মহামায়া পর্ব ৫৫
তুশকন্যা
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, অতঃপর রাতের আঁধারে সমগ্র মিউনিখ ঢাকা পড়েছে। তবে তিন রমণীর আবাসস্থলে ড্রইংরুমে আজ ভিন্ন রকমের আমেজ। সকলেই কাজকর্ম পড়াশোনা কোনোমতে গুটিয়ে, সোফায় বসে টিভির স্ক্রিণে চেয়ে আছে। যে করেই হোক, আজ রাতে আর ঘুমালে চলবে না। একে তো ফুটবল বিশ্বকাপের আমেজ, তার উপর আজ তিন রমণীর একত্রে প্রিয় দল আর্জেন্টিনা’র ম্যাচ। প্রত্যাশার চেয়ে তীব্র আত্মবিশ্বাস নিয়েই আইজেল-আনায়া-সাবা সেই ম্যাচ উপোভোগ করছে।
এরিমধ্যে খেলায় হাফ টাইমের ব্রেক দিতেই, আইজেল-সাবা নিজেদের মতো খেলা নিয়ে নানান কথাবার্তায় মত্ত হলো। আনায়া সে-সবে তাল মেলালেও, টুপ করে ফোনটা হাতে তুলে নিতেও ভুলল না। খেলা দেখতে দেখতে অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে; এবার ঘুমে চোখদুটোও বুঁজে আসছে। এই হাফ টাইমের মাঝে যদি কার্যকরী কোনো আমোদের মাধ্যম খুঁজে না পাওয়া যায় তবে কখন যে ঘুমে তলিয়ে যাবে টেরও পাবে না। ফলরূপ আগামীকাল ঘুম থেকে উঠতেই আফসোসের ঝুলি নিয়ে বসতে হবে।
এতো ভাবনার পরও আনায়াকে বেশি বেগ পেতে হলো না, তার যথাযথ সময় কাটানোর মাধ্যমটিকে খুঁজে পেতে। আগপাছ না ভেবে সোজা জুলি সেজে টেক্সট করে বসল কেনীথকে; এমনিতেও ভার্সিটির পর লোকটার সাথে আর দেখাসাক্ষাৎ হয়নি তার। বন্ধুদের চক্করে পড়ে বিকেল-সন্ধ্যা পুরো সময়টা কেটে যাওয়ায় আর অফিসেও যাওয়া হয়নি তার।
“হাই জান, কি করো?”
মিনিট পাঁচেক কেটে গেলেও কোনো প্রত্যুত্তর এলো না। আনায়া এবার উসখুস করতে লাগল। মনে মনে ভাবতে লাগল,
” লোকটা কি এতো দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছে? কই,রাত তো ততটাও বেশি হয়নি। আচ্ছা, উনি কি খেলাও দেখে না নাকি? ধূর! এতো কিসের ব্যস্ততা? জীবন তো একটাই, একদিন তো ম’রেই যাব!”
তার ভাবনা কাটতে না কাটতেই টুং করে নোটিফিকেশন বেজে উঠল,
“জ্বী বলুন,কি চাই?”
—“চাই তো সবসময় তোমাকেই। কিন্তু তুমি আমার কাছে ধরা দিলে তো!”
—“ধরা আমি দিচ্ছি না? আই থিংক, আপনি ভুল ভাবছেন। আপনি চাইলে, আমরা আমাদের ফাস্ট ডেটের প্ল্যানিংও সেরে ফেলতে পারি।”
আনায়া ভ্রু উঁচিয়ে মেসেজখানা গুনেগুনে দুবার পড়ল। অতঃপর বলল,
“মানে ঐ পরকীয়া?”
—“হ্যা, হ্যা, ওটাই। এমনিতেও… পরকীয়ার নিমন্ত্রণ পাঠিয়ে হঠাৎ দুদিন ধরে গায়েব ছিলেন কেনো?”
—“ঐ একটু কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তোমায় বলেছিলাম না? তোমার মতো আমারও অনেকগুলো বয়ফ্রেন্ড আছে, ওদেরও তো সময় দিতে হয় তাই না?”
—“তা তো অবশ্যই, কিন্তু আমাদের ব্যাপারটা কি হবে?”
