Home সুইটহার্ট সুইটহার্ট পর্ব ১৯

সুইটহার্ট পর্ব ১৯

সুইটহার্ট পর্ব ১৯
মোনালিসা মেহরোজ

নিজের ঘরে আয়নার সামনে নিঃশব্দে বসে আছে মেহরিন। মুখে নেই কোন আনন্দের ছাপ। খানিক আগেই পাল্লারের লোকেরা তাকে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। গায়ে ভারী কাঁচা গাঁধা ফুলের গহনা। তাজা থাকায় এখনো ফুলগুলো হতে সুভাস বের হচ্ছে ম ম করে৷ যা এসে সরাসরি নাসারন্ধ্রে বারি খাচ্ছে মেহরিনের। ভারি লেহেঙ্গা পরণে। লম্বা চুলগুলো বেশ স্টাইলিশ করে ছেড়ে দেওয়া। সেখানেও গাঁধা ফুলের সাথে লাল টুকটুকে গোলাপ আঁটকে দেওয়া।
মেহরিন আয়নায় নিজেকে খুব সুক্ষ্মভাবে একবার দেখে নিলো। সাজানো খারাপ নয়, তবে কোথাও একটা শূন্যতা অনুভব করছে রমণী। ফাঁকা ফাঁকা লাগছে ভিষন। সাথে মনের কোণেও সুক্ষ্ম ব্যথার রেশ অনুভব করছে। আজ গায়ে হলুদ, কাল বিয়ে। আদ্রিয়ানও তো সারা নামক মেয়েটাকে আপন করতে চলেছে একইভাবে।

মেহরিন বসে থাকতে পারেনা। বুকটা হুট করেই মোচড় দিয়ে ওঠে রমণীর। শুকনো ঢোক গিলে আলগোছে উঠে দাঁড়ায়। পা বাড়ায় খোলা বারান্দার পানে। বারান্দার দরজা ঠেলে রেলিংয়ের কাছে এসে একবার তাকায় নিচের দিকে। নিচের এই আনন্দঘন পরিবেশ দেখেও মেহরিনের ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটলো না। নিচে সকলে কত সাজগোছ করে ছবি তুলছে! ক্যামেরা ম্যানদের এক একজন হেদিয়ে মারছে। সূর্য ডুবেছে অনেক্ক্ষণ। গায়ে হলুদ অবশ্য একটু রাত করেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বলতে গেলে পুরোটা রাত”ই এই অনুষ্ঠানের রেশ থাকবে।
মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তাকায় আকাশের পানে। আজ চাঁদও ওঠেনি। ঘন কালো মেঘেরা আড়াল করে রেখেছে তা। মনে হয় তাদেরও মন খারাপ! হাঁসে মেহরিন। ক্লান্ত আর ভাঙা এক হাসি।
—এমনটা কেনো হচ্ছে আমার? নিজেকে এতোটা ভাঙা ভাঙা লাগছে কেনো? আমি তো এমনটা ছিলাম না!
ওপাশ থেকে উত্তর পেলো না মেহরিন। পাবেই বা কি করে! বাতাসে কথা বলছে যে! বাতাস কি আর উত্তর দিতে পারে?
ভাবনার মাঝেই হুট করেই পিছনে কারো অস্তিত্ব টের পেলো রমণী। ভ্রু কুঁচকে গেলো তার। পিছনে তাকাবে কি-না ভাবলো। অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। নিচে সাউন্ড বক্সে গান বাজছে মৃদু তালে। তবুও এই গম্ভীর আবহাওয়ায় খুব একটা দাগ কাটতে পারেনি। মেহরিনের অজান্তেই একটু ভয় হলো। কেউ এলে তো কথা বলবে! অথচ পেছনে সুস্পষ্ট আন্দাজ করতে পারছে নিস্তব্ধ হয়ে থাকা এক অস্তিত্বের।
পিছনের দীর্ঘদেহির মানবটি ভারী পদক্ষেপে এসে থামলো মেহরিনের পেছনে। একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। দামি পারফিউম এর কড়া ঘ্রাণ মেহরিনের নাকে ঠেকছে। এই ঘ্রাণটা মেহরিনের খুব চেনা, বড্ড বেশিই আপন মনে হলো।

