The Silent Manor part 54
Dayna Imrose lucky
ভোর এসেছে কিন্তু আলো নিয়ে নয়, এসেছে একধরনের নীরব অপরাধবোধ নিয়ে। গতকাল রাতের সমস্ত অন্ধকার পেরিয়ে যখন আকাশ ফিকে নীল হতে শুরু করেছে, তখনও ঘরের সামনের উঠোনে সুফিয়ান বসে ছিল। “বসে ছিল” এই কথাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর, কারণ মানুষটা আর বসে নেই।চলে গেছে। চিরতরে।
রাতে গুলিটা লেগেছিল সুফিয়ান এর বুকে।খুব কাছ থেকে। শব্দটা মুহূর্তের জন্য রাতকে ছিঁড়ে দিয়েছিল একটা ভাঙা বজ্রের মতো। তারপর নিমেষেই সব শান্ত হয়ে যায়। সেই শান্তির ভেতরেই তাঁর বুক থেকে রক্ত নেমে এসেছিল মাটিতে। ধীরে ধীরে। নিঃশব্দে। যেন মাটিও বুঝে উঠতে পারেনি, সে কী গ্রহণ করছে। লাল র’ক্তে উঠোনের ধুলো ভিজে গিয়েছিল। যেখানে তাঁর প্রতিদিন পায়ের ছাপ পড়ত, সেখানে জমে উঠেছিল জীবনের শেষ চিহ্ন।
জলটা চেয়েছিল।বোধহয় তীব্র তেষ্টা পেয়েছিল।কিন্তু শেষ তেষ্টা আর মেটাতে পারেনি। কিছু সত্য বলতে চেয়েছিল। কিছু অজানা ব্যথা বোধহয় জানাতে চেয়েছিল।পারেনি।মুখ থেকে শেষ শব্দ আর বেরোয়নি।গু’লির আ’ঘাত বুকে জমাট কষ্ট হয়ে আটকে দিয়েছিল সব কথা। শরীরটা ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে পড়েছিল।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ফজরের আজানের আগ মুহূর্তে বাতাস একটু কেঁপে উঠেছিল। পাখিরাও ডেকেছে দূরে কোথাও।তখনই দেখা গেছে উঠোনে র’ক্ত শুকোতে শুরু করেছে। গাঢ় লাল রঙটা কালচে হয়ে গেছে। মাটিতে ফাটল ধরেছে তার চারপাশে, যেন মাটিও ব্যথা সহ্য করতে না পেরে ফেটে যাচ্ছে।
তার শরীর ঠাণ্ডা। ভোরের হালকা শিশির তার পাঞ্জাবিতে জমেছে।সাদা রঙের পাঞ্জাবি।কাল রাতে পরেছিল। বিন্তি নিজে আলমারি থেকে বের করে দিয়েছিল। পরিচিত সাদা রঙটা এখনও পরিচিত, অথচ ভয়ংকরভাবে অচেনা।আজ ওর ভাইকে চিরবিদায় এর জন্য সাদা রঙের কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে মাটির ঘরে শায়িত করবে।
বুকে গু’লির ক্ষতটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।কোনো ব্যান্ডেজ নেই, কোনো চিকিৎসা নেই।শুধু একটা ক্ষত যেটা সবকিছু শেষ করে দিয়েছে।
সকালের আলো ধীরে ধীরে মুখে পড়ল সুফিয়ান এর। আলোটা নিষ্ঠুর। চোখদুটো আধখোলা তাঁর। দৃষ্টিতে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ভয় নেই,শুধু বিস্ময়। যেন শেষ মুহূর্তে বিশ্বাসই করতে পারেননি যে এই রাতেই সব শেষ হবে। বেঁচে থাকার তীব্র সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ মুহূর্তে হেরে গেল সুফিয়ান।
