Home রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৬

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৬

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৬
রিক্তা ইসলাম মায়া

আয়ন জুইকে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরেছে আজ এক মাস পেরোল। জুইকে ভর্তি করা হয়েছে মায়ার কলেজেই। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জুইকে অনেক আগেই ট্রান্সফার করা হয়েছিল—বলতে গেলে মায়া ও জুইকে একত্রে ট্রান্সফার করা হয়েছিল। কিন্তু আয়ন জুইকে নিয়ে তিন মাস লন্ডনে থাকায় এত দিন জুই কলেজে অনুপস্থিত ছিল। সামনের মাসে জুইয়ের পরীক্ষা। জুই অনেকটা সময় পড়াশোনা থেকে দূরে থাকায় এখন পড়াশোনার বেশ চাপ পড়েছে। সেজন্য আয়নও জুইকে ওর পড়াশোনায় যথাসম্ভব সাহায্য করছে। আয়ানের বাবা, মা ও বোন লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফিরবেন আরও মাসখানেক সময় পর। তত দিন আয়ন জুইকে নিয়ে নিজের আলাদা ফ্ল্যাটে উঠেছে।

সন্ধ্যার পর জুই পড়তে বসেছে। শব্দবিহীন, হালকা মাথা দুলিয়ে পড়ছে সে। বিছানায় আয়ন বসে। খালি ফ্ল্যাটে দুজন মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই। দিনের বেলায় একজন মহিলা এসে ঘর মোছা, কাপড় কাচা, থালাবাসন ধোয়া, রান্নাবান্না এসব করে দিয়ে যায়। আয়ন নাইট ডিউটি ছেড়ে দিনের শিফটে এসেছে। জুইয়ের জন্য নাইট ডিউটি সে করে না। জুইকে সকালে কলেজে নামিয়ে সে হাসপাতালে যায়। ফিরে আসে সন্ধ্যা ছয়টার নাগাদ। দুপুরে লাঞ্চের সময় জুই আয়নের হাসপাতালে চলে যায় মাঝেমধ্যে। দুজন লাঞ্চ সেরে আয়ন জুইকে ড্রাইভার দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। কাজের মহিলাটি আয়নের ফিরে আসা অবধি জুইয়ের সঙ্গে খালি বাড়িতে থাকে, তারপর চলে যায়। আয়ন ভাবছে জুইয়ের সঙ্গে খালি বাড়িতে থাকার জন্য কাউকে খুঁজবে। কিন্তু বিশ্বস্ত মেয়ে পাচ্ছে না বলে সে নাইট ডিউটি ছেড়ে যতটা সময় পারছে জুইকে ঢাকার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

‘ আপনি কী করছেন জুই?
নিস্তব্ধ নীরবতা ভেঙে আয়নের কথায় জুই হঠাৎ চমকে উঠল। বইয়ের পাতা থেকে চোখ উঠিয়ে আয়নের দিকে তাকিয়ে বলল…
‘ পড়ছি।
‘ কী পড়ছেন? শব্দ হচ্ছে না কেন?
‘ শব্দ করে পড়তে পারি না। পড়া মনে থাকে না।
আয়ন কপাল কুঁচকে জুইয়ের দিকে তাকাল। জুই প্রসঙ্গ পাল্টে ফের বলল…
‘ কফি খাবেন? করে আনব?
‘ আপনি খাবেন? আনব আমি?
‘ আপনার আনতে হবে না। আমি করে…

