Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩
সাইদা মুন

-“মা, ও মেহরীন। চট্টগ্রাম থেকে আসার পথে ওকে পেয়েছি, বিপদে পড়েছিল তাই সাহায্য করেছি।”
তিতলি বেগম ছেলের কথায় শান্ত হয়। মুচকি হেসে বললেন,
-“ভালো করেছিস, আয় আয়, ভেতরে নিয়ে আয়।”
মেহরীনকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বাড়ির বাকিরাও জড়ো হলো। সবার চোখে প্রশ্ন, কে এই মেয়ে? তালহা সবাইকে বুঝিয়ে বলল, সে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসে বিপদে পড়েছিল, তাই সাহায্য করেছে। তবে তাদের বিয়ের প্রসঙ্গটা পুরো এড়িয়ে গেল।
তালহার মা একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,

-“বাড়ি কোথায় তোমার?”
মেহরীন নিচু স্বরে উত্তর দিল,
-“চট্টগ্রামের চুরাডাঙা গ্রামে।”
-“বয়স কতো? কিসে পড়ো?”
-“জি, ১৬ বছর। এ বছর এসএসসি দিয়েছি।”
তিতলি বেগম বিস্মিত হয়ে বললেন,
-“এতো অল্প বয়সেই তোমার বাবা-মা তোমাকে বিয়ে দিচ্ছিল?”
মেহরীন আলতো হেসে উত্তর দিল,
-“আমার বাবা-মা মারা গেছেন ছোটবেলায়। চাচার ঘরেই বড় হয়েছি। দাদিই ছিলেন একমাত্র ভরসা, কিন্তু উনিও মাসখানেক আগে মারা যান। তারপর থেকেই চাচা-চাচি আমাকে বিদায় করার চেষ্টা শুরু করেন।”
মেহরীনের চোখে পানি চিকচিক করছে। সবাই চুপ হয়ে গেল, মেয়েটির জন্য কষ্ট লাগছে সবার। এ বয়সে যেখানে খেলা আর পড়াশোনার সময়, সেখানে তাকে বাস্তবের কঠিন মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তালহার চাচ্চু বিল্লাল সাহেব উঠে বললেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-“থাক, আমাদের সাথেই থাকবে। এ শহরে একা একটা মেয়ে কোথায় যাবে? মা, তোমার কোনো আপত্তি আছে?”
মেহরীন কিছুক্ষণ নীরব রইল। মনে মনে ভাবল, আপাতত এটুকুই তার একমাত্র আশ্রয়স্থান। পরে নাহয় নিজের ঠিকানা খুঁজে নেবে, কিন্তু এখন এখানেই মাথা গুঁজে থাকা ছাড়া উপায় নেই। মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিল তার কোনো সমস্যা নেই।
তালহা ডেকে উঠল,
-“তাহিয়া…”
-“জি ভাইয়া…”
-“মেহরীন যদি তোর সাথে থাকে কোনো সমস্যা আছে?”
-“না না ভাইয়া।”
-“তাহলে আজ থেকে তোর সাথেই থাকবে। ঘরে নিয়ে যা। কাল থেকে এই লেহেঙ্গাই পরে আছে, তোর একটা জামা দিস। পরে মার্কেট করিয়ে দিবো।”
ভাইয়ের কথায় তাহিয়া মেহরীনকে নিয়ে তার রুমে গেল। তাহিয়ার জামা পরে ফ্রেশ হয়ে নেয় মেহরীন। এদিকে দুজনেরই ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়, কারণ দুজনেই একই ক্লাসে, তাহিয়াও এ বছর এসএসসি দিয়েছে।
হঠাৎ তাদের গল্প থামে দরজায় টোকায়। দরজা খুলতেই তালহা ভেতরে ঢুকে,