—ক…কে?
অস্ফুট স্বরে আওড়ালো মেহরিন। সে জানে না কেনো পিছনে ঘুরতে পারছে না। অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে আছে রমণী। নড়াচড়া করতে পারছে না মোটেও। অদৃশ্য শক্তিবলে সে যেনো পাথরের ন্যায় জমে গেছে। মেহরিনের বুকের ধুকপুকানি বাড়ে ক্রমশ। বুকটা উঠানামা করছে ভিষন। ঠিক তখনি একটা বলিষ্ঠ হাত মেহরিনকে স্পর্শ করলো। আলতো করে জড়িয়ে সামনে দিয়ে গলা পেঁচিয়ে নিলো, ঠিক গলা নয়—বুকের উপরিভাগের সরু অংশটুকু হাতের সাহায্য জড়িয়ে মেহরিনকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।
অন্যদিকে আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত এই স্পর্শে মেহরিন থমকে গেলো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো কেমন! কিন্তু এই স্পর্শ, এই শরীরের ঘ্রাণটা তার বড্ড চেনা। তবে কি সে এসেছে?
মেহরিন ভাবতে পারেনা। অজানা আশংকায় থ মেরে রইলো রমণী। শিউর হতে চাইলো এই অস্তিত্বটা সম্পর্কে। অনেক্ক্ষণ সেভাবেই কেটে গেলো। পেছনের মানবটিও একদম নিস্তব্ধ। মেহরিন ভয়ে ভয়ে সেই হাতের দিকে তাকালো। পিছনের যুবক তার মুখ ততক্ষণে মেহরিনের চুলের ভাজে প্রবেশ করিয়েছে। লম্বা শ্বাস টেনে নিচ্ছে মন ভরে। সে যেনো তখন অন্য দুনিয়ায়। হেলদোল নেই বললেই চলে।

—ক…কি করছেন? ক….কে আ…আপনি?
—হুশশ্! ডোন্ট সাউন্ড, সুইটহার্ট।
যুবকের হাস্কি টোনে বলা কথাটায় মেহরিন আচমকায় স্থির হয়ে গেলো। ডাগর ডাগর আঁখিপল্লব ঝাপটালো বেশ কয়েকবার। সে কি স্বপ্ন দেখছে এসব? তারমানে এটা সত্যি আদ্রিয়ান? আদ্রিয়ান স্যার? এখানে? এভাবে তাকে জড়িয়ে আছে?
মেহরিনের মাথা ঘুরে উঠলো অজান্তেই। রমণী কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে শূন্যে তাকিয়ে আছে। পেছনে আদ্রিয়ান তখনো তার চুলের ভাজে মত্ত। এরমধ্যেই আচমকাই নিজের উদরে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ অনুভব করলো মেহরিন। সাথে অনুভব করলো সেথায় আদ্রিয়ানের বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়া। মেহরিন আর একদফা হতবাক৷ হতবুদ্ধির ন্যায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। শিরা-উপশিরা তখন কাঁপছে অজানা অনুভূতিতে। পুরুষটির মাতাল করা শরীরের ঘ্রাণের সাথে এই অদ্ভুত ব্যবহারে স্তব্ধ মেহরিন।

—নাউ ইউ ক্যান গো অ্যান্ড অ্যাটেন্ট দিস ইভেন্ট।
আদ্রিয়ান আলতো করে মেহরিনের উদর হতে হাত সরিয়ে নিলো। মেহরিন শাড়ী খাঁমচে দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে রইলো। নিজের অজান্তেই চোখের কোণ ভিজে উঠলো রমণীর। এই পুরুষটি তাকে নিয়ে এতো পাগলামি করে কেনো? কেনো এতো শাসনের মাঝেও মেহরিন অদ্ভুত প্রশান্তি পায়! কেনো আজ ক’টা দিন ধরে এই মানুষটার জন্য বুকে জ্বালা করছে তার? কেনো?
—আর ইউ হ্যাপি উইথ দিস ম্যারেজ, সুইটহার্ট?
মেহরিন হঠাৎ থমকে যায়। নিরবে চোখের পানি নামে কপোল বেয়ে বেয়ে। আদ্রিয়ান ভারী ভারী শ্বাস ফেলছে তার কাঁধে। মেহরিনের মনে হচ্ছে সেই তপ্ত নিশ্বাসের ছোঁয়ায় সে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে একদম। ফলে উত্তর করার মতো শক্তিও পেলো না। আর না এই প্রশ্নের উত্তর আছে তার কাছে।
অন্যদিকে মেহরিনের এই নিস্তব্ধতায় ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো আদ্রিয়ান। ঠোঁটের কোণায় হাসি থাকলেও চোখ তার অদ্ভুত ভঙ্গিমায় জ্বলছে। কপালের রগ ফুলে ফেঁপে উঠছে জবাব না পেয়ে। সে আরো খানিকটা ঝুঁকে এলো সামনের দিকে৷ মেহরিনকে আগলো নিলো আবারো আবারো। দু’হাতে কোমড় জড়িয়ে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে আওড়ালো—-

