শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩১
অনামিকা তাহসিন রোজা
অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে কোনো কিছু ঘটে গেলে তা হয় অন্যরকম, তবে বিশেষ। সারাটা রাত প্রকৃতি দামামা বাজিয়েছে মেঘের গর্জনে। বর্ষণমুখর পরিবেশে পুরো রজনী ছিল সতেজ আর স্নিগ্ধ। তবে শুধু প্রকৃতিই নয়, প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে সারারাত প্রেমবিলাসে মত্ত ছিল শ্রাবণ ধারা। বিয়ের প্রায় অনেকটা সময় পর আর বাকি পাঁচটা দম্পতির মত বিশেষ রাত কাটিয়েছো দুজন। যদিও ছিল অপরিকল্পিত, কিন্তু ছিল কাঙ্খিত। শ্রাবণের একেকটা এলোমেলো স্পর্শে ধারাও হারিয়েছে। খুইয়েছে নিজেকে। প্রিয় পুরুষের কাছে বিসর্জন দিয়েছে নিজের দামী সত্ত্বা। নিজের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করেছে সাবলীলভাবে। হয়তো গত রাতে বৃষ্টি না হলে বা ধারা শাড়ি না পড়লে কাঙ্খিত কাজটা কয়েকদিন পরেই হতো। কিন্তু অনুকূল পরিবেশে প্রিয়তমার রূপে মোহিত হয়ে নেশায় ডুবে গিয়েছিল শ্রাবণ শেখ। নিজেকে সামলাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে সঁপে দিয়েছে নিজের ব্যাক্তিত্ব।
শেষ রাতে প্রকৃতির ভূমিকম্পের সাথে হৃদয়ের ভূমিকম্পও নিয়ন্ত্রনে এসেছে। শ্রাবণের হুঁশ ফেরার পর থেকে সে ভীষন চিন্তিত। অসস্তিবোধ করছেও ভীষণ ভাবে। এমন একটা সময়ে মেয়েটার উপর দিয়ে ঝড় তুলিয়ে দিল। গত রাতে যা হয়েছে তাতে কি আদৌও মত ছিল ওর। অনুমতি নিতেও তো ইচ্ছে করেনি শ্রাবণের। মেয়েটা ভীষন রকম জাদুকরী মায়া খাটিয়ে সর্বনাশ করেছিল শ্রাবণ শেখের। নইলে এমন মাতাল মোটেই হতো না। ধারার অবস্থা কেমন তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। মেয়েটা একদম গুটিসুটি মেরে শ্রাবণের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। একটাবারও স্বামীর দিকে চোখ তুলে তাকায় নি সে। প্রয়োজনবোধ আছে বলে মনে করেনি। তবে বুকের কাছে ভেজা অনুভব হতেই শ্রাবণ বুঝেছে মেয়েটা কাঁদছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ। দুহাতে আরেকটু আগলে নিল মেয়েটাকে। দুই শরীরকে আবৃত করে রাখা কম্বলটা আরো টেনে নিয়ে মুড়িয়ে নিজের কাছে গুটিয়ে নিল প্রিয়তমার শরীরটা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
চারিদিকে কোনো আলো নেই। অন্ধকারে পুরো পৃথিবী ঢেকে গেছে। বৃষ্টির তীব্র বর্ষণ কমলেও স্নিগ্ধতায় সিক্ত রেশটা এখনো বিদ্যমান। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, শব্দ শুনতে পাচ্ছে শ্রাবণ। তবে অন্ধকারে একবারো ধারাকে দেখেনি সে। ভালোবাসাবাসির পাগলামি টা শেষ করেই ধারার দেহখানা বুকে চেপে ধরে একটু ঘুমিয়েছিল শ্রাবণ। তাই জানেও না মেয়েটার কী অবস্থা। নিতান্তই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে বলে শ্রাবণ নিজেই মনে করে। তবে সেও নিরুপায়। কিছু করার নেই। সে তো নিজেও একজন পুরুষ। রাতের