জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৫
তোনিমা খান
ভোর হতে হতে দুঃখ আর অভিযোগগুলো খানিক ফিকে হয়ে এল। লোকমুখে শোনা যায়, বৈবাহিক সম্পর্কে এক অদ্ভুত টান, গভীরতা আর পবিত্রতা থাকে। সেই টান আর পবিত্রতার কাছে মান-অভিমান বড়ই তুচ্ছ। তবে এই সম্পর্কের শক্তি অটুট থাকে ততক্ষণই, যতক্ষণ এর মাঝখানে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির হস্তক্ষেপ না ঘটে।
কিন্তু যেই মানুষ দু’টো একে অপরকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে, যারা চাইলেও একে অপরকে উপেক্ষা করতে পারে না। তাদের সম্পর্কের মাঝে কীভাবে ফাটল ধরবে?
বাইরে তখনও আলো-আঁধারের খেলা চলছে। পাখিরাও বোধহয় এখনো পুরোপুরি অলসতা ঝেড়ে উড়ে বেড়াতে শুরু করেনি। সিক্ত চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল তালহার। কোমরে জড়ানো সাদা তোয়ালে, চোখেমুখে সদ্যস্নাত এক নির্মল সতেজতা। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি এই মুহূর্তে সে-ই। তার মুখজুড়ে এমন এক নিশ্চিন্ত প্রশান্তি। দেখে মনে হচ্ছে সমস্ত অস্থিরতা কোথাও মিলিয়ে গেছে।
মাথা মুছতে মুছতে ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় বিছানার দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি স্থির হয় ঘুমন্ত মেয়েটির খালি হাত, কান, গলার দিকে। এটা তো তার গিন্নির চিরচেনা রূপ নয়।
সে নিঃশব্দে আলমারির লকার খুলে বিন্দুর ফেলে যাওয়া অলংকারের বাক্সটি বের করল। ধীর পায়ে এসে ঘুমন্ত মেয়েটির পায়ের কাছে বসে একজোড়া নূপুর পরিয়ে দিল। এটা পড়েই তো তার শুনশান ঘরটি রুনুঝুনু শব্দে মাতিয়ে রাখে। তার প্রতি কদম জানান দেয় এই ঘরে সুখের বসবাস।
সে মুগ্ধ চোখে চেয়ে মেয়েটির পা দুটো আঁকড়ে ধরে নিজের ঠোঁটের সাথে ঠেকালো। ফিসফিসিয়ে বলল,
‘আমার জীবন আর ঘরজুড়ে সবসময় তোমার বিচরণ থাকুক।’
একে একে বিন্দুর দুই হাতের আঙুলে আংটি, হাতে চুড়ি, কানে দুল আর গলায় ছোট্ট হার পরিয়ে দিতেই
বিন্দু তার সেই চিরচেনা গিন্নির রূপে ফিরে এল। তালহারের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। যেন তার ওলোটপালোট হয়ে যাওয়া দুনিয়াটা সে আবার গুছিয়ে নিয়েছে।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বিন্দু অবশ্য কিছুই দেখল না। দেখল না, নিজের স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ায় এক স্বামীর মুখে কী অপার্থিব প্রশান্তি আর অহংকার ফুটে ওঠে।
দেখল না, সে কারোর অহংকারের কারণ!
একটি আলিশান অফিস রুম। বাহিরে আঁধার পুরোপুরি না সরলেও ভেতরটা ঝলমলে আলোয় আলোকিত। কালো প্যান্ট কালো স্যুট পরিহিত তালহারের আপাদমস্তক চেক করা হতেই সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে গটগট করে ভেতরে ঢুকে গেল। কোলাকৃতির কাউচে পায়ের উপর পা তুলে বসা লোকটির ঠিক উল্টোপাশে গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে সোফায় গা এলিয়ে দিল।
সোজাসাপ্টা বলল,
‘বলুন, ড. জিন্নাহ!’
থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে রাখা ভাবুক লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো একদম নিজের সোজাসুজি। মধ্যবয়স্ক লোকটির বেশভূষা আত্মবিশ্বাসী, পরিপাটি, আভিজাত্যের ছোঁয়া। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘কেস ক্লোজ করার জন্য কী নিবেন?’
‘আপনার ক্যারিয়ারের ধ্বংস!’
তালহারের ঠান্ডা স্বরে ড. জিন্নাহ মৃদু হাসলেন।
‘আপনি জানেন, এটা আপনি কখনোই পারবেন না।’
‘চার মাস জিন্নাহ সাহেব! চার মাস একটা কেসের পেছনে লড়ে যদি আমি এতটুকু না বলতে পারি— তবে একজন সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার হিসেবে আমার উপর লানত!’
‘আমি দিচ্ছি আপনার উপর লানত। আপনি এমনটা কোনোদিন পারবেন না। শুধু শুধু পরিস্থিতি জটিল করছেন।’
ড. জিন্নাহ’র শান্ত মুখশ্রীতে উদ্বেগ ছুঁয়ে গেল। তালহার নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। পা দোলাতে দোলাতে বলল,
‘দেশের কৌশলগত ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থের কাছে পৌঁছে দেয়া।
প্রকৃত সরকারি রিজার্ভের তথ্য ও চূড়ান্ত নীতিগত প্রতিবেদনের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য তৈরি করা।
সরকারি জরিপের মূল ডেটা পরিবর্তন করা। যেখানে খনিজের মজুত বেশি ছিল, সেখানে রিপোর্টে ‘Low Commercial Value’ লিখিয়েছেন। পরে সেই একই ব্লক নামমাত্র মূল্যে বিদেশি কনসোর্টিয়ামের হাতে গেছে।
যে গবেষকরা আপত্তি তুলেছিলেন, তাদের রিপোর্ট বাতিল হয়েছে। কেউ বদলি হয়েছেন, কেউ চাকরি হারিয়েছেন, একজন রহস্যজনকভাবে মারা গেছেন।
যার মধ্যে ভূতত্ত্ববিদ আনোয়ার ফারুক অন্যতম একজন।
ভুয়া পরামর্শ ও প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছেন। সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, নথি জালিয়াতি, প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং মানি লন্ডারিং।
আপনি ভূতাত্ত্বিক জরিপের তথ্য বিকৃত করে প্রকৃত খনিজ মজুত গোপন রেখে বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থকে সুবিধা দিয়েছেন। সরকারকে ভুয়া জরিপ দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে দেশের খনিজ সম্পদ , তেল পাচার করছেন। যেখানে আমার দেশে একটা বোমা ছুঁড়লেও আমাদের পাল্টা বোমা ছোঁড়ার সামর্থ্য নেই। বিদ্যুতের অভাবে দেশের মানুষ আর দেশ অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে। লজ্জা করে না নিজের মাতৃভূমির মাথা কেটে দিতে?’
তালহারের কপালের শিরা উপশিরা ফুলেফেঁপে উঠছে। ড. জিন্নাহ তখনো শান্ত শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
তালহার তার পাশে রাখা একটা ফাইল ছুঁড়ে মারল মাঝখানে থাকা টি টেবিলে।
‘আপনার নেটওয়ার্কের আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের রেকর্ড, সাক্ষ্য, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল ডকুমেন্ট সব রয়েছে এখানে।আপনার পুরো ক্যারিয়ারের ধ্বংসের নথিপত্র। এখন সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি কী করবেন?’
ড. জিন্নাহ মৃদু হেসে বলল,
‘আমি আপনাকে এখন মেরে ফেলব।’
তালহার চোখে চোখ রেখে নির্বিকার বলল,
‘আপনি আমায় মারবেন আমার টিমের বাইশ জন অফিসার আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। আপনি ক’জনকে মারবেন?’
