Mad for you 2 part 39
তানিয়া খাতুন
আমানের কোলের ওপর বসে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা খেলনাগুলো নিয়ে আপনমনে খেলছে ছোট্ট বাচ্চাটি।
কখনো একটি গাড়ি ঠেলে দিচ্ছে, কখনো রঙিন বল হাতে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠছে।
মাঝেমধ্যেই ছোট্ট দুটি হাত বাড়িয়ে আমানের গাল ছুঁয়ে আদর করছে আর আধো আধো গলায় ডেকে উঠছে,
— “পাপা… পাপা…”
প্রতিবার সেই ডাক শুনে আমানের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠছে।
সে একদৃষ্টে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইল। মাথার ভেতর যেন হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
এতক্ষণ ধরে যে সন্দেহটা তাকে তিলে তিলে গ্রাস করছে, সেটা যদি সত্যিই সত্যি হয়… তাহলে সে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না।
কিন্তু হিসাবটা মিলছে না।
সিমরান কেন এত বড় সত্যটা তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে? কেন?
কিশোরী মেয়েটিকে বারবার জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করেছিল সে কিন্তু মেয়েটি ভয়ে কিংবা কারও নিষেধে একটি কথাও বলেনি।
রান্নাঘরে যাওয়ার পর থেকে আর এই ঘরের দিকেই আসেনি।
যেন ইচ্ছে করেই আমানের মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলছে।
আমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“সিমরান যদি মুখ না-ই খোলে, তাহলে সত্যিটা জানব কীভাবে?”
তার দৃষ্টি আবারও বাচ্চাটার দিকে গিয়ে স্থির হলো।
এখন একমাত্র ভরসা এই ছোট্ট শিশুটি। অথচ এই বয়সের একটা বাচ্চাই বা কী বলতে পারবে? ঠিকমতো কথা বলতেই তো শেখেনি।
ঠিক তখনই বাচ্চাটা খেলনা ফেলে দিয়ে দুই হাত তুলে হাসতে হাসতে আবার ডেকে উঠল,
— “পাপা… পাপা…”
আমানের ঠোঁটে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
সে আলতো করে বাচ্চাটার নরম গাল টিপে বলল,
— “আমি তোমার পাপা?”
বাচ্চাটা সঙ্গে সঙ্গে জোরে জোরে মাথা নাড়ল।
তার নিষ্পাপ চোখদুটোতে একফোঁটাও দ্বিধা নেই। যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে নিশ্চিত সত্যটাই জানে।
আমান মৃদু হেসে আবার বলল,
— “তুমি কী করে জানলে আমি তোমার পাপা? আমি তো তোমার পাপা নই…”
কথাগুলো বললেও নিজের গলাতেই আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেল না সে।
বাচ্চাটা কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার মতো বয়সও হয়নি তার।
বরং সে আমানের আঙুল শক্ত করে ধরে টানতে লাগল।
প্রথমে আমান কিছুই বুঝতে পারল না।
তারপর বাচ্চাটা হামাগুড়ি দিয়ে বিছানার দিকে গেল। ছোট্ট হাতটা বালিশের নিচে ঢুকিয়ে অনেক কষ্টে একটা ছবি বের করল।
ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরে আবার আমানের কাছে এসে ছোট্ট হাতে সেটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— “পাপা…”
আমান বিস্ময়ে ছবিটা হাতে নিল।
ছবিটা দেখেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
এটা তো তার নিজেরই ছবি!
সে হতভম্ব হয়ে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তাহলে… এই বাচ্চাটা জানল কীভাবে ছবিটা কোথায় রাখা আছে?
উত্তরটা বুঝতে তার আর বেশি সময় লাগল না।
নিশ্চয়ই তাকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়েছে— এই ছবির মানুষটাই তার বাবা।
তাই তো এত দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বারবার তাকে “পাপা” বলে ডাকছে।
আমান এখনও সেই ছবিটার দিকেই তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ বাচ্চাটা আবার দৌড়ে বারান্দায় চলে গেল।
সেখানে রাখা একটি ফটোফ্রেম দুই হাতে তুলে নিয়ে টলতে টলতে আবার ফিরে এল।
ফ্রেমটা আমানের হাতে তুলে দিয়ে আনন্দে আবারও বলে উঠল,
— “পাপা…!”
