দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৮
আফরোজা আশা
সদর দরজা পেরিয়ে হনহনিয়ে এসে, বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির পায়ে লাথি বসাল দিগন্ত। ভালোভাবে ঘুম না হওয়ায় ফলে চোখজোড়া লাল হয়ে আছে তার। কড়া মেজাজের দরুণ চোয়াল শক্ত।
এদিকে ভাবুক রায়হান দিগন্তের লাথি খেয়ে বাইক থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছে। চোখমুখ কুঁচকে নিয়ে খেঁকিয়ে উঠল ছেলেটা,
‘ মুখ নাই তোর। কথা বলতে পারিস না। সব সময় লাথালাথি ভালো লাগে না। দিন শুরু হলো তোর লাথি খেয়ে, নির্ঘাত শেষ হবে বউয়ের লাথি খেয়ে। শালার বা*লের বদঅভ্যাস একটা! ’
তিতিবিরক্ত দিগন্ত চড়া গলায় আওড়াল,
‘ সাড়ে পাঁচটা বাজে কেবল। দশটায় বের হবে সবাই। এই সাত সকালে মরতে এসেছিস কেন? ’
সহসা ভাবসাব নিয়ে থাকা মুখাবয়বের ভঙ্গিমা পাল্টে নিল রায়হান। আপাতত দিগন্তের সাথে লাগা যাবে না। বেশ শান্ত গলায় বলল,
‘ জীপ বের কর। আমি বাইক পার্ক করে আসছি। ’
‘ কেনো? ’
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘ কাজী, কাজী। ওই বুড়াটাকে ছাড়া তো বউ তুলা যাবে না রে। ব্যাটা জোরাজোরি করে বিয়ে না পড়ালে তো আমি বউটা পেতাম না। বুড়া হলেও আমার খুব উপকার করেছে। ’
ঘাড়ে হাত রেখে অলস ভঙ্গিতে আওড়াল দিগন্ত,
‘ চাবি দিচ্ছি। কাকে আনবি আন। আমাকে ডিস্টার্ব করিস না। এখন একটু না ঘুমালে শরীর চলবে না সারাদিন। ’
খটকা লাগল রায়হানের। দিগন্তের দিকে শকুনি দৃষ্টি ফেলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। দূর থেকে দেখে যেন সুবিধা করতে পারল না। ঝটপট দিগন্তের কাছে এলো। ওর কুঁচকে থাকা শার্টের কলারটা এদিক সেদিক করল। রায়হানের আচানাক কাজে ভড়কাল দিগন্ত। হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে ত্যক্ত গলায় বলল,
‘ সর। ফালতু কাজ কারবার। ’
কিন্তু রায়হান! সেকথা কি আদৌতে তার কানের ফুটোয় ঢুকেছে? সে তো কেবল আহত চোখে দিগন্তের গলার নীচের লাল দাগটার দিকে তাকিয়ে আছে। সেকেন্ড কয়েক পেরিয়ে গেল। এক সময় রায়হান দুম করে বাইকের উপরে বসে পড়ল। হতবাক গলায় বলল,
‘ একদিন? একদিনের ব্যবধানে তুই জিতে গেলি? ’
ঘুমে টুপছে দিগন্ত। রায়হানের কথা আমলে না নিয়ে পেছনের দিকে যেতে যেতে বলল,
‘ ঢং করিস না শালা। ’
‘ আমার আগে তুই বাসর সেরে ফেললি? হাউউউউ! ’
হাঁটার গতি থামল দিগন্তের। ঘাড় বাঁকিয়ে কোণা চোখে দেখল রায়হানকে। ওর চুপসে যাওয়া মুখটা দেখে বেশ আনন্দ পেল। তা দেখে চিড়বিড়িয়ে উঠল রায়হান। ছুটে গিয়ে দিগন্তের পেছনে লাথি মারল। তাতে দিগন্তের ভাবান্তর হলে তো। সে বরং গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে ভেতরে চলে গেল।
