Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪১
ইসরাত জাহান দ্যুতি

পুরুষালি হাতটা সুডোল নারী বক্ষ থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য ছটফট করলে কিরণের বেহুঁশ চিত্ত তখন একটুখানি সচকিত হলো বোধ হয়। সে জুল-জুল করে তাকিয়ে তিমিরময় ঘরের নিকষ কালো ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। এদিকে বুকে জড়িয়ে রাখা হাতটা ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে বুঝতে পারলেও অলীক স্বপ্ন ভাবতে শুরু করল সে নিমিষেই আঁখি বুজে। কিশোরী জীবনের প্রথম প্রেম অনুভূতি জন্মেছিল সারাদিন ঝগড়ায় মেতে থাকা পুরুষটির জন্যই। সেই পুরুষকে তো কখনই স্বামীরূপে পাওয়া হবে না— তাই কল্পনাতেই তাকে কাছে টানতে চাইল সে একান্ত পুরুষ ভেবে। কিন্তু বাস্তবের মতো স্বপ্নতেও যেন মানুষটি হৃদয়হীন। একটুও জড়িয়ে ধরতে চাইছে না সে ওকে। এত নির্মম কেন সৌরভ ওর সাথে? ঘোরের মাঝেই পিপাসিত বুকটা ওর কষ্টে ফেটে যেতে চাইল। ঠোঁট বাঁকিয়ে কেঁদে উঠল … প্রলাপ আরম্ভ করল ফের … ‘আমি বেহায়া হয়ে পড়ছি, সৌরভ। তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও না, আমি তা মানতেই পারছি না! আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে এ কথা? একদিন তো কাউকে ভালোবাসবেই, আমাকেই বাসো না!’

-‘ইঁচড়েপাকা মেয়ে! হাত ছাড় আগে আমার। তারপর তোর বেহায়া পিরিতের কথা শুনছি। জ্বর গায়ে, অথচ তাও দেখো গায়ে শক্তি কী মেয়ের!’ দাঁতে দাঁত কটমট করে, চাপা গলাতেই ধমকাতে থাকল সৌরভ। হাতটাও রক্ষা করে ছুটিয়ে আনতে পারল অবশেষে।
কিরণের চোখের কোন গড়িয়ে যাচ্ছে তখনও বিরহী অশ্রুতে। সৌরভের কণ্ঠ কানে পৌঁছলেও সে শারীরিক আর মানসিক, উভয়ভাবেই বিপর্যস্ত থাকায় বর্তমান পরিস্থিতি তেমনভাবে ঠাওর করতে পারল না।
ওদিকে বিছানা ছেড়ে দাঁড়ানোর পরই নিজের গালে চড়াত করে এক থাপ্পর বসালো সৌরভ। কোন আক্কেলে সে এখানে আসতে গিয়েছিল! আগেই বোঝা উচিত ছিল, সে আসা মাত্রই তাকে তোড়জোড় করে না চাইতেও কেন বিশ্রাম নিতে পাঠালো দীধিতি? যেখানে সে জানত কিরণও এখানেই।