চারপাশে আর কোনো কান্না নেই এখন। শুধু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মৃ’ত্যুর ঘ্রাণ। ভোরের আলো আর রাতের র’ক্ত একসাথে মিশে এমন এক দৃশ্য তৈরি করেছে যা জীবনের সঙ্গে যেন বেমানান। বিন্তি সুফিয়ান কে জড়িয়ে ধরে এখনো বসে আছে।বদরু ওঁরা পাশেই বসা ছিল। মৌলভী সাহেব এসে বলেছেন কব’র খুঁড়তে। বাঁশ কাটতে হবে।বড়ই পাতা গরম জলে শেষ গোসল এর ব্যবস্থা করতে। দাফনের আয়োজন করো।”
কিছু গ্রামের মহিলারা এসে বিন্তি কে সুফিয়ান এর থেকে সরাতে চাইল। বিন্তি ওঁর ভাইকে ছাড়বে না। ছেড়ে দিলেই হয়ত ওঁর ভাইকে ওঁর থেকে কেড়ে নিয়ে যাবে কেউ। মহিলাদের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলে উঠল। উনাদের স্পর্শ করতে বারণ করল ওকে। তারপরও জাভেদ এর ইশারায় বিন্তি কে সরিয়ে ফেলল মহিলারা।
একজন অনুচর এসে সুফিয়ান এর মৃ’তদেহটি সাদা কাপড়ে ঢেকে দিল। সুফিয়ান ছিল শক্ত মানুষ।যেই মানুষটা সামনে থাকলে ভয় কমে যেত,আজ সেই মানুষটাই পড়ে আছে অসহায়, নির্বাক হয়ে। বুকের ভেতর যেটুকু উষ্ণতা ছিল, তা মাটিতে ঢেলে দিয়ে গেছে।
একটা পিঁপড়ে কাছে আসে। রক্তের গন্ধে। তারপর থেমে গেল।শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিও বুঝে ফেলেছে এখানে কিছু ভ’য়ংকর ঘটে গেছে।
সকাল গড়িয়ে যাচ্ছে। আলো বাড়ছে। আর প্রতিটা বাড়ন্ত মুহূর্ত মৃ’ত্যুটাকে আরও স্পষ্ট করছে। রাতের গোপনীয়তা ভেঙে যাচ্ছে। এখন আর কোন কষ্টই যেন আড়ালে নেই।
ঘরের সামনে বসে থাকা মানুষটাকে আজ কেউ আর ডাকবে না নাম ধরে। ডাকলেও উত্তর আসবে না। এই উঠোনে আর তার পায়ের শব্দ পড়বে না।বোনকে ডেকে দরজায় আর সে কড়া নাড়বে না।গত রাতটা তাকে নিয়ে গেছে যে।ভোর শুধু এসে জানিয়ে দিচ্ছে, তাঁর বাহাদুর যেন এখন শেষ।
এই দৃশ্য কোনোদিন মুছে যাবে না।কেউ বোধহয় ভুলতেও পারবে না। উঠোন ধুয়ে পরিষ্কার করা হবে, র’ক্তের দাগ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে।কিন্তু সে-ই রাত,এই ভোর, এই শুয়ে থাকা দেহ, এই লাল হয়ে যাওয়া মাটি এগুলো থেকে যাবে চোখের ভেতর।
কিছু মৃ’ত্যু শব্দ করে আসে।আর কিছু মৃ’ত্যু এই ভোরের মতো চুপচাপ এসে জীবনটা ছিঁড়ে রেখে যায়।
হেলেনা দূর থেকে সুফিয়ান কে দেখছে। গতকাল অহংকার করে বলেছিল ‘আপনার ভালোবাসা ভিক্ষা চাইতে আসিনি।’ হেলেনা তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্যও গিয়েছিল।সাহস করে আর বলে উঠতে পারেনি।ভেবে নিয়েছিল পড়ে সময় করে একদিন ঠিকই বলবে -তার ভালোবাসার কথা। সুযোগটা আর হয়ে উঠেনি।নিকাবের আড়ালে গাল বেয়ে টপ টপ জল পড়ছে ওর। তবে ওর কান্না কেউ দেখছে না।নীরব, নিঃশব্দের কান্না।
