Home এক প্রণয় রাত্রি এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৪

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৪

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৪
আসিফা খান

ড্রইং রুমে বসে থাকা প্রতিটা মানুষের দৃষ্টি দরজার পানে।। যেখানে রিফাত দাড়িয়ে,,,তার ললাটে ভাঁজ যুক্ত সরু চোখের তীর ড্রইং রুমের মানুষদের দিকেই।। হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে যে এখানে হচ্ছে টা কি? রিফাত এর চোখ গিয়ে ঠেকে সিঙ্গেল সোফায় বসে থাকা সিয়াম এর উপর যে কি না শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকেই চেহে রয়েছে।।
এদিকে ইব্রাহিম সাহেব আর আফতাব মিয়া একে ওপরের দিকে তাকাচ্ছে,,,ছেলেকে কি জবাব দেবে তারা।। ইয়াসমিন বেগম আর আশফিয়ার ও একই অবস্থা।।,,,রিফাত কে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ইব্রাহিম সাহেব হালকা হেসে বলল,,,

“আরে দাদুভাই ওখানে দাড়িয়ে রইলে কেনো?
ওটা আমার বড়ো নাতি রিফাত আর ইয়ানার,,,,”
ইব্রাহিম সাহেব এর শেষের কথা শেষ হওয়ার আগেই সিয়াম এর মা তাঁকে থামিয়ে নিজেই বলতে শুরু করল,,,
“আর ইয়ানা মামুনির বড়ো ভাই।। ছেলেটা বড়ই নিষ্ঠাবান তাকে দেখলেই বোঝা যায়।। দূরে দাঁড়িয়ে কেনো বাবা এখানে আসো,,,তোমার কাজিন এর জন্যই আমরা এখানে,,,তার বিয়ের কথায় তোমারও উপস্থিতি প্রয়োজন।”
সিয়াম এর মায়ের কথায় আলেয়া চোখ উল্টে কপাল চাপড়ায়।। এদিকে রিফাত এক ভ্রু নাচিয়ে বুক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে এগিয়ে এলো।। ভিতর ভিতর থেকে ফুসছে রিফাত। চোয়াল শক্ত,কিন্তু ঠোঁট কাপিয়ে একটা বাক্যও উচ্চারিত করলো না।। বাম হাত মুঠো করে কিছুটা দূরে কোণঠাসা হয়ে বসে থাকা ইয়ানার দিকে তাকালো। মেয়েটা যেনো জগতের বাহিরে তলিয়ে গেছে,কেমন চুপ চাপ বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফ্লোরের দিকে।। রিফাত যেনো চোখ দিয়েই ইয়ানা কে ঝলসে দিচ্ছে।।
এবার শোনা গেলো সিয়াম এর মায়ের কণ্ঠস্বর,,,তিনি অত্যন্ত নমনীয় স্বরে আফতাব মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলতে আরম্ভ করলেন,,,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ভাই সাহেব,,,মেয়ে হিসেবে ইয়ানা অতুলনীয়। এখানে আসা থেকে এখন পর্যন্ত মেয়েটা ভালোলাগায় নিজের জায়গা করে নিয়েছে।।
এরকম মেয়েকে কে না চায় নিজের বাড়ির সদস্য হিসেবে,,,ছেলে আমার স্থাপিত,ভালো মানের স্তর আছে অফিসে তার।। যেদিন জানলাম ইয়ানা কে সে পছন্দ করে আমিতো খুশিতে আত্মহারা।। এই সম্পর্কে আমার মতামত অবশ্যই হ্যাঁ এর পাল্লায়,,,আপনারা কি বলেন এই বিষয়ে।”

সিয়াম এর মায়ের কথায় শেষ না হতেই রিফাত জ্বলন্ত চাহনি নিক্ষেপ করল তার সামনের সোফায় বসে থাকা সিয়াম এর দিকে,,যে কি না কোনা চোখে ইয়ানার দিকে বার বার তাকাচ্ছে।। রিফাত এর সর্বাঙ্গ কেপে উঠল,,মনে হচ্ছে সিয়াম কে এখানেই মেরে অধমার করে ফেলতে।।,কপালের শিরা দৃশ্যমান হচ্ছে ধীরে ধীরে,,, বুক ধড়পড় করে উঠলো তার।।রাগের সাথে এক অশান্ত অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে।।মনে পড়ে আহিল এর বলা কথা,,সে কি সত্যিই ইয়ানা কে হারিয়ে ফেললো! তবে কি সত্যিই দেরি হয়ে গেলো! এখন কি আফসোস করা ছাড়া উপায় আর নেই তার! ইয়ানার অপ্রকাশিত ভালবাসা কি প্রকাশ সীমানা অতিক্রম করবে না?