—“কি আর হবে, তুমি তো এখনো আমাকে সেই আপনি আপনি করেই ডাকো। এখনো আপনি হতে তুমিতে শিফট হতে পারলে না, সেখানে পরকীয়া কি করে করি, বলোতো?”
—“হুমম…এটাও ভাববার বিষয়। এইজন্যই বলছি, আমাদের হয়তো এবার দেখা করা উচিত।”
আনায়া কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে নিল। মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ঘটনা কি! আজ হঠাৎ দেখা করার জন্য উনি এতো উতলা কেন?”
আঁড়চোখে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল আইজেল-সাবা এখনো নিজেদের আলোচনায় ডুবে।এই ফাঁকে সে চোরের মতো আবারও টেক্সট করতে লাগল,
“দেখা-সাক্ষাৎ তো হবেই, সে আর তেমন কি। এরচেয়ে ভালো হয় কিছুদিন ফোনেই না হয় প্রেম…ওহ সরি, পরকীয়াটা চালিয়ে নেই।”
—“অলরাইট, অ্যাজ ইউ উইশ।”
দুজনের কথোপকথনে বিরতি এলো। আনায়া নিজের আমোদে মত্ত রইলেও, অন্যপ্রান্তে কেনীথ তখন বেজায় ব্যস্ত। অফিস থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে ম্যাকবুকটা নিয়ে বসে পড়েছে। তার আশেপাশেই আবার ঘুরঘুর করছে কেনেল-ক্লারা। একটা সময় এই দুজনকে প্রচুর সময় দিতে পারলেও, ইদানীংকালে বেচারা দুটোর আশেপাশে ঘেঁষারও সময় হচ্ছে না তার।
কাল আবার ফরেনার ক্লাইন্টদের সাথে মিটিংও আছে। আনায়া তার নামেমাত্র পিএ হওয়ায়, এসব কাজ তাকে হাতে ধরে নিজেকেই করতে হবে। একইসাথে আবার জুলি নামক বদমাশ ছদ্মবেশীটাকেও এক্সট্রা সময়ও দিতে হচ্ছে। তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়—কাজের ব্যস্ততায় বারবার তার ললাটে ভাজ পড়লেও আনায়াকে নিয়ে তার বিন্দুমাত্র বিরক্তিবোধ নেই। সে সুক্ষ্ম ভাবে দুটোকেই একত্রে ব্যালেন্সড করে যাচ্ছে।
এদিকে আনায়া জিজ্ঞেস করার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে লিখল,
“আপনি কি ব্যস্ত আছেন?”
—“হুম!”
—“খেলা দেখেন না?”
—“সময় হয়নি।”
—“ওহ আচ্ছা! ভারী ব্যস্ত লোক আপনি।তো…
⠀⠀⠀বিশ্বকাপ চলে, আপনি কোন দলের সাপোর্টার?”
কেনীথ একহাতে ম্যাকবুকের কিবোর্ড চাপতে চাপতে অন্যহাতে মেসেজ চেক করে সংক্ষেপে প্রত্যুত্তর পাঠাল,
—“জার্মানি।”
মুহূর্তেই আনায়ার চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। পুরো আশাতেই ছাই পড়ে গেল যেন!
—“ছিঃ, ছিঃ, আপনি মেসি সাপোর্টার না? আমি তো আপনাকে ভালো মানুষ ভেবেছিলাম।”
—“দল সাপোর্টের ভিত্তিতে মানুষের ভালোমন্দ বিচার?…বাই দ্য ওয়ে, মেসি যে দলের নাম তা জানা ছিল না।”
—“বেশি বুঝেন খালি, মেসি দলের নাম কেন হবে? আমি তো আর্জেন্টিনা সাপোর্টার, তাই আর্জেন্টিনার কথাই বলেছি।”
—“মিস জুলি, আই হ্যাভ অ্যা কোশ্চেন ফর ইউ। আর্জেন্টিনা সম্পর্কে আপনি জানেন কতটুকু?”
—“আমি? আর্জেন্টিনা সম্পর্কে? যতটুকু জানার ততটুকুই জানি। না জানার কি আছে? আর্জেন্টিনায় মেসি আছে। মেসির তিনটা ছেলে আছে, তার একটা বউ আছে। নামটা মনে হয় আন্তেনিলা রুপাঞ্জেল, উনি দেখতেও সুন্দর আছে। আর এমনিতে আর্জেন্টিনার দলে দিবালা আছে, মারিয়া আছে, আরো অনেকেই আছে, ওদের বউও আছে বাচ্চাও আছে। প্রত্যেকবার বিশ্বকাপেই আমি সবার নাম মুখস্থ করি, এবারও করেছি কিন্তু এখন ঠিক মনে পড়ছে না।”
কেনীথ আর প্রত্যুত্তর পাঠালো না। মনে মনে আওড়াল,
“এই ইডিয়েটকে গরুর রচনা কে লিখতে বললো!”
কেনো যেন খুব ইচ্ছে করছে, এই নাম্বারটাকে এক্ষুণি ব্লকলিস্টে ঝোলাতে। স্বাভাবিক ভাবেই অহেতুক আলাপ করা লোকজন তার সহ্য হয়না। কিন্তু আনায়ার ক্ষেত্রে বিষয়টা বোধহয় খানিক ভিন্ন। তাই বাধ্য হয়েও সে নিজের মনমর্জির বিরুদ্ধে গিয়ে, আনায়াকে আর ব্লক করল না।
কিন্তু ওদিকে আনায়া কোনো রিপ্লাই না পেয়ে ঠিকই চটে গিয়েছে,
—“কই ,কই, আবার কই গেলেন?
আপনাকে একটা প্রস্তাব দেই শুনেন—সময় থাকতে দল পাল্টে আর্জেন্টিনায় চলে আসুন। লোকে আপনাকে ভালো বলবে, নাহলে বলবে আপনি একটা জার্মান হিটলার। গতবার আমরা একটা ওয়ার্ল্ডকাপ জিতেছি, এবারও জিতবো দেখে নিয়েন।”
কেনীথ চাপা বিরক্তিতে দম্ভের সাথে লিখল,
—“আমাদের অলরেডি চারটা কাপ আছে।”
—“এ্যাহ, কাপের পাওয়ার দেখান? ওমন কাপ তো পাঁচটা ব্রাজিলেরও আছে। কিন্তু তারপরও দেখেন, ওদের কেউ সন্মান করেনা।সবাই সেভেন আপ বলে ডাকে।”
—“আর লোকে এই কারণেই আমাদের বাপ ডাকে। কারণ ওদের সেভেনআপ-টাও বোধহয় আমরাই দিয়েছিলাম।”
আনায়া চোখদুটো সরু করে মেসেজ খানা দেখে। পরক্ষণেই দাঁত কিড়মিড়িয়ে ওঠে,
—“এ্যাহ আসছে, তো এখন কি আমি আপনাকেও আব্বা বলে ডাকব নাকি, অসভ্য লোক! দল পাল্টাতে না পারলে আর কখনো মেসেজ দিবেন না। আর্জেন্টিনা যারা করেনা,ঐসব লোকের কোনোদিন ভালো হয় না। আপনারও হবে না—বিয়ের আগেই বউ পালায় যাবে দেখে নিয়েন।”
আক্রোশে মেসেজটা পাঠিয়েই ফোনটা সোফার একপাশে ছুঁড়ে মা’রল আনায়া৷ হাফটাইম প্রায় শেষ হতে চলল। তবে তার সুন্দর সাজানো-গোছানো মেজাজ তখন তুঙ্গে। তার বাবা-বোনদের সবসময় দেখেছে বিশ্বকাপে চিরকাল আর্জেন্টিনা’র সাপোর্ট করতে। একবার তো তার বাবা বলেও ছিল—তারা বংশগত আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। আর এটাই তাদের এহসান বংশের রীতি। তাহলে এই কথা যদি সত্য হয়, তবে তার স্বামী মহাশয় কোন প্রজাতির বংশধর হয়েছেন? দেশ পাল্টানোর সাথে সাথে বংশধারাও পাল্টে ফেলেছেন? এ তো বংশধর নামের কলঙ্ক!
