Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩০

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩০

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩০
সাইদা মুন

সিকদার বাড়ির মেইন দরজা থেকে গেট অবধি পুরো পথজুড়ে পুলিশ সারি করে দাঁড়িয়ে। মাঝখানটায় ফাঁকা রাখা হয়েছে। সেই পথ বেয়ে ধীরে ধীরে ঢুকে আসে একটি কালো গাড়ি। দৃশ্যটা হঠাৎ দেখে সবাই অস্বস্তিতে পড়ে যায়। এতো পুলিশ কেন? বিল্লাল সাহেব উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করতেই একজন জানায়, আইনমন্ত্রী সোহেল হোসেন এসেছেন। তাঁর নিরাপত্তার জন্যই এত আয়োজন। কালো গাড়িটির পেছনেই আরেকটি পুলিশের গাড়ি গেটের বাইরে অবস্থান নেয়। আইনমন্ত্রী বলে কথা, সিকিউরিটি তো থাকবেই। কিন্তু সবার মনে একটাই প্রশ্ন। হঠাৎ তিনি তাদের বাড়িতে কেন? তাও কাউকে কিছু না জানিয়ে!

বাগানের ফুলগাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল ফাইজা। পাশে দাঁড়িয়ে স্নেহা, তালহার মামাতো বোন। দুজনের মধ্যে ভালোই বন্ধুত্ব। দুজনে গল্প করতে করতে গাছের পরিচর্যা করছিল। ফাইজা মনোযোগ দিয়ে পানি দিচ্ছিল আর স্নেহা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। হঠাৎ গেট দিয়ে একসঙ্গে এত পুলিশ ঢুকতে দেখে সে থমকে যায়। ঠিক তখনই কালো গাড়িটা বাড়ির ভেতরে ঢোকে।
স্নেহা ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি ফাইজাকে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—এই ফাইজা, দেখ না তোদের বাড়িতে এতো পুলিশ কেন এলো?
স্নেহার কথায় ফাইজা পানি দেওয়া বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পেছন ঘুরে নিজেও থমকে যায়। অবাক বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে ওঠে। তাদের বাড়ির গেট থেকে সদর দরজা পর্যন্ত টানটান পুলিশ লাইন, দু’পাশে দাঁড়িয়ে। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। কিছু কি হয়েছে, তার ভাই? নাকি আব্বু-চাচ্চু? কার কি হলো।
ভয়ে তাড়াহুড়ো করে টেপ বন্ধ করে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে। সদর দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই, কালো একটা গাড়ি থেকে নেমে আসা একজন মধ্যবয়সি লোক আর তার দু’জন বডিগার্ড বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। ফাইজাও পেছন পেছন ভেতরে পা রাখতে যাবে, এমনসময় আবার আরেকটা গাড়ির শব্দে দাঁড়িয়ে যায়।
কি হচ্ছে? একের পর এক গাড়ি কেন তাদের বাড়িতে ঢুকছে? কালো গাড়ির লোকটা যে বড়মাপের কেউ, এটা বডিগার্ড দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু এবার আবার কে এলো?

চিন্তিত মুখে পেছন ফিরে তাকায়। দেখে সাদা রঙের আরেকটা গাড়ি গেট পেরিয়ে ঢুকছে। গাড়িটা থামতেই একজন পুলিশ দরজা খুলে দেয়। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে লম্বা-চওড়া গড়নের এক ছেলে। গায়ে ফরমাল গেটআপ, চোখে কালো চশমা। এলোমেলো চুলগুলো, টাইও বেঁকে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে এসেছে।
ফাইজা লোকটাকে দেখামাত্রই চোখ বড় হয়ে ওঠে। কয়েক পলক না যেতেই তার চোখেমুখ লাল হয়ে যায়। এই লোক এখানে কি করছে? প্রশ্নটা মনে দগদগে হতে না হতেই রাগে তেড়ে যায় সামনের দিকে। গিয়েই সরাসরি আরমানের বুক বরাবর ধাক্কা মেরে বসল সে।
গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই এমন অচেনা আক্রমণে আরমান চমকে ওঠে। দ্বিতীয়বার ধাক্কা মারার আগেই সে ফাইজার দুই হাত চট করে ধরে ফেলে। মুহূর্তেই হাত দুটো ফাইজার পেছন দিকে নিয়ে গিয়ে গাড়ির সাথে তাকে চেপে ধরে।

আরমানের পালটা আক্রমণ একদমই আশা করেনি ফাইজা। এতো লোকের সামনে তাকে এভাবে চেপে ধরায় সে ছটফট করতে শুরু করে। কটমট গলায় ঝাঁঝাল স্বরে বলে ওঠে,
—ইউ অভদ্র লোক! আর কতো অভদ্রগিরি দেখাবেন? ছাড়ুন বলছি, মানুষ দেখছে।
আরমান এক হাতে তার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে রাখে। অন্য হাত দিয়ে ধীরে চশমাটা খুলে গম্ভীর চোখে ফাইজার দিকে তাকায়। মেয়েটার নাক ফুলে আছে, রাগে হিসহিস শব্দ বের হচ্ছে। কপাল কুঁচকে আছে, ফরসা মুখটা কঠিন হয়ে লালচে রূপ ধারন করছে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আরমান মুখটা একদম তার সামনে এনে নিচু স্বরে বলল,

