Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ৪১

মেজর কারদার পর্ব ৪১

মেজর কারদার পর্ব ৪১
ফিনারা ঝুমুর

ডান গালে হাত রেখে মাথা উঁচিয়ে অবিচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিঞ্জা। ওর সুগঠিত পরনে এখন ঝিলিক মারছে সেই অফ-হোয়াইট ওয়েডিং গাউনখানা। অন্যহাতে পরম শক্ত ও অনড় বন্ধনে বন্দি করে রেখেছে ইতপূর্বে কাজী ডেকে ‘কবুল’ বলিয়ে নিজের চিরসখা বানিয়ে ফেলা ক্যাপ্টেন প্রহর ইবনাতকে!
​ওদের ঠিক সম্মুখে দাঁড়িয়ে এক রাগী অজগরের ন্যায় চরম আক্রোশে ফুঁসছেন শিউলি বেগম! ওনার বাঁ-হাত এখনো শক্ত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। যা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে, একটু আগেই কিঞ্জার গালে সপাটে সেই কঠিন চড়টি ওনার হাত দিয়েই পড়েছে।​নিজের কণ্ঠ হতে বিষাক্ত ও অগ্নিঝরা শব্দাবলি উগরে দিয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বলেন,
​“তোর মতো কুলাঙ্গার মেয়ে পেটে ধরাই সবচেয়ে বড় কাল হয়েছে রে আমার! তোকে জন্মের পরপরই মুখে একটু নুন খাইয়ে মেরে ফেলা উচিত ছিল! তবে অন্তত আজ এমন অপমানের দিন আমায় দেখতে হতো না!”

​স্ত্রীর পাশেই মাথা নিচু করে বসে আছেন জুবায়ের কারদার। নিজের পরম আদুরি কনিষ্ঠ কন্যার দিকে একরাশ ব্যথিত নয়নে চেয়ে আছেন তিনি। চোখের কোণে অল্প-বিস্তর পানি জমলেও তিনি একদম নিরেট, নিঃশব্দ। বাবার সেই ব্যথিত ও বিষাদগ্রস্ত আদলেই কিঞ্জার সকল নজর গিয়ে আটকে যায়।
​মায়ের কঠোর শাসন ও কটূক্তি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে হাঁটু মুড়ে আসন নেয় নিজের বাবার পায়ের কাছে। বাবার উদরে নিজের মস্তক সঁপে দিয়ে অত্যন্ত ভাঙা ও ব্যাকুল কণ্ঠে আকুতি করে বলে,
​“আই অ্যাম সো সরি, বাবা! আমি কসম খেয়ে বলছি, তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি। বিশ্বাস করো বাবা, তোমার আর কারদার পরিবারের মান-সম্মান নষ্ট হোক এমন কিছু আমি কখনোই চাইনি! কিন্তু পরিস্থিতির চাপে কীভাবে যে সব উলটপালট হয়ে গেল!”

​“থাক, তোকে আর নাটক করে কোনো সাফাই গাইতে হবে না! নিজের এই পছন্দ করা স্বামীকে নিয়ে এখনই এ বাড়ি থেকে বিদেয় হ!”
​পুরো ড্রয়িং রুম কাঁপিয়ে কঠোর গর্জন ছেড়ে ওঠেন শিউলি বেগম। যে চোখে একসময় কেবলই কন্যার জন্য বিশ্বজোড়া মমতার বাস ছিল। আজ সেই চোখে থিকথিক করছে তীব্র ঘৃণা, যন্ত্রণা আর সন্তানকে মানুষ করতে না পারার চরম ব্যর্থতার ছাপ!​কিঞ্জা অশ্রুসজল চোখে ফের চাইল পিতার সেই নত ও বিষাদময় মুখশ্রীর পানে। অত্যন্ত কাঁপাকাঁপা ও ভাঙা গলায় নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
​“সত্যিই কি আমি চিরতরে চলে যাব… বা…বা?”
ধীরে ধীরে নিজের নত মাথাটি তুললেন জুবায়ের কারদার। কিঞ্জার দিক হতে মুখটি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বড্ড শক্ত আর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করেন,