নিজের ভাবনা চিন্তা নিজের কাছেই বিশ্রী ঠেকলো রিফাত এর।।মনের মধ্যে সীমাহীন জেদ চাপলো,,,অন্তর চিৎকার করে বলল,,,ইয়ানা শুধুই তার,, একান্ত তারই।। আজ বাড়ি ফেরার পথে রিফাত অনেক ভেবেছে,,,সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেয়েটাকে মেনে নেবে। আর ইয়ানা নামক মেয়েকে না মেনে নেওয়ার কোন ধরনের কারণ তার কাছে নেই। অত্যন্ত চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে ইয়ানা সময় সাপেক্ষে শান্ত বটে,, ইয়ানা তার সামনে জন্ম নিয়েছে তার সামনে বেড়ে উঠেছে। মেয়েটার মধ্যে কোন খারাপ লক্ষণ দেখেনি কখনোই।।
২৯ বছর বয়সি রিফাত এইটুকু খুব ভালো করে উপলব্ধি পেরেছে ইয়ানা তার অন্তরের কোনো এক কোণে নিজের আস্তানা জমিয়ে নিয়েছে।। রিফাত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইয়ানাকে সে তার প্রাপ্য সম্মান,অধিকার, স্ত্রীর মর্যাদা সমস্তটা দেবে। আর ভালোবাসা ! সেটা!
রিফাত হাপড়ের মত নিশ্বাস নিচ্ছে সঙ্গোপনে। পরিস্থিতি অনুকূল আবহাওয়া ছড়িয়ে পড়ার আগে আসফিয়া বলে উঠলো,,,

“ইয়ানা আমাদের আদরে মেয়ে,,,তার নিয়ে প্রশংসা সবার কাছেই শোনা যায় আপনিও তার ব্যাতিক্রম নন। আর সিয়াম এর কথা আমরা সবাই জানি,,, শান্ত,ভদ্র ছেলে আপনার।। কিন্তু আপনার প্রস্তাব যে অহেতুক,,,”
আসফিয়া কথা শুনে সিয়াম এর মা সাথে সিয়াম ও চমকে উঠে। তিনি হাসার চেষ্টা করে বলেন,,”অহেতুক মানে! আমরা বুঝলাম না আপা। এই সম্পর্কে আপনাদের না বলার কারণ?”
এতক্ষণ পর সবার কর্ণঘাত হয় রিফাত এর রাশ ভারী কন্ঠে,,,লাল হয়ে ওঠা চোখ সিয়াম এর মায়ের উপর রেখে,,অত্যাধিক মার্জিত ভাষায় বলে,,,
“কারণ,,,বাঙালি জাতি বা ইসলাম দুটোই স্বামী জীবিত অবস্থায় মেয়েদের বিয়ের কথা বলেনি। আবার লোক চক্ষুর নজরেও ব্যাপার টা ভীষণ কটু।। হ্যাঁ তার স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁকে আরো একবার বিয়ে দেওয়াই যায় যদি সে নিজে চায়।। আর যতটা আমি জানি,,আমি এখনও আল্লাহর রহমতে জীবিত এবং না আমার আর আমার স্ত্রী ইয়ানার মাঝে ডিভোর্স হয়েছে!”

রিফাত এর শালিন,মার্জিৎপূর্ণ কথায় পুরো পরিবেশ যেনো শান্ত হয়ে উঠলো।। আফতাব মিয়া নিজেই অবাক রিফাত এর এহেন আচরণে। নাতির সুখের সংসার শুরু তাহ আন্দাজ করতে পারে ইব্রাহিম সাহেব,, বাঁধভাঙ্গা অনন্দ উপভোগ করেছেন।। এদিকে সিয়াম আর তার মায়ের মুখের অবস্থা কাহিল,,,সিয়াম রিফাত এর চোখে চোখ রেখে বললো,,,
“কি বলতে চাইছেন,,,”
রিফাত উত্তর দিল না বরং শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিয়াম এর দিকে।। এতক্ষণে ইয়ানা যেনো পরিস্থিতি বুঝতে পারলো,,,নাহলে এতক্ষণ ত সে রিফাত এর ভাবনায় নিমজ্জিত হয়ে বসে ছিলো। ইয়ানা শুকনো ঢোক গিলল,,,রিফাত এর দিকে এক বার তো এক বার সিয়াম এর দিকে তাকিয়ে অসহায় ভাবে আলেয়ার দিকে তাকালো,,,আলেয়া ইয়ানার চোখের ভাষা বুঝে দুই কাধ উচিয়ে নিচের ঠোঁট ফুলিয়ে ইয়ানার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,,,