চারপাশের পরিস্থিতিগুলো কেমন যেন জটিল আর এলোমেলো লাগছে ইয়াসিফের। রাঙামাটি অপারেশনে আসার পরই ওর মনটা বারবার অদ্ভুতভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল। চঞ্চলিত মনের অমন অস্থিরতার কারণ মোটেও ধরতে পারছিল না সে৷ কিন্তু মনে হচ্ছিল, ওর নিত্যনৈমিত্তিক জীবনের গল্পে নতুন কোনো বদল আসতে চলেছে; কিছু একটা ঘটতে চলেছে ওর সঙ্গে। এই অদ্ভুত আগাম বার্তা ওকে ওর মন এবারই নতুন দেয়নি। যখনই ওর জীবনে কোনো বিপদ ধেয়ে আসে বা অন্য কোনো ঘটনা ঘটতে যায়— তখনই ওর অন্তরিন্দ্রিয় ওকে আগাম সঙ্কেত দেয়। এবারও ঠিক এমন ইঙ্গিত ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে। কিন্তু কোথায়, কীভাবে, কার বা কাদের দ্বারা ওর জীবনকে প্রভাবিত করবে, তা বুঝতে পারছে না ঠিক।
রাশভারী মুখ করে গাঢ় মনোনিবেশে ড্রাইভিং করতে করতে নিম্ন ঠোঁট কামড়ে যখন ইয়াসিফ এসব চিন্তাকে কেন্দ্র করে নিঝুম, তখন পাশের সিটে বসে থাকা মোনোলিড চোখের মেয়েটা স্থির চোখে ওকে প্রগাঢ় অনুভবে অপলক দেখে। ওর ত্রিভুজাকৃতির মুখের হালকা দাড়িতে ঢাকা চওড়া চোয়ালজোড়া দেখে … ওর চিকন ঠোঁটগুলি … সরু নাক … পিঙ্গল বর্ণের ছোটো ছোটো ক্লোজ-সেট চোখদু’টি দেখে … ঘন অক্ষিপক্ষ্ম … সরু কপালের নিচে সান্দ্র ভ্রুদ্বয় আর মাথার উপরিভাগে ঢেউ খেলানো ঘন চুল।

স্টিয়ারিং ধরে রাখা বলিষ্ঠ, রোমশযুক্ত ফর্সা হাতটায় ওই
কালো ডায়ালের সিলভার কালার রিস্ট ওয়াচটাও এত চমৎকার লাগছে! যেন এই সুন্দর ছেলেটার পরিপুষ্ট হাতটার জন্যই ঘড়িটা তৈরি। এমনকি পরনের কালো রঙা হাফ স্লিভের পোলো-শার্টটাও৷
এতখানি কাছ থেকে অফিসার ইয়াসিফকে দেখতে দেখতে মনের গভীরের তরঙ্গময় অনুভূতিগুলো সারা অঙ্গে ছেয়ে যাচ্ছে তার। অবাধ্য, মৃদু কম্পিত হাতটা বারবার ছুটে গিয়ে ধরতে চাইছে অফিসারের পেশীবহুল হাতটা৷ উথাল-পাথাল অনুভূতিদের লম্ফঝম্প আচমকা থমকে গেল তার, তাকে যখন প্রশ্নবিদ্ধ করল ইয়াসিফ।

-‘স্বরূপে তো ফিরলে। এবার কি আসল পরিচয়, আসল উদ্দেশ্য জানাবে না?’
কোলের ওপরই মিনারেল ওয়াটারটা ছিল। বোতলের ক্যাপ খুলে ঢকঢক করে পানিটুকু গিলে গলাটা ভিজিয়ে নিলো আগে মেয়েটা। লম্বা একটি নিঃশ্বাস ফেলে, মস্তিষ্ককে আরাম দিয়ে তারপর বলল, ‘আমি মাভিশা আনান। দৈনিক সবুজ সিলেট সংবাদপত্রে কাজ করি।’
রাস্তাতেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে একটা হাত ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো তখন ইয়াসিফ। সে হাতের দিকে ভ্রু’কুটি করে মাভিশা প্রশ্ন চোখে তাকালে ইয়াসিফ বলল, ‘আইডি কার্ডটা দেখতে চাই।’
-‘আচ্ছা আচ্ছা, নিশ্চয়ই।’ বলেই সে হ্যান্ডব্যাগটা থেকে সাংবাদিক আইডি কার্ডটা বের করে তুলে দিলো ইয়াসিফের হাতে।
ড্রাইভিংয়ের ফাঁকে কার্ডটিতে জহুরি চোখে দৃষ্টি বুলিয়ে ইয়াসিফ জিজ্ঞেস করল নীরস কণ্ঠে, ‘তো জার্নালিস্ট ম্যামের আমার কাছে কী কাজ?’