জুইকে থামিয়ে আয়ন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে এতক্ষণ বিছানায় বসে ল্যাপটপে কিছু মেডিসিন নিয়ে গবেষণা করছিল। একই রুমে জুই পড়ার টেবিলে বসে আর আয়ন বিছানায়। আয়ন পায়ে স্যান্ডেল পরতে পরতে বলল…
‘ আপনার পড়া ছেড়ে উঠতে হবে না। আপনি পড়া শেষ করুন, আমি করে আনছি।
আয়ন বেরিয়ে যেতে জুই আয়নের চলে যাওয়ার দিকে তাকাল। আয়ন বেশ যত্নশীল পুরুষ—সেটা জুই আয়নের সঙ্গে একত্রে বসবাস করার পর থেকে বুঝেছে। যদিও দুজনের ফোনে কথা বলার সময় আয়ন এইভাবে যত্ন সহকারে কথা বলত, কিন্তু তখন জুই এতটা আয়নকে কাছ থেকে অনুভব করতে পারেনি যতটা এখন করতে পারছে। জুই সত্যি ভাগ্যবতী, আয়নের মতো যত্নশীল স্বামী পেয়ে। দুটো কফির মগ নিয়ে আয়ন জুইয়ের পড়ার টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসল। জুইকে একটি কফির মগ দিয়ে অন্যটিতে চুমুক দিয়ে বলল…

‘ আপনার পড়াগুলো আমাকে দেখান জুই।
জুই কফির মগে সবে চুমুক বসাচ্ছিল। আয়নের কথায় মগটা হাতে নিয়ে বলল….
‘ আমি পড়তে পারব।
‘ আমি জানি আপনি পড়তে পারবেন। তারপরও আমাকে আপনার পড়াগুলো দেখান।
‘ না।
‘ কেন?
‘ আপনি কাছে থাকলে আমার পড়া আসে না।
‘ তাহলে কী আসে?
জুই সহজসরল স্বীকারোক্তি দিয়ে বলল…
‘ প্রেম আসে।
‘ প্রেমে তো ঠিকমতো করতে পারেন না, আবার প্রেমের অজুহাত দিচ্ছেন?
জুই লজ্জায় ইতস্তত বোধ করে নত মস্তক হলো। আয়ন জুইয়ের থেকে বইটা টেনে নিজের কাছে নিতে নিতে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল….

‘ আপনার ভাই আরিফ ফোন করেছিল জুই।
আয়ন বাকি কথা শেষ করার আগেই জুই উত্তেজিত ভঙ্গিতে জানতে চাইল…
‘ কী বলেছে?
‘ বলেছে আপনাকে নিয়ে আপনাদের বাড়িতে যেতে। আপনার মা আপনাকে দেখতে চেয়েছেন।
‘ আর বাবা?

পারিবারিক ভাবে মায়াকে শফিকুল ইসলাম মেনে নিলেও জুইয়ের বাবা জামাল সাহেব আজও জুই-আয়নকে মেনে নেননি। যদিও জামাল সাহেব মায়ার নিখোঁজের সময় ঢাকায় এসেছিলেন, কিন্তু তখন আয়ন ও জুই বাংলাদেশে ছিল না। ওরা বাংলাদেশে ফেরে মায়ার আশুগঞ্জ চলে যাওয়ার আরও একদিন পর। জুইদের লন্ডন থাকাকালীন জুইয়ের মা বলতেন, জুইয়ের বাবা জামাল সাহেব জুইয়ের ব্যাপারে ধীরে ধীরে নমনীয় হচ্ছেন, হয়তো খুব শীঘ্রই আয়ন জুইকে মেনে নিবেন। জুই আশায় আছে, কোনো দিন জামাল সাহেব নিজে থেকে সবকিছু ভুলে আয়ন ও জুইকে মেনে নিবেন। কিন্তু যত দিন জুইয়ের বাবা নিজে থেকে ফোন করে আয়ন ও জুইকে ডাকবেন না, তত দিন জুই আশুগঞ্জ ফিরবে না। জুই হাতের কফিতে চুমুক বসাতে বসাতে স্বাভাবিক নেয় বলল…

‘ ওহ।
জুইয়ের ছোট উত্তরটা আয়ন বুঝল না। আয়ন জানে জুই কতটা ছটফট করে নিজের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু এখন সুযোগ পেয়েও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না বলে আয়ন ফের জুইকে বলল…
‘ আপনি কি নিজেদের বাড়িতে যেতে চান না জুই? আপনি যেতে চাইলে আমি আপনাকে পাঠাতে পা…
‘ আমি যাব না।
‘ কেন?
জুই মিথ্যা বাহানা দিয়ে বলল…
‘ সামনে আমার পরীক্ষা তাই।
‘ পরীক্ষা তো অনেক দেরি, এর মাঝে আপনি আপনার বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারবেন। আমি ড্রাইভারকে বলে দেব আপনাকে দিয়ে আসতে। যাবেন আপনি?
জুই হাতের কফিতে চুমুক বসিয়ে আয়নের থেকে বইটা নিজের কাছে টেনে বলল…

