নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪০
রূপন্তী সরকার
পরের দিন….
সকালে পুরো রায়ান কুঞ্জ জুড়ে একটা নতুন ব্যস্ততা শুরু হলো। রিদ আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। ও নিজে উদ্যোগ নিয়ে মিহি, রুহি, শুভ্র, মুগ্ধ আর জ্যোতিকে সাথে করে ওহিদুলের বাড়িতে গেল। ওহিদুল তো আগে থেকেই মনে মনে ইয়াশফাকে নিজের বাড়ির বড় বউ করার জন্য এক পায়ে রাজি ছিল, ওর বিন্দুমাত্র কোনো আপত্তি ছিল না। আর ইউভান এই বিয়ের খবর শুনে যেন হাতে চাঁদ পেল, ও তো খুশিতে এক পায়ে খাড়া। দুই পরিবারের বড়রা মিলে বসল আী সাচ্ছন্দ্যে বিয়ের সব কথাবার্তা আর দিনক্ষণ একদম পাকা করে ফেলল।
ওহিদুলের বাড়ি থেকে ফিরে এসে মিহি আর রুহিরা আর ঘরে বসে থাকল না। হাতে মাত্র সাতটা দিন সময়, তাই ওরা সবাই মিলে এক কাপড়ে ঝটপট বাজারের দিকে রওনা হলো বিয়ের মস্ত বড় শপিং করার জন্য। বাড়ির ছোট-বড় সবাই শপিংয়ে মেতে উঠলেও ইয়াশফা আর রাহা এই দুজন কিন্তু ওদের সাথে গেল না, ওরা বাড়িতেই রয়ে গেল।
ইয়াশফা না যাওয়ার কারণ ওর এই কেনাকাটা বা নতুন বিয়ে নিয়ে মনে বিন্দুমাত্র কোনো আগ্রহ নেই। ও যা কিছু করছে, ওই আড়ালে থাকা বেয়াদব ঋষভটাকে একটা চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য রিদের সাথে মিলে এই সাত দিনের বিয়ের নিখুঁত নাটক সাজিয়েছে। আর রাহা না যাওয়ার কারণটা ছিল একদম অন্যরকম। ও বিগত দু-তিন বছর ধরেই চুপচাপ আর একা একা থাকে, কারো সাথে ও সহজে মেলামেশা করে না। অথচ আগে রায়ান কুঞ্জের পরিস্থিতি এমন ছিল না। তখন রাহা আর ইয়াশফা দুজন একসাথেই প্রথমবার গর্ভবতী হয়েছিল এবং ওদের দুজনের বাচ্চাই এক সময়ে এই পৃথিবীতে আসার কথা ছিল।
সেই আগের দিনগুলোতে মুগ্ধ রাহাকে এক ফোঁটাও মেঝের মাটিতে পা রাখতে দিত না। ও নিজের হবু সন্তান আর স্ত্রীর প্রতি এতটাই অন্ধ ছিল যে পারলে চব্বিশ ঘণ্টা বউয়ের পেটের ওপর মুখ গুঁজে চুমু খেতো, আগলে রাখত ওকে। কিন্তু একদিন রাহা জেদ ধরল যে ও বাপের বাড়ি বেড়াতে যাবে। মুগ্ধ প্রথমে এই শরীরের অবস্থায় ওকে গ্রামে পাঠাতে রাজি ছিল না, কিন্তু রাহার লাগাতার জেদ আর কান্নাকাটির কাছে শেষমেশ ও হার মানল। ও নিজে গাড়ি চালিয়ে রাহাকে ওদের গ্রামের বাড়িতে রেখে এলো।
গ্রামে গিয়ে রাহা যখন ওর নিজের মাকে এই প্রেগন্যান্সির সুখবরটা দিল, তখন ওর মা খুশি হওয়া তো দূর, উল্টো চোখ বড় বড় করে কড়া গলায় ধমকে উঠে বললেন,
“তুই কি পাগল হয়েছিস রাহা? এই অল্প বয়সে এখনই কেন পেটে বাচ্চা নিয়ে বসে আছিস?”
