Home ডাকপ্রিয়র চিঠি ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৬

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৬

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৬
রিক্তা ইসলাম মায়া

সাক্ষীভিত্তিক প্রমাণ জোরালো না থাকায় দেড়মাস পর জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে মোল্লা সওদাগর ও তার মেজো ছেলে রতন সওদাগর। মানিক ও মানিকের ছেলেপেলেরা এখনো বন্দী জেলখানায়। হারুন সওদাগর প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে ভাতিজা মানিক সওদাগর ও তার ছেলেপেলে ছাড়াতে। হারুনের প্রথম প্রায়োরিটি মানিক। তার জন্য হারুন সওদাগরের রাজ্যই অন্ধকার। কিন্তু মারিদের জটিল মামলা দায়ের লঙ্ঘন করে আপাতত মানিককে কারাগার মুক্ত করতে পারছে না তিনি। তবে খুব শিগগিরই মানিক ছাড়া পেয়ে যাবে ধারণা করা যায়, তার প্রধান কারণ সেইরাতে মানিক সওদাগর নূরজাহানের জান বাঁচিয়েছে—এই স্বীকারোক্তি গ্রামবাসী দিয়েছে। সাক্ষী ভিত্তিতে মানিক ছাড়া পাবে, কিন্তু মারিদদের ক্ষমতার জোরে মানিকের ছেলেপেলেরা আটকে আছে।

মোল্লা চেয়ারম্যানের তিন ছেলে, স্ত্রী, বউদের নিয়ে উনার ভরা সংসার। মানিক, রতন দুই ভাইকে বিয়ে করিয়েছিল মোল্লা সওদাগর। মানিকের বউ-সন্তান বছর তিন-সাড়ে তিন বছর আগেই মৃত্যুবরণ করেন। রতনের এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে সুন্দর সংসার আছে। সওদাগর বাড়িতে চাকর-বাকর, স্ত্রীকে নিয়ে জমিদারি ভাব সওদাগর বাড়ির। রাতে বাড়িতে ফিরে মোল্লা সওদাগর গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিকে ডেকে রাতের খাবারের আয়োজন করেন। খাওয়া-দাওয়ার মাঝে গ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানলো, হাসানের বিরুদ্ধেও কিসের বৈঠক করলো বুঝা গেল না। রতন বাবার সাথেই বসে। মনে ভীষণ ক্ষোভ জমেছে দেড় মাস জেল খেটে সিকদার বাড়ির বিরুদ্ধে। মানিক জীবন বাজি রেখে নূরজাহানের ইজ্জত-জীবন দুটোই বাঁচালো, অথচ সেই অসুস্থ মানিককে হসপিটাল থেকে জেলে পাঠিয়েছে নূরজাহানের স্বামী। নূরজাহানকে মানিক পছন্দ করে বলে এতদিন সিকদার বাড়ির মানুষদের ছাড় দিয়ে রেখেছিল তারা। আজ যখন নূরজাহানের বিয়েই হয়ে গেছে, তখন কোনো আপোষ হবে না। সরাসরি ইটের জবাব পাথর দিয়ে দিতে হবে। অপমানের বদলা জান নিয়েই ক্ষান্ত হবে তারা। রতন বাবার ঘরে বসে। রাগে ফুসফুস করছে। মোল্লা সওদাগর গ্রামবাসীকে বিদায় করে ছেলেকে ঘরে ডেকেছে। সিংহাসন চেয়ারে বসে হুক্কা টানছে মোল্লা সওদাগর। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে…
‘শান্ত হ রতন। ধৈর্য ধর। সবুরে মেওয়া ফলে। মানিকরে জেল থেইক্কা আইতে দে। এক মাঘে শীত যায় না বুঝলি? সিকদার বাড়ির মাইসেগোরে এহন উড়তে দে। এমন ষড়যন্ত্রের চক ঘষমু জান লইয়া বাঁচতে পারব না কেউ। খালি কয়ডা দিন যাইতে দে, সুযোগ বুইঝা কোপ দিমু।

‘হেইদিন কবে আইব আব্বা? আমার প্রতিশোধের আগুনে মাথা-মগজ নষ্ট হইয়া যাইতাছে।
‘আগুনরে বুকে জ্বলতে দে। তাপসরে ফোন কইরা কবি কাইল বাইত্তে আইয়া পরতে। নূরজাহানের জামাইর চৌদ্দ গুষ্টির জনম কুষ্ঠিও যেন লইয়া আইয়ে। ওই ছোকরা গেরামে আওয়নের পর থেইক্কা গেরামের মানুষ আমাগোরে আর ডরায় না। গেরামের মাইসের মনে সাহস বাড়ছে। তাই এই পোলার তেজ কমাতে হইব। শুনলাম নূরজাহান হের ননদীরে লইয়া গেরামে আইছে, কাইল একবার দেখা কইরা আমুনে। শিকারীর শিকার করার আগে নজরে রাখা লাগে। এহন নজরে রাখ, হেরপর থাবা মাইরা শিকার করমু।
‘আপনে কি নূরজাহানের ননদীরে শিকার করবার কথা কইতাছেন আব্বা?
‘আমার শিকার নূরজাহানের বাপের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি দুইডাই। কেউ ছাড় পাইব না।

