শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৮
আয়েশা শেখ
নিজের এক্স গার্লফ্রেন্ডকে তারই চাচার সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ভার্সিটির চত্বরে চুমু খেতে দেখে স্তব্ধ হলো জারিফ! নিজের চোখে যেনো বিশ্বাস করতে পারছেনা সে।
অথচ একদিন একদিন ঝিলমিলও জারিফকে ঠিক একই অবস্থায় অন্য কারও সঙ্গে দেখেছিল। একই দৃশ্য; ঠিক এই কলেজেই। আজ যেন সময়ের চাকা ঘুরে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটল! কিন্তু আজ জারিফের বুকে এই অদ্ভুত তোলপাড় হচ্ছে কেন? ওপরন্তু বারিশ, অর্থাৎ নিজের চাচার চোখেমুখে ফুটতে থাকা ক্ষুব্ধ দৃষ্টির সামনে মুহূর্তেই টলে উঠল জারিফের শক্ত দুটি পা।
জারিফকে কিছু বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ দিল না বারিশ। এক ঝটকায় ওর কলারটা চেপে ধরে সজোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল তার চোয়ালে! সোজা মাঠের ধুলোয় আছড়ে পড়ল জারিফ। বারিশ ওর দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে উঠল,
— আমার স্ত্রীকে অসম্মান করার সাহস পাস কোথায় তুই? কি ভেবেছিলি ভাইয়ের ছেলে বলে আমার সীমানায় হাত দিয়ে পার পেয়ে যাবি? তছনছ করে দেব তোকে, বা*স্টার্ড!
মাঠের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে চোয়াল চেপে ধরল জারিফ। ঠোঁটের কোণ ফেটে ফিনকি দিয়ে র”ক্ত গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। চিবুক বেয়ে নেমে আসা নোনতা স্বাদ আর মুখে জমে থাকা ধুলোবালির চেয়েও বড় আঘাত লেগেছে তার পুরুষত্বে, তার অহংকারে!
কলেজের এত এত শিক্ষার্থীর সামনে নিজের চাচা তাকে এভাবে কু”কুরের মতো আছড়ে ফেলল! কাঁপতে কাঁপতে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। ঠোঁটের র”ক্তটুকু হাতের উল্টো পিঠে এক ঝটকায় মুছে নিয়ে বিকৃত এক হাসি হাসল সে। চাচার মুখোমুখি হয়ে চি”ৎকার করে উঠল,
— আমাকে মারো আর যাই করো, এটাই আসল সত্য যে, যাকে তুমি আজ নিজের স্ত্রী বলে দাবী করছ, সে একদিন আমার জন্যই পাগল ছিল! আমিই ছিলাম তার প্রথম ভালোবাসা! আর আমার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই ও তোমাকে ব্যবহার করেছে, তোমাকে বিয়ে করেছে!
কথাটা শেষ করার সুযোগটুকুও আর পেল না সে। সজোরে এক লা”থি এসে লাগল ওর পেটে! আবারও মাটিতে আছড়ে পড়ল জারিফ। এবার আর ওকে ওঠার বিন্দুমাত্র সুযোগ দিল না বারিশ। ওর বুকের ওপর এক হাঁটু চেপে বসে উন্মাদনায় একের পর এক ঘু”ষি বসাতে লাগল জারিফের মুখে, বুকে, চোয়ালে! চারপাশের পুরো বাতাস থমথম করছে, কেউ এগিয়ে আসার সাহস পর্যন্ত পাচ্ছে না!
