Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৬

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৬

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৬
অনামিকা তাহসিন রোজা

নরম রোদে ভেজা এক মিষ্টি সকাল। ঘড়ির কাঁটা আটটার কাছাকাছি। হালকা হাওয়ায় জানালার পর্দা একটু একটু দুলছে। পাখিদের কুজন ভেসে আসছে দূরের শাখা থেকে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা হালকা ঘি-ভাজার গন্ধে ঘরের পরিবেশটা হয়ে উঠেছে যেন আরও বেশি ঘরোয়া, আরামদায়ক। শ্রাবণের ঘরে তখন একটু হুলুস্থুল দশা। আজ খুব সকাল সকালই উঠার কথা ছিল তার। তবে গতরাতে ধারার হাতের চা খেয়ে রাতে আর ঘুমোতেই পারেনি। এখন গোসল সেরে ভেজা চুলে তোয়ালে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত চিরুনি চালাচ্ছে। চোখে-মুখে পানি দিয়ে আবার আয়নায় তাকালো শ্রাবণ। কিছু একটা মনে পড়তেই মুখ কুঁচকে বলল,

— “ধুর! আরেকটা পাঞ্জাবি ছিল না?”
আলমারির দরজা খুলে হাতড়ে খুঁজে বের করলো একটা হালকা সবুজ পাঞ্জাবি, ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল। তারপর বিছানায় রাখা কালো রঙের পাঞ্জাবি টা খপ করে পরেও ফেললো। তখনও হাতের তোয়ালেটা ঝুলে আছে কাঁধে।
ঘরের এক পাশে রাখা ব্যাগটা খুলে দ্রুত মোজা, ঘড়ি, ফোন চার্জার, আর ছোট একটা পারফিউম ঢুকিয়ে নিল। নিজের কফির কাপটা টেবিলেই পড়ে আছে, আধখাওয়া। কিন্তু এখন সময় নেই আর এক চুমুক খাওয়ারও। সে জানে গ্রামের গাড়িটা একবার বেরিয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না। বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে যাবার আগে একবার চারপাশে তাকিয়ে নিঃশ্বাস নিলো, এই মিষ্টি সকালের গন্ধটা যেন সারা শরীরে মেখে নিল শ্রাবণ। তার সত্যি ভীষন চিন্তা হচ্ছে। অকারনেই অসস্তি অনুভব করছে শ্রাবণ। প্রথমত তাকে ধারার সাথে স্বামীর পরিচয়ে যেতে হচ্ছে, সোজা ভাষায় বললে সে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। আবার ধারার সাথেও সম্পর্ক স্বাভাবিক না। যদিও কোনো সমস্যা নেই তাদের মাঝে, তবে আর পাঁচটা দম্পতিদের মত স্বাভাবিকও তো না। শ্রাবণ আর দেরি করল না। হাতের ব্যাগ টা নিয়ে ঘরের হাতল লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নিচে আসতেই তড়িঘড়ি করে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো সালমা বেগম কে। তিনি একটা বয়ামের কৌটা লাগাতে লাগাতে আঁচল সামলে এসে বয়ামটা শ্রাবণের ব্যাগে ঢুকিয়ে দিতে দিতে বলল,
—” নারকেলের লাড্ডু বানিয়ছিলাম। অল্প কিছু নিয়ে যা। সবাইকে দিয়ে খাবি।”
শ্রাবণ ব্যাগটা একটু টেনে ধরলো, যাতে বয়ামটা ভালোভাবে বসে। তারপর হালকা বিরক্ত মুখেও গলার স্বরটা নরম হয়ে এলো,
—”মা, তুমি না এসব না দিলেই পারতে! শুধু শুধু ব্যাগে বয়ে নিয়ে যাব! কে খাবে এত মিষ্টি জিনিস?
সালমা বেগম এবার চোখ কুঁচকে তাকালেন,
—” বেশি কথা বলিস না তো। তোর বউয়ের চাচাতো ভাই-বোন আছে না ওখানে? ছোটরা তো খাবে! আর বড়রাও খাবে, তোর কথা ভেবে যদি না-ই খায়, তোর মায়ের মুখ চেয়ে খাবে! গাধা একটা। আর ধারাও খায় এগুলো!”
শ্রাবণ মুখ ঘুরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। না জানি আর কি কি দেখতে হবে! সালমা বেগম এবার ছেলের পাঞ্জাবির কলারটা একটু ঠিক করে দিতে দিতে বললেন,

—” শোন বাবা, গ্রামে গিয়ে ঝগড়া করবি না কিন্তু। মেয়েটা অনেক শান্ত। তার চোখের দিকে তাকালেই বুঝবি ও তোকে নিয়ে কত কেয়ার করে। সব মেয়েই একটু ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে, আর তুই…”
—”মা!” শ্রাবণ এবার বিরক্ত গলায় আটকে দিল। বারবার একই কথা শুনতে আর ভালো লাগছে না তার। সালমা বেগম থেমে গেলেন। কিছু না বলে শুধু হাতটা একবার ছেলের মাথায় বুলিয়ে দিলেন।
—”আল্লাহ রক্ষা করুক। সাবধানে যাস। ফোনটা অন রাখিস। আর ওর দিকে খেয়াল রাখিস!”
শ্রাবণ এবার মাথা নিচু করে শুধু বলল,
—”আচ্ছা মা।”