বাবার ইশারা-ইঙ্গিতে রতন চুপ করে যায়, কিন্তু রাগ-প্রতিশোধের হিংস্রতা কমেনি। পরদিন সকালে লোকজন নিয়ে নূরজাহানদের বাড়িতে চিল্লাচিল্লি করে রতন। হাসান, মাজিদ, সাজিদের সঙ্গে হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায় তাদের। সুখ, নূরজাহানের জীবনে সওদাগর বংশের উৎপাত জানতো না। সবার চিল্লাচিল্লি আর হাতাহাতিতে ভীষণ ভয়ার্ত হলো সুখ। রাদ তো সুখের কোমর জড়িয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। রতন সবাইকে শাসিয়ে-ধমকিয়ে চলে যায়। হাসান, মাজিদ সওদাগর বংশের পুরুষদের জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত হলো। ফোন করে সবকিছু মারিদকেও জানালো। মারিদ তখন গাড়িতে। চট্টগ্রাম এরিয়ার ভেতরে। মোল্লা চেয়ারম্যান ও তার ছেলেরা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে—খবরটা সে রাতে শুনেই থানচির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। বউয়ের সাথে রাগ-অভিমান যাই হোক, কিন্তু বউকে তো আর এজন্য শত্রুদের মাঝে একা ফেলে রাখা যায় না, তাই না?

টানা দশ ঘণ্টা জার্নির পর মারিদ থানচিতে এসে পৌঁছায় সকাল বারোটায়। হাসানের কল পাওয়ার ঘণ্টা দুয়েক পরই মারিদের গাড়ি সিকদার বাড়ির উঠানে থামে। শাহানা কলপাড়ে ছিল, মারিদের গাড়ি দেখে দৌড়ে আসে খাতিরদারিতে—যেন নূরজাহান উনার অনেক আদুরে মেয়ে আর মেয়ের জামাইও উনার তারচেয়েও বেশি আদুরে। মারিদ ড্রাইভারকে দিয়ে ফল-মিষ্টি গাড়ির পেছনের ডিকি থেকে নামাচ্ছিল। শাহানা মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে দ্রুত এগিয়ে আসে, ব্যস্ত ভঙ্গিতে চিল্লিয়ে সবাইকে ডাকে…
‘ঐ তোরা কই গেলি? দেখ আমাগো নতুন জামাই আইছে। মান্না? অ মান্না, এদিকে আয়।

মারিদ ব্যস্ত শাহানাকে দেখে। সে যতবার থানচিতে এসেছে, ভদ্রমহিলা মারিদের সঙ্গে বরাবরই ভালো ব্যবহার করেছে। নূরজাহানকে রাতের আঁধারে ডাকাতের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টা শোনার পর থেকে এই মহিলার প্রতি মারিদের আকাশসমান ঘৃণা জম্ম নেয়। সেদিন নূরজাহানের মুখে শাহানার করা প্রতিটা অসৎ ব্যবহারের কথা শুনার পর থেকে সেই ঘৃণা বেড়েছে বহু গুণ। হাসানের প্রতি সম্মানের খাতিরে আপাতত মারিদ চুপ রইল। শাহানার এত আদিখ্যেতার পরও শাহানাকে সালাম কিংবা কুশলাদি বিনিময় করেনি মারিদ।
শাহানার ডাকে ভেতরের ঘর থেকে সকলেই দৌড়ে আসে। রতনের সকালের করা তোলপাড়ের পর কেউ আর ঘর থেকে বেরোয়নি। হাসান, মাজিদ, সাজিদ আশনূরকে নিয়ে মাজিদের পাত্রী দেখতে গেছে সকাল দশটায়। তারানূরও যায়নি নূরজাহান বাড়িতে আছে বলে। সবার অনুপস্থিতিতে শাহানা যদি আবার নূরজাহানের কিছু করতে চায় সেই ভয়ে তিনি যাননি। সুখ, রাদ দুজন দৌড়ে গিয়ে মারিদকে জড়িয়ে ধরে। রাদ মারিদকে জড়িয়ে লাফাতে লাফাতে বলে…

