শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৫
অনামিকা তাহসিন রোজা
ধারা খুব করে চাইছে মাটি যেন দু ফাঁক হয়ে যায়, আর ভেতর থেকে কোনো দানব শক্ত দড়ি দিয়ে টেনে নেয় তাকে। এমন টা হলে খুব একটা মন্দ হতো না বোধহয়! কারন এই মুহুর্তে নিজেকে লুকোনোর প্রয়োজন ধারার। সে আর সইতে পারবে না এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি।
শ্রাবণ বাথরুমে যাওয়ার দশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। বোধহয় গোসল করতেই ঢুকেছেন তিনি। নইলে তো দেরি হতো না। অথচ পুরোটা সময়ে ধারা হা করে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে হিসেব কষতে বসলো। অথচ কিছু মিলল না। শ্রাবণ যদি এই মুহুর্তে ঘরে আসে তাহলে হ্যালুসিনেশান ভুল হয় কীভাবে? আর যদি শ্রাবণ না আসে, তাহলে কি সত্যিই স্বপ্ন ছিল। কিন্তু শ্রাবণ শেখ তো নিজ মুখে বললেন। সত্যি না হলে উনি বুঝলেন কীভাবে? তার মানে সত্যিই কি! ধারার বুকের ভেতরটা কেমন ঝড়ের মতো কাঁপছে। এতক্ষণ যা ভাবছিল, তা যদি ভুল হয়? শ্রাবণ সত্যিই কাছে এসেছিল? ঘাড়ের উষ্ণ ছোঁয়া, কানপাশে নিশ্বাসের শব্দ, কোমরের আঁকড়ে ধরা হাত, সবটা যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তবে সে তো নিছক স্বপ্নে হারিয়ে যায়নি! তবে শ্রাবণ কীভাবে এমন কথা বললো?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ধারা একবার ভ্রু কুঁচকে বালিশ আঁকড়ে ধরলো, আবার এক মুহূর্তে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলো। ভেতরে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর শিহরণ কাজ করছে একসাথে। মনের ভেতরের কণ্ঠস্বর যেনো বারবার ঠেসে দিচ্ছে। সত্যিই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে ধারা। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, আর শ্রাবণ সবটাই বুঝে ফেলেছে! তারপরও, অন্য প্রান্তে এক অচেনা আবেগ আবারো ফিসফিস করে তাকে জানিয়ে দিচ্ছে— স্বামী হয় তোর! এত অতিরঞ্জিত ব্যাপার-স্যাপার তো নয়!
বিছানায় ধপ করে বসে থাকা ধারা ঠোঁট কামড়ে ফেললো। কী করবে এখন? শ্রাবণকে প্রশ্ন করবে? নাকি ভান করবে কিছুই বোঝেনি? কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করে বসে, তবে তো স্বীকার করেই ফেলবে নিজের দুর্বলতা! ঠিক সেই সময়ে বাথরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ থেমে গেল। ঝর্না বন্ধ হয়েছে, তারমানে গোসল শেষ! ধারা আবার এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো, বুকের ধুকপুকানিটা আরও বেড়ে গেল। যদি এবার আসে কীভাবে তার সামনে দাঁড়াবে?