-‘আপনি কি জানেন আমি আপনাকে আজ দু’বছর যাবৎ খুঁজছি?’
এমন কৌতূহলপূর্ণ প্রশ্নটিতে ইয়াসিফের যতখানি কৌতূহলী হওয়া উচিত ছিল, তার কিঞ্চিম্মাত্রও হলো না সে। জবাবে উলটে ঠাট্টা করে বলল মাভিশাকে, ‘গণক হলে জানতাম বোধ হয়। আফসোস!’
-‘মজা করছেন? না কি অবিশ্বাস?’
-‘ঝেড়ে কাশলে সিরিয়াসলি নিতে পারতাম হয়ত।’
-‘আপনি আন্ডারকভার অপারেশন করেন। মিথ্যা বললাম কি?’ মুচকি হেসে রহস্য করে বলল মাভিশা।
ইয়াসিফ এ প্রশ্নেও অভিব্যক্তি বদলাল না নিজের, ‘সত্য জেনেই যে আমার পিছে পড়েছ, তা প্রথমদিনেই বুঝেছি। তোমাকে বললাম ঝেড়ে কাশতে। কী গোয়েন্দা গোয়েন্দা ভাব নিয়ে একেকটা কথা বলছ! বিরক্ত হচ্ছি।’

ওর থেকে প্রত্যাশিত অভিব্যক্তি না পেয়ে মুখটা ভার করে ফেলল মাভিশা, থমথমে গলায় বলল এবার, ‘তাহলে সরাসরিই বলছি৷ আমি আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম মে দিবসে। সেদিন সোবহানীঘাট এলাকার তাজ রেস্টুরেন্ট, ইলিয়াস রেস্টুরেন্ট, দু’জায়গাতেই। টোকাই সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন চারপাশ দিয়ে। তখন তো বুঝিনি আপনার ময়লা চেহারার ছদ্মরূপের পেছনে একজন আন্ডারকভার পুলিশ অফিসার ছিল। কলিগদের সঙ্গে খাবার খেতে প্রথমে তাজ রেস্টুরেন্টে ঢুকেছিলাম। কিন্তু মনমতো মেনু না পেয়ে ইলিয়াস রেস্টুরেন্টে যাই। খাবার পার্সেল করে নেব হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিই সকলে৷ তারপরই আচমকা দুর্বৃত্তরা এসে হামলা করে ওখানে। ভেতরে যে ক’জন ছিল তারা কেউ আহত হলো আর কেউ কোনোমতে ছুটে বেরিয়ে যেতে পারলেও আমি ওয়াশরুমের ওদিকে ছিলাম বলে আটকা পড়ে যাই সেখানেই। আমার পার্সটাও টেবিলে পড়ে ছিল তখন। কারও থেকে সহায়তা নেওয়ার মতো উপায়ও ছিল না। ঠিক পাঁচ মিনিট বাদেই সেই টোকাই লোকটাকে ওয়ান ম্যান আর্মির মতো একা হাতে রিভলবার নিয়ে ছ’জন দুর্বৃত্তের সাথে লড়তে দেখলাম।

সিনেমার হিরোদের নাকটীয় ফাইটিংয়ের বদলে সেদিন রিয়েল হিরোর ফাইটিং স্কিল দেখলাম। ওরা যখন প্রায়ই ধরাশায়ী, তখন আপনার সহকর্মী পুলিশেরা এলো৷ আপনাদের কথোপকথন শুনে বুঝেছিলাম হামলা ইলিয়াস রেস্টুরেন্টসহ আরও কয়েকটি রেস্টুরেন্টে হয়েছে। আপনাদের কাছে এ তথ্য আগেই এসেছিল। জঙ্গি গোষ্ঠীর একটা হামলা হবে মে দিবসে। আপনারা যথাসম্ভব প্রোটেকশন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেদিন আপনার বলতে শুনেছিলাম শুধু ইয়াসিফ। এই একটা নাম নিয়েই কতগুলো দিন যে কতভাবে খুঁজে চলেছি আপনাকে! তা ধারণাও নেই আপনার। রাঙামাটির এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর অবৈধ অস্ত্র আর বোমাবারুদের চোরাচালানের তথ্য পেয়ে ছুটে আসি আমার এক সহকর্মীকে নিয়ে এখানে। আপনি যেদিন অপারেশনে নামেন, সেই স্পটে বাংলা মদ বিক্রেতা সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন প্রথমে। আমিও রাস্তার পাশেই পাথরের পেছনে ঘাপটি মেরে বসেছিলাম। কেউ দেখতে পায়নি আমাকে। আপনার মেকআপ অবশ্য ভিন্ন ছিল সেদিন। কিন্তু আপনার চোখ আর চেহারার কাঠামো আমার মস্তিষ্কে এত ধারালোভাবে গেঁথে ছিল যে, আমি এক চুটকিতেই ধরে ফেলি ওটা সেই টোকাইরূপী পুলিশ অফিসার ইয়াসিফ। তারপর থেকেই ভাবতে থাকি কীভাবে আর কী উপায়ে আপনার কাছাকাছি আসব।’