রায়হান ফোঁস ফোঁস করছে। হঠাৎ কেমন অসহায় হলো ওর মুখাবয়ব। আহহ! প্রতিবার একটুর জন্য দিগন্ত ওকে পিছে ফেলে দেয়। বিরস মুখে গিয়ে বাইকের উপরে বসল। পকেট থেকে এয়ারপড’স বের করে কানে গুজল। আপাতত একটু দুঃখের গান শুনে দুঃখবিলাস করবে সে। ফোন থেকে কুক স্টুডিও বাংলার নতুন গানটা চালু করল। ভালো সময়ে ভালো গান; এ গানটা বুঝি ওর জন্য ছাড়া হয়েছে। গানের তালে তাল মিলালো সে—
লাগাইয়া পিরিতের ডুরি
আলগা থাকি টানে রে
আমার বন্ধু মহা জাদু জানে
ওহ জাদু জানে, জাদু জানে রে
আমার বন্ধু মহা জাদু জানে
নয়ন তুলে সোনা বন্ধু
চাইলো যাহার পানে
মন্ত্র ছাড়া করে জাদু
দুই নয়নের বানে
আমার বন্ধু মহা জাদু জানে
ওহ জাদু জানে, জাদু জানে রে
আমার বন্ধু মহা জাদু জানে
ঘরে এসে গায়ের টি-শার্ট পাল্টে নতুন শার্ট গায়ে জড়ালো দিগন্ত।দর্পণে একপল নিজেকে দেখে এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ব্রাশ করতে করতে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা রমণীর দিকে আগালো। বাইরে বেশ শীত শীত ভাব পরেছে। মাথা মুড়িয়ে কম্বল ঢাকা দিয়ে ঘুমাচ্ছে বেলা। ভোররাত থেকে দিগন্তের শরীরের উষ্ণতায় বিড়াল ছানার ন্যায়; ওর সাথে লেপ্টে আরামের ঘুম দিয়েছে মেয়েটা। এখন পাশে দিগন্ত না থাকায় আরামের ঘুমে বিঘ্ন ঘটেছে কিছুটা। একটু পর পর নড়াচড়া করছে।
কম্বলটা টেনে ঘুমন্ত রমণীর মুখখানা বের করল দিগন্ত। ভোরের মৃদু আলোকছটা চোখে লাগলে ঘুম হালকা হলো বেলার। চোখ খুলল না। দিগন্তের গরম শ্বাস-প্রশ্বাস ওর চোখমুখে পড়ছে। হাতড়িয়ে কম্বলটা টেনে মুখ লুকানোর প্রয়াস চালানো। তাতক্ষণাৎ বেলার নরম গালে নাক ডুবিয়ে দিল দিগন্ত।
‘ খুব নড়াচড়া করিস। ডিস্টার্ব হয়। ’
কি বলবে বেলা! সে তো একপ্রকার যুদ্ধ চালাচ্ছে কম্বলের নিচে মুখ লুকানোর জন্য। কিন্তু দিগন্তের সাথে পারছে কই?
সাড়া না পেয়ে দিগন্ত ফের বলল,
‘ টেবিলে নাস্তা আর ওষুধ রেখেছি। উঠে খেয়ে নিবেন। বাইরে যাচ্ছি আমি। এসে যেন সব খালি পাই। ’
‘ হুম, কোথায় যাবেন এতো সকালে? ’
‘ রায়হানের সাথে; কাজ আছে। দশটায় বের হবে সবাই। যা যা লাগবে গুজিয়ে নিস। ’
টানাটানি ছেড়ে দুহাত তুলে ঝুঁকে থাকা দিগন্তের গলা পেঁচিয়ে ধরল বেলা। চোখ বন্ধ রেখেই খসখসে চাপ দাঁড়িমিশ্রিত গালে পর পর কয়েকটা চুমু দিয়ে, উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়ল। সরু চোখে মুখ ঘুরিয়ে রাখা বেলার দিকে তাকাল দিগন্ত। কম্বল আগের মতো টেনে দিয়ে খোশমনে আওড়াল,
‘ নির্লজ্জ, বেলা পাটোয়ারী। ’
বালিশে মুখ ডেবে রেখে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল বেলা,
‘ শরম পেলেও কথা শোনান, না পেলেও কথা শোনান। আপনি কি চান নিজেই জানেন না। ’