আমান কাঁপতে থাকা হাতে ফটোফ্রেমটা নিল।
এক পলক দেখেই তার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে গেল।
ফ্রেমের ভেতরে সে আর সিমরানের একসঙ্গে তোলা ছবি।
সিমরানের জন্মদিনে হোটেলে গিয়ে ছবিটা তুলেছিল তারা।
সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি প্রতিশ্রুতি মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে ভেসে উঠল।
আর কোনো সন্দেহ রইল না।
তার মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল।
সমস্ত যুক্তি, সমস্ত প্রশ্ন, সমস্ত দ্বিধা এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
শুধু একটি সত্য বজ্রপাতের মতো তার হৃদয়ে আঘাত করল—
এই শিশুটিই তার সন্তান।
পরমুহূর্তেই আমান ঝাঁপিয়ে পড়ে বাচ্চাটাকে বুকের ভেতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিই আর তাদের আলাদা করতে পারবে না।
তার বুক কেঁপে উঠছে। চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
কান্নায় গলা এতটাই ভারী হয়ে গেছে যে কোনো কথাই ঠিকমতো বের হচ্ছে না।
অনেক কষ্টে সে ফিসফিস করে বলল,
— “আমার বাচ্চা… আমার জান… আমি-ই তোর বাবা… আমি তোকে চিনতে পারিনি, সোনা। আমি নিজের সন্তানকে নিজের চোখের সামনে থেকেও চিনতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করে দে…”
সে পাগলের মতো বাচ্চাটার কপালে, গালে, চোখে, ছোট্ট হাতের তালুতে একের পর এক চুমু খেতে লাগল।
বাচ্চাটাও বাবার গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল।
সেই নিষ্পাপ হাসিটাই যেন আমানের বুকের ভেতর আরও গভীর অপরাধবোধের জন্ম দিল।
সে চোখ বন্ধ করে বাচ্চাটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
এরপর ধীরে ধীরে তার চোখের কোমলতা বদলে গেল।
সেখানে জমা হলো অভিমান… কষ্ট… আর একরাশ ক্ষোভ।
চোয়াল শক্ত করে সে নিচু স্বরে বলল,
— “এটা তুমি একদম ঠিক করোনি, সিমরান। আমার সন্তানের জন্মের খবর, আমার বাবা হওয়ার অধিকার— সবকিছু আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছ।
একজন বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছ।
এবার আর চুপ করে থাকব না। প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে হবে… প্রতিটা হিসাব তোমাকেই মেলাতে হবে।”
শহরের সবচেয়ে বড় নার্সিং হোম।
করিডোরজুড়ে থমথমে নীরবতা।
সেই করিডোরেই অস্থির পায়ে একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে পায়চারি করছে ক্রুশ। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। চোখেমুখে উদ্বেগ, অস্থিরতা আর অসহায়ত্বের ছাপ।
করিডোরের সামনের বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে আছে নীল। তার ঠিক পাশেই বসে আছেন রুহির আম্মু।
চোখ দুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে আছে। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
আর তাদের পাশেই নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে কুটুস। ছেলেটার চোখেমুখেও স্পষ্ট আতঙ্ক।
আজকের এই পরিস্থিতির জন্য যেন প্রত্যেকেই নিজেকে দায়ী মনে করছে।
মূলত নীলই রুহির আম্মু আর কুটুস কে নিয়ে গিয়েছিল বাটারফ্লাই ম্যানশনে।
এতগুলো বছর পর নিজের মেয়ে বেঁচে আছে— এই খবরটা শোনার পর রুহির মা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেননি।
বুকভরা আশা নিয়ে নীলের সঙ্গে ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে।