রাহা মায়ের এই বিরক্তি দেখে একটু দমে গিয়ে বলল, “কেনো মা? এখন না নিলে পরে যদি কোনো সমস্যা হয়, আর যদি কোনোদিন মা হতে না পারি?”
রাহার মা মেয়ের মাথায় একটা বারি দিয়ে বললেন, “কে বলেছে হবে না? বাচ্চা হওয়া কোনো ব্যাপার হলো? তুই বড্ড বোকা রাহা, পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা কর। এখন তোর ওই জা, মানে ইয়াশফারও তো এক সময়ে বাচ্চা হচ্ছে। চৌধুরী বাড়ির সবাই তো এখন ওই মেয়েকে নিয়েই দিন-রাত ব্যস্ত থাকবে, তোকে কেউ এক পলক চোখ তুলেও দেখবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা তোর পেটের এই প্রথম বাচ্চাটা যদি শেষমেশ মেয়ে হয়, তখন কী হবে? মেয়ে হলে তুই কি ওই বাড়ির সম্পত্তির অংশ দাবি করতে পারবি? তার চেয়ে ভালো, এখন এই ঝামেলা শেষ কর। পরে ধীরেসুস্থে যখন ছেলে বাচ্চা নিবি, তখন দেখা যাবে।”
মায়ের এই লোভী আর কুৎসিত বুদ্ধি শুনে রাহার নিজের মাথাটাও ঘুরে গেল। ও ওর মায়ের পাতা ফাঁদে পা দিল। ওর মা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে পরের দিন সকালেই রাহাকে নিয়ে গ্রামের একটা ছোট একটা হসপিটালের দিকে গেল। সেখানে ওরা ডাক্তারদের টাকার লোভ দেখিয়ে গোপনে রাহার পেটের ওই সুস্থ বাচ্চাটা নষ্ট করিয়ে নিয়ে এলো। কিন্তু ওরা বড় একটা ভুল করে ফেলেছিল। ওই আনাড়ি হাসপাতালের ডাক্তাররা তাড়াহুড়ো করে গর্ভপাত করতে গিয়ে ভুলবশত রাহার জরায়ু আর ভেতরের নরম টিস্যুগুলো কেটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলেছিল। যার কারণে রাহার শরীরের ভেতরের প্রজনন ক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। ও যে জীবনে আর কোনোদিন মা হতে পারবে না
এই কথাটা শুরুতে বিন্দুমাত্র জানত না। বাচ্চা নষ্ট করে রাহা যখন রায়ান কুঞ্জে ফিরে এলো, তখন থেকেই ওর অনবরত মাথা ঘুরত, শরীর বড্ড বেশি দুর্বল আর ফ্যাকাশে লাগত। রাহার এই ভাঙা শরীর দেখে মুগ্ধ আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ওদের ডাক্তারকে বাড়িতে ডেকে আনল। ডাক্তার এসে রাহাকে খুব ভালো করে পরীক্ষা করল। ওর পরীক্ষা শেষ হতেই ডাক্তারের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। ও মুগ্ধকে আড়ালে ডেকে কড়া আর স্পষ্ট গলায় বলল, ” আপনার স্ত্রীর পেটের বাচ্চাটা আর নেই, ওটা মারা গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা বাচ্চাটা কোনো স্বাভাবিক কারণে নষ্ট হয়নি, ওনাকে কোনো ভুল ওষুধ খাইয়ে বা জোরাজুরি করে গর্ভপাত করিয়ে বাচ্চা মেরে ফেলা হয়েছে! আর এই ভুল চিকিৎসার কারণে ওনার ভেতরের অর্গানগুলো এতটাই ড্যামেজ হয়ে গেছে যে উনি জীবনে আর কোনোদিন মা হতে পারবেন না।”
ডাক্তারের এই হাড়হিম করা কথা শোনা মাত্রই মুগ্ধর পায়ের তলার মাটি এক সেকেন্ডে সরে গেল। ও ওখান থেকেই একছুটে রাহার ঘরে গেল। ও রাহার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে রুক্ষ আর কড়া গলায় লাগাতার চাপ দিতে লাগল সত্যিটা জানার জন্য। মুগ্ধর ওই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে রাহা আর নিজের পাপ লুকাতে পারল না, ও কাঁদতে কাঁদতে ওর মায়ের দেওয়া সেই সম্পত্তির লোভ আর বাচ্চা নষ্ট করার পুরো সত্যিটা এক এক করে স্বীকার করে ফেলল।