ধারার ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই কয়েক সেকেন্ড পরে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো শ্রাবণ। সদ্য গোসল করে আসা লোকটার ভেজা চুলগুলো কপালে নেমে এসেছে, ফর্সা গায়ের রঙে পানির ফোঁটা চিকচিক করছে। গায়ের উপর সাদা শার্ট, কিন্তু বোতামগুলো এখনো পুরোপুরি লাগানো হয়নি। সব বোতাম খোলা। সত্যিই আজকাল শ্রাবণ সাদা শার্ট বেশি পড়ছে। ভেজা শরীরের গন্ধ আর ফ্রেশ বডি ওয়াশের সুগন্ধ পুরো ঘরটাকে ভরিয়ে তুললো। ধারার বুকটা ধকধক করে উঠলো। চোখ নামিয়ে রাখতে চাইলেও দৃষ্টি সরে গেল না একেবারে। আড়চোখে তাকাতে তাকাতে নিজের ভেতরেই গুটিয়ে গেল সে। হায় খোদা, এভাবে কেন তাকাচ্ছি আমি? মনে মনে ধিক্কার দিল নিজেকে। কিন্তু দম আটকানো এক আকর্ষণ তাকে ক্রমেই অস্থির করে তুললো।
শ্রাবণ তো একেবারেই স্বাভাবিক। ভেজা তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বিছানার পাশে রাখা ড্রয়ার খুলতে লাগলো। একবারও পেছনে তাকালো না। অথচ ধারার মনে হলো যেন লোকটা সবই বুঝতে পারছে, প্রতিটা নিঃশ্বাসই শুনে ফেলছে। ধারা দ্রুত মাথা নিচু করে নিলো, কিন্তু বুকের ভেতরের কাঁপন লুকাতে পারলো না। নিজের দুই হাত আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। হঠাৎ করেই ঠোঁট শুকিয়ে এলো, গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
শ্রাবণ ভেতরে ভেতরে কী ভাবছে কে জানে, তবে বাইরে থেকে কোনো অস্বাভাবিকতা প্রকাশ করলো না। হালকা হাসি খেলল ঠোঁটে, যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু সেই হাসিটুকুই ধারার অস্বস্তিকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলো।
ড্রয়ারে কিছু একটা ঠিক করে রেখে শ্রাবণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাকালো ধারার দিকে। না চাইতেও ধারার চোখ চলে গেলো আকর্ষণীয় বুকটায়। শার্টের আড়ালে বুকটা ঢেকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা। বোতাম খোলা থাকায় সব দেখতে পাচ্ছে ধারা। কি জানি কি হলো মেয়েটার! স্থান-কাল-পাত্র সব ভুলে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু শ্রাবণও ধারার দিকে তাকিয়ে থাকায় একটা সময় চোখে চোখ পড়ে গেলো। তৎক্ষনাৎ ভয় পেলো ধারা। সহসা চোখ নামিয়ে নিল। বাঁকা হাসলো শ্রাবণ। আজ তার কেনো যেন একটু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটাকে জ্বালাতে মন চাইছে। সে সোজাসাপটা জিজ্ঞেস করে বসল,
—” কী দেখছো? ”
কেঁপে উঠলো ধারা। ঠোঁট ভিজিয়ে জবাব দিল,
—” ক..কই! কিছু না!”
ঠোঁট কাঁমড়ে ভ্রু উঁচিয়ে বেশ অনুনয় করার ভঙ্গিতে শ্রাবণ আবারো বলল,
—” কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে, তুমি আসলেই কিছু একটা দেখছিলে! ”
—” মোটেই না। কিছু দেখছিলাম না!”
একটুও জোর নেই ধারার গলায়। অথচ প্রাণপণ চেষ্টা করছে গলায় তেজ আনার। মেয়েটার জুবুথুবু অবস্থা দেখে শ্রাবণের হাসি পেলো, তবুও হাসলো না।
শ্রাবণ বেশ নিষ্পাপ অভিব্যক্তি নিয়ে নিজের বোতাম খোলা শার্টটা খুলে ফেলতে শুরু করল। আর খুলতে খুলতেই এগিয়ে আসতে থাকলো ধারার দিকে। বেশ সন্দিহান দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” উহু! মিসেস শেখ, ভুলে যাবেন না! এতদিনে অন্তত আপনার চোখের ভাষা আমি পড়তে শিখে গেছি। সো, আই থিংক, সামথিং ইজ রং! আর ইউ ওকে? কী দেখছিলে ওভাবে? ডু ইউ ওয়ান্ট সামথিং? ”
অসস্তিতে লজ্জায় কান্না পেলো ধারার। ধূর! লোকাটকে ভালোবাসার কথা জানানো উচিতই হয়নি। কেমন যেন হুট করে বদলে গেলো! তবুও তেজ না কমিয়ে যথাসম্ভব জোর দিয়ে বলল,
—” কীসের ওয়ান্ট ফোয়ান্ট? কোনো কিছু চাইনা আমি। দূরে সরুন! যেতে দিন আমাকে!”
