Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ২৬

মেজর কারদার পর্ব ২৬

মেজর কারদার পর্ব ২৬
ফিনারা ঝুমুর

ল্যাভেন্ডার লেহেঙ্গার ভারী সাজে রাঙা হয়ে আজ শীর্ষর ঠিক মুখোমুখি বসে আছে মেঘ। মাথাটা ওর থমকে আছে নিচের পানে; থরথর করে কাাঁপতে থাকা দৃষ্টিটা স্থির হয়ে আছে লেহেঙ্গার নিচে উঁকি দেওয়া কাজ করা ঘেরটার দিকে। চারপাশের এত শোরগোল, আতর আর গোলাপজলের সুবাস ছাপিয়ে এক তীব্র পুরুষালী উগ্র পারফিউমের সুবাস ওর সরু নাকে এসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে বারবার। ও হাত না তুলে, মুখ না তুলেও খুব ভালো করেই টের পাচ্ছে ওর ঠিক সামনেই প্রখর আর তপ্ত দৃষ্টিতে বসে আছে এই বাড়ির জাঁদরেল মেজর, ওর অর্ধাঙ্গ শীর্ষ কারদার।

​“বলো মা, কবুল!”
​বয়োজ্যেষ্ঠ কাজী সাহেবের এমন জোরালো আদেশসূচক হাঁকে মেঘের হারিয়ে যাওয়া চেতনা এক লহমায় ফিরে আসে। বুকের একদম মাঝখানে যেন এক প্রলয়ঙ্করী কালবৈশাখী ঝড়ের তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। যে ঝড়ে সাধারণ সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়, ঠিক তেমনি এক তীব্র ভাঙন ঘটছে মেঘের নিজের অন্দরে। সে চুপ করে রইল; কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় নিজের গোলাপ পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটোকে দাঁত দিয়ে কামড়ে পিষে রাখল।
​“মেঘ, মা আমার—কবুল বল!”
​মাথার ওপর পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকা বাবার স্নেহপূর্ণ হাতের পরশ পেতেই মেঘ নিজের থরথর করে কাঁপতে থাকা টলটলে চাউনিটা তুলে জুবায়ের কারদার আর সাত্তার মাস্টারের দিকে তাকাল। ওর সেই গাঢ় বাদামি মায়াবী নয়নজোড়া তখন কান্নার জলে একবারে টইটুম্বুর হয়ে আছে, যেন চোখের পলক ফেললেই শ্রাবণের অঝোর বারিধারা নেমে আসবে! সে ভেতরে চেপে রাখা কান্নাটাকে কোনোমতে গিলে ফেলে, আস্তে আস্তে ডুকরে কেঁদে উঠে দুই দিকে মাথা নাড়ল,

​“আমি– আমি এ বিয়ে করব না বাবা! তোমায় ছেড়ে, আমার এই পরিবারকে ছেড়ে আমি কীভাবে অন্য কোথাও যাব, বলো? মা-কে ছেড়ে আমি একলা থাকব কেমনে?”
​মেঘের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটা ভাঙা কথা আর আকুল আর্তনাদ যেন সোজা গিয়ে আলেয়া বানু আর আবু সাত্তার মাস্টারের বুকের ভেতর এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড তৈরি করল। ওনাদের বুকটা দগ্ধ হয়ে উঠল, দু-চোখ বেয়ে অবাধ্য অশ্রুর ধারা নেমে এলো। কান্নারা সব বাঁধ ভেঙে চোখের কোণে এসে হুটোপুটি খেতে লাগল। বহু বছর আগে নিজেদের এক মেয়ে ঝিলিকে না-ফেরার দেশে চিরতরে হারিয়ে ফেলে, আজ অন্য আরেক মেয়েকে এমন হুট করে পরের ঘরে, শ্বশুরবাড়ির হাতে তুলে দেবে সন্তানহারানো এই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মন কোনোভাবেই যে এই নির্মম নীতি মেনে নিতে পারছে না!​আলেয়া বানু আঁচলে মুখ গুঁজে নীরবে কেঁদে উঠলেন, আর আবু সাত্তার মাস্টার নিজের চশমাটা খুলে হাত দিয়ে চোখ দুটো চেপে ধরলেন।
“মারে, পৃথিবীর সকল মেয়েকেই একদিন না একদিন এই বাপের পরবাসী ছায়া ছেড়ে নিজের স্বামীর আসল ভিটে আঁকড়ে ধরতে হয়। মেয়েরা তো আসলে পানির মতো রে মা, তাদের যেখানেই ঢালবি, তারা সেই পাত্রেরই আকার ধারণ করে ফেলবে।”