শ্রাবণেরই উঠতে দেরি হয়ে গেছে। ধারা ইতোমধ্যে তৈরী হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সকাল সকাল উঠেই সে তৈরী হয়ে নিয়েছে। এদিকে ট্যাক্সি ডেকে এনেছেন সামিউল শেখ। শ্রাবণ সালমা বেগম কে নিয়ে গেট পেরিয়ে একটু এগোতেই চোখ পড়লো সাদা-নীল রঙের শাড়িতে জড়িয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ধারার দিকে। চোখে কাজল, চুলগুলো আধ খোলা। গায়ের হালকা শাড়িটা সকাল রোদের সাথে মিশে একটা অদ্ভুত আলো ছড়াচ্ছে। মেয়েটার দিকে এক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতেই ওর চোখ তার চোখের সাথে আটকে গেল। দুজনেই চুপ, কিন্তু চোখের ভিতর যেন অনেক অজানা কথা। শ্রাবণ কিছুটা থমকে গেল। আবারো শাড়ি পড়েছে মেয়েটা? কী দরকার ছিল? অবশ্য এখন একদম বউ বউ লাগছে মেয়েটাকে! এর মধ্যে শ্রাবণ এক পলকে আবিষ্কার করে ফেলল, শাড়ি পড়লে মেয়েটাকে মোটেই পিচ্চি মনে হয়না। একুশ বছরের নারী মনে হয়! দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসলো শ্রাবণ। দেখলো মাঝারি আকারের একটা ব্যাগ নিয়েছে ধারা। শ্রাবণ নিজের টার সাথে সেটাও ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে ঠিকঠাক করল। এরপর পেছনের দরজা খুলে ধারাকে উঠতে ইশারা করল। ধারা সামিউল শেখ ও সালমা বেগম কে সালাম করে দোয়া নিল, আঁচল ঠিক করে গুছিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
সামিউল এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে সতর্কতার দৃষ্টিতে বললেন,

—” আমানতের খিয়ানত করা মহাপাপ। কথাটা মনে রেখো। ধারা এখন তোমার দায়িত্ব, তাই তুমি মানো আর না-ই মানো, স্বামী হিসেবে ওর দিকে খেয়াল করাটাও একটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। দেখে রাখবে ওকে। খেয়ালো রাখবে, সাবধানে থেকো!”
শ্রাবণ অসহায় চোখে তাকালো নিজের বাবার দিকে। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, ধারা-ই সামিউল শেখের মেয়ে। যাক, কি আর করার! তবে সামিউল শেখের কথা মিথ্যা নয়। তাই আর কিছু না ভেবেই সে উঠে বসলো। দরজা বন্ধ হলো। চাকা ঘুরলো। গ্রাম এখন দূরে নয়, বাসে উঠে পড়লেই চার-পাঁচ ঘন্টার মত সময় লাগবে পৌঁছাতে। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এই যাত্রায় কি ওরা দুজনও একটু কাছাকাছি আসবে?

গাড়ির ভেতরটা এখনো বেশ নীরব। জানালার পাশে বসে ধারা গা ঘেঁষে বসেনি, মাঝখানে ইচ্ছাকৃতভাবে একটুখানি ফাঁক রেখেছে। শ্রাবণও যেন সেই ব্যবধানটা অক্ষত রেখেছে নিজের মতো করে। কিন্তু তাদের মাঝখানে অদৃশ্যভাবে ভাসছে একরাশ প্রশ্ন, অস্বস্তি, আর না বলা কিছু অনুভব। রাস্তার দু’পাশে ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাকা দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে ধারা একটু চুপচাপ। কখনো দূরের ল্যাম্পপোস্ট, কখনো ফুটপাতের উপরে থাকা হকার রা, কখনোবা হাইওয়ের ছোট ছোট দোকান দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
শ্রাবণ পাশ থেকে চোখের কোণে মেয়েটার সেই হালকা সাদার ছায়াটা টের পায়। ধারা সত্যিই চেষ্টা করছে, অন্তত নিজের জায়গা থেকে, চুপ করে থাকলেও এই যাত্রাটা যেন সহজ হয় সেই চেষ্টাটুকু করছেই। হঠাৎ, শ্রাবণ ফোন বের করে ট্যাপ করতেই একটানা ঝনঝনে রিং বেজে উঠল। ফোনটা কানে দিয়ে বলল,