—এই বিয়েতে যদি খুশি হয়েও থাকো, তাহলেও এটা তোমার ক্ষনস্থায়ী সুখ, সুইটহার্ট। এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আদ্রিয়ান চৌধুরী তা হতে দেবে না।
মেহরিন শক্ত করে শাড়ী খামচে ঘনঘন শ্বাস ফেলে। এই পর্যায়ে যুবকটিকে ভিষন ভয় লাগতে শুরু করলো৷ কিছু বলার জন্য মুখ খুললো মেহরিন। তবে তার আগেই দরজা ধাক্কাধাক্কির আওয়াজে চমকে সেদিকে তাকালো। এক ঝটকায় আদ্রিয়ানকে ছেড়ে হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইলো দরজার পানে।
—মেহু! মেহু! দরজা খোল।
দরজার ওপাশ হতে অভ্রের কন্ঠ পেয়ে আত্মা শুকিয়ে আসে মেহরিনে। আদ্রিয়ানের দিকে তড়িঘড়ি করে ফিরতে নিলেই ঘটে আর এক কান্ড। হুট করেই বিদ্যুৎ চলে যায়। পুরো ঘর অন্ধকারের আচ্ছন্ন হয়ে পরে। মেহরিন নিজের জায়গায় স্থির হয়ে যায়। কি করবে ভেবে পায়না।

—মেহু! দরজা খোল।
বলেই ওপাশে কাকে জানি কল লাগালো অভ্র। হুট করেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে পেলো না। জেনেরেটর থাকতে এটা কেনো হবে! আশ্চর্য!
অন্যদিকে অভ্রের ডাকাডাকিতে একপ্রকার ভয়েই হাতরে এগিয়ে এসে দরজা খোলে মেহরিন। বিশ্বাস, আদ্রিয়ান অন্ধকারের আড়ালে নিজেকে আড়াল করবে৷ এখন তাকে পাবে না দেখতে অভ্র।
মেহরিন দরজা খুলতেই অভ্র চট করে তার ডান হাতের কবজি চেপে নিজের সাথে নিয়ে যেতে থাকে। সাথে অন্যহাতে ফোনে কথা বলতে থাকে। মেহরিন ফিরে চায় নিজের ঘরের পানে। লম্বা করিডর ধরে হাঁটার সময় নিজের ঘরের দরজায় এক পুরুষের আবছা অবয়ব দেখতে পায় মেহরিন। তার শরীর ফের হিম হয়ে আসে।

প্রায় দশ-মিনিট বাদে ফের আলো চলে এলো।
লাল-নীল আলোকসজ্জায় সজ্জিত পুরো এড়িয়া। চারিদিকে অতিথিরা থৈ থৈ করছে৷ বিশাল স্টেজে পাশাপাশি বসে আছে মেহরিন-সারা। মেহরিনের পুরো মুখ হলুদে রাঙিয়ে দেওয়া। সকলের আনন্দ-ফুর্তির শেষ নেই যেনো। মনোয়ার শেখ দূর হতে মেয়েকে দেখে চলেছেন। আদরের একমাত্র মেয়ে তার। দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেলো! আর কাল তার বিয়ে! মনোয়ার শেখ হাসেন কথাখানা ভাবতে গিয়ে। চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে। মনে হচ্ছে একমাত্র পাঁজরকে পর করে দিতে চলেছেন তিনি। বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে৷ সাউন্ড বক্সের মায়াবি সুর তখন অদ্ভুত এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে সেখানকার। মনোয়ার শেখ চারিদিকে একবার নজর বুলিয়ে নিলেন। এরমধ্যেই কাঁধে কারো স্পর্শ পেতেই খানিক চমকে ওঠেন তিনি। তরিৎ পিছনে তাকিয়ে আশিক চৌধুরীকে দেখে ভরকে যান। তবুও নিজেকে সামলে হাসিমুখে তাকান।