‘ উম্মহহ! মুখ কেমন তীরের বেগে চলছে। এই তোর ভয় লাগে না? ’
‘ ভেতর থেকে ভয় না আসলে কি টেনে আনবো? অত সব কথা ছেড়ে আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দেন। সেই রাতে করেছি, এখনো জবাব পাইনি। ’
‘ কি? ’
এবার হালকা কেঁপে উঠল বেলার কণ্ঠস্বর,
‘ বুকের বাঁ পাশে কি লিখেছেন? কারো নাম? আপনি কাউকে ভালোবাসতেন? ’
প্রশ্ন করার অনেকক্ষণ পেরিয়ে যাবার পরও কোনো রকম সাড়াশব্দ না পেয়ে মাথা উঠালো বেলা। একি! পুরো ঘর ফাঁকা। ধপ করে উঠে বসল মেয়েটা। ওয়াশরুমসহ চারপাশ দেখে রাগে ফেটে পড়ল। দু’বার প্রশ্ন করার পরও জবাব পেল না সে। দিগন্ত কিছু না বলে চলে গিয়েছে। থম মেরে বসে থাকল বেলা।
কাচুমাচু হয়ে বসে আছে কাজী আফতাব হোসেন। তার সামনে দুটো চেয়ার জুরে বসে আছে দুটো জোয়ান ছেলে। তন্মধ্যে একজন তার দিকে কেমন অগ্নিঝরা চোখে দেখছে। এই ছেলে নির্ঘাত পাগল! কোন নসিবে যেন এই পাগল ছেলের পাল্লায় পড়েছিল সে। কোন কুলক্ষণে যে এই ক্ষেপা ষাঁড়ের বিয়ে দিতে গিয়েছিল সে। শান্তশিষ্ট জীবনটা তার তেজপাতা বানিয়ে ছেড়েছে।
‘ এই বুড়া! খবরদার। আমার বিয়ে নিয়ে আফসোস করবি না। বুড়া ঢ্যামড়া! বিয়ে যখন জোর করে দিয়েছিলি, তখন জোর করে একটা বাসর ঘর সাজিয়ে দিতে পারতি না। নাটক মারায় গ্রামের বাইরে ছেড়ে দিয়েছিলি কেনো? সেই কোন যুগে বিয়ে হয়েছে আর আজ যাবো বউ আনতে। সেদিনই যদি বাসর টাসর হয়ে যেত তাহলে কি আর আমি বউ রেখে আসতাম নাকি? এতোদিনে দু-তিনটে আন্ডাবাচ্চা চলে আসত। ’
চড়া গলায় বলল রায়হান। রায়হানের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওর পায়ে পাড়া দিল দিগন্ত। চোখ রাঙানি দিয়ে বলল,
‘ ঠিকভাবে কথা বল। উনি আমাদের ইউনিয়নের সম্মানিত ব্যক্তি। ’
দিগন্তের কথা শুনে আস্কারা পেল আফতাব কাজী। নড়েচড়ে বসে খ্যাস খ্যাসে স্বরে বলল,
‘ ভদ্রতা না থাকলে সম্মান অসম্মানের কি বুঝবে? মুরুব্বিদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তার কোনো জ্ঞান নাই। তা বাবা তোমরা এই সকাল সকাল এখানে এলে যে? ’
দিগন্ত মুখ খুললেও রায়হান মাঝখানে ফোঁড়ন কাটল। ফোঁস করে উঠে সে বলল,
‘ আবার জিজ্ঞেস করছে? এখনি না বললাম আজ আমার বউ আনতে যাবো। বুইড়া খাটাশ! আমার বিয়ে যে চান্দু তুমি দিছো ভুলে গেছো বুঝি? তোমাকে ছাড়া কোনো কাজ কাম আগাবে? ’
ভড়কে গিয়েছে কাজী। কেমন আহাম্মকের ন্যায় দিগন্তের দিকে তাকাল সে। এদিকে বেকায়দায় পড়েছে দিগন্ত। রায়হান তো এতোটা উগ্র না। বড়দের বেশ সম্মান দিয়ে চলে সে। কিন্তু এখন যেরকম করছে তাতে দিগন্ত বাকহারা। রায়হানকে হুড়িয়ে গুতিয়ে ঠান্ডা করতে পারছে না। কাজীর সাথে ওর কিসের রেষারেষি কে জানে!
তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হলো বৃষ্টি। আজ সেও চট্টগ্রাম চলে যাবে। মাস খানেক ফয়সালের সাথে কোয়ার্টার এ ছিল; সপ্তাহ হলো ঢাকা এসেছে। এ কদিন পাটোয়ারী বাড়িতে কাটিয়ে, গতকাল শ্বশুরবাড়িতে এসেছিল। এখান থেকে এখন ফাহাদ চট্টগ্রামে দিয়ে আসবে তাকে। ফয়সালের ছুটি নেই কোনো।
ঘর ছেড়ে বের হতেই সামনের ব্যক্তিকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল বৃষ্টি। ভয় পেল, পিছিয়ে গেল দুপা। শাড়ি পরিহিত বৃষ্টিকে বিকৃত নজরে অবলোকন করছে ফাহিম। গলায় ঝুলতে থাকা রূপার মোটা চেইনটা টেনে বলল,
‘ অনেকদিন পর দেখা হলো ডার্লিং। আগের দিনগুলো খুব মিস করি। তুমি করো না, সুইটহার্ট? ’
কথা বলল না বৃষ্টি। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল, পারল না। খপ করে ওর একহাত ধরে ফেলল ফাহিম। ঘৃণায় গা গুলিয়ে গেল বৃষ্টির। কোনোকিছু না ভেবে সপাটে চড় বসিয়ে দিল ফাহিমের গালে। পরমুহূর্তেই পায়ের জুতো খুলে একের পর এক আঘাত হানল ফাহিমের শরীরে। লম্বা, চোখা হিল জুতোর আঘাতে ক্ষত হলো ফাহিমের দেহ, চোখমুখ। লাগাতার প্রহারে আটকাতে ব্যর্থ হলো সামনের রমণীকে। এদিকে মনের আক্রোশ মিটিয়ে মারছে বৃষ্টি।
ফায়সালের সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল ফাহাদ। একটু পরেই বের হবে তারা। ভাইয়ের কথামতো ভাবিকে ডাকতে এসে যেন তব্দা খেল সে। দৃষ্টি সম্মুখে তার স্বীয় বড়ভাই জুতোপেটা হচ্ছে। লাইনে থাকা ফয়সালের উদ্দেশ্যে অবাক গলায় আওড়াল ফাহাদ,
‘ ভাই, ভাবি মারছে। ফাহিম ভাইকে ভালোই জুতোপেটা করছে। ’
ফিল্ডে দৌড়াচ্ছিল ফয়সাল। ফাহাদের কথা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁফ ধরা গলায় বলল,
‘ ফাহিম ওবাড়িতে কেনো এসেছে? ওকে আমি মানা করিনি; আমার বউয়ের থেকে শতহাত দূরে থাকতে? কোন মুখে আবার আমার বাড়িতে পা রাখে? ওর মারা শেষ হলে বলবি যেন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় ওকে। ’
কিঞ্চিৎ হাসল ফাহাদ। ঠেস মেরে বলল,
‘ বেশ মহব্বত দেখছি। ভাবি সাত খুন করলেও মাফ করবে নাকি? ’
পানির বোতল হাতে নিয়ে ক্রুর হাসল ফয়সাল। বলল,
‘ সাত খুন করার পারমিশন আমিই দিয়েছি। মাফ করার প্রশ্ন উঠে না। ’
কথার মাঝে বৃষ্টির কাছাকাছি চলে এসেছে ফাহাদ। ঠিক সে সময়ে ফাহিম হাত তুলেছে বৃষ্টিকে মারার জন্য। সে হাত ধরে ফেলল ফাহাদ। ফাহিমের এক কাঁধে হাত রেখে নিরেট গলায় আওড়াল,
‘ কুল ব্রো! ভাবি হয় তো। ভাবি মায়ের সমান। চাইলে মা মা করেও ডাকতে পারিস। আফটার অল আমাদের মা নেই। পুষিয়ে নিতে পারিস। ’
ঝটকা দিয়ে ফাহাদের হাত সরিয়ে দিল ফাহিম। রাগান্বিত গলায় বলল,
‘ আমার শেয়ারের সবগুলো হাতিয়ে নিয়ে, আমার সাথেই গাদ্দারি করিস না ফাহাদ। ছোট ভাই বলে খুব ছাড় দিয়েছি। মেরে ফেলতে একটুও হাত কাঁপবে না। ’
শক্ত হলো ফাহাদের চোয়াল,
‘ কিসের শেয়ার? তোর অংশের সবকিছু দিয়ে জুয়া খেলেছিস তুই। সব বিকিয়ে দিয়েছিস। বাকি যা আছে সেসব আমার ভাগের। ’