​“প্রহরকে যদি সত্যিই এতটা ভালোবেসে থাকতি, তবে সেটা আগেই ব্যক্ত করলি না কেন? এত বড় আয়োজন, সামীর পরিবার আর আমার এত বছরের সম্মানটা কেন এভাবে পুরো সমাজের সামনে ধূলিসাৎ করলি?”
​বাবার এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেখে বুকে বড্ড আঘাত পায় কিঞ্জা। বাবার কাছে আসার আগেই সে প্রহরের হাত ছেড়ে দিয়েছিল। দূরে এক কোণে চরম ব্যর্থ ও হতাশ বদনে দাঁড়িয়ে থাকা সামী, তার বাবা লোকমান হোসেন এবং মা দিয়া বেগমের পানে একবার অপরাধীর মতো চোখ তুলে তাকায় কিঞ্জা। তারপর পেছনে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরের পানেও আলতো করে চায়।
​“প্রহরকে আমি ভালোবেসেছি সত্যি, বাবা। কিন্তু তিনি যে আমায় কোনোদিন ভালোবাসেননি! বিগত কয়েকটা বছর ধরে ওনার মন পাওয়ার জন্য আমি হাজারো চেষ্টা চালিয়েছি, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছি।”
​“তোমার এই ব্যর্থ প্রেমকাহিনীর করুণ ইতিহাস শুনতে আমরা কেউ ইচ্ছুক নই, কিঞ্জা! যা জিজ্ঞেস করেছি, শুধু তার সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে আমাদের ধন্য করো!”

​একদম নিরেট আর কঠোর গলায় কিঞ্জাকে ধমকে ওঠেন জুবায়ের কারদার। জন্মের পর থেকে যে পরম আদরের কনিষ্ঠ কন্যাকে কখনো চোখ গরম করেও শাসন করেননি, আজ সেই জুবায়ের কারদার নিজের মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না! কিঞ্জার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু এবার বাঁধ ভাঙার উপক্রম হয়।
​“যে ভালোবাসার কোনো শক্ত ভিতই তৈরি হয়নি কোনোদিন, সে ভালোবাসার কথা আমি তোমাকে কিকরে বলতাম, বলো? আমি সাহস করে বলতে পারি নি, বাবা! তবে তোমাকে না বলতে পারলেও আমি কিন্তু সামীকে বারবার এই বিয়েটা ভাঙার কথা বলেছিলাম! কিন্তু ও আমার কোনো কথাই শোনেনি। ও হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল—’এসব নাকি আমার কৈশোরের সাময়িক ঝোঁক বা ভুল, সময়ের সাথে সাথে সব সমাধান হয়ে যাবে আর আমি প্রহরকে ভুলে যাব!’ আমি সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়েই আজ বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছিলাম, বাবা..!”

​“আর এই প্রহর বুঝি সব জেনেবুঝে অমতেই বিয়ে করল তোমায়?”
​শিউলি বেগমের কণ্ঠ থেকে তীব্র বিষ আর ঝাঁঝ মেশানো প্রশ্নটা ভেসে আসতেই কিঞ্জা চোখ তুলে তাকায়। অত্যন্ত ধীরে মাথা নাড়িয়ে ‘না’ সূচক সম্মতি জানায় সে। তারপর পুরো ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে স্পষ্ট উচ্চারণে স্বীকার করে,
​“না… ওনাকে আমি আজ বন্দুকের মুখে জোর করে বিয়ে করেছি!”
জুবায়ের কারদার একটু হাসলেন। বড্ড করুণ আর বেদনাময় সেই হাসি!কিঞ্জা স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল বাবার সেই নিঃশব্দ হাসির দিকে, যা এক নিমেষে ওর বুকটা সজোরে মোচড় দিয়ে তুলল। পরম আকুলতায় দৌড়ে যায় পিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরার লক্ষ্যে।