—আপনি?
—হ্যাঁ আমি। দূর থেকে আপনাকে খেয়াল করছিলাম। তাই ভাবলাম আসি, কথা বলাও হবে।
—হ্যাঁ, তা ভালো করেছেন।
আশিক চৌধুরী হাসেন মনোয়ার শেখের সাথে। এরমধ্যেই আশিক চৌধুরী চট করে বলে বসেন—-
—চিন্তা হচ্ছে মেয়েকে নিয়ে?
মনোয়ার শেখ চুপ করে গেলেন। আকাশের পানে চেয়ে মৃদু হেঁসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কোন বাবার’ই না হয়?
আশিক চৌধুরী মনোয়ার শেখের কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিলেন। ঠোঁটের কোণায় এক চিমটি হাসি ফুটিয়ে আওড়ালেন—–
—চিন্তা করবেন না। আপনার মেয়ে আমাদের ঘরে বেশ ভালোই থাকবে। বউমা হিসেবে নিয়ে যাচ্ছি না মশাই, মেয়ে করেই নিয়ে যাচ্ছি।
মনোয়ার শেখ আশিক চৌধুরীর হাতে হাত রাখলেন।
—বিশ্বাস আছে আপনার উপর। শুধু আমার মেয়েটাকে একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিবেন। বাচ্চা মেয়ে, অতি চঞ্চল। আদর দিয়ে পোষ মানালে তাকে পাবেন—নইলে উড়াল দিতে সময় নিবে না।
আশিক চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না। শুধু হাসলেন এক চিমটি। অতঃপর দুজন পিতা একইসঙ্গে তাকালেন স্টেজের উপর বসে থাকা বর-কনেদের উপর।

—নে বেবি, আর একটু নে।
বলতে বলতে আরো এক চিমটি হলুদ তুলে মেহরিনের গালে লেপ্টে দিলো শিফা। মেহরিন বাঁধা দিলো না। আর না-তো টুঁশব্দ অবদি করলো। এতে অবশ্য খানিক অবাক হয়েছে শিফা। মেহরিনকে এতো এতো হলুদ, উষ্কানিমূলক কথা বলে একটু রাগাতে চাইছে তবুও আজ মেয়েটা কথা বলছে না। একদম পুতুলের ন্যায় বসে আছে। শিফা বিরক্ত হয়। ঠাস করে হলুদের বাটিটা নামিয়ে ছোঁ মেরে শাওনের হাত থেকে নিজের ফোনটা কেড়ে নিলো। যা শাওনকে দিয়েছিলো কয়েকটা ফটো তুলে দিতে। তবে মেহরিনের এই আচরণে আর ছবি তোলার মোড নেই।
শিফা ফোনটা কেড়ে বিড়বিড় করতে করতে অন্যদিকে চলে গেলো। বেচারা শাওনও চলে গেলো তার পিছুপিছু।