ভরা কলেজের চত্বরে জারিফকে মেরে আধামরা করে ফেলাটা ফাইজানের চরম বেপরোয়া সিদ্ধান্ত ছিল। প্রফেশনাল লাইফ আর ব্যক্তিগত রাগের দেওয়াল ভাঙা হয়তো তার বোকামিই হয়েছে। কলেজের মধ্যে নিজের এমন উগ্র মেজাজ দেখানো কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। সিকিউরিটি গার্ডরা কোনোমতে এসে তাকে থামানোর পর অবশেষে পুরো বিষয়টাই গিয়ে পৌঁছিয়েছে প্রিন্সিপালের কামরায়। প্রিন্সিপাল স্যার কপালে হাত দিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছেন।
রুমের মাঝে মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে ঝিলমিল আর জারিফ। জারিফ ভাঙা হাতটা অন্য হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে; ঠোঁটের কোণ ফেটে র”ক্ত চুইয়ে পড়ছে, কপালটাও ফোলা। আর প্রিন্সিপালের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফাইজান বারিশ। চোখে কোনো অনুশোচনার বিন্দুমাত্র আভাস নেই, যেন সে কিছুই করেনি। দীর্ঘ ১০টা মিনিট কেটে গেছে এই গুমোট নীরবতায়।
— স্যার, কিছু বলার থাকলে দয়া করে বলুন। আমাকে ওদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে।
জারিফ আর ঝিলমিলের দিকে একঝলক নজর বুলিয়ে প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে বলল বারিশ। প্রিন্সিপাল চশমা খুলে সামনে দাঁড়ানো এই বেপরোয়া পুরুষটার দিকে চোখ তুলে তাকালেন। এই কি সেই ফাইজান বারিশ? যাকে তিনি এতদিন ভদ্র, মার্জিত আর অত্যন্ত পরিশীলিত এক শিক্ষক হিসেবে দেখে এসেছেন? যে প্রয়োজন ছাড়া একটা শব্দ বেশি বলে না, যার কণ্ঠস্বর সবসময় নিচু ও গম্ভীর থাকে! প্রিন্সিপাল সাহেব নিজেই ভেবে পাচ্ছেন না কোথা থেকে শুরু করবেন।
— প্রফেসর হয়ে তুমি একজন ছাত্রীকে কীভাবে ভরা ক্যাম্পাসে চুমু খেলে বারিশ? যেখানে এত এত স্টুডেন্ট উপস্থিত ছিল!
সরাসরি জবাব চাইলেন প্রিন্সিপাল।
— আমি কি আরেকবার চুমু খেয়ে দেখাব স্যার?
একেবারে অবুঝের মতো ভ্রূ কুঁচকে বলল বারিশ। যেন বাজ পড়ল রুমের ভেতরে! উপস্থিত শিক্ষক ম্যামরা একে অপরের মুখের দিকে তাকালেন। প্রিন্সিপাল নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন,
— মানে? কী বললে তুমি?
—‘ওয়েট, ওয়েট! রেগে যাচ্ছেন কেন? আপনিই তো জিজ্ঞাসা করলেন কীভাবে চুমু খেয়েছি।’
নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল বারিশ।
—আমি বোঝাতে চেয়েছি, তোমার কি একবারও লজ্জা করল না?
— না।
— কেন?
— কারণ যাকে চুমু খেয়েছি, সে আমার স্ত্রী।
প্রিন্সিপাল এবার চূড়ান্তমাত্রায় বিস্মিত হলেন। ঘরের আবহাওয়া যেন আরও ভার হয়ে উঠল। তিনি মাথা নিচু করে থাকা ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় প্রশ্ন করলেন,
— ঝিলমিল, ও যা বলছে তা কি সত্যি?
ঝিলমিল মুখ তুলল না। সেভাবেই অপরাধীর মতো থেকে হালকা করে মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। আজ কলেজে আসাটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।
প্রিন্সিপাল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বারিশের দিকে ফিরলেন,
— তাই বলে তুমি সবার সামনে এভাবে চুমু খাবে?
— ‘তাহলে কীভাবে খাওয়া উচিত ছিল, স্যার?’
আবারও এক অতি-অনভিজ্ঞ নিষ্পাপ বালকের মতো প্রশ্ন বারিশের।
— প্রতিষ্ঠানের একটা মান-সম্মান আছে বারিশ!