কাঁপা কাঁপা গলায় কথা গুলো বলে পালানোর পথ খুঁজলো ধারা। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। কিন্তু ইতোমধ্যে শ্রাবণ শেখ কোনো কথা শোনেনি। সে তো তার পরনের সাদা শার্ট টা খুলে ছুঁড়ে মারল বিছানায়। আর এগিয়ে এসে এক হাতে ধারার কোঁমড় জড়িয়ে ধরে এক টান মেরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। চোখ খিঁচে বন্ধ করল ধারা। অনূভব করলো শ্রাবণ ঠান্ডা হাতটা গলিয়ে আঁকড়ে ধরেছে কোঁমড়। ধারার চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করা দেখে মুচকি হাসলো শ্রাবণ। একটুখানি ঝুঁকে ফু দিলো মেয়েটার সারা মুখে।
ধারা এবার একটু একটু করে চোখ খুলল। কিন্তু চোখ খুলতেই থমকে গেলো। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের বুকের দিকে। একদম লোকটার চওড়া বুকের কাছটাতেই চেপকে গেছে ধারা। তার গুটিয়ে যাওয়া হাত দুটোও লোকটার উদাম শরীরে। অসস্তিতে সারা শরীর ছেয়ে গেলো এবার। শ্রাবণ আরেকটু ঝুঁকে ধারার কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
—” দূর থেকে দেখতে কষ্ট হচ্ছিল জানি। নাও, এখন মন ভরে কাছ থেকে দেখো তো! ইজেন্ট ইট মোর অ্যাট্রাকটিভ?”
ধারা কাতর নয়নে হরিণের মত তাকালো সদ্য গোসল করে আসা পুরুষটির দিকে। চুল থেকে এখনো টপটপ করে মুক্তোর মত পানি পড়ছে। সেটা বেশ লোভনীয় হলেও ধারার সময় নেই সেটা দেখার, সে বরং শ্রাবণের দুষ্টু হাসিটা দেখে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
—” আপনি ইচ্ছে করে এমন করছেন, তাই না?”
শ্রাবণও শিশুদের মত সরল ভঙ্গিতে স্বীকার করে মাথা উপর-নিচ নেড়ে বলল,
—” জ্বি, মিসেস শেখ!”
—” কেনো?”
ধারার কথা শুনে যে কেও মায়ায় গলে গিয়ে আদর করতে চাইবে। তবে শ্রাবণ এখন দুষ্টুমিতে মত্ত। সে আরো বেশি কাতর কন্ঠে বলল,
—” তুমি যে এত বোকা জানতাম না। তোমায় জ্বালাতে ভালো লাগছে।”
ধারার এবার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি এমন হাল হলো। কোনো মতে ঠোঁট ফুলিয়ে সে মোচড়ামুচড়ি করতে শুরু করল,
—” ছেড়ে দিন! আমার কান্না পাচ্ছে! ”
শ্রাবণের হাসি ধপ করেই নিভে গেলো। সে গভীর নয়নে তাকালো বৃষ্টির দীঘির ন্যায় ধারার চোখের দিকে। কাজল কালো চোখজোড়ায় বর্ষা নামছে। বেশি দেরি করলে বন্যা বইয়ে দিতে সময় নেবে না। তাই এবার ফোঁস করে শ্বাস ফেলল শ্রাবণ। হাতের বাঁধন টা খানিক আলগা করে অন্য হাত উঠিয়ে ধারার সামনে থাকা চুলগুলো কানের পেছনে আদুরে ভঙ্গিতে গুঁজে দিল। শ্রাবণের মুখের অভিব্যক্তি আগের মত হয়েছে। এইতো! ইনিই তো শ্রাবণ শেখ! গম্ভীর অভিব্যক্তি নিয়ে থাকা মুখটা কত আকর্ষণীয় দেখলো ধারা। আর কান্না পেলো না। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। এতক্ষণ অসস্তি হচ্ছিল!
শ্রাবণ ধারার কানের কাছ থেকে চোখ সরিয়ে এবার চোখের দিকে চেয়ে রইলো। জ্বলজ্বল করা চোখদুটো পিটপিট করে তাকিয়েছে। শ্রাবণ গালে হাত ডুবিয়ে এগিয়ে এলো খানিকটা। বরাবরের মত উষ্ণ অথচ খুব আদরের সাথে কপালে চুমু এঁকে দিল নিজের প্রিয়তমার! সময় নিল বেশ। এরপর সরে এসে ধারার চোখের নিচে আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে বলল,
—” বোকা মেয়ে, আমি তোমার সাথে দুষ্টুমি করছিলাম। ভয় পেয়েছো?”
ধারা কিছু না বলে লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। শ্রাবণ আবারো মুচকি হাসলো। কোনো আগামবার্তা ছাড়াই নিজের মাথা দুদিকে সজোরে ঝাঁকালো, তৎক্ষনাৎ তার ভেজা চুলগুলো থেকে টপটপ করে পড়তে থাকা পানিগুলো ছিটকে ধারার মুখে আসলো। চোখ খিঁচে বন্ধ করল মেয়েটা। অজান্তেই শ্রাবণের বুকের কাছে থাকা হাতটাও মুঠো করলো, খাঁমচি লাগলো সুঠাম বুকে। ধারাকে চোখ বন্ধ করতে দেখে শ্রাবণ আবারো একই কাজ করল। এবারে আরো সংকুচিত হলো ধারা। ঠান্ডা পানির ছোঁয়া পেতেই সিড়সিড় করে উঠলো পুরো দেহ।
ঘরটা যেন হালকা দমবন্ধকর অবস্থায় হয়ে এলো। ধারা অস্থির হয়ে চোখ মেলতেই দেখল শ্রাবণের দুষ্টু হাসি এখনো খেলা করছে ঠোঁটে। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে তার গলায়, কাঁধ বেয়ে শার্টবিহীন বুকে। আর সেই পানি ছিটকে পড়েছে ধারার মুখে। ধারা ভিজে যাওয়া চোখদুটো ঘষতে চাইলো, কিন্তু পারলো না। বুকের কাছে থাকা হাতটা অজান্তেই আরও শক্ত করে চেপে ধরল শ্রাবণের শরীর। হায় আল্লাহ! লোকটা একদমই সিরিয়াস না! মনে মনে বিড়বিড় করল ধারা। ঠোঁট ফুলিয়ে গলায় কাঁপা স্বরে বলল,
—” এসব কী! ইচ্ছে করে জ্বালাচ্ছেন! আপনি ভীষন খারাপ হয়ে যাচ্ছেন, শেখ সাহেব !”
শ্রাবণ এবার আর হাসলো না। ধীরে ধীরে ভ্রু নামিয়ে কোমল দৃষ্টিতে তাকাল প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে। কণ্ঠটা ভারী, অথচ উষ্ণতা নিয়ে বলল,
—” বাহ! ডাকটা সুন্দর তো! আরেকবার ডাকো দেখি!”
ধারা মুখ ফঁসকে শ্রাবণ কে নিজের মত করে ডেকে ফেলেছে। বিষয়টা বুঝে আসতেই আমতা আমতা শুরু করল মেয়েটা। শ্রাবণ হাসলো,
—” আচ্ছা, ঠিক আছে। আর দুষ্টুমি করব না।”
এবার সত্যিই কোঁমড়ে থাকা হাতটা পুরো আলগা করে দিলো। ধারা হঠাৎ করেই মুক্তি পেয়ে খানিকটা পেছনে সরলো। কিন্তু নিজের কাঁপুনি, ভেজা মুখ, আর এলোমেলো অবস্থা লুকোতে গিয়ে আরো বেশি অগোছালো হয়ে গেল। শ্রাবণ মৃদু হেসে তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে বিছানায় বসে পড়লো। এক দৃষ্টিতে দেখল ধারার বিহ্বল চেহারা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব নিচু স্বরে বলল,
—” হঠাৎ করে উপলব্ধি করলাম, তুমি আমার বউ। হুট করেই মনে পড়লো, আমার বউ আছে। তাই দুষ্টুমি করেছি।”
ভ্রু কুঁচকালো ধারা। ভাবলো প্রশ্ন করবেনা। কিন্তু মনের খচখচানিটা রয়েই যাবে। তাই মিনমিন করে বলে উঠলো,
—” কেনো? এতদিন মনে ছিল না? ”
শ্রাবণ দুদিকে সরল ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলে,
—” এতদিন তো “ভালোবাসি” বলোনি!”