—এন্ড ইউ স্টুপিড গার্ল, এখানে কি করছো? আমার পিছু পিছু এখানেও চলে এসেছো?
কথাটা শোনামাত্রই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে ফাইজা। ঝারি মেরে বলল,
—হেই মিস্টার অভদ্র লোক, মুখ সামলে কথা বলুন! পিছু তো নিয়েছেন আপনি আমার। সেদিনও আপনিই পিছু নিয়েছিলেন, আজও আপনিই আমার পিছু নিয়ে বাড়ি অব্দি চলে এসেছেন।
কথা শেষ হতেই আরমানের গম্ভীর মুখে পরিবর্তন আসে। তাকে ছেড়ে দিয়ে পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বলে,

—এতোদিন জানতাম তুমি চুন্নি। কিন্তু এখন দেখি বড় মাপের ডাকাতও। আমার মানিব্যাগ চুরি করে শান্তি হয়নি? আবার আমার বোনকে ডাকাতি করে নিয়ে এসেছো।
বলতে বলতেই আরমানের মুখে রাগী ভাবটা ফুটে ওঠে। ফাইজা কটমট চোখে তাকিয়ে বলল,
—কি যা তা বলছেন? আর আপনি এখানে এসেছেন কেনো? কি চাই?
আরমানের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠেছে। কপালের নীল রগটা ফুলে উঠেছে। গলা ভারী করে বলল,
—ভালো করে বলো, আমার বোন কোথায়?
ফাইজা কপাল কুচকে স্থির হয়ে যায়। কি বলছে সে? তার বোন কোথায় মানে। সে জানবে কীভাবে!
—ও হ্যালো, আপনার বোন কোথায় তা আপনি না জানেন! আমি কেমনে জানব?
তার কথায় রাগে আরমানের গলা থরথর করে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে, চোখ লাল করে বলল,
—তুমি জানো না মানে? তুমি জানো.. তোমার বাপও জানে। আমার বোনের যদি কিচ্ছু হয়, আমি জাস্ট এই বাড়ি জ্বালিয়ে ছারখার করে দেব।

বলতে বলতেই ফাইজাকে পাশ কাটিয়ে হনহনিয়ে ঢুকে পড়ল তাদের বাড়িতে। ফাইজা রাগী চোখে তাকিয়ে আছে তার যাওয়ার দিকে, যেন মনে হচ্ছে হাতে এখন পাথর থাকলে তাই পেছন থেকে আরমানের মাথা বরাবর মেরে বসত। এদিকে স্নেহা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কাহিনি দেখছিল। আরমান ভেতরে যেতেই সে এগিয়ে এসে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—ব্যাপার কিরে ফাইজা, চিনিস?
ফাইজা এগোতে এগোতে বলল,
—চিনি বৈকি, একদম হারে হারে চিনি এই বদলোককে।

সিকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে আছে বড়রা, ছোটদের নিচে আসতে নিষেধ করেছেন। তাই সবাই উপরের ঘরে বসে আছে, মন যেন এক অনির্বচনীয় দোলাচল। চারপাশে পুলিশ দেখে কারো মনে শান্তি নেই। মেহরীন তো ভয়ে কেঁদেই ফেলেছিল। সে ভেবেছিল, পুলিশ তালহাকে ধরতে এসেছে। তবে তাহিয়া তাকে আশ্বস্ত করেছে। সে জানে তার ভাই এমন কোনো কাজ করতে পারেনা, যার জন্য পুলিশ আসবে।
সকলেই টুকটাক কথা বলছে, কিন্তু তনিমা এক কোণে গুটিয়ে বসে আছে। ডান হাতের নখ কামড়াচ্ছে দাত দিয়ে, চোখে ভীতির আভাস। মনে হচ্ছে, তার মাথার ভেতরে একটি ঝড় চলছে, ঝড় যার নাম চিন্তা।

—কিরে, তুই কি নিয়ে চিন্তা করছিস?
তাহিয়ার প্রশ্নে তনিমার ধ্যান ভেঙে যায়। সে হড়বড় করে উত্তর দেয়,
—ক..ক..কই না তো, কিসের চিন্তা? আমি বিন্দাস, ক..কোনো চিন্তা নাই।
মেহরীন তনিমার মুখের অভিব্যক্তি ভালো করে পরখ করে বলল,
—কিন্তু তোর ফেসিয়াল রিয়েকশন দেখে তো লাগছে তুই অনেক চিন্তিত।
তনিমা বুক ফুলিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে বলল,
—দূর, আমার আবার কিয়ের চিন্তা! উলটো চিন্তারা আমাকে নিয়ে চিন্তা করে।
কথার মাঝেই হঠাৎ নিচ থেকে তুমুল চিল্লাচিল্লি। সকলেই ভয়ে হালকা কেঁপে উঠল। কৌতুহলি মন মিয়ে আর বসে থাকতে পারল না। দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে দোতালার করিডোরে এসে দাঁড়াল।