নীলের বিশ্বাস ছিল, নিজের মাকে সামনে দেখলে অন্তত রুহির সবকিছু মনে পড়ে যাবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।
রুহি তার মাকে চিনতে পারেনি।
এমনকি নিজের ছোট ভাই কুটুসকেও না।
নিষ্পাপ, ফাঁকা চোখে শুধু তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন জীবনে এই মানুষগুলোকে সে কখনো দেখেইনি।
সেই মুহূর্তে একজন মায়ের বুক যে কতটা ভেঙে গিয়েছিল, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
তবুও তিনি হাল ছাড়েননি।
শেষ চেষ্টা হিসেবে রুহিকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন।
হয়তো পরিচিত পরিবেশ, পুরোনো ঘর, শৈশবের স্মৃতি— সবকিছু মিলিয়ে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো আবার ফিরে আসবে।
পুরোনো অ্যালবাম বের করেছিলেন।
ছোটবেলার খেলনা।
রুহির প্রিয় পুতুল।
তার পড়ার বই।
স্কুলের পুরস্কার।
এমনকি ছোটবেলার আঁকা ছবিগুলোও।
একটার পর একটা দেখিয়ে তিনি মেয়ের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু সবকিছুই যেন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল।
রুহি প্রতিটি জিনিসের দিকেই অপরিচিত মানুষের মতো তাকিয়ে ছিল।
তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, কোনো পরিচিতির ছাপ নেই।
শুধুই শূন্যতা।
এরপর কুটুসও আর নিজেকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
সে ইন্টারনেটে খুঁজে বের করেছিল বহু বছর আগের সেই নিউজ ভিডিও, যেখানে ক্রুশ আর রুহির বিয়ের খবর প্রচার করা হয়েছিল।
তার বিশ্বাস ছিল, ভিডিওটা দেখলে হয়তো কোনো না কোনো স্মৃতি ফিরে আসবে।
প্রথমদিকে সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল।
রুহি স্থির চোখে ভিডিওটা দেখছিল।
কিন্তু হঠাৎ করেই তার মুখের রং বদলে গেল।
সে দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল।
মনে হতে লাগল, যেন মাথার ভেতর অসংখ্য স্মৃতি একসঙ্গে ধাক্কা মারছে।
প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে উঠল।
পরের মুহূর্তেই তার শরীর কাঁপতে শুরু করল।
শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে উঠল।
তারপর সবার সামনেই জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল রুহি।
ভয় পেয়ে যায় সবাই।
এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত তাকে শহরের সবচেয়ে বড় নার্সিং হোমে নিয়ে আসা হয়।
বাড়িতে পৌঁছেই পুরো ঘটনাটা জানতে পারে ক্রুশ।
খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তার বুক কেঁপে ওঠে।
এক মুহূর্তও দেরি না করে গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে পাগলের মতো ছুটে আসে নার্সিং হোমে।
সেই থেকে একটানা করিডোরে পায়চারি করেই চলেছে সে।
তার সমস্ত মনোযোগ এখন সামনের বন্ধ দরজার ওপর।
কিছুক্ষণের অপেক্ষার পর সাদা কোট পরা ডাক্তার ধীর পায়ে বাইরে বেরিয়ে আসতেই সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
সবচেয়ে আগে প্রায় দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারের সামনে দাঁড়াল ক্রুশ। তার চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ।
— “ডাক্তার… আমার স্ত্রী কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো?”
ডাক্তার শান্ত দৃষ্টিতে ক্রুশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
— “আপনিই কি রোগীর স্বামী?”
— “জি, আমি ওর স্বামী। প্লিজ ডাক্তার, বলুন ও কেমন আছে?”
