Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৭ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৭ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৭ (২)
jannatul firdaus mithila

“ যা ইচ্ছে করিস! তবে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে করিস। আজকে রাতের মধ্যেই ও আমার মেয়ের জীবন থেকে সরে যাওয়া চাই!”
মুহুর্তেই মুখাবয়বে লালসার তৃপ্তি ফুটে উঠল শম্ভুর। কালচে ঠোঁট দু’টো আপনাআপনি বেঁকে গেল পৈ শা চি ক আনন্দের পূর্বাভাসে। তৈলাক্ত দেহখানা কোনমতে নাড়িয়ে চাড়িয়ে এগোয় সে। পথিমধ্যে ফের কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় পাদু’টোয় রুখ টানে শম্ভু। ঘাড় বাকিয়ে তাকায় অন্ধকারের সিন্দুকে দাঁড়িয়ে থাকা মালকিনের পানে! রয়েসয়ে এক গাল হেসে, দোনোমোনো করতে করতে শুধায় সে,

“ মা জি!”
বিরক্তিতে কপাল গোছালেন সুদীপা রায়। মাথার ওপর জড়িয়ে থাকা পাতলা শালটা আরেকটু টেনেটুনে, মুখ ঢেকে নিলেন আলগোছে। নিরব কদমে কয়েক হাত এগিয়ে এসে চাপা ক্ষোভে আওড়ালেন,
“ কি হয়েছে?”
মালকিনকে এক আকাশসম হতবাকতায় ডুবিয়ে দিয়ে নিষ্পাপ কায়দায় দাঁতকপাটি বার করে হাসলো শম্ভু। বাহাতে আলতো করে চুলের গোড়া চুলকাতে চুলকাতে খানিক নিচু স্বরে বলে উঠল,
“ একথাল ভাত তৈয়ার করে রাখিয়েন মা জি। গরম গরম ভাত। পারলে লগে একটুখানি ঘি ছড়ায় দিয়েন। সক্কাল তোন পেডে ব্যাদনা! ভাত খাইবার পারিনাই মা জি। আভি বহুত ভুক লাগছে। হাম কামডা সাইরা আসি। আপ ততক্ষণে ভাতডা বাইড়া রাখিয়েন।”
অভাবের দায়ে বাঁকা পথে হাটছে শম্ভু! তা যে অজানা নয় সুদীপা রায়ের। বেচারার এহেন অভাবের সুযোগটুকুই বড্ড কাজে লাগালেন বিচক্ষণী! সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে পরপরই গুরুগম্ভীর কন্ঠে শুধালেন,
“ তুই যা শম্ভু! আমি ভাত রেডি রাখবো।”
কাঙ্ক্ষিত আশ্বাস পেয়ে অমায়িক হাসলো শম্ভু! তক্ষুনি কাঁধের ওপর বস্তা তুলে পা বাড়ালো সম্মুখে। অতঃপর দেখতে দেখতে হারিয়ে গেল অন্ধকারের মাঝে। ওদিকে সুদীপা রায়ের দৃষ্টি অনড়! অন্ধকারেও চেয়ে আছেন একদৃষ্টে। হাত উঠিয়ে মাথার ওপর থেকে শালের আবরণটুকু সরিয়ে দিয়ে, পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠে বিড়বিড়ালেন,
“ ভাগ্য ভালো হলে ফিরে এসে ভাত খেতে পারবি শম্ভু! নয়তো….”

সদ্য ওয়াশরুম থেকে বের হলো সপ্তদশী! ক্ষুদ্র মুখখানায় তার এখনো মুক্তোর ন্যায় পানির ছিটাফোঁটা স্পষ্ট বিদ্যমান। হাতে একখানা তোয়ালে মেয়ের, আলতো করে মুছে যাচ্ছে সিক্ত মুখ। ধীরলয়ে কাউচের পানে আগাচ্ছে পা। কয়েক কদম সম্মুখে এসে দাঁড়াতেই রমণীর ক্লান্ত দৃষ্টিজোড়া একত্রে নিক্ষিপ্ত হলো কাউচের অভিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট টেবিলের ওপর। সেথায় একে-একে সাজিয়ে রাখা কয়েক পদের খাবার দাবার। কি সুন্দর ঘ্রাণ বেরুচ্ছে! তন্মধ্যে সর্ষে ইলিশের ঝাঁঝালো ঘ্রাণটা যেন সবকিছু ছাপিয়ে রমণীর নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্র দিয়ে ভকভক করে প্রবেশ করল। মুহুর্তেই মায়াবিনী টের পেলো — তার পেট ডাকছে! উদরে অবস্থিত ক্ষুধার্থ ইঁদুর গুলো দৌড়াচ্ছে রীতিমতো। মাহি’র আর তর সইলো না। দুপুর থেকে না খেয়ে থাকায় ক্ষুধায় অন্ধ সে, তক্ষুনি পা ছুটিয়ে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল মখমলি কাউচের কোলে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাতে প্লেট নিয়ে ভাত নিলো কিছুটা। অতঃপর আর কোনোদিক না তাকিয়ে বাটি থেকেই সর্ষে ইলিশের তরকারিটুকু তুলে খেতে লাগলো রমণী। মুহুর্তেই জিভের ডগায় দারুণ স্বাদে চোখদুটো আপনা-আপনি বুঁজে এলো তার। রয়েসয়ে পরিতৃপ্ত কায়দায় সবটুকু ভাত মাখিয়ে বড্ড শৃঙ্খলায় খেতে লাগলো সপ্তদশী। আয়েশ করে চাটতে লাগলো আঙুলের ডগাগুলো। এরইমধ্যে হুট করেই মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠল তার। চোখদুটোর দৃষ্টি হতে লাগলো ঘোলাটে! মাহি হতভম্ব। ডানহাতে খাবার প্লেটটা ধরে রেখে, বাঁহাতে চেপে ধরল মাথার একপাশ। অস্থিরতায় ব্যাকুল হয়ে আওড়াল,