লম্বা গল্পটা জানানোর পর মাভিশা উৎসুক চোখে চেয়ে থাকল তার অফিসারের দিকে। ওর উত্তর কী হয় এরপর, তা শোনার আশায়। কিন্তু এবারও ইয়াসিফ তার মনঃপূত অভিব্যক্তি প্রকাশ না করে বরঞ্চ রুক্ষ ভাষায় বলল, ‘তুমি খুব ইন্টেলিজেন্ট জার্নালিস্ট। কিন্তু তোমার কর্মক্ষেত্রে প্রফেশনাল না। কাজের মধ্যে যদি ব্যক্তিগত জীবন ইন্টারাপ্ট করতে দাও, তার থেকে কাজ ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তিগত জীবনের বর খুঁজতেই লেগে পড়ো। রাত হয়ে গেছে বলে দায়িত্ববোধ থেকে ঢাকা অবধি ছেড়ে দেব তোমাকে। এরপর নিজের রাস্তা নিজে মাপবে।’

টেবিলে খাবার পরিবেশনের দায়িত্বটা বান্ধবীদের দিয়ে দীধিতি সারাদিন পর শোবার ঘরটায় প্রবেশ করল রাত সাড়ে সাতটায়। ঘামে পুরো শরীর বিচ্ছিরিভাবে চটচট করছে দেখে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না সে গোসলে যেতে।
ওদিকে নাওফিল বন্ধুদের মাঝে বসে সুযোগ খুঁজছে শুধু বউয়ের কাছে যাওয়ার। কিন্তু তার পাঁজি বন্ধুগুলো তার উশখুশ করা ধরতে পেরে আরও বেশি করে চেপে ধরে বসে আছে। সৌরভ গেস্টরুম থেকে ভারিক্কি চেহারায় বের হলো তখন। অস্বস্তি নিয়ে সবুজের পাশে এসে বসল। দীধিতি ফোনে আজ এত করে অনুরোধ করেছিল ওকে আসতে! তাই না চাইলেও বিষণ্ন মনটা নিয়ে ছুটে আসতে হয়েছে।

নাওফিল কথার মাঝে তাকে লক্ষ করল। মনে পড়ল বিয়ের দিন সন্ধ্যাবেলার একটা ছোট্ট দৃশ্য। বাগান থেকে বেরিয়ে সে যখন সিকিউরিটি গার্ডদের সঙ্গে কথা বলে গেল, তখন দেখেছিল গেটের বাইরে কিছুটা দূরে এই ছেলেটাকে মলিন চেহারায় দাঁড়িয়ে থাকতে৷ নিষ্প্রভ দৃষ্টিজোড়ায় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়েছিল সে গেটের ওপরে মরিচ বাতিতে জ্বলজ্বল করা বর-কনের নামের বোর্ডটিতে। কবুল বলার পরই নাওফিল তার আর দীধিতির নাম লেখা বোর্ড লাগিয়ে ফেলেছিল সেখানে। সেদিন নাওফিল চিনত না সৌরভকে। গতকাল রাতেই দীধিতির ফোন থেকে তাকে দেখল সে। এখনও তার চোখজোড়া বিষণ্নতায় ছেয়ে আছে৷ তা দেখে নাওফিল উঠে এলো ওর কাছে। ওর পাশে বসে প্রথমে কুশলাদি বিনিময় করল। সবুজরাও একে একে গল্প আরম্ভ করল তখন ওর সঙ্গে।