নিজের স্ত্রীর মুখে এই জঘন্য আর নিষ্ঠুর সত্যিটা শোনা মাত্রই মুগ্ধর মনের ভেতরের রাহার প্রতি থাকা সমস্ত ভালোবাসা এক পলকে তীব্র ঘৃণায় বদলে গেল। ও নিজের দাঁতে দাঁত চেপে ওখান থেকেই রাহার সাথে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে দিল। আজ দীর্ঘ ২টি বছর হয়ে গেছে, মুগ্ধ রাহার সাথে এক রুমে তো দূরের কথা, ওর সাথে মুখে একটা কথাও বলে না। ও রাহাকে এক আস্ত জ্যান্ত লাশ বানিয়ে ঘরের এক কোণায় ফেলে রেখেছে। রাহা আর কোনোদিন মা হতে পারবে না এই চরম সত্যটা ও এখন প্রতিটা মুহূর্তে নিজের হাড় দিয়ে টের পায়। ও নিজের মায়ের ওই নোংরা বুদ্ধি শোনার জন্য দিন-রাত একলা ঘরে বসে অঝোরে চোখের পানি ফেলে আর আফসোস করে। ও কতবার মুগ্ধর পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছে, কেঁদে কেঁদে নিজের ভুল স্বীকার করেছে, কিন্তু মুগ্ধর ওই পাথরের মতো শক্ত মন ও আজ দু বছরেও এক ফোঁটা গলাতে পারেনি। ও নিজের ভুলের শাস্তি একলা ঘরে বসে ভোগ করছে।
তো এই হলো রাহার বর্তমান অবস্থা। বাড়ির সবাই এই সত্যিটা জানার পর থেকে রাহার সাথে একদম কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। অভ্র তো রাহার মুখ পর্যন্ত দেখতে চায় না, আর তিথিও ওকে নিজের ঘৃণার তালিকায় ফেলে দিয়েছে। কিন্তু এই পুরো বাড়িতে একমাত্র ইয়াশফাই এখনো রাহার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলে। যদিও মুগ্ধ ইয়াশফাকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছে, “ইয়ানকে যেনো ভুলেও রাহার ধারে কাছে না নেওয়া হয়। এই লোভী মহিলা নিজের স্বার্থের জন্য যেকোনো সময় ট্যাও এর বড় ক্ষতি করে বসবে।”
ইয়াশফা অবশ্য মুগ্ধর কথা গুরুত্ব দেয়নি। মুগ্ধ নিজে ট্যাওকে জান দিয়ে ভালোবাসে। ওর নিজের কোনো সন্তান নেই, তাই ট্যাও-ই ওর দুনিয়া। আর বাইরের সব মানুষও জানে মুগ্ধ আর রাহার ছেলোই হলো ট্যাও। ইয়াশফার যে নিজের বাচ্চা হয়েছে, এই আসল সত্যিটা রিদ আজ পর্যন্ত বাড়ির বা বাইরের কাউকেই জানতে দেয়নি।
ইয়াশফা ইয়ানকে কোলে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল রাহার ঘরের দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই রাহা ইয়াশফাকে দেখে চোখের পানি মুছে বড্ড আকুল গলায় বলল, “তুই এসেছিস? আয় পাখি, বস।”
ইয়াশফা ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ইয়ানকে নিয়ে রাহার পাশেই বসলো। এরপর ইয়ানকে বিছানায় শোয়াতেই ইয়ান শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। রাহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ও তাড়াহুড়ো করে ঝুঁকে পড়ে ইয়ানের কপালে আর গালে টুপ টুপ করে কয়েকটা চুমু খেল। ও বাচ্চাটার গায়ের ওই নিষ্পাপ মিষ্টি গন্ধটা নিজের বুকের ভেতর টেনে নিয়ে নিলো৷ এটপর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। রাহার এই বুকফাটা কান্না দেখে ইয়াশফা ওর কাঁধে একটা হাত রাখল। ও রাহাকে শান্ত করার জন্য নরম গলায় বলল, “কেঁদো না আপু। যা হয়েছে, ওটা তোমার ভাগ্যেই লেখা ছিল, তাই হয়েছে। এখন কেঁদে আর কী হবে?”