‘ আমি বিবাহিত ডাক্তার সাহেব। আর বিবাহিত মেয়েদের স্বামীকে রেখে বাপের বাড়িতে একা বেড়ানোটা শোভা পায় না। যেদিন আমার বাবা আমার স্বামীকে সহ মেয়ে-কে সসম্মানে দাওয়াত করবেন, সেদিনই যাব। আর নয়তো যাব না। আমি আমার স্বামীর ঘরে ভালো আছি। আমার স্বামী আমার অনেক খেয়াল রাখে।
আয়ন জুইয়ের ব্যাপারটা সবে বুঝতে পেরে খানিকটা হাসলো। জুইয়ের বাবা আয়নকে জামাতা হিসাবে মানছে না বলে জুই নিজেদের বাড়িতে আয়নকে ছেড়ে যাচ্ছে না আয়নের সম্মানের জন্য। আয়ন জুইকে বুঝাতে চেয়ে বলল…
‘ জুই, আমি চাই না আপনি আমার জন্য নিজের পরিবার থেকে দূরে থাকুন। আমি আছি, সবসময় আপনার জন্য থাকব। আপনি যান পরিবারের সাথে গিয়ে দেখা করে আসুন। আপনি আমার জন্য ভাববেন না।
জুই কপাল কুঁচকে বলল…

‘ আমার স্বামী কথা তো আমাকেই ভাবতে হবে তাই না। নাকি আপনার জন্য ভাবার আরও মানুষ আছে, কোনটা? পরকীয়া করেন?
‘ আস্তাগফিরুল্লাহ। না।
‘ তাহলে বউকে বাপের বাড়িতে পাঠাতে এতো উতলা হচ্ছেন কেন?
জুই কেমন কথা গুলো ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে আয়নের উপর নিয়ে আসল। আয়ন খানিকটা বোকা হেঁসে বলল..
‘ আমি তো আপনার কথা চিন্তা করে বলেছিলাম জুই।
‘ আমার কথা আপনার চিন্তা করতে হবে না। আমি আমার স্বামীর ঘরে ভালো আছি।
আয়ন হঠাৎ দু’হাত প্রশস্ত করে জুইকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে উৎফুল্লতায় বলল…
‘ আসুন তো জুই, আপনাকে জড়িয়ে শক্তপোক্ত একটা চুমু খাই। আমার কপালে যে এত ভালো বউ জুটবে ভাবিনি, আপনাকে পেয়ে ভাগ্য খোলে গেছে৷ আমার জুই।

খালি বাড়িতে মায়ার সময়টা অসহ্যের নেয় লাগছে। জুই, মুক্তা সকালেই ঢাকার ওদের শ্বশুর বাড়িতে। একাকী মায়াই বিয়ের আয়োজনে আশুগঞ্জ চলে এসেছিল সেদিনই, কিন্তু এখন মায়ার একা বাড়িতে মন টিকছে না। সেদিন রিদ মায়ার সাথে রাগারাগি করে সেই যে গেল, আর মায়ার সঙ্গে রিদের দেখা হয়নি। মায়া নিজের পরিবারের সঙ্গে সেদিন টিয়াদের বাড়ি থেকে আশুগঞ্জ চলে আসার আজ এক মাস তেরো দিন পেরোল; অথচ এই দিনগুলোতে রিদের দেখা নেই, আর না দুজনের কথা হয়েছে। মায়ার খান বাড়ির সকলের সাথে যোগাযোগ আছে, কথা হয়। সুফিয়া খান মায়াকে জানান, রিদ বিয়ে করবে না বলে বেঁকে বসেছে। প্রথমে বিয়ের ব্যাপারে রিদ রাজি হলেও মায়ার পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে রিদ বিয়েতে আর সম্মতি দিচ্ছে না।