বাথরোব গায়ে দিয়ে দীধিতি চুল মুছতে মুছতে আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ারটা যখন হাতে নিলো, তখন বেলকনিতে হঠাৎ কিছু পড়ার বিকট আওয়াজ কানে এলো৷ মনে হলো ভারী টব কেউ আছাড় মেরেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালে দরজার ওপাশে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকে দেখতে পেল ও। কিন্তু এই বেলকনিতে এই মুহূর্তে কারোরই আসার কথা না! তাহলে কে ওখানে? ড্রায়ারটা রেখে দিয়ে সেদিকে এগোলো সে, থাই গ্লাসের দরজাটা খুলেই দেখতে পেল সত্যি একটা টব নিচে পড়ে আছে ভেঙেচুরে। আর নাওফিল কার্নিশে দু’হাতে ভর দিয়ে উলটোপাশ ফিরে দাঁড়ানো। বোঝায় যাচ্ছে, টবটা সে-ই ভেঙেছে। কিন্তু কার্পেটের ওপর অমন খণ্ডবিখণ্ড হয়ে ভাঙল কেমন করে? তাছাড়া ভাঙলই বা কেন নাওফিল? আশ্চর্য হলো দীধিতি। মেজাজ খারাপ করে বলে উঠল, ‘এই, তুমি টবটা ভাঙলে কী করে? রেগেমেগে ভেঙেছ না কি? অদ্ভুত তো! রাগ হলেই ভাঙচুর করতে হবে এভাবে? কার ওপরের রাগটা আমার সুন্দর টবটার ওপর ঝাড়লে?’

নিরুত্তর নাওফিল পিছু ফিরে তাকালও না ওর দিকে। দীধিতি বকতে থাকল ওকে। বকতে বকতেই সিরামিকের টবটার ভাঙা অংশগুলো খুঁটে নিতে শুরু করল৷ হঠাৎ বাতাসের ঝাপটা এসে লাগল গায়ে। সেই বাতাসে কী বিশ্রী এক দুর্গন্ধ বাড়ি খেল ওর নাকে। মাথা তুলে নাওফিলের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারল, গন্ধটা তার গা থেকেই আসছে। অত্যন্ত বিরক্ত হলো এতে দীধিতি, ওকে কটাক্ষ করে বলল, ‘সারাদিন মাছের আঁশটে, মুরগির নাড়িভুড়ি মাখামাখি করি আমি! অথচ গন্ধ আসে তোমার গা থেকে৷ ছিঃ! গায়ে সাবান নাও না কতদিন? এই দুর্গন্ধ নিয়ে তুমি মসজিদে জামাতে দাঁড়াও কী করে? মুসল্লীরা কিছু বলে না তোমাকে? যাও তো, গোসল করে আসো এক্ষুনি। খবরদার এই পচা গন্ধ গায়ে নিয়ে একদম নিচে যাবে না।’
কথাগুলো শেষ হতেই মৃদু ভঙ্গিমায় নাওফিল ঘাড় ফিরিয়ে নিচে বসে থাকা দীধিতির দিকে তাকাল৷ দীধিতির হাত ভর্তি তখন ভাঙা টবের অংশগুলো। ওগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়ালেই নাওফিলের দিকে চোখ পড়ল ওর … মুহূর্তেই গগন কাঁপানো এক চিৎকার দিয়ে উঠল।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪০

চোখের কোটরদু’টো ফাঁকা নাওফিলের। অথচ একটা চোখ কপালে। আর রক্তাত দু’গালে এবড়োখেবড়ো পচা মাংস৷ তার মাঝে ছোটো ছোটো অগণিত চেলা পোকা কিলবিল করছে। নাকের ছিদ্রর মাঝে সেগুলো ঢুকছে, আবার বের হচ্ছে। নিঃশব্দে প্রচণ্ড হাসছে নাওফিল। কিন্তু তার মুখের ভেতরের অস্বাভাবিক বড়ো জিহ্বাতে আরেকটি রক্তলাল চোখ। সে চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি দীধিতির দিকে। নাওফিলের মুখের ভেতর থেকেও অসংখ্য চেলা পোকা বের হয়ে নিচে পড়ে ছুটে এসে দীধিতির গা বেয়ে উঠতে শুরু করল।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪১ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here