‘মারিদ ভাই এসেছে! মারিদ ভাই এসেছে!
সুখ বলে…
‘তুমি একা এসেছ ভাই? আর কেউ আসেনি?
‘আর কেউ কে আসবে? আমার শ্বশুরবাড়িতে আমি তো একাই আসব, তাই না?’
সুখ আশা করেছিল মারিদের সাথে রাদিলও আসবে বলে, অথচ রাদিল আসল না। এতে সুখের অদৃশ্য মন খারাপ হলো। রাদিল ভাই সুখকে গুরুত্ব দেয় কম। সুখ মারিদকে ছেড়ে কিছু বলবে, তার আগেই রাদ ভয়ার্ত মুখে ঘণ্টা তিনেক আগে ঘটে যাওয়া সকালের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করতে করতে বলে…
‘জানো মারিদ ভাই, সকালে কতগুলো লোক এসেছিল আমাদের সবাইকে মারতে। তারপর আঙ্কেল আর দুইটা ভাইয়া মিলে ওদের ভাগিয়ে দেয়। ওরা বলেছে আবার আসবে আমাদের মারতে।
মারিদ বুঝতে পারে রাদ কাদের কথা বলেছে। রাদ ভয় পাচ্ছে দেখে মারিদ কথা ঘুরিয়ে বলে…
‘ওরা দুষ্ট লোক ছিল। খেলায় হেরে গেছে বলে বাড়িতে এসে চিল্লাচিল্লি করছিল। তুই যেমন রাতুলের সঙ্গে খেলায় হেরে গেলে ঝগড়া করিস, ওরা ও তাই করছিল।
‘আমি তো রাতুলকে লাঠি দিয়ে মারতে যাই না মারিদ ভাই। ঐ লোকগুলো তো লাঠি নিয়ে এসেছিল।
‘বড় মানুষ লাঠি দিয়েই খেলে। কিন্তু ছোট মানুষের লাঠি দিয়ে খেলা নিষেধ, তাই তুই আর রাতুল লাঠি দিয়ে খেলতে পারিস না।

এবার মারিদের কথাগুলো রাদের নিকট যুক্তিযুক্ত মনে হয়। তাই সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। নূরজাহান হলুদ রঙের একটা থ্রি-পিস পরে বারান্দার খুঁটির সঙ্গে লেগে দাঁড়িয়ে। নূরজাহান বাপের বাড়িতে আসার পাঁচদিনের মাঝেই যে মারিদ চলে আসবে, নূরজাহান তা ভাবেনি। নূরজাহান ভেবেছিল মারিদ আরও সময় নিয়ে। নূরজাহান মাথায় ঘোমটা টেনে স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। মারিদ রাদের সঙ্গে কথা শেষ করে একপলক টিনের ঘরের ফটক-বারান্দার দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। মারিদের দৃষ্টি শান্ত, স্বাভাবিক। নূরজাহানের ওপর কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়েই সেই দৃষ্টি ঘুরে গেল তারানূরের দিকে। তারানূরের পায়ে হাত দিয়ে মারিদ সালাম করে কুশলাদি বিনিময়ে কথা চালাল। তারানূর খুশমেজাজে বলে…
‘নাতজামাই, ঘরে আইয়ো। বাইরে রৌদ মেলা। ওই নূরজাহান, যাতো নাতজামাইর লাইগা লেবুর পানি লইয়া আয়।

মারিদ শ্বশুরবাড়িতে এসেছে, তাই যেন বিশাল আয়োজনের বাজার-সদাই কিনে এনেছে। শাহানা ব্যস্ত হয়ে, ব্যস্ত পায়ে তক্ষুনি মারিদের জন্য রান্নাবান্নার আয়োজন করতে ছুটে যায় রান্নাঘরে। মান্না ড্রাইভারকে নিয়ে বাকি সব জিনিসপত্র ঘরের ভেতরে নিয়ে রাখছে। রাদ মারিদের হাত চেপে তারানূরের পেছন পেছন ঘরের ভেতরে যাচ্ছিল, হঠাৎ রাদ মারিদের তাজা কাটা রক্তাক্ত বাম হাতটা দেখে আতঙ্কে মৃদুস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে…
‘মারিদ ভাই, তোমার হাতে রক্ত! রক্ত।
রাদের চিৎকারে সুখ, তারানূর দুজনই মারিদের দিকে ঘুরে যায়। মারিদের রক্তাক্ত হাতটা দেখে সুখ এগিয়ে এসে বলে…
‘দেখি ভাই, কি হয়েছে তোমার? কোথায় কেটেছ?
মারিদ রাদের থেকে হাতটা ছাড়িয়ে পকেটে গুঁজে বলে…
‘হালকা গাড়িতে আঁচড় কেটেছে, এর জন্য তোকে দেখতে হবে না পাকনি।
মারিদ তারানূরের সামনে সুখকে পাকনি ডাকায় সুখ অপমানিত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে চলে যায়। সুখ চলে যেতে তারানূর বলে…

‘হাতে কি হইছে নাতজামাই? ব্যথাটেতা পাইছো না কিতা হাতে?
‘না দাদী। তেমন কিছু হয়নি, গাড়ি বেজে এমনই একটু আঁচড় লেগেছে হাতে।
মারিদকে ঘিরে বসার ঘরে হৈচৈ। রাদ মাজিদের ছেলে নোহাশের সঙ্গে হৈচৈ করছে। সুখ রাদ নোহাশের সঙ্গে। শেফালির মেয়ে মর্জিনাকে দেখা গেল নূরজাহানের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে। নূরজাহান লেবু চিপে গ্লাসে রাখছে। মর্জিনাকে শুধিয়ে বলে, “যা, তোর দুলাভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে আয়।
লাজুক মর্জিনা মাথার ঘোমটা কপাল অবধি টেনে বলে, “আমার শরম করে বুবু।
‘শরম কিসের বোকা? যা, কথা বলে আয়।
নূরজাহানের কথায় মর্জিনা মারিদের সঙ্গে কথা বলতে বসার ঘরে গিয়েও ফিরে আসে। মারিদ বসার ঘরে নেই। মান্না মারিদকে কলপাড়ে নিয়ে গেছে হাত-মুখ ধুতে। শেফালি রান্নাঘর থেকে মর্জিনাকে ডাকে। নূরজাহান মর্জিনাকে বলে…
‘আচ্ছা, পরে কথা বলে নিস। তোর মা কেন ডাকছে শুনে আয়। যা।
‘আইচ্ছা বুবু।

