়েটাকে বাড়ির লোক নিয়ে যাবে।আর যদি নিয়েও যায় তাহলে মেহেরাজের নিজের বাবা এমন একটা কাজ কিভাবে করলো।তাও মেহেরাজের চেক এর সিগনেচার কপি করে ডিভোর্স পেপারে বসিয়ে দিয়েছে।মেহেরাজ মানছে তার দোষ বেশি কিন্তু তার থেকে তার পরিবারের তো কম না।
গাড়ির স্ট্রিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ির গতি সীমিত কমিয়ে নিয়ে আসে মেহেরাজ।বাড়ি থেকে অনেক দূর চলে এসেছে।মেহেরাজ অফিসে চলে যেতে চেয়েছিলো তবে হুট করে মনে হলো মেয়েটার সাথে যেহেতু তার আসল ডিভোর্স হয়নি।আর মেয়েটার বা মেয়েটার পরিবার জানে ডিভোর্স হয়েছে তাই মেহেরাজ এবার সত্যি সত্যি ডিভোর্স দিয়ে মেয়েটাকে একেবারেই তার জীবন থেকে মুক্তি দিবে।
কিন্তু কাজটা সে অফিসে গেলে আর হবে না।আবারো হয়তো কোনো মিশনে চলে যাবে সে।তখন আরো দেরি হবে।তাই মেহেরাজ গাড়ি চালাতে চালাতেই ভেবে নিয়েছে এই তিন মাসের ভিতরে যেভাবেই হোক মেয়েটার পরিচয় খুজে বের করবে।তারপর ডিভোর্স দিয়েই এলাকা ছাড়বে।
মেহেরাজ পকেট থেকে নিজের ফোন বের করলো। তারপর দেখে দেখে খুজে কাঙ্খিত একজনের নাম্বার খুজে বের করলো।সাথে সাথে কল লাগালো সেই নাম্বারে।বেশ কয়েকবার রিং হতেই ফোন রিসিভ হলো।মেহেরাজ সালাম দিতেই ওপাশের লোকটা সালামের উত্তর দিয়ে খুক খুক করে কেশে গলা পরিষ্কার করে রশিকতা কন্ঠে বলল,
-হটাৎ লেফটেন্যান্ট সাহেবের কল যে।এই অধম কে হটাৎ কি মনে করে কল দিলেন স্যার।আমি আপনার কোন মুল্যবান কাজে লাগতে পারি।আমাকে তো ভুলেই গিয়েছেন।
মেহেরাজ কপাল কুচকে যায় ফাহিমের কন্ঠ শুনে।গম্ভীর গলায় বলে,
-তোর মশকরা বন্ধ করবি।একটা জরুরি দরকারে ফোন দিয়েছি।
-আমি জানি তুই প্রয়োজন বাদে ফোন দিবিও না।বিজি মানুষ।
-বাই।
কথাটা বলেই কল কাট্টে যাচ্ছিলো মেহেরাজ।যেহেতু সে গাড়ি চালাচ্ছে তাই সাথে সাথে কাটতে পারেনি।মেহেরাজের এখন মজা ভালো লাগছে না।মেহেরাজের বাই বলা দেখে ওপাশ থেকে ফাহিম এবার সিরিয়াস ভাবেই বললো,
-এই না না সরি দোস্ত।শোন বল কি দরকার।
-দরকার নেই।
-প্লিজ বল।সরি বললাম তো।
-তোদের বিল্ডিং এর নিচে আই।
-কেন?