লজ্জায় কুন্ঠিত হলো ধারা। ঠোঁট কাঁমড়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। ইশ! ওই সময় আবেগে বলে ফেলেছিল সে। কিন্তু এখন তো হুঁশে আছে। এসব এখন সামাল দেবে কীভাবে! হুট করেই শ্রাবণ একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে নেশালো কন্ঠে বলে উঠলো,
—” তোমায় এভাবে দেখতে আমার ভালো লাগে।”
ধারা তোতলাতে লাগলো। তবে জানতে ইচ্ছে করল বিস্তারিত ভাবে। তাই চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” কীভাবে?’
শ্রাবণ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো। তারপর একটু ভেবে বলল,
—” এইযে, এভাবে। লাজুকলতার মত গুটিয়ে গিয়ে যেভাবে টমেটোর মত লাল হও, বড় বড় ভেজা পাঁপড়ি গুলো ঝাপটিয়ে যেভাবে তাকাও, যেভাবে তোমার ঠোঁটদুটো কাঁপে, যেভাবে একটা পালাই পালাই ভাব ধরো, ঠিক সেভাবেই!”
ধারার গাল টকটকে লাল হয়ে গেলো। বুকের ধড়ফড় বাড়লো দ্বিগুণ। নিজের মুঠো ধরা হাতটা আস্তে আস্তে আলগা করে নিলো, যেন কেউ না দেখে ফেলে তার দুর্বলতা।
ধারা এবার প্রস্থান নিতে চাইলো। এক পা বাড়িয়ে দিলে যাওয়ার আগেই শ্রাবণ ধারার কোমল হাতটা আলতো করে চেপে ধরলো, থামিয়ে দিল। ভেজা দৃষ্টি গাঢ় হয়ে উঠল।
—” আমার ভেজা চুলগুলো একটু মুছে দেবে?”
নিঃসংকোচে আকুল আবেদন! এ আবেদন কি ফিরিয়ে দেয়া যায়? তাও যদি তা হয় প্রিয় পুরুষের! এতদিনে অন্তত ধারা এটা বুঝেছে, সে শ্রাবণ শেখকে অসম্ভব ভালোবেসে ফেলেছে। শুধু লজ্জায় এগোতে পারছেনা। তবে খুব করে চাইছে শ্রাবণকে একটু ভালোবাসতে। একটু ভালোবাসার আবেদনও করতে। তাই প্রিয় পুরুষের আবেদনটা তাকে গলিয়ে দিল।
মিনমিন করে বিছানার কাছে আসলো ধারা। শ্রাবণ বিছানায় সোজা হয়ে বসে তোয়ালে টা ধারার হাতে দিল। ধারা কাঁপা হাতে তোয়ালেটা নিলো। ভেতরে ভেতরে বুকটা ধপধপ করছে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে নাকি শ্রাবণের ভেজা দৃষ্টির চাপ, বুঝতেই পারছে না। তোয়ালেটা দু’ভাঁজ করে ধীরে ধীরে আরেকটু এগিয়ে গেলো শ্রাবণের কাছে।
শ্রাবণ চোখ নামাল না। স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো শুধু ধারার মুখের দিকে। ধারা তোয়ালে তুলতেই হাত কেঁপে গেলো। প্রথমে মুছতে শুরু করলো কপালের পাশ থেকে। চুলে আঙুল ছোঁয়াচ্ছে না, কেবল তোয়ালে দিয়ে পানি মুছছে। কিন্তু তাতেই মনে হচ্ছে আঙুলের স্পর্শ খেলে গেলো শরীরে। শ্রাবণ চোখ বন্ধ করে দিলো। গভীর নিঃশ্বাস নিলো যেন সেই স্পর্শটুকু পুরোটা উপভোগ করতে পারে। তার নীরবতাই ধারাকে আরও অস্থির করে তুলল। বুকের ভেতরে একটা অচেনা আলোড়ন, আবার লজ্জার ছটফটানিও কম নয়।
হঠাৎ শ্রাবণ মৃদুস্বরে বলল,
—” একটু ভালো করে মুছে দাও না ধারা, যেন তোমার হাতের ছোঁয়া টের পাই…!”
