Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৫

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৫

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৫
মাইশা জান্নাত নূরা

নির্ঝরের বলা শেষ কথাগুলো যেনো পুরো কেবিনজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। অনু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নির্ঝরের দিকে। চোখ দু’টো বিস্ময়ে, আবেগে আর অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরে উঠেছে ওর। যেনো অনু এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না কেউ ওকে এভাবেও চাইতে পারে! এভাবে নিঃস্বার্থভাবেও ভালোবাসতে পারে! এভাবেই কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলো। ওরা কেউ কোনো কথা বললো না।
কয়েকসেকেন্ড পর অনু ধীরে নিজের হাতটা নির্ঝরের হাতের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিলো। নির্ঝরের বুকটা সঙ্গে সঙ্গে ধক করে উঠলো। ওর মনে অজানা ভয় কাজ করছে এই ভেবে যে, এবার কি অনু ওকে না বলে দিবে? নির্ঝরের চোখে-মুখে এক মুহূর্তের জন্য অনিশ্চয়তার ছায়া দেখা দিলো। অনু নিচের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বললো….

—”আপনি জানেন আমি সবচেয়ে বেশি কাকে ভয় পাই?”
নির্ঝর কিছু বললো না। কেবল তাকিয়ে রইলো অনুর দিকে। অনু আবার বললো….
—”নিজেকে।”
নির্ঝরের ভ্রু কিন্ঞ্চিত কুঁচকে এলো। অনু মৃদু কাঁপান্বিত কণ্ঠে বলতে লাগলো….
—”আমি ভয় পাই আমার অতীতকে। ভয় পাই আমার ভেঙে পড়াকে। ভয় পাই আবার কাউকে হারিয়ে ফেলি যদি সেই চিন্তাকে।”
কথাগুলো বলতে বলতেই অনুর চোখ আবারও ভিজে উঠলো নোনা জলে। কিন্তু সে থামলো না। বললো….
—”ছোটবেলা থেকে যাদের আপন ভেবেছি একে একে সবাইকেই হারিয়েছি আমি। সবথেকে আপন ছিলো যেই মা! তাকেও হারিয়েছি নিজের চোখের সামনে। কতোটা অসহায় বোধ করেছিলাম তা আর নতুন করে নাই বা বলি। তাই এরপর থেকে আমি কাউকে নিজের খুব কাছে আসতে দিতে চাই নি। কারণ আমি জানি একবার মানুষ কাছের হয়ে গেলে, তার সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে সেই মানুষটাকে হারিয়ে ফেললে কি ভীষণ কষ্ট হয়!”

নির্ঝরের বুকটা হুহু করে উঠলো অনুর কথাগুলো শুনে। অনু বললো….
—”কিন্তু আপনি! আপনি একপ্রকার জোর করে আমার জীবনে ঢুকে পড়েছেন। আমি না চাইলেও আপনি আমার কাছাকাছি থাকছেন। আমার বি*পদে-আ*পদে নিজের জানের পরোয়া না করে ঝাঁ*পিয়ে পড়ছেন আমায় রক্ষা করার জন্য। আমি আপনার থেকে দূরে সরে যেতে চাইলেও কি দারুণ ভাবে আমায় আটকে দিচ্ছেন! আমার কান্না আপনার হৃদয়কে ব্যথিত করে শুনে আমার ভিতরে অন্য রকম অনুভূতিরা আন্দোলন শুরু করে দেয় জানেন! আর এই কারণে আমি আবার ভয় পাচ্ছি। বড্ড ভয় হচ্ছে আমার নির্ঝর সাহেব।”
নির্ঝর বললো….
—”আমাকে হারানোর ভয় হচ্ছে এবার আপনার?”
অনু কোনো উত্তর দিলো না। কিন্তু ওর নীরবতাই যেনো সব বলে দিলো নির্ঝরকে। তৎক্ষণাৎ নির্ঝরের ঠোঁটে ম্লান হাসি ফুটে উঠলো। নির্ঝর বললো…..