‘আমি শুধু আপনাকেই মারব।’
তালহার হাঁটুতে দুই কনুই ঠেকিয়ে ঝুঁকে গেল। স্মিত হেসে বলল,
‘আর আপনাকে আমি অলরেডি মেরে ফেলেছি।’
বলেই তালহার পকেট থেকে ফোন বের করে তার সামনে তুলে ধরল। রক্তাক্ত বদনে মাহির চৌধুরী একের পর এক তার সকল অপকর্মের স্বীকারোক্তি দিচ্ছে। ড. জিন্নাহর মুখের উজ্জ্বলতা গতকাল ই ফুরিয়ে গিয়েছিল। যেটুকু বাকি ছিল এখন সেটাও হারিয়ে গেল।
তালহার বলল,
‘আমায় না মেরে নিজেকে মারুন। কারণ আপনার মৃত্যু নিশ্চিত। আসছি, আলবিদা।’
বলেই সে হাঁটা ধরল। কিন্তু দুই পা এগিয়েও পিছিয়ে এলো। বলল,
‘শুনুন, যদি ভেবে থাকেন আপনার বিদেশি সহযোগীদের সাহায্যে উড়াল দেবেন—তাহলে সে আশা ভুলে যান। সরকারের নির্দেশে গতকাল বিকেল থেকেই আপনি গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারিতে আছেন। আকাশ কিংবা পাতাল কোথাও পালানোর সুযোগ নেই।’
তালহার যেভাবেই সিনা চওড়া করে আত্মগরিমা নিয়ে এসেছিল সেভাবেই বেরিয়ে গেল। ড. জিন্নাহ তখনো থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন ছিল। সে ভাবছে কোনটা সুখকর! অন্যের হাতে মৃত্যু নাকি নিজের হাতে মৃত্যু? কিন্তু মৃত্যু তো কখনোই সুখকর হয় না।
কালো একটি বিলাসবহুল গাড়ির ভেতরে সিট রেক্লাইনিং করে আরামে শুয়ে ছিল সুপ্ত। কিন্তু হঠাৎ করেই তার আরামে বিরক্তি সৃষ্টি করল হেলে থাকা সিটটা আস্তে আস্তে সোজা হয়ে যেতেই। সুপ্ত সোজা হয়ে বসে ঠোঁট থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা সরিয়ে নিলো। চোখ খুলে বিরক্তি নিয়ে তাকালো সদ্য ড্রাইভিং সিটে বসা তালহারের দিকে। বলল,
‘বেঁচে ফিরেছিস? আমি ভেবেছি জিন্নাহ তোকে বেঁচে ফিরতে দেবে না।’
‘তার জন্য ই কী ঠোঁটে সিগারেট চেপে আরামে ঘুমিয়ে ছিলি?’
তালহার গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে আড়চোখে চেয়ে বলল। সুপ্ত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
‘ভাবছিলাম কিছু হলে জিন্নাহকে কীভাবে মারব!’
তালহার তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
‘ভেবে আমায় উদ্ধার করার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু জিন্নাহকে মারার মতো এত কষ্ট করতে হবে না। সে নিজেই যথেষ্ট নিজেকে মারার জন্য।’
সুপ্তর ভ্রু কুঁচকে গেল।
‘মানে?’
তালহার শান্ত দৃষ্টিতে ফেলল তার দিকে। তখুনি সকালের নিস্তব্ধ ধরণীতে আলোড়ন তুলল ট্রিগার চাপার বিকট শব্দ। সুপ্ত ভড়কে জিন্নাহর বাড়ির দিকে তাকালো। তালহারের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠল।
গাড়িটি চলতে শুরু করল। সুপ্তর সিগারেটটি আর শেষ হলো না। সেভাবেই আঙুলের ভাঁজে পুড়তে লাগল। ঠিক যেমনটা ভেতরটা পোড়ে!
ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘বিন্দুর কী অবস্থা?’
‘কিছুটা বেটার। শরীর দূর্বল।’
‘হঠাৎ এমন হলো কেন? মাহির গতকাল কিছু করেছে?’
‘উহু।’
‘তবে?’
‘ডক্টর ধারণা করছে, বিন্দু প্রেগন্যান্ট। হসপিটালে যেতে হবে বিকালে।’
তালহার একমনে ড্রাইভ করতে করতে জবাব দিল। সুপ্ত বাহির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকায় তালহারের শান্ত মুখপানে। ওই মুখে কোনো উদ্বেগ নেই। সে সিগারেটটা ঠোঁটের ভাঁজে রাখল।
‘যদি পজিটিভ হয় তবে কী করবি?’