​কিন্তু আজ বোধহয় ভাগ্যও তার সহায় হলো না! কিঞ্জার সুকোমল স্পর্শ ওথায় পৌঁছানোর আগেই সযত্নে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন জুবায়ের কারদার। অত্যন্ত হতাশ আর নিভে যাওয়া গলায় শেষবারের মতো জানান,
​“এবার তুমি তোমার অর্জিত স্বামীকে নিয়ে এই বাড়ি থেকে যেতে পারো, কিঞ্জা।”
​“না পাওয়ার আক্ষেপ করার চেয়ে অন্তত পেয়ে আক্ষেপ করা অনেক বেশি উপকারী, বাবা! ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ফেলার চেয়ে সমাজের সব বেড়াজাল চূর্ণবিচূর্ণ করে তার সাথে ঘর বাঁধা হাজার গুণে শ্রেয়!”
​কিঞ্জা আর এগোতে পারে না, থমকে দাঁড়ায়। পেছন ফিরে ধীরপায়ে হেঁটে চলে যেতে থাকা পিতার শক্ত পিঠের পানে চেয়ে গলা দিয়ে এক বিশালাকার শক্ত ঢোক গিলে নেয়। চোখের কোণ বেয়ে নামতে চাওয়া কান্নাটুকু বহু কষ্টে আটকে রেখে কাঁপাকাঁপা গলায় বলে,
​“তুমিই তো আমার জীবনের প্রধান শিক্ষাগুরু ছিলে, বাবা! অথচ আজ তোমার দেওয়া সেই শিক্ষাটুকুই অক্ষরে অক্ষরে পালন করার অপরাধে আমায় এভাবে চিরতরে ত্যাগ করলে? এই বুঝি তোমার এত বছরের শিক্ষার মূল রস ছিল, বলো?”

“তুমি আমায় বড্ড কষ্ট দিয়েছো, প্রহর। বোনের ছেলের কাছ থেকে এতোবড় বেদনা পাওয়ার ভাগ্য বুঝি আমারই ছিলো। দোয়া করি, সুখী হও। তবে, জেনো নাও — আজ থেকে আমার কোনো মেয়ে নেই। যে ছিলো, সে কিছু সময়পূর্বে মারা গেছে। মরণ ঘটেছে আমার মেয়ে। কিঞ্জা নামে কেউ নেই, কেউ না।”
আসর হতে অদৃশ্য হন জুবায়ের কারদার। জোবায়েদা খাতুন যান ছেলের পেছন পেছন। যাওয়ার পূর্বে আদরের নাতির দিকে করুণ ভাবে চেয়েছিলেন।
​কিঞ্জার এই চরম ভঙ্গুর ও অসহায় অবস্থা দেখে আর স্থির থাকতে পারল না মেঘ! শীর্ষর হাতের আঁটসাঁট বাঁধন এক ঝটকায় ছাড়িয়ে এক লাফে গিয়ে আগলে নেয় কিঞ্জাকে। নিজের দু-হাতের নিরাপদ ভাঁজে কিঞ্জার ভেঙে পড়া শরীরটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। দূর থেকে মেঘের এমন নিঃস্বার্থ মায়া ও ভালোবাসা ভরা অভিব্যক্তি দেখে শীর্ষর বুকখানা এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে ভরে ওঠে।