নানান সব ভাবনায়, রাগে হাত-পা গুটিয়ে আনায়া স্বগত হিসহিসিয়ে উঠল,
“ধূর,ধূর, কি একটা মুসিবত! ওনার সাথে তো আমার কোনোকিছুই মেলে না। এভাবে হলে কিভাবে চলবে? সারাজীবন কি নিয়ে সংসার করবো আমি? আল্লাহ্, আমার অন্তর-কলিজা সব জ্বলে যায় খোদাআহ্!
হঠাৎ তার মেজাজের এহেন পরিবর্তন আইজেলের নজরে পড়তেই, সে সাবার সাথে গল্প থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কি হলো আনায়া? তোমার আবার কি হলো?”
আনায়া নিজের আক্রোশকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বলল,
“আমার কপালেই সব ভুলভাল জিনিস জুটেছে, কোনোটাই কাজের না। জার্মান হিটলার একটা!”
আনায়া নিজের মেজাজে হুশে না রইলেও, আইজেলের চোখদুটো আরো খানিকটা সরু হলো। কি যেন ভেবে হুট করে বলে বসল,
“হঠাৎ এভাবে রেগে আছো। তুমি কি জেইনের সাথে কথা বলছিলে নাকি?”
আনায়া নিজেকে তটস্থ করে নড়েচড়ে বসল,
“কই না তো।”
আনায়ার আশ্বস্ত করার ঢঙে আইজেল ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“না, এমনিতেই বললাম আরকি। হঠাৎ কাকে যেন জার্মান হিটলারের কথা বলছিলে…যাই হোক, চলো চলো খেলা শুরু হবে আবার৷ আমি গিয়ে কিচেন থেকে আরো কিছু স্ন্যাকস নিয়ে আসি।”
পরদিন সকাল বেলা; সারারাত ধরে খেলা দেখা আর আড্ডা-গল্পের মাঝে তিন রমণীর দুচোখের পাতা এক হয়েছে ভোর নাগাদ৷ ঘন্টা তিনেক আগে হতে প্রত্যেকটা কক্ষে এলার্ম বাজতে বাজতে যেন এলার্ম বাবাজী নিজেও হাঁপিয়ে উঠেছে। এলার্মের শব্দ কানে পৌছাতেই তারা সেটিকে বন্ধ করে দিয়ে আবারও ঘুমের ঘোরে তলিয়ে যাচ্ছে। আর এটাই ঘন্টা কয়েক ধরে লাগাতার পুনরাবৃত্ত হওয়ার পর অবশেষে সেই এলার্মগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে।
ফলাফলস্বরূপ ভার্সিটির কথা একপ্রকার চিরতরে ভুলতে বসে, রমণীদের চোখের পাতাই আর এখন খুলছে না। এভাবে আরো মিনিট দশেক কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ আনায়ার ঘুম ভাঙল। সে আনমনা হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করার পর হঠাৎ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। হাতড়ে ফোনটা খুঁজে নিয়ে সময়টা দেখতেই চোখদুটো ছানাবড়া। সাড়ে দশটা ছাড়িয়ে এগারোটা বাজতে চলল; এতো বেলা করে আজ ঘুম থেকে উঠেছে ভাবতেই যেন তার অক্কা পাবার দশা। আচ্ছা আইজেল আর সাবা উঠেছে তো? হয়তো না! ওরা উঠতে নিশ্চয় তাকেও ভার্সিটির জন্য ডাক দিতো।
আনায়া আগপাছ না ভেবে আইজেল-সাবার কথা ভেবে রুম থেকে বেরিয়ে তাদের ডাকতে উদ্যত হয়। তবে তক্ষুনি তার মনে পড়ে, ভার্সিটির যথার্থ সময় পেরিয়ে গিয়েছে। এখন আর ওদের ডেকে লাভ নেই। তার চেয়ে ঘুমাচ্ছে যখন ঘুমাতে থাক। এমনই ভাবনায় অস্থির হয়ে ওঠা আনায়া হঠাৎ শান্ত গা-ছাড়া ভঙ্গিতে হেলে-দুলে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
ওয়াশরুম হতে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে, সে সোজা নিচে নেমে এলো। ব্রেকফাস্টে তিনজনের জন্য হালকা-পাতলা ব্রেড-টোস্ট আর এগপোচ তৈরি করে, বসে বসে নিজের খাবারটুকু খেয়ে নিল। অতঃপর আইজেল-সাবার খাবারগুলো সুন্দর করে টেবিলে সাজিয়ে, প্লেট দিয়ে ঢেকে রেখে আবারও চলল তার নিজের ঘরে।
