Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

-‘আমি নিজেও চাই না তুমি কিরণকে বিয়ে করো, সৌরভ।’
এ কথায় সৌরভ ক্লেশিত মনেই হাসল একটুখানি। তা দেখে নাওফিল বলল, ‘আমি প্রেমিক হলে জিতিয়ে দিতে পারতাম তোমাকে৷ বিয়ের আগে এ ঘটনা জানলে সত্যিই তুমি জিততে। কিন্তু আমি যে এখন পৃথিবীর সকল প্রেমিকের থেকেও ঊর্ধ্বে৷ মহামূল্যবান শীর্ষ স্থানে আছি। ততটাই শীর্ষ স্থানে, যতটা কেবল একজন পুরুষ স্বামী হলে থাকতে পারে।’

-‘আর আমি পৃথিবীর সকল আদর্শবান স্বামী পুরুষদের মর্যাদাসম্পন্ন চোখে দেখি।’ কণ্ঠে সৌরভের উদ্দীপ্ত ভাব, আত্মপ্রত্যয়ী এক মনোভাব।
ঈষৎ হাস্যরত নাওফিলের মুখশ্রীতে তখন প্রশস্ত হাসি খেলে গেল। কাছে এসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলে আবদার জানাল, ‘ছোটো ভাইয়ের শূন্যস্থান আছে একটা। করবে পূরণ?’
বিষণ্ন মুখে সামান্য হাসি টানল সৌরভ। কয়েক পল থেমে রয়ে জবাব দিলো, ‘আমার সবটা দিয়ে করব। আর নিষ্ঠার সাথে করব বলেই আজকের পর স্মরণের সঙ্গে দূরত্ব সীমা যতটুকু বাড়ানো উচিত ততটুকুই বাড়িয়ে দেব। আমার মন তো প্রেমিক পুরুষের মন। সেই মনের রাশ টানা সহজ হবে না। তাই আপনার না বলা উপদেশকে আমি সাগ্রহে গ্রহণ করছি। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, ভাই।’
-‘আমায় স্বার্থপর ভাবতে পারো। কিন্তু খারাপ ভেবো না, ভাই!’ কোমল স্বরে অনুরোধ নাওফিলের।
দুজন মুখোমুখি দাঁড়াল আবার। সৌরভ বৃহৎ হাসি মুখ করে বলল, ‘আমি আপনার থেকে অনেকটাই ছোটো, ভাই। কিন্তু তাই বলে আমার মানুষ চেনার দক্ষতা খারাপ নয়। এই মুহূর্তে আমি আপনার জায়গায় হলে হয়ত আপনার মতো এতখানি নরম হতাম না। একজন প্রেমিক কখনও ভালোবাসার মানুষটিকে প্রেমের নজরে ছাড়া ভিন্ন নজরে দেখতেই পারে না৷ না থাকুক সেই নজরে আকাঙ্ক্ষা, কামুকতা। কিন্তু তবুও তার অধিকার নেই অন্যের নামে বৈধ হওয়া ওই মানুষটিকে প্রেমের নজরে দেখার।’

-‘আর আমি নিজেই যদি বলি বন্ধুর মতো পাশে থেকো! আগে যেমনটা থাকতে?’
চকিতেই সৌরভ দৃষ্টি রাখল নাওফিলের চোখে। যে চোখের চাহনি শীতল, সরল হলেও তার গুপ্ত ভাষা কখনও দুর্বোধ্য, কখনও সহজ। এ মুহূর্তে বোধ হয় সে ভাষা সহজই ছিল কিংবা সৌরভ ওর সম্মুখের মানুষটিকে খোলা বইয়ের মতো পড়তে পারছে এখন। তাই চট করেই বুঝে নিলো তার ওই কথার পেছনে থাকা চোরা উদ্দেশ্য। মৃদু হাসল তখন, ‘আপনি নাওফিল শেখ সেটা কখনই চাইবেন না। আর আমিও নিজেকে সো কলড বন্ধু পদে মানাতে পারব না৷ এখনকার কাপলদের মধ্যে ব্রেকআপের পর যদিও এই কথাটা প্রায়শ চলে “আমরা বন্ধু হয়ে থাকতে পারি” । কিন্তু আপনিও জানেন আর আমিও জানি, একটা অড জব হ্যাংকি-প্যাংকি কথা এটা।’
-‘সেডাক্টিভ পার্সোনালিটি! আ’ম ইম্প্রেসড্ অফ য়্যু, মাই ইনটেলিজেন্ট ব্রাদার!’ অভিভূত কণ্ঠেই স্তুতি গাইল নাওফিল।
সৌরভ হাসল, ‘আমার এসিড টেস্ট কি তবে সমাপ্ত হলো, ভাই?’

