মেজর কারদার পর্ব ২৭
ফিনারা ঝুমুর
বৈরী বৃষ্টির হেতুতে বাগানের চারপাশের সমস্ত গাছ-গাছালি পিচ্ছিল হয়ে অবস্থান করছে। এমন স্যাঁতসেঁতে ভেজা রাতে সামান্য একটু বেকায়দায় পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই ধপাস করে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে চিরতরে ঘরকুনো হওয়ার সম্ভাবনা অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ! যে মনুষ্যজাতি ভরদিবালোকে সবার সামনে গাছে উঠতে গিয়ে লজ্জায় সংকোচে সংকুচিত হয়, আজ মধ্যরাতে কি না এই বরের সাজ পোশাক ছেড়ে চোরা পেয়াদার মতো গাছে চড়তে হবে!
মনের গহীনে অযাচিত ভয়কে হৃদে স্থান দিয়ে, জীবনের প্রথম মধুচন্দ্রিমায় নতুন বিবাহিত কনেকে সঙ্গ নিয়ে জাঁদরেল মেজর এসে পৌঁছাল ছগীর আলীর সেই কুখ্যাত আম বাগানে। বুড়ো ছগীর আলীর আম গাছগুলোর আকৃতি বেশ মোটা-সোটা এবং প্রাচীন। একটা বিশালাকার আম বৃক্ষের গায়ে আলতো করে নিজের হাতখানা হাতড়াতে হাতড়াতে পরম সংকোচে শীর্ষ ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট বউটাকে শুধাল,
“এমতাবস্থায় এই পিচ্ছিল গাছে ওঠা বড্ড ঝুঁকিপূর্ণ, প্রিয়া। অসাবধানতাবশত পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু আজ অত্যন্ত বেশি।”
“আপনি না দেশের নামজাদা একজন জাঁদরেল মেজর! দিনের পর দিন বনে-বাদারে, পাহাড়ে-জঙ্গলে কাদা-পানিতে রাতের পর রাত পড়ে যুদ্ধবিদ্যার মহড়া দিতেন, তখন কোনো সমস্যা না হলে সামান্য এই একটা আম গাছে উঠতেই এখন আপনার এত অজুহাত আর কেন হচ্ছে, শুনি?”
হাত দুটো কোমরে রেখে বেশ রাগীস্বরে ও ঝ ঝাঁঝালো কণ্ঠে কথাগুলো উগরে দিল মেঘ। কিন্তু শীর্ষ ওনার সেই রাগী চাউনি আর তোপ শুনেও নিজের গম্ভীর মনোভাব একবিন্দু পরিবর্তন করল না। বরঞ্চ পূর্বের ন্যায় নিজের সেই সুগম্ভীর ও দারাজ গলায় শোনালো,
“দুর্ঘটনা বা আহতের আশঙ্কা শতভাগ রয়েছে, মেঘালয়া। মেজরি আলাদা জিনিস আর বউ নিয়ে মাঝরাতে পিচ্ছিল গাছে চড়া আলাদা। বিজ্ঞ মানুষের মতো পারিপার্শ্বিক ঝুঁকিটা তোমাকে বুঝতে হবে।”
মেঘ শীর্ষের সুশীল যুক্তি আর সতর্কবাণীতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে, নিজের চড়িদার কামিজের আঁচলটা কোমর অব্দি তুলে নিয়ে গাছে ওঠার জন্য এক পায়ে কায়দা করে জোর দিল। তারপর তড়িঘড়ি করে বুড়ো আম গাছের উঁচু আর পিচ্ছিল গুড়িটা ধরে ডাল বেয়ে হনহন করে ওপরে উঠে গেল!নিচে দাঁড়িয়ে রাখা পকেট টর্চের সরু হলুদ আলোক রশ্মি মেঘের ওপর ফেলে স্তব্ধ হয়ে রইল শীর্ষ। ও আলো আঁধারির মাঝে দেখতে লাগল ওর সবেমাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শুভ কাবিন হওয়া সাদা চুরিদার পরা, সদ্যবিবাহিতা কনে কীভাবে কাঠবিড়ালীর মতো তরতর করে আম গাছে উঠে যাচ্ছে!গাছের ডালে পা জমিয়ে বসে মেঘ মুখ কুঁচকে নিচু গলায় তাগাদা দিল,
“ওমন হ্যাবলার মতো গোল গোল চোখে তাকাইয়া না থাইকা তাত্তাড়ি ঝুলানো ব্যাগটা মেলায়া ধরেন তো! সুস্বাদু আমগুলা লওন লাগবো তো!”