ডাক্তার আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হালকা হাসলেন।
— “আপনি আপাতত চিন্তা করবেন না। রোগীর অবস্থা এখন স্থিতিশীল। বিষয়টা খুব একটা আশঙ্কাজনক নয়, তবে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্তও বলা যাচ্ছে না।”
ক্রুশের বুক থেকে যেন খানিকটা চাপ নেমে গেল। তবুও উৎকণ্ঠা কাটল না।
ডাক্তার আবার বলতে শুরু করলেন,
— “আপনারা জানিয়েছেন, অতীতের অনেক কিছুই উনার মনে নেই।
অর্থাৎ আগের দুর্ঘটনায় মাথায় যে আঘাত লেগেছিল, তার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে।
এই অবস্থায় জোর করে পুরোনো স্মৃতি মনে করানোর চেষ্টা করলে মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। আজ ঠিক সেটাই হয়েছে।”
— “মস্তিষ্ক যখন ভুলে যাওয়া স্মৃতিগুলো একসঙ্গে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, তখন রোগীর প্রচণ্ড মাথাব্যথা, অস্থিরতা, এমনকি জ্ঞান হারানোর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এমন ভুল আর করবেন না।”
ডাক্তারের কথা শেষ হওয়ার আগেই অস্থির হয়ে উঠল ক্রুশ।
তাড়াহুড়ো করে সে বলল,
— “না, ডাক্তার! আর কেউ ওকে কিছুই মনে করানোর চেষ্টা করবে না।
দরকার হলে ও সারাজীবন যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে। তবুও আমি ওর ওপর কোনো চাপ পড়তে দেব না। শুধু ওকে সুস্থ থাকতে হবে।”
ক্রুশের কণ্ঠে থাকা আতঙ্ক আর ভালোবাসা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন ডাক্তার।
তিনি আশ্বস্ত করে ক্রুশের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
— “রিল্যাক্স, ইয়াং ম্যান। এতটা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়।
মাথায় আঘাত পাওয়া অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই এমনটা দেখা যায়। ধৈর্য ধরতে হবে। স্মৃতি ফিরবে, তবে সময় নিয়ে।”
— “একটা বিষয় সবসময় মনে রাখবেন— কখনোই রোগীকে জোর করবেন না।
যা করবেন, ধীরে ধীরে এবং স্বাভাবিকভাবে করবেন।
এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করবেন না, যাতে উনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি নিয়মিত চিকিৎসা চলবে। আশা করছি, ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
কথাগুলো শুনে সবাই কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন,
— “তবে আপনাদের জন্য একটা ভালো খবরও আছে।”
মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি ডাক্তারের দিকে স্থির হয়ে গেল।
— “আজকের ঘটনার পর আমরা লক্ষ্য করেছি, রোগীর কিছু কিছু পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
অর্থাৎ আপনারা যে চেষ্টা করেছিলেন, সেটা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। তবে পদ্ধতিটা ভুল ছিল, তাই এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।”
ক্রুশের চোখে আশার আলো ফুটে উঠতেই ডাক্তার আবার বললেন,
— “তবে একটা বিষয় মনে রাখবেন। যখন উনার সম্পূর্ণ স্মৃতি ফিরে আসবে, তখন এই স্মৃতিভ্রংশের সময়কার অনেক ঘটনাই উনার মনে নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ বর্তমানে যা যা ঘটছে, সেগুলোর কিছু অংশ বা সবটাই উনি ভুলে যেতে পারেন। এটা এমন রোগীদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নয়।”
ডাক্তারের কথা শেষ হতেই ক্রুশ আর নিজের অস্থিরতা সামলাতে পারল না।
কাঁপা গলায় বলল,
— “ডাক্তার… আমি কি এখন ওর সঙ্গে দেখা করতে পারি?”