রাহা ওর কথা শুনে আরও বেশি ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “ভাগ্যের দোহাই দিস না। আমি… আমি নিজেই এক পাপিষ্ঠ নারী। যে নিজের লোভের জন্য, নিজের মায়ের কথায় অন্ধ হয়ে নিজের হাতে নিজের জ্যান্ত সন্তানকে মেরে ফেলেছে! এই জঘন্য পাপের জন্যই আজ আল্লাহ আমার কপাল থেকে চিরতরে সন্তানের সুখ কেড়ে নিয়েছে। আমি এই শাস্তিরই যোগ্য।”
ইয়াশফা রাহার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বলল, “একদম চুপ করো আপু। এসব ফালতু কথা আর মুখে এনো না। এই যে আমাদের ইয়ান আছে না? ও তো তোমারও ছেলে। তুমি ওর আরেক মা।”
রাহা ইয়াশফার এই কথা শুনে ভয়ে নিজের হাত দুটো টেনে নিল। ও মাথা নেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “না না, ভুলেও এই কথা বলিস না! আমার মতো অলক্ষী আর পাপী মানুষের নজর লাগলে বাচ্চার ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি তো ওর ছায়াও মাড়ানোর যোগ্য না, মা হওয়া তো অনেক দূরের কথা।”
ইয়াশফা এবার আর কোনো কথা শুনল না। ও এক হ্যাঁচকা টানে রাহাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ও রাহার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বড্ড মায়া মাখা গলায় বলল, “না আপু, তুমিই ওর আরেক মা। আর একটা কথা সবসময় মনে রাখবে মা কখনো নিজের সন্তানের জন্য অলক্ষী বা অশুভ হতে পারে না। মা তো মা-ই হয়, তার কোনো বিকল্প নেই।”
ইয়াশফার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়ে রাহা ওর বুকে মুখ গুঁজে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল। অতীতে ও এই মেয়েটাকে কত হিংসা করেছে, হিংসার বশে মাসের পর মাস ওর সাথে একটা মুখে কথাও বলেনি। অথচ আজ যখন পুরো বাড়ি ওকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, তখন এই মেয়েটাই ওকে কতটা ভালোবাসছে, নিজের সন্তানের মায়ের আসন দিচ্ছে! রাহা ইয়াশফার পিঠে নিজের হাতটা রেখে কান্নাভেজা গলায় বলল, “তোর অনেক ভালো হোক পাখি। অনেক সুখী হ তুই তোর এই নতুন জীবনে। ওপরওয়ালা তোকে দুনিয়ার সব আনন্দ দিক!”