শীর্ষ চারপাশের খাঁ খাঁ করা আঁধারে একবার সতর্ক দৃষ্টি ফেলে, বাধ্য ছেলের মতো পকেট থেকে বড়সড় একটা ব্যাগ বের করে মস্ত বড় ফাঁক করে মেলে ধরল। মেঘ গাছের ডালে বসে নাগালে পাওয়া ডাঁসা ডাঁসা কাঁচা আমগুলো টপাটপ ছিঁড়ে নিচে ব্যাগটার গভীর গহ্বরে ফেলতে লাগল।
তবে গোল বাধাল মেঘের দুই হাতের একরাশ কাঁচের গাঢ় রঙের চুড়ি! নিস্তব্ধ রাতের সেই নীরব আম বাগানে আম ছিঁড়তে গিয়ে মেঘের হাতের চুড়িগুলোর অনবরত টুংটাং শব্দ চারিদিকে এক অপূর্ব সুর ছড়িয়ে দিতে লাগল।
ঝুঁকির মাঝেও শীর্ষর দুই শ্রুতিনালী আর পুরুষালী মন সেই মিষ্টি ধ্বনিতে এক অদ্ভুত পুলক বোধ করল। সে আলতো করে গলা পরিষ্কার করে গাছের দিকে মুখ উঁচিয়ে ফিসফিস করে সুধাল,
“বলছিলাম কি, আমার চোর বউ —হাতের চুড়িগুলো খুলে রাখলে হয় না? খুব শব্দ হচ্ছে কিন্তু! এমন পরম শান্তির কাজে বড্ড বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এই মেলোডি!”
শীর্ষর কাব্যিক কথা শেষ হওয়ার আগেই বাগানের অপর প্রান্ত থেকে এক কটমটে ও বিকট বৃদ্ধ কণ্ঠ গর্জে উঠল,
“আবে কোন হালায় রে এই রাইত্তের বেলায় হামার রূপোলী বাগানের ভিত্তে ঢুকিয়া কুকাম করে? ধরবার পারলে হালার পো, মোটা কঞ্চি বাঁশ আইজ তোর ওনে ভরমু!”
হঠাৎ সেই যমদূতের মতো হাঁক শুনে গাছের ওপর বসে থাকা মেঘের পিলে চমকে উঠল! ও উপর থেকেই আতঙ্কে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা স্বনামধন্য জাঁদরেল মেজরকে তাগাদা দিয়ে ফিসফিসিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“আবে এম্ভায় হা করে খাড়ায় আছেন ক্যালা, মেজর সাহেব? জলদি এই গাছে পালান! বুড়ো ছগীর আলী আইসা পড়ছে! ধরবার পারলে কিন্তু পিঠের চামড়া ছিল্লা ফালাইবো!”
কিন্তু মেঘের এত চরম সতর্কতা শীর্ষর এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে গেল। ও নিজের চেনা আর্মির সাহসিকতা আর পার্সোনালিটি বজায় রেখে কদম না বাড়িয়ে একদম নিচ থেকেই বেশ আভিজাত্যের সাথে হাঁক ছেড়ে বলল,
“তোমায় এমতাবস্থায় এই পিচ্ছিল গাছের ডালে একলা ফেলে আমি একা পালাই কীভাবে, মেঘালয়া?”
“যাওয়াইতাছি তোমারে পালাইবার রাস্তা, দাড়া! হালার পো, হামার বাগানে আইসো গভীর রাইতে আম চুরি করবার? নে ঠেলা সামলা!”
কথাটা বলতে না বলতেই কোনো প্রকার আগাম নোটিশ ছাড়াই শীর্ষর চওড়া পশ্চাদ্দেশে চপাট করে এক বিরাট বাঁশের কঞ্চির আঘাত এসে আছড়ে পড়ল! আস্তে নয়, একবারে বুড়ো ছগীর আলীর পুরো গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে আছড়ে মারা হলো সেই বাড়ি!
“আউচ!”
জীবনের প্রথম এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত শারীরিক আক্রমণে জাঁদরেল মেজর শীর্ষ কারদারের কটু মুখ হতে চরম ব্যথাতুর ও সকরুণ এক শব্দ ছিটকে বের হয়ে এলো!কিন্তু খেপা বৃদ্ধ ছগীর আলী সেসব কোনো ভাবমূর্তির তোয়াক্কা না করে, টানা একের পর এক মোটে পাঁচ-পাঁচটা শক্ত ও সপাটে বাঁশের সপাসপ আঘাত হেনে বসাল দেশের সেরা তুখড় আর্মি অফিসার শীর্ষর পশ্চাদ্ভাগে!
গাছের ডাল থেকে চোখ দুটো মস্ত বড় বড় করে পুরো নিজের স্বামীকে মোড়ের বুড়োর হাতে পশ্চাৎদেশে বাঁশ খেতে দেখে হতবম্ব ও স্তম্ভিত হয়ে দেখে গেল মেঘ!
