অভিসৃতি পর্ব ১৬
নওরিন কবির তিশা
বিস্তৃত কক্ষটির পূর্ব সীমানায় প্রকাণ্ড বাতায়ন ঘেঁষে অবস্থিত সুবিশাল বিছানার মধ্যিখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে কায়রা। শ্বেতশুভ্র ঘোমটার প্রচ্ছায়ায় ঢাকা পড়েছে ওর আরক্তিম মুখশ্রী। নাসারন্ধ্রে ক্ষণে ক্ষণে আঘাত হানছে থরে থরে সাজানো দেশি-বিদেশি পুষ্প সম্ভারের উন্মাদকর, সুবাসিত সুবাস।
ঘোমটার নিবিড় রেশমি আবরণের আড়াল হতে উন্মীলিত চঞ্চল নেত্রে চারপাশটা মেপে নিচ্ছিল কায়রা। বিছানার উত্তর প্রান্তের অর্ধবৃত্তাকৃতির প্রশস্ত ব্যালকনিতে রোপিত চেনা-অচেনা ক্ষুদে বৃক্ষরাজি,পুষ্পতরু, রেলিং আঁকড়ে রাখা নানাবিধ বনলতা দৃষ্টি কেড়েছে ইতিমধ্যেই। কক্ষের সুবিন্যস্ত এক কোণে কাঁচের আলমারিতে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো বহুবিধ দুর্লভ পুস্তক সমগ্র!
হঠাৎ ভাবনায় ছেদ ঘটালো নৈঃশব্দ্যের প্রাচীর চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ভেসে আসা পৌরুষ পদধ্বনি। দ্বারের হুড়কো আটকে দেওয়ার সেই ধাতব ধ্বনি শোনামাত্রই কায়রার বক্ষপিঞ্জরে হৃতস্পন্দনের প্রকাণ্ড দাপাদাপি নিমেষেই বৃদ্ধি পেলো সহস্রগুণ! লাজুক আশঙ্কায় সিক্ত অক্ষিপল্লব অবনত করে ও স্থির হয়ে বসে রইল পুষ্পশয্যায়।
এগিয়ে আসা পদধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে দৈহিক কম্পন দ্বিগুণ বেগপ্রাপ্ত হচ্ছে কায়রার। অযাচিত এমন পরিস্থিতির কারণ বুঝলো না কায়রা। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনার এক ব্যর্থ প্রয়াসে লিপ্ত সে। হঠাৎ, ভেসে আসা পদধ্বনি থমকায়। পথ ঘুরিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে মাথা থেকে পাগড়ি খুলে রাখতে রাখতে কায়রার উদ্দেশ্যে বলে,,
“চেঞ্জ করো নি? অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে। চেঞ্জ করে নাও দ্রুত!”
ঘোমটার আড়ালে বসে নিজের ভাবনার সূক্ষ্ম জালে আটকে পড়েছিল কায়রা। কিন্তু দুর্জয়ের এমন রসকষহীন, শুষ্ক প্রস্তাবনায় ওর সমস্ত রোমান্টিকতা মুহূর্তেই উবে গেল! মুভিতে, কত শত বাসর রাতের দৃশ্য দেখেছে ও। যেখানে বর এসে অতি মায়ায় ঘোমটা তুলবে, হৃদস্পন্দনের প্রকাণ্ড দাপাদাপি মেপে পরম মোহে কপালে ভালোবাসার আলপনা আঁকবে, কিংবা হয়তো উপহারের সুদৃশ্য বাক্স এগিয়ে দিয়ে মুগ্ধ নেত্রে চেয়ে থাকবে! আর এই কাঠখোট্টা লোকটা কিনা ঘরে ঢুকেই সোজা পোশাক বদলানোর হুকুম ছুঁড়ল?কায়রা খানিক ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,,
“মানে?”
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের সুবিন্যস্ত শার্টের হাতা গুটোতে গুটোতে দুর্জয় ঘাড় ফেরাল। সুগভীর এক ভ্রূ উঁচিয়ে, স্বভাবসুলভ ধাতব কণ্ঠে বলল,
“মানে? এত ভারী আর অস্বস্তিকর একটা ড্রেস পরে বসে আছ, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে না? জাস্ট গো অ্যান্ড চেঞ্জ।”
গম্ভীর মানবের নির্লিপ্ত জবাবে,কায়রা ঘোমটার আড়ালেই বাচ্চাদের মতো মুখ কুঁচকে, তীব্র ক্ষুণ্ন গলায় বলে উঠল,
“আপনি কি সত্যিই কিচ্ছু বোঝেন না?”