—”তাহলে তো আমি জিতে গেলাম।”
অনু অবাক হয়ে বললো….
—”মানে?”
—”কারণ ভালোবাসার শুরুটা যদি একে-অপরকে হারানোর ভয় থেকে সৃষ্টি হয় তবে সেই ভালোবাসা চিরস্থায়ী হয়। আর আপনাকে আমি চিরস্থায়ী ভাবে নিজের করে পেতে পারি যদি একবার, শুধু একটাবার আপনি হ্যাঁ বলে দেন!”
অনু কিছু বললো না। নির্ঝর মৃদু হেসে বললো….
—”অনু, আমি আপনাকে এখনই কোনো উত্তর দিতে বলছি না।”
অনু বিস্মিত হয়ে তাকালো নির্ঝরের দিকে। নির্ঝর আবারও বললো….
—”আপনি অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে বর্তমান সময়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমি জানি আপনার যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। তাই আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করবো।”

—”কতোদিন অপেক্ষা করবেন?”
—”যতোদিন সময় লাগবে আপনার ততোদিন।”
—”যদি কোনোদিনও উত্তর না দিই?”
নির্ঝর এক সেকেন্ডও দেরি না করে বললো….
—”তবুও আপনার পাশেই থাকবো আমি।”
অনুর বুকটা মৃদু ভাবে কেঁপে উঠলো। সে বললো….
—”কেনো?”
নির্ঝর গভীর দৃষ্টিতে অনুর দিকে তাকিয়ে বললো….
—”কারণ ভালোবাসায় সবসময় পাওয়ার আশা রাখতে নেই। ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের সবটা উজার করে ভালোবেসে একটা জীবন অপেক্ষার নামে পার করে দিলেও সময়টা কম হয়ে যাবে তাকে ভালোবাসার জন্য।”

অনুর চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। অনু কাঁপান্বিত কণ্ঠে বললো….
—”আপনি আমার আশ্রয়স্থল নির্ঝর। আমাকে এভাবে দূর্বল করে দিচ্ছেন কেনো? হাঁটু ভে*ঙে আপনার সামনে বসে পড়ি যদি পরে সামলে নিতে পারবেন?”
—”সন্দেহ আছে কোনো?”
অনু ওর সংকোচ ভাবকে নিজের ভিতরে দাবিয়ে রেখে নিজ থেকে নির্ঝরের হাত নিজের দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বললো….
—”আমার এখনও উত্তর দিতে ভয় লাগছে।”
—”ভয় করছেই যখন তখন কেবল আমার হাতটা নয় আমার বুকে মাথা ঠেকিয়ে পুরো আমিটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরুণ না! দেখবো তখন এই ভয় কোথায় থেকে আসে আপনার মনে আমার জন্য রাখা জায়গাখানা দখল করতে!”
অনু হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো….

—”যদি আপনাকে হারিয়ে ফেলতাম আজ তখন কি হতো আমার?”
নির্ঝর মৃদু হেসে বললো….
—”তাহলে তো আমার সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যেতো।”
—”কোন পরিকল্পনা?”
—”আপনাকে সারাজীবন জ্বালানোর যে পরিকল্পনা দীর্ঘ দিন থেকে সাজিয়ে রেখেছিলাম আর আজ আপনার সামনে উপস্থাপন করলাম সেই সব!”
অনু কান্নার মাঝেও হেসে ফেললো নির্ঝরের কথা শুনে।
আইসিইউ-এর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সারফারাজ আর তেজ। প্রায় আধা ঘণ্টা হতে চললো কিন্তু অনুর বের হওয়ার নামগন্ধ নেই। তেজ ওর দুই হাত বুকের উপর ভাঁজ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো….
—”ভাইয়া, তোমার ছোট ভাইটা মনে হয় আমাদের কথা ভুলেই গিয়েছে।”
সারফারাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো….

—”মানে?”
—”মানেটা খুবই পরিষ্কার। এতোক্ষণ ধরে কি কথা বলা যায় ভিতরে বলো তো? আমার তো সন্দেহ হচ্ছে ওরা হয়তো ইতোমধ্যেই নিজেদের ভবিষ্যৎ সংসারের জন্য মাসিক বাজেট থেকে শুরু করে কয়টা বাচ্চা নিবে আর তাদের নাম কি রাখবে সব প্ল্যানই করে ফেলতেছে।”
সারফারাজ ঠোঁট চেপে নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করে অবাধ্য, ঠোঁটকাটা নিজের এই ভাইটার সামনে গাম্ভীর্য ভাব বজায় রেখে বললো….
—”অপ্রয়োজনীয় কথা কম বল তুই।”
তেজ ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো….
—”আমি কিছু বললেই সেটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় তাই না? আমরা দুই ভাই সারারাত না ঘুমিয়ে একপ্রকার জানটা হাতে নিয়ে হাসপাতালের করিডোরে পায়চারি করে কাটালাম ঐ ভা*দা*ইম্মার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় আর এখন জ্ঞান ফিরতেই ছোট সাহেবের মুখে প্রথম প্রশ্ন এলো কি? তার পেয়ারিলাল অনু কোথায়? অথচ ওর প্রথম প্রশ্ন হওয়া ছিলো, ‘ভাইয়া তোমরা ঠিক আছো? খেয়েছো তোমরা?”
সারফারাজ এবার হেসেই ফেললো তেজকে জেলাসের অতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছে যেতে দেখে। তেজ আরও বললো….