​মায়ের বুকে জড়িয়ে লেপ্টে থেকে পরম মমতাময় এই সান্ত্বনার বাণী শুনেও মেঘের বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা ছাইচাপা দহন একটুও কমে না। সে আলেয়া বানুকে নিজের দুই বাহু দিয়ে আঁকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে, পরম আকুতিতে গুণগুণিয়ে বলে,
​“আমি কোথাও যাব না গো মা! আমায় তোমাদের কাছেই রেখে দাও না প্লিজ! এই অচেনা দুনিয়ায় আর কেউ কোনোদিন তোমাদের মতো ভালোবাসা দিয়ে আমায় আগলে রাখবে না– ও বাবা!”
​বুকের ভেতরের সমস্ত হাহাকার উগরে দিয়ে মেঘ জলভরা আকুল চোখে নিজের বাবার পানে তাকায়। আবু সাত্তার মাস্টার আর সহ্য করতে পারেন না; তিনি একপ্রকার চোখ মুছে দ্রুত পা চালিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যান। এই তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ঢাকা শহরে এসে পৌঁছালেন উনি। এসে পা রাখতেই শুনলেন নিজের ছোট মেয়ের শুভ বিবাহ নাকি আজ সন্ধ্যায়! এই অনাকাঙ্ক্ষিত চমকে সেই থেকে এই মানুষটার ভেতরটা এক অনবরত কান্নায় ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। ​ঠিক তখনই শীর্ষ মেঘের একদম কাছাকাছি সরে আসে। নিজের চওড়া, উত্তপ্ত হাতখানা মেঘের সুবিন্যস্ত বিয়ের ওড়নার ওপর দিয়ে ওর মাথায় রেখে পরম স্নেহে আস্বস্ত করে বলে,

​“তুমি তোমার মা-বাবার কাছে ঠিক যতদিন মন চায় থাকবে, প্রিয়া। তার জন্য তোমাকে এই বাড়ি আটকে রাখবে না। আ’ম অলওয়েজ উইথ ইউ।”
​শীর্ষর এই সংক্ষিপ্ত অথচ আশ্বাসভরা কথার শেষাংশে ঠিক কী এক ঐশ্বরিক জাদু ছিল, তা কারও জানা নেই! শুধু এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো মেঘের বুকের ভেতরের এতক্ষণ ধরে চলা প্রলয়ঙ্করী কালবৈশাখী ঝড়টা যেন এক লহমায় অলৌকিকভাবে শান্ত হয়ে গেছে! সেই ঝড়ের জায়গায় এখন স্থান করে নিয়েছে এক বিশাল আকাশ পরিমাণ স্নিগ্ধতা আর গভীর মুগ্ধতা!
​মেঘের কান্নার বেগ শান্ত হয়েছে, চোখ জোড়া স্থির হয়েছে শীর্ষর ওই তপ্ত পুরুষালী আননে। শীর্ষ এবার চোখে ইশারা করে কাজী সাহেবকে দ্রুত বিয়ের শুভ কাজ সম্পন্ন করার তাগাদা দেয়।​কাজী সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে আবারও সানন্দ কণ্ঠে আহ্বান জানান,

​“বলো মা, কবুল!”
​মেঘ নিজের কম্পিত ওষ্ঠাধর জোড়া আলতো করে খুলে, শীর্ষর প্রখর অক্ষিতে নিজের দৃষ্টি ডুবিয়ে ধীর অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
​“আলহামদুলিল্লাহ — কবুল!”
মায়ের পরম মমতাপূর্ণ বুকে ফের মাথা এলিয়ে দেয় মেঘ। পরম তৃপ্তিতে চোখ দুটো বুজে ফেলে ও। কাজী সাহেব এবার বর শীর্ষর দিকে ফিরে কবুল বলার তাগাদা দিতেই, জাঁদরেল মেজর সাহেব কালবিলম্ব না করেই বেশ স্পষ্ট ও গম্ভীর কণ্ঠে ঝটপট বলে উঠলেন,
​“আলহামদুলিল্লাহ– আখিরাত অবধি কবুল!”
​জুবায়ের কারদার নিজের ছেলের বিয়ের এমন উন্মাদের মতো তাগাদা আর কথা দেখে উপস্থিত সকলের আড়ালে ঠোঁট উল্টে নিজের মনেই মুখ ভেংচিয়ে বিড়বিড় করে উঠলেন,
​“আস্ত এক হারামজাদা বের হয়েছে আমার নিজের অংশ থেকে! বেটা বাপকে এক কাঠি ছাড়িয়ে গেল দেখছি! হায় রে ভালোবাসা!”