বৃষ্টিধারা অদৃশ্য এক মায়াজাল বুনে দিয়েছিল তার চারপাশে। হৃদয়ের মাঝে জমে থাকা না-বলা কথাগুলো বৃষ্টির ছন্দে ভেঙে পড়েছিল। তবে অজান্তেই শ্রাবণের চোখে যে আকাঙ্ক্ষার ঝড় ছিল, তা ধীরে ধীরে ধারার দৃষ্টিতেও প্রতিফলিত হয়েছিল। বৃষ্টির মৃদু আওয়াজ আর মোমের মতো ম্লান আলোতে তারা দুজন নীরব এক প্রতিশ্রুতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। শব্দহীন এক স্বীকারোক্তিতে, যা ছিল ভালোবাসার গভীরতম রূপ।
শ্রাবণের বুক ধকধক করছে অস্বস্তিতে। তার মন বারবার গত রাতের দিকে ফিরে যাচ্ছে। সেই অপ্রত্যাশিত মুহূর্তগুলোতে, যেখানে তাদের দূরত্ব হঠাৎ ভেঙে গিয়েছিল। সে জানে না, সেই আবেগপ্রবণ মুহূর্তগুলোতে ধারা কতটা প্রস্তুত ছিল। নিজের অস্থির হাতের কাছে, নিজের অজান্তেই কেমন দুর্বল হয়ে পড়েছিল সে। এখন তার ভয় হচ্ছে, সে কি তাকে কষ্ট দিয়েছে? নাকি ধারা নিজেই তার মতো অনুভব করেছে? ধারার নীরবতা তাকে আরও ব্যথিত করে তুলল। সে নিজের বাহু একটু শক্ত করে জড়িয়ে নিল। শ্রাবণের মনে হলো, বৃষ্টি যেমন রাতের অন্ধকারে অজান্তেই পৃথিবীকে ধুয়ে মসৃণ করে দেয়, তেমনি এই সম্পর্কটাকেও হয়তো আজ নতুন রূপ দিয়েছে। তবুও, ধারা কী অনুভব করছে, এই অনিশ্চয়তা তার বুকের ভার হয়ে রইল।
তাই এই গভীর অন্ধকারেই শ্রাবণ সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। মাথা একটু নামিয়ে দেখার চেষ্টা করল ধারার মুখখানা। খুব আলতো স্পর্শে ধারার গালে হাত বুলিয়ে ডেকে উঠলো আধোস্বরে,
—” ধারা…!”
শ্রাবণ ভেবেছিল ধারা ঘুমিয়েছে বা জেগে থাকলেও জবাব দিবে না। তবে শক্ত বুকে মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকা ধারা ওভাবে থেকেই মিনমিন করে সাড়া দেয়,
—” হু..!”
বুকে প্রশান্তির অন্যরকম হাওয়া বয়ে গেল শ্রাবণের। কাঁদো কাঁদো স্বরটা টের পেয়েছে সে। তবে ধারা যে ভুল বুঝবে এমন কিছু মনে হয়না। কারন শ্রাবণ একটু হলেও বুঝতে পেরেছে, রাতে যা হয়েছে তাতে ধারার সায় ছিল। আটকায় নি মেয়েটা বা অসস্তিবোধ করেনি তেমন। লজ্জা পেয়েছিল শুধু, যা অন্যরকম আকর্ষণীয়। শ্রাবণ এবার গায়ের কম্বলটা আরো ভালো করে জড়িয়ে ধারার কানের কাছে মুখ এনে আদুরে স্বরে জিজ্ঞেস করে,
—” খারাপ লাগছে সোনা? ওয়াশরুম যাবে? গোসল করিয়ে দিই ?”
সজোরে মাথা ঝাঁকিয়ে না’বোধক ইশারা করল ধারা। এখন সে উঠতে চায় না এই বুক থেকে। তাই আরো শক্ত করে দুহাতে চেপে ধরল শ্রাবণের পিঠ। বুকের কাছে রাখা মুখটা একটু সরিয়ে এগিয়ে এলো শ্রাবণের গলার কাছটায়। মিনমিন করে কাঁদো মুখ নিয়ে চোখ বন্ধ রেখেই বলে উঠলো,
—” আপনি ভীষন নিষ্ঠুর শেখ সাহেব। ”
হাসলো শ্রাবণ। শব্দহীন মুচকি হাসলো। শব্দ করে চুমু খেয়ে নিল ধারার কপালে। কপালে ঠোঁটটা রেখেই ভীষন আকুল স্বরে অভিযোগ জানালো,
—” ছলনাময়ী তুমি মেয়ে। নিষ্ঠুর হতে বাধ্য করেছো। ভীষন অন্যায় করেছো আমার সাথে। বেশ ছলচাতুরী করে খুন করলে আমায়। অথচ এখন আমায় নিষ্ঠুর বলছো!”