কিন্তু এখন তার ঠিক কি করা উচিড বুঝে উঠতে পারছে না। কিছুক্ষণ রুমের ভেতর ভাবুক চিত্তে, এলোমেলো পায়ে পায়চারি করতে করতে ভাবল,
“কেবল তো ঘুম থেকে উঠলাম, এখনই কি পড়তে বসতে হবে? একটু পর দুপুর হয়ে যাবে, থাক গোসল করে খেয়েদেয়ে তারপর পড়তে বসবো।”
এই ভাবনাতেই সে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ রিলস্ স্ক্রল করেও খুব একটা মন বসল না তাতে। খুঁজে খুঁজে ঢুকে পড়ল কেনীথের ইনবক্সে। লোকটা কি এই সময়ে এক্টিভ আছে? কে জানে!একটা মেসেজ দিয়েই দেখা যাক। আজ তো তার ভার্সিটিতেও কোনো ক্লাস নেই বোধহয়।
যথারীতি আনায়া বিছানায় নড়েচড়ে পদ্মআসনে দুপা গুটিয়ে, টাইপ করল,
“গুড মর্নিং! কি করছেন?”
মিনিট দুয়েক কেটে গেল, কোনো রিপ্লাই নেই। আনায়া ধৈর্য ধরে আরো চারমিনিট অপেক্ষা করল। লিখল,
“গুড মর্নিং বলেছি, কিছু তো বলুন!”
এবারও কোনো প্রত্যুত্তর নেই। বরং আনায়া ত্যক্ত হয়ে ফোনটা রাখতে যাবে, তখনই খেয়াল করল কেনীথ তার মেসেজ সিন করেছে। আনায়া আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করল, হয়তো এই বুঝি লোকটা রিপ্লাই পাঠাবে। কিন্তু না! মিনিট পাঁচেক আরো কেটে গেলেও, ওপাশ হতে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
আনায়া দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল,
“আরেব্বাস্! সিন করল অথচ রিপ্লাই দিলো না? ওয়েট দেখাচ্ছি মজা।”
আনায়া আবারও লিখতে থাকল,
“এতো অসভ্য কেন আপনি হ্যাঁ?”
” মেয়েদের মেসেজ সিন করেন অথচ রিপ্লাই করেন না।”
“এতো কিসের ভাব আপনার? সবসময় খালি ভাব দেখানো, তাই না?”
“আপনাকে তো আমি…”
আনায়া থেমে গেল। ওপাশ হতে সংক্ষেপে প্রত্যুত্তর এলো,
“মিটিং-এ আমি।”
আনায়া চোখমুখ চুপসে মেসেজটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। অন্যান্য সময় হলে অবশ্য নিজেকে বুঝ মানিয়ে বুঝদারের মতো বিষয়টাকে থামিয়ে দিত কিন্তু না! আনায়ার মনে হঠাৎ অদ্ভুত এক ফন্দি আঁটল। সে ফোনটা নেড়েচেড়ে বিছানা হতে উঠে দাঁড়িয়ে, আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের গায়ে জড়ানো ঢিলেঢালা কালো টিশার্ট-টাউজার পড়া অবয়বটুকু পরখ করে আচমকা এক কুটির হাসি হাসল। বিড়বিড়িয়ে করে আওড়াল,
“উনি তো আমারই! ওনার সাথে না হয় একটু-আধটু শয়তানি করাই যায়।”
যেই বলা সেই কাজ। একবারও ভাবল না, ওদিকে গম্ভীর-দাম্ভিক মানুষটার অফিস মিটিংএ ঠিক কি পরিস্থিতিতে অবস্থান করছে। নিজের অবাধ্য ভাবনাগুলো গুছিয়ে, নতুন বদমাশি করার লক্ষে তোরজোড় শুরু করে দিল আনায়া।
বিশাল-সুসজ্জিত কনফারেন্স রুম জুড়ে থমথমে গম্ভীর এক আবহ বিরাজ করছে। প্রকাণ্ড টেবিলটিকে ঘিরে বসে আছে দেশি-বিদেশি উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা ও ক্লায়েন্ট। সেখানে ইমানি, পাভেল এবং কেনীথ সহ উপস্থিত সকলেই স্ব-স্ব স্থানে বেশ গম্ভীর। বিগত এক বছরে ব্লাডেন ইন্ডাস্ট্রিজের যে হারে ধস নেমেছিল, তা এই মুহূর্তে যথাযথভাবে সামলে নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি; সর্বদা এসব বিষয়ে গা-ছাড়া কেনীথও এখন সর্বক্ষণ এই ভাবনায় ডুবে থাকে।