-আসতে বলেছি আই।
-ওকে।
মেহেরাজ কল কেটে দেয়।ফাহিম মেহেরাজের সেই স্কুল জীবনের বন্ধু।এক সাথেই সব কিছু। তবে দুজন দুই প্রফেশন এ।মেহেরাজ ডিভেন্স এ আর ফাহিম ল নিয়ে পড়ে উকিল হয়েছে।চট্রগ্রাম এর বেশ নাম করা উকিল ফাহিম।আর সব থেকে বড় কথা মেহেতাজের বেস্ট ফ্রেন্ড ফাহিম।মেহেরাজ যতোটা গম্ভীর চুপচাপ সভাবের ফাহিম ঠিক তার উলটো।মানুষ মাঝে মাঝে ভাবে মেহেরাজের সাথে ফাহিমের বন্ধুত্ব হলো কিভাবে।কিন্তু এসব মেহেরাজ বা ফাহিম ভাবে না।তাদের সভাব আলাদা হকেও আত্মার টান এক।
মেহেরাজ গাড়ির গতি বাড়িয়ে কিছুক্ষনের মাঝেই একটা চার তলা বিল্ডিং এর সামনে এসে দাঁড়ায়।তারপর ফোন লাগাই ফাহিমের নাম্বারে।সাথে সাথে বাড়ির গেট খুলে বের হয়ে আসে ফাহিম। ফাহিম কে বের হতে দেখে মেহেরাজ গাড়ি থেকে বের হয়।তারপর এগিয়ে যায় ফাহিমের দিকে।ফাহিম নিজের প্রান প্রিয় বন্ধুকে এতোদিন পর দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে মেহেরাজকে।মেহেরাজ ও ধরে।
বেশ কিছুক্ষন পর ফাহিম মেহেরাজ কে ছেড়ে বলে,
-চল উপরে চল।যেতে যেতে বলিস কি দরকার।এখন তোর কি অবস্থা।কেমন আছিস।
-উপরে যাবোনা চল কোনো কফি শপে গিয়ে বসি।
-আরে না তুই উপরে চল।আম্মু তোকে দেখলে ভীষন খুশি হবে।
-না।
-তোকে আস্তে বলেছি আই।
বেগত্যা মেহেরাজ আর তর্কে যায় না।এম্নিত্রি মাথা গরম।তাই ফাহিমের সাথে করে গাড়ি নিয়ে ভিতরে ঢুকে।মেহেরাজ মিষ্টি নিতে চাই তবে ফাহিম নিষেধ করে তাই ফল-মুল কিনে নেয় কয়েক ধরনের।আর যাইহোক কারোর বাড়িতে কি খালি হাতে যাওয়া যায়।মেহেরাজের বিবেকে বাধা দেয়।তারপর ফাহিমের সাথে বাড়ির ভিতরে চলে যায় লিফটে করে তিনতলার উদ্দেশ্যে।
শ্রেয়সী বাড়ি ফিরে বেলা বারোটায়।বাড়িতে এসে দেখে তার ভাবির বড় ভাই আর ছোট বোন এসেছে।শ্রেয়সী সালাম দিয়ে ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করে নিজের ঘরে চলে যায়।অনেক গরম পড়েছে আজ।লম্বা একটা শাওয়ার নেওয়ার প্রয়োজন।
শ্রেয়সী ঘরে এসে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়।তার কলেজ ব্যাগ পড়ার টেবিলের উপর রেখে স্কাপের পিন খুলতে শুরু করে।ওয়াড্রব থেকে একটা জাম রঙের থ্রিপিস নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় শ্রেয়সী।
শ্রেয়সী বাড়ি ফেরার প্রায় আধঘন্টা পর তোহা হাতের কাজ শেষ করে শ্রেয়সীর জন্য রান্না ঘর থেকে ফ্রিজের পানি বের লেবু চিপে সরবত বানিয়ে নেয়।তারপর খাদিজা খাতুনকে বলে বের হয় রান্না ঘর থেকে।কারন শ্রেয়সী যাওয়ার আগে বলেছিলো ঠান্ডা পানির কথা।তবে হাতে কাজ থাকায় তখন আর দিতে পারেনি তোহা।তাই এখন যাচ্ছে।সোফায় তোহার ভাই তুহিন আর ছোট বোন তুশি বসে আছে।তোহা ওদের সামনে গিয়ে তুহিনের উদ্দেশ্যে বলে,
-ভাইয়া তুই ওই কোনার ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নে।আব্বুরা আসুক তখন বলিস আব্বুকে।আর তুশি তুই আমার সাথে আই।