মর্জিনা লাজুক ভঙ্গিতে চলে যায়। মেয়েটা খুব সহজ-সরল আর লাজুক। দুনিয়ার মারপ্যাঁচ কিছু বোঝে না। মর্জিনার স্বামী কাল রাতে মর্জিনাকে নিতে আসেনি। ফোন করে মর্জিনার শাশুড়ি বলেছে, মর্জিনাকে উনার ছেলে আর নিতে আসবে না। মর্জিনার স্বামী মতিনকে আরও ভালো ঘরে লাখ টাকা যৌতুক নিয়ে বিয়ে দেবেন উনারা। ব্যাপারটায় শেফালি আহত। বাপ-মরা মেয়েটার বিয়ে শেফালি অনেক কষ্ট করে দিয়েছে হাসানের থেকে টাকা নিয়ে। এত ছোট মেয়েটা একটা বছর সংসার করতে পারল না। অল্প বয়সেই মর্জিনার তালাক হবে ভেবে শেফালি চিন্তায় আছেন। অবিবাহিত মেয়েদেরই ভালো জায়গায় বিয়ে হয় না, সেখানে তালাকপ্রাপ্ত বাপ-মরা এতিম মেয়েকে কে আবার বিয়ে করবে?
মারিদ চিনি কম খায়। নূরজাহান ছোট চামচে অল্প চিনি লেবু পানিতে ঘোটাচ্ছে। মারিদ পেছনের দরজা দিয়ে ভাতঘরে ঢোকে। কলপাড় থেকে হাত-মুখ ধুয়ে সোজা এদিকেই এসেছে। নূরজাহান টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে লেবু পানিতে চিনি মেশাচ্ছে। মারিদ ঢুকতেই দুজনের চোখাচোখি হয়। নূরজাহান দ্রুত মাথায় ঘোমটা টেনে সালাম দেয়।

‘আসসালামু আলাইকুম।
মারিদের হঠাৎ উপস্থিতিতে কথা খুঁজে না পেয়ে নূরজাহান থতমত খেয়ে সালাম দেয়। মারিদ হয়তো মনে মনে সালামের উত্তর দেয়, কিন্তু মুখে প্রকাশে ভিন্ন কিছু। নূরজাহানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে চট করে নূরজাহানের গায়ের ওড়না টেনে ভেজা মুখ মোছে। হতবাক, বিস্মিত নূরজাহান দ্রুত আশেপাশে তাকায়, ওড়নার এক টুকরো অংশ বুকে চেপে রাখে। এই প্রথম মারিদ বিনা অনুমতিতে নূরজাহানের গায়ে কাপড় টেনেছে। অস্বস্তিতে নূরজাহান বিস্মিত হয়। মারিদ নূরজাহানের ওড়নায় মুখ-হাত মুছে নূরজাহানের মুখের ওপর ওড়নাটা ঢিল মেরে বলে…
‘বেশি দেখলে আমার নজর লাগবে। চোখ সরাও।
‘হুম?

মারিদ নূরজাহানকে ‘তুমি’ করে কথা বলছে, নূরজাহান এতে হতবিহ্বল হয়ে গেছে। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে মারিদের দিকে। মারিদ নূরজাহানের গাল টেনে বলে…
‘জামাইর বিরহে শুকিয়ে গেছ মনে হচ্ছে? মুখটা শুকনা শুকনা লাগছে কেন? খাও না?
নূরজাহানের ঢোক গিলতে কষ্ট হয়। মারিদ নূরজাহানের সাথে ‘তুমি’ সম্বোধন করে কথা বলছে, যেমনটা দুজনের ফোনে কথা বলার সময়ও কখনো মারিদ নূরজাহানকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে কথা বলেনি। আর না এতটা ফ্রি হয়েছে কখনো। নূরজাহানের উত্তর না পেয়ে মারিদের কপাল কুঁচকে আসে। ফের একই প্রশ্ন করে বলে…
‘কি ব্যাপার কথা বলছ না কেন? ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করো না? মুখটা শুকনা লাগছে কেন জান?
জান? মারিদ ‘জান’ ডেকেছে? নূরজাহান হাঁ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। না উত্তর দিচ্ছে, আর না দৃষ্টি সরাচ্ছে। নূরজাহানকে জমে যেতে দেখে মারিদ বিরক্ত হয়ে টেবিল থেকে লেবু পানির গ্লাসটা হাতে তুলে নেয়। গ্লাসে থাকা চামচটা টেবিলে রেখে এক চুমুকে সম্পূর্ণ লেবু পানি শেষ করে নূরজাহানের হাতে খালি গ্লাসটা দিয়ে বলে…

‘স্বামী বাড়িতে আসলে বউদের শাড়ি পরতে হয়। যাও, শাড়ি পরে আসো। এসব থ্রি-পিসে তোমাকে বউ বউ লাগে না।
নূরজাহান এবার লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিল। কম্পিত হাতে খালি গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে রুমে গেল। মারিদ নূরজাহানের পেছন পেছন নূরজাহানের ঘরে ঢুকে কাঠের দরজার ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগাতেই নূরজাহান চমকে উঠে পেছনে তাকায়। নূরজাহান লাগেজ থেকে শাড়ি খুলছিল পরার জন্য। মারিদকে দরজা লাগাতে দেখে জড়তায় দ্রুত বলে…
‘দরজা লাগাচ্ছেন কেন? আপনি বাইরে যান, আমি কাপড় চেঞ্জ করব।
‘তোমাকে দেখার আমার হক আছে। এবার সেটা শাড়ি পরেই হোক কিংবা শাড়ি ছাড়া। দুটোতেই কিন্তু আমার হক আছে।
নূরজাহানের তীব্র লজ্জায়, অস্বস্তিতে আঁচড়ে পড়ে শরীরে মৃদু কম্পন নিয়ে লাগেজ ছেড়ে শাড়ী হাতে উঠে দাঁড়ায়। হঠাৎ মারিদের কি হয়েছে যে পাঁচদিনে আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল? নূরজাহানের সাথেও কেমন ক্লোজ আচরণ করছে! মারিদ নূরজাহানের মুখোমুখি হতে হতে বলে…

‘তুমি তোমার শাশুড়িকে কি বলেছ? আমি তোমাকে যৌতুকের জন্য বাপের বাড়িতে পাঠিয়েছি—এটা বলেছ?
নূরজাহান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলে…
‘আপনার জন্য আম্মু আমাকে ভুল বুঝছিল, তাই আমি আপনার দোষ আপনার ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়েছি। আপনি আম্মুর ছেলে। আজ ভুল বুঝলে কাল মাফ করে কাছে টেনে নেবে, কিন্তু আমি ঐ বাড়ির বউ। আমি দোষ করলে সেটা সবার চোখে উঠে যাবে। একবার বউ-শাশুড়ির মাঝে কোনো কিছু নিয়ে দ্বন্দ্ব বেজে গেলে তার রেশ সবসময় থেকে যাবে। সেজন্য আমি চাই না আপনি কিংবা অন্য কারও জন্য আম্মু আমার ওপর রাগ করুক। আমি সংসারে শান্তি চাই, আম্মুর ভালোবাসা চাই।
মারিদ নূরজাহানের কথা বুঝে প্রসঙ্গ এড়িয়ে নূরজাহানের শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নূরজাহানের মুখের ওপর ঝুঁকে বলে…

‘মার ভালোবাসা চাও, আর ছেলের ভালোবাসা চাও না? তোমার সংসারে শান্তি কিন্তু মার ছেলেকে ভালোবাসলেই আসবে জান। দেখবে?
চোখ-মুখ খিঁচে লজ্জায় মাথা নুইয়ে নেয় নূরজাহান। নূরজাহানকে লজ্জা পেতে দেখে মারিদ দুষ্টু হেসে নূরজাহানের কোমর জড়িয়ে বুকে টানে। নূরজাহানের ফোলা গালে কামড় দিয়ে ঠোঁটে এসে থামে। ফিসফিস করে বলে…
‘কয়েক দিন ধরেই আমার প্রেসার ফল করছিল। ডাক্তার বলেছে মিষ্টি খেতে। কিন্তু আমার মিষ্টি তো শ্বশুরবাড়িতে এসে বসে, তাই আমিই চলে এলাম মিষ্টিমুখ করতে।
মারিদ শব্দ করে নূরজাহানের কম্পিত ঠোঁটে চুমু খায়। একটা, দুইটা, তিনটা শব্দ করে চুমু খেয়েই নূরজাহানের ওষ্ঠে মারিদ দীর্ঘ মিলনের আকুতি নিয়ে মিলিত হতে চাইলে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ে কেউ…
‘নাতজামাই, তোমার শশুর আইছে। তোমারে দেখা করবা ডাকছে, আইয়ো তো জলদি।
ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে বাঁধা পাওয়া মারিদ নূরজাহানকে ছেড়ে কপালের একপাশ চুলকায়। নূরজাহান হাতের মুঠোয় শাড়িটা পিষে লজ্জায় মাথা নুইয়ে নাক-মুখ খিঁচে দাঁড়িয়ে। দরজায় তখনো তারানূর ডাকাডাকি করছে। মারিদ বিরক্তির গলা ঝেড়ে বলে…