হা হা করে হেসে উঠল নাওফিল, ‘এই পরীক্ষায় সত্যি তুমি আমার প্রত্যাশার বাইরে বেস্ট স্কোর করেছ।’
ওদের মাঝে আরও দু’চারটা কথা বিনিময় হওয়ার মুহূর্তেই রাতুল ট্যারেস থেকে গলা ছেড়ে ডেকে উঠল ওদের, ‘এ ভা—ই! তোরা করিসটা কী ওইখানে? এদিকে আয়, আজকে অ্যাডাল্ট গেম খেলব।’
ওরা এগিয়ে আসলো ওখানটায়। দীধিতির দিকে চোখ পড়ল দুজনেরই। কেমন একটা নির্জীব ভঙ্গিমায় কাউচে পা উঠিয়ে বসে আছে সে। সৌরভ এক পল তাকিয়ে দৃষ্টি হটিয়ে নিলেও নাওফিল নিগূঢ়ভাবে দেখতে দেখতেই রুমানের পাশে ফাঁকা জায়গাটিতে এসে বসল। নিচে মাদুর বিছানো, সামনে একেকজনের জন্য কফি মগ। ছেলেরা পাশাপাশি বসা আর মেয়ে পাঁচজন গায়ের সাথে গা ঘেঁষে কাউচটাতে বসে আছে।
-‘কেমন অ্যাডাল্ট গেম, ভাই? মানে ভবিষ্যত বউয়ের কাছে ফ্রেশ, আনস্পটেড থাকতে পারব তো?’ সৌরভ সহাস্যে বলল।

এমন কথায় ছেলেরা অট্টহাসিতে মাতল। রাতুল হাসতে হাসতে ওর পিঠে চাপড় মেরে বলল, ‘বলা যাচ্ছে না, ছোটো ভাই। তোমাদের তো জোড়া আছে। আজকে তোমরা সুযোগ পেলে কাজে লাগাতে পারবে। শুধু আমি, সবুজ আর তুষার দুর্ভিক্ষে ভোগা হাভাতে মানুষের মতো বসে থাকব ।’
ড্রয়িংরুমে থাকাকালীন নাওফিলদের মিশুক স্বভাবের আলাপচারিতায় এত জলদি সহজ হতে পেরেছে সৌরভ ওদের সঙ্গে। কেবল একমাত্র কিরণ এখানে প্রচণ্ড লজ্জায় বোনের কাঁধে মাথা নামিয়ে বসে আছে।
তুষার তামান্নার দিকে এক পলক তাকিয়ে কুটিল হেসে ব্যাখ্যা দিলো, ‘এখানে সবাই জেনেশুনে খেলতে রাজি। অ্যাডাল্ট গেম বলতে গতানুগতিকভাবেই আমার হাতের এই বোতলটি ঘুরানোর পর অবশেষে যার মুখোমুখি থামবে, তাকে আমরা যেটা করতে বলব সেটাই করতে হবে। অথবা যা প্রশ্ন করব তার উত্তর না দিলেই আমাদের দেওয়া শর্ত পালন করতে হবে।’

তামান্না বিরক্তির ভাঁজ কপালে ফেলে দীধিতির কানের কাছে চুপিচুপি স্বরে বলল, ‘ওই ফাতরা শালা নির্ঘাত আমার সাথে কিছু একটা লুচ্চামি করবে মনে হয়। কী করব বল তো? কীভাবে আটকাব তখন?’
-‘সে করার আগেই তুই করে ফেলবি কিছু একটা৷’ গম্ভীর গলায় বলল দীধিতি।
তামান্না মুখ কুঁচকাল তা শুনে। উত্তরটা পছন্দ হয়নি তার একটুও। তুষার ওদের পাঁচজনকে নিচে এসে বসতে বলল তখনই। ছেলেদের থেকে একটু দূরত্ব রেখেই তামান্না এসে বসল নিচে। তার পাশে বাকি চারজন। তুষার আর দেরি না করে বোতল হাতে নিতেই সবুজ ঝট করে একটানে বোতলটা কেঁড়ে নিলো ওর থেকে। বাচ্চাদের মতো জিদ্দি গলায় বলে উঠল, ‘আমি ঘুরাব প্রথমে।’
তুষার তেরছা চোখে তাকিয়ে থাকল তখন৷ সবুজ পাত্তা দিলো না। তামান্নার দিকে চেয়ে ঠোঁট চেপে হেসে বোতলটা ঘুরাতেই টেনশনে তামান্না চোখ বুজে আল্লাহর নাম জপতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ড ধরে বোতলটা ঘুরতে ঘুরতে গতি দুর্বল হয়ে থাকল ঠিক নাওফিলের মুখোমুখি। দীধিতি বাদে সমস্বরে মেয়ে চারজন ‘ওই…হই’ করে চেঁচিয়ে উঠলে শিহাব তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, ‘আমি, আমি। আমি প্রশ্ন করব ওকে!’
নাওফিল একদম বিকারশূন্য। সবাই শিহাবকে অনুমতি দিলে সে জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘ব্রাদার, তোমার প্রথম চুমুর গল্পটা বলো ফাস্ট ফাস্ট।’