কক্ষের ঠিক মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে কেনীথ পুরো প্রজেক্টের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিবরণ উপস্থাপন করছিল। পেছনের দেয়ালের বিশাল প্রজেক্টর স্ক্রিনে ভেসে উঠছিল বিভিন্ন প্রেজেন্টেশন ও গ্রাফ। কখনো স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে সাবলীল ভাষায় জটিল সমীকরণ ব্যাখ্যা করা, তো কখনো টেবিলে ঝুঁকে ল্যাপটপে কারিগরি দিকগুলো খতিয়ে দেখা—পুরুষ তার কাজে ছিল পুরোপুরি ব্যস্ত। অথচ এই সবকিছুর মাঝেও বাধ্য হয়ে তাকে কখনো কখনো ফোনটির দিকেও নজর রাখতে হচ্ছিল। একের পর এক কাজের চাপ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফোনের ভাইব্রেশন মোডটুকু সাইলেন্ট করার মতো ফুরসতও তার হচ্ছে না।
মিটিংএর বিষয়ে আনায়াকে অবগত করার মিনিট দশেক পর্যন্ত সব স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটি আবারও কিছু আগত মেসেজের নোটিফিকেশনে কম্পিত হলো।
কাজের প্রতি গভীর মনোযোগ থাকা সত্ত্বেও ফোনের এই ক্ষীণ সাড়াশব্দে কেনীথের ধ্যান কিছুটা বিঘ্নিত হলো। মুখে ক্লায়েন্টদের উদ্দেশ্যে সাবলীলভাবে বিবরণ দিয়ে যাওয়ার মাঝেই সে অলক্ষ্যে ফোনটি হাতে তুলে নিল।
ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে প্রজেক্টর স্ক্রিনের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখদুটো আটকে গেল ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা আনায়ার পাঠানো একটিমাত্র ছবিতে—আলতো এক হাতে রমণীর পরিহিত ঢিলেঢালা কালো টি-শার্টটি বেশখানিকটা ওপরে উঁচিয়ে তোলা; আর সেই সুবাদে প্রস্ফুটিত হয়েছে তার কোমল ফর্সা ত্বকের লতানো তনু কোমরখানা।
এছাড়া ছবিটির নিচে অতি সংক্ষিপ্তে লেখা,
”এই দেখুন আমার চিকনি কোমর, সুন্দর না?”
দৃশ্যটি দেখা মাত্রই কেনীথ চরমভাবে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল; আচমকা বিষম খেয়ে উঠল। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এই পরিস্থিতিতে সে নিজের ওপর থেকে প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসলো। হাত থেকে অসাবধানতাবশত ফোনটি পড়ে যেতে নিলেও, অন্তিম মুহূর্তে সে তা সামলে নিল।
হঠাৎ কেনীথের এই আকস্মিক বিচলিত ভাব দেখে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি তার ওপর নিবদ্ধ হলো। সকলের মাঝে উদ্বেগের রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ইমানি ভ্রু কুঁচকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি পানির বোতল নিয়ে কেনীথের দিকে এগিয়ে গেল। কেনীথ দ্রুত নিজের ফোনটি লক করে স্ক্রিন নিচের দিকে দিয়ে টেবিলের ওপর রেখে দিল—যাতে কারও নজরে কিছু না পড়ে।
কিন্তু নিজেকে শত চেষ্টা করেও স্বাভাবিক-স্থির করতে পারছিল না সে। ইমানি বা উপস্থিত আর কেউই বুঝতে পারছিল না যে, হঠাৎ এমন কী ঘটল!