ধারার কোনো জবাব পাওয়া গেলো না। শ্রাবণ আরো দুটো চুমু খেলো ধারার কপালে। এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো গুছিয়ে দিল। হাত বুলোতে থাকলো মাথায়। এরপর নিজের পিঠে আঁকড়ে ধরে রাখা ধারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। ঠোঁটের কাছে এনে আদুরে স্পর্শ টা কব্জিতেও দিল। এরপর আঙুলে আঙুল গুঁজে দিয়ে ধরে রাখলো মিইয়ে যাওয়া কোমল হাতটা। চোখ বুঁজে ধীর স্বরে আবারো শ্রাবণ বলে উঠলো,
—” পৃথিবীর মায়া অত্যন্ত ভয়ংকর। আর এই ভয়ানক জিনিসটার উৎস, হলো ভালোবাসা। যা আরো বেশি রহস্যময়। আমরা ভালোবাসি না, মায়ায় পড়ি। সেই মায়ার টানে খুইয়ে দিই সবকিছু।”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ নীরব থেকে তার নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে চেষ্টা করল। বাইরে এখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, আর জানলার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা বাতাস ঘরের নিস্তব্ধতায় এক অদ্ভুত গভীরতা এনে দিচ্ছে। ধারা তার বুকে গুটিসুটি মেরে আছে, চোখ বন্ধ, তবু শ্রাবণ বুঝতে পারছে সে জেগেই আছে, কারন গভীর শ্বাসটা উন্মুক্ত বুকে টের পাচ্ছে সে। নরম স্বরে শ্রাবণ আরো বলল,
—” যেদিন তোমায় প্রথম দেখলাম, সেদিনও ভাবিনি এই মেয়েকে বউ মানব। কখনো কল্পনা করিনি তোমার মায়ায় পেঁচিয়ে যাব। ভালোবাসা কেমন যেন ধীরে ধীরে আসে। ভীষন ধীরে। সময় নিয়ে জালের মত বুনে আসে। প্রথমে সেটা চেনা যায় না। হয়তো একদিন কোনো অভিমানী চোখের চাহনিতে হঠাৎ বুকটা কেঁপে ওঠে। তখনও বোঝা যায় না এটা কী। আমি তোমার দিকে তাকালেই প্রথমে বিরক্ত হতাম, আবার অজান্তেই খুঁজে বেড়াতাম তোমার উপস্থিতি। আমি নিজেও জানিনা কখন, কবে, কোথায়, কীভাবে, কেনো তোমায় ভালোবেসে ফেললাম। আমি জানিনা। শুধু এটুকু জানি, আমি তোমায় ছাড়া অচল হয়ে গেছি। বাঁচা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। দুর্বল হয়ে শেষ হয়ে গেলাম আমি। এ কি জাদু করলে? শ্রাবণ শেখকে বশ করে ফেলার অপরাধে তোমায় সারাজীবন কারাদণ্ড দেয়া উচিত মেয়ে। আর সেই কারাগার হবে আমার অতৃপ্ত হৃদয়!”
শ্রাবণ একটুখানি থামল, ধারার হাত মুঠোয় ধরে আঙুলগুলো আলতো করে ঘষল। চুমু খেলো হাতের আঙুলে। তারপর আবার বলল,
—” আমরা কেউই পরিকল্পনা করে ভালোবাসি না। মায়া এসে আমাদের সব হিসেব নষ্ট করে দেয়। তোমার প্রতি আমার এই টান, এটা কখন শুরু হলো, সেটাও আমি জানি না। হয়তো সেদিন, যেদিন তোমাকে কাঁদতে দেখেছিলাম, হয়তো যেদিন তোমায় নিয়ে ভাবলাম, যেদিন ঘুমন্ত অবস্থায় তোমায় দেখলাম। হয়তো বা তার অনেক আগেই। কিন্তু আমি জানি, গত রাতে যে ঝড় বয়ে গেল, সেটা শুধু বাইরে ছিল না, আমাদের মাঝেও ছিল। হয়তো সেটাই প্রকৃতির নকশা ছিল। আমার যে অনুভূতিটা এতদিন ধরে চেপে রেখেছিলাম, সেটা নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো। আমি কোনো স্বার্থের জন্য তোমাকে টেনে নিইনি, ধারা। আমি টেনেছি কারণ আমি তোমাকে ছাড়া নিজের পৃথিবী ভাবতে পারি না। আমি তোমায় ভালোবাসি হৃদয়হরণী। আসক্ত হয়েছি তোমার প্রণয়ে। নিজের বউকেই ভালোবেসেছি আমি। নিশ্চয়ই পাপ হবে না, তাই না?”