হঠাৎ, নীরবতা ছারখার করে দিয়ে দুর্জয়ের পকেটে থাকা ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। দুর্জয় একনজর ডিসপ্লেতে চোখ বুলিয়ে গম্ভীর মুখে কলটা রিসিভ করল এবং কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা প্রশস্ত ব্যালকনির দিকে হেঁটে গেল। ব্যালকনি হতে ভেসে আসা দুর্জয়ের গম্ভীর দাপ্তরিক কথোপকথন শুনে কায়রার মেজাজ চড়ল সপ্তম আসমানে! ও নিজের কপালে স্বহস্তে এক চড় কষে আনমনে বেশ চড়া সুরেই বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“আল্লাহ্! কী ভেবেছিলাম আর কী হলো! শেষমেষ,এমন একটা রসকষহীন কাঠখোট্টা মানুষ আমার বর হলো? ফাডা কপাল আমার! আআআআ আমার কতো শখ! কিচ্ছু পূরণ করলো না এই লোক! কিচ্ছু বোঝে না। খাইস্টা!”
“সো, আই অ্যাম অ্যান আনরোমান্টিক মেটেরিয়াল, মিসেস দুর্জয় আহসান?”
পেছন হতে হঠাৎ ভেসে আসা সুগভীর, প্রখর পৌরুষ কণ্ঠস্বরে কায়রা একলহমায় স্থাণু হয়ে গেল! ভয়ে আর সীমাহীন কুণ্ঠায় থরথরিয়ে কেঁপে উঠল বক্ষপিঞ্জর। লোকটা কি সব শুনে ফেলেছে? লজ্জা বিস্ময়ে কায়রা ওষ্ঠাধর কাঁপিয়ে বিস্ময়ে তোতলে উঠে বলল,
“আ-আপনি…?”
দুর্জয় অলস ভঙ্গিতে ব্যালকনির দুয়ার পেরিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। ফোনটা টেবিলে রেখে, ধীর অকম্পিত পদক্ষেপে কায়রার একেবারে সন্নিকটে এসে দাঁড়াল,,
“না চিনে সম্পূর্ণ অচেনা এক নম্বরে কল দিয়ে গালিগালাজ করে তাকে ব্লকলিস্টে পাঠানো… অন্য একজনের থমকে থাকা গাড়ির কাঁচকে ড্রেসিং টেবিল ভেবে নিজেকে সাজিয়ে নিয়ে, ভেতরের লোকটার মরণের কারণ হতে চাওয়া…. এগুলোও কি আপনার দীর্ঘদিনের শখের তালিকায় পড়ে, মিসেস কায়রা আহসান?”
নিজের ঘটানো অঘটন গুলোর কথা কর্ণগোচর হতেই বিস্ফোরিত কায়রার হরিণী দৃষ্টি। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল ওর, সারা শরীরে এক অনভিপ্রেত ঘামের সূক্ষ্ম রেখা ফুটে বেরুল তৎক্ষণাৎ।ঘোমটাটুকু স্বহস্তে এক ঝটকায় সরিয়ে তোতলানো কণ্ঠ সামলে আকুল নেত্রে শুধাল,
“মা-মানে?”
দুর্জয় কায়রার একেবারে মুখোমুখি এক হাঁটু মুড়ে বসল;ওর আরক্তিম, ভয়ার্ত মুখের দিকে অতল প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, সুগভীর কণ্ঠে বলল,
“মানে, প্রতিবারই আপনার ঘটিত অনাহূত অ্যাক্সিডেন্টের একমাত্র ভিকটিম আমিই ছিলাম।”
কায়রা আর জীবনে এই প্রথম বার নিজেকে প্রচন্ড অসহায় ঠেকছে। সারাক্ষণ ফটর ফটর করা বাক্যঝুলি হারিয়েছে বহুক্ষণ। আপাতত বাকশক্তিহীন ইতর প্রাণীর ন্যায় দুর্জয়ের দিকে চেয়ে আছে ও। কি বলবে? এত এত অঘটন যে লোকটার সঙ্গে ঘটালো, সেই ওর সারা জীবনের সাথী!