​মেঘ নিজের আনত চোখে পুরো বসার ঘরটা আড়চোখে অবলোকন করে। জোবায়েদা খাতুন, পিংকি বেগম, নীরব, নীরবের স্ত্রী তিথি, কিঞ্জা, মিথিলা, রাহাত, আদর—সবাইকে হাসিমুখে চারপাশে দেখলেও শিউলি বেগমকে ও কোথাও দেখতে পেল না। উনি যে দুপুরে রাগ করে নিজের ঘরে খিল দিয়েছেন, এখনও যে তা খোলেননি! মেঘের কোমল মনটা এতে বেজায় খারাপ হয়ে গেল। শ্বাশুড়ির এই নীরব অভিমানটুকু ওর বুকে খটকা হয়ে বিধল।
​অবশেষে আইনি কাবিননামায় একে একে স্বাক্ষরিত হয়ে গেল বর-কনের নাম। মেঘের নামের পাশে এক দারুণ ছন্দ আর আভিজাত্যে চিরতরে স্থাপিত হয়ে গেল নতুন এক পদবী ‘কারদার’।​আজ থেকে ওর নাম কেবল ‘মেঘালয়া আরণ্যি’র সীমানায় বন্দি নেই; তা বদলে গিয়ে এখন হয়েছেমিসেস শীর্ষ কারদার।
​বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গর্ভরত্ন, তূখড় বুদ্ধিমত্তা আর অদম্য সাহসের ধারক মেজর শীর্ষ কারদার অঙ্কনের বৈধ পত্নী, অর্ধাঙ্গিনী ও জীবনসঙ্গিনী!​কী এক অদ্ভুত ও মধুর অনুভূতিতে হৃদয়মন ভরে উঠল মেঘের! এক নারীমনে নিজের পরম অর্ধাঙ্গের নাম এখন দোল খাচ্ছে। শীর্ষ নামের সেই তপ্ত পুরুষটি আজ চিরতরে জায়গা করে নিয়েছে মেঘের মনন পুষ্পকাননে একেবারে একচ্ছত্র অধিপতি ‘পুষ্পরাজ’ হয়ে!​মেঘালয়ার একচ্ছত্র পুষ্পরাজ — অঙ্কন!

সতেজ ও তাজা মনোরম সব বর্ণিল পুষ্পের সুবাসে আজ সেজে উঠেছে শীর্ষর সেই চেনা শয়নকক্ষ। যে ঘরে এতদিন শীর্ষ ছাড়া আর কারও প্রবেশের বিন্দুমাত্র অধিকার বা অনুমতি ছিল না, সে ঘরেই আজ থেকে চিরকালের জন্য পূর্ণ অধিকারে প্রবেশ ঘটেছে ওনার প্রাণের প্রেয়সীর!
​খাটের ওপর ল্যাভেন্ডা রঙা লেহেঙ্গার ভারী সাজে বসে থাকা মেঘ দরজার কাছ থেকে হঠাৎ বেশ কজন উঠতি বয়সীদের চুপিচুপি ঝগড়ার ফিসফিস শব্দ শুনতে পেল। ও মৃদু কৌতূহল নিয়ে মাথার সুবিন্যস্ত ঘোমটাটা সামান্য একটু উঁচু করে সেদিকে চাইল।
​দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মেজর শীর্ষ কারদারকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ওর পথ আগলে একদম সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে তিথি, কিঞ্জা, মিথিলা, মিরা, তৃষ, রাহাত আর আদর!
​“কী চাই তোদের, হ্যাঁ?”
​শীর্ষ নিজের ডান হাতের ঘড়িটা খুলতে খুলতে ভ্রু কুঞ্চিত করে ওদের দিকে এক অসীম গম্ভীর ও তপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।​ওদের সেনাপতি রাহাত জাঁদরেল মেজরের ওমন চাহনি দেখে হাঁসের মতো গলাটা উঁচু করে ভয়ে একটা শক্ত ঢোক গিলে নিল। তারপর নিজের গলাটা একটু পরিষ্কার করে এক প্রকার প্যাক প্যাক করে বলে উঠল,