ডাক্তার আশ্বস্ত করে মৃদু হেসে বললেন,
— “অবশ্যই পারবেন। তবে বেশি সময় কথা বলবেন না। রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে আর হ্যাঁ, পরে একবার আমার চেম্বারে এসে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। কিছু বিষয় আপনাকে জানাতে হবে।”
— “জি, ডাক্তার।”
ডাক্তার চলে যেতেই ক্রুশ ঘুরে রুহির মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল। তাঁর ক্লান্ত, অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— “আন্টি, আপনি আর চিন্তা করবেন না। অনেক রাত হয়ে গেছে। আপনি কুটুসকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। রুহি একটু সুস্থ হলেই আমি নিজে ওকে আপনাদের কাছে নিয়ে যাব। আপনাকে কথা দিচ্ছি।”
রুহির মা কিছুক্ষণ চুপচাপ ক্রুশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এই ছেলেটার চোখে নিজের মেয়ের জন্য যে সীমাহীন ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ, সেটা স্পষ্ট দেখতে পেলেন তিনি।
ভারী নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বললেন,
— “আল্লাহ তোমাদের দুজনকে ভালো রাখুন, বাবা। এখন সবকিছু তাঁর হাতেই ছেড়ে দিলাম। আল্লাহ ভরসা।”
ক্রুশ সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করল।
তারপর সে ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে নীলের দিকে তাকাল।
এক মুহূর্তেই তার চোখের কোমলতা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে কঠোরতা নেমে এল।
— “নীল… এখনই আমানকে ফোন কর।”
নীল অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
— “কী হয়েছে?”
ক্রুশ চোয়াল শক্ত করে বলল,
— “রুহির মা সেজে যে বসে আছে, তাকে খুঁজে বের করতে বল।
আমি জানতে চাই সে কে। আর আমানকে বল, যেখানেই থাকুক, তাকে নিয়ে যেন আমার সামনে আসে। আমি আর কোনো সত্য আড়ালে থাকতে দেব না।”
ক্রুশের কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে নীল আর কোনো প্রশ্ন করল না।
সে সঙ্গে সঙ্গেই নিজের ফোন বের করে আমানের নম্বরে কল করতে লাগল।
রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে।
আমান নিজের সন্তান কে নিয়ে হোটেলের রুমে ফিরে এসেছে।
অনেক কষ্টে কিশোরী মেয়েটির কাছ থেকে বাচ্চাটিকে নিয়ে এসেছে সে।
মেয়েটি বারবার বাধা দিয়েছিল, অনুরোধ করেছিল বাচ্চাটাকে নিয়ে না যেতে কিন্তু আজ আমান আর কারও কথা শোনার অবস্থায় ছিল না।
এতদিন পর নিজের সন্তানকে ফিরে পেয়ে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে মন সায় দিচ্ছিল না।
রুমে ফিরেই সে বাচ্চাটাকে আদর করে খাইয়ে দেয়। ছোট্ট মেয়ে টা বারবার “মা… মা…” বলে চারপাশে তাকাচ্ছিল।
আমানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলেও সে ধৈর্য ধরে তাকে বুঝিয়ে, গল্প শুনিয়ে, বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
এখন বাচ্চাটা নিশ্চিন্তে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে।
আমান চুপচাপ তার পাশেই বসে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখে ঘুম নেই। সে জানে, আজ রাতেই কেউ একজন আসবে।
দরজায় জোরে কড়া নকের শব্দ হতেই আমান উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে কোনো বিস্ময় নেই। যেন এই মুহূর্তটার জন্যই সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল।
দরজা খুলতেই প্রায় ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে পড়ল সিমরান।
তার এলোমেলো চুল, কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে যাওয়া চোখ আর হাঁপিয়ে ওঠা নিঃশ্বাসই বলে দিচ্ছে, সে কতটা উদ্বিগ্ন।
রুমে ঢুকেই সে চারদিকে অস্থির চোখে তাকিয়ে বলল,
— “আমার বাচ্চা কোথায়? ওকে কেন নিয়ে এসেছেন? আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন!”