দুর্জয় সুঠাম দেহে কায়রার আরেকটু কাছ ঘেঁষে বসল। সুগঠিত আঙুল দুটো দিয়ে পরম ভালোবাসায় কায়রার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে ওপরের দিকে তুলল। অতল কৃষ্ণচোখের দৃষ্টি স্থির রেখে বললো,
“বিগত দিনগুলোতে আপনার বদৌলতে যে পরিমাণ ঝঞ্ঝাট আমায় ফেস করতে হয়েছে, তার বদলে কি প্রপার একটা পেনাল্টি আমার প্রাপ্য নয়, মিসেস দূর্জয়?”
কায়রা সীমাহীন কুণ্ঠায় ছোট হয়ে এল। চোখ দুটি লাজে অবনত করে, অস্ফুট কাঁপা কণ্ঠে তোতলে বলল,
“প-পেনাল্টি? কিসের পেনাল্টি…?”
দুর্জয়ের ওষ্ঠাধরের কোণে সুপ্রচ্ছন্ন একচিলতে বক্র হাসির দেখা মিলল। অতঃপর, সুগভীর পুরুষালী কণ্ঠে পরম প্রশান্তিতে ও শুধাল,
“দিতে পারবেন?”
কায়রার বক্ষপিঞ্জরে হৃতস্পন্দনের তোড় তখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। লাজুক হরিণী নেত্রে ক্ষণিকের তরে চোখ তুলে, পুনরায় আনত করে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“জ-জ্বী… দিতে পারব।”
দুর্জয় এক ইঞ্চি দূরত্ব কমিয়ে আনল। ওর প্রখর, উষ্ম নিঃশ্বাস কায়রার কপোল স্পর্শ করতেই কায়রা চোখ দুটো সজোড়ে বুজে ফেলল। দুর্জয় কায়রার কানে জমে থাকা আলগা চুলগুলো সযত্নে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে নিচু, ভরাট কণ্ঠে বলল,
“একটা চুমু খাই? উঁহু… কপালে নয়, ঠোঁটেই।”
সুগভীর মোহমিশ্রিত কথার তোপে কায়রার সর্বাঙ্গে এক অচেনা শিহরণ খেলে গেল! উত্তর দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ও একেবারে নিস্পন্দ হয়ে চেয়ে রইল। দুর্জয় আর এক মুহূর্তও দেরি করল না; কায়রার শাড়ির আঁচল সরিয়ে ধীরে ধীরে আঁকড়ে ধরল ওর মসৃণ কোমর। অতঃপর, এক প্রকাণ্ড অধিকারবোধে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো কায়রার স্নিগ্ধ, আরক্তিম ওষ্ঠাধরে।
ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশের প্রপঞ্চ; পুষ্পশয্যার সমস্ত পুষ্পকোরক যেন, নিঃশব্দে সাগ্রহে প্রত্যক্ষ করছে দুই অনন্য হৃদয়ের চূড়ান্ত অভিসার। আর, নিস্তব্ধ ধরিত্রীতে একমাত্র প্রাণ স্পন্দন হিসেবে কাজ করেছে কায়রার চূড়ান্ত কম্পন। ঘেমেনেয়ে একসাড় হয়ে গেছে মেয়েটা ইতিমধ্যেই। নিঃশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় দশ গুণ।
দুর্জয় ধীরে ধীরে ঠোঁট জোড়া আলাদা করে কায়রার অতিমাত্রায় কাঁপতে থাকা মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটার এহেন অবস্থায় মৃদু হাসলো ও। অতঃপর কয়রার বন্ধ অক্ষিপল্লব, দ্রুত ওঠা-নামা করা বুক আর ঘামে ভিজে যাওয়া কপালের দিকে তাকিয়ে ভরাট কণ্ঠে বলল,
“সিরিয়াসলি, কায়রা? মাত্র একটা কিসেই এই অবস্থা? অলরেডি নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়ে গেছে তোমার।”
দুর্জয়ের এমন টিপ্পনীতে কায়রা সজোড়ে চোখ মেলে তাকাল। লজ্জায় ওর পুরো মুখমণ্ডল তখন রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে! নিজের কাঁপতে থাকা কণ্ঠটাকে টেনেটুনে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে ক্ষুণ্ন গলায় বলল,
“আ-আমি একদম নার্ভাস নই! আর এমনিতেই আপনার রুমের এসিটা মনে হয় কাজ করছে না… তাই গরম লাগছে!”