-“যা তো, এক কাপ কফি নিয়ে আয়।”
ভাইয়ের কথায় তাহিয়া বিরক্ত হয়ে বলে,
-“ভাইয়া, দেখছো না মেহুর সাথে গল্প করছি? অন্য কাউকে বলো না।”
তালহা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
-“মেহু আবার কে?”
-“আরে বুদ্ধু, মেহরীনকেই মেহু বলছি। নামটা বড়, তাই শর্ট নাম রাখলাম।”
-“ওহ, আচ্ছা। যা, এবার কফি নিয়ে আয় ফাস্ট।”
ভাইয়ের উপর রাগ ঝেড়ে গজগজ করতে করতে কফি বানাতে গেল।
এদিকে মেহরীন বিছানার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে আছে। তালহা এগিয়ে এসে হাত গুটিয়ে দাঁড়ায় তার সামনে। মেহরীন তাকাতেই গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসে,
-“বিয়েটা একটা খারাপ পরিস্থিতিতে হয়েছে। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। তোমার যা দরকার আমি দেব, কিন্তু বিয়ের কথা কাউকে বলবে না। আমার মা হার্টের রোগী, মানতে পারবেন না। আর আমিও এই বিয়ে মানি না। তুমি অনেক ছোট, আমাদের বয়সের পার্থক্যও অনেক। তাই এগুলো মাথা থেকে ঝেরে ফেলো। তোমার অনেক সুন্দর একটা ফিউচার পড়ে আছে। বুঝেছো?”
মেহরীন শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল। তালহা রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,

-“কোনো অসুবিধা হলে আমাকে জানাবে। পাশের রুমটাই আমার।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাহিয়া কফি দিয়ে আসে। এরপর মেহরীনকে নিয়ে আবার নিচে নামে খাওয়ার ডাক এসেছে।
টেবিলে বসতেই মেহরীনের চোখ জুড়িয়ে গেল। পরিবারের সবাই একসাথে বসে আছে, অসাধারণ এক দৃশ্য। হেল্পিং হ্যান্ড সবাইকে খাবার পরিবেশন করছে। খাওয়া শেষে মেহরীনকে নিয়ে ঘরে ফিরছিল, এমন সময় রিতু সামনে এসে দাঁড়ায়।
তাহিয়া রিতুকে দেখে ব্রু কুচকায়,
-“কিছু বলবে আপু?”
রিতু নাক উঁচু করে বলল,
-“এর থেকে দূরে থাকিস, গ্রামের মেয়ে।”
রিতুর কথায় মেহরীন সোজা বলে,
-“কেনো আপু, গ্রামের মেয়ে কি মানুষ না?”
মেহরীনের উত্তর রিতুর মোটেই ভালো লাগল না।
-“গ্রামের মেয়েরা তো শুধু এভাবেই মুখে মুখে তর্ক করে, ক্ষেত!”
বলেই সে চলে যায়। তাহিয়া ভাবে মেহরীন কষ্ট পেয়েছে তাই শান্ত করতে বলে,
-“রিতু আপু একটু এরকমই। কিছু মনে কোরো না, প্লিজ।”
-“আরে না, কিছু মনে করিনি।”

রাতে তাহিয়ার রুমেই থাকে। কথায় কথায় মেহরীন জানতে পারল এটা সিকদার বাড়ি। তাদের যৌথ পরিবার। তালহা সিকদারের আপন বোন তাহিয়া সিকদার, মা তিতলি বেগম। বাবা মারা গেছেন তাহিয়া যখন সপ্তম শ্রেনীতে পড়ে। এখন বাবার দেশ-বিদেশের ব্যবসা তালহাই সামলায় চাচাদের সাথে মিলে। তাদের কোম্পানি দেশের সেরা দশটির একটি। যার কৃতিত্ব তার চাচ্চুরা দেয় তালহাকেই।
দাদি সায়রা বেগম এখনো বেঁচে আছেন। তানহার মেজো চাচ্চু বিল্লাল সাহেব, তার স্ত্রী তানিয়া বেগম। তাদের দুই মেয়ে রিতু, এইচএসসি পরীক্ষার্থী আর ফারহা, ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার। ছোট চাচ্চু আফতাব সাহেব, তার স্ত্রী সালমা বেগম, তাদের এক ছেলে মেহেদি, ক্লাস টেনে পড়ে। এই হলো তাদের পরিবার।
তবে কথোপকথনের মাঝে মেহরীন তালহার ব্যাপারেই সবচেয়ে বেশি জানতে আগ্রহ দেখাচ্ছিলো। কেন, সেটা সে নিজেও জানত না।