​কিন্তু কিঞ্জাকে এভাবে মেঘের আগলে ধরা শিউলি বেগম কিছুতেই সহ্য করতে পারলেন না! উপস্থিত সকল আত্মীয় ও স্তম্ভিত অতিথিদের মাঝেই বিষাক্ত গলায় মেঘের দিকে হাঁক ছেড়ে ওঠেন,
​“এই বেজন্মা মেয়ে! ছাড় আমার মেয়েকে। এখনই ছাড় বলছি!”
​এক প্রচণ্ড গায়ের জোরে ধাক্কা দিয়ে কিঞ্জাকে মেঘের কোল থেকে আলাদা করেন তিনি। সেই ধাক্কার তোড়ে মেঘ সোজা ছিটকে মেঝেতে পড়ে যেতে নিলেই বিদ্যুৎ গতিতে এসে ওকে শক্ত হাতে আগলে নেয় ভাই নোমান! পরম মমতায় নিজের শক্ত বুকের সাথে বোনকে জড়িয়ে ধরে সে। তারপর অগ্নিশর্মা চোখে শিউলি বেগমের দিকে চেয়ে গর্জন করে হুংকার দিয়ে ওঠে,
​“নিজের হাত সামলে কথা বলুন, আন্টি! আমার নিষ্পাপ বোনের গায়ে হাত তোলার বা অপমান করার অধিকার এই কারদার বাড়ির কারও নেই! এরপর যদি ফের আমার বোনের গায়ে হাত তোলার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। তবে কে ছোট আর কে বড়, সে বিচার আমি কিচ্ছু মানব না! সোজা মেরে এই ইহলোক পার করিয়ে দেব!”
নোমানের প্রচণ্ড হুংকারেও শিউলি বেগম বিন্দুমাত্র দমলেন না। বরং অন্ধ রাগে মেঝেতে থুথু ফেলে তীব্র চিৎকারে গজরাতে থাকেন,

​“অন্য কারও ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্ট আবর্জনা নিয়ে এত কিসের বাহাদুরি তোর, হ্যাঁ? বলতে পারবি কেউ কার রক্ত বইছে ওর শরীরে? কে ওর আসল বাপ? যার জন্মেরই ঠিক নেই, বাপের কোনো ঠিকানা নেই। তার আবার কিসের বংশের মান-সম্মান? ওর কূলটা তো স্রেফ একটা চরিত্রহীন নষ্ট নারী!”
​শিউলি বেগমের মুখ থেকে নির্গত এমন বিষাক্ত ও বীভৎস বাক্য শুনে উপস্থিত সকলে এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়! এত বড় চরম সত্য এভাবে সবার সামনে উন্মোচিত হতে দেখে পিংকি বেগম আর নোমান স্তব্ধ হয়ে চমকে ওঠে। রক্ত গরম হয়ে আসা নোমানের পাশে এসে পরম ধীরপায়ে থামে মেজর শীর্ষ। কড়া চোখের দৃষ্টি আর শীতল কিন্তু মারাত্মক ভারী গলায় শিউলি বেগমকে শুধায়,
​“মুখ দিয়ে কী বলছ তুমি একটু ভেবেচিন্তে বলছ তো?”
​“ওর কথার আসল মানেটা কী — তা না হয় এবার আমি বিস্তারিত বুঝিয়ে বলছি!”
​উপস্থিত স্তম্ভিত জনতার ভিড় ঠেলে সামনে প্রকট হয় তানভীর! শীর্ষর চোখ জোড়া একনিমেষে কুঁচকে যায় ওকে দেখে, দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে এক অলৌকিক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ! শীর্ষকে এভাবে থমকাতে দেখে ঠোঁটের কোণে একখানা তেছড়া তাচ্ছিল্যের হাসি ফোটায় তানভীর। বিগলিত ও বিদ্রূপাত্মক গলায় পুরো ড্রয়িং রুম শোনাবার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“আপনার বউ একজন জারজ। যার জন্মানোর ঠিক নেই, বাবার পরিচয় নেই। বেজন্মা একনারীকে আদোও ঘরের বউয়ের সম্মান দেওয়া যায়?”