শীর্ষ চাইলে এক সেকেন্ডে বুড়ো ছগীর আলীকে কাবু করে ফেলতে পারত। কিন্তু ও জানে নিজের পরিচয় সামনে এলেই মেঘের নাম জড়াবে, বাড়ির লোক জানবে, আর মেঘ চরম বিপদে বা লজ্জায় পড়বে। তাই নিজের সেই আর্মি ইগো আর সম্মান বিসর্জন দিয়ে কেবল নিজের ভালোবাসার মানুষটার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই সে নীরব কষ্ট সহ্য করছিল।
গাছের ওপর দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখে মেঘ কিন্তু আর আগে-পিছে কিচ্ছু ভাবল না! নিজের স্বামীর গায়ে এমন একের পর এক বাঁশের বাড়ি পড়া দেখে ওর ভেতরের কালিনী রূপটা জেগে উঠল। ও তড়িঘড়ি কোমরে গোঁজা ছোট টর্চটা হাতে নিল। মাথার দীঘল কুন্তলরাশির শক্ত বাঁধনটা এক ঝটকায় খুলে পিঠময় অবাধ্যের মতো ছড়িয়ে দিল। চোখের কোটরে থাকা গাঢ় কাঁচাকাজল আঙুল দিয়ে এক টানে গালে লেপ্টে দিয়ে পুরো চেহারার ভৌতিক রূপান্তর ঘটাল! তারপর টর্চটা নিজ থুতনির নিচে জ্বালিয়ে এক বিটকেল ও হিমশীতল হাসিতে কেঁপে উঠল,
“ও ছগীর, ও ছগীররে! ভালা আসোসনি রে আব্বা?”
ঘুটঘুটে আঁধারে আচমকা কোনো পেত্নীর মতো ফ্যাসফ্যাসে ও বিকট গলা শুনতে পেয়ে শূন্যে ওঠানো ছগীর আলীর বাঁশধরা হাতটা মাঝপথেই জমে কাঠ হয়ে গেল!
নিচে দাঁড়িয়ে কষ্টে কোঁকাতে থাকা শীর্ষ চমকে মুখ উঁচিয়ে চাইল। গাছের একদম মগডালে আবছায়ায় সাদা চুড়িদার পরা অচেনা নারীর ভয়াল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল ও। বাতাসের তোড়ে ওর ওড়না ডানার মতো উড়ছে।ছগীর আলীর থরথর করে কাঁপতে থাকা পুরো দেহটা ওমন ভুতুড়ে ডাক শুনে বরফ হয়ে গেল। সে তোত্লাতে তোত্লাতে শুধাল,
“ক্যা– ক্যাঠা আফনে?”
গাছের ওপর থেকে মেঘ টর্চের আলো নিজের লেপ্টে থাকা ভুতুড়ে মুখে রেখে গলার স্বর আরও নারকীয় করে শোনালো,
“তোর জন্মদাত্রী মা মরহুমা কমলা বিবি রে! নিজের আপনার আম্মাজানরে চিনবার পারো নাইক্কা, আব্বা?”
বহু বছর আগে পরপারে পাড়ি দেওয়া নিজের মা মরহুমা কমলা বিবির নাম শোনামাত্রই ছগীর আলীর বুকের কলিজা ধরাস করে নিচে নেমে এলো! চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল ওর। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল,
“নিশি আইছে রে! ওরে বাবা গো, নিশি ডাকছে! এই যে পোলা, ও পোলা–”
নিজের বাঁশ খাওয়া সঙ্গীকে বাঁচানোর আশায় পাশে তাকাতেই দেখে সেখানে কেউ নেই! শীর্ষ আগেই চতুরতার সাথে আঁধারে আড়াল হয়ে গেছে। আর অন্ধকারের কারণে ছগীর আলী ওকে এতক্ষণ চেনার সুযোগও পায়নি।
পাশের চওড়া ছেলেটাকে এক লহমায় গায়েব হতে দেখে ছগীর আলীর ভেতরের ভয় এবার হাজার গুণে বেড়ে গেল! ও আবার তোত্লাতে তোত্লাতে গাছের পানে দৃষ্টি স্থির করতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
গাছের ডাল বেয়ে রক্তচক্ষু মেলে এক বিকট মরহুমা কমলা বিবি যেন সটান ওর দিকেই এগিয়ে আসছে! ওর ভয়াল রক্তবর্ণ মুখশ্রী একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখন!
মেজর কারদার পর্ব ২৬
ছগীর আলী দুই পা পিছিয়ে বুক চেপে ধরে উল্টো দিকে পালাতে চাইল। কিন্তু মেঘও ততক্ষণে গাছের ডাল থেকে টপ করে নিচে লাফিয়ে নেমে এসে এক্কেবারে ভূত হয়ে ছগীর আলীর মুখের ওপর এসে থাবা বাড়াল! ঘুটঘুটে রাতে সাদা পোশাকে নিজের মৃত মায়ের এমন ভয়াল ও রক্ত হিম করা অবয়ব একদম চোখের সামনে দেখে আর নিতে পারল না ছগীর আলী। চোখ দুটো উল্টে ওখানেই ধপাস করে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল!মেঘ টর্চটা নেভাতে নেভাতে লুটিয়ে পড়া বুড়োর দিকে তাকিয়ে এক গা জ্বালানো ভঙ্গি করে বলে উঠল,
“শ্লা শয়তান বুইড়া! মারছিলি আমার জামাইরে বাঁশ? মর এনে এই ঠান্ডা মাটিতে পইড়া!”