—”আমি আগেই বুঝেছিলাম এসব প্রেম-ট্রেম খুবই ভয়ংকর জিনিস। মানুষকে নিজের ভাইদের থেকে পর বানিয়ে দেয়।”
—”তোর নাটক শেষ হয়েছে?”
তেজ মুখ বাঁকিয়ে আইসিইউ-এর দরজার দিকে তাকিয়ে বললো….
—”এই যে আধা ঘণ্টা হয়ে গেলো মনে হচ্ছে এখনই ভিতরে গিয়ে বলি, ‘মাফ করবেন ছোট ভাইয়ের হবু বউ রোগীর আরো দুই জন অভিভাবক এখনও জীবিত আছেন।তাদেরও একটু রোগীর সাথে সময় কাটানোর সুযোগ দিয়ে উপকৃত করা হোক’!”
সারফারাজ মাথা নেড়ে বললো…
—”তো যা গিয়ে বল! আটকিয়েছে কে তোকে?”
তেজ মুখ কালো করে বললো….

—”বলতে পারছি না জন্যই ভিতরে ভিতরে আ*হত হচ্ছি। গভীরভাবে আ*হত হচ্ছি আমি। এতো গুলো দিন আমি ছিলাম নির্ঝরের সবথেকে প্রিয় মানুষ। এখন যখন দেখতেছি আমার জায়গা অন্য কেউ দখল করে ফেলছে তখন কি আমার বুকে জ্বা*লা অনুভব হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু বলে মনে হচ্ছে তোমার!”
সারফারাজকে কোনো প্রতিত্তোর করতে না দেখে তেজ ওর দিকে তাকাতেই দেখলো সারফারাজ নিজের ফোনে কিছু একটা দেখতে ব্যস্ত। তেজের কথা, ওর রিয়াকশন দেখা নিয়ে সারফারাজের কোনো আগ্রহ নেই তা বুঝতে আর বাকি রইলো না তেজের। এইমূহূর্তে তেজের ইচ্ছে করছে দেওয়ালে নিজের পশ্চাৎদেশ ঠুকে ঠুকে আ*ত্ম*হত্যা করার।
খানিকক্ষণ পর আইসিইউ-এর দরজা খুলে অনু বাইরে বেরিয়ে এলো। তেজ সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভদ্র ছেলের মতো বললো….

—”আপনাদের মিটিং অবশেষে শেষ হলো! আমরা আরো ভাবলাম রোগীর সাথে দেখা করার আর সুযোগ পাবো না এ জনমে।”
তেজের কথা শুনে অনু লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। সারফারাজ সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে তেজের পশ্চাৎদেশের উপর চি*মটি কাঁ*টলো। তেজ দাঁতে দাঁত চেপে খানিক কুঁ*কড়ে গিয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নিলো।
সকাল বেলা…..
পিহু, নীরা আর ইলমা হাসপাতালের উদ্দেশ্যে সকাল সকালই বেরিয়েছে। নির্বাণকে নীরা ওর মা আতুশির কাছে রেখে এসেছে। বেশি সময় বাইরে থাকবে না ওরা তাই তাড়াহুড়ো করেই চলে এসেছে। পিহু আগে থেকেই সারফারাজকে কল করে বলে রেখেছিলো আসার কথা। তাই হাসপাতালের মূল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের অপেক্ষা করছিলো সারফারাজ।
পিহুদের গাড়ি থামতেই সারফারাজ এগিয়ে এলো। গাড়ি থেকে নামতেই পিহুর চোখ প্রথমেই পড়লো সারফারাজের উপর। মানুষটাকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতরে জমে থাকা ভয়টা কেটে গেলো। পিহু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো…..