কেমন পাগলের মতো ঘাড় ফুটাল ফাহিম। উপস্থিত দুই ব্যাক্তিকে রক্তচক্ষু নিয়ে দেখে হনহনিয়ে বাড়ি ছাড়ল। ফাহাদ সরু চোখে দেখল ফাহিমকে। কাজিন হয়েও ওর আর ফয়সালের মাঝে যে বন্ডিং, সেটা কখনো নিজ ভাইয়ের সাথে গড়ে উঠেনি ফাহাদের। ছোট থেকে একাকী বড় হয়েছে সে। আস্তে আস্তে বখে গিয়েছে, মেয়েবাজ হয়েছে। কিন্তু ফাহিমের মতো চরিত্রহীন হয়নি।
তালুকদার বাড়িতে পাড়াপাড়ি করে তৈরি হচ্ছে সবাই। সকালের নাস্তা শেষে যে যার ঘরে চলে গিয়েছে তৈরি হতে। বেলা নয়টার ঘরে। এইতো আর কিছুক্ষণের মধ্যে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে সবাই। শিকদার বাড়ির গাড়ি আর তাদের বাড়ির গাড়ি একসাথে ছাড়বে। দিহান যাবে না, সে নিয়ে মিতালীর কাছে দোনমোন করছে। বাণী পাটোয়ারী বাড়িতে আছে। ওকে ছাড়া যেতে নারাজ সে। এ অবস্থায় এতোটা পথ জার্নি করা বাণীর জন্য ঠিক নয় বলে সে যাবে না। মিতালী বুঝল ছেলের গাঁইগুঁই। জোর করল না আর। কেবল বলল,
‘ তবে এ দুদিন তুই ওবাড়িতেই থাকিস। জুনায়েদ ভাই তো অফিস ট্যুরে গিয়েছে। বাড়িতে একা থেকে কি করবি? তালা দিয়ে যাবো। ’
মিতালীর কথাখানা যুৎসই হলো বৈকি! দিহান টুপ করে মেনে নিয়ে মায়ের ঘর ছাড়ল। প্রত্যাশাকে নতুন জামা পড়িয়ে দিয়ে মিতালী নিজেও রেডি হতে লাগল।
দিশার ঘর থেকে বিরস মুখে বের হলো বেলা। চোখমুখ তার দিশা সাজিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে কি পড়বে তা নিয়ে! দাদি-শ্বাশুরির এক কথা শাড়ি পড়বে কিন্তু শাড়ি পরে তো এক পাও চলতে পারে না সে। সেজেছে আধ ঘণ্টার মতো হলো এখনো পোশাক সিলেক্ট করতে পারল না। ইতোঃমধ্যে দিগন্তকে কল দিয়েছে কয়েকবার। লোকটারও কোনো পাত্তা খবর নেই। সেই যে ভোরে বেরিয়ে গেল এখনো ফেরেনি।
বাহুর একপাশে একটা নতুন শাড়ি আর একটা কামিজ ধরে ঘুরে ফিরে নিজেকে দেখছে বেলা। দুটোই ভালো লাগছে ওর। কিছুক্ষণ দেখেশুনে মনস্থির করল শাড়িই পরবে। হুট করে কাঁধের কাছে শিরশিরে ছোঁয়ার জমে গেল শরীর। পেছন থেকে জরিয়ে ধরে বেলার উন্মুক্ত কাঁধে থুতনী রেখে আয়নায় ওর দিকে চেয়ে আছে দিগন্ত। মিইয়ে গেল বেলা। মিনমিনে গলায় বলল,
‘ কাছে আসবেন না। সকালে ওভাবে চলে গেলেন, ফোন দিলাম তাও তুললেন না। ঘরের বাইরে বের হলে আপনার ভাব বেড়ে যায়। ’
বেলার কেশগুচ্ছ থেকে ভেসে আসা মোহনীয় সুবাসে ঘোর লাগল দিগন্তের। ওর চুলের ভাজে নাক ডুবিয়ে জোরে জোরে শ্বাস টানল।
‘ ব্যস্ত ছিলাম সোনা। ’
‘ তখন কিছু না বলে চলে গেলেন। ’
‘ পরে বলব। ’
কথাটা মোটেও ভালো লাগল না বেলার। চুলের ভাজে নাক ডুবিয়ে রাখা দিগন্তের হাত ইতোঃমধ্যে আলগা হয়ে গিয়েছে। সে সুযোগে ওর কাছে সরে গেল বেলা। হাতের পোশাক দুটো দিগন্তের দিকে ছুঁড়ে মেরে রাগী স্বরে বলল,
‘ যখন বলবেন তখন আসবেন। একটা ছোট প্রশ্নের জবাব দিতে এতো নকর-ছোকর কেউ করে? ’
বেলার ছুঁড়ে মারা জিনিসগুলো ধরল দিগন্ত। ঠোঁট কামড়ে শাড়িটা নেড়েচেড়ে বলল,
‘ শাড়ি পড়বি? ’