কুদ্দুস সুফিয়ান এর লা’শের কাছেই বসে আছে। জাভেদ ক’বার করে বলেছিল কুদ্দুস কে ঘরে বসতে।শুনেনি। আলিমনগর এর কথা ওর ভীষণ মনে পড়ে। মনে পড়ে সুফিয়ান এর কথা।কত উৎসব,কত মেলাতে তাঁরা একসঙ্গে সময় কাটিয়েছে। সুফিয়ান ছিল নিরহংকার একজন মানুষ।এত এত নামডাক, ধনসম্পত্তি তাঁর থাকার পড়েও এক চুল পরিমান অহংকার তাঁর ছিল না।সবার সাথে বিনয়ের সাথে কথা বলত,নরম আচরণ করত,অন্যর দরকারে,প্রয়োজন ছুটে এগিয়ে যেত।গ্রাম বাসীদের সাহস দিত, ভরসা চুকাত।আজ যেন সে-ই ভরসাস্থল র’ক্তের স্রোতের সাথেই ভেসে গেছে। ভাবতেই অবাক হচ্ছে সকলে – যে মানুষটি গতকালও বেঁচে ছিল আজ আর সে নেই।
রশীদ তালুকদার ঘরের সামনে বসে আছেন।উনি অনুতপ্তের আগু’নে জ্বলে পু’ড়ে ছারখার হচ্ছে।রাগে আক্রোশে সত্যটা না জেনেই নিজের সন্তানের হ’ত্যার প্রতিশোধ নিতে নিরপরাধ, সুফিয়ান কে মে’রে ফেলেছে। মানুষটি তাঁর মেয়েকে ভালোবেসেছিল। ওকে ঘিরে বাঁচতে চেয়েছিল,পারেনি।
সিলমন হায়দার। তাঁর প্রাণপ্রিয় বন্ধু ছিলেন।শত স্মৃতি তাঁর এখনো জমে আছে। একদিন সিলমন হায়দার বিপদে পড়েছিলেন। শ’ত্রুদের কবলে। সময়টা ছিল রাত। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন সিলমন এর সাথে কোন অনুচর ছিল না। চারদিক থেকে অ’স্ত্র হাতে ক’জন আক্র’মণকারী এগিয়ে আসে।সিলমন দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলেছিল। মৃ’ত্যুর সময় গুনতে ছিল।ঠিক সে-ই মুহূর্তে রশীদ উপস্থিত হয়েছিলেন।দূত হয়ে।সিলমন হায়দার কে বাঁচিয়েছিলেন।সেদিন রশীদ আদিব এর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন।সিলমন শ’ত্রুদের হাত থেকে বেঁচে রশীদ এর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল।সিলমন হাসতে হাসতে সেদিন বলেছিল ‘চারদিকে আমার শ’ত্রু দেখেছিস তো, কখনো যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তবে আমার সন্তানদের দেখে রাখিস।” রশীদ সেদিন তাঁকে কথা দিয়েছিল। কিন্তু আজ সে-ই ওয়াদার বরখেলাপ হয়ে গেছে। রশীদ নিজেই সিলমন এর শ’ত্রু হয়ে গেলেন। তাঁর সন্তান কে নিজ হাতে মে’রে ফেলেছেন। আক্ষেপ হচ্ছে। তীব্র কষ্ট হচ্ছে।যা অপ্রকাশ্য।
বিন্তি সুফিয়ান এর দেহটার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।ওর কান্না যেন আর থামার নয়।নিজের চোঁখের সামনে ভাইয়ের মৃ’ত্যু বোনের সহ্য হওয়ার নয়।ওরও হচ্ছে না। বুকটা ফেটে যাচ্ছে চাঁপা আর্ত’নাদে। চারপাশে সবাই সুফিয়ান এর শেষ বিদায়ের আয়োজন করছে।আজকের দিনটি দেখার জন্য বিন্তি প্রস্তুত ছিল না।কখনকালেও না।
“ বিন্তি, একগ্লাস জল এনে দে।খুব জলতেষ্টা পেয়েছে।” বিন্তির চারপাশে শব্দটি বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।ওর ভাই শেষ তৃষ্ণাটা অবধি মেটাতে পারেনি বলেই ওর যন্ত্র’ণাটা যেন আরো বেশি।