“দাদাভাই ভীষণ রেগে আছে আপি,,,।”
ইয়ানা অসহায় ভাবে ফিসফিসিয়ে বললো,,,”আমি কিছু জানি না,,,।”
“চিন্তা নেই দাদাভাই জানিয়ে দেবে।”
বলেই দাত দেখলো।। ইয়াসমিন বেগম সিয়াম এর কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে শুরু করল,,,
“ইয়ানা আর রিফাত এর বিয়ে হয়েছিল চার বছর আগে।। আপনারা এই বিয়ে সম্পর্কে অবগত নন আর না থাকারই কথা।। রিফাত দেশে ফিরেছে এই বছরেই!,,,,আমরা অনেকক্ষণ ধরেই আপনাদের এই বিষয়ে বলতে চাইছিলাম কিন্তু আপনারা তার সুযোগ টুকু দেননি।”
সিয়াম এর মায়ের মনে পরে তারা যখন থেকে এখানে এসেছে এবং নিজেদের প্রস্তাব জানিয়েছে তখন থেকেই ইয়ানার পরিবারের মানুষ তাকে কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু তিনিই সেই সুযোগ তাদের দেয়নি। তখন তাদের কথা বলার সুযোগ দিলে এই মুহূর্তে তাদের এই রকম পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।
ইয়াসমিন বেগম এর শব্দ গুলি যেনো সিয়াম এর কানে না বরং হৃদয়ে করাঘাত করলো। কেও যেনো অন্তরের আয়নায় সজোড়ে পাথর দিয়ে আঘাত করেছে আর মুহূর্তেই সেই মন ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেলো,,,খুব ধিমে আওয়াজে রিফাত এর দিকে তাকিয়ে বললো,,,

“মানে ইয়ানা আপনার,,,,,”
“বউ,,, ”
ব্যাস রিফাত এর এই টুকু “বউ ” শব্দে ইয়ানা চমকে উঠলো। পেট মোচড় দিলো,মনের কোণে মরিচ বাতি জ্বলে উঠলো ।। এদিকে সিয়াম এক পলক ইয়ানার দিকে তাকিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাড়ালো,,,চোখ তুলে তাকালো না কারোর দিকেই,,,পাতলা কন্ঠে সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেল সাথে সিয়াম এর মাও।।
ইয়ানা এবার চোখ তুলে তাকালো রিফাত এর দিকে,,,ছেলেটা তার দিকেই তাকিয়ে চোখ দিয়ে ভস্ম করে দিচ্ছে ইয়ানা কে।। ইয়ানার সর্বাঙ্গ থরথর করে কেপে উঠলো,,, নিমিষেই শরীরে যেন অবস হয়ে এল,,, রিফাতের এহেন দৃষ্টি ইয়ানা কে কাবু করে ফেলেছে।। আবারো লণ্ডভণ্ড হওয়া অন্তর নিয়ে ইয়ানা নতজানু হয়ে বসে রইলো।। রিফাত দাত কিরমির করে উঠে দাড়ালো,,,ধির পায়ে ইয়ানার সামনে এসে মেয়েটার হাতের কব্জি ধরলো শক্ত করে,,,ইয়ানা চমকে উঠলো কিন্তু মাথা উঁচু করলো না।। ইয়ানা কে টেনে নিয়ে যেতে নিলে ইয়ানা কাঠ হয়ে বসে রইলো।। রিফাত এবার দাতে দাঁত পিষে বললো,,,

