পৌষপার্বণ পর্ব ৩২
Irfa Mahnaj
সময় বহমান। দেখতে দেখতে সাত মাস কেটে গেছে।পৌষের চেকআপের জন্য হসপিটালে যাওয়া হবে। সঙ্গে যাবে পৌষের মা বর্ষা, ফাল্গুন ও মাঘ। মানে বাড়ির মহিলা পার্টি সকলেই যাবে। পৌষ যদিও বলেছিলো একজন গেলেই হবে কিন্তু না তারা মানতে নাড়াজ।
চৈত্র ও যেতে চেয়েছিলো কিন্তু ভাদ্র আর চৈত্রের ক্লাস আছে। বসন্ত ও হেমন্তকে স্কুলে পাঠানো হয়েছে। আর পার্বণ? সে তো পড়াশোনা থেকে বহু দূরে তার যোগসূত্র।
পার্বণকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তুমি পড়াশোনা কেনো করো ওর উত্তর,
— সবাই পড়াশোনা করে আমি না করলে খারাপ দেখায় তাই করি।
আবার যদি জিজ্ঞেস করা হয় পড়াশোনা করো না কেনো? তখন দিবে এমন উত্তর,
— এতো পড়াশোনা করে হবে কি একদিন তো মরেই যাবো।
আসলে পার্বণ হচ্ছে ওইসব এভারেজ স্টুডেন্ট যারা সারা বছর পড়বে না এক্সামের আগের রাতে পড়ে উল্টিয়ে ফেলবে। বর্তমানে পার্বণের টিকির ও খোঁজ নেই। সে গিয়েছে কোন জাউড়ামির মিশনে।
এতে অবশ্য স্বস্তি অনুভব করে ফাল্গুন। নিজের ছেলে বলে না এই ছেলে আসলেই জাউড়ামির সর্দার। ওনার হাড়মাস জ্বালিয়ে একদম তামা তামা করে ফেলে।
ফাল্গুন সকলকে তাড়া দিচ্ছে।
— এই তোরা সবাই তাড়াতাড়ি চল আমার জাউড়াটা আসার আগে।
নিজের জামাইর সম্পর্কে এরূপ কথা পছন্দ হলো না বর্ষার। উনি প্রতিবাদ করে বললেন,
— এভাবে বলছো কেনো? মানছি ছেলে টা একটু দুস্টুমি করে তাই বলে ওকে নিবে না এ আবার কেমন কথা! বাবা না ও। চলুক আমাদের সাথে।
এখন পৌষের আবার নিজের মায়ের কথা মনে ধরে না। চোখ মুখ কুঁচকে শুধায়,
— মোটেও না আম্মু। বড় মা ঠিকই বলেছে। আমি ওকে আমার সাথে মোটেও নিবো না। ও যাওয়া মানে ঝামেলাকে বগলদাবা করে নিয়ে যাওয়া।
মহিলাদের ঠোকাঠুকির মাঝেই তারা রওনা দিলো হসপিটালের উদ্দেশ্য। পৌষের উঁচু ফোলা পেটের জন্য হাঁটতে পারে না ঠিক মতো। মাতৃত্বের ছাপ স্পষ্ট কেমন আলাদাই চেহারা গ্লো করছে। একধরণের স্নিগ্ধ, আকর্ষণীয় রূপে জ্বলজ্বল করছে পৌষের ভারি শরীরটা।
গাল দুটো ফুলে লাল আভায় ছেয়ে আছে। যেনো টসটস করা লাল আপেল। মা হলে নাকি মায়েদের শরীরের আলাদাই জেল্লা দেখা যায়। পৌষের ঠিক তেমন। স্বাভাবিকের তুলনায় পৌষের পেট একটু বেশিই ফুলো। তাই তো বাড়ির সবাই চিন্তিত।
পৌষ কোমরের পিছনে এক হাত রেখে ধীরে ধীরে হাটছে। ওর আরেক হাত ধরে আছে বর্ষা। মাঘ ও ফাল্গুনও সাথেই। মাঘ পৌষকে সাবধানে হাঁটতে বলছে।
— পৌষ মা সাবধানে। দেখে দেখে পা ফেলো।
হসপিটালে চিন্তা নেই। জ্যৈষ্ঠ আগেই সব রেডি রেখেছে। ধীরে ধীরে পৌষকে অটোতে ধরে বসানো হয়। এতোটুকু আসতেই হাঁপিয়ে গেছে পৌষ। নিজের ভারি শরীর টা অটোর পিছনের সিটে এলিয়ে দিলো।
— পৌষ শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?