“ওহ, রিয়েলি? এসি কাজ করছে না?”
দুর্জয় অলস ভঙ্গিতে কায়রার ঘর্মাক্ত কপাল থেকে কয়েকটা চুল সরিয়ে দিতে দিতে আরেকটু কাছে সরে এলো। তারপর একদম কায়রার কানের কাছে ঝুঁকে সুগভীর কণ্ঠে বলল,
“তাহলে তো প্রবলেম! কারণ আমার পেনাল্টি’র কেবল ফার্স্ট চ্যাপ্টার শেষ হলো, মিসেস দুর্জয় আহসান। বাকি পেনাল্টি হিসেব করা তো এখনো বাকি!”
কায়রা বিস্মিত নেত্রে চাইলো,
“মানে?”
দূর্জয় বাঁকা হাস্যে বললো,,
“তোমার ওই দুষ্টু ব্রেনটা দিয়ে আমার লাইফে যতগুলো ঘাপলা বানিয়েছ—তার প্রতিটার হিসেব আমি প্রতিদিন একটু একটু করে বুঝে নেব;ডিসকাউন্টের চান্স নেই!”
“মানে?”
বোকা কায়রা বারংবার এই এক ‘মানে মানে’ করে চলেছে। ব্যাপারটা মেয়েটার বোকা মস্তিষ্ক না বুঝলেও, ওর এমন কাণ্ডে অগোচরে মৃদু হাসলো দুর্জয়। ভরাট কন্ঠে শুধালো,,
“ওয়েট কত?”
“মানে?”
পুনরায় এহেন বোকাটে প্রশ্নে দুর্জয় অতল কৃষ্ণচোখের প্রখর দৃষ্টি কায়রার ভয়ার্ত, আকুল মুখশ্রীর ওপর স্থির রেখে ধাতব কণ্ঠে শুধাল,
“ওয়েট কত তোমার?”
হঠাৎ, প্রসঙ্গের পরিবর্তনে কায়রা বিভ্রান্ত নেত্রে চাইলো,,
“অ্যাঁ?”
দুর্জয় নিজ চিবুকে হাত রেখে পুনরায় শুধালো,
“তোমার বডি ওয়েট কত, কায়রা?”
“প-পঁয়তাল্লিশ… ইয়ে মানে, চল্লিশ হবে হয়তো!”
জবাবটা শ্রবণগোচর হতেই দুর্জয়ের ওষ্ঠাধরের হাসিটুকু আরও বিস্তৃত হলো;আনমনে মৃদু স্বরে আওড়ালো,
“তাইতো বলি, হুট করে একটুকরা তুলা এসে কাঁধে পরলো কোত্থেকে!”
দুর্জয়ের আনমনে বলা কথাটা শুনতে না পেয়ে, কায়রা কৌতুহলী কন্ঠে বলল,,
“কিছু বলছেন?”
দুর্জয় কায়রার দিকে সামান্য ঝুঁকে, ওর ভেজা কপালের চুলগুলো পরম মায়ায় সরিয়ে দিতে দিতে গম্ভীর সু-গোছালো কণ্ঠে বলল,
“নো! তবে কাল থেকে প্রপার ডায়টিং শুরু করো। আদারওয়াইজ, পঁচাত্তর কেজির প্রেশার হ্যান্ডেল করা চল্লিশ কেজির বডি ফ্রেমের পক্ষে ইজি হবে না!”