“আমার রাগের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে,,, যাহ সামলাতে তোমার কূলকিনারা হারিয়ে যাবে, শেষ হয়ে যাবে তুমি।”
সহসা ইয়ানা কিছুটা স্তব্ধ হয়ে গেলো। হৃপিন্ড লাফাচ্ছে।। ইয়ানা কে এক প্রকার টেনে নিয়ে যেতে লাগলো রিফাত।। তার রাগের মাত্রা হিতাহিত জ্ঞান শূন্য।। পরিবারের সবাই থ মেরে রয়েছে।। তাদের সামান্যতম কথা হয়তো রিফাত এর রাগের মাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে কিন্তু আফতাব মিয়া ইয়ানার ভয়গ্রস্থ চেহারা দেখে রিফাত এর উদ্দেশে বললো,,,
“রিফাত,,,ইয়ানা এই সম্পর্কে কিছুই জানতো না! ওকে কিছু বলো না। মেয়েটা এমনিতেই ভয়ে আছে।”
রিফাত যেনো সব কিছু শুনেও না শুনার ভান করলো,,,তার এখন কারোর কথাই কানে যাচ্ছে না। ইয়ানা এক প্রকার ছুটে যাচ্ছে,,,রিফাত এর সাথে তাল মিলাতে বেগ পেতে হচ্ছে তার।

ছোটো ছোটো ব্যাথায় টনটন করে উঠলো আতিকার দেহ। সময় পেরিয়ে গেলেও আহিল তার কাজে ব্যাস্ত। মেতে রয়েছে আতিকার মাঝে।। আতিকা চোখ বন্ধ করে,,,ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে।। সে এসেছে প্রায় আধা ঘণ্টা হতে যায়,,,দেরি করে বাড়ি প্রবেশ করলে লজ্জায় পড়তে হবে তাকে।। মায়ের দিকে তাকাবে কি ভাবে?,,,আতিকা অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে জোরালো কন্ঠে বলল,,,
“আ আহিল।”
শেষের চুমু গাঢ় করে এঁকে গলা থেকে মুখ তুললো আহিল।। এতক্ষণে আতিকার চোখের কোনে পানি জমে উঠেছে। যাহ দেখে আহিল অত্যাধিক ঘাবড়িয়ে গেল,,, আতিকার গালে আলতো হাতে রেখে চোখের পানি মুছে আদুরে শব্দে বললো,,

“হেই,,,কি হলো? বেশি ব্যাথা দিয়ে ফেললাম বুঝি!”
আতিকা চোখ মুখ কুঁচকে বিড়াল ছানার মত নিজে আহিল এর বুকের মাঝে লেপ্টে গেল। আহিল মেয়েটিকে আগলে নিলো শক্ত করে। আতিকা কম্পণরত স্বরে কোনো রকম আড়ালো,,,
“আপনি লজ্জার সাগরে আমাকে ডুবিয়ে দিয়েছেন আহিল,,,আপনার দিকে তাকাবো কেমন করে?”
সহসা আহিল হেসে উঠলো।। মেয়েটা এমনিতেই লজ্জায় একাকার তাই আর তাকে ঘাটলো না।। আতিকার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিতে লাগলো,,,আর এটা সেটা জিজ্ঞাসা করলো।। আতিকাও আহিল এর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে ধীমে আওয়াজে।। কিছুটা সময় পর আতিকা একটু ইজি ফিল করে,,, আহিল এর বুক থেকে মাথা তুলে আমতা আমতা করে বলল,,,

“আমি এখন যাই?”
আহিল অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছু মুহূর্ত,,,তত্পর আতিকার ওড়না ভালো করে মেয়েটার মাথায় চাপিয়ে গলা ঢেকে দিল।। আতিকর গাল টিপে দেয় বললো,,,
“বাড়ি ফিরে সোজা নিজের রুমে যাবে,,,চোখ মুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হবে।। এই কাঙ্ক্ষিত দাগ কিছু দিন থাকবে,,,তাই সামলে চলবে।। মা,বাবা কিংবা তোমার ভাই দেখলে লজ্জার শিকার হবে।। বুঝেছ!”
আতিকা দ্রুত মাথা ঝাকিয়ে ঝটপট দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। আর কিছুক্ষন লোকটার সামনে থাকলে লজ্জায় মূর্ছা ধরবে তার বদনে।।

বিকট শব্দের গুঞ্জন এর সাথে বেচারা দুলদানি খানখান হয়ে পড়ে রইল ইয়ানার সামনে।। ইয়ানা ভয়ে দুই কদম পিছিয়ে সিটিয়ে দাড়ালো আলমারির সাথে।। বুকের ভেতর টর্নেটো হচ্ছে তার। শরীর ভয়ে জমে উঠেছে।। রিফাত সোফায় বসে চোয়াল শক্ত রেখে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে।। মারাত্মক রকমের সুন্দর মানুষটা এখন যেনো লৌহমানব।। হাতের মুঠোর জন্য তার ফর্সা চামড়া ভেদ করে উঁকি মারছে নীল রঙের শিরা উপশিরা।। ইয়ানা এক পলক রিফাত এর দিকে তাকিয়ে আবারও দৃষ্টি নয়ালো।। রিফাত এবার আলগোছে উঠে দাড়ালো,,,জোরালো কদম ফেলে আলমারি থেকে একটা কাগজ বের বের করে,,তত্পর ইয়ানার হাত টেনে টি – টেবিল এর কাছে নিয়ে আছে।। একটা পেন ইয়ানার হাতে গুজে দিয়ে কর্কশ কন্ঠে বলল,,,