ধারা এবারো জবাব দিলো না। শুকনো ঢোক গিলল বোধহয়। নিশ্চল মিইয়ে যাওয়া শরীরটাও নড়ল না। ব্যাথায় জর্জরিত থাকা অবস্থাতেও ঠোঁট কাঁমড়ে কাঁপলো। কণ্ঠ আরও নরম হয়ে এলো শ্রাবণের। চোখের কোণে একটু আর্দ্রতা জমে উঠল।
—” গতরাতে আমি শুধু আমার অস্থিরতাকে মুক্তি দিয়েছি, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় সত্য হলো, তুমি আমার ধৈর্য, আমার কোমলতা, আমার ভয়ের জায়গা আর আশ্রয়। আমি ভয় পাই, তুমি ভুল বুঝবে। কিন্তু আমি জানি, এই অনুভূতিটা স্রেফ একটা মুহূর্তের উত্তাপ নয়। এটা সেই মায়া, যা আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের মধ্যে ঢুকে গেছে। আমি জানিনা তুমি কী ভাবছো। কিন্তু… তুমি যদি কখনো সন্দেহ করো, মনে রেখো, প্রকৃতি যেমন রাতের অন্ধকার শেষে ভোর এনে দেয়, তেমনই আমার ভেতরের সব অস্থিরতা শেষে যে ভালোবাসা রয়ে যায়, সেটা তোমার জন্যই।”
ধারা চোখ বন্ধ রেখেই নিঃশব্দে চোখের কোণ মুছল। শ্রাবণের কথাগুলো তার ভেতরের সব দ্বিধা নরম করে দিল। বাইরে বৃষ্টি ধীরে ধীরে থেমে এলো, কিন্তু তাদের মাঝে সেই নীরবতার মধ্যে গাঢ় এক উষ্ণতা থেকে গেল। শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝিয়েছে। যথাসম্ভব চেষ্টা করেছে বোঝানোর। এখন বাকিটা ধারা জানে। শ্রাবণ হাল ছেড়ে দিয়েই চোখ বুঁজে আরেকটু ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলো।
কিন্তু তখনি অদ্ভুত ভাবে শ্রাবণের বুক থেকে ধারা নিজেকে সরিয়ে আনলো, তবে দুরত্ব বাড়ালো না। বিড়াল ছানার মত মুখটা উঠিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকালো। শ্রাবণ অবাক হলো। ভ্রু কুঁচকালো। চাঁদ দেখেছে শ্রাবণ। চাঁদের কলঙ্কও দেখেছে। তবে কলঙ্ক হীন চাঁদ আজ প্রথম দেখলো বোধহয়। চকচক করছে ধারার চেহারা। অদ্ভুত আলোতে চারিদিকে জ্বলজ্বল করছে বোধহয়। তবে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করছে ধারার চোখ দুটো। কাজলের অস্তিত্ব এখনো আধো বিদ্যমান। শ্রাবণ ঢোক গিলল। সরাসরি এই চোখে তাকালেই সর্বনাশ। তাই ঠোঁট ভিজিয়ে সতর্ক করল রমণীকে,
—” এভাবে তাকিয়ে থেকো না, ধারা। দোহাই তোমার, এই নেশাভরা চোখ নিয়ে আমায় দেখবে না। নইলে ভীষন সর্বনাশ হবে। বারবার হবে। তোমার না হলেও আমার হবে। এই অন্যায় কোরো না। আমি পারবনা নিজেকে কষ্ট দিতে।”
ধারা চোখের পলক ফেলল। ঠোঁট চেপে আরেকটু জোরে চেপে ধরল শ্রাবণের বুক পিঠ। মানুষটার শক্ত শরীরটা জড়িয়ে ধরে চোখে চোখ রেখেই বলে উঠলো,
—” আপনি কিচ্ছু বোঝেন না! উঁহু, কিচ্ছু না। বোকা আপনি। ভীষন খারাপ আপনি। আমি আপনাকে একটুও পছন্দ করি না।”
ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ। পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে দেখলো ধারার মুখটা। বোঝার চেষ্টা করল কিছু। কিন্তু বুঝলো না। ধারা এবার জড়িয়ে ধরল শ্রাবণকে। এগিয়ে গিয়ে শ্রাবণের গলার কাছে মুখ গুঁজে দিয়ে বুকে মাথা রাখলো আবারো। শ্রাবণ চোখ খিঁচে বন্ধ করল। ধারার উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়ছে তার গলায়। এসব যন্ত্রনা নেয়া যাচ্ছে না। কেনো যে মেয়েটা বোঝেনা। ধারা এবার চোখ বুঁজে ফেলল। নিজেকে স্বামীর কাছে লুকিয়ে অবলীলায় স্বীকার করে বলেই বসলো,
—” আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি, শেখ সাহেব। পৃথিবীতে হয়তো এতটা কেও কাওকে ভালোাবাসেনি। আপনি আমায় বাঁচতে শিখিয়েছেন। ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। মায়ায় জড়াতে আপনিই শিখিয়েছেন। এখন যে ভীষন রকম ভালোবেসে ফেলেছি। চাচা-চাচি ছাড়া থাকতে পারি, বাবা-মা কে তো চোখেও দেখিনি সেভাবে। ভালোবাসা শিখব কীভাবে? কিন্তু আপনাকে তো পেয়েছি। এ জীবনে আপনি ছাড়া আর কে আছে বলুন? আর কেও নেই আমার। এখন আমায় নতুন ভাবে জীবন শিখিয়ে যদি ছলনাময়ী বলেন, তবে হ্যাঁ আমি ছলনাময়ী। আপনি নিষ্ঠুরতা দেখালে পাপ হবে না। তবে এই ছলনাময়ী কে ছুঁড়ে ফেলে দিলে ভীষনরকম পাপ হবে!”
শ্রাবণ স্তব্ধ হয়ে রইল। বুকের ঝড় তুলছে মেয়েটা। সে অনুভব করল, মেয়েটার কণ্ঠের কম্পন আর বুকের ধকধকানি, যা তার নিজের হৃদস্পন্দনের সাথে মিশে যাচ্ছে। বৃষ্টির গন্ধ এখনো জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে আছে, কিন্তু তার চেয়ে তীব্র ছিল এই স্বীকারোক্তির উষ্ণতা। শ্রাবণ ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে ধারার কপালে ঠোঁট রাখল। মৃদু এক শ্বাস নিয়ে সমস্ত অনুভূতি বহন করে নিলো। কিছু সময় চুপ থেকে, সে এক নিঃশ্বাসে সবকিছু উজাড় করে দিয়ে বলল,
—” তোমার অগোচরে, প্রতিদিন, প্রতিটি হাসিতে, প্রতিটি অভিমানী চোখে আমি ডুবে গিয়েছি। তোমার জীবনের পেছনে থাকা কষ্ট, তোমার নীরবতা, তোমার ছোট ছোট স্বপ্ন সবকিছুর সাথে মায়া জড়িয়েছে আমার। সেই মায়া আজ আমাকে বন্দী করেছে তোমার ভেতরেই। গতরাত যা ঘটেছে, সেটা কোনো আকস্মিক আবেগ ছিল না, তা ছিল আমার ভেতরের সব ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।”
হাত বাড়িয়ে ধারার চুল সরিয়ে দিল শ্রাবণ, আঙুলের ডগা আলতো করে তার গাল ছুঁয়ে বলল,
—”তুমি জানো, পৃথিবীর মায়া থেকে পালানো যায় না। কিন্তু আমি পালাতে চাইওনি। কারণ এই মায়ার মধ্যেই তোমাকে পেয়েছি। যদি কখনো তুমি আমাকে ভুল বুঝে যাও, বা মনে করো আমি তোমার প্রতি অন্যায় করেছি, জেনে রেখো, আমি কখনোই তোমার সুখের বাইরে কিছু ভাবিনি। তুমি আমার কাছে শুধু এক নারী নও, তুমি আমার সমস্ত শূন্যতার উত্তর।”
ধারা শুনলো। শ্রাবণের কণ্ঠ একেবারে গভীর হয়ে এলো,
—” আমার আর কিছু চাইবার নেই ধারা। আমি যদি তোমার জীবনের আশ্রয় হতে পারি, যদি তোমার ভালোবাসা পেয়ে আমার জীবন অর্থ পায়, তবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার কাছে কিছু নেই। আর কিচ্ছু চাই না। তুমি চাইলেও আর এই নিষ্ঠুর মানবের কাছ থেকে মুক্তি পাবে না ছলনাময়ী।”