​“আমাদের দাবি একটাই, ভাইয়া! শুভ বাসরের মোহরানা চাই!”
​“কত?”
শীর্ষ এক হাত পকেটে গুঁজে সংক্ষেপে শুধাল।
​“মাত্র ত্রিশ হাজার টাকা!”
রাহাত বুক ফুলিয়ে অংকটা হাঁকাল।​ওদের সবার উচ্ছ্বসিত গলায় ওমন আকাশচুম্বী টাকার অংক শুনে মেজরের চোখ সোজা কপালে উঠে গেল! ও চরম অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
​“ত্রিশ হাজার টাকা কী গাছের মোয়া যে চাইলেই পাবি? যা, ফুট তো এখান থেকে! নিজের চরকায় তেল দে গিয়া!”
​“কী যে বলেন ভাসুর সাহেব! আমরা যে এত কষ্ট করে আপনাদের ঘরটা ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করিয়ে সাজালাম, তার কি কোনো মজুরি বা পারিশ্রমিক দেবেন না?”
তিথি একটু মিনমিন করে আবদারের সুর তুলল।​শীর্ষ তিথির দিকে না তাকিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বলল,

“তুমি নতুন বউ মানুষ তিথি, তোমার চাওয়াটা আর অপূর্ণ রাখতে পারছি না। তবে তোমার টাকাটা আমি তোমার বর নীরবের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেবো, বুঝে নিও।”
​“আর আমাদের দাবির কী হবে?”
কিঞ্জা আর রাহাত একযোগে গর্জে উঠল।​শীর্ষ ওদের অনড় মুখের দিকে কিছু পল স্থির চোখে চাইল। তারপর মনে মনে কী যেন শয়তানি বুদ্ধি এঁটে ঠান্ডা গলায় বলল,
​“ড্রয়িংরুমের ওই কোণের সোফায় গিয়ে দ্যাখ আমার পার্সোনাল ওয়ালেটটা পড়ে আছে। ওখানে চারটে ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড সব আছে। যার যত ইচ্ছে পার্সেন্টেজ বা অ্যামাউন্ট তুলে নিস, আমার কোনো আপত্তি নেই।”
​টাকা আর ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের নাম শুনতেই কিঞ্জা, রাহাত, আদরদের চোখ এক লহমায় চকচক করে উঠল! মেজরের পিন নম্বর জানার বা এর পেছনের চালাকিটুকু আগে-পিছে না ভেবেই ওরা সবাই স্রেফ একের ওপর এক হুড়মুড় করে দৌড় দিল নিচের ড্রয়িংরুমের পানে!​যাওয়ার পথে রাহাত আনন্দের চোটে চেঁচাতে চেঁচাতে গেল,

​“আজকে কিপ্টা শীর্ষর পকেট একবারে খালি খালি হইবে রে! আয় ভাই আয়, পায়সা হি পায়সা!”
ওদের ওই অবুঝ উল্লাসের সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে শীর্ষ ঝটপট নিজের রুমে ঢুকে সশব্দে ভেজিয়ে দেয় দরজা। তারপর পকেটে দু-হাত দিয়ে হালকা বিড়বিড় করে ওঠে,
​“কী রাজকপাল আমার! দিনশেষে নিজের ঘরে ঢুকতেও আবার চড়া ট্যাক্স গুণতে হয়!”
​কথাটা বলেই শীর্ষ ধীরপায়ে এগিয়ে এসে দৃষ্টি রাখে মেঘের দিকে। নিজের সেই মায়াবী বধূয়াকে একজোড়া দুষ্টু চোখে অবলোকন করতে থাকে। শীর্ষর নিজেরই পছন্দ করে কিনে দেওয়া সেই ল্যাভেন্ডার রঙের ভারী লেহেঙ্গায় আবৃত হয়ে আছে রমণীর তনুদেহে। সাথে ল্যাভেন্ডার রঙের ছোট আর মাঝারি সাইজের খাঁটি পান্নায় গড়া অলঙ্কার যেন এই শ্যামবর্ণা নারীর রূপ আর শোভা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ওর সামনে বসে থাকা এই শ্যামা গাত্রের অষ্টাদশী আজ কেবল ওর মন চুরি করেনি উহু, চুরি বললে ভুল হবে! একবারে ডাকাতি করে নিয়েছে। ডাকাতিনীর মতো নিখুঁতভাবে হনন করে নিয়েছে ওর জীবন, যৌবন আর সমস্ত মনন!
​“এই নাও, তোমার দেনমোহরানা।”
​শীর্ষ নিজের ঘরে থাকা কাভার্ড থেকে কাপড়ে মোড়ানো বেশ ভারী একখানা বস্তু বের করে মেঘের কাঁপতে থাকা হাতের ওপর তুলে দেয়। হাতে নিয়ে পরম বিস্ময়ে কয়েক পল ওটার দিকে তাকিয়ে থাকে মেঘ। শীর্ষ চোখে হালকা ইশারা করে বাঁধনটা খোলার জন্য। মেঘ আলতো হাতে লাল ভেলভেটের কাপড়টা সরাতেই চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় পরম পবিত্র গ্রন্থ ‘আল কোরআন’। মহান আল্লাহর দেওয়া পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বউত্তম বাণী।