ধারা থমকে গেলো। বুক কেঁপে উঠলো প্রবল লজ্জায়। তোয়ালেটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো, কিন্তু তবুও আস্তে আস্তে চুলগুলো মুছতে লাগল। মাঝে মাঝে আঙুলও ছুঁয়ে যাচ্ছে ভিজে চুলে। সেই ছোঁয়ায় অজান্তেই গা শিউরে উঠছে দুজনেরই।
শ্রাবণ এবার চোখ খুলে তাকালো সোজা ধারার চোখের দিকে। কণ্ঠটা ভারী অথচ কেমন মায়াময় করে বলল,
—” তুমি ম্যাজিক জানো, ধারা?”
ধারা খানিক বিভ্রান্ত হয়ে ধীরে মাথা নাড়ালো,
—” উহু! ”
—” তবে কেনো মনে হচ্ছে, তুমি এত দূরে থেকেও আমার পুরো হৃদয়টাই ছুঁয়ে দিচ্ছো।”
ধারার নিঃশ্বাস আটকে এলো। এক ঝটকায় চোখ নামিয়ে ফেললো। ঠোঁট কাঁপতে লাগলো, কিন্তু কোনো কথা বের হলো না। শ্রাবণ ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে নিয়ে তোয়ালেটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো। তারপর নরম স্বরে বলল,
—” ঠিক আছে, থাক। বাকিটা আমিই করছি। নাহলে লজ্জায় তুমি হয়তো পালিয়ে যাবে।”
ধারা আরও একবার লাল হয়ে গেলো। চুপচাপ বিছানার কোণায় বসে পড়লো। এতটা কাছে আসা কি ঠিক হলো? কিন্তু এই মানুষটাকে ভালো না বেসে থাকা যায় কীভাবে? শ্রাবণ বসা থেকে উঠে গেলে হুট করে ডেকে উঠলো ধারা,
—” শুনুন! ”
ঘাড় ফিরিয়ে পিছে তাকালো শ্রাবণ,
—” বলুন, মিসেস শেখ!”
ঠোঁট ভেজালো ধারা। সে এখনো বিষয়টা নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছে। খুব আতঙ্কিত মুখ নিয়ে সে মিনমিন করে বলল,
—” ওই সময় বারান্দায় কি আপনিই ছিলেন?”
দুহাত বুকে গুঁজে নিল শ্রাবণ। ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,
—” তোমার কী মনে হয়?”
ধারা এবার খানিক সময় ভেবে বলল,
—” আপনি তো দরজা থেকে পরে এলেন! তাহলে ওটা কীভাবে আপনি হন? আর হ্যালুসিনেশান হলে আপনি জানলেন কীভাবে?”
বাঁকা হাসলো শ্রাবণ। এগিয়ে এসে আদুরে ভঙ্গিতে ধারার মাথায় হাত বুলালো। চুলোগুলো এলোমেলো করে দিয়ে আবার গুছিয়ে দিল। একটা উষ্ণ চুমু খেলো চুলের মাঝে। গালে হাত রেখে বলল,
—” কিছু কিছু জিনিস রহস্যই থাক বরং! আমি বাবার সাথে দেখা করে আসছি হুম?”