ধারা চোখ বুঁজে সাথে সাথে জড়িয়ে ধরল শ্রাবণকে। শ্রাবণ আগলে নিল। মেয়েটার ছোট্ট দেহটা দুহাতে আগলে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল। চুলে মুখ ডুবিয়ে নেশালো ঘ্রানটা টেনে নিয়ে বড় শ্বাস নিলো। ধারা কাঁদছে। ভীষন কাঁদছে। শ্রাবণ জানে ধারা দুটো কারনে কাঁদছে। গতরাতের প্রভাবে আর তার ভালোবাসা প্রকাশের আনন্দে। তাই থামালো না। শুধু চুলে হাত বুলিয়ে বারবার বলতে থাকলো,
—” শশ..কাঁদে না সোনা। আমার বুকে তীরের মত বিঁধছে তোমার চোখের পানি। কেঁদো না প্লিজ। বেশি ব্যাথা করছে? আদর করছি তো। আদর করলে কষ্ট কমবে তোমার?”
ধারা মাথা নাড়ালো সজোরে, তবে হ্যাঁ সূচক উত্তরে। হুম কমবে। আদরে সব কষ্টই কমবে। শ্রাবণ নিজের বুক থেকে ধারার মাথাটা উঠালো৷ মুখটা দুহাতে মুঠোয় নিয়ে নিজের কাছে টেনে নিল। এরপর সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সারামুখে চুমু খেলো। গতরাতের মত চোখে, নাকে, থুতনিতে, ঠোঁটে, কানে, গালে চুমু খেলো সময় নিয়ে। এরপর থামলো শ্রাবণ। মুখ নামিয়ে চুমু খেলো ধারার গলায়। লাল তিলটায় ঠোঁট রেখে আদর করলো। এখন আর কোনো অসস্তি লাগছে না। ভালো লাগছে শ্রাবণের। নিজেকে সুখী মনে হচ্ছে। কোনো অপরাধবোধও কাজ করল না। বউকে আদর করে মন ভরিয়ে নিল। হয়তো ওই সময়ের থেকে এখন শেষ রাতটা আরো ভালো সময় পার করলো দুজনে। শুরু হলো নতুন জীবন, নতুন পথচলা, নতুন করে দাম্পত্য জীবন!
সালমা বেগম সকালে ফিরেছেন বাড়িতে। এসেই দেখেছেন সামিউল শেখ নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছে। তা দেখে তিনিও আগে এক ঘন্টা ঘুমিয়েছেন। এরপর শাড়ি পাল্টে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে ঢুকে পড়েছেন রান্নাঘরে। তবে তিনি চিন্তিত। ভীষন রকম সন্দিহান চোখ নিয়ে তিনি দুটো ঘরের দিকে তাকাচ্ছেন। শ্রাবণের ঘর আর নিজেদের ঘর। সামিউল শেখ এখনো ঘুমোচ্ছেন মানে দেরি করে বাড়িতে ফিরেছেন আর শ্রাবণের দরজা এখনো লক কেনো, তা নিয়ে চিন্তিত ভদ্রমহিলা। তার জানামতে তার হীরের টুকরো ছেলে সকাল ছটার মধ্যে উঠে পড়ে। এরপর জগিং করে এসে ড্রয়িং রুমে বসে থাকে। তবে আজ ব্যতিক্রম কেনো? ধারাও ঘুম থেকে উঠেনি এখনো? সালমা বেগম কিছুক্ষণ ভেবে পরে স্বাভাবিক ভাবেই নিলেন আর রান্নার কাজে ব্যস্ত হলেন।
ধারা যখন সকালের নরম আলোর আঁচ পেয়েছে তখন ঘুম থেকে উঠে নিজেকে এলোমেলো অবস্থায় দেখে লজ্জা পাওয়ার সাথে সাথে ভীষন কুন্ঠিত হয়েছে। ভাগ্যিস শ্রাবণ এখনো ঘুমোচ্ছে, যা দেখে সস্তির শ্বাস ফেলেছে বেচারি। তখনি মনে পড়ল শেষ রাতে করা পাগলামিগুলো। ইশ রে। কত কী বলে ফেলেছিল ওই মুহুর্তে। কোনো হুঁশই ছিল না সেই সময়। নইলে এসব কথা কি বলতে পারত?