রাস্তায় এঁটে থাকা তালহারের স্থির আঁখিদ্বয় নড়ে উঠল। ম্লান হেসে বলল,
‘বাবার হয়ে থেকে গেলে বুকে আগলে রাখব। কিন্তু আমি জানি প্রতিবারের মতোই ছেড়ে যাবে।’
‘এমনটা কেন হয়?’
‘অ্যান্টিফসফোলিপিড সিন্ড্রোম।’
তালহার ছোট্ট করে উচ্চারণ করল।
সুপ্ত সিগারেটে শেষ সুখটানটা দিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
‘যদি এবার সব ঠিকঠাক থাকে?’
‘বিন্দুকে বিদেশে পাঠিয়ে দেব চিকিৎসার জন্য।’
‘হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলে নিলি যে? গতকাল পর্যন্ত তুই বাচ্চা চাসনি।’
প্রশ্নটি শুনতেই তালহারের বুকের ভেতর যেন ছলকে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বিন্দুর গতকাল রাতের সেই বিধ্বস্ত দশা আর ঘৃণাভরা চাহনি। বিন্দুর ওই দশা তাকে উদ্বিগ্ন করতে না পারলেও ওই চাহনির কথা মনে পড়তেই তার ভেতরটা থমকে যায়। ওই চোখে নিজের জন্য ঘৃণা দেখলে সে বাঁচবে কী করে? সে ধিমি কণ্ঠে বলল,
‘বিগত দেড় মাসে আমি এতটুকু বুঝেছি আমার শক্তি কোথায়! বাঁচতে হলে আমার তাকে প্রয়োজন। আর তার প্রয়োজন একটা বাচ্চা। আমি সিঙ্গাপুরের হসপিটালে ওর রিপোর্টগুলো পাঠিয়েছি। তারা এখনো ফিডব্যাক দেয়নি। দিলে হয়তো ওকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে দেব চিকিৎসার জন্য।’
‘ওহ্।’
সুপ্ত ছোট্ট করে বলে জানালার বাইরে দৃষ্টি রাখল। কিন্তু দারুচিনি রঙা চোখদুটো এক অন্য ভ্রমে ডুবে ছিল।
বিন্দুর চোখ যখন খুলল তখন অম্বর ঝলমলে আলোয় আলোকিত। বিছানা বরাবর একদম সোজা পুরো অর্ধেক দেয়াল জুড়ে থাকা কাঁচের দেয়াল আর ভেলভেট পর্দা ভেদ করে একটু আধটু সূর্যের মিঠা রোদ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। মৃদু নড়েচড়ে উঠতেই উপলব্ধি করল পুরো দেহ জুড়ে অবসাদ!