“স্বাক্ষর করো।”
ইয়ানা এবার পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো সেই কাগজটির দিকে।। এটা তার আর রিফাত এর রেজিস্ট্রি পেপার।। ইয়ানার সর্বাঙ্গ কেপে উঠলো।। শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে ধারস্থ করে,,,জেদ দেখিয়ে বললো,,,
“না।”
“তুমি বাধ্য।”
ইয়ানা এবার গরম তেলে পানি পড়ার মত তেতিয়ে ওঠে।। রিফাত এর চোখে চোখ রেখে,তীব্র অভিমান এর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে,,,চিৎকার করে বলল,,,
“আমি বাধ্য নোই।। কিসের জন্য এই নাটক।। যেই সম্পর্কের ইতি বিচ্ছেদ,,,সেই সম্পর্কে আমৃত্যুর ওয়াদা,,,কেনো করছেন?”
রিফাত এর চোখ শান্ত কিন্তু ভিতর থেকে সে পুড়ে যাচ্ছে।। গলায় জ্বলন অনুভব হচ্ছে তার।। ইয়ানা কে কাছে টেনে,,,আবেগে বশবর্তী হয়ে বললো,,

“আমৃত্যুর ওয়াদা তো সেই চার বছর আগেই করেছি,,, এখন বিচ্ছেদের ইতি টানবো।।”
রিফাত এর অবাঞ্ছিত প্রণয়ী স্পর্শে ইয়ানা নেতিয়ে পড়ল।। অভিমান ,অভিযোগ উবে গেলো সেখানে এসে হাজির হলো এক রাশ তরঙ্গ যাহ ইয়ানা কে ভিতর থেকে নাড়িয়ে তুলছে।। হতভম্ভ সে এহেন কথায়। অসাধারণ অনুভূতি জানার ইচ্ছে করছে তার।। রিফাত এর কোমরের কাছের শার্ট আঁকড়ে ধরে,,,ইয়ানা অভিমানের অভিনয় করে বললো,,,

“যান ওই আপির কাছে,,,আমাকে মুক্তি দিন নিজেও মুক্তি হয়ে যান।”
রিফাত এর যেনো কি হলো,,,রাগ লাগলো ইয়ানার এমন কথায়।। মেয়েটা কেনো তাকে বুঝছে না! কেনো তার অনুভূতির সমাহারের মধ্যে মিশে থাকা তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছে না! কেনো রিফাত এর অশান্ত কাব্য সাহিত্যে ইয়ানা কে লেখা সেই ছোট্ট পঙক্তি পড়তে সক্ষম হচ্ছে না!
রিফাত হিতাহিত জ্ঞান আহরণ করতে পারলো না।। ইয়ানার কোমর টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেললো।। একদম নিস্তব্ধ নিরব মুহূর্তে ইয়ানা স্তব্ধ।।