বিন্তি মহিলাদের হাত সরিয়ে পুনরায় এসে সুফিয়ান এর পাশে বসে।সাদা কাপড়টা সরিয়ে ভাইয়ের র’ক্তাক্ত মুখটি দেখছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শুধু ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছিল সে। এতটুকু সুখ পায়নি যেন জীবনে। দুঃখ দিয়ে পূর্ণ ছিল তাঁর জীবন। দুঃখকে ভুলে যখন সুখের আগমন ঘটল,ঠিক তখনই যেন প্রতি’শোধ এর একটি অংশ এসে হা’না দিল। প্রতি’শোধ এর খানিকটা ইচ্ছে, অপরদিকে মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে যাচ্ছিল তাঁর জীবনটা। টানাপোড়েন এর শেষ পর্যায়ে এসে নিয়তি তাকে খণ্ড খণ্ড করে দিয়ে চলে গেল।আজ করেছে পুরোপুরি সমাপ্ত তার গল্প।
সোলেমান ওরা এসে সুফিয়ান এর লা’শটি খাটিয়ায় শুইয়ে দেয়। গোসলের জন্য অন্যপাশে ব্যবস্থা করা হয়েছে।চারজন মিলে খাটিয়া কাঁধে তুলে নিতেই বিন্তি সুফিয়ান এর হাতটি ধরে।ওর ভাইকে নিতে দিবে না। চিৎকার দিয়ে উঠল ‘আমার ভাইকে নিবেন না।’ ওর চিৎকার এর যেন আজ মূল্য নেই।কেউ আজকে ওর কথা শুনবে না।আজ সবকিছু হবে নিয়মে।নিয়মের বাইরে বোধহয় কিছুই সম্ভব নয়।
বিন্তি সুফিয়ান এর কনিষ্ঠা আঙুলটা ধরে রেখেছে।ঠিক যেমন ছোট্ট বেলায় ভাইয়ের হাত ধরে এভাবে হাঁটত।আজ ও ধরেছে। তবে আজ আর ওর ভাই পাশাপাশি হাঁটবে না।বোনকে নিয়ে ঘুরতে যাবে না।আজ ওর ভাই চিরস্থায়ী ঘরে ঠাঁই নেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।
সুফিয়ান কে নিয়ে যায়। গ্রামের মহিলারা বিন্তিকে সরিয়ে নেয়।ভাই ভাই বলে ডাকতে থাকে। তকদির।আজ ওর ভাই শুনছে না।
নিস্তব্ধতার ভেতর পর্দা ঘেরা পরিষ্কার স্থানে শুয়ে আছে সুফিয়ান এর দেহটি। শব্দহীন এমন মুহূর্তে উষ্ণ জল আনা হয়, আর তার সঙ্গে বড়ইপাতা
,সবুজ, সুগন্ধি, প্রকৃতির এক নিঃশব্দ আশ্বাস। পাতাগুলো জলে ডুবতেই এক অদ্ভুত ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে, যেন গাছের স্মৃতি আর মাটির শীতলতা একসাথে জেগে উঠেছে।
প্রথমে মাথায় জল ঢালা হয়। বড়ইপাতা দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করা হয় চুল আর কপাল।জীবনের ক্লান্তি যেন সেখানেই জমে ছিল। উষ্ণ জলের ছোঁয়ায় জমে থাকা ধুলো, ঘাম, র’ক্ত,পথচলার চিহ্ন গলে যায়।পাতার নরম স্পর্শে শরীর পায় শেষবারের মতো মমতা। কোথাও জোর নেই, কোথাও তাড়া নেই,সবই যেন শেষ ধৈর্যের ভাষা।
পাতা ঘোরে বুকের উপর, কাঁধের ভাঁজে, হাতে-পায়ে। প্রতিটি স্পর্শে আছে নীরব দোয়া। জল বয়ে যায় শরীরের রেখা ধরে।যেন, এক নদী তার শেষ যাত্রায় নামছে। সেই জলে নেই প্রশ্ন, নেই হিসাব। আছে মুক্তি। জীবনের ভার, রাগ-ক্ষোভ, অপূর্ণ কথাগুলো ধুয়ে যাচ্ছে একে একে।
