Home নেশাক্ত প্রহর (মিহি সিজন ২) নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪১

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪১

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪১
রূপন্তী সরকার

ঋষভ ইয়াশফার একদম কাছে ঝুঁকে এলো। ওর ঘুমের ঘোরে থাকা শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় ফিসফিস করে বলল,
“আমি তোমাকে একা রেখে চলে যেতে চাইনি সাকুরা। কিন্তু দেশের সুরক্ষার জন্য, ওই মিশনে আমার যেতেই হতো। আমি যাওয়ার আগে পাপাকে সব বলে গিয়েছিলাম, সব জানত পাপা। তবুও পাপা আজ নিজের জেদ ধরে তোমাকে অন্য কারো সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে চাচ্ছে! আমি পাপাকে সহজে ছাড়বো না সাকুরা। তুমি শুধু আমার, একমাত্র আমার! তোমাকে ছাড়া আমার যে কতটা কষ্ট হয়েছে, তা শুধু আমিই জানি। আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও তোমাকে হাতছাড়া করছি না।”
কথাটা শেষ করেই ঋষভ আলতো করে ইয়াশফার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা গভীর চুমু দিল। ওপাশে শুয়ে থাকা পুচকে ইয়ানের দিকে তাকিয়ে ওর মনটা ভালো হয়ে গেলো।
ও নিচু হয়ে ইয়ানের নরম গালে একটা আলতো চুমু দিয়ে সাবধানে বারান্দার দরজা দিয়ে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল।

পরের দিন সকালে….
রায়ান কুঞ্জে এক উৎসবের আমেজ তৈরি হলো। আজকেও বাড়িতে মোটামুটি অনেক মেহমান এসেছে। তিথির বাপের বাড়ি থেকে ওর ভাইয়ের বউ আর সাথে আরধ্যা এসেছে। পুরো বাড়িটা ফুল আর আলো দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মেহমানদের দেখাশোনা আর রান্নাবান্না আপ্যায়ন নিয়ে বাড়ির সবাই যার যার মতো কাজে ব্যস্ত।
এই চারদিকের ভিড়ের মাঝেই ড্রয়িংরুমের করিডোর দিয়ে জ্যোতি হনহন করে হেঁটে যাচ্ছিল। আর ওর ঠিক পেছন পেছন ওড়নার আঁচলটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরে গুটি গুটি পায়ে হাঁটছিল শুভ্র। জ্যোতি কিছুটা পথ এগিয়ে গিয়ে আর সহ্য করতে পারল না। ও হুট করে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ফিসফিসিয়ে বলল, “আজব! সবসময় ওড়নার আঁচল ধরে এভাবে পিছু পিছু হাঁটো কেন? বাসায় কত মেহমান এসেছে দেখেছ? ওনারা দেখলে মনে মনে কী ভাববেন বলো তো? একটুও লজ্জা করে না তোমার?”