‘তোমার দাদী রং সময়ে ঢুকেছে। তুমি যেমন রং নাম্বার হয়ে আমার জীবনে এসে আমাকে এলোমেলো করে দিয়েছ, তোমার দাদীও রং সময়ে ঢুকে আমার রোমাঞ্চের বারোটা বাজিয়েছে। নো প্রবলেম, হিসাব তুলে রাখলাম, রাতে পুষিয়ে নেব।
মারিদ বেরিয়ে যায়, নূরজাহান তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে। এই অপরিচিত মারিদকে নূরজাহান চিনতে পারছে না। কেমন অবিশ্বাসের ঘোর লাগছে নূরজাহানের। মারিদ বলেছিল সে যেদিন নূরজাহানের অতীতের করা সকল ভুল ক্ষমা করতে পারবে, সেদিন সে নতুন সম্পর্ক গড়তে নূরজাহানকে নিতে আসবে থানচিতে। তাহলে কি মারিদ নূরজাহানকে ক্ষমা করে নূরজাহানের সাথে নতুন সম্পর্ক গড়তে ওকে নিতে এসেছে? সেজন্যই কি ‘তুমি তুমি’ সম্বোধন করে আর দশটা স্বাভাবিক কাপলের মতন আচরণ করছে? এবার সত্যি সত্যি নূরজাহান লজ্জা-অস্বস্তিতে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। মারিদের কথাবার্তা, আচরণে মনে হচ্ছে সে নূরজাহানকে বউ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এজন্য নিশ্চয়ই রাতেও কাছে আসতে চাইবে? হঠাৎ নূরজাহানের শরীরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল মৃদু কম্পন। শাড়ি হাতে নিয়েও নূরজাহান শাড়িটা পরল না। বাম গালে মারিদের কামড় দেওয়া জায়গাটা স্পর্শ করতে লজ্জা দ্বিগুণ বাড়ল। ফর্সা গালে মারিদের পুরুষালি দাঁতে কামড় দেওয়াতে জায়গাটা ক্রমশই লাল হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ জানে, দাগ না হয়ে যায় আবার! তাহলে নূরজাহান কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না লজ্জায়।

দীর্ঘ সময় নিয়ে হাসান, মাজিদ, সাজিদের সঙ্গে বসার ঘরে মারিদের কথা হয়েছে। সাজিদের পছন্দের পাত্রীকে দেখে ফেরার পথে থানচি বাজারে শুনেছে, মোল্লা চেয়ারম্যানের মেজো ছেলে রতন ও তার দুজন ছেলেকে মারিদ পিটিয়ে বাজারে ফেলে এসেছে। গ্রামের মানুষ কেউ এগিয়ে আসেনি বাঁধা দিতে। মারিদকে গ্রামবাসী প্রায় মানুষ চেনে হাসপাতালের প্রজেক্টের কাজে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাবান সওদাগর বংশের পুরুষদের যে লোক জেল খাটাতে পারে, সে নিঃসন্দেহে দ্বিগুণ ক্ষমতাবান পুরুষ হবেন এটা গ্রামবাসীর ধারণা। মারিদের গাড়িটা থানচি বাজারে ঢুকতেই মারিদ গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকে দিয়ে বাজার থেকে ফলমূল-মিষ্টি কিনছিল। সেখানে রতন হঠাৎ উপস্থিত হয়ে মারিদের গাড়ি দেখে সেই-ই আগে তোলপাড় শুরু করে ঝামেলা করে। রতন বংশের ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে মারিদের শার্টের কলার টেনে ধরতেই মারিদ বেধুম পেটায় দোকান থেকে কাঁচা বাঁশ নিয়ে। রতনের চামচা দুটো ছেলে এসেছিল রতনের হয়ে মারিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, মারিদ তাদেরও রেহাই দেয়নি। দক্ষ হাতে তিনজনকেই থানচি বাজারের ফেলে বেধুম পেটানোর খবরটা সারা গ্রামে রটে যায়। মারিদের যেমন প্রশংসা হয়, তেমনই সওদাগর বংশ আরও একবার অপমানিত হয় গ্রামবাসীর সামনে।
এই খবরটা শুনেই হাসান খানিকটা চিন্তিত হয়েছিল মারিদের জন্য। চেয়ারম্যান ছাড়া পেয়েছে, মানিক আজ না হয় কাল, একদিন না একদিন ছাড়া পাবেই; তখন মানিক মারিদকে ছেড়ে দেবে না। মানিক যে হারামি স্বভাবের লোক, সে প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত শান্ত হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, মানিক নূরজাহানের জন্য পাগল। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যখন জানবে নূরজাহানের বিয়ের খবরটা তখন মানিক কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে—সেই চিন্তায় অস্থির তিনি। মানিক নূরজাহানের কোনো ক্ষতি করবে না ভালোবাসে বলে, কিন্তু পাছে যদি মারিদের কোনো ক্ষতি করে ফেলে—সেই চিন্তায় দিশেহারা হাসান। সবটা শুনে মারিদ হাসানকে আশ্বস্ত করে বলে…

‘ আপনি আমার জন্য চিন্তা করবেন না আঙ্কেল। মানিক তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করলেও আমার একটা চুলও বাঁকা করতে পারবে না। যদি তাদের সেই ক্ষমতা থাকত, তাহলে হারুন সওদাগরই এতদিনে নিজের ভাই-ভাতিজাদের জেল থেকে ছাড়িয়ে নিত। শুধু তাই নয়, আমি কিংবা আপনাদের পরিবারের কারও কিছু হলে হারুন সওদাগরই এর জন্য প্রথম দায়ী থাকবে। জেল জরিমানা , এমনকি পদ নিয়েও হুমকিতে পড়তে পারেন হারুন সওদাগর যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে। এতসব কিছু হারানোর ভয়ে কখনো হারুন সওদাগর তার ভাই-ভাতিজাদেরকে আমাদের কিছু করতে দেবে না। আপাতত নিশ্চিন্তে থাকুন আঙ্কেল, বাকিটা পরে দেখা যাবে কি হয়।’ল