ভীষন রকম লজ্জা পেয়ে ধারা শেষমেশ শ্রাবণের ঘুম ভাঙার আগেই ছুটে বাথরুমে চলে গেলো। তবে বাথরুমের আয়নায় চোখ রাখতেই চক্ষু চড়কগাছ হলো বেচারির। এ কি অবস্থা তার! গলা থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত! ছিঃ ছিঃ! এত দাগ হয়ে গেছে? এসব লুকোবে কীভাবে সে। ভীষন চিন্তিত হয়ে ঠোঁট চেপে ধরল ধারা। মুখ ধুতে গিয়ে টের পেলো ঠোঁটও কেটেছে। ইশ! লোকটা বড্ড অধৈর্য! কীভাবে কাঁমড় দিয়েছে মনে পড়তেই সারা শরীর শিউরে উঠলো ধারার। তখনি মনে পড়লো লোকটা সারাটা রাতই তাকে জড়িয়ে ছিল, ওই সময়ে চূড়ান্ত মুহুর্তে কতবার যে ভালোবাসি বলেছে! ধারার গাল লাল হয়ে উঠলো। কোনমতে গোসল করতে শুরু করল সে।
সামিউল শেখ ফ্রেশ হয়ে এসে নিচে নামলেন। সালমা বেগম ফিরেছে বুঝতেই তিনি গম্ভীর হয়ে সোফায় বসে পড়লেন। রান্নাঘরে স্ত্রীর দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে পেপার হাতে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—” কখন এসেছো?”
সালমা বেগম রেগে আছেন অল্প। তাই তিনিও গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন,
—” ভোরে।”
সামিউল শেখ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
—” সারারাত থাকবে তা তো জানাও নি। আমায় একবার জানানোর প্রয়োজনবোধ বলে মনে করোনি কেনো?”
সালমা বেগমও এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। হাতে থাকা বেলন টা শক্ত করে চেপে ধরে বললেন,
—” কেনো? তোমায় বলব কেনো? তুমি কিছু বলো আমায়?”
সামিউল শেখ চোখের চশমা ঠিক করে তাকালেন। ভীষন গুরুতর ভঙ্গিমায় বললেন,
—” আমি আবার কী করলাম?”
সালমা বেগম ভীষন রাগান্বিত অবস্থায় আছেন। তিনি শক্ত কন্ঠে জানালেন,
—” কী করেছো মানে? তুমি আমাকে রেখেই তো ঘুমিয়েছো! আবার সকালে কত দেরি করে উঠলে। তারমানে দাঁড়ায়, আমায় ছাড়া বেশ ভালোই গভীর ঘুম হয় তোমার। আমি তো বকবক করে জ্বালাই তোমায় তাই না?”