“ওর পিতার পরিচয় এবং ওর জন্ম পরিচয় সবই রয়েছে। সময় হলে তা প্রকাশিত হবে। তবে, মনে রাখবেন — ও কোনো গরিব ঘরের মেয়ে নয় ; বরং,কোটিপতি বাবার একমাত্র কন্যা এবং এক ভাইয়েরনা জানা বোন।”
হঠাৎ পিছন থেকে বরবেশে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির ক্যাপ্টেন প্রহরের শক্ত কন্ঠ ভেসে আসতেই উপস্থিত সকলে আরও বহুগুণে বিস্মিত ও হতবাক হয়ে যায়!
​এতক্ষণে অপমান আর ব্যথার চোটে মেঘের থরোথরো শ্যামলা আদলে শ্রাবণের অশ্রুধারা নেমে এসেছে। সে পরম অবাক ও অশ্রুসজল চোখে চেয়ে থাকে প্রহরের পানে। প্রহর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে একদম সামনাসামনি মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় বিষাক্ত তানভীরের! প্রহরের সেই তিক্ষ্ণ চোখে ফুটে উঠেছে হিংস্র আক্রোশ, আর তানভীরের চোয়ালও ততক্ষণে রাগে আর অহংকারে ধারালো হয়ে উঠেছে। ওদিকে শীর্ষ নিজের অফ-হোয়াইট পাঞ্জাবির পকেটে দু-হাত গুঁজে পরম শান্ত কিন্তু ভয়ংকর এক মূর্তি ধারণ করে পর্যবেক্ষণ করছে সবকিছু!
​“তাই বুঝি, ক্যাপ্টেন সাহাব?”
​একপাশের ভ্রু উঁচিয়ে চরম বাঁকা ও বিদ্রূপাত্মক হাসি হাসে তানভীর। প্রহরের চোখের দিকে এক পা এগিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ ছোঁড়ার ভঙ্গিতে ফের বলে,

​“তা যদি এতটাই পরিচয় থেকে থাকে। তবে সোজা বাংলায় বলুন দেখি—কে ওর জন্মদাতা বাবা?”
ওর বাবা যেই হোক না কেন, তাতে আমার বিন্দুমাত্র কিছু এসে যায় না!”
​নোমানের কাছ থেকে পরম মমতায় মেঘকে নিজের দু-হাতের শক্তিশালী কোলজুড়ে তুলে নেয় শীর্ষ। তানভীরের একদম নাকের ডগায় বুকঘেঁষে মেঘকে পরম সুরক্ষায় আগলে নিয়ে এসে দাঁড়ায় সে।
​উপস্থিত সকলের হিংস্র ও উৎসুক চোখের সমানে নিজের বীরত্বপূর্ণ চোখের সাথে চোখের মিলন ঘটিয়ে, চাপা অথচ বজ্রকঠিন জোরালো গলায় প্রতিটি মানুষের গালে এক অদৃশ্য কড়া চপেটাঘাত হেনে শীর্ষ বলে ওঠে,

“আমার বউ যেমনই হোক, আমারই বউ। তাকে আমি সেভাবে গ্রহণ করেছি, যেভাবে আমিতাকে ভালোবাসি!”
শীর্ষর এমন অকম্পিত ও বীরোচিত স্পষ্ট জবাবে এক নিমেষে পুরো ড্রয়িং রুম নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে! তানভীরের মুখের ধূর্ত বিশ্রী হাসিটা ক্ষণিকের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, আর শিউলি বেগমসহ উপস্থিত অপমানের আঙুল তোলা মানুষগুলোর মুখ এক নিমেষে চুন হয়ে যায়।
​মেঘ শীর্ষর সুঠাম কাঁধ দুটো দু-হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে স্বামীর চওড়া বুকের ধুকপুকানির মাঝে নিজের অশ্রুসজল মুখখানা লুকিয়ে ফেলে। শীর্ষর বুকের সেই চেনা উষ্ণতায় মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় ওর সমস্ত অপমান, ঘৃণা আর জন্ম পরিচয়ের অপবাদ!

মেজর কারদার পর্ব ৪০

“কে ওর বাবা, ওর কার ঔরসজাত সন্তান, এসব জেনে আমি ওকে ভালোবাসিনি। ভালোবেসেছি ওর স্নিগ্ধতা দেখে। মায়ায় আবদ্ধ হয়েছে মায়াবিনীর চাহনি দেখে। নিজেকে হারিয়েছি ওর মাঝে। যার মাঝে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাই, তার রক্ত জেনে নিজের ভালোবাসাকে অপমান না করি।”

মেজর কারদার পর্ব ৪২