কথাটা শোনামাত্র কায়রার ডাগর চক্ষু চরম বিস্ময়ে প্রসারিত হলো! দুর্জয়ের সুপ্রচ্ছন্ন পৌরুষ ইঙ্গিত ওর চপল মস্তিস্কে আঘাত হানতেই লজ্জার রক্তিম আভা ওর ফর্সা গাল দুটিকে রাঙিয়ে দিল। পুনরায় কিছু বলার ভাষা খুজে না পেয়ে অবনত মস্তকে বিছানায় চেয়ে রইলো ও। চঞ্চল মেয়েটির শান্ত রুপে ভয়ে পরিমাণ বেশ ঠাওর করতে পারলো দূর্জয়।
“সো, দ্যাটস এনাফ ফর টুনাট, মিসেস আহসান! তোমার এই ভীতু হৃদপিণ্ডটাকে আজকের মতো রেহাই দেওয়া হলো। নাও, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো!”
পোশাক পরিবর্তনের কথা মাথাতেও এলো না আর। আপাতত, প্রচন্ড ঘুমের প্রয়োজন ওর। তাই অনুমতি পেতেই কোনোমতে লেহেঙ্গা গুটিয়ে, ত্বরিত পাশ ফিরে শয্যার অপর প্রান্তে চক্ষু মুদে শুয়ে পড়ল। দুর্জয় মৃদু হেসে ওর পাশে শায়িত হলো,,
“আই সেড স্লিপ, কায়রা… আমার থেকে দূরত্ব বাড়াতে বলিনি! সো, ডোন্ট ইভেন ট্রাই টু এস্কেপ।”
কায়রা তোতলে উঠে রুদ্ধশ্বাসে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আ-আমি তো দূরে যাচ্ছি না… জাস্ট শুয়েছি!”
দুর্জয় কায়রার রেশমি অলকগুচ্ছ সযত্নে একপাশে সরিয়ে দিয়ে, ওর উন্মুক্ত শুভ্র ঘাড়ে আলতো করে নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে দিল। অতঃপর এক পরম নিশ্চিন্তের সুরক্ষাবেষ্টনীতে কায়রাকে বক্ষপটে শক্ত করে আবদ্ধ করল,,
“লিসেন, কায়রা… অ্যাজ লং অ্যাজ আই অ্যাম হিয়ার, আমার বুকে ঘুমানোর চিরন্তন বাজে অভ্যেসটাই করতে হবে তোমাকে। কোনো লজ্জা কিংবা অযথা ফিয়ার দিয়ে আমার কাছ থেকে নিজেকে হাইড করতে পারবে না নিজেকে! গেট ইট?”
গম্ভীর মানবের এমন কথা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছে না কায়রার। অবশ্য গোটা সময়টা জুড়েই ঘোরে আচ্ছন্ন ছিল ও। যেন মনে হচ্ছিল গোটাটাই এক অদ্ভুত মিষ্টি স্বপ্ন। এর সমাপ্তি কভু না ঘটুক!
“আমাকে ওরা বাঁচতে দেবে না দোস্ত! মে’রে ফেলবে আমাকে। আব্বুর অবস্থা ভালো না। তার ওপর এত কিছু! আমি আর মানসিক ট্রেস্ট নিতে পারছি না।”
বোনের শোকে সারারাত নির্ঘুম কাটাবার পর, ভোরের আলো ফুটতেই সবেমাত্র অক্ষিপল্লব বুজেছিল পায়রা। কিন্তু সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন শান্তির অবকাশ দীর্ঘস্থায়ী হতে না দিয়ে কর্কশ শব্দে বেজে ওঠা ফোন কলে ঈষৎ বিরক্ত হয়ে হাত বাড়িয়ে ফোনটি উঠিয়ে কেটে দিতে গিয়েও, স্ক্রিনে ভাসমান সংরক্ষিত নামটায় রিসিভ করার পর মুহুর্তে এই ওপাশ থেকে ভেসে আসা ক্রন্দনরত কন্ঠে পায়রা নিমেষেই বিছানায় সোজা হয়ে বসল। উদ্বেগভরা কণ্ঠে বলল,
“রিয়া,জানু, শান্ত হ! ডিপ ব্রিদিং নে। ক্লিয়ারলি বল তো, ঠিক কী হয়েছে? অসভ্যতা আবার কোনো লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছে, নাকি অন্য কিছু?”
রিয়া ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“ওরা ডিভোর্স প্রসেসিংয়ের লাস্ট হিয়ারিং বন্ধ করতে চায়! থ্রেট দিচ্ছে আইন দিয়ে নাকি কিছু হবে না। যদি কেস উইথড্র না করি, তবে ফ্যামিলিসহ আমাদের শেষ করে দেবে!”
পায়রা প্রখর প্রত্যয়ে বলল,
“প্যানিক করিস না একদম! এই মেন্টাল টর্চার অনেক হয়েছে, আর এক পা-ও পিছু হঠবি না। লিগ্যাল নোটিশ বা থ্রেট ডিরেক্টলি সলভ করার রেসপন্সিবিলিটি এখন তোর ওই ব্যারিস্টারের। তুই আঙ্কেলের কেয়ার নে, বাকিটা আমি হ্যান্ডেল করছি।”
রিয়ার সাথে কথা শেষ করেই পায়রা কালবিলম্ব না করে ডায়াল করলো আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখা সায়মনের নম্বরে। প্রয়োজনের তাগিদেই গত দিন ইমনের কাছ থেকে নিয়ে সেভ করে রেখেছিল ও। দু-তিনবার রিং হওয়ার পর ওপার হতে ভেসে এলো এক অতিমাত্রায় গম্ভীর, স্বাচ্ছন্দ্যময় পৌরুষ কণ্ঠস্বর,,
“হ্যালো, সায়মন রহমান স্পিকিং। হু ইজ দিস?”
“হ্যালো, মিস্টার সায়মন। আমি পায়রা। রিয়ার একটা আরজেন্ট লিগ্যাল ইস্যু নিয়ে কথা বলার ছিল।”
“ওহ, মিস পায়রা! মর্নিং। সত্যি বলতে, আজ সকালে আশপাশের কাকগুলোর ডাক মিস করছিলাম। বাট থ্যাংক গড, আপনার কলটা এলো! তা, এত সকাল সকাল সত্যিই প্রফেশনাল কোনো ঝামেলার খবর, নাকি জাস্ট দিনটা একটু ড্রামাটিক করার অ্যাটেম্পট?”
সাইমনের এমন অপ্রাসঙ্গিক চপলতায় পায়রার রূঢ় মেজাজ মুহূর্তে চড়ে গেল। কঠোর কণ্ঠে শুধাল,
“মিস্টার সায়মন, আই থিঙ্ক উই আর নট প্র্যাকটিসিং কমেডি হিয়ার! এটা একটা সিরিয়াস ম্যাটার। রিয়ার এক্স-হাজবেন্ডের পক্ষ থেকে ফাইনাল হিয়ারিং স্টপ করার জন্য লাইফ থ্রেট দেওয়া হচ্ছে। দে আর হ্যারাসিং হার ফ্যামিলি!”
পায়রার ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর শুনেই সায়মন নিমেষেই নিজের মেজাজ বদলে ফেলল। পরম পেশাদারিত্বে প্রখর গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,,
“আই সি! থ্রেট বাই ফোন নাকি পার্সোনালি? কাইন্ডলি ভয়েস রেকর্ড বা কোনো টেক্সট এভিডেন্স থাকলে আমাকে মেসেঞ্জারে বা মেইলে ফরওয়ার্ড করুন। ল’প্রসেসিংয়ের লাস্ট স্টেজে এসে এমন ইললিগ্যাল মোভমেন্ট একদম টলারেট করা হবে না।”
“এভিডেন্সগুলো আমি এখনই কালেক্ট করে আপনাকে পাঠাচ্ছি। আজকেই কি কোনো প্রোটেক্টিভ অ্যাকশন নেওয়া সম্ভব, মিস্টার সায়মন?”
সায়মন আশ্বস্তকারী কন্ঠে বলল,
অভিসৃতি পর্ব ১৫ (২)
“ডোন্ট অরি, মিস পায়রা। লিগ্যাল প্রসেসের শেষ পর্যায়ে এসে যারা এমন ক্রিমিনাল ট্যাকটিক্স খাটায়, তাদের সাইজ কীভাবে করতে হয় তা আমার ভালোই জানা আছে। আই উইল হ্যান্ডেল দিস অফিশিয়ালি। আপনি জাস্ট এভিডেন্সগুলো সেন্ড করে রিল্যাক্স থাকুন।”
“থ্যাংক ইউ, মিস্টার সায়মন। আশা করি সল্যুশন দ্রুত পাব।”
“মাই প্লেজার, মিস পায়রা। হ্যাভ এ গুড ডে!”