​“কোরআন শরীফ?”
​প্রশ্নবদ্ধ আর বিস্ময়ভরা মেঘের ওই বাদামি চাউনি। শীর্ষ বিছানার পাশে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলে। বড্ড মনোমুগ্ধকর আর পৌরুষদীপ্ত সে হাসি!
​“তোমায় আমি পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মোহরানা দিয়েছি, মেঘালয়া। পবিত্র আল কোরআন! এর অর্থ কিন্তু কেবল কোটি টাকা মূল্যের বাঁধাই করা মলাটটাই নয়, বরং এই কোরআনের প্রতিটি বাণী আর শিক্ষা পূরণ করাও সেই কাবিনেরই পরম অংশ। আর দেখো, এই কোরআনের পাশেই রাখা আছে দেনমোহরের লিখিত বাকী দেনা মেটানোর রসিদ ও নথিপত্র। স্ত্রীর মোহরানা সম্পূর্ণ অপরিশোধিত রেখে এই মেজরের পক্ষে তার আখিরাতের সঙ্গিনীকে ছোঁয়া বড্ড নিষিদ্ধ, প্রিয়া।”
​মেঘ একদৃষ্টে অপলক চেয়ে থাকে শীর্ষর ওই তীব্র, গম্ভীর গ্রে রঙা চোখ দুটো পানে। নিজের ওই নিষ্পাপ চোখ জোড়া দিয়ে কী যেন অহরহ খুঁজে চলেছে সে সেখানে — সম্মানই বোধহয়?​আর গভীর সেই সাগরে ও তা পেয়েও গেল সুদের মূলে। শীর্ষর অক্ষিজোড়ায় আজ ওর প্রতি উপচে পড়ছে অসীম সম্মান, গভীর শ্রদ্ধা আর এক পাহাড় পরিমাণ বিশ্বাস! আর একজন নারীর জন্য যে এর চেয়ে বড় কোনো পাওয়া হতে পারে না– মেঘ আজ তাতেই ধন্য, তাতেই পুরোপুরি পূর্ণ!
মেঘ পরম শ্রদ্ধায় আল কোরআন শরীফটি তার নির্ধারিত পবিত্র স্থানে তুলে রেখে, লেহেঙ্গার ভারী ঘেরটা সামলে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে এসে শীর্ষর একদম মুখোমুখি দাঁড়ায়। ও হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে শীর্ষর পা ছুঁয়ে সালাম করার উদ্দেশ্যে মাথা নত করতে গেলে শীর্ষ সাথে সাথেই দুই হাতে ওর নরম বাহু দুটো ধরে ওকে বাধা দেয়।