আবারো! আবারো ওর কথা এড়িয়ে গেল দিগন্ত। কেমন টলমলে চোখে চেয়ে থাকল বেলা। বেলার সে দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারল না দিগন্ত। বিছানায় বসে ওকে কোলের মাঝে নিল। ছোটাছুটি করল বেলা কিন্তু দিগন্তের দাবাং দুহাতের বন্ধন থেকে ছাড়াতে পারল না নিজেকে।
আশান্ত বেলাকে শক্ত করে চেপে ধরে ঠাণ্ডা স্বরে বলল দিগন্ত,
‘ বললাম না পরে বলব। এতো তাড়াহুড়ো কেন করিস। সবকিছুতে অস্থিরতা ভালো না। বলেছি যখন বলব তখন বলবই। ধৈর্য্য ধরতে শেখ। তোর জন্য তো কম ধৈর্য্য ধরিনি আমি! এরকম করেছি কখনো? খালি বেয়াদবি! ’
‘ হ্যাঁ নাকি না বললেই কথা শেষ। এতো চড়াই-উতড়াই কেনো করেন বুঝি না? ’
‘ বুঝতে হবে না। ছোট মাথায় এতো চাপ নিবি না; আমার চাপ কি যথেষ্ট নয়! ’
থেমে গেল বেলার নড়চড়। চুপ মেরে বসে থাকল সে। তখনি কানের পাশে দুটো ঠান্ডা ওষ্ঠ বলে উঠল,
‘ ভালো লাগছে বুঝি, এভাবেই থাকবেন? আপনি থাকতে চাইলে আমার সমস্যা নেই। ’
সহসা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল বেলা। আঁতকে উঠে বলল,
‘ দশটা বেজে আসছে তো। ছাড়েন,সবাই এতোক্ষণে নিচে নেমে গিয়েছে হয়তো। ’
বাঁধ সাজল দিগন্ত। সেজেছে বেলা, চোখমুখে তার রঙিন প্রসাধনী। দিগন্তের বেহায়া নজর সেদিকেই। বেলার গালে হাত রেখে ভারী কণ্ঠে বলল,
‘ এতো সাজতে হবে কেনো? সবকিছু বেশি বেশি হয়ে গিয়েছে। আমি ঠিক করে দেই? ’
টনক নড়ল বেলার। লাফিয়ে সরে গেল দিগন্তের বাহুবন্ধন থেকে। দুপাশে না বোধক মাথা নাড়িয়ে বলে উঠল,
‘ একদম না। দিশা আপু অনেক সময় নিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে। ‘
ভালো সময়ে বেলার এভাবে সরে যাওয়াতে বিরক্ত হলো দিগন্ত। ভ্রুঁজোড়ায় ভাজ ফেলল বলল,
‘ সব সময় বেয়াদবি! এখন ছেড়ে দিলেও পরে ছাড় পাবি না বেলা পাটোয়ারী। ‘
শুষ্ক অধরজোড়া ভিজেয়ে জবাব দিল বেলা, ‘ হুম। ’
বলে বিছানায় পরে থাকা শাড়িটা হাতে নিল। সহসা দিগন্ত বলে উঠল,
‘ শাড়ি পরবেন? ’
‘ কি পরব বুঝতে পারছি না। এই দুটো থেকে বেছে দেন না। ‘
হাত দিয়ে গাল চুলকালো দিগন্ত। গভীর গলায় বলল,
‘ শাড়ি পরিয়েন না। কু-মন্ত্রনা দেয়। আমার অবশ্য সমস্যা নেই, আপনি চাইল…’
আর কিছু শোনার প্রয়োজন হলো না বেলার। চোখজোড়া বৃহদাকার করে কামিজ হাতে হন্তদন্ত করে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় লাগাল।
অবাক লোচনে পাশের পুরুষটাকে দেখল মাইশা। ভীষণ কান্নার দরুণ চোখমুখ ফুলে একাকার তার। এক মুহূর্তের জন্য ভেবে বসেছিল এরকম দূর্বিষহ জীবন রাখার মানে হয় না। মানসিক টর্চার কতটা বিপর্যস্ত পর্যায়ে উঠলে ওর মতো পূর্ণ বিবেকবোধ সম্পন্ন মেয়ে আত্মহত্যার কথা চিন্তা করতে পারে! ওদিকে কিনা মানুষটা হেসেখেলে বেড়াচ্ছে? কিয়ৎকালের জন্য আর নিজের মধ্যে থাকল না রমণী।