“ আশ্চর্য! মাথাটা কেমন ভনভন করছে কেনো আমার? এমন ঘুমঘুম পাচ্ছে কেনো হঠাৎ করে?”
নিজ মনে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে নিরব মাহি। দৃষ্টিযুগল ঝাপ্সা হতেই দূর্বলতা বাড়লো তার হাতের। অবহেলায় কাঁচের প্লেটটা কেমন মুহুর্তেই খসে পড়ল হাত থেকে। কন্ঠায় তীব্র খরা অনুভুত হতেই দূর্বল হাতদুটো সম্মুখে বাড়ায় বোকা মানবী। কাঁপা কাঁপা হাতে পানিভর্তি গ্লাসটা তুলে এনে ঠোঁটের ডগায় বসাতেই এক বিদঘুটে গন্ধে গা গুলিয়ে উঠে তার। মুখটা ত্রস্ত কুঁচকে গেল ঘৃণায়! তবুও তীব্র তৃষ্ণায় ধুঁকতে থাকা সপ্তদশী উপায়ন্তর পেলো না তেমন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিদঘুটে গন্ধযুক্ত পানিটুকু ঢকঢক করে গিলে নিলো দুবারে। ওমনি ঝাঁঝালো তেঁতো স্বাদে নাকমুখ কুঁচকে গেল মাহি’র। তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে ভুলক্রমে ঝাপ দিলো নেশার অতল সমুদ্রে।

মূল রায় জমিদারবাড়ির ঠিক পেছনে পুরনো আমবাগান এবং বাঁশঝাড়। খানিকটা আড়ালে একটি পরিত্যক্ত একতলা, চুন-সুরকির ছোট দালান! দালানের কোথাও তেমন আলোর দেখা নেই। পুরনো দিনের দু/তিনটে ঘর পেরিয়ে সামনে সরু বারান্দা, জানালায় মরিচে ধরা লোহার শিক। দরজায় কোনমতে আঁটকে আছে ঘুনে খাওয়া পুরনো কাঠের পাল্লা। বহু বছর আগে যা একসময় ব্যবহৃত হতো জমিদার কর্মচারীদের থাকার ঘর হিসেবে, তা এখন সাধারণের জন্য পরিত্যক্ত!

পরিত্যাক্ত বাড়ির একদম শেষের ঘর! বহুদিন ধরে আবদ্ধ থাকায় চারিদিক থেকে ভেসে আসছে স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের উটকো গন্ধ। পায়ের তলায় ইট-সিমেন্টের জমিনে ক্ষয় ধরেছে বেশ। মনস্টার নামক বলিষ্ঠ সুদর্শন দাঁড়িয়ে আছেন কামরার ঠিক মাঝখানে। চিরচেনা স্বভাবসূলভে গা উদোম তার, একহাতে ধরে রাখা একখানা ধারালো চাপাতি! চুন-খসা সিলিং হতে ঝুলতে থাকা হলদেটে ল্যাম্পশেডের মৃদু আলোয় চাপাতির গা-টা কেমন চিকচিক করছে। সম্পূর্ন মুখাবয়ব তার আড়াল হয়েছে কালো রঙা বালাক্লাভা মাস্কের আবরণে। মাস্কের ওপর দিয়েই অনবরত ফুঁকছে সিগার! তার ঠিক পেছনে দু’হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। নতমুখ তার, সে-ই সঙ্গে গম্ভীর অভিব্যক্তি। পাশের কক্ষ হতে তখনো ভেসে আসছে মৃদু গোঙানির শব্দ। যেন মুখের ওপর কাপড় পেঁচিয়ে কাউকে ইচ্ছেমতো অত্যাচার করা হচ্ছে সেথায়। মাঝেমধ্যে ধেয়ে আসছে বেশকিছু জোরালো পায়ের আঘাতের শব্দ! এরইমধ্যে কক্ষে বিরাজমান নিরবতার দেয়াল ভাঙতে নিজ উদ্যোগেই অধর নাড়ালো এডউইন। কেমন ভীতসন্ত্রস্ত কন্ঠে শুধালো,