এই কথাটা সুফিয়া খান মায়ার পরিবারকেও জানান। সুফিয়া খান মায়াকে বলেছিল, মায়া কয়েক দিন নিজেদের বাড়িতে ঘুরে ঢাকা চলে আসতে। মায়াও নিরুপায় হয়ে তাতে সম্মতি দিয়েছিল, কিন্তু রিদ ঢাকা নেই—সে বিগত দুই সপ্তাহ ধরে দেশের বাইরে আছে। সুফিয়া খানও চট্টগ্রামে। মায়া ঢাকা একা বাড়িতে থাকতে পারবে না বলেই আশুগঞ্জ আছে। আরিফও চট্টগ্রামে। তবে ফিহা শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে আশুগঞ্জ থাকছে। মেয়েটা ভীষণ লক্ষ্মী এবং বুদ্ধিমতী। অল্প সময়ে শ্বশুর বাড়ির সকলের মন জয়ও করে নিয়েছে। আরিফ সপ্তাহে শুক্রবার করে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে করে আশুগঞ্জ আসে। শুক্রবার দিনটা থেকে শনিবার রাতে চলে যায়। এইভাবে চলছে জীবন। মায়ার ফুফিরা মায়াদের বাড়িতে কম আসে। মায়া থাকাকালীন কাউকে দেখা যায়নি এই বাড়িতে।

মায়া মনে মনে ঠিক করেছে, রিদ দেশে ফিরলেই মায়া ঢাকায় চলে যাবে। শুধু রিদকে আর বিয়ের জন্য চাপ দেবে না। জোর করে কোনো কিছু করানো যায় না। মায়া রিদকে বিয়ের জন্য চাপ দিতো, কারণ মায়া চাইত এই বিয়ের মাধ্যমে রিদ মায়ার পরিবারের সাথে সহজ হয়ে উঠুক। মায়ার মতো করে মায়ার পরিবারকেও রিদ আপন মনে করুক। মায়া চায় না স্বামী এবং নিজ পরিবারের মাঝে মনোমালিন্য থাকুক। মায়া পরিবারের জন্য স্বামীকে আর স্বামীর জন্য পরিবারকে ছাড়তে চায় না। মায়ার দুটো সম্পর্কই চায়। মায়া একটা সম্পর্ক বাদ দিয়ে অপর সম্পর্কটা বেছে নিতে পারবে না বলে এতদিন জোর করে রিদকে বিয়ের জন্য রাজি করাতে চাইত। কিন্তু রিদ যখন মায়ার কষ্ট বুঝতে চাইছে না, তখন মায়াও এই নিয়ে রিদকে আর জোর করবে না, বরং স্বামী-ঘরে ফিরে যাবে। অন্যমনস্ক মায়া অসময়ে বিছানায় শুয়ে এসব ভাবছিল। ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে লাগানো ছিল। হঠাৎ ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল ফিহা। ভেজা হাতটা শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে মায়াকে ডেকে বলল…

‘ রিতু ঘুমিয়ে পড়েছো?
‘ না ভাবি।
ফিহার গলা শুনে মায়া উঠে বসল। খোলা চুলগুলো এলোমেলো ভাবে পিঠে পড়ে আছে। ফিহা সেটা লক্ষ করে বলল..
‘ সেকি চুলের এই অবস্থা কেন? গোসল করোনি এখনো?
‘ না ভাবি। পরে করব। এখন ভালো লাগছে না।
‘ আচ্ছা ঠিক আছে গোসল না করো অন্তত ফ্রেশ হয়ে নাও। বাসায় ছোট ফুফি এসেছেন। তোমাকে এই অবস্থায় দেখলে ভাববে তুমি স্বামীর ঘরে সুখী নও। চেহারার কী হাল করেছো দেখো। তোমার কি মন খারাপ রিতু?
মায়া সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে থাকে। মাঝেমধ্যে মা-ভাবির কাজের সাহায্য করতে চাইলেও ওরা দেয় না। তাই মায়ার সময় অবসরে একাকী কাটে। মায়া অনেক চেয়েও রিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না বলে মায়ার প্রায়ই মন খারাপ থাকে। কিন্তু এটা ফিহাকে বলতে চাই না। মায়া প্রসঙ্গ পাল্টে বলল…