বাইরের প্রকৃতিতে এখন রাতের প্রহর। মাইশাদের ছোট কুঁড়েঘরের উঠোনে আজ খানিকটা আয়োজন হয়েছিল। সন্ধ্যার আগে আগে রেহানার তার একমাত্র মেয়েকে তুলে দিয়েছে রায়হানের হাতে। জম্পেশ খাওয়া-দাওয়া শেষে মাইশাকে নিয়ে দিলদার তালুকদারের ভিটাতে উঠেছে শিকদার ও তালুকদার বাড়ির সব মানুষজন। দুটো দিন গ্রামে কাটিয়ে তবেই শহরে ফিরবে তারা।
ঘরের দরজা আঁটকে বরবেশী রায়হান তার বধূর কাছ ঘেঁষে বসে আছে চুপচাপ। রমণীর ভাবগতি ঠিক ধরতে পারছে না। শান্ত মেয়েটাকে বেজায় ভয় পাচ্ছে সে। অতঃপর গলা খাঁকড়ি দিয়ে বলল,
‘ রাগ করেছো বউ? ’
জবাব আসে না কোনো। রায়হান হাঁটু গেড়ে মাইশার সামনে বসল। শাড়ির ওপর অবহেলায় পরে থাকা নরম হাতদুটো নিজ হাতের মাঝে নিয়ে অসহায় গলায় আওড়াল,
‘ আমার কোনো দোষ নেই। এবার আমি আমার কোনো দোষই নেই। বাড়ির বড়রা বাধ্য করেছিল, বিদায় না হওয়া পর্যন্ত যেন তোমার সাথে কোনোধরণের যোগাযোগ না করি। তবে নাকি আমাকে আর আমার বউ দিবে না। বিশ্বাস করো, একথাতেই কাবু করেছে আমাকে। নয়তো কবেই এসে তুলে নিয়ে যেতাম। কিন্তু এসব কাজ করলে আবার আমার শ্বাশুরি অসামাজিক জামাই বলে তার মেয়েকে কেঁড়ে নিতে চাইত। দেখো! সব দিক দিয়ে কত বেকায়দায় ছিলাম আমি। ’
মাত্রাতিরিক্ত ঠাণ্ডা স্বরে বলে উঠল মাইশা,
‘ আপনারা কি যে ভাবেন আমাকে? আচ্ছা, আমার মধ্যে কি ইমোশন নেই? কি মনে হয় বলেন তো? আজ যদি আমি কোনো ভুল পথ বেছে নিতাম তবে কি করতেন? তখনো পুতুল পুতুল খেলতেন আমাকে নিয়ে? ’
স্তব্ধ হয়ে গেল রায়হান। কেমন আতংকিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল পাংশুটে মুখশ্রীর রমণীর দিকে। পরমুহূর্তে জাপটে মিশিয়ে নিল নিজের বক্ষপিঞ্জিরায়। হৃদস্পন্দনের গতি তার অস্বাভাবিক। প্রথমদিকে মাইশা ভেতরের যাতনাগুলো জাহির করলেও, পরে শান্ত হলো মেয়েটা। প্রশ্রয় দিল স্বামীকে।
গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে বাইরে বের হলো দিশা। একহাতে প্রত্যাশার হাত ধরে রেখেছে আরেকহাতে তার ভ্যানিটি ব্যাগ। এই পুরো বাড়িতে এতো লোকজন হয়েছে যে শেষমেষ তার থাকার জায়গার অভাব পড়ল। বৃষ্টি আর ফয়সাল এসেছিল বিয়েতে। থাকার জায়গার সংকট দেখে বৃষ্টি দিশাকে বলেছে তার সাথে কোয়ার্টার এ যেতে। বেলা দিগন্তকেও যেতে বলেছে তারা কিন্তু বিদায়ের পর থেকে তাদের দেখা পায়নি কেউ। কোথায় গিয়েছে কে জানে! আপাততত সে আর প্রত্যাশা যাবে বৃষ্টির কাছে। কাল আবার চলে আসবে।
সদর দরজা মারিয়ে বাইরে আসতেই আটকে গেল দিশা। চোখে কি ভুল দেখছে! চোখ ঘষা মারার জন্য হাত উপরে তুলেও আটকে গেল তার। চোখে যে কাজল আর আঁইশেডোর পাহাড় ঘষেছে! পাশে থাকা প্রত্যাশাকে বলল,
‘ পুতু! দেখ তো, তোকে যে একটা ছবি দেখিয়েছিলাম সেদিন।সামনের মানুষটা কি সত্যি সত্যি সে? ‘
প্রত্যাশার গোল গোল চোখজোড়া একবার সামনে দেখল। তারপর দিশার দিকে ফিরে বলল,
‘ হ্যাঁ। ওই আংকেলটার সাথে আমার আগেও দেখা হয়েছিল আপু। আমার চুলে লাগিয়েছিল, পঁচা আংকেল। ’
ব্যস, চটজলদি ব্যাগ থেকে ফোন বের করে নিজের চেহারা সুরৎখানা দেখে নিল দিশা। নাহ! ঠিক আছে। তাকে দেখতে ভালোই লাগছে। একদফা নিজের প্রশংসা নিজের করল মেয়েটা।