ইয়াশফা রাহার এই মন থেকে দেওয়া দোয়ার কথা শুনে নিজের ঠোঁটের কোণে হালকা একটু রহস্যের হাসি হাসল। ও মনে মনে বলল “নতুন জীবন তো শুরু হবেই আপু, তবে বরটা বদলাবো না হেহে বরের হাতে হারিকেন হোগায় বাঁশ দেওয়াটা বাকি”
আজকে ইয়াশফার আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার দিন। ঝুম বৃষ্টির পর সন্ধ্যার দিকে রায়ান কুঞ্জের পুরো ড্রয়িংরুমটা এক রাজকীয় আলোয় সেজে উঠল। বাড়ির ছোট-বড় সবাই এসে ড্রয়িংরুমে জড়ো হলো। ইউভান এই বিশেষ দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাজার থেকে একাই কয়েকটা চমৎকার থিমের কেক নিয়ে এসেছে।
একটা বিশাল টেডিবিয়ার থিমের কেক, একটা নতুন জীবনের শুরুর মতো বিয়ের থিমের কেক, আর পুচকে ট্যাও-এর জন্য একটা সুন্দর গাড়ির থিমের কেক আরও অনেকগুলো কেক পুরো টেবিল জুড়ে সাজানো। সবগুলো কেক আসলে ইয়াশফা আর ট্যাও একসাথে মিলেই কাটবে। ইয়াশফার এসব ঘটা করে পালন করা এক ফোঁটাও পছন্দ করে না, ভেতর ভেতর ও ভীষণ বিরক্ত হচ্ছিল। কিন্তু রিদের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং ওর কথার মান রাখতে ও নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষমেশ রাজি হয়ে গেল।
আজকে আবার ওহিদুল আর রিদের কথা মতো এনগেজমেন্টও হওয়ার কথা, যার কারণে দুই পরিবারের পছন্দের আংটিও একদম সাজিয়ে রেডি করে রাখা হয়েছে। ড্রয়িংরুমের কোণায় মিউজিক চালু হতেই জন্মদিনের মূল উৎসব শুরু হলো। ইয়াশফা ইয়ানকে সাথে নিয়ে এক এক করে সবগুলো কেক কাটল। কেক কাটার পর ও হাসিমুখে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মিহি, রিদ, রুহি আর ইউভানসহ বাড়ির সবাইকে ডেকে ডেকে নিজের হাতে কেক খাইয়ে দিল। কিন্তু সবাই যখন ওকে কেক খাওয়াতে গেল, ও একটু ও মুখে তুলল না। ও নিজের ওড়না দিয়ে মুখটা চেপে ধরে বলল ওর নাকি কেমন যেন বমি বমি ভাব লাগছে, শরীরটা ভারী লাগছে।
কেক কাটার এই মিষ্টি পর্ব শেষ হতেই ড্রয়িংরুমে এনগেজমেন্টের মূল প্রস্তুতি শুরু হলো। ইউভান হাসিমুখে নিজের পকেট থেকে দামী আংটির লাল বক্সটা বের করল। ঠিক তখনই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুট করে পুরো রায়ান কুঞ্জের মেইন পাওয়ার সাপ্লাইয়ের কারেন্ট চলে গেল! চারদিকের সব আলো নিভে এক সেকেন্ডে পুরো বাড়ি একদম ঘুটঘুটে আর হাড়হিম করা অন্ধকারে ঢেকে গেল। চারদিকে একটা হইচই পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। কিন্তু ঠিক দুই মিনিটের মাথায় করিডোর দিয়ে জেনারেটরের আলো আবার ফিরে এলো।
আলো আসতেই ইয়াশফা নিজের হাতের দিকে তাকাতেই নিথর হয়ে থমকে গেল। ও দেখল ওর একটা আঙুলে অলরেডি হিরের একটা আংটি পরানো হয়ে গেছে! ইয়াশফা একটু অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে ইউভানের দিকে তাকাল। ইউভান তখন নিজের বক্স থেকে আনা আংটিটা ওর আঙুলে পরাতে যাবে, ঠিক তখনই ওর নজর গেল ইয়াশফার হাতের দিকে। ও চমকে উঠে নিজের চশমাটা ঠিক করতে করতে ইয়াশফাকে বলল, “উমম এই আংটিটা কোত্থেকে আসলো বেবিগার্ল? এটা তো এতক্ষণ তোমার এই হাতে ছিল না! এই দুই মিনিটের অন্ধকারে এটা কে পরালো?”
ইয়াশফা এক সেকেন্ড চুপ করে রইল। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এত কড়া সিকিউরিটি ফাঁকি দিয়ে ঘরে ঢুকে এই নিখুঁত জাওড়ামিটা আসলে কে করে গেছে, সেটা বুঝতে ওর এক ফোঁটাও সময় লাগল না। ও নিজের ভেতরের কাঁপন আর এক চিলতে শয়তানি হাসিটা কোনোমতে চেপে রেখে ইউভানকে স্বাভাবিক গলায় বলল, “ছিল, আপনি হয়তো খেয়াল করেননি। আংটি পরাবেন তো, পরান।”
ইউভান আর ওভাবে কথা বাড়াল না, ও ইয়াশফার অন্য হাতের একটা আঙুলে নিজের আনা আংটিটা আলতো করে পরিয়ে দিল। এবার ইয়াশফা যখন নিজের হাত বাড়িয়ে ইউভানকে আংটি পরাতে যাবে, ও বক্সের দিকে তাকিয়ে দেখল ইউভানের জন্য রাখা আংটিটাই উধাও! ওখানেই আংটিটা নেই। একদিকে আংটি চুরি, অন্যদিকে শরীরের ভেতর তীব্র বমি বমি ভাব আর মাথা ঘোরা
সব মিলিয়ে ইয়াশফা হুট করেই কেমন যেন বেশি অসুস্থ হয়ে বেঞ্চের ওপর ঢলে পড়ল। ওর এই অবস্থা দেখে রিদ সোফা থেকে জলদি উঠে এসে কড়া আর গম্ভীর গলায় বলল, “যা হয়েছে হোক, বাদ দাও। আজ আর এনগেজমেন্টের কোনো দরকার নেই। চারদিকের পরিস্থিতি ভালো ঠেকছে না, আগামী সপ্তাহে আমি একবারে বিয়ে দিয়ে দেবো।”
ইউভানও আর কোনো জোরাজুরি না করে চুপচাপ মাথা নাড়ল।
ওদিকে বাড়ির বাইরে লনের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে একটা বড় গাছের আড়ালে একা দাঁড়িয়ে আছে ঋষভ। রাগে ওর পুরো হাত-পা থরথর করে কাঁপছে, চোখের মণি দুটো লাল হয়ে গেছে। ওর মুখের চোয়াল রাগে এত শক্ত হয়ে গেছে যে দাঁত কিড়মিড়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সবাইকে কাচা খেয়ে ফেলবে। বউকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে ওর? এতো বড় সাহস? ওর বউকে অন্য কেউ আংটি পরালো?
ও নিজের হাতের মুঠোয় থাকা ইউভানের ওই টেবিল থেকে চুরি করে আনা আংটিটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো ড্রেনে। রাগে ফুসতে ফুসতে বরফ শীতল কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল
“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু আর কেউ না আমার নিজের আপন বাপ! আমার দুনিয়ার সব শত্রু একদিকে, আর আমার বাপ আরেকদিকে। আমার চালের ওপর আরেক চাল চালছে! আমার অগোচরে, আমার চোখের সামনে আমার বউকে অন্য একটা পুরুষের সাথে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে?! আমি একবার শুধু ফিরি… পাপা, তোমাকে আর তোমার এই বেয়াদব বউমাকে আমি কাঁচাই খেয়ে ফেলব! তোদের এই বিয়ের নাটকের বারোটা আমি বাজাবো!”
গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ঋষভ যখন রাগে ফুসছিল, ঠিক তখনই ওর পাশে থাকা একজন বডিগার্ড অত্যন্ত নিচু স্বরে বলে উঠল, “বস, উড়িয়ে দেবো ওই ডাক্তার ইউভানকে? রায়ান কুঞ্জের সবকিছু জ্বালিয়ে দিয়ে ম্যামের এই বিয়ে দেওয়ার ভূত এক সেকেন্ডে নামিয়ে দিই?”
ঋষভ নিজের ব্ল্যাক হুডিটা টেনে মাথাটা আরও ভালো করে ঢেকে নিল। ওর চোখের মণি দুটো অন্ধকারের মাঝেও তীব্র হিংস্রতায় জ্বলজ্বল করে উঠল। ও নিজের ঠোঁটের কোণে এক ক্রূর হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল, “না! ওর বিয়ে করার খুব শখ হয়েছে না? করুক! আমিও একটু দেখতে চাই ও এই বিয়েটা কীভাবে সম্পূর্ণ করে। আমার ওর ওপর পুরো বিশ্বাস আছে, ও কোনোদিন এই বিয়েটা করবে না। ও নিজের শুধু আমাকে আড়াল থেকে টেনে বের করার জন্য কতো দূর পর্যন্ত চাল চালতে পারে, সেটাই আমি দেখতে চাই।”
গার্ডটা একটু ইতস্তত করে কপালে হাত দিয়ে বলল, “কিন্তু স্যার… ম্যাম যদি সত্যিই ওই ডাক্তারকে বিয়ে করে নেয়, তখন কী হবে?”
‘বিয়ে করে নেয়’ শব্দটা কান পর্যন্ত পৌঁছানো মাত্রই ঋষভের পুরো শরীর রাগে এক সেকেন্ডে শক্ত হয়ে গেল। ও গার্ডের কলারটা এক হাত দিয়ে খামচে ধরে হিসহিসিয়ে হুংকার দিয়ে বলল, “ওর সেই ক্ষমতা বা সাহস কোনোটিই নেই! ও অন্য কারো হওয়ার আগেই ওর কলিজা আমি নিজের হাতে কেটে নিয়ে আসব। আর শোনো যে পুরুষ আমার বউকে বিয়ে করার সাহস দেখাবে, তার ও ওই মেইন পয়েন্ট এক টানে ছিড়ে এনে আমি আমার সিংহর মুখের সামনে ছুঁড়ে দেবো!”
ঋষভ বডিগার্ডকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে নিজের গায়ের হুডিটা একটু ঝেড়ে নিল। ও শান্ত গলায় আবার বলল, “তোরা এখন এখান থেকে যা। আমি এখন ঘরের ভেতরে যাবো। আমার বউকে কেক খাওয়াতে হবে। ডাইনিং টেবিলে সবার সামনে নিজে খেল না, শুধু আমার হাতে কেক খাবে বলে নাটক করলো”
বডিগার্ডের লোকগুলো ওখান থেকে চোখের পলকে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল। ওরা চলে যেতেই ঋষভ নিজের সাথে আনা একটা কেকের বক্স হাতে নিয়ে নিঃশব্দে, বিড়ালের মতো পায়ে রায়ান কুঞ্জের পাইপ বেয়ে সোজা ইয়াশফার ঘরের বারান্দা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। ঘরে ঢুকে ও খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই একটু অবাক হলো। ও দেখল বিছানার মাঝখানে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে পুচকে ইয়ান, আর ওর ঠিক পাশেই ইয়াশফা গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে।
ঋষভ নিজের মনে মনে একটু ভাবল মুগ্ধর ছেলে সবসময় ইয়াশফার কাছেই থাকে, এটা ও সোর্সের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল।
কিন্তু তাই বলে এই মাঝরাতেও ও ইয়াশফার কাছেই ঘুমায়? ও কি একটুও কান্না করে না? সাধারণত ছোট বাচ্চারা নিজের জন্মদাত্রী মাকে ছাড়া অন্য কারো কাছে ওভাবে থাকতে চায় না। অথচ মুগ্ধর নিজের বাচ্চা রাহার কাছে না থেকে সারাক্ষণ ইয়াশফার সাথেই চিপকে থাকে, এটা কেমন অদ্ভুত বিষয়!