​“তোমার স্থান আমার পদতলে নয়, মেঘালয়া! আমার বুকের বাম পাশে। নারীকে পুরুষের মাথা কিংবা পায়ের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়নি; তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে পুরুষের বুকের বাম পাশের পাঁজরের হাড় থেকে, যাতে সে হদয় দিয়ে আগলে থাকে। রবের দেওয়া সৃষ্টির এই নিয়মকে অবজ্ঞা কোরো না। সালাম মৌখিক সম্মানেই পবিত্র হয়, ঝুঁকে গিয়ে নয়।”
​কথাটা বলেই শীর্ষ মেঘকে টেনে নিজের চওড়া বুকের মাঝে জড়িয়ে নেয়। ওর মাথায় থাকা রেশমি সুতোর কারুকাজ করা ওড়নাটির ওপর আলতো করে ওষ্ঠস্পর্শ করে সে। তারপর নিজের সুগঠিত থুতনিটা মেঘের নরম মাথায় ঠেকিয়ে বড্ড গম্ভীর ও আকুল গলায় এক আবদার পেশ করে,
​“তোমার কাছে আজ রাতে একটা পরম জিনিস চাইব, প্রিয়া — আমায় দেবে?”
​মেঘ শীর্ষর বুকের ধুকপুকানি শুনতে শুনতে এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে ধীরকণ্ঠে জবাব দেয়,
​“আপনি আমার কাছে যা চাইবেন, আমি তা-ই দেব!”
​মেঘের সুনিশ্চিত উত্তরে শীর্ষর মুখশ্রীদের এক অমায়িক ও গভীর তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। সে মেঘকে নিজের বক্ষপিঞ্জর থেকে খানিকটা আলাদা করে, ওর নিটোল আননটা পরম মমতায় নিজের দুই হাতের আঁজলায় তুলে নেয়। তারপর ওর গাঢ় বাদামি মায়াবী চোখের গভীরে নিজের প্রখর গ্রে চোখজোড়া বিদ্ধ করে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক আকুলতায় মেঘের পুরো সত্ত্বাকে যেন আচ্ছন্ন করে ফেলতে চাইল!

​“হাশরের সেই কঠিন ও ভয়াল ময়দানে যদি কোনোদিন রবের তরফ থেকে শাফায়াতের কোনো সুযোগ পাও, তবে চিরকালের জন্য এই আমায় মির্জাকেই চেইয়ো, মেঘালয়া। আমার পাপ-পুণ্যের পাল্লা সমান নাকি অসমান তা আমি জানি না। তবে হাশরের ওই কঠিনতম সময়ে হিসাব-নিকাশের দিনে আমি তোমাকেই আমার পাশে চাই। আমাদের এই পার্থিব জীবনটা বড্ড ছোট, প্রিয়া। কিন্তু আখিরাতের জীবনটা বিশাল, বড্ড কঠিন! সেই অনন্ত কঠিন সময়ে কেবল আমার পাশে থেকো, এটাই আমার একমাত্র মোহরানা।”
​শীর্ষর এমন অপার্থিব কথাগুলো মেঘের কোমল বুকে যেন তীরের মতো গিয়ে বিদ্ধ হলো! কী ভীষণ মিনতি, কী গভীর আকুতি লুকিয়ে আছে এই জাঁদরেল মেজরের তপ্ত কণ্ঠে! বাসর রাতের শুভলগ্নে এমন এক স্বর্গীয় উপহার পাবেমেঘ তা নিজের স্বপ্নেও কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি। যার কোনো বাবার পরিচয় নেই, যার মাও লোকলজ্জায় আত্মহত্যা করেছিল– সমাজের চোখে এমন এক অপয়া, কলঙ্কিত মেয়ের ভাগ্যে মহান আল্লাহ এমন এক পবিত্র ও বিশাল হৃদয়ের পুরুষকে লিখে রেখেছেন! এর চেয়ে পরম সৌভাগ্য আর কী-ই বা হতে পারে ওর জীবনে?
​মেঘ জলে ভরপুর বাদামি চোখ দুটো তুলে পরম ভালোবাসায় শীর্ষর অক্ষিপটে চাইল, তারপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ গলায় উচ্চারণ করল,

​“ইহকাল কিংবা পরকাল। কোনো অবস্থাতেই আমি আপনার এই হাত দুটো আর ছাড়ব না, মেজর সাহেব। যেখানেই যাব, এই আপনাকে পরম সঙ্গী করেই যাব। তবে আপনার কাছে আমারও একটা শেষ চাওয়া রইল,রবের ডাক এসে পৌঁছানোর পূর্বে দয়া করে আপনি নিজ হাতে আমায় মেরে ফেলবেন! কারণ এই দুনিয়ায় বা ওই পরকালে আপনার হীন বেঁচে থাকার কোনো মনবাসনা এই মেঘালয়ার আর নেই।”
​শীর্ষ আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। পরম নিবিড়তায় মেঘকে আবারও নিজের বুকের গভীরে আগলে নিল। কতটুকু ভালোবাসলে একটা মানুষ আরেকটা মানুষের পরকালের সঙ্গী হওয়ার এমন ব্যাকুল আকুতি জানাতে পারে!​কিছু সময় এই নিঝুম নিস্তব্ধতায় নিরব থেকে শীর্ষ আলতো হাতে মেঘকে নিজের বক্ষপট হতে আলাদা করে দিল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে বলল,
​“এবার এই ভারী পোশাক ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে এসো, প্রিয়া। আমরা একসাথে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করব।”