সোহেল হোসেন রাগে ফেটে পড়া গলায় চেচাচ্ছেন,
— আমার মেয়েকে এক্ষুনি বের করো, নয়তো খুব খারাপ হয়ে যাবে বলছি।
বিল্লাল সাহেব তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন, দু’হাতে থামিয়ে সোফায় বসান। তাঁর শান্ত স্বভাবের বিপরীতে সোহেল হোসেনের উত্তপ্ত আচরণ। তিনি স্বর নরম করে জিজ্ঞেস করেন কী হয়েছে, কেন এমন উত্তেজনা। কিন্তু সোহেল হোসেন সেসবের উত্তরই দিচ্ছেন না। তার একটাই কথা, তার মেয়েকে বের করে দিতে হবে। বিল্লাল সাহেব যত নরম হচ্ছেন, ততই যেন আরো গরম হয়ে উঠছেন সোহেল হোসেন।
— আপনাদের একেকটাকে জেলের ভাত খাওয়াবো বলছি। আমার মেয়েকে বের করে আনুন।
এতোক্ষণ ধৈর্য ধরে থাকা তালহা, চাচার প্রতি এই অসম্মান দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,

— মুখ সামলে কথা বলুন মিস্টার সোহেল হোসেন। আপনি দেশের আইনমন্ত্রী হোন, বা প্রাইম মিনিস্টার, আই ডোন্ট কেয়ার। আমার চাচ্চু আপনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলছে, তাই আপনিও সম্মান দিয়ে কথা বলবেন।
তালহার রাগে থরথর করা কণ্ঠ ঘরে প্রতিধ্বনিত হতেই বিল্লাল সাহেব তাকে শান্ত করতে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে ভেসে আসল আরেকটি কণ্ঠ,
—তুই গলা নামিয়ে কথা বল। কার সামনে কিভাবে কথা বলছিস তোর সাহস দেখে তো আমি অবাক। চোরের মায়ের বড় গলা।
শব্দগুলো শুনে তালহার কপালের রগ এক মুহূর্তেই ফুলে ওঠে। দরজার দিকে তাকাতেই দেখে আরমানকে। পরক্ষণেই গায়ে চড়ে থাকা রাগ যেন মাথায় চড়ে বসেছে। আরমান সামনে এগোতেই তালহাও দু’কদম এগিয়ে যায়। একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দু’জনের বুক প্রায় ছুঁই ছুঁই।
তালহা কাঠ কাঠ গলায় বলল,,

—তুই গলা নামিয়ে কথা বল। তোর এত সাহস আসে কোথা থেকে, আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গেই ঘেউঘেউ করছিস।
আরমানের চোখে তখন ক্রোধ। এক পা এগিয়ে দাঁত কিরমিরিয়ে বলল,
—তুই ঘেউঘেউ কমাই কর, আমার বোনকে ফিরিয়ে দে। নয়তো তোর বোনকে….
বাকিটুকু বলার আগেই তালহা প্রচণ্ড শক্তিতে তাকে ধাক্কা দিয়ে বসল। আরমান দু’পা পিছিয়ে গিয়ে পড়তে নিয়েও নিজেকে সামলে নেয়।
তালহার চোখে তখন লাল শিখা,
—ইউ ব্লাডি বিচ! তোর মুখে আমার বোনের নাম নিলে তোর জিহ্বা টেনে ছিড়ে ফেলব।
কথার সঙ্গে সঙ্গেই আরমান আবারও এগিয়ে আসে, দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা ক্রোধে তালহাকে পাল্টা ধাক্কা মারে।

— আমার বোন কোথায়? আমার বোনকে এনে দে বলছি!
তালহা দু’কদম পিছিয়ে গেলেও রাগে ফের তেড়ে আসে। এবং শুরু হয় দু’জনের মধ্যে তুমুল হাতাহাতি। ড্রয়িংরুম যেন এক মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তালহা চেচাচ্ছে,” তোর বোন কোথায়, আমি জানিনা!”। আরমান সমানে বলছে, “তোদের বাড়িতেই লুকিয়েছিস! আমার বোন দে!”।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৯

ঘরের ভেতর উপস্থিত সবাই আতঙ্কিত। তিতলি বেগম মুখে আচল চেপে কেঁদে উঠেন। ভয়ে মেহরীন, তাহিয়া আর রাফাদেরও চোখ-মুখ ভিজে উঠেছে। আর তনিমা মুহূর্তেই নিচের দিকে দৌড় লাগায়।
তালহার চাচারা, সোহেল হোসেন সহ আরও দুইজন পুলিশ কন্সটেবল এগিয়ে গিয়ে তাদের ছাড়ানোর চেষ্টায়। তবে দু’জন শক্তপোক্ত তরুণকে ছাড়ানো সহজ হচ্ছে না। হাতাহাতির একপর্যায়ে কেউ হঠাৎ কান্নামিশ্রিত, কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
— ভাইয়ায়ায়ায়া…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩১