লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩০
নুসাইবা আরা নুরি
-আমি হয়তো সত্যিই খারাপ রে।কারন আসলেই আমি ইরুকে ফোর্স করেছি আমাকে ভালোবাসার জন্য। তবে বিশ্বাস কর আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে ছিল না।কত তো দেখলাম এমন জোর করে ভালোবাসা তৈরি হয়।তাদের সুখের সংসার হয়।আমিও তো সেটা ভেবেই ভালোবেসেছিলাম ওকে।আর ও তো আমাকে কখোনো মুখ উচু করে কিছু বলেনি আগে যদি বলতো আজকের মতো বিশ্বাস কর আমি দ্বিতীয়বার ওর পথে কাটা হয়ে দাড়াতাম না।আমি কখোনো বুজতে পারিনি আমার ভালোবাসায় ও বিরক্ত হতো।
ফাহিমের চোখে পানি টলমল করছে।মেহেরাজ ফাহিমের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগে ফাহিম বলে,
-আমার ভিষন খারাপ লাগছে মেহেরাজ।বুকের বাম পাশ টা ভিষন জ্বালা করছে।এখন কিভাবে ভুলে থাকবো ওকে।নিজের কাজের ফাকে ফাকে ওর জন্য রাস্তায় গিয়ে দাড়াতাম।ওকে খুব ভালোবাসতাম।আমি বুজতে পারিনি আমি ভালোবাসা প্রকাশ করলে ওর ঘৃনার পাত্র হয়ে যাবো তাহলে কখোনোই ভালোবাসা প্রকাশ করতাম না।আমি তো ওকে ওই নরক থেকে মুক্ত করে খোলা আকাশে উড়াতে চাইছিলাম।
ফাহিম থামে টেবিলের উপর থেকে টিস্যু নিয়ে চোখের কোনে আসা পানিটা মুছে নেই।অনেক সময় পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে চলে যায় না চাইতেও ছেলেদের চোখে পানি এসে জমা হয়।মেহেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে কখপ্নো কোনো মেয়ের দিকে সেভাবে তাকায় নি।আর ভালোবাসেও নি।তাই এই কষ্ট টা মেহেরাজ কখোনো অনুভব করেনি।তবে ফাহিমের মতো মানুষের চোখে পানি দেখে তা বুজতে পেরেছে।মেহেরাজ শান্ত কন্ঠে বলে,
-নিজেকে শক্ত কর।তুই কিন্তু শক্ত।আর ছেলেদের চোখে পানি মানায় না সব সময় হৃদয়হীন কাঠের পুতুলের মতো থাকতে হয় নয়তো সমাজ খারাপ ভাব্বে শত্রুরা আঘাত করবে।তাই শান্ত হো।আমার কিছুই ঠিক মনে হলো না।একটা শান্ত মেয়ে হুট করে রেগে যাওয়ার অনেক কারন আছে।
-রাগের মাথায় সত্যি টা প্রকাশ পেয়ে যায়।
ফাহিমের কথায় মেহেরাজ নিজের ফোন উলটে ঘড়ির টাইম দেখে বলল,
-এই কথাটা সম্পুর্ন ভুল।রাগের মাথায় আমাদের এমন কিছু কথা মস্তিষ্কে আসে যেগুলো অপর প্রান্তের মানুষকে মানষিক ভাবে ভেঙে দিতে পারে।আর ইরুকে যতটুকু দেখেছি মেয়েটা চুপচাপ আজ রেগে যাওয়ার পিছনে রার মায়ের হাত ও থাকতে পারে।তাই কষ্ট না পেয়ে খোজ লাগা।এটা ভুলে যাস না।মেয়েরা সব সময় সব থেকে বেশি যাকে ভালোবাসে আপন মনে করে তাকেই বেশি আঘাত করে।হয়তো কথা গুলো ইরুর মনের কথা ছিলনা।
-কিন্তু।
-কোনো কিন্তু না।তুই এত বড় একজন এডভোকেট হয়ে খোজ খবর না নিয়ে নিজের মনে যা আসে তাই ধরে নি।ভালোবাসা কি ফেলনা।আর কিছু জিনিস সহজে না পেলে জোর করে আদায় করে নিতে হয়।এবার প্লান বি এপ্লাই করবো।
-মানে??
-আগে তুই খোজ লাগা তারপর কথা হবে।
ফাহিম মেহেরাজের কথায় নিজের মনটাকে কিছুটা শান্ত করলো।আসলেই ইরু তো এমন না তাহলে তার উপর কেনো এতো রাগ এতো অভিযোগ। ইরুকি কোনো সমস্যায়।ওর মা কি ওকে অন্য কোনো প্রেশার দিচ্ছে।ফাহিম আর মেহেরাজ উঠে গেলো কফি শপ থেকে।মেহেরাজ ফাহিম কে ভালো মতো বুজিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে নিজে চললো জুয়েলার্সের দোকানের দিকে।
ইরুকে বাড়ি অব্দি দিয়ে শ্রেয়সী নিজের বাড়ি ফিরেছে।অনেক কষ্টে ইরুর মন গলিয়েছে শ্রেয়সী। ইরু বাড়িতে এসে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়।সোফায় বসে চা খাচ্ছে শ্রেয়সীর ভাই সিয়াম।প্রায় আসে তাদের বাড়ি।ইরুকে যেতে দেখে সিয়াম পা থেকে মাথা অব্দি দেখলো খুটিয়ে তারপর পিছন থেকে ডেকে বলল,
-ইরু শ্রেয়সী কি বাড়িতে চলে গেছে??
সিয়ামের কথায় রোকেয়া ও রাকায় ইরুর দিকে।ইরুর পা থেমে যায়।ইরু ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,
-জ্বি??
-আজ কি তাড়াতাড়ি ছুটি দিলো স্যার??
-জ্বি।
সিয়াম আর কিছু বলে না।ইরু ও হাফ ছেড়ে বাচে।ইরু ঘরের ভিতর গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।তারপর দরজা ঘেষে বসে নিঃশব্দে কেদে ফেলে।বুকের ভিতর তীব্র ব্যাথা।এ ব্যাথা ইরু সহ্য করতে পারছে না।কিভাবে এতো খারাপ কিভাবে হলো সে।এতটা পাষান।ছোট থেকে কারোর আদর ভালোবাসা না পেয়ে একা একা বড় হওয়ার পর একটা মানুষ তাকে বিনা স্বার্থে ভালোবাসলো।আর আজ তাকেই সব থেকে বড় আঘাত টা দিলো ইরু।কিভাবে।কিভাবে পারলো সে।সে তো সত্যিই লোকটাকে ভালোবাসে।তাহলে কেন বললো বাসেনা।কেন কষ্ট দিলো।তার ভাইটাকে বাচাতে গিয়ে একজন৷ ভালো মানুষের মনে কষ্ট দিলো আল্লাহ কি তাকে মাফ করবে।
ইরু ফুফিয়ে কেদে উঠে বুকের ভিতর অসম্ভব পিড়া দিচ্ছে।কেমন দোম বন্ধ লাগছে ইরুর।পুরো রাস্তা টা শ্রেয়সীর সামনে নিজের কষ্টটা প্রকাশ করবে না বলে কতটা শক্ত থেকেছে সেটা শুধু ইরু জানে।কিন্তু এখন আর পারছে না খুব কষ্ট হচ্ছে ইরুর। খুব।ইরু উঠে বিছানার কাছের টেবিলে ঘাড়ে থাকা ব্যাগ টা রেখে বিছানায় সুয়ে ফুফিয়ে কেদে উঠে।অভাগা মেয়েদের জীবন হয়তো সারাজীবন ই কষ্টে কাটে।
সকাল সকাল তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে সিয়াম।আজ শহরের বাইরে কি কাজ আছে ঢাকা যেতে হবে ওকে।ফিরতে এক সপ্তাহ খানেক লাগবে।যদিও কথাটায় সবার মতে তোহার মন খারাপ হএয়ার কথা কারন হুট করে কিছু না বলে স্বামি চলে যাওয়ার পর যখন যানে এক সপ্তাহ পর ফিরবে তখন খারাপ তো লাগবেই।
সিয়াম তোহার কান্না দেখে বুকে জড়িয়ে অনেক বুজিয়ে তাই বিদায় নিয়েছে।তবে বলে যায়নি কি কাজ।সিয়ামকে যদিও তোহা জিজ্ঞাসা করেছে তবে সিয়াম কিছু বলেনি শুধু বলেছে সারপ্রাইজ আছে।তাই তোহা আর কথা বাড়াই নি।সিয়াম চলে যেতেই তোহা ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়।এখোনো বাড়ির সকলে ঘুমাচ্ছে।সিয়াম গাড়িতে উঠে ফোন দেওয়ার পর তোহা সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
শাড়ির আচল টা কোমরে গুজে।আলমারি খুলে একদম নিচের তাকে রাখা তার পুরোনো ল্যাগেজ টা বের করে। তারপর বিছানার উপর রেখে সাবধানে চেন খুলে নিজের ল্যাপটপ টা বের করে।যেহেতু সিয়াম বাড়ির কোনো জিনিস ঘাটাঘাটি করে না তাই তোহার সকল জিনিস লুকিয়ে রাখতে বেশ সুবিধা হয়।আর সিয়াম যেহেতু জানে তোহা খুব বেশি লেখা পড়া যানে না এস এস সি পাশ শুধুমাত্র তাও ডি গ্রেট এ।তাই সকল কাগজ গুলো ও তালে দেয় যাতে সে যত্নে রেখে দেয়।
তোহা ল্যাপটপ ওপেন করে। তারপর চার্জে বসায়।অনেকদিন না চালানোর ফলে চার্জ শেষ। তোহা উঠে দ্বিতীয় আলমারি টা খোলে।তারপর পারসোনাল লকার খুলতে গিয়ে হয় বিপত্তি কারন।এই লকার সিয়ামের।তোহা কখোনো যানতে চাইনি এতে কি আছে কারন তোহা জানে এতে এমন কিছু আছে যা সিয়াম কাওকে জানাতে চাই না।
তোহা অনেক খুজে আগে বানিয়ে রাখা বাড়ির প্রতিটা যায়গার প্রতিটা জিনিসের নকল চাবির রিং টা থেকে লকারের নকল চাবি দিয়ে লকার খোলে।খুলতেই তোহা চোখ বড় বড় হয়ে যায় সাথে সাথে।
তোহা হাতএ হ্যান্ড গ্লাভস পরে ফোন দিয়ে আগে ছবি তুলে নিলো তার পর হাত বাড়িয়ে টাকা গুলো ছুয়ে দেখে।লকার এ দুইটা থাক।প্রথম টাই সব এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিল।তার পরের থাকে অনেক গুলো কাগজ দলিল পত্র।তোহা টাকা গুলো থেকে চোখ সরিয়ে দলিল পত্রের নিচের ডয়ার টা খুললো।সেখানেও কয়েকটা কাগজ।আর একটা চাবি।তোহা চাবিটা হাতে তুলে পরখ করে বুজে এটাও কোনো লকার এর চাবি।তোহা সব জিনিস একই ভাবে ঠিক করে রেখে চাবি টা নিয়ে নেয়।পুরো আলমারির কোনায় কোনায় খুজে পুরো ঘর তল্লাসি করে কিছু পায় না।তবে সিয়ামের পাঞ্জাবির পকেটে একটা চাবি পায়।সেটায় তোহার সন্দেহ আবার বাড়ে।কারন চাবি গুলো নতুন আগে কখোনো এমন ডিজাইন এর চাবি তোহা দেখেনি।
তোহা খুজতে খুজতে হটাৎ তার বক্স খাটের কথা মনে হতেই।সব সরিয়ে বক্স খাটের মেট্রেস তুলে ফেলে কাঠের ঝাড়ন টাও তুলে ফেলে নিঃশব্দে। তোহার সন্দেহ আবার খেটে যায়।বিছানার মাঝখানে একটা বাক্স।তোহা প্রথম পাওয়া চাবিটা লাগালে তালা খুলে না।পরের টা দিতেই তালা খুলে যায়।তোহা আস্তে করে বাক্সের মুখ টা খুলতেই আবারো অবাক হয় টাকা দেখে।একটা মুদি ব্যবসায়ী এত টাকার মালিক।আর টাকা যদি থাকেও তাহলে ব্যাংকে না রেখে এখানে কেন।তোহা টাকার ভাযে কয়েকটা কাগজ পায়।কিছুর বাইনারি কোড লেখা।তোহা মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে নেয় কাগজ টার তারপর সব খুজে আরো কিছু পাওয়ার আশায়।না পেয়ে যেটা যেভাবে ছিলো সেটা সেভাবে রেখে আবার বিছানা ঠিক করে দেয়।
সব ঠিক ঠাক করে আলমারির ডয়ারে পাপ্যা চাবিটা হাতে নিয়ে তোহা পুরো বাড়ির সব তালার সাথে মনে মনে মিলাতে থাকে।তখনই মনে পড়ে।সিয়াম প্রায় সময় তার শশুরের ঘরে যেতো।আর যেদিন যেতো সেদিন ই সিয়ামের শহরের বাইরে কাজ পড়ে যেতো।তোহার মনে খটকা লাগ্লেও তা নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি।কিন্তু সে তো তার শশুরের ঘরের আলমারির লকারের চাবি বানাতে পারেনি।তাহলে এটা নয়তো।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৯
তোহা জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন থেকে একটু আগে তোলা বাইনারি কোড গুলো ইভান কে ম্যাসেজ করে দিয়ে টাকা গুলোর ছবি তুহিনের কাছে পাঠালো।এখোনো পাকাপোক্ত কোনো প্রমান পাইনি সে।কিন্তু মনে মনে শশুরের ঘরে যাওয়ার প্লানিং বানিয়ে ফেলে।যা করার আজ রাতেই করবে।তার মিশন এই সাত দিন এই শেষ করতে হবে যে ভাবেই হোক।