মেঘ মাথা নেড়ে আলতো পায়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। ও ভেতরে ঢুকতেই শীর্ষ নিজের পরনের ভারী পোশাকটা ছেড়ে আরামদায়ক টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে নেয়। মেঘ ওয়াশরুমের কপাট খুলে বের হতেই শীর্ষ ওর দিকে সরাসরি না তাকিয়ে ধীরপায়ে ঢুকে অযু করে আসে। এরপর বর-কনে দুজন পাশাপাশি জায়নামাজ বিছিয়ে গভীর ধ্যানে নফল নামাজ আদায় করে। সালাত শেষে হাত তুলে রবের দরবারে তাদের এই নতুন পথচলার জন্য অশেষ কল্যাণ, শান্তি আর হেদায়েত কামনা করে।
​মুনাজাত শেষে জায়নামাজ গুটিয়ে রাখার সময় মেঘের মনে চেপে থাকা প্রশ্নটা আর আটকে রাখা গেল না। সে কিছুটা দ্বিধা আর মৃদু সংকোচ নিয়ে সুধাল,
​“আমার ওই কুৎসিত জন্মপরিচয়ের সবটা জানার পরও আপনি আমায় এভাবে আপন করে বিয়ে করে নিলেন, মেজর সাহেব?”

​মেঘের সেই করুণ প্রশ্নটা শীর্ষর কান অবধি পৌঁছাল। ও ধীরহাতে জায়নামাজ দুটো গুছিয়ে একপাশে রেখে মেঘের একদম কাছাকাছি চলে আসে। বিছানার কিনারায় বসা মেঘকে পরম মায়ায় পেছন থেকে নিজের চওড়া বুকে জড়িয়ে ধরে। মেঘের সুবাসিত চুলে নিজের মুখ গুঁজে হিমশীতল ও গভীর কণ্ঠে বলে,
​“তোমার জন্ম কিংবা অতীত পরিচয় নিয়ে এই শীর্ষ কারদারের বিন্দুমাত্র যায়-আসে না, মেঘালয়া। তুমি যেমনই হও না কেন, ঠিক তেমনই আমার। আকাশের ওই অপরূপ চাঁদের গায়েও তো কত কলঙ্ক জমা থাকে, তা বলে কি চাঁদের আলো কমে যায়? আমার রূপোলী চাঁদের গায়েও যদি সামান্য কলঙ্ক থাকে, তাতে আমার বা আমার ভালোবাসার কী-ই বা যায় আসে? এতে আমার কোনো সমস্যা নেই প্রিয়া, কারণ তোমায় আমার পাশে পেয়ে আমি আজ সত্যি বড্ড বেশি সুখী!”

​শীর্ষর মুখ থেকে উছলে পড়া এই অগাধ বিশ্বাসের বাণী শোনামাত্রই মেঘের দুই গাল বেয়ে টপটপ করে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এক অদ্ভুত সুখের হাহাকারে ওর পুরো অন্দরে তোলপাড় আর আন্দোলন শুরু হয়ে গেল! যুগে যুগে কি মানুষ আদেও এতটা নিঃস্বার্থ ও পবিত্র হতে পারে? এই যুগে সামান্য কারণে যেখানে ডিভোর্স আর সম্পর্কের বিচ্ছেদ অহরহ ঘটছে, অগণিত নিষ্পাপ সন্তানরা যেখানে অবহেলায় রাস্তায় পড়ে থাকছে। সেখানে এমন এক কঠিন জাঁদরেল আর্মির পুরুষ ওর জন্মকলঙ্ক আর পরিচয়কে এভাবে এক নিমেষে ধুয়ে-মুছে দিল! তবে কি ওর কপালটা সত্যি বড্ড রাজকপাল? ওর ভাগ্যলিপিতে কি এতখানি সুখ আর ভালোবাসা সহ্য হওয়া লেখা ছিল?