শুভ্র ওর এই রাগ দেখে একটুও দমে গেল না। ও নিজের একগাল মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“ওনারা ভাবলে ভাবুক, তাতে আমার কী আর তোমারই বা কী? তুমি খেয়াল করেছ করিডোরে কত ছেলে এসেছে? ওরা যদি ভুলেও তোমার দিকে নজর দেয়, তখন কী হবে? সেই ভয়েই তো আমি আগে থেকে সিকিউরিটির জন্য আঁচলটা এভাবে হাত দিয়ে লক করে ধরে আছি।”
জ্যোতি শুভ্রর এই অদ্ভুত লজিক শুনে নিজের কপালে একটা হাত দিয়ে বড্ড বিরক্তি মাখা গলায় বলল, “ভাই! তোমার চিন্তা-ভাবনা এত গভীর? একটা ওড়না ধরা নিয়ে এত বড় সমীকরণ সাজিয়ে ফেলেছ?”
শুভ্র ওর আরেকটু কাছে এগিয়ে গিয়ে চোখের ইশারায় একটু দুষ্টুমি করে বলল, “হু, বড্ড গভীর! আর শোনো… চিকমিকির মতো আমরাও চল না আবার নতুন করে বিয়ের আয়োজন করে ফেলি? কেমন হবে বলো তো?”
জ্যোতি এক সেকেন্ডে নিজের ওড়নাটা শুভ্রর হাত থেকে এক টানে ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা মুখের ওপর জবাব দিল, “নোপে! কোনোদিনও না। একবার বিয়ে করেই আমার জীবনের হালুয়া টাইট হয়ে গেছে, দ্বিতীয়বার এই ভুলের ফাঁদে আমি আর পা দিচ্ছি না!”
কথাটা বলেই ও শুভ্রর দিকে তাকিয়ে একটা ভেঙচি কেটে হনহন করে মেহমানদের ঘরের দিকে চলে গেল। শুভ্র ওখানেই দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো একটু চুলকে নিয়ে মুচকি হাসল।
ওদিকে ওপরের তলায়…

ইয়াশফার যখন ঘুম ভাঙল, তখন ঘরের জানালার পর্দা গলে সকালের মিষ্টি আলো এসে পড়েছে বিছানায়। ও চোখ মেলতেই ওর নজর গেল খাটের পাশের ছোট টেবিলটার দিকে। ও দেখল সেখানে একটা প্লেটে চমৎকার এক পিস চকোলেট কেক সুন্দর করে কেটে রাখা আছে! ও বিছানা থেকে নেমে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। পাশে ওর পুচকে ইয়ান তখনো দুই হাত ছড়িয়ে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।
ইয়াশফা প্রথমে ধীরপায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁটের কোণটা একটু ছুঁয়ে দেখল, ওর মন একদম নিশ্চিত হয়ে গেল যে এই মাঝরাতে এসে এই জাওড়ামিটা আসলে কে করে গেছে। ও খুব ভালো করেই জানত যে এটা ওর বলদা পাডা।
ও টেবিলের পাশে এসে বসল এবং চামচ দিয়ে শান্ত মুখে কেকটা খেতে লাগল। কিছুটা কেক খাওয়ার পর ওর পেটের ভেতর কেমন যেন বমি বমি ভাব লাগায় ও বাকিটা প্লেটেই রেখে দিল। ওর ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে চতুর আর প্রতিশোধের হাসি ফুটল। ও মনে মনে বলল “এতো চালাক আপনি? তবে আপনি যতোই চালাক হন না কেনো আমার ফাঁদে পা দিতেই হবে”
ইয়াশফা আর ঘরে বসে সময় নষ্ট করল না। ও ঘুম থেকে জেগে ওঠা ইয়ানকে কোলে তুলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমে নামামাত্রই জ্যোতি ওদিক থেকে ছুটে এসে এক ঝটকায় ইয়ানকে নিজের কোলের ভেতর লুফে নিল। ও ইয়ানকে আদর করতে করতে বলল, “আমার সোনা বাবাটা উঠে গেছে? চলো আজকে কাকিয়া তোমাকে অনেক মজার মজার জিনিস দেখাবে।”