বলেই মিষ্টি হেসে প্রস্থান নিল শ্রাবণ। ঘর থেকে চলে গেলো সে। কিন্তু ঠোঁট উল্টিয়ে তাকিয়ে রইলো ধারা। বিষয়টা বুঝতে পারলো না। তবে অনেকটা সময় ভাবার পর তার মনে পড়লো, ওই সময় মোটেই ফুলের টব টা তার হাতে লেগে ভাঙেনি। কেও ইচ্ছে করে ফুলের টব টা ভেঙেছে।
সামিউল শেখ থমথমে মুখ নিয়ে বসে আছেন। চোখেমুখে আঁধার নেমেছে। শ্রাবণ সাদারঙা শার্টটা পড়তে পড়তে বাবার ঘরে ঢুকলো৷ কিন্তু ভদ্রলোকের এমন অভিব্যক্তি দেখে শ্রাবণেরও কপাল কুঁচকে গেলো। সে এগিয়ে এসে বিছানায় বসলো।
—” বাবা! ডেকেছিলে আমায়?”
শ্রাবণের ডাকে হুঁশ ফিরে আসে সামিউল শেখের। সে এবার একটু নড়েচড়ে বসে সোজা হলেন, বেশ চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
—” মুনিরা নামে চেনো কাওকে? তোমার পিএ ছিল নাকি?”
শ্রাবণ অবাক হলো। একটু সময় নিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ বাবা। পিএ আমার। কিন্তু কেনো?”
কাঁধ উঁচিয়ে চিন্তিত ভাব নিয়ে সামিউল শেখ মাথা নাড়ালেন। ভাবুক হয়ে বললেন,
—’ ওই মেয়ে টাকে নাকি গত দুদিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”
শ্রাবণ কপাল কুঁচকে বিস্মিত চোখে তাকাল বাবার দিকে।
—” কীভাবে? মানে! কোথায় গেছে ও? হঠাৎ করে এভাবে…আমি তো কিছু জানিনা!”
সামিউল শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কণ্ঠে ক্লান্তি আর অজানা ভয় মিশিয়ে বললেন,
—” অফিসের কেও প্রথমে বোঝেনি। মেয়েটা নাকি তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। তারপর থেকেই ওর কোনো খোঁজ নেই। পরিবারের লোকজন মানে ওর বাবা খুব দুশ্চিন্তায় আছে। থানায় অভিযোগও দিয়েছে। ”
শ্রাবণের বুকটা ধক করে উঠলো। হঠাৎ করেই যেন এক অজানা আশঙ্কা তার ভেতর ঢুকে পড়লো। কারন মুনিরা যে জিহানের সাথে রিলেশনে ছিল এটা সেও বেশ ভালো করে জানে৷ তবে জিহান থাকতে এমন অঘটন হলো কীভাবে? শ্রাবণ একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,
—” তুমি এসব জানলে কীভাবে?”
—” আজ বিকেলে ওর বাবার ফোন আসে। বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। তুমিই তো মেয়েটাকে অফিসে এনেছিলে পিএ হিসেবে, তাই প্রথমেই আমার সাথে যোগাযোগ করেছে।”
কিছুক্ষণ থেমে গম্ভীর স্বরে সামিউল শেখ আবার বললেন,
—” শ্রাবণ, আমি চাই তুমি এই বিষয়ে খোঁজ নাও। মুনিরা তোমার অধীনে কাজ করত, ওকে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আমাদের নাম যেন কোথাও খারাপভাবে জড়িয়ে না যায়। বুঝছো তো?”