“ মনস্তার! আরেকটাবার নাহয় ভেবে….”
বাক্যটুকু পূর্ণ হবার ফুরসত পেলো না বেচারা এডউইন। তার পূর্বেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল মুগ্ধের ভারী এবং তেজী কন্ঠ!
“ ম’রতে ইচ্ছে করছে?”
আঁতকে উঠে এডউইন! তড়িঘড়ি করে শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে মাথা নাড়ায় দু’ধারে। ভয়ার্ত কন্ঠে প্রতুত্তরে বলে,
“ ন-না মনস্তার!”
তৎক্ষনাৎ চোয়ালের পেশি টানটান করল মুগ্ধ! আঙুলের ভাঁজে আঁটকে রাখা জ্বলন্ত সিগারটা মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে, সেথায় পা পিষলো দাম্ভিকের ন্যায়। রুক্ষ হাতের মুঠোয় চেপে রাখা চাপাতির হাতলটা আরেকটু শক্ত করে চেপে নিয়ে, তক্ষুনি পিছু ঘুরল রূঢ় মানব। চোখের পলকে চাপাতিটা এডউইনের কন্ঠনালী বরাবর আলতো করে চেপে ধরতেই ভড়কায় এডউইন! তটস্থলক্ষণে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় সম্মুখে। ওমনি মুগ্ধ কেমন দাঁত খিঁচে চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,

“ ইফ ইউ ডোন্ট ওয়ান্না ডা’ই, সো জাস্ট শাট ইউ’র ফা’কিং মাউথ বাস্টা’র্ড! নয়তো ওর জায়গায় তোর গর্দান যাবে।”
তৎক্ষনাৎ ভয়ার্ত ঢোক গিললো এডউইন। নেত্র নামালো মুহুর্তব্যয়ে। ধীরলয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধালো,
“ ওকে মনস্তার।”
সহসা চাপাতি সরায় মুগ্ধ! দৃঢ় চোয়ালে কটমট শব্দ তুলে পা বাড়ায় বা-দিকে। গটগটিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে অপর কক্ষের দুয়ার পানে এসে দাঁড়াতেই অভ্যন্তরে থাকা গার্ডেরা কেমন জড়সড়ভাব ধরল তৎক্ষনাৎ। পেটানো কর্মে খানিকটা অব্যহতি ঢেলে, আহত ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়ে কদম পেছায় সকলে। মুগ্ধ ঢুকলো এবার। দৈবাৎ শক্তিতে ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে কুঞ্চিত দৃষ্টিতে তাকালো সম্মুখে। অদূরে মেঝেতে আহতাবস্থায় লুটিয়ে আছে শিবু। সঙ্গে দু’জন তারই সাঙ্গোপাঙ্গো! মা’র খেতে খেতে ছেলেগুলোর হয়েছে বেহাল দশা। চোখদুটো টেনে খুলতে গিয়েও পারছেনা যেন। মুগ্ধ এগোয় সেথায়। গুনে গুনে দু’টো কদম সম্মুখে বাড়াতেই অপর কক্ষ হতে আচানক ছুটে আসে এডউইন। সন্দিগ্ধ গলায় বলে ওঠে,

“ মনস্তার! আপনার বাড়িতে হঠাৎ করেই সব লাইট অফ হয়ে গিয়েছে। অথচ এখানকার লাইটগুলো এখনো জ্বলছে!”
মুহুর্তেই স্থবির হলো মুগ্ধ। ব্যস্ত পায়ে টানলো রুখ। কপালের চামড়ায় গোটাকতক সন্দিষ্ট ভাঁজ টেনে ভাবলো কিছু একটা। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো রূঢ় মানবের। বলিষ্ঠ পাদু’টো তৎক্ষনাৎ ঘোরালো উল্টোপথে। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হিসহিসিয়ে ছুটলো সে। হাতে তার তখনো ধরে রাখা ধারালো চাপাতিটা! এডউইন গম্ভীর মুখে তক্ষুণি দুয়ার ছেড়ে দাঁড়ালো। মুগ্ধ তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো বেচারা। ধীরলয়ে আপনমনে বিড়বিড় করে আওড়াল —
“ আজ মনে হয় হেক্সা ডান হয়ে যাবে কিছুক্ষণ পরেই! সো স্যাড অফ দ্যাম। চু চু চু!”