—”হ্যালো… হ্যাঁ মুনিরা, আমরা রওনা দিয়েছি। সময়মতো পৌঁছে যাবো ইনশাআল্লাহ্‌… হুম, ঠিক আছে। তুমি ঠিকঠাক কাজগুলো করে ফেলো।”
ধারা তাকায় না, কিন্তু বোঝে হয়তো অফিসের কাওকে কল দিয়েছে শ্রাবণ। তাই চুপ থাকে৷ ফোনটা রেখে একটুখানি গলা খাঁকারি দেয় শ্রাবণ। তারপর জানালার বাইরের দিকে তাকিয়েই বলল,
—” খারাপ লাগছে?”
ধারা ধীরে চোখ তুলে তাকায়, ঠোঁটের কোণে একটুকরো মৃদু হাসি ফুটে ওঠে,
—” নাহ। আমি জার্নিতে একটুআধটু অভ্যস্ত। ”
শ্রাবণ এবার ওর দিকে তাকিয়ে বলে,

—” আজকে মনে হয় রাস্তায় জ্যাম থাকবে না। আর এমন হলে পাঁচ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাব ইনশাআল্লাহ।”
ধারা একটু ঘাড় নামিয়ে হাসে। তারপর সাহস করে জিজ্ঞেস করে ফেলে,
—”আপনি খুব বিরক্ত হচ্ছেন না তো, এইসব আয়োজন দেখে?”
শ্রাবণ এবার একটুখানি থেমে ওর দিকে তাকায়। তারপর ধীরে মাথা নাড়ে,
—”না, মানে… হ্যাঁ, আগে হচ্ছিলাম। এখন আসলে কিছু বুঝতে পারছি না। তবে গ্রামে আমার একটা বন্ধু আছে, নাম মনে হয় শুনেছো, সাদিক। তার সাথে প্রায় সাত বছর পর দেখা হবে। এই জন্য একটু এক্সাইটেড!”
ধারা চোখ বড় করে তাকায়, মুখে এক ঝলক সত্যিকারের আগ্রহের ছায়া,
—”সাত বছর! ওনার সাথে আগে কোথায় ছিলেন? কলেজে?”
শ্রাবণ হালকা হেসে মাথা নাড়ল,

—” হ্যাঁ, কলেজ থেকেই বন্ধুত্ব। তারপর আলাদা হয়ে গেছিলাম… আমি ঢাকায়, ও গ্রামের দিকেই ছিল সবসময়। যোগাযোগও ছিল দূর্লভ। তবে ও-ই আমাকে বারবার বলেছে, একবার যেন গ্রামে যাই। এই যাওয়া যদি না হতো, হয়তো আর হতোও না।”
ধারা এবার জানালার বাইরে তাকায়, রাস্তার পাশে ছুটে চলা পাথরের গুঁড়ি আর গাছপালাগুলোর মাঝে চোখ রাখে। তারপর হালকা গলায় বলে,
—”বন্ধুরা আসলে এমনই হয়… ওরা চাইলেই টেনে রাখে। না হলে আমরা তো সবাই ব্যস্ত হয়ে হারিয়ে যাই নিজেদের ভেতরে।”
শ্রাবণ এবার একটু নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,

—”তোমার? খুব কাছের কেউ আছে? মানে, যাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হয়?”
ধারা চোখ নামিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
—” ওইযে একজন ছিল। আমার ছোটবেলার বান্ধবী, জান্নাতি। ও ছাড়া আর কেও নেই তেমন। আমি একটু কম কথা বলি তো, তেমন কেও মিশতে চায়না আমার সাথে। এদিকে বিয়ে হয়েছে জান্নাতির, তাই এর পর একটু যেন ছেঁকে গেল সম্পর্কটা… হয়তো আমি নিজেই তেমনটা করে ফেলেছি। আরো দুজন ছিল, কিন্তু এখন শুধু জান্নাতিই আছে বলা যায়, বাকি সবাই আলগা হয়ে গেছে সময়ের সাথে।”
শ্রাবণ ধীর নিঃশ্বাস ফেলল,

—” সময়ের সাথে সবকিছু বদলে যায়, তাই না? আমরা যেমন আগে ছিলাম, আলাদা, অচেনা। আর এখন…”
তার কথা থেমে গেল। ধারা তার দিকে তাকায় না, কিন্তু একটা চাপা গলার কাঁপুনি যেন শ্রাবণের কণ্ঠে ধরা পড়ে।
—”এখন?” — ধারা আস্তে প্রশ্ন করল।
শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—”এখন আমরা একসাথে যাচ্ছি। আর এর মাঝেও, অনেক কিছু একসাথে বোঝার চেষ্টা করছি। এটা কি কম বড় ব্যাপার?”
ধারার মুখটা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে থাকে।তারপর হালকা হেসে বলে,

—”হ্যাঁ, বড় তো অবশ্যই। কেউ কেউ তো একটা কথাও বলে না, শুধু দূরে সরে যায়। আপনি যে আমাকে ঘর থেকে দূরদূর করে তাড়িয়ে দেন নি, এই তো অনেক।”
ধারার বলা কথাটা যেন একটু বেশি সত্য হয়ে গেল। শ্রাবণ অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। চোখে যেন কোনো খুঁত নেই ওর, শুধু একরাশ অনুভব। খুব ধীরে গলায় বলল,
—”তুমি এইসব এত সহজভাবে বলো কী করে?”
ধারা হালকা কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানালার বাইরে তাকায়,
—”সারাজীবন চুপ থেকে শুনেছি… মানুষ চুপ থাকলে অনেক কিছু শুনে ফেলতে পারে।”
দুজনেই চুপ করে রইলো। শ্রাবণ আরো একটা জিনিস ধরে ফেলল। ধারার বয়স কম, কথাও বলে কম। কিন্তু বাস্তবজ্ঞান অনেক রয়েছে। কথার মধ্যে অনে গভীরতা রয়েছে, যা না চাইতেও মুগ্ধ করল শ্রাবণকে।

বাস স্টেশনের কোলাহল ভাঙল ভেতরের নীরবতাটা। ট্যাক্সি এসে থামতেই হুট করে বদলে গেল চারপাশের আবহ। লোকে লোকারণ্য, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, বাসের হেল্পাররা চিৎকার করে গন্তব্য ডেকে বেড়াচ্ছে। ট্যাক্সির দরজা খুলতেই ধারা প্রথমে বের হলো। শাড়ির আচলটা আঁচলে গুছিয়ে, ব্যাগটা ভালোভাবে হাতে ধরে সে একপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। শ্রাবণ ব্যাগ নামিয়ে দিয়ে চারপাশটা দেখে নিয়ে বলল,
—”তুমি এখানেই দাঁড়াও, আমি টিকেট নিয়ে আসছি। বেশি দূরে যেও না, এই জায়গায়ই থেকো।”
ধারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। একটু দূরে ছায়া পড়ে আছে স্টেশনের একটা গাছের নিচে, সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে সে। শ্রাবণ এবার দ্রুত পা চালিয়ে বাস কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়। পেছন ফিরে একবার তাকায়… ধারা ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। ব্যাগ হাতে, শাড়ির কুঁচিটা হাওয়ায় একটু নড়ছে, চোখে কোনো অস্থিরতা নেই, শুধু একটা স্বাভাবিক স্থিরতা।

শ্রাবণের মনে হয়, এই মেয়েটাকে সত্যিই কোথাও হারিয়ে ফেলার ভয় হয় না ওর, বরং ওর এমন দাঁড়িয়ে থাকাটাই আশ্বাস দেয়, থাকবো পাশে, শুধু বলো কোথায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। মুচকি হাসলো শ্রাবণ। নিজেকে অভিভাবক মনে হচ্ছে তার! এই ভেবেই সে আবার মুখ ঘুরিয়ে টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। দু-তিনজন রয়েছে।
ধারা আগ্রহের সাথে আশেপাশে তাকালো। সত্যি বলতে ঢাকা শহরে যে কত মানুষ রয়েছে, সেটা এইসব স্টেশনে আসলে বোঝা যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, ঢাকার অধিকাংশ মানুষই দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে এসেছে। তাই বছরের বিশেষ দিনগুলো ছাড়াও প্রায় সব দিনই ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকেনা জায়গাগুলোতে।
হুট করেই ধারা পাশে তাকিয়ে দেখলো, ছোট্ট একটা ফুলের দোকান। অনেক যাত্রীরা শখের বশে ফুলের মালা কিনছে। বাঁশের উপরে শক্ত তরে বাঁধা দড়িতে বিভিন্ন ফুল ঝুলিয়ে বিক্রি করতে বসেছে এক বাচ্চা মেয়ে। ধারা চোখ বুলিয়ে একটু কাঁত হয়ে সব ফুলগুলোই দেখলো। ছোট থেকেই তার ফুল ভীষণ পছন্দ। কিন্তু কখনো এমন করে মালা গেঁথে হাতে, গলায় বা মাথায় পড়েনি সে। ধারা লক্ষ্য করল কিছু নারী যাত্রী রা সাদা রঙের এক ধরনের ফুলের মালা কিনে খোঁপা তে গুঁজে নিচ্ছে, হাতে বেঁধে নিচ্ছে। দেখে ভালো লাগলো ধারার, পছন্দ হলো বেশ। অপলক তাকিয়েই রইলো সে।

শ্রাবণ দুটো টিকেট পকেটে গুঁজে এগিয়ে আসলো ধারার দিকে। কিন্তু ধারার অদ্ভুত দৃষ্টি লক্ষ্য করে সেও অনুসরণ করে তাকালো ফুলের দোকানটার দিকে। ভ্রু কুঁচকে আবারো ধারার দিকে চোখ ফেরালো সে, প্রতিবারের মত নাম না ধরেই ডেকে উঠলো,
—” এই মেয়ে, শুনছো?”
ধারা সংবিৎ ফিরে পেলো, চমকে বলল,
—” হু?”
শ্রাবণ এবার ফুলের দোকানটার দিকে চোখ রেখে আবারো ধারার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” কী দেখছিলে?”
ধারা আবারো তাকালো ওদিকে। সাদা রঙের ওই ফুলের মালাগুলো একসাথে গুচ্ছ করে রাখা হয়েছে। শ্রাবণের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সেদিকে তর্জনী তাক করে ধারা সরল মনে জিজ্ঞেস করল,
—” ওগুলো কী ফুল? নাম কী?”
শ্রাবণ একবার চোখ সরু করে সেদিকে তাকালো, এরপর বলল,
—” মনে হয় বেলী ফুল। বেলী ফুলের মালা ওগুলো।”
ধারা আঙুল নামালো। ভাবলো, গ্রামে তো বেলী ফুল দেখেছে সে, কিন্তু সেগুলো এত সুন্দর করে মালা বানানো যায় তা তো জানতো না। ধারা মুগ্ধ হলেও মুখে ছোট করে বলল,

—” ওও। ভীষণ সুন্দর! ”
শ্রাবণ ঠোঁটে সূক্ষ্ম রেখা টেনে নরম কন্ঠে বলল,
—” তুমি নিতে চাও? কিনে দেব?”
ধারা আবারো সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁট কাঁমড়ে কিছু একটা ভাবলো, এরপর মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল,
—” কত দাম হতে পারে ওগুলোর ?”
শ্রাবণ এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ধারার মুখের ওই শিশুসুলভ কৌতূহল আর সংযত আগ্রহটা ওর চোখ এড়িয়ে গেল না। সত্যি বলতে, ওর প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটুকরো লজ্জা, একটুকরো সংকোচ, একটা অদ্ভুত কোমলতায় ভরে দিল শ্রাবণের বুক। হৃদয় কাঁপলো শ্রাবণের। মেয়েটা কি তাকে ভয় পাচ্ছে? তার টাকা খরচ করতে হবে বলে কি সংকোচ করছে? শ্রাবণ আর কিছু বলল না, শুধু গভীর চোখে একবার মেয়েটার মুখের দিকে তাকালো। যেন সেই চোখে লেখা হয়ে আছে কত অজস্র অপূর্ণ চাওয়া, বলার মতো না-বলা কথা। তারপর একটুও সময় না নিয়ে সে ঘুরে সোজা এগিয়ে গেল ফুলের দোকানের দিকে। ধারা প্রথমে কিছু বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলো। তারপর যখন বুঝলো সে কিনতে যাচ্ছে, একটু দৌঁড়ে কাছে গিয়ে বলল,

—” না না, আমি তো এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম… লাগবে না, সত্যি…! ফুল নিয়ে কী করব আমি?”
শ্রাবণ একপলকে ওর দিকে তাকিয়ে আবারো হাদ ধরে টেনে আগের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে কঠোর গলায় বলল,
—” চুপচাপ এখানে দাঁড়াও। আসছি আমি!”
বলে আবারো ওদিকে গেলো শ্রাবণ। দোকানি মেয়েটার হাতে ১০০ টাকার একটা নোট দিলো, আর বেছে নিলো দুটো ছোট্ট, খাসা সুগন্ধি বেলী ফুলের মালা। দোকানি মেয়েটা বলে উঠলো,
—” মালা তো চল্লিশ ট্যাকা কইরা ভাইজান। আমার কাছে তো খুচরা বিশ ট্যাকা নাই!”
শ্রাবণ ফুলের মালা দুটো হাতে নিল, মুখে বলল, রেখে দাও, লাগবেনা। তারপর ধীরে ধারা’র দিকে ফিরে এসে, হাত বাড়িয়ে ওর দিকে এগিয়ে দিল মালাটা। ধারা চোখ পিটপিট করে তাকালে শ্রাবণ তাড়া দেয়,

—” তাড়াতাড়ি নাও। মাথায় পরতে না চাইলে হাতে বাঁধো। আমরা তো বাস মিস করে ফেলব! নাও দ্রুত!”
ধারা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। মালাটা হাতে নিতে নিতে ওর ঠোঁটে নরম একটা হাসি ফুটলো। তবে সেটা শুধু মুখে নয়, চোখে, কপালে, পুরো মুখাবয়ব জুড়ে ছিলো একরকম অভিভূত হওয়ার প্রকাশ। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটা হঠাৎ করে কেউ হাতে তুলে দিয়েছে। ধীর গলায় বলল,
—” ধন্যবাদ…”
শ্রাবণ শব্দহীন হাসলো। ধারা তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর নরম করে বেলী মালাটা হাতের তালুর কাছেই রাখল…. একটু পরে কোথায় রাখবে সেটা ভাবতে থাকলো। আর শ্রাবণের চোখ তখন অন্যদিকে, কিন্তু মন… মন ছিলো মালাটা হাতে নেয়া ওই মেয়েটার মৃদু, মুগ্ধ হাসির ভিতর। বাসস্ট্যান্ডের কোলাহলে, একটা নীরব মুহূর্তের জন্ম হলো, দুজন মানুষের মাঝখানে।

শ্রাবণের বন্ধু সাদিকের স্বভাব শ্রাবণের ঠিক উল্টো। যেখানে পেটের ভেতর বোম ফাটালেও শ্রাবণের মুখ থেকে অপ্রোয়জনীয় কথা বের করা দুঃসাধ্য! সেখানে সাদিকের মুখে কেও টেপ মেরে রাখলেও ফুটন্ত পপকর্নের মত বুলি ফুটতে থাকে তার মুখে। কী বলে, না বলে, সেটা বড় কথা নয় তার কাছে। কিন্তু কথা বলতেই হবে, এই আর কি। আর বাচাল সাদিক যখনই খোঁজ পেলো যে জিগড়ি দোস্ত শ্রাবণ গ্রামের দিকে রওয়ানা দিয়েছে, তখনই অনেক কষ্টে বিভিন্ন বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে জোগাড় করে ফেলেছে শ্রাবণের নাম্বারটা। এতদিন নাম্বার সাথেই ছিল, কিন্তু গত বছরে ফোন পুকুরে পড়ে যাওয়ার নষ্ট হয়ে যায়, আর সেভ করা সব নাম্বারও হারিয়ে যায়। তাই অনেকদিনই যোগাযোগের বাইরে ছিল তারা।

আপাতত গোবর পরিষ্কার করে সাদিক এসে বসে পড়লো পুকুর পাড়ে। এক হাতে কপালের ঘাম মুছে কল দিল শ্রাবণের নাম্বারে। এইমাত্র বাসে উঠেছে শ্রাবণ, সিট খুঁজে ধারাকে জানালার পাশে বসিয়ে সেও বসলো। সাথে সাথে পকেটের ফোনটা বাজতে শুরু করল। লকারে দুটো ব্যাগের জায়গা হয়নি, তাই ধারার ব্যাগটা নিজের সাথে রাখলো শ্রাবণ। সিটের নিচে ঠিকঠাক গুছিয়ে রেখেই পকেটো ঝঙকার তুলে বাজতে থাকা কলটা ধরল সে। অপরিচিত নাম্বার বলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
—” কে বলছেন?”
উৎফুল্লে চেঁচিয়ে উঠলো সাদিক,
—” বন্ধু! কেমন আছো দোস্ত! শহুরে মানুষ হয়ে, আমাকে ভুলে গেছো নাকি হ্যাঁ? শোনো, তবলা বাজে ধিকধিক, আমি হলাম তোমার বন্ধু সাদিক!”
শ্রাবণ কানে ফোন ধরে মুহূর্তখানেক চুপ করে রইলো। সেই চেনা নামটা শুনেও যেন বিশ্বাস করতে একটু সময় লাগল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক টুকরো নরম হাসি ফুটে উঠল, সেই ধরনের হাসি, যা খুব কাছের কাউকে অনেকদিন পর শুনলে হয়। গলায় খুশির আবরণ রেখেও শান্ত ভঙ্গিতে কিড়মিড় করে বলল,

—” শা’লা, তুই এখনো বদলালি না! একই রকম আছিস, তাই না? চেঁচাতে চেঁচাতে কথা শুরু করিস!”
ওপাশে হু হা করে হেসে উঠল সাদিক,
—” আর কী করব! তোকে তো ধরাই যাচ্ছিল না। শেষমেশ মিঠুন, মাসুদ, নাঈম, সবার থেকে ঘুরে ঘুরে তোর নাম্বার জোগাড় করতে হলো। এই শুন না, শুনেছি তুই আজ গ্রামে আসছিস। তাই নিজে থেকে না বললে, আমি আগেই হানা দিচ্ছি, দোস্ত!”
শ্রাবণ একটু হেসে বলল,
—” হ্যাঁ, রওনা দিয়েছি। এখনই সবে বাস ছাড়ল। তোর খোঁজ ভালো লাগল, সাদিক। অনেকদিন হয়ে গেছে, না?”
—” সাত বছর, ছয় মাস, তিন দিন, আর… প্রায় পাঁচ ঘণ্টা!”
সাদিক দারুণ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল। মনে হচ্ছে বিষয়টা নিয়ে ভালোই সিরিয়াস। ধারা তখন জানালার পাশে বসে, একটু কৌতূহলী চোখে শ্রাবণের দিকে তাকালো। ওর হাসির শব্দে বোঝা গেল, শ্রাবণ কোনো ঘনিষ্ঠ কারো সাথে কথা বলছে।
শ্রাবণ কথা বলতে বলতে সাদিককে জিজ্ঞেস করল,

—” এখন কোথায় আছিস? গ্রামেই তো?”
সাদিক বলল,
—” হ্যাঁ, গ্রামে। দুপুরে তুই পৌঁছানোর কথা, তাই দুপুরের ভাত খাবি আমার হাতেই রাঁধা। না, না, ভয় পাবি না! রাঁধতে শিখেছি রে ভাই, পেট মোটা করার দায়িত্ব আমার। তবে একটা কথা বলি, তোর জন্য সারপ্রাইজ রেডি করে রেখেছি!”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বলল,