শ্রাবণ নিঃশ্বাস টেনে নিলো। মুনিরার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া তাকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়ে গেলো। মাথার ভেতর নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো, কোথায় গেল মুনিরা? জিহানের সাথে দেখা করতে গিয়ে উধাও হবে কেনো? সত্যিই কি দেখা করতে গিয়ে উধাও, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে? প্রথমে জিহান কে খোঁজার সিদ্ধান্ত নিলো শ্রাবণ।
শ্রাবণ চিন্তিত মুখে ঘরে আসতেই বারান্দা থেকে দৌঁড়ে আসে ধারা। হাসিমুখে আসলেও শ্রাবণের নিভে যাওয়া মুখটা দেখে ভয় পেলো মেয়েটা। আতঙ্কিত চোখ নিয়ে বলল,
—” কী হয়েছে?”
শ্রাবণ তাকালো ধারার দিকে। অযথা দুশ্চিন্তা করতে দিতে চাইলো না। মিষ্টি হেসে বলল,
—” কিছু না! তুমি কি এই রাতে পানি দিলে ফুল গাছে?”
ধারা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালো। তারপর কিছু একটা মনে পড়তেই বলে উঠলো,
—” আপনি একটু সাদিক ভাইয়াকে কল দিবেন তো। আমি অনেকবার চাচার নাম্বারে কল করেছি। কিন্তু কল যাচ্ছেনা। ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে কনিকার জন্য। একটু খোঁজ নিন না!”
শ্রাবণ নিজেও একটু চিন্তিত হয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে এগিয়ে দিল ধারার কাছে। ধারাকেই কল করে খোঁজ নিতে বলল। ধারা মিষ্টি হেসে বলল,
—” আমি মায়ের ঘরে গিয়ে কথা বলছি। আপনি বিশ্রাম নিন। একটু পর খাবার রেডি করে ডেকে দেব!”
বলেই ঘর থেকে বের হয়ে গেলো ধারা। শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় শুয়ে পড়লো। জিহান আর মুনিরার বিষয়টা মোটেই স্বাভাবিক নয়। জিহান তাকে কেনো কিছু জানালো না? কী হয়েছে?শ্রাবণ যখন গ্রামে ছিল, তখনই কি এসব হয়েছে?
ধারা সিঁড়ির কাছে বসে পড়ে। ফোনটা হাতে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ছোট মায়ের নাম্বারেই আবারো কল দিল। আশ্চর্যজনক ভাবে এবার কল ঢুকলো। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর কল ধরার উচ্ছাসিত কন্ঠে বলে উঠলো,
—” হ্যালো ছোট মা, কেমন আছো? কনিকা কেমন আছে?”
কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা গ্রাম্য মহিলার কর্কশ কন্ঠ,
—” কোন ছেড়ি রে? কেডা কল করছো?”
ধারা একবার নাম্বারের দিকে বিভ্রান্তি নিয়ে তাকালো। নাম্বার তো ঠিকই আছে। এরপর আবারো ফোন কানে নিয়ে বলল,
—’ জ্বি, আমি ধারা। ছোট মা কোথায়? কনিকার চাচাতো বোন আমি!”
ওপাশে থাকা মহিলাটি এবার কেন যেন ক্ষেপে গেলেন। রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো,
—” ওরে! তাইলে তুই সেই ছেড়ি তাই না? হারামজাদি! বাপ-মায়েরেও খাইলি, এহন নিজের বোনডারেও খাইলি! অভাগী ছেড়ি একটা! তোরেই পিডাইয়া মাইরা ফালার দরকার!”
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৪
ধারার পুরো শরীর হিম হয়ে গেলো। কাঁপতে থাকলো পা জোড়া। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ধারা শূন্য চোখে তাকিয়ে রইলো অদূরে! কিছু বুঝলো না। কী বললো এই মহিলা! সে বোন টা কেও খেয়েছে মানে? কী হয়েছে কনিকার! কী হয়েছে! কিছুক্ষণের জন্য ব্রেন কাজ করলো না ধারার। একটু পর অনুভব করল চারপাশে অন্ধকার দেখছে সে। পৃথিবী আপনা-আপনি শূন্য হয়ে জোর গতিতে ঘুরতে শুরু করেছে। নিজেকে সামলাতে পারল না ধারা, অনিয়ন্ত্রিতভাবে শরীর ছেড়ে দিল।