বাড়ির মেহমান আর রিদ-মিহিরা সবাই তখন বিয়ের নানারকম তদারকি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিল। ইয়াশফা সোফায় বসে চারদিকের এই উৎসবের আমেজটা দেখতে লাগলো.
এর মধ্যেই মেহমানদের ভিড় ঠেলে তিথির ভাইয়ের মেয়ে আরধ্যা ইয়াশফার একদম সামনে এসে দাঁড়াল। ও নিজের ফোনটা কানের কাছে ধরে ওপাশ থেকে কারোর সাথে কথা বলার ভান করতে লাগল। আসলে ও ফোনেই কথা বলছিল না, ওর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইয়াশফাকে খোঁচা দেওয়া। ইয়াশফাকে শুনিয়ে শুনিয়ে চড়া আর বিষাক্ত গলায় বলল, “জানিস, আমাদের সমাজে কিছু কিছু বেয়াদব আর চরিত্রহীন মেয়ে আছে, যারা সুযোগ পেলেই অন্যের ভালোবাসা কেড়ে নেয়। অন্যের ভালোবাসা কেড়ে নিয়ে ওনারা আবার ঠিকমতো সংসারও করতে পারে না! ৩ বছর বছর বর নিখোঁজ থাকতে না থাকতেই কোলে একটা বাচ্চা নিয়ে এখন আবার আরেকটা পুরুষের সাথে নতুন করে বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। এই জাতের মেয়েরা আসলে বড্ড লোভী হয়, এদের পরিবারে কোনো শিক্ষা-দীক্ষা বলতে কিচ্ছু থাকে না!”

আরধ্যার মুখে এই জঘন্য কথাগুলো শোনা মাত্রই ইয়াশফা এক সেকেন্ডে বুঝতে পারল যে কথাগুলো সরাসরি ওকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। ও তিথির মুখে আগে থেকেই শুনেছিল যে আরধ্যা মনে মনে ঋষভকে ভীষণ পছন্দ করত। কিন্তু ঋষভ যখন ইয়াশফাকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসে, তখন থেকেই আরধ্যার মনের ভেতর ইয়াশফার প্রতি এক মস্ত বড় ক্ষোভ আর হিংসা জমে ছিল। আজ ইয়াশফার এই হঠাৎ নতুন বিয়ের খবর শুনে আরধ্যা আর নিজের ভেতরের সেই হিংসাটা চেপে রাখতে পারেনি। ইয়াশফা অবশ্য নিজের আত্মসম্মান ধরে রেখে চুপচাপ বসে রইল, ও আরধ্যাকে কোনো জবাব দিয়ে নিজেকে ছোট করতে চাইল না।
কিন্তু ইয়াশফা কোনো কথা বলার আগেই ওদিক থেকে করিডোর দিয়ে হেঁটে এলো ড. রোহান ইউভান। ইউভান এসে কোনো নাটক না করে সরাসরি ইয়াশফার একদম গা ঘেঁষে সোফাটায় বসল। ও আরধ্যাকে আড়চোখে এক পলক দেখে নিয়ে, ওকেই শুনিয়ে শুনিয়ে ইয়াশফার হাতটা আলতো ছুঁয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“রাস্তার কুকুর চারদিকে ঘেউ ঘেউ করবেই পাখি, ওসব ফালতু কথায় একদম কান দিতে নেই। এদের বংশগত স্বভাবই আসলে এমন, কুকুরের লেজ তো আর কখনো সোজা হয় না!”

ইউভানের মুখ থেকে এমন সোজাসাপ্টা আর কড়া অপমানজনক জবাব শোনার পর আরধ্যার পুরো মুখটা একদম অপমানে লাল হয়ে গেল।
ও ইউভানের দিকে রাগে এক কড়া চাউনি দিয়ে নিজের পায়ের জুতো ঠকঠক করে ওখান থেকে হনহন করে চলে গেল। আরধ্যা চলে যেতেই ইয়াশফা ইউভানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় শুধু একটা শব্দ বলল,
“ওকে।”
ইউভান চারদিকে একবার তাকিয়ে মেহমানরা একটু দূরে আছে দেখে ইয়াশফার আরেকটু কাছে ঝুঁকলো। ও নিজের গলার স্বরটা নিচু করে সরাসরি ইয়াশফাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি তো মনে মনে খুব ভালো করেই জানো যে তুমি আমাকে কোনোদিনও বিয়ে করবে না। তাহলে আমার সাথে এই বিয়ের নাটকটা কেন করছ, বেবিগার্ল?”