প্রিন্সিপালের গলা এবার কিছুটা চড়ল। বারিশ একচুলও নড়ল না। তার চোখেমুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। শক্ত কণ্ঠে সে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
— আমার স্ত্রীরও একটা মান-সম্মান আছে স্যার!
প্রিন্সিপাল হাত দিয়ে টেবিল চাপড়ে সজোরে চিৎকার করে উঠলেন,
—স্টপ ইট, বারিশ! তোমার স্ত্রী বলেই কি তুমি কলেজের ডিসিপ্লিন পকেটে পুরে ঘুরবে? নিজের প্রাইভেট লাইফ আর প্রফেশনাল লাইফের পার্থক্য ভুলে গেছ তুমি? দিস ইজ অ্যান এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন! এখানে তোমার এই বেপরোয়া আচরণের কোনো জাস্টিফিকেশন হতে পারে না!
বরফশীতল কণ্ঠে বলল বারিশ,
— বউকে যে কোনো জায়গায় এবং বউয়ের যেকোনো জায়গায়ই আমি চুমু খেতে পারি। নিয়ম ভাঙার জন্য আপনি আমায় শাস্তি দিতে পারেন–সেটা আপনার মর্জি। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে ফাইজান বারিশ যেখানে ইচ্ছে সেখানে চুমু খাবে – এটা তার একান্ত অধিকার!
প্রিন্সিপাল তাকিয়ে রইল। তাকিয়েই রইল কিছুক্ষণ ভরে। থমথমে ঘরটায় তিনি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য বাক হারিয়ে ফেলেছেন। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। বলবেনটা কী?
ওদিকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিলমিল মাথা নিচু রেখেই শক্ত করে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিয়েছে। তার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে ঘরের ছাদটা যদি ফাঁকা হয়ে যেত আর সে ডানা মেলে সরাসরি বাসায় উড়ে চলে যেতে পারত, তবে হয়তো বেঁচে যেত! নয়তো এখনই একটি মারাত্মক ভূ”মিকম্প এসে ছাদটা ভেঙে পড়ুক সবার মাথার ওপর, সবাই একসাথে শেষ হয়ে যাক!
—তুমি শুধু নিজের পেশার মর্যাদাই ডোবাওনি, পুরো কলেজের পরিবেশটাকেও এক মুহূর্তে কলঙ্কিত করেছ! গভর্নিং বডিকে আমি এখনই ইনফর্ম করছি। তারা মিটিং ডেকে তোমার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন, তার জন্য প্রস্তুত থেকো!
আবারও গর্জে উঠলেন প্রিন্সিপাল। জবাবে বারিশ বলল,
—জি, আমি প্রস্তুত।
বারিশের এমন নির্লিপ্ত জবাবে প্রিন্সিপাল স্যারের মেজাজ আরও চড়ে গেল। তিনি চেয়ার থেকে কিছুটা সামনে ঝুঁকে বারিশের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তুমি কি আদৌ বুঝতে পারছ যে এতে তোমার স্ত্রীরও কতটা সম্মানহানি হয়েছে? স্ত্রীর মান-সম্মানের চিন্তা যদি তোমার এতই থাকত, তবে ওকে চারপাশের শত শত স্টুডেন্টের ট্রোল বানানোর সুযোগ তুমি নিজে করে দিলে কেন?
প্রিন্সিপালের কথার জবাবে বারিশের মুখে ফুটে উঠল এক তীক্ষ্ণ ও ধারালো হাসির রেখা। চোখ দুটো সামান্য ছোট করে, একদম শান্ত অথচ শীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
— কারা ট্রোল করবে স্যার? ওই স্টুডেন্টগুলো? যারা এই কলেজের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে-চুরিয়ে একে অপরকে চেপে ধরে চুমু খায়? তাও আবার লিভ-ইন কিংবা প”রকীয়া মার্কা অবৈধ সম্পর্কে থেকে? তারা আমার বৈধ বউকে আমার চুমু খাওয়া নিয়ে কথা বলবে? ফাইজান বারিশ নিজের বৈধ স্ত্রীকে নিজের বুক আগলে চুমু খেয়েছে—লুকিয়ে করা কোনো পাপ নয়।
প্রিন্সিপাল আবারও বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। রুমের উল্টো পাশে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অন্যান্য স্যার-ম্যামরা। সেই দলের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে ফাহিম আর পরিণীতাও। ফাহিম ও পরিণীতার মুখ দুটো অতিরিক্ত শক্ত হয়ে আছে।
ফাহিম বারিশ আর ঝিলমিলের সম্পর্কের কথাটা ক’দিন আগেই জেনেছে আলতাফ চৌধুরীর মুখ থেকে। ঝিলমিলকে নিয়ে ফাহিম প্রায়ই অতিরিক্ত খোঁজখবর নিত দেখে আলতাফ সাহেব সোজা প্রশ্ন করে বসেছিলেন সে তার মেয়েকে পছন্দ করে কি না। ফাহিম কিছুটা লজ্জা পেয়ে মুচকি হেসে নিজের অনুভূতির কথা শিকার করে নিয়েছিল। সে আসলেই ঝিলমিলকে প্রথম দেখায় ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু আলতাফ সাহেবের মুখে যখন শুনল ঝিলমিল বিবাহিত, ফাহিমের মুখের আলো নিমেষে নিভে যায়। আলোটা আঁধারে রূপ নেয় যখন জানতে পারে ঝিলমিলের স্বামী আর কেউ নয়, খোদ ফাইজান বারিশ!
ফাইজান ফাহিমের একসময়ের ক্লাসমেট ছিল, আর বর্তমানে একই প্রতিষ্ঠানের ভার্সিটি সেকশনের প্রফেসর। সব শুনে ফাহিমের মন ভারী হয়ে উঠলেও আলতাফ চৌধুরীর শেষ কথাগুলো তার মনে আবার আশার আলো জ্বালিয়েছিল। আলতাফ চৌধুরী বলেছিলেন,
“সেদিন দীঘি পালিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ঝিলমিলকে বিয়েটা দিতে হয়েছে। এই বিয়ে না ঝিলমিল মেনে নিয়েছে, না আমরা। তুমি তো জানোই বারিশ ছেলে হিসেবে কেমন! তাই যেভাবেই হোক আমার মেয়েটাকে আমি ওই নরক থেকে ফিরিয়ে আনব।”
“কিন্তু ফাইজান? ও কি ছেড়ে দেবে?” ফাহিম সংশয় নিয়ে শুধিয়েছিল।
“ঝিলমিলের এখনো আঠারো বছর হয়নি। ও যদি একবার অস্বীকার করে, তবে বারিশের কোনো মুরোদ নেই ওকে জোর করে আটকে রাখার! সময় আসুক, সব ব্যবস্থা হবে… তুমি ভেবো না।”
সেই আশার প্রদীপ নিয়েই আজ ফাহিম দাঁড়িয়ে আছে। তবে বারিশের আজকের বেপরোয়া রূপ তাকে নতুন করে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
ফাহিম এবার সবার মধ্যে থেকে বলে উঠল,
— ওর সাথে অযথা তর্ক করে লাভ নেই স্যার। বেয়াদবিতে পিএইচডি করেছে ও; ভদ্রতার কোনো অস্তিত্বই নেই ওর মাঝে। যে নিজের পেশাগত দায়িত্ব ভুলে ক্যাম্পাসে এরকম নোংরামো করতে পারে, তার সাথে কথা বলাই সময়ের অপচয়। আমি তো শুরু থেকেই অবাক হচ্ছি—এমন একটা মানসিকতার মানুষকে এই প্রতিষ্ঠানের টিচার বানাল কে!
চমকে উঠল ঝিলমিল। সে মাথা সামান্য তুলে বিস্ময় ভরা চোখে ফাহিমের দিকে তাকাল। ফাহিম স্যার লোকটাকে চেনে? শুধু চেনাই নয়, ওদের কথাবাত্রার টোন তো বলে দিচ্ছে সম্পর্কটা বেশ পুরোনো এবং তিক্ত! বারিশ ধীরপায়ে ফাহিমের কাছে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল উপহাসের হাসি। মৃদু আওয়াজে বলল,
—পৌরুষের অভাব থাকলে মানুষ সাধারণত নীতিবাক্যের আড়ালে লুকায়। তুই আজও ঠিক সেটাই করছিস। আমার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজের দিকে তাকা! তোর মতো কাপুরুষ, যে অন্যের বউয়ের দিকে ছিপ ফেলে বসে থাকে, তার মুখে অন্তত টিচারের সম্মান আর ডিসিপ্লিনের খই ফোটা মানায় না। আমি যদি বেয়াদবিতে পিএইচডি করে থাকি, তবে তুই অন্যের স্ত্রীর দিকে নজর দেওয়ার উপর মাস্টার্স করেছিস!
ফাহিম দাঁতে দাঁত চেপে কড়া চোখে তাকাল বারিশের দিকে। কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই প্রিন্সিপাল সাহেব মেজাজ হারিয়ে টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন,
—এনাফ ফাইজান! আজ থেকে তোমাকে এই কলেজের সবরকম একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো! ইউ আর সাসপেন্ডেড!
প্রিন্সিপালের এই বড় সিদ্ধান্তের পরও বারিশের মুখে কোনো উদ্বেগের ছাপ ফুটল না।
—ওকে।
কথাটা বলেই সে পাশে জমে থাকা ঝিলমিলের এক হাত নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
—চলো।
প্রিন্সিপাল সাহেব চোখ বড় বড় করে বলে উঠলেন,
—ওর হাত টানছ কেন?
বারিশ এক মুহূর্তের জন্য থামল। ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করল,
—রেখে যাব নাকি?
— তোমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তোমার স্ত্রীকে নয়! ও এই কলেজের স্টুডেন্ট, ও ক্লাসে যাবে।
বারিশ ঝিলমিলের কাঁধে এক হাত রেখে প্রিন্সিপালের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদম স্পষ্ট ও গভীর গলায় জবাব দিল,
— যেখানে ফাইজান বারিশ নেই, সেখানে তার স্ত্রীর এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকারও কোনো প্রশ্ন ওঠে না! আমার ছায়া যেখানে থাকবে না, সেখানে আমার আলোও থাকবে না।
বাক্য শেষ করে বারিশ আবারও ঝিলমিলের হাত চেপে ধরে বের হতে চাইল। কিন্তু প্রিন্সিপালসহ পুরো ঘরের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের থমথমে দৃষ্টির সামনে ঝিলমিল যেন একদম জমে বরফ হয়ে গেছে। পা দুটো কেমন আটকে আছে লজ্জায়। বারিশ ওর এই অনড় ভাব দেখে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মুখ নিচু করে সবার সামনেই বলে উঠল,
—নড়তে পারছ না? কোলে তুলে নিয়ে যেতে হবে?
বারিশ দুই হাত বাড়িয়ে দিতেই, ঝিলমিলের বুকের ভেতর অমনি আতঙ্কের ঝনঝনানি বেজে উঠল! এই লোক যে বেপরোয়া সত্যি সত্যিই যে চারপাশের শত শত মানুষের সামনে ওকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিতে এক সেকেন্ড ভাববে না—তা ঝিলমিল খুব ভালো করেই জানে!
মুহূর্তের মধ্যে নিজের সমস্ত ইতস্তত ভাব দূরে ঠেলে দিয়ে ঝিলমিল এক ঝটকায় পা বাড়িয়ে দিলে। বারিশ হাত স্পর্শ করার আগেই দ্রুত পায়ে সবার হতবাক চোখের সামনে দিয়ে অফিস রুমের বাইরে বেরিয়ে এল সে!
—
জারিফও বারিশদের পিছু পিছু চুপচাপ রুম থেকে সটে পড়ার জন্য এক পা বাড়াতেই প্রিন্সিপাল সাহেবের তীব্র কণ্ঠ তাকে থমকে দিল,
—তুমি দাঁড়াও!
পাশেই ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়নের দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় কড়া আদেশ দিলেন প্রিন্সিপাল,
— ওর বাবাকে ইমিডিয়েট কল দাও! কলেজ প্রাঙ্গণে বিশৃঙ্খলা আর ইভটিজিংয়ের অভিযোগে ওর বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেওয়া বাকি আছে এখনো।
বাবার কথা শুনতেই জারিফের পা কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল।
ফাহিম হনহন করে অফিস রুমের বাইরে বেরিয়ে এল। বারিশ আর ঝিলমিল তখনও করিডোর ধরে সামনের দিকে এগোচ্ছিল। ফাহিম দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে ঝিলমিলের ফাঁকা হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। হঠাৎ স্পর্শে থমকে দাঁড়াল ঝিলমিল। ফাহিম ব্যাকুল চোখে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
— আমি জানি ঝিলমিল তুমি এই বিয়ে মানো না! চলো আমার সঙ্গে, আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।
ঝিলমিল এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেও পরক্ষণেই এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। ফাহিমের এমন অনধিকার চর্চায় বিরক্ত হয়ে কঠিন গলায় বলল,
— আপনাকে কে বলেছে আমি এই বিয়ে মানি না?
— ‘তোমার বাবা বলেছেন!’ ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল।
ঝিলমিলের উত্তর দেওয়ার আগেই পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের তারা দুটো মুহূর্তেই রক্তিম ও হিংস্র রূপ ধারণ করল। বরফশীতল কণ্ঠে সতর্ক করে বলল,
— ডোন্ট টাচ হার! নতুন করে ঝামেলা করতে বাধ্য করিস না ফাহিম!
বারিশকে উপেক্ষা করে ফাহিম ঝিলমিলের দিকে তাকাল,
— তুমি ভয় পাচ্ছ ঝিলমিল! জোর করে গুটিয়ে রেখো না নিজেকে। আমি সব জানি, আলতাফ স্যার আমাকে সব বলেছেন। ও তোমাকে ভয় দেখিয়ে আটকে রেখেছে তো? ভয় পেয়ো না, তুমি শুধু একবার বলো যে তুমি ওর সাথে থাকতে চাও না, বাকিটা আমি দেখে নেব!
কথাটা শেষ হতে না হতেই বারিশ ফাহিমের কলার চেপে ধরে এক হেঁচকা টানে তাকে এক পা পেছনে সরিয়ে দিল। ওর চোয়ালের রগগুলো রাগে ফুটে উঠেছে, চোখের দৃষ্টিতে জ্বলছে আগুন।
— আমার পেশেন্স পরীক্ষা করিস না ফাহিম! অনেক সহ্য করেছি টিচার্স রুমের ভেতর। ঝিলমিল আমার স্ত্রী—ওর জন্য কী করতে হবে, না হবে, সেটার সিদ্ধান্ত আমি নেব। তোর মতো থার্ড পারসনের ছায়াও যেন আর কখনো ওর আশেপাশে না দেখি!
দুজনের এই উগ্র রূপ আর করিডোরে জমা হতে থাকা লোকজনের কৌতুহলী চোখ দেখে ঝিলমিলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
— বাবা যাই বলুক, আমি এই বিয়ে মানি এবং আমি এতে রাজি! আপনারা এবার দয়া করে থামবেন?
ব্যস, ফাহিমের আর কিছুই বলার রইল না। ক্ষোভ আর একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে দিয়েই ঝিলমিলকে নিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল বারিশ।
সারাটা রাস্তায় বারিশ কিংবা ঝিলমিলের মধ্যে কোনো কথা হলো না। গাড়িটা শেহরিয়ার বাড়ির আঙিনায় এসে থামলেও ঝিলমিল গাড়ি থেকে নেমে এক দৌড়ে চৌধুরী বাড়িতে ঢুকে পরল। বারিশ কিছুক্ষণ সেই যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দাবানলের মতো খবরটা আলতাফ চৌধুরীসহ চৌধুরী বাড়ি এবং শেহরিয়ার বাড়ির সবার কানে পৌঁছে যায়। আইনগতভাবে তারা স্বামী-স্ত্রী হলেও, কলেজের মতো একটা জায়গায় প্রকাশ্যে এমন বেপরোয়া আচরণ সমাজের চোখে মোটেও স্বাভাবিক না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা চরম নিন্দনীয় আর বেমানান হিসেবেই দেখা হয়। চারপাশের লোকজন আর প্রতিবেশীরা আলতাফ চৌধুরীকে ডেকে একের পর এক কটু কথা শোনাতে লাগল। কারণ, তাদের অনেকের সন্তানই ওই একই কলেজে পড়ালেখা করে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠল যে, ঘটনার জেরে কয়েকজন অভিভাবক তো নিজেদের ছেলেমেয়েকে সেই কলেজ থেকে ছাড়িয়ে পর্যন্ত নিয়ে এলেন!
এসব নিয়ে কটু কথা শুনতে হচ্ছে চঞ্চল সাহেব এবং ঝর্ণা বেগমকেও। দুই পরিবারেরই বিশাল বিজনেস কোম্পানি রয়েছে, যার কারণে খবরটি দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়া আর সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
‘কলেজের প্রফেসর হয়ে স্টুডেন্টকে প্রকাশ্যে লিপ কিস করলেন ফাইজান বারিশ শেহরিয়ার।’
ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানান প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে এটাই সবচেয়ে ভাইরাল নিউজ। সাংবাদিকরাও যেন ওঁৎ পেতে বসে আছে এসব নিয়ে জলঘোলা করার জন্য। সাথে লাফিয়ে বাড়ছে কলেজের বদনাম। এতে বারিশের কোনো হেলদোল না থাকলেও দুই পরিবারসহ ঝিলমিলের অবস্থা কাহিল। লজ্জায় আর অপমানে ঝিলমিল তো নিজের রুম থেকেই বের হচ্ছে না।
এর ওপর প্রিন্সিপাল সাহেবও আলতাফ চৌধুরীকে ফোন করে মারাত্মক সব কথাবার্তা শুনিয়ে দিলেন। এত মানসিক চাপ, সমাজের অপমান আর লোকের নানা মন্তব্যে আলতাফ চৌধুরী একদম শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।
আজ চারদিন পর ঝিলমিল বাসা থেকে বের হলো ইরানের বাসায় যাবে বলে। ইরানটাও ইদানীং কেন যেন ওদের বাসায় খুব একটা আসছে না। নিজের বাসা থেকে একটু সামনে এগোলেই শেহরিয়ার বাড়ির গেট। গেটটির দিকে না চাইতেও কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে উঁকিঝুঁকি দিল ঝিলমিল। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে দ্রুত চলে যেতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই একটা শক্ত হাত পেছন থেকে ওর হাত টেনে ধরল! পরক্ষণেই ওকে টেনে নিয়ে গেল দুই বাড়ির মাঝখানের সংকীর্ণ দেয়ালের আড়ালে।
দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে যেতেই এক জোড়া হাত ঝিলমিলের মুখ শক্ত করে চেপে ধরল।
ঝিলমিল ভয়ে আর আ”তঙ্কে চেঁ”চিয়ে উঠতে গিয়েও বারিশকে দেখে থেমে গেল। চেনা মুখটা চোখে পড়তেই নিমেষে ওর চেহারার আ”তঙ্ক গায়েব হয়ে সেখানে ফুটে উঠল একরাশ ক্ষোভ। মুখটা শক্ত করে কঠিন কণ্ঠে বলল,
— এখানে নিয়ে এসেছেন কেন?
— ‘কোথায় যাচ্ছিলে?’ বারিশ বরফশীতল কণ্ঠে শুধাল।
— আপনাকে কেন বলব?
— আমাকে বলবে না মানে? বাপের বাড়ি গিয়ে অহংকার বেড়ে গেছে?
— ‘চুপ করুন আপনি!’ ঝিলমিল আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ‘আপনার জন্য আমার আব্বুর কতটা মান-সম্মান নষ্ট হয়েছে, কোনো ধারণা আছে আপনার?’
— ‘তাতে আমার কী?’ বারিশের গলায় বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই।
— আপনার কিছু না হলেও আমার অনেক কিছু!
ঝিলমিলের এই উদ্ধত জবাবে বারিশের চোখ দুটো সরু হয়ে এলো। ঝিলমিলের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল বুড়ো আঙুল দিয়ে।
— আমার সাথে এভাবে কথা বলবে না।
— ছাড়ুন আমায়!
ঝিলমিল গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে নিজেকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে গটগট করে সেখান থেকে বেরিয়ে হাঁটা ধরল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই পথচলতি কয়েকজন তরুণ ওকে দেখে নিজেদের মধ্যে হেসে উঠল। তাদের একজন উঁচুকণ্ঠে বলে উঠল,
— এই তো, এটাই সেই মেয়ে না? কলেজের স্যারের সাথে অসভ্যতামো করে বেড়ায়? স্যারের ভাতিজার সাথেও তো এর আগে ইটিসফিটিস ছিল!
মুহূর্তের মধ্যে ঝিলমিলের সারা শরীর অপমানে আর রাগে রি-রি করে উঠল। কথাগুলো পেছনের বারিশের কানে পৌঁছানোর আগেই ছেলেগুলো হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে যায়। সেদিকে তাকিয়েই কেঁদে ফেলল ঝিলমিল। বারিশ দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে ঝিলমিলের এক হাত ধরে নরম গলায় বলল,
— কী হয়েছে?
ঝিলমিল এবার নিজের বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই হাত তুলে বারিশের গালে সজোরে এক চ”ড় কষে দিল! তারপর আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল,
— দূরে থাকবেন আমার থেকে! খবরদার, আমার সামনে কোনোদিন স্বামীর অধিকার দেখাতে আসবেন না! আমি কোনোদিনও আপনাকে ওই নজরে দেখিনি, আর কোনোদিন দেখতে পারবও না! জারিফ একদম ঠিক বলেছিল – ওর ওপর ক্ষোভ থেকেই আমি সেদিন বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম! হ্যাঁ, এই বিয়েটার পেছনে আমার নিজেরও প্ল্যান ছিল! তখন বুঝিনি যে এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে… আজ হাড়েহাড়ে বুঝতে পারছি!
ঝিলমিল দম নেওয়ার জন্য থামল, ওর শরীর কাঁপছে।
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৭
— আমি আবারও বলছি, আমি এই বিয়ে মানি না! এতদিন আপনাকে রান্না করে খাওয়ানো, আপনার কাজ করে দেওয়া, আপনার বাধ্য হয়ে থাকা—এসবের একটাই কারণ ছিল, যাতে আমি আপনাদের বাড়িতে পড়ে থাকতে পারি আর জারিফকে চোখের সামনে জ্বালাতন করতে পারি! ব্যাস, এটুকুই!
রাগের মাথায় কী রেখে কী বলে ফেলল ঝিলমিল। বারিশের থমকে যাওয়া মুখের দিকে দ্বিতীয়বার না তাকিয়েই সে উল্টো ঘুরে নিজের বাসার দিকে এক দৌড়ে চলে গেল।