আমান দরজা বন্ধ করে দিল।
তারপর সিমরানের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— “কারণ… ও শুধু তোমার সন্তান নয়, ও আমারও সন্তান।”
কথাটা শুনে সিমরান যেন পাথর হয়ে গেল।
তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
— “আপনার সন্তান বললেই তো হয়ে যাবে না। আমার বিয়ে হয়ে গেছে… আমার স্বামী আছে…”
বাকিটুকু আর বলতে পারল না।
আমান ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল। দুই হাত দিয়ে সিমরানের মুখটা আলতো করে ধরে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল।
হঠাৎ পাওয়া সেই পরিচিত উষ্ণতায় সিমরান স্তব্ধ হয়ে গেল।
এত বছর ধরে যে মানুষটাকে ভুলে থাকার অভিনয় করেছে, আজ তার বুকের ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করতেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
কতদিন পর সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটার স্পর্শ…
মুহূর্তের জন্য সমস্ত অভিমান, সমস্ত কষ্ট যেন হারিয়ে যেতে চাইল।
অনেকক্ষণ পর আমান ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিল।
দুজনের কপাল একসঙ্গে ঠেকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
— “তোমার বিয়ে হয়নি, সিমরান।
সেদিন তুমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলে। হাসপাতালে নেওয়ার পর সবাই জানতে পারে তুমি অন্তঃসত্ত্বা।
তারপরই বিয়েটা ভেঙে যায়। তোমার মা সমাজের ভয়ে তোমাকে সন্তান নষ্ট করতে বলেছিলেন
কিন্তু তুমি রাজি হওনি।
নিজের এক কাজিনের সাহায্যে সব ছেড়ে এখানে চলে এসেছিলে আর তোমার বাবা-মা সমাজের সামনে নিজেদের সম্মান বাঁচাতে সবাইকে মিথ্যে বলেছিলেন যে তোমার বিয়ে হয়ে গেছে।
আমি কি ভুল বলছি?”
আমানের এক নিঃশ্বাসে বলা প্রতিটি কথায় সিমরানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।
এই সত্যগুলো সে আজ পর্যন্ত কাউকে জানায়নি।
কারণ সে জানত, সমাজ তার সন্তানকে কখনো মেনে নেবে না।
তাই তো সবকিছু ছেড়ে এত দূরে পালিয়ে এসেছিল।
আমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “কী হলো? চুপ করে আছ কেন, সিমরান?
তুমি কি আমাকে এতটুকুও বিশ্বাস করতে পারনি?
একবারও বলতে পারতে। তোমার কী মনে হয়, আমি আমার নিজের সন্তানকে অস্বীকার করতাম?”
সিমরান হেসে উঠল।
কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না।
চোখের জল মুছতে মুছতে সে বলল,
— “বিশ্বাস? কীভাবে করতাম? যেখানে আমার নিজের বাবা-মাই আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, সেখানে আপনাকে বিশ্বাস করাটা আমার কাছে বিলাসিতা মনে হয়েছিল।
আমি ভয় পেয়েছিলাম… যদি আপনিও আমাকে আর আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দেন?”
কথাগুলো শুনে আমানের বুকটা হাহাকার করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— “আর আমি… আমি প্রতিটা দিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। তোমাকে খুঁজেছি। তোমার জন্য দেশ-বিদেশ ছুটে বেড়িয়েছি।”
সিমরান অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।
তাহলে…মানুষটা সত্যিই তার জন্য এতদূর ছুটে এসেছে?
সব সত্য জানার পরও?
আমান গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর কণ্ঠটা আবার দৃঢ় হয়ে উঠল।
— “তুমি আমাকে আমার সন্তানের অধিকার থেকে এতগুলো বছর বঞ্চিত করেছ, সিমরান।
এই কষ্ট আমি সহজে ভুলতে পারব না। কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য হলো— তুমি আমার সন্তানের আর আজও আমি তোমাকে ভালোবাসি।
তোমার এবং আমাদের সন্তানের দায়িত্ব আমার। তাই আমরা বাংলাদেশে ফিরব।”
একটু থেমে সে সিমরানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
Mad for you 2 part 38
— “তুমি চাইলে রেজিস্ট্রির কাগজ ছিঁড়ে ফেলতে পারো। কিন্তু কাগজ ছিঁড়ে ফেললেই সম্পর্ক মুছে যায় না।
সত্যিটা হলো— আজও তুমি আমার স্ত্রী।
আমি তোমাকে আর কোনোদিন একা ছেড়ে দেব না।”