অন্যদিকে,
এক দৃষ্টিতে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে আছে একজোড়া নেশাক্ত চোখ। চোখের পলক যেনো পরছে না যুবকের। পুতুলের ন্যায় বসে থাকা মেহরিনকে সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে অনেক্ক্ষণ ধরে। রমণীর কোন হেলদোল না দেখে মাঝেমধ্যে ভ্রু কুঁচকে গেলেও তাতে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করছে না পুরুষটি। বরং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেপে দেখছে মেহরিনের শরীরের প্রতিটি ভাজ।
খানিক বাদে কপাল স্লাইড করতে করতে জিভ দ্বারা অধরজোড়া ভিজিয়ে নিলো যুবক। ঘাড় সামান্য কাত করে ফের মনোযোগ দিলো রমণীকে দেখায়। তবে ঠিক সুযোগ করে উঠতে পারলো না। তার আগেই স্টেজের উপর থেকে একজোড়া হাত তাকে টেনে নিচে নামালো। পুরুষটি এতো রাগান্বিত হলো।
—হোয়াট হ্যাপেন্ড মম? এভাবে টানছো কেনো?
উত্তর পেলো না যুবক। দু’জন মিলে সরাসরি এসে স্টেজের এক কোণে। নাজমা তালুকদার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের পানে তাকালেন। আজ-কাল ছেলেকে কেমন অদ্ভুত লাগছে তার কাছে। এমনটা তো অভ্র নয়!নাজমা তালুকদার বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে। হাতের পার্স শক্ত করে চেপে শকুনি দৃষ্টি ফেলেন ছেলের পানে। অভ্র তখনো বিরক্তিকর মুখে এদিক-ওদিক ঘাড় বাঁকাচ্ছে।

—কি হয়েছে তোমার?
অভ্র ভ্রু কুঁচকায়।
—মানে? কিসের কথা বলছো? আমার তো কিছু হয়নি, অ্যাম টোটালি ফাইন৷
নাজমা তালুকদার বিরক্ত হয়। নজর ফেলান স্টেজে বসে থাকা মেহরিনের পানে।
—তোমার মনে কি চলছে, অভ্র? অদ্ভুত লাগছে তোমায়।
মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে অভ্র নিজেও তাকায় সেদিকে। লক্ষ করে মেহরিন তখন কারো সাথে কথা বলছে। হাতে মেহেন্দি পড়িয়ে দিচ্ছে একজন। গায়ে হলুদের পাশাপাশি মেহেন্দির অনুষ্ঠানও একই সাথে। সেই হিসেবে আজ পুরো রাত জুড়েই উৎসব লেগে থাকবে এই রিসোর্টে। অভ্র দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ায়। চোখের দৃষ্টি আরো সরু করে।
—প্ল্যান কি চেঞ্জ করেছো তুমি? এরূপ অদ্ভুত বিহেভিয়ার কেনো করছো অভ্র?
—ওহ মম। ডোন্ট ওয়ারি। আমি জাস্ট চাওয়া-পাওয়ার অংশটা বাড়িয়েছি। কিচ্ছু চেঞ্জ করিনি। চিল মম, চিল।
নাজমা তালুকদারের কপাল কুঁচকে গেলো এক লহমায়। কুঞ্চিত ভ্রু যুগল নিয়ে তিনি তাকালেন ছেলের পানে।
—চাওয়া-পাওয়ার হিসেব বৃদ্ধি পেয়েছে মানে? কি বলতে চাইছো তুমি?
যুবকের ঠোঁট জোড়ায় অশুভ বাঁকা হাসি খেলো গেলো মায়ের কথায়। উত্তর করলো না আর। কেবল শান্ত চোখে চেয়ে রইলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটির পানে। নাজমা তালুকদারও ছেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালেন সেদিকে। নজরে পরলো একজন মানবি—মেহরিন।

—শিফু, এই শিফু। দাঁড়া প্লিজ। আমিও আসছি তো।
বলতে বলতে তারাহুরো করে শিফার পিছনে দৌড় দেয় শাওন। তবে সে দৌড় দিলেও এই পর্যায়ে শিফার পা থেমে গেলো চট করে। তাকে অদ্ভুত নামে সম্মোধন করায় কপাল কুঁচকে গেলো রমণীর। ঘাড় ঘুড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে সুধালো—–
—কাকে শিফু বলে ডাকলি তুই? আমাকে?,
শাওন থেমে জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিয়ে মাথা ঝাকালো। শিফার চোখমুখ লাল হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। আচমকা রমণী থাবা বসালো শাওনের ঝাঁকড়া চুলের গোছায়। হুট করেই শিফার আকস্মিক হামলায় প্রথমে থ হয়ে পরেছিলো শাওন। তবে ব্যথার তাড়নায় চট করে চিল্লিয়ে ওঠে।
—আরে আরে কি করছিস কি? আমি কি করলাম? মারছিস কেনো এভাবে?
—হারাম*জাদা আমি শিফু? তোর আমাকে দেখতে কুত্তা মনে হয় যে আমি শিফু? শা*লা জাউড়া আজ তোর সব চুল ছিঁড়ে ফেলবো। আমাকে শিফু ডাকা তাইনা?