কিয়ৎকাল নিঃসাড় দেহে বিছানায় শুয়ে রইল সে। তখনি চোখ যায় বেডসাইড টেবিলে। ছোট্ট একটা চিরকুট সাথে ঢেকে রাখা একটি খাবারের প্লেট। বিন্দু আলুথালু বেশে উঠে বসল। চিরকুটটিতে কাটা কাটা স্পষ্ট কিছু লাল কালির অক্ষর জ্বলজ্বল করছে।
‘গুড মর্নিং, মহামান্য! নাস্তা আমি রেডি করে রেখেছি। সবটা খেয়ে নেবে। আমায় জরুরী কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে। লাঞ্চে ফিরব। তারপর বিকালে হসপিটালে যাব।’
তালহারের হাতের লেখা অদ্ভুত সুন্দর। ঠিক যেন কম্পিউটারে টাইপ করা হয়েছে। বিন্দু সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তাকে তো তালহার জড়িত ছোট ছোট বিষয় ও খুব সুখ দিত। তবে আজ বুকের ভেতরটা এত নিস্তেজ হয়ে আছে কেন? সে যেন দিকভ্রান্ত পথিক। সে জানে না সে কী খুঁজছে! নিজেকে নাকি তালহারের আগের সেই স্ত্রীকে? যার কাছে সুখ মানেই তালহার ছিল।
সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বিন্দু ধীর কদমে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢোকে। দেয়ালে এঁটে থাকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গায়ের টিশার্টটা এক টানে খুলে ফেলল। ডিম্বাকৃতির আয়নায় ভেসে উঠল একটি সুগঠিত নগ্ন দেহের প্রতিবিম্ব। বিন্দুর উদাসীন দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো কলার বোনের উপরে জ্বলজ্বল করতে থাকা লালচে তাজা দাগের ওপর। নাসারন্ধ্র থেকে একটা গভীর নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসল।
‘সে কখনোই তালহারকে উপেক্ষা করতে পারে না।’
তার হাতটি ছুঁয়ে দেয় গলার লালচে জায়গাটা।
এই জায়গাটা তালহারের খুব পছন্দের। কেন? তা কখনো বলেনি। অবশ্য তালহার কখনোই তাকে কিছু বলে না। তার যে মা হওয়ার অধিকার নেই সেটুকুও বলে না।
সে আরশি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ঝরনা ছেড়ে দিতেই ঝিরিঝিরি পানি শীতল ছোঁয়া দেহের সব স্পর্শ মুছে দিল। স্বামীর ভাষ্যমতের এই প্রেমময় স্পর্শ গুলো আজকাল তাকে বড্ডো পীড়া দেয়!
যাদের আত্মার মিলন হয়নি, তাদের দৈহিক মিলন কী করে সুখময় হয়?
সোনালী পাড়ের লাল টুকটুকে একটা শাড়ি জড়িয়ে সে বেরিয়ে আসে ওয়াশরুম থেকে। তার আলমারি জুড়ে লাল শাড়ির সমাহার! কেন? কারণ তালহারের পছন্দ!
মর্নিং সিকনেস এর দরুন একদফা বমি করে সে মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে আসল। বেডসাইড টেবিলে তার ফেলে রাখা ফোনটি অনবরত ভাইব্রেট করছে। তালহারের ফোন। সে রিসিভার কানে ঠেকালো। ভেসে আসল নম্র স্বর।
‘হ্যালো, উঠেছ?’
‘হু।’
‘শরীর খারাপ লাগছে?’
‘নাহ।’
‘খাবার খেয়েছ?’
‘পিল খেয়েছি কি-না এটা জানতে চাইছেন?’
বিন্দু রুমের পর্দা খুলতে খুলতে অলস কণ্ঠে বলল। তালহারের ভেতরকার প্রসন্নতা মিলিয়ে গেল।
‘এটা কখন বললাম?’
‘আপনি নিশ্চয়ই খাবারে ওষুধ মিশিয়ে রেখেছেন? যেমনটা কফিতে মেশাতেন? এত কষ্ট করতে হবে না তালহার। আমি পিল খেয়ে নেব।’
তালহার কপালে আঙুল ঘঁষতে ঘঁষতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘খেয়েছ কিনা তাই ফোন দিয়েছিলাম।’
‘আমি পিল খেয়েছি কি-না আপনি সেটা নিশ্চিত হতে ফোন দিয়েছেন!’
‘কাম অন, বিন্দু! ওই এক জায়গায় কেন আঁটকে আছো?’
‘কারণ ওটাই আমার জীবনের একমাত্র দুঃখ!’
‘একটা দুঃখকে এতটা প্রায়োরিটি দিচ্ছো। তবে বাকি সুখ গুলো কী দোষ করেছে?’
‘ওই এক দুঃখের কাছে সব সুখ বড্ডো তুচ্ছ!’