ইউভানের এই হঠাৎ মুখের ওপর বলা সত্যি কথা শুনে ইয়াশফা কিন্তু বিন্দুমাত্র চমকাল না। ওর চোখের পলক পর্যন্ত নড়ল না। ও খুব ভালো করেই জানত যে ইউভান চালাক একটা ছেলে, ও ওদের পরিকল্পনার পুরোটা না জানলেও এটুকু ঠিকই টের পেয়েছে যে এটা একটা বড় ফাঁদ। কিন্তু তারপরও এই ছেলেটা কেন ইয়াশফার স্বার্থে নিজেকে এভাবে ইউজ হতে দিচ্ছে, কেন ও নিজের ক্যারিয়ার আর সম্মান বাজি রেখে ইয়াশফাকে সাহায্য করছে সেটা ওপরওয়ালাই ভালো জানেন।
ইয়াশফা নিজের চোখ দুটো সোজা ইউভানের চোখের ওপর রেখে থমথমে গলায় সোজাসাপ্টা জবাব দিল,
“নিজের স্বার্থে।”
ইউভান ওর জবাব শুনে একটা মলিন হাসি হাসল। ও নিজের চশমাটা একটু ঠিক করে ইয়াশফার চোখের দিকে তাকিয়ে কাতর কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল, “এই জনমে তো তোমার মনের ভেতর নিজের জন্য কোনো জায়গা পেলাম না পরজনমে অন্তত আমার হয়ে এসো,?”
ইউভানের এই আকুলতা দেখে ইয়াশফা ওনার দিকে গম্ভীর মুখে চাইল। ও এক সেকেন্ডও না ভেবে কাটকাট গলায় জবাব দিল,

“পরজনম বলতে কোনো কিছু নেই । আর যদি কখনো সত্যি তেমন কোনো জন্ম থেকে থাকে, তবে আমি সেই জনমেও আমার বাবুর বাবাকেই নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে চাইবো। অন্য কারো কোনোদিন কোনো সুযোগ নেই।”
ইউভান নিজের মনের ভেতরের কষ্টটা একটা হালকা হাসির আড়ালে লুকিয়ে ফেলল। ও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা, আমি আসছি।”
কথাটা বলেই ও মেহমানদের কামরার দিকে চলে গেল।
দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো। ইয়াশফা ঘরে ইয়ানকে নিয়ে একা বসা ছিল। হঠাৎ ও খেয়াল করল ইয়ান বড্ড বেশি কাশছে, ওর বুকের ভেতর থেকে কেমন যেন একটা সাঁই সাঁই শব্দ বের হচ্ছে।
বাচ্ছাটার শ্বাসকষ্টের পুরোনো সমস্যাটা শুরু হতেই ইয়াশফা ভয় পেয়ে গেল। ও আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে সোজা ইউভানের পার্সোনাল নাম্বারে ফোন দিল।
ইউভান তখন হসপিটালে ছিল, ও ফোনের ওপাশ থেকে ইয়াশফার ভয়ার্ত গলা শুনে জলদি বলল, “বেবিগার্ল, তুমি ইয়ানকে নিয়ে এখনই হসপিটালে চলে এসো। আমার এখানে একটু পর একটা ইমার্জেন্সি অপারেশন আছে, আমি ওটি-তে ঢোকার আগে ওকে দেখবো ফাস্ট আসো।”

ইয়াশফা আর ঘরে বসে সময় নষ্ট না করে ইয়ানকে একটা চাদরে জড়িয়ে সোজা হসপিটালের চাইল্ড ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেল। ইউভান ওখানেই আগে থেকে সাদা অ্যাপ্রন পরে রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ও ইয়াশফার কোল থেকে ইয়ানকে নিজের বুকের সাথে আগলে নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ওর বুক আর পিঠ পরীক্ষা করল। ওর শ্বাসকষ্টের মেডিসিনটা দিয়ে ও ইয়ানকে নিজের কোলের ভেতর একটু উঁচুতে তুলে ধরল। ও ইয়ানের গোলুমোলু মুখের দিকে তাকিয়ে আদুরে ধমকের সুরে বলল,
“তোর মা ডা অনেক খারাপ রে বাপ! ও আমাকে একটুও ভালোবাসে না, সারাক্ষণ শুধু ওই খ্যাপাটে সিংহটার জন্য কান্নাকাটি করে। শালা একটা বেয়াদব আমার বেবিগার্ল কে বশ করে রেখেছে”
ইয়ানের নালিশ আর মুখভঙ্গি দেখে পুচকে ইয়ান ওর অ্যাপ্রনের কলারটা খামচে ধরে নিজের দাঁতহীন মুখে খিলখিল করে হেসে উঠল। ইউভান ওর এই হাসি দেখে নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে রাগ দেখিয়ে বলল, “হাসিস না বাল! তুইও নিজের বাপের মতো আমার কষ্ট দেখে হাসছিস? রাগ লাগে আমার!”
ইউভানের ওই হঠাৎ কড়া ধমক আর বড় বড় চোখ দেখে ছোট ইয়ান ভয় পেয়ে গেল। ওর মুখের হাসি এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল এবং ও ঠোঁট উল্টে ওখানেই জোরে কাঁদতে শুরু করে দিল। ইয়ানকে ওভাবে কাঁদতে দেখে ইউভান ঘাবড়ে গেল। ও ইয়ানকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে কাতর গলায় বলল, “আচ্ছা বাবা সরি, একদম কেঁদো না সোনা। আমি তো জাস্ট এমনিই রাগ করছিলাম, বাবা আর বকবে না তোমায়।”

কিন্তু ইউভানের এই সান্ত্বনার মাঝেই হুট করে ইয়ান ইউভানের কোল জুড়ে আরামে ফিসফিস করে হিসু করে দিল! নিজের গরম হিসুর ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই ইয়ান নিজের কান্না থামিয়ে একদম চুপটি করে ইউভানের মুখের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে রইল।
ইউভান নিজের ট্রাউজার আর অ্যাপ্রনের নিচের অংশটা এক সেকেন্ডে ভিজে একাকার হতে দেখে একদম আকাশ থেকে পড়ল! ও ইয়ানকে দুই হাত দিয়ে সোজা নিজের চোখের সামনে উঁচুতে ধরে বিরক্ত মাখা গলায় চেঁচিয়ে বলল, ” এই পুচকে! হিসু করে চুপ করে আছিস কেনো হ্যাঁ? দুনিয়াতে এতো জায়গা থাকতে আমার কোলেই হিসু করতে হলো? এখন কি আমি এই ভেজা ট্রাউজার পরে ওটি তে যাবো? অপারেশন কি তোর বাপ করবে? ও সরি তোর বাপই তো করবে। শালা তুই একটা বিচ্ছু। জ্বালিয়ে মারলি তুই আর তোর মা আমাকে”
ইউভানের এই আজব আশরাফুল মার্কা চিল্লানি শুনে এমন হুট করে বলে ফেলা সংলাপ গুলো শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশফা নিজের মুখে ওড়না চেপে ধরল। ও হাসবে নাকি কাঁদবে সেটা ও বুঝতে পারছিল না। ও অবাক হয়ে দেখল এই ছেলেটা সব সময় নিজেকে ইয়ানের বাপ দানি করে৷ অথচ নিজের বাপ খোঁজ ও নেই না। ইয়াশফার রাগ হয় ঋষভের উপর ঋষভের জন্য অন্য একটা পুরুষ ওর ছেলেকে নিজের বাপ দাবি করে। ইয়াশফা বললো “চুপ একদম ও আপনার ছেলে না ও আমার ছেলে। আমিই ওর মা আমিই ওর বাবা দরকার নেই আপনার”