—” কী সারপ্রাইজ?”
—” সেটা তো বললে আর সারপ্রাইজ থাকে না রে বেটা!”
খিক খিক করে হাসে সাদিক। এপাশে নীরবে শ্রাবনও হাসলো। ভালো লাগছে তার! এই একমাত্র বন্ধু সাদিকই প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত বন্ধুত্বের মর্যাদা রেখেছে। এজন্যই তাদের সম্পর্ক একদম ভাইয়ের মত। শ্রাবণ মাথা নাড়ে, ধীর কণ্ঠে বলল,
—” ঠিক আছে। আসছি। দেখা হলে সব শোধ নিই তোর কাছ থেকে।”
কিছু একটা মনে করতেই সাদিক জিজ্ঞেস করে বসলো,
—” ও হ্যাঁ! ভালো কথা, তুই নাকি, রহিম চাচার মেয়েকে বিয়া করছোস?”
শ্রাবণ এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল জানালার বাইরের দিকে। তারপর একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

—” হ্যাঁ। এ বিষয়ে পরে কথা বলি, এখন কিছুক্ষণ বাসে একটু বিশ্রাম নিতে চাই। দেখা হলে অনেক কথা হবে।”
সাদিক হেসে বলল,
—” ঠিক আছে, বিশ্রাম নে। কিন্তু সাবধানে আসিস!”
শ্রাবণ থেমে যায়। একটু চাপা হাসি ঠোঁটে রেখেই কলটা কেটে ফেলে। ধারা তখনো পাশেই বসে। নিশ্চুপ, কিন্তু বুঝে গেছে, সেদিনের সেই ছেলেটা, যে পুকুরে জুতা ডুবিয়ে মাছ ধরার স্বপ্ন দেখত, সে এখনো কোথাও হারায়নি। শুধু সময় আর বাস্তবতার পরতে পরতে খানিকটা গম্ভীর হয়ে গেছে।

কল কেটে ধারার দিকে তাকালো শ্রাবণ। মেয়েটা এখনো সেই মালা দুটো হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছে, হাতের উপর রাখছে, ঘ্রাণ শুঁকছে। যেন একেকটা ফুল তার ভেতরের কোথাও কিছু জাগিয়ে তুলছে। শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর নিঃশ্বাস ফেলে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে চোখ রেখে কীসব টাইপ করতে লাগল। হয়তো কারো মেসেজের উত্তর, বা হয়তো… কোনো নোট লিখছে চুপিচুপি, ঠিক যেমনটা সে মাঝে মাঝে করে।
এই ফাঁকে ধারা জানালার কাঁচটা সরিয়ে দিল। বাইরের দমকা বাতাস চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে তার, ওর চোখে-মুখে বাতাসের সেই আদর লেগে আছে। ধারা চোখ বুজে একটু নিঃশ্বাস টেনে নিল, মালার ঘ্রাণ আর বাইরের বাতাস মিলেমিশে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিল।
হঠাৎ সে অনুভব করল, কেউ তাকিয়ে আছে। চোখ মেলে দেখল শ্রাবণ। তাকিয়ে আছে নিঃশব্দে। চোখে কোনো প্রশ্ন নেই, আবার উত্তরও নেই। শুধু একটা প্রশ্রয় মাখানো উপস্থিতি। ধারা বুঝলোনা কেনো শ্রাবণ তাকিয়ে আছে। কোনো ভুল করেছে কিনা এমন মনোভাব আনতেই গুটিয়ে এলো ধারা। অসহায় চোখ মেলে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ এবার ঠোঁট ভিজিয়ে আঁটসাঁট গলায় বলল,

—” চুল বেঁধে রাখলে ভালো হতো!”
ধারার চোখে হালকা বিস্ময়। যেন গলা পর্যন্ত ঠেলে আসা বাতাসটা আচমকা থেমে গেল। ওর খোলা চুলগুলো সত্যিই এলোমেলোভাবে ওড়ছিল জানালার হাওয়ায়। শ্রাবণের কথাটা কেমন যেন আদেশ নয়, আবার অভিযোগও নয়, বরং একধরনের যত্ন, যা সে বুঝেও উঠতে পারে না। আচ্ছা চুলগুলো কি শ্রাবণকে বিরক্ত করছে? করতেই পারে! বাতাসে তো বাধ্য থাকেনা চুল। ধারা চট করে মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকাল আবার, যেন নিজের প্রতিফলন দেখতে চায় কাঁচে। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ কাটে। তারপর ধারা নিঃশব্দে ব্যাগ থেকে একটা ছোট ক্লিপ বের করে আনলো, মাথা নামিয়ে ধীরে ধীরে চুলগুলো এক করে গুঁজে নিলো ক্লিপে। কিছু বলল না, শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো। হাওয়াটা এবার তার মুখে লাগছে, কিন্তু চুল আর উড়ছে না।
শ্রাবণ এবার চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। ওর মুখে হালকা এক সান্ত্বনাজনক শান্তি, যেন কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেল। কারন ধারার খোলা চুলগুলো আসলেই উড়ে এসে শ্রাবণের ফোনের স্ক্রিনে পড়ছিল।
কিছুক্ষন পর শ্রাবণ আস্তে করে বলল,

—” কিছু খাবে? তোমার জন্য ব্যাগে কেক, পাউরুটি, জুস নিয়ে এসেছি। খিদে পেয়েছে?”
ধারা আস্তে করে বলল,
—” উহু। খাব না!”
শ্রাবণ এক কোণে ঠোঁট তুলে বলল,
— ” এখনো অবশ্য অনেক রাস্তা বাকি। খাব না বললে তো হবেনা, এক ঘন্টা পরই খিদে পাবে। খিদে পেলে বলবে, আপাতত পানি খাও!”