দূর্বার গতিতে ছুটছে মুগ্ধ! ব্যস্ত কদমে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে অন্দরমহলের তিনতলার দিকে। ঘেমে-নেয়ে একাকার তার সুদর্শন বদন। অবচেতন হৃদয়টা কেমন ধ্বকধ্বক করছে সপ্তদশীর চিন্তায়। মেয়েটা অন্ধকারে ভয় পায়! আলো না থাকায় নিশ্চয়ই এতক্ষণে কেঁদেকেটে বুক ভাসিয়েছে। এহেন চিন্তায় ব্যাকুল নির্দয় মানব। অন্ধকারেই বড্ড দক্ষতায় ছুটে এলো রমণীর কক্ষের দারপ্রান্তে। ব্যগ্র দু’হাতে আচানক দুয়ার ঠেলে কক্ষে ঢোকে মুগ্ধ। ওমনি বিদঘুটে অন্ধকারে চোখদুটো বুঁজে এলো তার। নিরব কদমে সম্মুখে এগোতে এগোতে সন্দিহান গলায় ডাকলো,
“ সিগনোরা!”
তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর আসেনি তেমন। তবে একখানা রিনরিনে কন্ঠের খিলখিল হাসির শব্দ ঠিক পৌঁছুলো রূঢ় মানবের কর্ণকুহরে। তক্ষুনি পাদু’টো জমে গেল মুগ্ধের। সন্দিগ্ধতায় গুটিয়ে গেল কপালের চামড়া। ভারী কন্ঠে ফের ডাকলো,

“ সিগনোরা?”
এবারে খিলখিল হাসির শব্দটা বেশ জোরালো হলো মনে হচ্ছে! রয়েসয়ে প্রতুত্তরে রিনরিনে কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো,
“ হ্যাঁ জান!”
বাক্যটুকু কর্ণধার হতেই অন্ধকারে আঁচানক হোঁচট খেলো মুগ্ধ। পড়তে পড়তে কোনরকমে বাঁচলো রুশদী কিং। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে, মুখভঙ্গিতে একরাশ হতবুদ্ধিকর ভাবস্রোত লেপ্টে সন্দিহান গলায় পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কি বললি তুই?”
“ কাছে আসো জাআআআআআন! তোমার টসটসে গাল বরাবর ঠেসে দু’টো চুমু খাবোওওওওও।”
মুহুর্তেই হতবাকতার সমুদ্রে সাঁতার না জানার অপরাধে গলা অব্ধি ডুবে গেলো মুগ্ধ! ভাব ধরল হতবিহ্বলের ন্যায়। কিয়তক্ষন মৌন থেকে অন্ধকারেই পা আগায় সে। কিন্তু রমণীকে হাতের নাগালে না পেয়ে চোয়াল শক্ত হলো তার। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে দাঁত খিঁচে শুধালো,

“ রাত-বিরেতে বাংলা ম দ গিলেছিস বেয়াদব? নিজের থেকে একযুগ বড়ো মুরুব্বিকে ঠেসে চুমু খাওয়ার কথা বলিস কোন সাহসে নির্লজ্জ মেয়েছেলে?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই চমৎকার ধ্বনিতে হেসে ওঠে মাহি। অন্ধকার কূপে আড়াল থেকে আওড়ায়,
“ মুরুব্বি যদি হয় তোমার মতো হ্যান্ডসাম এন্ড হট, তবে আমি আজীবন নির্লজ্জ খেতাবে ভূষিত হতে রাজি জাআআআআন! কাছে এসো আমার কুচুপুউউউউ! আমার গুলুগুলু! আমার সোনাআআআআ। আ’ই ওয়ান্না গিভ ইউ আ টাইইইইট হাগ!”
বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে গেল মুগ্ধের। রাগে-জেদে নিম্নাংশের অধর চলে গেলো ধারালো দাঁতের তলায়। প্রকাশ্যে মেয়েটাকে একটুখানি ছুঁতে গেলেই — অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়াসহ আরও কত কত অভিনব নাম-খেতাবে ভূষিত হতে হয়েছে তাকে, অথচ এখন দেখো! অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নির্লজ্জ মেয়েছেলেটা কিসব উদ্ভট কথাবার্তা বলে যাচ্ছে তাকে। এহেন ভাবাবেগে ক্ষুব্ধতায় হিসহিস করতে করতে তৎক্ষনাৎ শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ায় মুগ্ধ। বড় বড় নিশ্বাস ফেলে নিজ উপচে পড়া রাগগুলো প্রশমিত করার প্রয়াসে মত্ত হলো পরক্ষণেই!