ইউভান আর কথা বাড়াল না, ও ইয়ানের কপালে একটা শেষ কামড়ের মতো গভীর চুমু দিল। তারপর ইয়ানকে সাবধানে ইয়াশফার কোলের ওপর ফিরিয়ে দিয়ে নিজের ভিজে যাওয়া ট্রাউজারটা একটু ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “কালকে সকাল সকাল তোমার গায়ে হলুদ বেবিগার্ল। যদিও আমি খুব ভালো করেই জানি এই পুরো বিয়েটাই একটা মিছেমিছি নাটক তবুও কেন জানি না, আমার মনের ভেতর খুশি কাজ করছে। আমি কাল সকালের জন্য প্রস্তুত।”
কথাটা শেষ করেই ও ওটি-র চেঞ্জিং রুমের দিকে ছুটে গেল। আর ইয়াশফা ইয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে হসপিটালের করিডোরের বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকাল,
এইদিকে…

রিদ নিজের ঘরে বসে মনোযোগ দিয়ে কিছু কাজ করছিল। ঠিক তখনই ওর ফোনে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলো। রিদ একটু অবাক হয়ে কলটা রিসিভ করে কানে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কে?”
ওইপাশ থেকে কোনো ভূমিকা ছাড়া, এক ভয়ঙ্কর গম্ভীর গলা ফিসফিসিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল,
“আই উইল কিল ইউ, পাপা।”
রিদের ঠোঁটের কোণে এক নিমেষে ওনার সেই চতুর আর শয়তানি হাসিটা ফুটে উঠল। ও নিজের চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বসল। ও স্বাভাবিক গলায় ওপাশের উদ্দেশ্যে বলল, “কি বস ভালো তো? কেমন আছো? সব ঠিকঠাক?”
ঋষভ ওপাশ থেকে কিছুটা উত্তেজিত আর ক্ষ্যাপাটে গলায় চেঁচিয়ে বলল, “আই হেইট ইউ পাপা, আই জাস্ট হেইট ইউ! তুমি আমার সাথে এই কাজটা কীভাবে করতে পারলে? তুমি তো সব সত্যি জানতে। সবকিছু জানতে তুমি! তাহলে জেনে-বুঝে এখন আমার বউ কে অন্য পুরুষের সাথে বিয়ের এই নাটক কেন করছ?”
রিদ ছেলের এই খ্যাপাটে রূপ দেখে জোড়ে জোড়ে হেসে উঠলো। ও নিজের গলার স্বরটা কড়া করে ধমকের সুরে বলল, “চুপ থাকো তুমি! তোমার মুখে এসব কথা সাজে না। তুমি নাকি ওকে কোনোদিন নিজের বউ বলে মানবা না? আবার ওর সাথে বেয়াদবি করে ওকে রেখে দেশ ছেড়ে চলে যাবা আর আমি সব মুখ বুজে মেনে নিবো? অত সহজ না ঋশ!”

ঋষভ এবার নিজের রাগটা কোনোমতে চেপে অসহায় আর উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
” পাপা আমি কি শখ করে ছেড়ে গেছিলাম ওকে?
ইউ নো না আই অ্যাম আ সিক্রেট এজেন্ট! আমাকে মিশনে যেতেই হতো পাপা। তুমি তো সব কিছু জানো তাহলে কেনো এমন করছো?
রিদ এবার নিজের আসল চালটা চালল। ও টেবিলের ওপর সজোরে একটা থাপ্পড় মেরে ওখান থেকেই কড়া গলায় বলল, “মিশনের দোহাই দিও না! আমি তোমাকে সোজাসাপ্টা একটা শেষ সুযোগ দিচ্ছি। তুমি কি আজ এই মুহূর্তে স্বীকার করো যে ইয়াশফা তোমার নিজের বিবাহিতা স্ত্রী? ওকে তুমি নিজের বউ বলে মানো? যদি আজ নিজের মুখে এটা স্বীকার করো, তবে আমি নিজে এই বিয়েটা এখনই ভেঙে দেবো।”
ফোনের ওপাশ থেকে এক দীর্ঘ আর থমথমে নীরবতা নেমে এলো। ঋষভ কিছুতেই হার মানতে চাইল না। ও নিজের ভেতরের সবটুকু রুক্ষতা এক জায়গায় এনে গম্ভীর আর কাটকাট গলায় বলল, “নো! আই ডোন্ট লাইক হার। আমি ওকে বউ বলে মানি না।”
রিদ শয়তানি হাসিটা হেসে ওপাশে থাকা ঋশের মেজাজ আরও চাঙ্গা করে বলল, “ওকে! ফাইন! তোমার যখন বউ কে নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই, তাহলে তোমার বউয়ের বিয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ইউভানের সাথে ধুমধাম করে দেবো, হেহে।”