ফোনে দৃষ্টি নিবদ্ধ ফাহাদের ধ্যান ভাঙল পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে। চোখ তুলে চাইল সে। দিশাকে একপলক দেখে পাশেরজনের দিকে তাকাল। ওকে উপেক্ষা করে প্রত্যাশাকে কোলে নিল সে। অজ্ঞাত অপমানে থমথমে হলো দিশার মন। কিন্তু সে তো অপমান সয়ে নেওয়ার মেয়ে না। বিদ্রুপ করে বলল,
‘ শুনেছি আপনার নাকি নজর খারাপ। মেয়েদের দিকে খুব একটা ভালো নজর ফেলেন না। প্লিজ! প্রত্যাশাকে নামিয়ে দেন। তালুকদার বাড়ির মেয়েরা নিজেদের রূপ-গুণ বাঁচিয়ে চলে। ’
ললাটে ভাজ ফেলে দিশাকে দেখল ফাহাদ। ফাহাদের দৃষ্টি মারিয়ে ফোনে বৃষ্টির নাম্বার ডায়াল করতে করতে ফের বলল দিশা,
‘ বৃষ্টি আপাটাও না! নিজের সাথে নিয়ে যাবে তা না; কি একটা ঝামেলা রেখে গিয়েছে। ’
সহসা বলে উঠল ফাহাদ, ‘ হোয়াট? ’
ভাবসাব নিয়ে থাকা দিশা সে শব্দটা আমলে নিলে তো! বৃষ্টির সাথে ফোনকলে থেকে একহাত বারিয়ে, ফাহাদের কাছে থেকে টেনে প্রত্যাশাকে কোলে নিল রমণী। হুট করে এহেন ব্যবহারে ভ্যাবাচেকা খেল ফাহাদ। দিশা তাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসল। কিছুপল শক্ত চোয়ালে পূর্বের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ফাহাদ এসে ড্রাইভিং সীটে বসল। তখনি পাশ থেকে দিশা বলল,
‘ দিগন্ত তালুকদার; আমার ভাইকে তো চেনেন। নজর সাবধানে রাখবেন ব্রো। ঠিক আছে? ’
কিংকর্তব্যবিমূঢ় ফাহাদ। কার ড্রাইভ করতে করতে তার ওষ্ঠপুট বেঁকে গেল। পাশে বসা রমণী নিজেকে মাত্রাতিরিক্ত চালাক ভেবে বেশ খোঁচাখোঁচি করছে। আদৌ ফাহাদ দেওয়ান সম্পর্কে তার ধারণা আছে? নেহাৎ ফাহাদ ওর খেল দেখার জন্য ছেড়ে দিয়েছে, নয়তো নাকানিচুবানি খেতো মেয়ে।
এতো ঠেস মারার পরও ফাহাদের থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ভেতরে ভেতরে অবাকতার চূড়ান্তে পৌঁছাল দিশা।
বেশখানিকটা পথ পেরিয়ে হুট করে গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটল যেন। ফাহাদের গম্ভীর্যভরা পুরুষালি গলায় বলা কথাগুলো বজ্রাঘাতের ন্যায় আঘাত হানল সেখানে।
স্টিয়ারিং এ হাত চালিয়ে দিশার উদেশ্যে বলে উঠল ফাহাদ,
দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৭
‘ দিশা তালুকদার! এ জীবনে অনেক মেয়েকে হাতে ইশারায় নাচিয়েছি। আমার সাথে লাগা এতো সহজ নয়। ইউ নো হোয়াট! মেসেজ ডিলেট দিলেই কাহিনী শেষ হয় না। গ্যালারিতে একটা স্ক্রিন ভিডিও রেকর্ড আছে। ফাহাদ দেওয়ানকে স্টক করা মুশকিল ব্যাপার, লিটল গার্ল। সর্যি, ‘ এঞ্জেল ডি ’। ডি স্ট্যান্ড’স ফর দিশা; রাইট? ’
শেষের প্রশ্নটা করার সময় দিশার শুকিয়ে যাওয়া মুখপানে তাকাল ফাহাদ। এতোক্ষণে ফটর ফটর করা রমণী মিইয়ে গিয়েছে অচিরেই। এ যেন লুডু বোর্ডে সাপ-গুটি কাটাকাটির কাহিনী চলছে! দিশার আতংকিত বদন দেখে বাঁকা হাসল ফাহাদ। নিজেকে অতি চালাক ভাবা মানুষ যখন জায়গা মতো ধরা খায়, ঠিক সেরকম হয়েছে দিশা তালুকদারের বর্তমান মুখভঙ্গিমা।