হাসান, মাজিদ, সাজিদ মারিদের কথায় ভরসা পেল। নূরজাহান যে এতদিনে নিরাপদ স্থানে পৌঁছেছে, সেই নিশ্চয়তা পেল। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে মারিদ ঠিক করল হাসপাতালের প্রজেক্টের কাজটা দেখতে একবার ঘুরে আসবে। নূরজাহান সঙ্গে যাবে বলে আবদার জানাতে মারিদ বলল রেডি হতে। হাসান, মাজিদ মারিদের সঙ্গে যাবে। মারিদ ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে ঘরে ঢুকে নূরজাহানকে বোরকা পরতে দেখে কপাল কুঁচকে নূরজাহানকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে মারিদ বলে…

‘যদি পর্দার জন্য বোরকা পরো, তাহলে কিছু বলব না। আর যদি কারও ভয়ে বোরকার আশ্রয় নাও, তাহলে বলব বোরকা পরার দরকার নেই। তোমার স্বামী আছে সামনে, কাউকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রথম প্রথম নূরজাহান মানুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচতে ভয়ে বোরকার আশ্রয় নিলেও পরে সে বোরকা পরে চলাফেরা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বোরকা ছাড়া সে চলাফেরা করতে পারে না, অস্বস্তি লাগে। মারিদের কথার উত্তরে নূরজাহান ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ভেতর দিয়ে বোরকার পিনআপ করতে করতে বলে…
‘আমি বোরকা পরে চলাফেরা করে অভ্যস্ত। এখন কারও ভয়ে বোরকা পরছি না। পর্দা করা আমাদের ধর্মে ফরজ। যদিও আমি সম্পূর্ণ পর্দা করি না, তবে বোরকা আমি আমার ইচ্ছাতেই পরি।

মারিদ কিছু বলে না। সে রেডি হয়ে বেরিয়ে যায় নূরজাহানকে নিয়ে। হাসান, মাজিদ হাসপাতালের কাজ পর্যবেক্ষণ করে। মারিদ নিজে নূরজাহানের হাত চেপে পুরো হাসপাতালের প্রজেক্টের কাজ ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছে—কোথায় কি হবে তা নিয়ে। হাসান দূর থেকে নূরজাহানের প্রতি মারিদের যত্ন, মায়া দায়িত্ব-স্নেহ দেখে মহান আল্লাহর দরবারে লাখ-কোটি শুকরিয়া আদায় করেন। উনার পরে কেউ একজন আছে উনার এতিম মেয়েটার খেয়াল রাখতে। এর মাঝে হঠাৎ মোল্লা চেয়ারম্যানের আগমন ঘটে কনস্ট্রাকশন সাইটে। উনারা কাল রাতে জেল থেকে ছাড়া পেলেন, আর সকালেই উনার মেজো ছেলেকে পেটাল নূরজাহানের জামাই! গ্রামের মানুষের চোখে উনার প্রতি সম্মান কমে গেছে, পূর্বের মতো আর ভয় পায় না কেউ, বরং সবাই উপহাস করে। এই গ্রামে সওদাগর বংশের প্রতিপত্তি-ক্ষমতা বিস্তার করতে অনেক বছর খাটুনি লেগেছে পূর্ব পুরুষদের, যেটা দুই দিনের আসা একটা ছোকরা ছেলে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। এত সহজে মোল্লা সওদাগর নিজের বংশের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ক্ষমতা-রাজত্ব ধ্বংস হতে দেবে না। আপাতত যেমন আছে তেমনই থাক, দুই দিনের ছেলেটাকেও লাফাতে দিক; তারপর হঠাৎ চারপাশ থেকে এমনভাবে গলা চেপে ধরবে যেন পালানোর সুযোগ না পায়।

মোল্লা চেয়ারম্যানের মাথায় হ্যাংলা-পাতলা গঠনের একটা মধ্যবয়সী লোক ছাতা ধরে আছে। অপর হাতে মোল্লা চেয়ারম্যানের পানের ডিব্বা, তাতে বানানো বেশ কয়েকটা পান। মোল্লা সওদাগর মুখ ভর্তি পান চিবোতে চিবোতে হাসপাতালের কনস্ট্রাকশনের কাজের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। গায়ে সাদা লুঙ্গি, ফতুয়া পরা। পরনের লুঙ্গির কুঁচি গুলো মুঠোয় চেপে একপাশে ধরে সামনে এগোল। নূরজাহানকে দেখা যাচ্ছে বোরকা পরে সামনে দাঁড়িয়ে, মারিদ আশেপাশে নেই। মোল্লা সওদাগর পেছন থেকে নূরজাহানকে ডেকে বলে…

‘কেমন আছো নূরজাহান? মেলা দিন ধইরা তোমারে দেহি না। শরীর-স্বাস্থ্য ভালা আছে? শুকাই গেছ মনে হইতাছে, খাও না নাকি?
মোল্লা সওদাগরের গমগমে আওয়াজে নূরজাহান চমকে পেছনে তাকায়। অপদার্থ মোল্লা সওদাগর লালসার চোখে বোরকার ওপর দিয়েই নূরজাহানের ওপর দৃষ্টি বুলাল, মুখ ভর্তি সাদা দাঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে। নূরজাহানের চোখে ভয়ভীতি কিছু দেখতে পাচ্ছে না, কেমন একরোখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে নূরজাহান। মোল্লা সওদাগর জিভে চুন ঘষে পান চিবোতে চিবোতে ফের বলে…
‘আমার পোলাডা জেলে, তাই তোমার সোয়ামী দুনিয়ার আলো-বাতাস দেখতাছে; তয় বেশি দিন দেখবার পারব না মাইয়া। তুমিও হুদাই…

কথার মাঝে মোল্লা সওদাগর থেমে যায় নূরজাহানের সামনে কারও উপস্থিতি পেয়ে। মোল্লা সওদাগর বিরক্ত হয়ে ব্যক্তিটির পাশে উঁকি মেরে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বাকি কথা গুলো বলতে চাইলে মারিদ মোল্লা সওদাগরের মাথা চেপে তার মুখোমুখি সোজা দাঁড় করতে করতে বলে…
‘তোর তো ভাই কলিজাডা বড়! আমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও আমাকে ডিঙিয়ে পেছনে তাকাস?’
মোল্লা সওদাগর অপদস্তক মারিদকে দেখে নেয়। মুখের পান ধীরগতিতে চিবোচ্ছে, যেন কোনো রহস্য খুঁজছে মারিদের মুখে। মোল্লা সওদাগরের হাতের মুঠোয় চেপে ধরা লুঙ্গিটা নিয়েই কোমরের উপর হাত রাখে। মুখ ভর্তি পানের পিচকারি পাশে ফেলে বলে…
‘হুনলাম তুই নাকি আমার মাইজ্জা পোলাডারে মারছত? দুক্কু পেলাম, মারিদ সাহেব।
মোল্লা সওদাগরের মাথায় ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার হাত থেকে পানের বক্সটা কেড়ে নিয়ে মারিদ পরপর দুটো পান মুখে ভরে, গাল ভর্তি পান চিবোতে চিবোতে মোল্লা সওদাগরকে হুবহু কপি করে বলে…
‘তোরে দুক্কু দেওয়ার লাইগাই তোর পোলাডারে পিটাইছি মোল্লা। কি পোলা জন্ম দিছত? বাপের কথা হুনে না? জাউরামি করলে তোর পোলা ভবিষ্যতে এই বাপের হাতে আরও মাইর খাইব। তুই পোলাডারে বুঝাইস বাপের লগে জাউরামি না করতে। এই বাপ তো হের বাপরেও ছাড়ে না, পোলা কেমনে ছাড়ব, ক?
মোল্লা সওদাগর ধীরে ধীরে পান চিবোতে চিবোতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মারিদের নাটকীয় ভঙ্গির দিকে তাকিয়ে রইল। হুবহু উনাকে কপি করছে! পোলা বহুত জাউয়া আছে, খেলা জমবে এবার ভালা মতোন। চেয়ারম্যান আঙুলের মাথার চুন জিভে ঘষে বলে…

‘বাপের লগে পোলারা এমন একটু-আধটু জাউরামি করেই, মারিদ সাহেব। সবই বয়সের দোষ। তুমি যে আমার পোলার পছন্দের মাইয়ারে নিজের বউ বানাইয়া সংসার করতাছ, হেইডা আমার বড় পোলাডা হুনলে তো গোসসা করবই। এহানে পোলার কি দোষ দিমু, কও?
মোল্লা সওদাগর কথা ফাঁকে মারিদের পেছনে নূরজাহানের দিকে দৃষ্টি ঘোরাতে চাইলে নূরজাহান মারিদের আড়ালে চলে যায়। মারিদ সেটা বোঝে। মুখ ভর্তি পানের পিচকারি মোল্লা সওদাগরের পায়ের কাছে ফেলে—অল্পের জন্য মোল্লা সওদাগরের পায়ে পড়েনি সেটা। বিষয়টা মোল্লা সওদাগরও খেয়াল করে ভ্রূ কুঁচকে ফেলে। মারিদ বক্স হতে চুন নিয়ে জিভে ঘষে। মুখ ভর্তি পান চিবোতে চিবোতে মোল্লা সওদাগরকে আবারও হুবহু কপি করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে…

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৫

‘উহুম! বউয়ের দিকে নজর দিস না মোল্লা। বহুত হারামি আমি। বউ নিইয়া কাড়াকাড়ি পছন্দ না। তাহলে জায়গায় জায়গায় ছিদ্র কইরা দিমু, গুইনা কুলাইতে পারবি না। তোর পোলারে কইস—হের বাপে হের মাইরে লইয়া সুখে সংসার করতাছে, মাঝে যেন বাগড়া না দেয় নইলে জায়গা মতো হান্দাইয়া দিমু।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here