ঠিক তখনই ফোনের ওপাশ থেকে এক অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য শব্দ ভেসে এলো। রিদ ওর কানের স্পিকারে স্পষ্ট শুনতে পেল ওপাশে থাকা ঋষভ হুট করেই কেমন যেন ফুঁপিয়ে উঠল! ও একনাগাড়ে করুণভাবে কাঁদছে। ছেলের কান্নার আওয়াজ কানে পৌঁছানো মাত্রই রিদের মাথার ওপর যেন এক আকাশ ভেঙে পড়ল! ওর পুরো শরীর এক সেকেন্ডে পাথরের মতো হয়ে গেল। ঋষভ কাঁদছে?! এটা কীভাবে সম্ভব? ও বড় হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত রিদ ওকে কোনোদিন কাঁদতে দেখে নি।।এমনকি যখন বয়স ১২ বছর তখন থেকেই ঋশ চুপচাপ ব্যথা লাগলেও মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না। সেই ছেলে কাঁদছে? এটা কিভাবে মেনে নিবে রিদ? রিদ নিজের সন্দেহ দূর করতে
ছটফটে আর অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ঋশ? কাঁদছ কেন তুমি?”
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না, শুধু ভারী নিশ্বাসের আর ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। রিদ নিজের চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে কাতর গলায় আবার বলল, “এই ঋশ, কথা বলো আমার সাথে? কী হয়েছে তোমার?”
ঋষভ তবুও কোনো কথা বলল না। ও এক অবুঝ বাচ্চার মতো ওপাশে একলা অন্ধকারে কেঁদেই চলল। রিদ এবার ওনার নিজের ইগো একপাশে সরিয়ে রেখে নরম আর আদুরে গলায় বলল, “বাবু, প্লিজ কথা বলো পাপার সাথে? পাপা শুনবে তেমার সব কথা সোনা, প্লিজ কথা বলো।”
ঋষভ হঠাৎ ওর ওই কান্নামিশ্রিত, ভাঙা আর একদম নিচু কণ্ঠে আকুল হয়ে স্বীকার করে বসল, “আই রিয়েলি লাভ হার, পাপা…”

ছেলের মুখ থেকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আর কাঙ্ক্ষিত সত্যিটা শোনা মাত্রই রিদ পুরো মুখে এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। ওর এতদিনের সাজানো সব নাটক আজ এক সেকেন্ডে সফল হয়ে গেল। রিদ নিজের মুখের সেই চতুর হাসিটা আবার ফিরিয়ে এনে গম্ভীর গলায় বলল, “তাহলে ধরে নিবো যে তুমি ওকে নিজের বউ বলে মানো?”
ঋষভ নিজের চোখের পানিটা এক ঝটকায় মুছে নিজের সেই ইগোটা আবারও ফিরিয়ে আনল। ও গম্ভীর মুখে এক লাইনে সাফ জবাব দিল, “নো!”
রিদ ঋষভের ওই এক লাইনের “নো” জবাব শুনে শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে। যেদিন নিজের মুখে দাঁড়িয়ে ওকে নিজের স্ত্রী বলে স্বীকার করবা, মানে যেদিন নিজের এই ইগো ভুলে আমার সামনে এসে নিজের মুখে বলবা “পাপা, আমি ওকে আমার নিজের বউ বলে মানি ”
ঠিক সেদিনই তুমি তোমার বউকে ফিরে পাবে তার আগে কোনো সুযোগ নেই।”
ঋষভ ওপাশ থেকে নিজের জেদ আর রাগ বজায় রেখে আবারও এক লাইনে বলল, “মানি না ওকে আমার বউ বলে!”