হাজারো ভাবনার কুণ্ডলী পাক খেতে লাগল ওর ছোট্ট মাথায়।
​শীর্ষর বুকে পিঠ ঠেকিয়ে থাকা মেঘের ওষ্ঠদ্বয় তখন আবেগ আর কান্নায় তিরতির করে কাঁপছিল। আর সেই কাঁপতে থাকা গোলাপ পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটো শীর্ষকে বড্ড বেশি আকর্ষণ করতে লাগল। মেজরের নিজের তপ্ত গলাটা কেমন যেন এক অজানা কামনায় ও ভালোবাসায় শুকিয়ে আসতে শুরু করেছে।
​শীর্ষ নিজের প্রখর গ্রে দৃষ্টি জোড়া মেঘের কাঁপতে থাকা ওষ্ঠাধরের ওপর স্থির রাখল। ওর ঘন নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। তীব্র এক আবদার প্রকাশ করে বড্ড গভীর ও মাতাল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
​“তোমার ওই মিষ্টি ওষ্ঠ দুটো সামান্য একটু ছুঁই, প্রিয়া?”
​শীর্ষর এমন সরাসরি ও আদিম আবদারের গভীরতা বুঝতে মেঘের এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। লজ্জায় আর পুলকে ও নিজের চোখ দুটো এক ঝটকায় শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। মেঘের দেহের থরথর কাঁপন আর মৌন আত্মসমর্পণ শীর্ষকে সবুজ সংকেত দিয়ে দিল।
​শীর্ষ আর এক মুহূর্তও কালবিলম্ব না করে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়ল মেঘের ওই নিটোল ওষ্ঠাধরে! পরম তৃষ্ণায় ধীরে ধীরে শুষে নিতে লাগল ওর সকল সুধা আর মিষ্টতা! সেই অপরূপ ভালোবাসার মিষ্টি স্পর্শ আর তপ্ততা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল উভয়ের শিহরিত তনুদেহের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে।​মেজর শীর্ষ কারদার তার অর্ধাঙ্গিনীকে নিজের গভীর বাঁধনে আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরে মাতাল কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠল,
​“ইউ আর মাই অনলি হ্যাপিনেস, ওয়াইফি!”

মিষ্টি ও গভীর মুহূর্তটি অবশেষে শেষাত্মক রূপ নিল। মেঘের নিটোল ললাটে নিজের তপ্ত ললাট ঠেকিয়ে ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুজন নিজেদের ধাতস্থ করার চেষ্টা করছিল। মেঘ ধীরে ধীরে নিজেকে শীর্ষর বাঁধন থেকে কিছুটা গুটিয়ে নিতে নিতে চোখ তুলে তাকায়। ওষ্ঠের কোণে এক চিলতে শয়তানি আর চপলতার হাসি ফুটিয়ে ধীরকণ্ঠে শুধায়,
​“মেজর সাহেব, আমার সাথে একস্থানে যাবেন?”
​শীর্ষ ওর ওমন অচেনা চাউনি আর সুর দেখে হালকা ভ্রু কুঞ্চিত করে জবাব দেয়,
“কোথায়?”
​“আপনাদের এই কারদার বাড়ির ঠিক পাশের বাসার ছগির আলী শেখের ওই মস্ত বড় আম আর জামরুল বাগানে!”
​শীর্ষ নিজের কপাল আরও গুটিয়ে বেশ অবাক হয়ে সুধায়,

মেজর কারদার পর্ব ২৫

“রাতদুপুরে ছগির আলীর বাগানে? হঠাৎ ওখানে কেন?”
​মেঘ নিজের সুবিন্যস্ত শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে গুঁজে নিয়ে, মুখে এক স্বর্গীয় বিদ্রূপের ভঙ্গি ফুটিয়ে রসিয়ে রসিয়ে বঙ্গভাষার ঢঙে বলল,
​“কেন আবার? চুরি করিতে, প্রাণসুধা! এই মধুচন্দ্রিমার পবিত্র ক্ষণে স্বীয় বর সহিত উড়িয়া আসিয়া জুড়ে বসিয়া, আমরা দুই চুরি করিব ওই ব্যাটা ছগির আলীর সুবিশাল ফলকাননের খণ্ডিত খণ্ডিত তরুতলের সুমিষ্ট ফলবিভাজিতিতে!”

মেজর কারদার পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here