‘ ফুফি কিছু বলেছে ভাবি?
‘ না। তবে ফুফির দৃষ্টিভঙ্গি অন্য রকম। কথাবার্তাও বেশ সুবিধার মনে হয়নি। আচ্ছা যাই হোক, তুমি নিচে চলো, খাবে। বাবা তোমাকে নিচে খেতে ডাকছেন।
‘ আচ্ছা তুমি যাও, আমি আসছি।

মায়া সময় নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে মাথায় ওড়না টানল। অলসতায় গোসল করেনি। সবাই খাওয়ার জন্য মায়ার অপেক্ষায় বসে আছে, সেজন্য গোসল করা হয়নি। সন্ধ্যায় করে নিবে। মায়া সবার সাথে ডাইনিংয়ে বসল। মায়ার ছোট ফুফি সালেহা মায়ার মুখোমুখি চেয়ারে বসে। মহিলা বেশ কয়েক বার মায়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন। মায়া সালেহা বেগমকে দেখেও না দেখার মতো করে আছে, কথা বলেনি। সালেহার জন্যই মায়ার নাদিমের সঙ্গে বিয়ে হতে গিয়েছিল, সেজন্য মায়া সালেহা বেগমকে এড়িয়ে চলছে। মায়ার পাশে শফিকুল ইসলাম, তারপর জামাল সাহেব। মায়ার মুখোমুখি অপর পাশে সালেহা বেগম। জুইয়ের মা, রেহেনা বেগম, ফিহা সকলেই একত্রে টেবিলে গোল করে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। এর মাঝে হঠাৎ সালেহা বেগম মায়াকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ করে বলল…
‘ বড়লোক ছেলে দেখে বিয়ে করেছিস, তাহলে চেহারার এই অবস্থা কেন? তোর স্বামী কী তোকে খাওয়ায় না? আমার ভাইয়ের ঘরে তো এর থেকে ভালো ছিলি। বড়লোক ছেলে দেখে বিয়ে করে লাভ কী হলো।

ডাইনিং টেবিলের সকলেই খাওয়া ছেড়ে থমথমে মুখে একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল। হুটহাট করে যে সালেহা বেগম মায়াকে এসব কথা বলবে, সেটা কারও ধারণাতে ছিল না। তবে আগের বারের মতো এইবার আর মায়া চুপ করে সবকিছু সহ্য করল না। বরং প্রতিবাদ জানিয়ে একই সুরে বলল…
‘ আমার স্বামীর অত দামী খাবার আমার সস্তা পেটে হজম হয় না, ফুফি। তোমাদের খাওয়ানো সস্তা খাবার পেটে সয়ে গেছে তো, সেজন্য স্বামীর দামী খাবার খেয়ে শরীর ভালো হচ্ছে না। কমদামী মানুষ তো, সেজন্য দামের মর্ম বুঝি না।
মায়ার উত্তরে সকলে খাওয়া ছেড়ে মায়ার দিকে তাকাল। সালেহা বেগম মায়ার কটাক্ষ কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল…

‘ বিয়ে হতে না হতেই স্বামীর বুঝে গেছিস? এজন্য স্বামী ধরে ধরে মারে।
কথাটা মায়াকে অপমান করার জন্য বলল। অথচ
মায়া একইভাবে কটাক্ষ করে উত্তর দিয়ে বলল…
‘ তোমাদের রক্ত আমার শরীরে তো ফুফি, সেজন্য বেয়াদব হয়েছি। স্বামীকে মান্য করতে জানি না। এজন্য বেয়াদবির ফল পাই যেমনটা তুই পাও ফুফার থেকে। তবে তোমার স্বামী তোমাকে যতটা মারে, আমার স্বামী তার থেকে অনেকটা কম মারে। এই হিসাবে আমি অনেক ভাগবতী বলতে পারো ফুফি, আমার কিন্তু অনেক দাম আমার শ্বশুর বাড়িতে।
মায়ার কথা গুলো যেন সালেহা বেগমের শরীরের আগুন ধরাচ্ছে। তিনি অপমানে থমথমে মুখে বেশ রাগান্বিত গলায় বলল…