‘আমি আগে তোমায় খুব বুদ্ধিমতি ভাবতাম।’
‘কিন্তু আমি তো শুরু থেকেই বোকা ছিলাম। যে তিন বছরেও তার স্বামীকে চিনতে পারল না।’
তালহার আর কথা বাড়ালো না। ডাক্তার বলেছিল বিন্দু মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। সে পরিস্থিতি খারাপ করতে চায় না। বলল,
‘যেমনটা তোমার ভালো মনে হয়। কিন্তু নিজের ভালোটা একটু চিন্তা করো। আর এইসব ওভার থিংক করা বন্ধ করো। খাবার খেয়ে নিও। আমি তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করব।’
সে ফোন রেখে দিল। বিন্দু বিছানার এক কিনারায় বসে ফোন দিল নিশির ফোনে। দীর্ঘ আলাপন শেষে নিশি হতভম্ব হয়ে বলল,
‘এমনটা করো না বিন্দু। তালহারকে জানাও। আগে শোনো ও কী বলে। তারপর নাহয় কোনো সিদ্ধান্ত নিও।’
বিন্দু অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল,
‘তালহার বাচ্চা চায় না নিশি। সে কোনোদিন আমায় বাচ্চা রাখতে দেবে না, নিশি। সে অসুস্থতার দোহাই দিয়ে আমায় অ্যাবোর্শন করিয়ে দেবে।’
‘বললেই হলো নাকি? আগে তুমি নিজের চেকাপ করাও। আগের বারের মতো এবারেও হলে? বাচ্চার কন্ডিশন দেখো তারপর সিদ্ধান্ত নাও। এরপর যদি তালহার বাচ্চা না রাখতে চায় তবে আমরা তোমায় নিয়ে আসব।’
নিশি দীর্ঘক্ষণ বোঝানোর পর বিন্দু নিজের ভয় সামলাতে সফল হলো। সে বলল,
‘আচ্ছা, আমি আগে চেকাপ করাব। বাচ্চার কন্ডিশন যদি সুস্থ থাকে তবে তালহারকে জানাব।’
নিশি হাঁফ ছাড়ল।
সকাল তখন নয়টা বাজে। বিন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। রান্নাঘরে টুকটাক শব্দ হচ্ছে। চাকতিতে বিছিয়ে রাখা কাঁচা বাজার, মাছ , মাংস। যা মালা ঠিক করে রাখছে। বিন্দু মাছের গন্ধে নাকে কাপড় চাপল। বলল,
‘আপা, মাছ মাংসগুলো ভালোকরে ধুয়ে ফ্রিজে তুলে রাখুন।’
মালা বলল,
‘আজকে কী রান্না করবেন ভাবি?’
‘পরে দেখছি।’
‘আচ্ছা।’
মালা বিমর্ষ মুখে কাজ করতে লাগল। এত বাজার! কিন্তু সে একটা দুইটা সরাতে পারছে না। ঘরে ঘরে কাজ করায় হাতের দোষ হয়েছে ইদানিং! কিন্তু এই ঘরের কোনায় কোনায় ক্যামেরা। কী মুশকিল !
বিন্দু এক কাপ কফি বানাতে নিলো। তন্মধ্যেই কলিং বেল বাজলো। সে কফি হাতে সদর দরজার কাছে গেল। কে এসেছে দেখার জন্য পিপ হোলে চোখ রাখতেই মৃদু চমকালো। সে কিছুটা বিব্রত বদনে দরজা খুলে দিতেই একটি স্নিগ্ধ সুন্দর মুখ ভেসে উঠল।
ব্যাগি প্যান্ট আর কূর্তির সাথে কাঁধে ঝুলানো একটি পার্স সমেত মৃদু অগোছালো মেয়েটিকে দেখে বিন্দু ভ্রু কুঁচকে বলল,
জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৪
‘আপনি?’
লাল টুকটুকে শাড়ি, নতুন বউদের মতো অলংকার পরিহিত ভেজা চুলের নারীটির আপাদমস্তক দেখে মেঘ মৃদু হাসল। বলল,
‘আমি মেঘ। আপনি নিশ্চয়ই বিন্দু? বিন্দু তালহার মুজাহিদ। বি.টি.এম—এই বাড়ির আসল মালিক? তালহার ঠিক বলে, শাড়ি সবচেয়ে চমৎকার একটা পোশাক। কারণ সেটা আপনি পড়েছেন। আপনাকে শাড়িতে খুব সুন্দর লাগে।’