তীব্র ব্যথায় শাওনের মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার যোগার। তবে শিফা থামলো না। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে শাওনের মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলো। বেচারা শাওন বুঝলো না এতে ওর দোষ কোথায়? শিফু তো সে আদর করে ডেকেছে, তাই বলে এভাবে মারবে?
শাওন ব্যাথিত হলো। হাঁপাতে হাঁপাতে আওড়ালো—-
—আরে ইয়ার ছাড় এবার! আগে বল ভুল কি বললাম? শিফু ডাকায় চেইতা গেলি ক্যান এমনে?
—কারণ আমাদের পাশের বাসার জাউড়া কুত্তার নাম শিফু। যে আমারে রোজ দৌড়ানি দেয়।
এতোক্ষণ পর শাওন বুঝতে পারলো আসল ঘটনা। বেচারা ভালো করতে গিয়েও খারাপ হয়। অসহায় মুখে শিফার পানে তাকিয়ে রইলো শাওন। শিফা শাওনকে ছেড়ে কড়া চাহুনিতে তার পানে একবার তাকিয়ে গটগট পায়ে সেখান থেকে চলে গেলো। অন্যদিকে শাওন নিজেও ফের শিফার পিছু নিলো।

রাত একটার কাছাকাছি।
ক্লান্ত শরীরে হেলতে দুলতে নিজের ঘরে এসে আচমকায় বিছানায় মাথা এলিয়ে দিলো মেহরিন। বড্ড ক্লান্ত লাগছে, চোখ বুঁজে আসছে ঘুমের তাড়নায়। মুখের হলুদ অবশ্য পরিস্কার করে দিয়েছে শিফা। ঘন্টাখানেক আগেও মুখ ধুয়ে ফের তাদের সাথে বসেছিলো। পুরো দু’হাত মেহেন্দিতে ভরপুর। শুকিয়ে গেছে অবশ্য।
মেহরিন লম্বা শ্বাস টানে। মেহেন্দি লাগানো হাতটা আলতো করে সামনে ধরতেই হাতের তালুতে বড় ইংরেজি অক্ষরের ‘A’ নামটি চোখে পরতেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে মেহরিনের। তখন পাত্রের নাম হিসেবে মেহেদী পড়ানোর লোকজনরা হাতে এই শব্দটা লিখে দিয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে এটার মানে অভ্রকে বোঝায়। অথচ মেহরিনের মাথা শুধু একটা নাম”ই ঘুরপাক খাচ্ছে। আর তা হলো আদ্রিয়ান চৌধুরী।

সুইটহার্ট পর্ব ১৮

আদ্রিয়ানের কথা মনে হতেই চট করে উঠে বসে মেহরিন। দু’আঙ্গুল তুলে আলতো করে আঁচলটা সরাতেই কেঁপে উঠল রমণী। উদরে এখনো কাঁচা হলুদের ছোঁয়া লেপ্টে আছে। সাথে সুস্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে পুরুষটির আঙুলের ছাপ। মেহরিন জিভ দ্বারা অধর ভেজায়। গলা শুকিয়ে আসে তখনকার ঘটনা মনে পরতে। আদ্রিয়ানের ফিসফিসিয়ে বলা কথাগুলো এখনো কানে বাজছে রমণীর। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে কেমন!
মেহরিন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় নিজের উদরের দিকে। ভাবে এসবের মানে। আর অনেকটা বোধহয় মস্তিষ্ক বুঝেও ফেলে! একজন পুরুষের এরূপ পাগলামি তো আর এমনি এমনি হতে পারেনা। নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে! মেহরিন নজর ফেরায়। বারান্দার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ায়—-
—আমিই যদি আপনার সত্যি হয়ে থাকি তাহলে সারা কি? আর, সারা সত্যি হয়ে থাকলে আমি কি? কি আমি?

সুইটহার্ট পর্ব ২০