বলেই ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে ধারার হাতে ধরিয়ে দিল শ্রাবণ। ধারা চুপ। একবার মালার দিকে তাকাল, একবার পানির বোতলের দিকে তারপর শ্রাবণের দিকে। একটা খুব হালকা হাসি ছুঁয়ে গেল তার ঠোঁটের কোণে। বাতাস তখনও বইছে, দুজনের মাঝখানে অদৃশ্য কিছু কথা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
গাড়ি তখন হাইওয়ের শেষ প্রান্তে উঠে এসেছে। দূরে সবুজ আর কুয়াশার মাঝে ভেসে উঠছে গ্রামের ছায়া, খেজুর গাছ, ছোট ছোট পুকুর। একটা ধীর গতি সম্পর্কের ভিত গাঁথা শুরু হয়েছে। হয়তো খুব নীরবে। খুব ক্ষীণভাবে। কিন্তু তবু শুরু তো!

দু ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। বাস এখনো চলমান। গন্তব্যের দিকে ধীরে ধীরে ছুটে চলেছে। শ্রাবণ কানে ইয়ারফোন গুঁজে একটা মুভি দেখতে শুরু করেছিল। কানে ইয়ারফোন, চোখে মুভির ফ্রেম, বাইরের জগৎ যেন বিলীন করে দিয়ে নিজের জগতে হারিয়ে গিয়েছে। আর ফলস্বরূপ সে ভুলেই গেছিল, পাশে কেও আছে। নিজের মত করেই খুব মনোযোগ দিয়ে মুভি দেখতে থাকা শ্রাবণ হুট করে অনুভব করল তার কাঁধে এক অদ্ভুত ভার। একরকম মোলায়েম, কিন্তু পুরোপুরি সতর্ক করে দেয়ার মতো। ভারটা অনুভব করতেই পাশে ফিরিয়ে দেখলো ধারার মাথা টা তার কাঁধে এসে পড়েছে। বেকায়দায় ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। সে এক মুহূর্ত থমকে গেল। ধারার মাথাটা নিঃশব্দে এসে তার কাঁধে হেলান দিয়েছে। সত্যিই ঘুমিয়ে গেছে মেয়েটা, বেখেয়ালে, অদ্ভুত একটা নির্ভরতায়।

ধীর সুস্থে কান থেকে ইয়ারফোন খুলে ফেলল শ্রাবণ, পাশে তাকিয়ে দৃষ্টি ধীর হয়ে এলো। সেই মেয়েটার দিকে চেয়ে থেকে বুঝলো, এ ঘুমটা কেবল ক্লান্তির নয়, এ যেন একটা ভরসা। মেয়েটা নিজের অজান্তেই তার পাশে একটুখানি আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। শ্রাবণ নড়ল না। নীরবে বসে রইল। মুভি থেমে গেছে। এখন চলন্ত বাসের জানালার বাইরের আলোছায়ার চেয়েও সুন্দর দৃশ্য তার ডানদিকে ঘুমিয়ে আছে। সে চুপচাপ মেয়েটার চুলগুলোকে একবার দেখল। হালকা এলোমেলো, বাতাসে উড়ছে একটু একটু করে। তারপর মৃদুস্বরে নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল,
—” না চাইতেও নিজেকে হাসবেন্ড মনে হচ্ছে!”

হলে হোক! কি আর করার! হাতের ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে ধারার ঘাড়ে হাত দিয়ে মাথাটা ঠিক করে রাখলো শ্রাবণ, তবে নিজের কাঁধ থেকে সরালো না। আঁচল ঠিকঠাক করে দিয়ে মনমতো ঘুমোনোর ব্যবস্থা করে দিল। নিজেও একটু চোখ বুঁজলো।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৫

গাড়ি তখন শহর ছেড়ে গ্রামমুখী উন্মুক্ত রাস্তায় ঢুকে পড়েছে। খোলা আকাশ, দূরের কুয়াশা, আর চারদিকে সবুজের পরত। এই নিস্তব্ধ রাস্তায়, শ্রাবণ হঠাৎ বুঝে ফেলে, এই মেয়েটা যতই তার জীবনসঙ্গিনী না হোক এখনো, ওর উপস্থিতিতে একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। একটা ভারসাম্য। শ্রাবণ আর কিছু না বলে আবার বাইরের দিকে তাকায়। কিন্তু এবার সে বুঝে গেছে, এই যাত্রা কেবলমাত্র গন্তব্যের দিকে নয়, তাদের মধ্যকার সেই দুরুহ দূরত্বটার দিকেও।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৭