মায়ের কথা শুনে মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তারপর শুধায়,
— একটু খারাপ লাগছে।
পৌষের পাশেই মাঘ বসে। সে পৌষের মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে বলে,
— একটু চোখ বুজে থাক। দেখবি এই চলে আসছি।
মা চাচির এমন যত্ন সবটাই লুফে নিয়ে ফিচেল হাসে। এক হাত আপনাআপনিই চলে যায় নিজ উদরে। সেথায় রেখেই মনে মনে বলে উঠে,
— মায়ের কথা শুনতে পাচ্ছ? এই যে এতো কষ্ট করছি আমি এরপর যদি দেখেছি না বাপের মতো ভন্ড হয়েছো তখন দেখো কি করি।
পূর্ণার সাথে স্পেশাল মিটিং শেষে বাড়ি ফিরে পার্বণ। কিন্তু একি বাড়িতে তো তালা দেওয়া। কতক্ষন নিজেদের ঘরের মূল গেটের দরজার তালাটা ধরে হাবাতের মতো দাড়িয়ে থাকে। তালা টা ধরে টানাহেঁচড়া করেও যখন কিছু হয়না তখন ষাঁড়ের মতো চেঁচায় কিছুক্ষন।
— মা? আম্মাআআআ…. আম্মুউউউউ ও মাআআআ মাগোওও??
বিড়বিড়িয়ে গালি দিয়ে উঠলো। মাথা চুলকে নিচ তলায় নামে। রাস্তায় আসতে আসতে গেমস খেলে ফোনের চার্জ সব শেষ করে বসে আছে।
নিচ তলায় এক বুড়ো আর এক বুড়ি থাকে। পার্বণ জানে নিজের মায়েদের সাথে এই বুড়োর ভালো খাতির। তাইতো তাদের কাছেই আসা।
বুড়ো আর বুড়ির নামটা বর্তমানে মনে পড়ছে না পার্বণের। এই নিয়েও সে কি এক গালি ছুড়লো।
— বাল আমার দরকারের টাইমে নাম মনে পড়ে না।
অগত্যা এতসব ভাবনা ছেড়ে সে দরজা ধাক্কাতে আরম্ভ করে। কলিং বেল চাপতে তার সে কি অলসতা। দরজা ধাক্কাছে তাও হাত উপরে তুলে না নিচ দিয়েই।
বুড়িতো সেই লেবেলের খেপছে। লাঠির ঠক ঠক আওয়াজ শুনে বোঝা গেলো সে দরজা খুলতে আসছে। সাথে পারছে বিলাপ।
— ওই কোন হতচ্ছাড়া রে? কলবেল থাকতে দরজাডারে পিডায়।
বুড়ির কথা শুনে হামি দিয়ে দরজা ধাক্কানোর স্পিড আরো বাড়িয়ে দিলো ভন্ড পার্বণ। মানে ওর সব জায়গাতে পুংটামি করা চাই।
— হ হ পিডাইয়া পিডাইয়া ভাইঙ্গা ফালা দরজাডা।
— আগে দরজা খোলো আমার লাভ বার্ড।
দরজা খুলতেই নজরে আসে পার্বণের পাউট করা মুখের। বৃদ্ধা খেকিয়ে উঠে।
— কলবেল চাপন যায় না?
— এই কলবেলটা আবার কি? জেন-জি দের নিউ কোড নাকি? কিন্তু তুমি তো আমাদের জেনারেশনের বাইরে।
— তোর জামা গেঞ্জি তোর কাছে রাখ। এহন ক দরজাডা ভাইঙ্গা ভিতরে ডোকার এতো তাড়া কেন? হইছে কি?
নিজের জেনারেশনের নাম এর এমন বিকৃতি শুনে আকাশটা পার্বণের মাথায় ভেঙ্গে পড়লো। ঘোর প্রতিবাদ জানালো সে।
— এই বুড়ি কি বলো এসব! কিসের গেঞ্জি কিসে জামা! আশ্চর্য! অপমানস! তাও এতো বড়।
বৃদ্ধা নিজের হাতের লাঠি ধারা পার্বণের পশ্চাদে এক বাড়ি দিতেই সুরসুর করে নিজের ভোল পাল্টে ফেলে ছেলেটা। গলা খাকারি দিয়ে জানতে চায় মায়ের লোকেশন। এবং জানতে পারে নিজ মাতা তার সাথে ঘষেটি বেগমের মতো আচরণ করেছে।
মাকে কতবার করে বলেছে যে সে তাদের সাথে যাবে। কিন্তু না সেই তাকে না নিয়ে নিজের মাই নিজের ছেলের বউ নিয়ে গায়েব? তারা কেউ এটুকু বুঝলো না তার গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি।
সে আছে বলেই তো ফাল্গুন ছেলে পেলো। পৌষ একটা জামাই পেলো। আবার এই যে পৌষ মা হলো, ফাল্গুন দাদি হলো কার জন্য এসব? তার জন্যই তো।
এই পার্বণের অবদানেই তো পৌষকে হসপিটালে নেওয়ার মতো একটা সিচুয়েশন ক্রিয়েট হলো। এদিকে দেখো সেই তাকেই রেখে এরা চলে গেছে! এটা কোনো কারবার!