ইমানির হাত থেকে পানির বোতলটি নিয়ে কেনীথ এক নিঃশ্বাসে বেশ কিছুটা পানি ঢকঢক করে গিলতে লাগল। ইমানি গভীর উদ্বিগ্ন গলায় প্রশ্ন করল,
”হঠাৎ কী হলো তোর? ঠিক আছিস তো তুই?”
কেনীথ কোনো উত্তর দিতে ব্যর্থ। তার রক্তচাপ যেন একলফ্যে মাথার শিখরে গিয়ে ঠেকেছে। কিছু মুহূর্ত পরেই ইমানির নজর আটকে গেল কেনীথের মুখের ওপর। কেনীথের নাসারন্ধ্র বেয়ে লাল রক্তের এক সরু রেখা নেমে আসছে। ইমানির সুক্ষ্ম সন্দেহ এবার আরও ঘনীভূত হলো। চরম মানসিক চাপ বা আকস্মিক উত্তেজনায় না ভুগলে তো এমনটা হওয়ার কথা নয়! কিন্তু কেনীথ তো স্রেফ নিজের ফোনটাই একবার দেখেছিল; তবে কী এমন ঘটল যে তার শারীরিক ভারসাম্য এভাবে বিঘ্নিত হলো?
ইমানি কণ্ঠে চাপা সতর্কতা এনে মৃদু স্বরে বলল,
”ভি! তোর নোস ব্লিডিং হচ্ছে!”
কথাটি বলেই সে দ্রুত টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে টিস্যু বক্সের দিকে হাত বাড়াল। ইমানির কথা শুনে কেনীথ নিজেও কিছুটা অবাক হলো। আঙুল দিয়ে নাসারন্ধ্র স্পর্শ করতেই সে রক্তক্ষরণের সত্যতা টের পেল। ইতোমধ্যে ক্লায়েন্টদের মধ্য থেকেও অনেকে কৌতূহল ও দুশ্চিন্তা নিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠলেন,
”মিস্টার ভিকে, আর ইউ ওকে?”
ইমানি ততক্ষণে কেনীথের হাতে টিস্যু পেপার তুলে দিয়েছে। কেনীথ দ্রুত রক্তটুকু মুছে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
”ইট’স ওকে, আই’ম ফাইন।”
উপস্থিত সকলকে কথার স্বচ্ছতায় আশ্বস্ত করলেও,মনে মনে সেই অবাধ্য,অসভ্য রমণীর স্মরণে সে দাঁতে দাঁত চেপে স্বগত উচ্চারণ করল,
”ইডিয়েট! তোকে শুধু আরেকবার হাতের নাগালে পাই…!”
নিজের যথাযথ কাজটুকু সমাপ্ত করে আনায়া এখন বেজায় খুশি। লোকটা মেসেজ দুটো দেখে কি প্রতিক্রিয়া দেবে বা দিচ্ছে সেসব নিয়ে আনায়া ভাবছে না। বরং সকাল সকাল এমন বদমাশি করতে অদ্ভুত এক মজা লাগছে তার।
যথারীতি কেবল কোমড়ের ছবি পাঠিয়েই আনায়া ক্ষ্যান্ত হলো না। সে ছটফট করতে লাগল নতুন কিছু করার জন্য।ফোনটা হাতে নিয়ে আয়নায় নিজেকে আবারও একঝলকে দেখে নিল। হাত-পা কিংবা গলা পরখ করতে আওড়াল,
“চেহেরার ছবি তো দেওয়া যাবে না; চিনে ফেলবে। তাহলে আর কিসের ছবি পাঠাবো?”
বলতে না বলতেই সে খুব কৌশলে নিজের ফর্সা চামড়া ভেদ করে হালকা দৃশ্যমান হয়ে ওঠা, সরু কলার-বোনের দুটো ছবি তুলল। একটা ছবি তৎক্ষনাৎ কেনীথকে পাঠিয়ে দিয়ে, নিচে ছোট্ট করে লিখল,
“এটা আমার বিউটিবোন। জানি,জানি এটাও সুন্দর। আপনি চাইলে এখানে দুটো চুমুও খেতে পারেন। আমি কিন্তু কিছু মনে করব না।”
জিভের অগ্রভাগ ওষ্ঠকোণের বাহিরে ঠেকিয়ে, টেক্সটুকুও পাঠিয়ে দিল একনিমিষেই। একগাল মুচকি হেসে নিজেই আবার বদমাশি চিন্তায় মগ্ন হলো। এবার নতুন কিছুর ছবি তুলতে হবে!