—”আপনি ঠিক আছেন দেখে এখন কিছুটা স্বস্তি লাগছে।”
সারফারাজ মৃদু হেসে বললো…..
—”আমি তো বলেছিলাম, আমি ঠিক আছি।”
ইলমা আর নীরা হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করলো। নীরা নির্ঝরকে আর ইলমা অনুকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। পিহু আর সারফারাজ ওদের পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতেই সারফারাজ পিহুর দিকে সামান্য ঝুঁকে নিচু স্বরে বললো…..
—”চিন্তা হচ্ছিলো আমার জন্য?”
পিহু একপলক সারফারাজের দিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকালো। অতঃপর বললো….

—”চিন্তা না হওয়ার মতো বিষয় তো ছিলো না।”
সারফারাজ ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো….
—”শুধু বিষয়টার জন্য চিন্তা হচ্ছিলো নাকি আমার জন্যও?”
পিহু এবার ভ্রু কুঁচকে সারফারাজের দিকে তাকিয়ে বললো…
—”মজা নেওয়া শেষ হয়েছে আপনার?”
—”উত্তরটা তো এখনও পেলাম না।”
পিহু অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে বললো…..
—”আপনি সব জেনে বুঝেও আমার সাথে এমন করেন। শান্তি পান এসব করে?”
সারফারাজ নিচু স্বরে হেসে ফেললো।
—”ভালোবাসার মানুষের কাছে একটু অসহ্য হওয়ার অধিকার তো আমার আছেই। সেই অধিকারটুকুকে কাজে না লাগিয়ে বেকার ফেলে রাখলে মন্দ দেখায় বিধায় খাটালাম। এতে রেগে যাচ্ছো কেনো বউ?”
পিহুর গাল হালকা লাল হয়ে উঠলো। সে আর কথা বাড়ালো না সারফারাজের সাথে। কিয়ৎক্ষণ পর ওরা কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখতে পেলো তেজ বাইরে করিডোরের বেঞ্চে বসে আছে। নীরা বললো…..

—”তেজ ভাইয়া, তোমার মুখটা এমন আমের শুকনো আঁটির মতো চুপসে আছে কেনো?”
তেজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো…..
—”আমার দুঃখের কাহিনী আর জিজ্ঞেস করিস না।”
ইলমা বিস্মিত হয়ে বললো…..
—”কি হয়েছে?”
তেজ বললো…..
—”কি হওয়ার বাকি আছে? খান পরিবারের সবথেকে অবহেলিত মানুষটা তো আমিই। তাই তো অবহেলার পাত্র হয়ে বহিরে বসে আছি।”
সবাই একসাথে ভ্রু কুঁচকালো তেজের কথায়। তেজ আক্ষেপের স্বরে বললো…..
—”সকাল থেকে অনু ম্যাডাম নির্ঝরের কেবিনে ঢুকে বসে আছেন। এখন পর্যন্ত বের হওয়ার নামগন্ধও নেই তার। আর আমার বড় ভাই অর্থাৎ এই মহান ব্যক্তি একবারও বললেন না ‘তেজ, এবার তুই ভিতরে যা। তোর ছোট ভাইয়ের সাথে দুইটা কথা বলে আয়।'”
তেজের জেলাসের মাত্রা পরিমাপ করতে পেরে পিহু হেসে ফেললো। তেজ এবার একটু গম্ভীর হয়েই বললো…..

—”আমি নিশ্চিত, কয়েকদিন পর নির্ঝর সুস্থ হয়ে গেলে আমাদের দুই ভাইকে চিনতেই অস্বীকার করবে।”
নীরা হেসে বললো…..
—”মেজ ভাইয়া! তুমি যে এতো পরিমাণ জেলাস ফিল করবে অনুর ছোট ভাইয়ার কাছাকাছি বেশিক্ষণ থাকার কারণে তা হয়তো ভিতরে বসা ওরা ২জনও বুঝতে পারে নি।”
তেজ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বললো…..
—”আমি? আর জেলাস? নাহ, নাহ! কি যে বলিস তুই! আমি তো শুধু আমার ভাইকে হারানোর শোকে কাতর হচ্ছিলাম একটু।”
ইলমা বললো…..
—”অভিনয়ে এখনও পরিপক্ব হয়ে উঠতে পারেন নি আপনি।”
—”তোমরা কেউ আমার কষ্ট বুঝলে না।”

ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে ভিতর থেকে অনু বেরিয়ে এলো। ওর চোখ দু’টো হালকা লাল হয়ে থাকলেও মুখশ্রী জুড়ে প্রশান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে থাকতে দেখলো সবাই৷ অনুকে দেখেই তেজ উঠে দাঁড়িয়ে বললো…..
—”অবশেষে! আমাদের মতো গরিব আত্মীয়দেরও এখন ভিতরে যাওয়ার সময় হবে বলে মনে হচ্ছে!”
অনু আবারও লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। সারফারাজ হালকা কাশি দিয়ে বললো…..
—”ঠিক আছে, সবাই ভিতরে যাও। তবে নির্ঝরের সাথে বেশি কথা বলবে না কেউ। ডাক্তার ওকে বিশ্রাম নিতে বলেছেন।”

সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। নীরা, পিহু আর তেজ ভিতরে প্রবেশ করলেও ইলমা থেকে গেলো। অনুর কাছে গিয়ে ওকে ভালো ভাবে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিয়ে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিলো। আবেগঘন একটা পরিবেশ তৈরি হলো। রক্তের বন্ধন না থাকলেও ইলমা আর অনু ২ বোন হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। অনুর হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, এতো বড় বি*পদ থেকে নিরাপদে-অ*ক্ষত অবস্থায় ফেরত আসতে পারবে কিনা সেই চিন্তায় ইলমা গতকাল বড্ড অস্থির হয়ে ছিলো। অনু হাসিমুখে বললো…..
—”আজ এই আমিটা যে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি এর পিছনে সবথেকে বড় অবদান ছিলো নির্ঝরের পাশাপাশি সারফারাজ ভাই ও তেজ ভাইয়ের। একূল-অকূল জুড়ে নিঃস্ব আমিটার জন্য ওনারা যে এতোটা করবেন, আমার জান বাঁচাতে নির্ঝর তার নিজের জানের মায়া ত্যাগ করে লড়বেন তা আমি কল্পনাও করতে পারি নি।”
পাশ থেকে সারফারাজ অনুর মাথায় হাত রেখে স্নেহভরা কন্ঠে বললো…..

—”তোমাকে আর ইলমাকে নীরার মতোই আমি আমার ছোট বোন হিসেবে মনে করি অনু। আর বড় ভাই হিসেবে বোনের নিরাপত্তায় যা করা প্রয়োজনীয় সবটাই করে যাবো শেষ নিঃশ্বাস পড়া পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ।”
এরূপ কথা শুনে অনু আবেগে নিজেকে ভাসিয়ে নিলেও ইলমার হাসিমুখটা মিইয়ে গেলো। ওর মন ও মস্তিষ্ক জুড়ে কি চিন্তা আবার কাজ করতে শুরু হলো তা বোঝা গেলো না।
খানিকক্ষণ পর পিহু, তেজ ও নীরা ভিতর থেকে বেড়িয়ে এলে ইলমা গেলো নির্ঝরের সাথে দেখা করতে। দেখা-সাক্ষাৎ এর পর্ব সবার শেষ হয়েছে। ইলমা বললো…..
—”বাড়িতে গুরুজনদের থেকে নির্ঝর ভাইয়ের অবস্থার বিষয়টা গোপন রাখলেন আপনারা কিন্তু নির্ঝর ভাইকে তো মিনিমাম ৭-৮ দিন এখানে ভর্তি থাকতে হবে বলে মনে হচ্ছে। ততোদিন আপনারা এখানেই থাকবেন কিভাবে? ফ্রেশ হওয়ার প্রয়োজন আছে, পাশাপাশি ভালো খাবার খাওয়ারও প্রয়োজন আছে।”
সারফারাজ বললো…..

—”হাসপাতালের পাশেই একটা হোটেল আছে। সেখানে রুম বুক করেছি। সমস্যা হবে না থাকা খাওয়া নিয়ে। চিন্তা করো না তোমরা।”
—”অনুকে নিয়ে আমি বরং আমাদের পুরোনো ভাড়া বাসায় ফিরে যাই। এ ক’দিন সেখানেই থাকবো। আর কফিশপেও যেতে সুবিধা হবে আমার।”
সারফারাজ একবার অনুর দিকে তাকালো। অনু নিরব হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। সারফারাজ একটু ভেবে বললো…..
—”না। তোমরা ২জনও আমাদের সাথে এই হোটেলেই থাকবে। আর তোমাকে কফিশপে সেফলি পৌঁছে দেওয়ার ও নিয়ে আসার দায়িত্ব তেজ পালন করবে। কি তেজ করবি না?”
তেজ ১ সেকেন্ডও দেড়ি না করে বললো….
—”সে কথা আবার জিজ্ঞেস করতে হয় ভাইয়া? আমি তো ফ্রী-ই থাকি সবসময়৷”
নীরা নাক সিটকে বিরবিরিয়ে বললো…..