‘ বড়লোক স্বামীর ঘরে গিয়ে মুখে মুখে তর্ক করা শিখেছিস। তোর স্বামী যেমন আমার ভাইদের সম্মান করতে জানে না গরিব বলে। তুইও তোর অহংকারী স্বামীর থেকে বড়দের অসম্মান করা শিখেছিস ওখানে থেকে।
সালেহা আর মায়ার বাক্‌-বিতণ্ডা সকলেই শুনছে, কিন্তু মাঝে কথা আপাতত কেউ বলছে না। কারণ মায়া নিজের প্রতিবাদ নিজেই করছে। এর মাঝে মায়া খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বেশ স্বাভাবিক এবং শান্ত স্বরে বলল…
‘ শোনেন ফুফি, আপনার সম্মান আপনার নিজের কাছে। আপনি যদি নিজের সম্মান বজায় রাখতে না পারেন, তাহলে আমি ছোট হয়ে আপনাকে সম্মান দিতে যাব না। আর রইল আমার স্বামীর ব্যাপারটা তাহলে বলব আমার স্বামী যদি বেয়াদব হয় তাহলে তার বউও বেয়াদব হবে সেটাই স্বাভাবিক। আপনি ভালো মানুষ হয়ে বেয়াদবের সাথে লাগতে আসেন কেন? নিজের সম্মান নিয়ে নিজে বসে থাকুন তাহলেই তো হয়। বেয়াদবের কাছে সম্মান চাইবেন সেটাতো হবে না।

থমথমে পরিবেশে মায়া খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। পাঁচে মায়াকে কেউ ডাকে নি। তবে মায়ার চলে যাওয়ার পরপর রেহেনা বেগমও খাওয়া ছেড়ে উঠে চলে গেল রান্নাঘরে। মায়াকে কত কাঠখড় পুড়িয়ে এই বাড়িতে আনল ওনারা, অথচ আবার মায়াকে অপমান করল সালেহা বেগম। কিন্তু শফিকুল ইসলাম বাবা হয়ে মায়ার পক্ষে একটা কথা বলেনি আর না বোনকে থামিয়েছে। মায়ার যে এই বাড়িতে মন টিকছে না, সেটা রেহেনা বেগম অনেক আগে থেকে লক্ষ করেছিল। এখন অভিমান করে মায়া আবার চলে না যায়। মায়া শুধু বাবা-মা’র সম্মানের কথা চিন্তা করে স্বামীর বিরুদ্ধে গিয়ে আশুগঞ্জ এসেছিল। অথচ সেই মেয়েটাকে অপমান করল সালেহা।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৫

মায়া ঘরে গিয়ে সত্যি সত্যি সুফিয়া খানকে ফোন করে জানাল, মায়া খান বাড়িতে ফিরতে চায়। সুফিয়া খান বিষয়টা বেশ স্বাভাবিক নেয়। যেহেতু রিদ বাংলাদেশে নেই, তাই সুফিয়া খান চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি পাঠিয়ে মায়াকে চট্টগ্রামে নিয়ে যান। মায়া চলে যাওয়াতে রেহেনা বেগম বেশ কান্নাকাটি করেন। মায়া রেহেনা বেগমকে সান্ত্বনা দিয়ে বোঝায়, মায়া ফের আসবে নিজের পরিবারকে দেখতে। কথা সত্যি, মায়া নিজের পরিবারকে দেখতে হয়তো মাঝেমধ্যে আসবে, কিন্তু আর কখনো এতটা দিন নিয়ে থাকবে কিনা সন্দেহ।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৭