আম্রপালি রেগে বোম হয়ে আছে। ফোঁসফোঁস করছে সাপের মতো। সামনেই মুখ কাচুমাচু করে দাড়িয়ে বসন্ত। আর তার থেকে কিছুটা দূরে দাড়িয়ে হেমন্ত হাসতে হাসতে শেষ।
হেমন্তের পেটে খিল দেবার জোগাড়। সে হাসতে হাসতে এবার ভাইয়ের দিকে এগিয়ে এলো। বসন্তের কাঁধে হাত রাখতেই বসন্ত তার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। আর অমনি হেসে উঠে হেমন্ত।
টিফিন ব্রেকে ফ্রেন্ডরা মিলে ঠিক করে একটা গেম খেলবে। মুখের মধ্যে পানি নিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যে আগে হাসবে এবং মুখের পানি ফেলবে সে আউট।
নিয়ম অনুযায়ী বসন্ত আর আম্রপালিও খেলতে শুরু করে। খেলার আগে সে কি চাঁপা বসন্তের। আম্রপালিকে উদ্দেশ্য করে এও বলে,
— আরে আমি তো তোমার চোখের মায়ায় জনম জনম তাকিয়ে থেকে হারিয়ে যেতে পারবো।
সব আবেগীয় কথার ইতি ঘটে যেইনা মুখে পানি নিয়ে বসন্ত তাকায় আম্রপালির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠে। তার নাকি আম্রপালির মুখ দেখলেই হাসি পায়। হাসির তোড়ে পানিও ছিটকে সব আম্রপালির মুখে। সবচেয়ে কম সময়ে পানি রেখে রেকর্ড করে বসন্ত।
সেই থেকেই রেগে ফায়ার আম্রপালি। সে কি জোকার? যে তার মুখের দিকে তাকালেই হাসি আসে। এখন বসন্ত কেমনে বুঝাবে ওর হাসি এসে পড়েছে আম্রপালির নাকের ফুটার দিকে তাকিয়ে। সেটা বললে আজ এখানেই মেরে বসন্তের মুখের ফুটা থুড়ি নাকের ফুটাই বন্ধ করে দিবে।
হসপিটালে এসে ডাক্তারের সাথে পার্বণের তুমুল ঝগড়া। মা চাচিদের কাউকে খুঁজে না পেলেও পেয়েছিলো ডাক্তারকে। ডাক্তারের সাথে কথা বার্তার এক পর্যায়ে পার্বণ জানতে পারে ইনিই পৌষের চেক আপ করবেন।
তো পার্বণ ও জানায় সে পৌষের পরিচিত। সেই শুনে ডাক্তার তো মহা খুশি।
— যাক পেসেন্ট এর পরিচিত কাউকে পেলাম। আচ্ছা শোনো বাবু পেসেন্ট তোমার কি হয়?
বাবু! ডাক্তারের মুখে নিজেকে বাবু বলে সম্বোধন শুনে তো পার্বণের মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। যে নিজেই কয়দিন পর বাবুর বাবা হবে তাকে কিনা বলছে বাবু!
— কে বাবু? কিসের বাবু!কি বলছেন?
— কেনো তুমি বাবু। পিচ্চি মানুষকে আর কি ডাকবো। এখন বলো পেসেন্ট তোমার কি হয়?
না পার্বণ কিছুতেই ডাক্তারের কথা মানতে পারছে না। সে চোখ মুখ ভোঁতা করে বলে উঠে,
— পৌষ আমার…
পার্বণের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ডাক্তারই আবার বলল,
— আমিও না। নিশ্চই তোমার বোন হয়। তোমার বোনের হাসব্যান্ডকে ডাক দেও।
— কিসের বোন। বউ আমার। আর আমিই হাসব্যান্ড। কি বলার আছে বলুন।
হাসে মধ্যেবয়স্ক ডাক্তারটি। শুধায়,
— হা হা হা! খুবই ভালো মজা পেলাম। এখন ভদ্র বাচ্চার মতো ডেকে নিয়ে এসো।
— আরে ইয়ার আমিই বাপ। মানতে কেনো চাচ্ছেন না!
— মজা করো না। বড় কাউকে ডাকো। তুমি বাবা? তাও মানতে বলছো। এইটুকুনি ছেলে সে আবার বাবা। মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দেখেছি। আর তোমাকে তো পেসেন্ট এর ভাই মনে হয়। চেহারাতো একই।
— কাজিন আমার চেহারা যদি ওর সাথে না মিলে তো কি আপনার মেয়ের সাথে মিলবে। বাড়তি পেচাল না পেরে আমাকে বলেন কি দরকার।
পার্বণ এতো বুঝানের পরেও ডাক্তার বুঝতে চাইছে না। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। পার্বণের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। ও চেঁচিয়ে উঠলো ডাক্তারের উপর।
— ওরে আ*বালরে তোরে ডাক্তার কে বানাইছে। বলতে আছি সেই কতক্ষন যাবৎ পৌষ আমার বউ আর ওর পেটেরটা আমারই শুক্রাণু।
থেমে আবার বলে উঠে,
পৌষপার্বণ পর্ব ৩১
— আরে বাল চোখে ছানি পড়া শালা ডাক্তার। আমিই বাপ। ধুরো ব্যাঙ বিশ্বাস কেনো করতে আছেন না? বয়স কম দেখে বাপ লাগে না। তোর বাপ লাগার গুল্লি মারি।