—”বড্ড নির্লজ্জ, আর ছুঁ*চো হয়ে যাচ্ছো তুমি দিন দিন মেজো ভাইয়া। বড়-ছোট কিচ্ছু মানছো না। ইলমা আপুর কাছাকাছি তাকার সুযোগটা পেলেই হলো তোমার। কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দিবা না।”
অতঃপর পিহু নীরাকে নিয়ে চলে গেলো খান বাড়ির উদ্দেশ্যে। তেজ ইলমা আর অনুকে নিয়ে হোটেলে গেলো ওদের জন্য আগে থেকে বুক করে রাখা রুমটা দেখিয়ে দিতে। পাশাপাশি সে নিজেও ফ্রেশ হয়ে নিবে এরপর সারফারাজকে এসে ফ্রেশ হওয়ার সুযোগ করে দিবে। নির্ঝরের আশেপাশে অন্তত একজনের থাকা দরকার বুঝেই সারফারাজ সেখানে রয়ে গিয়েছে।
কেটে গেলো প্রায় ৭দিন,

এর ভিতর অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। তেজ নিয়ম করে ইলমাকে কফিশপে রেখে এসেছে আবার নিয়ে এসেছে। অনু বেশিরভাগ সময় নির্ঝরের খেয়াল রাখতে ওর কাছাকাছিই থাকে। অনুর সংকোচ বোধ, ও ভীতিবোধ দু’টোই কেটে গিয়েছে এ ক’দিনে। অনু এখনও মুখ ফুটে নির্ঝরকে ওর প্রপোজালের পজেটিভ উত্তর না করলেও ওর আচারণেই নির্ঝর বুঝে গিয়েছে অনুও ওকে চায়। নির্ঝরের ক্ষ*ত স্থান প্রায় শুকিয়ে এসেছে। এখন ও একাই চলাচল করতে পারে। নিজের কাপড় পরিবর্তন করতে পারে। আর ২-৩ দিন গেলে আরো বেটার ফিল করবে নির্ঝর। এরভিতর পিহু আর নীরা নানান বাহানা দেখিয়ে ওদের সবার সাথে দেখা করতে এসেছিলো। সারফারাজ এখানে থেকেই নিজের বাহ্যিক কাজ গুলো আগের ন্যায় সামলে নিচ্ছে।
আরো প্রায় ৩দিন পর নির্ঝর এখন পুরপুরি নিজেকে সুস্থ অনুভব করায় হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে নেয় ওরা। এরপর তেজ আর নির্ঝর একসাথে স্বাভাবিক ভাবেই খান ভিলায় ফিরে আসে। এতোদিন পর নিজেদের আদরের ২ সন্তানকে ফিরতে দেখে তাহমিনা, শিউলি, আতুশি ৩ জনই যথেষ্ট খুশি হন। ওদের পছন্দনীয় খাবার খুব যত্নের সহিত রান্না করেন তারা। এরমাঝে গুরুজনরাও ঠিক করেন খুব শীঘ্রই সারফারাজ আর পিহুর বিয়েটা আনুষ্ঠানিক ভাবে সেরে ফেলবেন৷ বারবার ডেইট পিছিয়ে যাচ্ছে নানান তাল-বাহানায় এবার আর পিছাতে দিলে হবে না বলেই তারা সিদ্ধান্ত পাকা করেন।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৪

বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য সপিং পুরোপুরি ভাবেই করা হয়ে গিয়েছে ওদের। বাড়ির গুরুজনদের কথায় অনু আর ইলমাকেও খান বাড়িতে আনা হয়েছে আবার। খান বাড়িটা আবারও আগের ন্যায় পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। ক’দিন ধরে লম্বা সময় ইলমার সাথে কাটানোর বদৌলতে ইলমার প্রতি তেজের দূর্বলতা ও ভালোলাগার মাত্রা আরো গাঢ় রূপ ধারণ করেছে। তেজ ঠিক করেছে সেও আর দেড়ি করবে না নিজের অনুভূতিগুলোর বহিঃপ্রকাশ ইলমার সামনে ঘটাতে।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here