ঋষভ আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামাল না। ও ধীরপায়ে খাটের ওপর ঝুঁকে পড়ল। সমস্ত হাহাকার ভুলে ও ইয়াশফার নরম বুকে আর ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে গভীর একটা চুমু খেল। ও ওভাবে ঝুঁকে থাকা অবস্থাতেই পাশে শুয়ে থাকা ইয়ান হুট করে একটু নড়েচড়ে উঠল। ঋষভ আর নিজেকে সামলাতে না পেরে পুচকে ইয়ানের কপালেও আলতো করে একটা ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। কিন্তু চুমুটা দেওয়ার পরেই ঋষভ এক মস্ত বড় আজব জিনিস খেয়াল করল। মুগ্ধর এই বাচ্চাটা দেখতে একদম হুবহু ওর নিজের মতো হয়েছে! ওর ওই তীক্ষ্ণ নাক, চওড়া কপাল আর চোখের চাউনি যেন একদম ঋষভের ছোটবেলার কার্বন কপি। এটা কীভাবে সম্ভব?
ঠিক তখনই ইয়ান নিজের বড় বড় চোখ দুটো পিটপিট করে মেলল এবং সোজা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঋষভ মায়ায় পড়ে ইয়ানকে এক ঝটকায় নিজের কোল জুড়ে তুলে নিল। ও বাচ্চার গোলুমোলু পেটের ওপর নিজের মুখটা ঠেকিয়ে একটা চুমু দিল। তারপর ইয়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “তোমাকে দেখতে জুনিয়র ঋশ লাগছে। তবে শোনো আমার বউয়ের সবসময় দেখভাল করবে, ওকে চোখে চোখে রাখবে, কেমন? আর একটা কথা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও একদম আমার বউয়ের কাছে বেশি ঘেঁষবা না! আমি অনেক দিন থেকেই খেয়াল করেছি, তুমি সারাক্ষণ আমার বউয়ের গায়ের সাথে চিপকে থাকো। এতে আমার বড্ড বেশি রাগ লাগে। ও শুধু আমার বউ, ও চিপকে থাকলে একমাত্র আমার সাথেই চিপকে থাকবে। খবরদার… তুমি আর আমার বউয়ের এত কাছাকাছি আসবে না!”
২ বছরের ইয়ান চুপচাপ ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে বাপের এই খ্যাপাটে কথাগুলো শুনতে লাগল। ইয়ান যদি এই বয়সে কথা বলতে পারত, তবে ও নির্ঘাত এই পাগল লোকটাকে কড়া একটা গালি দিয়ে বসত! কত্ত বড় সাহস ওর নিজের জন্মদাত্রী মাকে ওর নিজের থেকেই দূরে থাকতে বলছে!ঋষভ এবার ইয়ানের পুরো শরীরের নিজের নাক আর মুখ ঘষে ওর গায়ের সেই মিষ্টি সুবাসটুকু তৃপ্তিতে বুক ভরে টেনে নিল। তারপর ওকে সাবধানে বিছানায় ইয়াশফার পাশে শুইয়ে দিল। ও নিজের পকেট থেকে একটা ছোট ছুরি বের করে ইয়াশফার গলার কাছে ধরে বললো “অন্য পুরুষের হাত ধরেছিস তুই তোর গলার রগ ছিড়ে ফেলবো আমি। কিন্তু এই কেক কাটাট ছুড়ি দিয়ে সম্ভব না তাই আপাতত কেক কাট”
এরপর ঋশ ইয়াশফার হাত ধরে কেকটা সুন্দর করে কাটল। ইয়াশফা তখনো ওষুধের ক্লান্তিতে একদম গভীর ঘুমে মগ্ন। ঋষভ কেকের একটা ছোট টুকরো নিজের আঙুলে নিয়ে আলতো করে ইয়াশফার বন্ধ ঠোঁটের কোণায় ছুঁইয়ে দিল। ও মনে মনে বলল
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৯
“Happy Birthday, Sakura. May you have a great life ahead with me, of course. Keep pushing my limits, and I swear I’ll kill you.
Anyway, I love you… but don’t get it twisted, I still don’t accept you as my wife, even I don’t like you.