বিদঘুটে অন্ধকারে চারপাশ যেন ডুবে আছে এক অতল গহ্বরে। বোকার ন্যায় টর্চ লাইটের আলো জ্বালাতে ভুলে গিয়েছে শম্ভু। এগোনোর পথে হাত খসে টর্চ লাইটটা যে কোথায় পড়লো! তা খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করার মতো বোকামি করল না ময়লা পুরুষ। কার্যসিদ্ধির প্রয়াসে এক হাতে বস্তা আঁকড়ে ধরে, অন্ধের ন্যায় হাতড়ে-হাতড়ে কোনোরকমে এগোচ্ছে সে। কয়েক গজ পথ পাড়ি দিতেই টের পেলো — কাঙ্ক্ষিত ঘরের দরজা খোলা। ওমনি পাদু’টো থেমে গেল শম্ভুর। আনমনে ভাবল —
“ ঘরের দুয়ার খুইলে রাখছে কার লাইগ্গা? আমার লাইগা না-কি?”
ভাবনার ডোরে আষ্টেপৃষ্টে আঁটকে থেকে বোকার ন্যায় হাসলো শম্ভু! তবে সর্তকতায় দাঁতকপাটি কেলিয়ে হাসেনি সে। কর্মের উদগ্রীবতায় পা বাড়ায় ফের। গরমে অতিষ্ঠ সে, ঘেমে-নেয়ে একাকার ইতোমধ্যে। কিন্তু কর্মের টানে ঠিকই এগোচ্ছে!
এমনিতেই চারপাশে সে-কি ঘুটঘুটে অন্ধকার! তার ওপর শম্ভুর ওমন ময়লা গায়ের রঙ। দুটো মিলিয়ে বড্ড উপকার হলো শম্ভুর। অন্ধকারে সযত্নে তলিয়ে গিয়ে এগোলো দক্ষের ন্যায়। দু’হাত এদিক-ওদিক ছড়িয়ে হাঁটছে শম্ভু। বোকার ন্যায় হাত নাড়তে গিয়ে আঁচানক অন্ধকারের ভেতর কোনো এক ইস্পাত-দৃঢ় অচেনা বস্তুর সঙ্গে তার তৈলাক্ত হাতখানা স্পর্শ হলো খানিক। বস্তুটি আসলে কি? তা যাচাই করার প্রয়োজনটুকুও বোধ করল না শম্ভু। বরং স্বভাবসুলভ কৌতূহলে বস্তুটাকে সজোরে খামচে ধরল সে! ওমনি নিস্তব্ধ অন্ধকার চিরে সম্মুখ থেকে ভেসে এলো এক ক্ষিপ্ত হুংকার—

“হু দা ফা’ক ডেয়ার টু টাচ মা’ই ‘পাখি’? অন্ধকারের মধ্যে কোন লু*চ্চা কু***বাচ্চা করলি রে এই কাজ?”
বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই প্রচণ্ড ক্রোধে ছোড়া এক জোরালো লাথি এসে সজোরে আঘাত হানলো শম্ভুর তৈলাক্ত বুক বরাবর। মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে অদূরে ছিটকে পড়ল বেচারা শম্ভু। কয়েক সেকেন্ড হতভম্বের ন্যায় মাটিতে পড়ে থেকে কোনোরকমে মাথা তুলে সম্মুখের অন্ধকারের দিকে তাকাল সে। চোখেমুখে একরাশ বিস্ময় ঢেলে হতবুদ্ধির ন্যায় আওড়াল —
“বেডি ধরবার লাগি আইসা, বেডা আইলো কইত্তে?”
বেচারার কন্ঠে হতবুদ্ধিকর ভাবস্রোত! তন্মধ্যে অন্ধকার হাতড়ে ছুটে এলো মুগ্ধ। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় এক আগ্রাসী হিং স্র থাবায় আচমকা চেপে ধরল বেচারা শম্ভুর তৈলাক্ত গ্রীবাদেশ। সেথায় নিজ শক্তপোক্ত হাতের ব্যাপক জোর বসাতেই অদূর হতে ধেয়ে এলো সপ্তদশীর নিষ্পাপ রিনরিনে কন্ঠ!
“ জাআআআন! তোমার “ পাখি ” মানে? তুমি আবার পাখি পালো কবে থেকে? আগে কোনোদিন বলোনি তো! কি নাম তোমার পাখির? দাও তো পাখিটা আমার কাছে। একটু আদর করে দিই। ইউ নো কুচুপুউউউ? আ’ই লাভ পাখি’স!”
এপর্যায়ে রূঢ় মানবের রাগের পারদ যেন তরতর করে বেড়ে গিয়ে আকাশ ছুঁলো। একহাতে শম্ভুর কন্ঠা চেপে রেখে, দাঁত কিড়মিড়িয়ে ঝাঁঝিয়ে আওড়াল,

“ চুপ কর নির্লজ্জ মেয়েছেলে! নয়তো থাপড়ে গাল লাল করে দিব বলে দিলাম।”
“ দাও না সোনা! দাও দাও। থাপ্পড় দিলেও তুমি দিবে, আদর করলেও তুমি করবে। তাই আসো না প্লিইইইজ।”
সুদর্শন এবার বেশ বুঝলো — এই মেয়ে নির্ঘাৎ নিজ অজান্তে নেশা-পানি করেছে। নয়তো এমন দুঃসাহসিক কথাবার্তা তার মুখ দিয়ে থোড়াই বেরুতো! রূঢ় মানব চোয়াল শক্ত করল ফের। শক্ত হাতের জোরালো শক্তিতে শম্ভুর কন্ঠনালী চেপে ধরে, বেচারাকে টানতে টানতে ঘর ছেড়ে বের হতে উদ্যোত হতেই পেছন থেকে ফের শোনা গেল বোকা মানবীর বোকা কন্ঠ!
“ জাআআআআন! কই যাও?”