চোখের পাতায় জল পড়ে।যে চোখ আর খুলবে না, তবু তাদের দিয়ে পৃথিবী দেখা হয়েছিল।আর দেখবে না।ঠোঁটে জল ছোঁয়ানো হয়।যে ঠোঁট একদিন কথা বলত, হাসত, প্রার্থনা করত। বড়ইপাতার সুবাসে পর্দাঘেরা ঘরটি ভরে ওঠে নরম এক শোকগন্ধে,কষ্টের বিদায়ের।
শেষে জল থামে। শরীর কিছুটা ঝকঝকে পুরোটা পবিত্র হয়েছে। কষ্টে ভারী বাতাস হালকা হয়ে আসে। মনে হয়, মানুষটি এখন আর পৃথিবীর থাকার যোগ্য নয়।সে পরপারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।এই গোসল শেষ বিদায়ের নিয়ম পালনের একটি ভালোবাসার শেষ আলতো বাক্য, যা জল আর বড়ইপাতায় লেখা হয়ে চুপচাপ আকাশের দিকে উঠে যায়।
সকাল এগারোটার দিকে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামের ছোট্ট ছেলে, যুবক, মুরুব্বি থেকে শুরু করে সব বয়সের সবাই জানাযায় শরীক হয়।নিয়ম মেনে জানাযা শেষে হায়দার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান এর দিকে সুফিয়ান কে নিয়ে যাওয়া হয়।ফারদিনার কব’রের পাশে সুফিয়ান এর জন্য কব’র খোঁড়া হয়।ক’জন মুরুব্বি মিলে সুফিয়ান কে কব’রে শায়িত করে। সুফিয়ান এর ঘরটি সাজাতে বাঁশের ছাদ দিল। তার উপর মাটি।
সবাই পা দিয়ে পাড়িয়ে পাড়িয়ে মাটি শক্ত করে বসিয়ে দিচ্ছে। সুফিয়ান হায়দার – যার সামনে কেউ গলা উঁচিয়ে কথা বলতে পারত না,আজ ওরাই তাঁর উপর উঠে যেন মাটির ঘরে রাখার শেষ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাচ্ছে।
বিন্তি দূর থেকে দেখছে শুধু। গ্রামের বাকিরাও তাকিয়ে আছে।আজ শুধু দূর থেকে সবাই এক নজর চোখ মেলাবে, এরপর চলে যাবে। দুনিয়ার সবটুকু ভালোবাসা,মায়া,মমতা সব যেন এখানে এসেই থেমে যায়।আজ যেন থেমে গেছে সুফিয়ান এর জন্য সবার ভালোবাসা।
দাফনের কাজ শেষ করে সবাই এক পা দু পা করে কবরস্থান থেকে ফিরে আসছে। সুফিয়ান কে অন্ধকার ঘরে একলা ফেলে রেখে।আজ আর কেউ আলো নিয়েও তাঁর কাছে যাবে না।ফারদিনা আর সে পাশাপাশি শুয়ে আছে। অজানা ভাবেই যেন সুফিয়ান তাঁর ইচ্ছা পূরণ করতে পারল।খুব করে চেয়েছিল মৃ’ত্যু। আজ মৃ’ত্যুতেই যেন তাঁর গল্পের ইতি টানা হল।
সোলেমান ওরা কবরস্থান থেকে ফিরে এসে ধানক্ষেত এর পাশে দাঁড়াল। বিষন্ন মনে শান্তি নেই আজ। শান্তি আর ফিরবে বলে ওরা নিশ্চিত করতে পারছে না।আকাশ সমান ব্যথা নিয়ে ওদের প্রাণপ্রিয় ভাইকে একা ফেলে এসেছে। সোলেমান হঠাৎ দেখল সুফিয়ান ক্ষেতের আইলে হাঁটছে। তরতাজা মানুষটি। সোলেমান বদরু ওঁদের দেখাল।ওরাও দেখল। সুফিয়ান ওদের উদ্দেশ্যে বলল “তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ক্ষেতে কাজ বাকি।যা,কোদাল নিয়ে আয়।”