রিদ শয়তানি হাসিটা হেসে আয়েশ করে বলল, “ওকে! ফাইন! তাহলে ঘরে বসে মুড়ি খাও, সাথে একটু খাঁটি সরিষার তেল মেখে নিও, মজা লাগবে খেতে।”
কথাটা শেষ করেই রিদ ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তরের সুযোগ না দিয়ে খট করে নিজের ফোনটা কেটে দিল। কলটা কাটার পর ওর শয়তানি হাসিটা কেমন যেন ফিকে হয়ে গেল। রিদ একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের টেবিলের ফাইলের দিকে তাকিয়ে অপরাধী গলায় আলতো করে বলল,
“সরি ঋশ, আই অ্যাম রিয়েলি সরি আমি তোমাকে আরও একটি বড় মিথ্যা বলেছি।”

রিদের মুখ থেকে এই আচমকা কথাটি বের হওয়া মাত্রই ঘরের দরজার পর্দা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল মিহি। ও এতক্ষণ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে বাবা-ছেলের এই সব কথা নিজের কান খাড়া করে শুনছিল। মিহি ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। ও রিদের দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরের এতদিনের জমে থাকা সমস্ত কান্না আর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল, “আমার ছেলেটার কপাল এতটাই পোড়া যে তার নিজের একটা ছেলে আছে সেটাই সে এখনো জানে না! ও নিজের সন্তানকে অন্যের বাচ্চা ভেবে দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। এই সব তোমার ওই একগুঁয়ে জেদ আর প্ল্যানের কারণে হয়েছে । তুমি আসলেই অনেক নিষ্ঠুর, পাষাণ তুমি!”
মিহির এই কান্নাভেজা নালিশ শুনে রিদ নিজের চেয়ার থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ও মিহির কাছাকাছি এসে শান্ত গলায় বোঝানোর সুরে বলল, “আমি কী করতাম বলো, মিহি? তুমি নিজেই সেই পরিস্থিতিটা একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো। সে সময় আমি যদি এই সত্যিটা সিক্রেট না রাখতাম, আর ঋশ যদি কোনোভাবে নিজের বাচ্চার খবর জানতে পারত তাহলে ও নিজের মিশন-ফিশন সব মাঝপথে বাদ দিয়ে ব্যাক করত। আর ও যদি তখন ফিরে আসত, তবে শত্রুদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে লাভের থেকে আমাদের সবার ক্ষতি হয়ে যেত। পুরো রায়ান কুঞ্জ ধুলোয় মিশে যেত!

আমি কি সবার জীবন এভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারতাম? ও আমার নিজেরও রক্ত মিহি। আমিও চাই ও নিজের সন্তানের সবটা জানুক, নিজের ছেলেকে নিজের বুকে টেনে নিক। তবে এখন নয় আর কিছুদিন পর, ওর এই আন্ডারগ্রাউন্ড মিশনসম্পূর্ণ শেষ হোক।”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪০

মিহি রিদের কথাগুলো ভালো করে বুঝলো। কিন্তু একজন মা হিসেবে নিজের ছেলের এই কষ্ট ও আর সহ্য করতে পারছে না। ও রিদের বুকের ওপর আলতো করে একটা কিল মেরে মুখ ফুলিয়ে কান্নাভেজা গলায় বলল, “সব থেকে বড় শয়তান তো তুমি নিজে! তুমিই আড়ালে থেকে কাঠি করছ

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here