প্রতিত্তোর করল না মুগ্ধ। অথচ গলার যন্ত্রণায় শম্ভু খানিক চেঁচিয়ে উঠতে গেলেই সে ঘটিয়ে বসল আরেক কাণ্ড। মুহূর্তেই হাতে থাকা চাপাতিটি তুলে এনে আড়াআড়িভাবে চেপে ধরল বেচারার উন্মুক্ত মুখ বরাবর। রুষ্ট ক্রোধে শক্ত হাতে চাপ বাড়াতেই শম্ভুর গালের দুপাশের মাং সে ফুটে উঠল তীব্র ছে দের দাগ। ব্যথায় কুঁকড়ে গেল শম্ভুর মুখ, গলায় বাড়ল তীব্র আত্মচিৎকারের স্বর। অথচ অন্ধকারে সম্মুখে বসে থাকা রূঢ় মানবের চোখে দয়া-মায়ার লেশমাত্রও নেই। সে কেমন হিং স্রতার সনে মুখ এগিয়ে এনে হুট করেই আওড়াল,
“ হুঁশশ! আওয়াজ করবি না। আমার চাশমিস ভয় পেলে, তোকে আমি নির্ঘাৎ মে রে ফেলব!”
মুহুর্তেই শম্ভুর আর্তনাদের করুণ সুরগুলো আঁটকে গেল গলার কাছে। মুখভর্তি উষ্ণ ক্ষারীয় তরলে মাখামাখি অবস্থা তার! ছলছলে চোখে কেবল তাকিয়ে আছে সম্মুখে। মুহুর্ত খানেক যেতে না যেতেই রূঢ় মানব আচমকা এক হেঁচকা টানে শম্ভুকে তুলে নিলো নিজ কাঁধে। পাদু’টোয় ভর দিয়ে শক্ত মুখে ঘর ছাড়বার উদ্দেশ্যে খানিক এগোতেই সপ্তদশী ফের ঘুমঘুম কন্ঠে আওড়াল,

“ গুলুগুলুউউউ! আসোওওওওও না।”
এবার আর রাগ করল না মুগ্ধ! উল্টো শম্ভুকে কাঁধে চেপে রেখে ঠোঁট পিষে হাসল খানিক। প্রতুত্তরে একইভাবে নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রতুত্তর করল —
“ না গোওওওও! আ’ম বিজি নাউ!”
রমণী কি বুঝলো কে জানে! আচমকা তিরিক্ষি মেজাজে বলে উঠল —
“ কেনো? বিজি কেনো? তুমি কি হা গ তে যাচ্ছো?”
সপ্তদশীর এহেন বোকা বাক্যে না চাইতেও হেসে উঠে মুগ্ধ! সুদর্শন মুখখানায় সে-কি সৌন্দর্য ফুটেছে তার। ভাগ্যিস অন্ধকার! নয়তো নেশায় জড়ানো মানবী এতক্ষণে ঠিক ছুটে আসতো নির্দয় লোকটার কাছে। মুগ্ধ পা বাড়ায় সম্মুখে। প্রতিত্তোরে উল্টো প্রসঙ্গে আওড়ায়,

“ ঘর ছেড়ে বের হবি না সিগনোরা! আ’ল বি ব্যাক সুন!”
ব’লেই পা ছোটায় মুগ্ধ। তবে এরইমধ্যে পেছন থেকে ভেসে এলো মাহি’র উদ্বিগ্ন কন্ঠ!
“ সাবধানে হাই গো জাআআআআন!”
মুহুর্তেই থমকায় মুগ্ধ! বিরক্তিতে চিড়বিড়য়ে চাপা স্বরে আওড়াল,
“ বান্দীর মেয়ের মাথার ক’টা তাঁর আগে থেকেই ছেঁড়া, তার ওপর কোন কু***বাচ্চা বাকি তাঁর ক’টাও ছিঁড়ে দিয়ে গেল? একবার পেয়ে নেই শুধু হাতের কাছে! এ্যাই বান্দীর ছেলে! এসবে তোর হাত আছে তাই না?”
“ উমমম…ওগগগগগ…”
কপাল গোছায় মুগ্ধ! প্রবল বিরক্তিতে দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,
“ চল বে বান্দীর ছেলে! তোকে আজ গায়ে হলুদ দিবো।”

“ সে-ই কখন থেকে বাড়িতে আলো নেই! কি করছিস তোরা? বাড়ির মেইন সুইচবোর্ডটা চেক করেছিস আদৌও?”
“ যাইতেছি কর্তাবাবু।”
“ যাচ্ছি মানে? এই যাচ্ছি মানে কী? এখনো আলো এলো না কেনো? সব-কয়টা খেয়েদেয়ে হাতি হচ্ছিস উচ্ছিষ্টের দল-বল কতগুলা! যা তাড়াতাড়ি।”
অন্দরমহলের প্রশস্ত খোলা অঙ্গনে দাঁড়িয়ে থেকে হাঁক ছুঁড়ছেন হিমাংশু রায়। চিড়বিড়িয়ে গাল-মন্দ করে যাচ্ছেন গৃহকর্মীদের। বলিষ্ঠ পাঠার ন্যায় লোকগুলো অন্ধকারেই ছুটছে এদিক-ওদিক। হিমাংশু রায় যারপরনাই বিরক্ত। একহাতে পরনের ধুতির গোছ আঁকড়ে, সম্মুখে পা বাড়াতেই হুট করে পুরো বাড়ি ঝলমলিয়ে উঠল কেমন! তক্ষুনি থেমে গেলেন হিমাংশু রায়। খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরলয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালেন অদূরের তিনতলার পানে। সেথায় আগত সপ্তদশীর কক্ষের দুয়ারপানে স্ত্রীকে ওমন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্দিষ্ট হলেন তিনি। খানিক ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন কিছু একটা। সুদীপা রায় গালের ভাঁজে জিভ ঠেললেন পরপরই। ইশারায় কিছু একটার ইঙ্গিত দিয়ে তৎক্ষনাৎ পা ঘোরালেন উল্টোপথে। তা দেখে স্বস্তির ঢেকুর তুললেন হিমাংশু রায়। অস্ফুটে বিড়বিড়ালেন,
“ যাক ভ গ বা ন! আপদটা ঘাড় থেকে নামলো তবে।”

নীরব কক্ষ! কক্ষের ওমন হাড় হিম করে দেওয়া নিরবতার মাঝে হঠাৎ কানে বিঁধল ধাতুর সনে ধাতু ঘষার একখানা বিদঘুটে শীতল শব্দ! শররররররশররর! ত্বরিত ভয়ার্ত ঢোক গিললো শম্ভু। আহত হাতদুটো তার পিছমোড়া করে পিঠের সনে বেঁধে রাখা। আহত মুখখানা থেকে এখনো অবলীলায় গড়াচ্ছে লহু। দূর্বল দৃষ্টিযুগল তার সম্মুখে আঁটকে আছে সে-ই কখন থেকে। অদূরেই পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক সুদর্শন ভয়ানক পুরুষ। আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকায় বলিষ্ঠ দেহখানা তার, কেমন স্বর্ণের ন্যায় চিকচিক করছে। এক সুস্পষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে মুখারন্যের চারপাশে। বোধহয় সিগার ফুঁকছে ভয়ংকর পুরুষ। তার বাহাতের মুঠোয় চেপে রাখা একখানা নিস্তেজ খন্ডিত ম স্ত ক। তা যে কার, তা নিয়ে বড্ড সন্দিহান শম্ভু! রূঢ় মানবের ঠিক সম্মুখে দু’টো জংলী কুকুর। আয়েশ করে ছিড়েখুঁড়ে খাচ্ছে কারো খ ন্ডি ত দেহ। এহেন পৈ শা চি ক কান্ড স্বচক্ষে দেখে জ্ঞান হারানোর উপক্রম শম্ভুর। নিবুনিবু হয়ে আসছে তার চোখদুটো! ঠিক তখনি রূঢ় মানব ধীরলয়ে শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ালেন। ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপে রেখে দৃষ্টি করলেন তীক্ষ্ণ। গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“ কে পাঠিয়েছে তোকে?”
জিভ কেটে গিয়েছে শম্ভুর! গোঙানি ছাড়া বাক বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। তা অবলোকন হতেই বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। পাদু’টো দরজার অভিমুখে বাড়িয়ে কটমট কন্ঠে শুধালো,
“ ওয়েট কর বাস্টা’র্ড! তোকে একা একা চিতায় তোলাটা ঠিক হবে না। তোর সঙ্গ দিতে ওদেরকেও নাহয় নিয়ে আসি।”