এভাবেই কেটে যায় মেহরীনের কয়েকটা দিন। এই পরিবারের সবাই এতটাই ভালো যে তাকে কখনো বুঝতেই দেয় না সে বাইরের মেয়ে। শুধু রিতু-ই একটু সহ্য করতে পারে না। তবে তা সে মানিয়ে নিয়েছে। হাতের পাচঁ আঙুল তো আর এক সমান নয়।
এই কদিনে তালহার সাথে আর কথা হয়নি। লোকটা ভীষণ গম্ভীর আর একগুঁয়ে, সকালে অফিসে যায় আর রাতে ফেরে। বাসায় থাকলেও হয় ল্যাপটপে নয়তো মোবাইলে ব্যস্ত। সারাক্ষণ কাজ নিয়েই পড়ে থাকে। মেহরীন প্রতিদিন নিয়ম করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, শুধু তাকে এক ঝলক দেখার আশায়।
ষোলো বছরের কিশোরী মনের কোমল কোণে নীরবে, অচেনা এক তরঙ্গের মতো জায়গা করে নিয়েছে তালহা। যেন হঠাৎ ফুলে ভরা ডালে অজানা রঙের প্রজাপতি এসে বসেছে অকারণে, অথচ গভীর কারণে। অনুভূতিটা একপাক্ষিক হলেও মেহরীনের বেশ ভালোই লাগে, কিশোরী মনের নতুন এক অচেনা অনুভূতি।
কাল এসএসসি পরীক্ষার ফল। তাহিয়া আর মেহু দুজনেই ভীষণ চিন্তিত, সকালে কি হবে সেই ভাবনায় সারারাত এপাশ-ওপাশ করেই কেটেছে। পরদিন সকাল থেকেই চৌধুরী বাড়িতে উত্তেজনার বাতাস, দশ বছরের কর্মের ফল আজ প্রকাশ পাবে।

১২টার দিকে তালহা ল্যাপটপ নিয়ে বসে। আজ বোনের রেসাল্ট বলে সেও যায়নি অফিসে। তালহার পাশে বসে আছে তাহিয়া আর মেহরীন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাহিয়ার রোল সার্চ দিতেই সিকদার মেনশনে আনন্দের ঢেউ ওঠে, সে এ প্লাস পেয়েছে। কর্তারা মিষ্টি নিয়ে রেডিই ছিলো। শোনা মাত্রই বিল্লাল সাহেব ও আফতাব সাহেব বেড়িয়ে পড়েন মিষ্টি বিলাতে। সে নিজেও পুরো বাড়ি লাফালাফি করছে। কিন্তু মেহরীন চুপচাপ বসে, তার ফলাফল এখনো জানা হয়নি। ভীষণ চিন্তা মাথায় আঁকড়ে বসে আছে।
হঠাৎ তালহার ডাকে মেহরীন মাথা তোলে তাকায়। এই বাড়িতে আসার পর ওই প্রথমদিন ছাড়া আর কখনো তার সাথে কথা হয়নি। হবেই বা কী নিয়ে?
-“তোমার রোল আর রেজিস্ট্রেশন নাম্বার দাও।”
মেহরীন তাড়াতাড়ি নাম্বারগুলো বলে দেয়। তালহা টাইপ করছে, মেহুর বুকের ধুকপুকানি বাড়তে থাকে, শ্বাস ভারী হয়ে আসে। বাড়ির সবাইও এবার অপেক্ষা করছে তার ফলাফলের। হঠাৎ তালহা মাথা তুলে তাকায়। তালহার মুখের হতাশ ভাব দেখে মেহরীনের বুক মুচড়ে ওঠে। তবে কি সে ফেল করেছে?
তালহা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,