মুখ থেকে কিছুই উচ্চারণ করতে পারলো না মেয়েটা।। ক্ষণেই অনুভব করলো নিজের পাতলা ঠোটে উষ্ণ স্পর্শ।। ইয়ানার বুক ছলাৎ করে উঠলো। শরীর শিউরে উঠলো মুহুর্তেই।। চিকন বদনের কম্পন বাড়লো। ইয়ানা খামচে ধরেছে রিফাত এর ঘাড়।। জীবনের প্রথম বার এরকম কোনো পুরুষের বেসামাল ছোঁয়া পেয়ে ইয়ানা নেতিয়ে যাচ্ছে যেনো।। নিজের কোমরে রিফাত এর হাতের দৃঢ় স্পর্শে ইয়ানার পেট মোচড় দিয়ে উঠছে।। ঠোঁটের ওপর এরকম বেপরোয়া চুম্বন, আলিঙ্গন সব মিলিয়ে ইয়ানা ভীষণ অসুস্থ, শন্তহীন।। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ভীষণ।। ঠোটে ব্যাথা অনুভব করছে ইয়ানা।। ইয়ানা রিফাত কে ধাক্কা দিয়েও কাজ হলো না।। ছেলেটা কেমন ব্যাস্ত ভঙ্গিতে নিজের অধর মিশিয়ে রেখেছে মেয়েটার নরম ওষ্ঠে।। জন্ম জন্মান্তর এর তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম প্রচেষ্টা চালাচ্ছে রিফাত।।
সময় গড়ালো। রিফাত ইয়ানার হাঁসফাঁস রত কাহিল অবস্থা দেখে মাথা তুললো।। দুইজনেই বেশ লম্বা নিশ্বাস নিচ্ছে।। ইয়ানা থরথর করে কাপছে। চোখ মেলে তাকাতে পারছে না রিফাত এর পানে।। কিন্তু রিফাত চুপ থাকলো না,,, দুই গাল টিপে বৃদ্ধা আঙ্গুল দ্বারা ইয়ানার ঠোঁট মুছে দিতে দিতে গভীর নিশ্বাস ফেলে বললো,,,

“সত্যিই যাবো তার কাছে।। যেখানে সামান্য আলিঙ্গন সহ্য করতে পারোনি,,, সেখানে পারবে সহ্য করতে এই ভাবেই তাকে কাছে টানলে! নিজের একান্ত মানুষটাকে অন্য কোনো নারীর দেহ,,,,,,”
নাহ রিফাত কথা শেষ করতে পারলো না,,,ইয়ানা হাত উচিয়ে রিফাত এর মুখ চেপে ধরে কথা আটকিয়ে দিলো। ইয়ানার চোখ ছলছল করছে।।রিফাত কে অন্য কারোর সাথে দেখা তো দূরের কথা ভাবতেই বিশ্রী লাগছে তার।। ইয়ানা এবার ডুকরে কেঁদে ওঠে,,,কপাল ঠেকালো রিফাত এর প্রশস্ত বুকের খানিক নিচে,,,হিচকি তুলে কাদঁছে মেয়েটা।। কিন্তু রিফাত তাকে আটকালো না,,,বয়ে যাক মেয়েটার সমস্ত রাগ, অভিমান।। ইয়ানা এক পর্যায়ে আলতো কণ্ঠে ধ্বনিত করলো,,,

“কেনো ভালোবাসেন না আমায় রিফাত?কেনো?
আমি কি আপনার যোগ্য নোই?”
রিফাত শুকনো ঢোক গিলল,,, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইয়ানার মাথায় হাত রাখলো,,, গলায় দৃঢ়তা বজায় রাখার চেষ্টা করে বললো,,,
“তুমি আমার যোগ্য বউ,,,আমার মত সৃষ্টিশীল, ধৈর্যশক্তি সম্পন্য মানুষকে বেসামাল খাদে ফেলে দিয়েছো।। ভাবতে পারছো তোমার অপরাধ,,,শাস্তি স্বরূপ যাবতজীবন কারাদন্ড।। আমার সাথে আজীবন বেঁচে থাকার কারাবাস দিলাম তোমায়।”
এত সুখের শাস্তিও হয় নাকি? এরকম শাস্তি তো ইয়ানা মাথা পেতে নেব।। ইয়ানার মনের মধ্যে সীমাহীন আনন্দ ছেয়ে গেল।। ইস এত সুন্দর অনুভূতি ও হয় নাকি? ভালোলাগার প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে অন্তর্মহলে। ইয়ানা মাথা উঁচু করে তাকালো রিফাত এর পানে,,যে কি না অনিমেষ দৃষ্টিতে তার দিকেই নজর রেখেছে।। ইয়ানা এবার গুন গুন করে বললো,,,

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৩

“আর ভালোবাসা!”
“ভালোবাসা তো অনেক প্রকারের। তাহ কেমন ভালোবাসা চাইছো? একটু আগের মতো ভালোবাসা নাকি এর থেকেও বেশি কিছু?”
রিফাত এর মুখে এরকম লাগাম ছাড়া কথায় ইয়ানার আলুথালু অবস্থা।। কোনো রকম নিজেকে রিফাত এর থেকে মুক্তি করে,,,ঝটপট তাদের রেজিস্ট্রি পেপার এ সাক্ষর করেই রীতিমত ছুটে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।। আল্লাহ,,, আজ সে রিফাত এর সামনে আসবে কি করে?

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৫