কয়েক জোড়া ব্যস্ত কদম! পিছুপিছু হাঁটছে কয়েক হাত সম্মুখে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকা শ্যাডো মনস্টারের। অদূরে দাম্ভিক কদমে হাঁটছে মুগ্ধ! তার ফর্সা পেটানো উদোম দেহে লোহুর ছিটেফোঁটার শেষ নেই! মুখটা মাখোমাখো লহুর দাগে। ট্যাটুশৈলীতে অঙ্কিত বলিষ্ঠ হাতদুটোয়ও তরতাজা লহুর উপস্থিতি। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই মাফিয়া বিস্টের। উল্টো নির্বিঘ্নে টানছে সিগার। তার ব্যস্ত পাদু’টো অন্দরমহলে প্রবেশ ঘটানোর পূর্বেই থমকে দাঁড়ায় একমুহূর্তের জন্য। ঠোঁটের কোণে সিগার চেপে অহমিকায় পরিপূর্ণ রূঢ় মানব, দু’হাত খানিকটা পেছনে বাড়াতেই তক্ষুনি একখানা ফিনফিনে কালো রঙা শার্ট হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে এডউইন। বাধ্যের ন্যায় শার্টের হাতদুটো শ্যাডো মনস্টারের দু’হাতে জড়িয়ে দিয়েই কদম পেছায় সে। বাকিটুকু মাফিয়া বিস্ট নিজেই করলেন। এক ঝটকায় গায়ের ওপর শার্টখানা কোনমতে জড়িয়ে নিয়ে, ফের গতি টানলেন পায়ের। শার্টের বোতামগুলো অবহেলায় খুলে রাখা তার! সঙ্গে তাল মিলিয়েছে সদ্য ওলফকাটে সজ্জিত বাদামী চুলগুলো।

তিনতলার কাঠের করিডর দিয়ে ধুপধাপ শব্দ তুলে এগোচ্ছে মুগ্ধ! পা ছুটিয়েছে বোকা মানবীর কক্ষের পানে। তবে কক্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে দুয়ারটা ওমন হা করে খুলে রাখা দেখে মেজাজ খিচঁল বদরাগী পুরুষের। চোয়াল শক্ত করে রুষ্টতার সনে কক্ষে প্রবেশ করতেই চোখদুটোর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো তার। সম্পূর্ণ কক্ষ ফাঁকা! রমণীর অস্তিত্বও নেই সেথায়। সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হলো মুগ্ধ। গমগমে গলায় ডাকলো,
“ সিগনোরা?”
প্রতুত্তর আসেনি কোনো। তবে বিপরীত বারান্দা হতে তক্ষুনি ভেসে এলো সাউন্ডস্পিকারের উচ্চ শব্দ! সহসা পিছু ঘুরে দাঁড়াল মুগ্ধ। বিপরীত বারান্দা অর্থাৎ তার ঘরে ওমন উচ্চশব্দে গান বাজাচ্ছে কে? কার এতবড় সাহস, তার অনুমতি ছাড়া তারই ঘরে ঢোকে? ক্ষুব্ধ মুগ্ধ! ক্রুর দৃষ্টে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে এগোয় নিজ ঘরের পানে। ঠিক তখনি পথিমধ্যে রূঢ় মানবের পায়ে বাঁধল নরম কিছু। ওমনি থমকায় মুগ্ধ। ঘাড় ঝুঁকিয়ে পায়ের তলায় তাকাতেই দেখে — সপ্তদশীর পরনের জামা তার পায়ের নিচে। মুহুর্তেই কপাল গোছায় মুগ্ধ। ত্বরিত ঝুঁকে এসে আলগোছে কাপড়টা তুলে নেয় হাতে। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে ফের এগোয় সম্মুখে। পথিমধ্যে পাওয়া গেল সপ্তদশীর ট্রাউজার, হাতের ব্রেসলেট! মুগ্ধ একে একে সব তুললো হাতে। এপর্যায়ে অস্থিরতা বাড়লো তার। অবচেতন মনের কোণে প্রশ্ন জাগলো —

“ মেয়েটা ঠিক আছে তো?”
এহেন ভাবনার জেরে রূঢ় মানব ছুটলো নিজ ঘরের দিকে। দৌড়ে এসে ব্যগ্রতার সনে হালকা ভেজিয়ে রাখা দুয়ারটা একটানে খুলে দিতেই, আচমকা রূঢ় মানবের মুখের ওপর কোত্থেকে যেন ছিটকে এলো কাপড় জাতীয় কিছু। থমকায় মুগ্ধ! ত্বরিত মুখের ওপর থেকে কাপড়টা সরিয়ে এনে দৃষ্টি সম্মুখে বাড়িয়ে ধরতেই অভ্যন্তরে হোঁচট খায় সে। তার হাতে একখানা কালো রঙা অন্তর্বাস! কে ওভাবে মুখের ওপর ছুঁড়ে দিলো তা পরোখ করতে যে-ই না দৃষ্টি সম্মুখে তাক করল, ওমনি ফের হতবাকতায় থমকে যায় মুগ্ধ। অদূরেই টিভিতে গান বাজছে,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৭

“ ek haath mai sharab duja piya mere saath
Peeti jaau peeti jau ni mai saari saari raat…!”
আর সেই গানের তালে কোমর ঢুলিয়ে নাচছে মাহি! গায়ে তার রূঢ় মানবের প্লাস সাইজ টি-শার্ট। যার দৈর্ঘ্য এসে থেমেছে মানবীর পায়ের কাছে। তার হাতে একখানা রেড ওয়াইনের বোতল! ক্ষণে ক্ষণে সেথায় চুমুক দিচ্ছে মেয়েটা!

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৮