সোলেমান ওঁরা সত্যি সত্যি কোদাল নিয়ে আসল। ক্ষেতে কাজ শুর করল।কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে মাথা তুলে সুফিয়ান এর দিকে দেখছে। সুফিয়ান হেঁটে হেঁটে ওদের থেকে দূরে যাচ্ছে। ওঁরা হঠাৎ করে কাজ থামাল। সুফিয়ান দাঁড়িয়ে ওদের দিকে ঘুরে বলল “আবার কেন কাজ বন্ধ করলি? আলসেমি করলে চলবে না, তাড়াতাড়ি সেরে ফেল।আর হ্যাঁ,আর কোনদিন চু’রি ডা’কাতি করবি না।” ওঁরা মাথা আওড়ালো।বুঝেছে। সুফিয়ান এর কথা মেনে চলবে।
এরপর সবকিছু নিস্তব্ধ। সুফিয়ান যেতে যেতে হাওয়া হয়ে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। সোলেমান ওঁরা আর দেখল না। হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল। সোলেমান তবু একবার বিষাদ ভরা কন্ঠে বলল “কিছুক্ষণ এর জন্য ভেবেছিলাম উনি হয়ত বেঁচে আছেন। কিন্তু না – আমাদের মাঝে আর সুফিয়ান হায়দার নেই।”
“ এভাবেই সবকিছু সেদিন শেষ হয়ে গিয়েছিল।” বললেন সেলিম।উনি থেমে থেমে কেঁদে উঠছেন ভাঙ্গা গলায়। সে-ই সাথে কাঁদছে মীর,রাফিদ,আহির।রাত বারার সাথে সাথে যেন তাঁদের কষ্ট গুলো বেড়ে যাচ্ছে। মীর চোখের জল মুছে সেলিম কে কান্না থামাতে বলল।
আহির বলল “ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে সুফিয়ান এর জন্য।তিনি জীবনে কিছুই পাননি।বরং হারাতে হারাতে এক সময় নিজেও হারিয়ে গেছেন।কত জমা কষ্ট ছিল উনার ভেতর।”
মীর আহির এর রেশ টেনে মর্মাহত কন্ঠে বলল “আমারও তাঁর জন্য কষ্ট হচ্ছে। একাধিক টানাপোড়েনে যেন সেদিন সুফিয়ান পড়েছিল। একদিকে গ্রাম, অন্যদিকে পরিবার হারানোর শোক, এরপর যুক্ত হল বি’ষাক্ত ভালোবাসা।যে ভালোবাসাকে নিজের হাতে মে’রে ফেলে নিজেই যেন নিজের মৃ’ত্যু বয়ে আনল।”
পরিবেশ নীরব হয়ে গেল। লণ্ঠন এর আলো নিভু নিভু। শীতল বাতাস কোন ফাঁকফোকর থেকে হিম হিম করে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করছে।সেলিম উনার চাদরটা শক্ত করে পেঁচিয়ে নিল। প্রচন্ড শীতেও উনার বড্ড জলতেষ্টা পেল।আহির কে দিয়ে বাধ্য হয়ে একটু জল চাইলেন সেলিম।আহির রান্নাঘর থেকে মাটির পাত্রে জল নিয়ে আসল।সেলিম এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলল জলটুকু। ঘনঘন শ্বাস ফেলে বললেন “সুফিয়ান সেদিন তৃষ্ণার্ত ছিল। জলটুকু অবধি খেতে পারেনি। আমার তাই ভেবে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। যখনই সেই দিনটার কথা ভাবি,আমি যেন অতিতে হারিয়ে যাই।”
মীর কৌতুহল চোখে বলল “আচ্ছা,সেদিন সুফিয়ান কি বলতে চেয়েছিল?আর বিন্তিই বা কি উপহার দিতে চেয়েছিল? একচোখা ব্যক্তি কোথায়?
The Silent Manor part 52+53
সেলিন ধীরে বললেন “সুফিয়ান সেদিন কোন সত্যর কথা জানাতে চেয়েছিল তা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। বিন্তি সেদিন কি উপহার দিতে চেয়েছিল তা-ও আজ অবধি কেউ জানে না। একচোখার ব্যক্তির খোঁজও আর কেউ পায়নি।

তৃতীয় খণ্ড কবে আসবে 🥹
নেক