ভাবুক চিত্তে হঠাৎ ড্রেসিং টেবিলের উপর পা-টা তুলে দিয়ে, কালো টাউজারটা কোনোমতে টেনেটুনে হাটুঅব্দি উঁচিয়ে তুলল। ফর্সা পা-খানা একবার এপাশ-ওপাশ করে ভাবল,
“ঠ্যাং-এর ছবিও কি পাঠাবো? না থাক, বেশি বেশি হয়ে যাবে। এমনিতেও খারাপ না, আমার পা সুন্দরই আছে।”
নিজেকে দুখান প্রসংশাবাণী দিয়ে আনায়া ক্ষ্যান্ত হলো। কুটিকুটি করে হাসতে হাসতে সে চলল বিছানার দিকে। বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে ধাড়াম করে শুয়ে পড়ল। কেনীথ তার কোমড়ের ছবি সিন করলেও পরের মেসেজগুলো দেখেনি। আনায়া মনে মনে আশা রাখছে, কেনীথ হয়তো কোনো প্রত্যুত্তর করবে না। কিন্তু তার বড়ই ইচ্ছে করল একবার যদি সামনা-সামনি দেখতে পেত, লোকটার এইমূহূর্তে ঠিক অবস্থায় আছে!
—“যতই হোক, ছেলে মানুষ বলে কথা। একটু কি স্টিস্টেম হিলবে না? এতো কঢ়াহ্ একটা বউ আমি তার! হিলবে না কেন? অবশ্যই হিলবে! হেলে-দুলে সোজা চৌরাস্তা ঘুরে একদিন সোজা আমার কাছে চলে আসবে!”
আনায়া আবারও কুটিল ভাবনায় বিছানায় গড়াগড়ি করতে করতে হেসে উঠল। পরক্ষণেই দুহাতে চোখ-মুখ ঢেকে নিজমনে আওড়াতে লাগল,
“এসব তো কিছুই না। যেদিন ওনাকে পুরোপুরি হাতের নাগালে পাবো, ঐদিন তো আমি সবকিছু করে ছাড়ব; কোনোকিছু বাদ রাখব না। ইশশশ, কত বেহায়া আমি!”
বলতে না বলতেই আনায়া নতুন কোনো এক গম্ভীর ভাবনায় আওড়াতে লাগল,
“কই, আমি তো কখনো উল্টোপাল্টা মুভি-টুভি দেখিনা। তাহলে হঠাৎ ইমরান হাশমির ফিমেল ভার্সন হয়ে গেলাম কি করে?”
প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, উত্তর খোঁজার চেষ্টাটুকু করল না সে। চোখদুটো বুঁজে নিয়ে, সুপুরুষের প্রতিচ্ছবিকে কল্পনায় এঁকে নিল; ওষ্ঠকোণ কামড়ে ধরে গলা ছেড়ে গান ধরল,
মহামায়া পর্ব ৫৪
⠀⠀⠀⠀⠀মেরি নিগাহো মে ত্যেরা চেহারা রওয়া হ্যায়,
⠀⠀⠀⠀⠀গেহ্রে হ্যায় আরমা জানেজা পাগল সামাহ্যায়
⠀⠀⠀⠀⠀আপনে দায়ারে সে ম্যে তো ছুটনে লাগি হুঁ
⠀⠀⠀⠀⠀তেরে বাজুও মে আকে টুটনে লাগি হুঁ!
⠀⠀⠀⠀⠀তেরে বিন জীনা নেহীঁ হ্যায় গওয়ারা,
⠀⠀⠀⠀⠀তেরে বিন দিল কা নেহীঁ হ্যায় গুজারা
⠀⠀⠀⠀⠀তেরে বিন কৌন আপনা সাহারা, তেরে বিন!
⠀⠀⠀⠀⠀আশিক বানায়া আশিক বানায়া, আশিক
⠀⠀⠀⠀⠀বানায়া আপনে…..!”