-“পড়ালেখা করোনি নাকি?”
মেহরীনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে তো স্কুলের সেরা ছাত্রী ছিলো। কাঁপা কণ্ঠে বলে,
-“না না, আমি তো পড়েছি। আমাদের গ্রামের স্কুলের বেস্ট স্টুডেন্ট আমিই ছিলাম।”
মেহরীনের এমন ভীতু আর বাচ্চা বাচ্চা কথায় তালহা মনে মনে হাসে। রিতু পাশ থেকে তাচ্ছিল্য করে বলে,
-“গ্রামের স্কুল আবার কতটুকু ভালো হয়! সেখানে যে কেউ বেস্ট স্টুডেন্ট হতে পারে।”
রিতুর কথায় মেহরীন মাথা নিচু করে ফেলে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। অথচ তার তো পরীক্ষা ভালোই হয়েছিল। তালহা গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,

-“ভালো শিক্ষার জন্য গ্রাম–শহর লাগে না, লাগে নিজের চেষ্টা। আর মেহরীন শুধু ভালোই করেনি, গোল্ডেন প্লাস পেয়েছে। এমনকি চট্টগ্রাম বোর্ডে ৩য় স্থান তার।”
তালহার কথা শুনে সবাই অবাক সাথে খুশিও বটে। তবে এদিকে মেহরীন তো ফেল ভেবে কেঁদেই ফেলেছিল, কিন্তু সত্যিটা শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারে না খুশি-ভয় সবকিছুর মিশ্রনে কেঁদে উঠে।
তিতলি বেগম তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে মেহরীনকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তালহার দিকে কপট রাগ দেখিয়ে বলেন,

-“বেয়াদব ছেলে, ভালো করেছে বললেই হতো। এমন করে বলেছিস যে মেয়েটাকে কাঁদিয়েই দিয়েছিস।”
তালহা হেসে বলে,
-“আমি জানতাম নাকি, এই মেয়ে এতটা পেটকাদুরে..”
তালহার কথায় সবাই হেসে ওঠে, সেও হাসছে। মেহরীন রাগ করে মাথা তোলে, কিন্তু মুহূর্তেই রাগ মিলিয়ে যায়। মনে বার বার ভাবনা আসছে, একটা ছেলের হাসি এত সুন্দরও হয়। এ প্রথমবার তালহাকে হাসতে দেখল সে। যেন আরও গভীরভাবে তার প্রেমে পড়ে গেল। চারিদিকের কোনো কিছুতে খেয়াল নেই। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করে,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২

-“এই লোক কি আমার সর্বনাশ ডেকে আনবে? সবদিক দিয়ে এত পারফেক্ট কিভাবে হয় কেউ।”
সেদিনটা কেটে যায় হাসি-আনন্দে। সবাই তাদের নানারকম গিফট দেয়। তাহিয়া তো তার ভাইয়ের কাছে আবদার করেই বসে দূরে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে। বাকিরাও চেপে ধরায় তালহা রাজি হয়। ঠিক হয় পরের সপ্তাহে সবাই মিলে সিলেট যাবে। আসলে এটা তিতলি বেগমের প্ল্যান, কারণ সিলেটে তার বাবার বাড়ি। সেখানে দুই দিন থেকেও আসবে। তাহিয়া তো খুশিতে আত্মহারা, ঘুরতে প্লাস নানুবাড়িও যাবে বলে। মেহরীনও ভীষণ এক্সাইটেড, সে কোনোদিন ঘুরতে যায়নি। তবে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা শুনেছে।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