তুহিন উঠে চলে যায় ঘরে।এদিকে তুশি আর তোহা চলে যায় শ্রেয়সীর ঘরে।শ্রেয়সী বিছানায় টান টান হয়ে সুয়ে আছে।মাথায় তোয়ালে পেচানো।ফ্যান ঘুরছে মাথার উপর।মাত্র গোসল করে বেরিয়ে সে।তোহা দরজার কাছে এসে বলে,
-ননদিনী আসবো।
ভাবির কন্ঠ শুনে শ্রেয়সী বিছানায় উঠে বসে। তারপর শান্ত কন্ঠেই বলে,
-তোমাকে কতবার বলেছি ভাবি আমার ঘরে আসতে অনুমতি নিতে হবে না।তুমার যখন ইচ্ছা আসবা যাবা।
শ্রেয়সীর কথায় তোহা হেসে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে,
-আমার ননদিনী বড় হয়েছে।তার একটা প্রাইভেসি তো আছে তাই না।
-তোমাদের কাছে কিসের প্রাইভেসি।তোমরা তো আমার সব।।
তোহা হাসে।শ্রেয়সীকে আপন বোনের মতো ভালোবাসে।বিনিময়ে শ্রেয়সী ও একই রকম সম্মান শ্রদ্ধা করে বড় বোনের ন্যায়।তোহা এগিয়ে এসে হাতে থাকা লেবুর সরবত টা এগিয়ে দিয়ে বল,
-লেবুর সরবত তোমার তো পছন্দ তাই করে নিয়ে এলাম। খেয়ে নাও।
শ্রেয়সী এক চুমুকে সব টুকু খেয়ে নিলো বিনাবাক্যে।তারপর তোহার দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুশি আর ভাইয়ারা কখন এসেছে ভাবি??
-ওইতো তুমি যখ কলেজ গেলে তখনই এসেছে একটু দরকারে।
-ওহ।
-আচ্ছা থাকো।আমি যাই আম্মা আবার খুজবে রান্নায় হেল্প করি।
-আচ্ছা যাও।তুশি এখানে থাক।
-আচ্ছা।
তোহা তুশিকে শ্রেয়সীর কাছে রেখে চলে যায়।শ্রেয়সী এই বাড়িতে শুধু তার ভাই আর মা বাদে কাওকে ভয় পাই না।তার ভাই তাকে যতটুকু ভালোবাসে ততটুকু শাসন করে।কিন্তু এখন শাসন করতে গেলে বাবা বাড়ি না থাকলে ভাবি এসে তাকে বাচায়।ব্যাচ শ্রেয়সী বেচে যায় বকা খাওয়ার থেকে।
মির্জা বাড়ির সবার মুখ থমথমে।হাসান সাহেব ভিষন রেগে আছে সবার উপর।কারন এসবের কিছুই জানতেন না।তিনি জানতেন মেহেরাজ ডিভোর্স দিয়েছে।কিন্তু তার তার নাতির পিছনে এতো বড় ষড়যন্ত্র তা তিনি বুজেননি।তখন মেহেরাজ বাড়ি ছেটে চলে যাওয়ার পর।শারমিন খাতুন আর নাহিদা খাতুন কাদতে কাদতে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে।নিলয় মির্জা তখনও একই ভাবে দাঁড়িয়ে।
নিলয় মির্জাকে চুপ চাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শারমিন খাতুন তার সামনে ঠাস করে নিজের ছেলের গালে কসিয়ে চড় মারে।তারপর রাগী কন্ঠেই বলে,
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫
-তোকে আগেই বলেছিলাম পরে সমস্যা হবে।ডিভোর্স করাস না এভাবে।এটা শুধু নাম মাত্র ডিভোর্স। ইসলামের নিতিতে ফুজনের মত ছাড়া ডিভোর্স হয় না।সেখানে ও তো সাইন ই করেনি।।দিলি তো আমার নাতিটাকে ঘর ছাড়া করে।তুই বের হতে বলার কে। কেন বেরিয়ে যেতে বললি ওকে।দোষ তো তোর।তুই সব করেছিস।আর মাঝখানে আমার নাতিটা চলে গেলো।আমার কলিজার নাতিটা বছরেও একবার আসেনা।আর এবার তিন মাসের জন্য এসেছিলো।দিলি তো বের করে।শান্তি হয়েছে এবার তোর।
শারমিন খাতুনের কথায় চুপ করে যায় নিলয় মির্জা।মায়ের হাতের চড় টা তার দরকার ছিলো।আসলেই সে ভুল করেছে।আর যার জন্য তার ছেলেটা তার উপরেই রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গেলো।