প্রশ্নটা সবারই পছন্দ হলো। ওদের ধারণা নাওফিলকে বাসর রাতের মুহূর্তগুলো এবার বলতেই হবে। দীধিতির দিকে তাকাল তখন নাওফিল। তার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বিশীর্ণ চেহারাটা তখন একটু রক্তিমাভ দেখাল দীধিতির। নাওফিল মুচকি হেসে বলল, ‘ওয়েল, এটা আমার বউয়ের জানারও হক আছে। যেদিন প্রথম আমার বউ শেখ বাড়িতে পা ফেলল সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের বাগানের বেলীফুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ঝোপ বুঝে কোপটা ফেলেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল ওই মোমেন্টের একটা ভিডিয়ো রেখে ক্লিপটাকে ব্ল্যাকমেইলের কাজে লাগানো, যদি আমার বউ হতে রাজি না হত ও তবেই আর কী।’
বলা শেষেই মিটিমিটি হাসতে থাকল সে দীধিতির দিকে চেয়েই। খানিকটা বিস্ময় নিয়ে অনড় চাউনিতে দীধিতিও চেয়ে থাকল।
সময় না নিয়ে তুষার বোতলটা ঘুরালে ওটা এবার দীধিতির মুখোমুখি হয়ে থামল। মনঃক্ষুণ্ন হলো তুষার তখন। আর তামান্না আরও একবার বিজয় উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল। সাথে বাকি মেয়েরাও। তুষার হেসে বলল, ‘দীধিতি, তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে মুখে লাগাম টানতাম না। তোমাকে বোন মানি। কী আর জিজ্ঞেস করব! তুমি আমাদেরকে জানাও তোমার জীবনের প্রথম সেই মানুষটা কে? যাকে তোমার খুব ভালো লাগত বা লাগে।’

-‘কাকে লাগে বলতে গেলে সেটা হবে বর্তমান। আর আমার বর্তমান এবং আগামী দুই সময়তেই আপনাদের বন্ধু আছে এবং থাকবে। কিন্তু সে প্রথম নয়।’
-‘না না, প্রথমজনের কথা জিজ্ঞেস করছি। মানে যাকে লাগত।’
এবার দীধিতি একটু সঙ্কোচ জানাল, ‘ব্যক্তির নাম না বললে হয় না?’
-‘কেন হবে না? নিশ্চয়ই হবে। শুধু পরিবর্তে আমাদের বন্ধুকে ওপেন কিস করবে।’ দুষ্টু হেসে রাতুল বলল।
নাওফিল ঠোঁট চেপে তাকিয়ে আছে তখনও দীধিতির দিকে। তার মনে হচ্ছে উত্তরটা জানা হলেও সেটা শুনতে মোটেও শ্রুতিমধুর লাগবে না তার কাছে।
দীধিতি কিরণের দিকে একবার চেয়ে তারপর সৌরভের দিকে তাকাল, ‘আমি স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করা অবধি আমার জীবনে একজন ছেলেই বন্ধু হিসেবে ছিল। সৌরভ৷ যখন ক্লাস নাইনে উঠল ও, তখন ওর রূপ বেড়ে গিয়েছিল বোধ হয়৷ আমার চারপাশে ওর চেয়ে সুন্দর আর কোনো ছেলে চোখে পড়েনি৷ নয়ত ওই পুচকি ফুচকি ছেলেকে চোখে লাগত না জীবনেও।’

কিরণকে সবাই তখন না চাইতেও আড়চোখে, সোজা চোখে দেখে নিলো৷ তা লক্ষ করে কিরণ হেসে বলল, ‘আমাকে চোরাচোখে দেখার কী আছে? আমি বহু আগেই জানি৷ আপু এ কথা আমাকেই বলেছিল সর্বপ্রথম। আর সেটা শুনে আমি নাক শিটকে আপুকে বলেছিলাম, “আপু তোর চোখে ব্ল্যাক ম্যাজিক করেছে ওই দুর্গন্ধটা। তাই তোর চোখে আর কোনো সুন্দর ছেলে বাধছে না।” ভাগ্যিস নাওফিল ভাইয়ার দেখা পেয়েছিল আপু! নয়ত ব্ল্যাক ম্যাজিকের দোষটা আজও কাটত না বোধ হয়।’
সবাই হেসে উঠলেও হাসল না শুধু নাওফিল৷ তাকিয়ে ছিল সে সৌরভের মুখপানেই৷ সৌরভ মুখ নুইয়ে মেকি হেসে মনেমনে বলছিল তখন, ‘আসলেই কাটত না৷ ভাগ্য না, আমার জীবনের দুর্ভাগ্য হয়ে নাওফিল শেখ এসেছিল।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২

মেসেজের টুং শব্দে নাওফিলের মনোযোগ সরল। ভাইব্রেট হওয়া ফোনটা প্যান্টের পকেট থেকে বের করে দেখল হোয়াটসঅ্যাপে অচেনা নাম্বার থেকে একটা টেক্সট আর একটা ছবি মেসেজ এসেছে। ইনবক্সে গিয়ে ছবিটা দেখার আগে মেসেজটা পড়ল সে— ‘My Dear bset friend, tor bou er kache ei chobir golpota bolar sujog hoyni sedin. Chobita ki ok sent korbo? Golpota bolbo Australia giye ebar nawfil Sheikh kivabe thekeche, ki koreche? Naki tui ese meet korbi amar songe? Korle chole ay eka ekkhuni amar basay.’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here