ব্যপারটা এবার পুরোপুরি বুঝলেন সামিউল শেখ। পেপারটা নামিয়ে স্ত্রীর দিকে চেয়ে রইলেন। ভ্রু কুঁচকানো মুখটা এক মুহূর্তের জন্য শান্ত হলো। তিনি হালকা নিঃশ্বাস ফেললেন, তারপর শান্ত স্বরে বললেন,
—” সালমা, তোমার কথাগুলো কষ্ট দিচ্ছে আমায়। তুমি কি ভাবো সত্যি সত্যিই তোমায় ছাড়া আমার ঘুম ভালো হয়? তুমি পাশে না থাকলে এই ঘর, এই সোফা, এমনকি আমার নিজের শ্বাসও অচেনা লাগে।”
সালমা বেগম বেলনটা এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন, কিন্তু তার চোখের কোণে হালকা জল চিকচিক করছে। এই বয়সে এসে হয়তো এসব মানায় না। তবে তিনিও ভীষন অভিমানী। একটুতেই বেশ কষ্ট পান।৷ তিনি ভেবেছেন সামিউল শেখ শান্তিতে ঘুমিয়েছেন। সামিউল শেখ গম্ভীর কিন্তু মোলায়েম কন্ঠে বললেন,
—” সারারাত জেগে ছিলাম বুঝেছো। ঘড়ি দেখে ভেবেছিলাম তুমি এসেই হয়তো একটু বিশ্রাম নেবে, বিরক্ত না করে চুপ করে ছিলাম। কিন্তু তুমি যে অভিমান করেছো, তা আমি বুঝতে পারিনি। আর আমি জানতাম না তুমি রাতে আসবে না। তোমার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে রাত হয়েছে বেশি। আর আমি ঘুমিয়ে পড়েছি! তোমার বকবক ছাড়া ঘুম আসলেও গভীর হয় না। ওটা না শুনলে আমার ঘুম ভাঙে না।”
সালমা বেগম চোখ সরিয়ে নিতে চাইলেন, কিন্তু ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি চাপা পড়ে গেল। অভিমানের আবরণ ভেঙে গেলো অল্পতেই। সামিউল শেখ এবার হেসে বললেন
—” আর রাগ করো না। এই বয়সে আর তোমার রাগ ভাঙানোর এনার্জি নেই। আজ বিকালে ফুচকা এনে খাওয়াতে পারি শুধু!”
সালমা বেগম ফিক করে হাসলেন। এবারে ভালো লাগছে তার। তখনি ড্রয়িং রুমে গুটিগুটি পায়ে পদচারণ করল ধারা। কলাপাতা রঙের শাড়ি পরিহিত ধারাকে দেখে মুহুর্তেই সবকিছু ভুলে গিয়ে হা হয়ে তাকালেন সালমা বেগম। হাতের সবকিছু ফেলে দিয়ে ছুটলেন বউমার দিকে। ধারা শুকনো ঢোক গিলে দাঁড়িয়ে থাকলো। সালমা বেগম এসেই ধারার থুতনি ধরে মাশা-আল্লাহ বললেন। এরপর খুশিমনে বললেন,
—” কি সুন্দর লাগছে রে তোকে! একদম পরির মত। আয়হায়! তুই একা একা শাড়ি পড়তে পারলি? আর হুট করে শাড়ি পড়লি কেনো মা?”
সামিউল শেখও কৌতুহলী চোখে তাকালেন বউমার দিকে। পরীর মত মেয়েটা কে দেখে তিনি আবেগে আপ্লুত হলেন। মিষ্টি সুরে বললেন,
—” বাহ, বউমা কে তো সুন্দর লাগছে সালমা। দেখেছো, কত বড় হয়ে গেছে ও।”
সালমা হাসলেন,
—” তাই তো দেখছি। হ্যাঁ রে, একা একা পড়লি কীভাবে?”
ধারা একবার শ্বশুর, আরেকবার শ্বাশুড়ির দিকে ভীত নয়নে তাকালো। দু একবার চোখের পলক ফেলে আমতা আমতা করে বলল,
—” ও..ওই আর কি। ইয়ে মানে…!”
এতক্ষণে ধারার ব্লাউজের দিকে চোখ গেলো সালমা বেগমের। তিনি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
—” কীরে ধারা? তুই আবার এত ছোট গলার ব্লাউজ পড়েছিস কেনো? গলা সহ ঢেকে গেছে। গরম লাগবে তো! আবার ফুলহাতাও পড়েছিস!”
সালমা বেগমের কথায় ধারার এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস আটকে গেল। লজ্জায় তার গাল দুটি লালচে হয়ে উঠল। গলার কাছে যেন কেউ হাত বুলিয়ে দিয়েছে এমন শিহরণ হলো। কেনো যে ফুলহাতা, আর গলা ঢাকা ব্লাউজ পড়েছে তা কি আর বলা যায়। কত কষ্ট করে ঠোঁটের কাছে থাকা লালচে দাগটা পাউডারের সাথে লুকিয়েছে সে।
সামিউল শেখ গলা খাঁকারি দিয়ে হালকা হাসলেন। ভাবলেন ছোট মানুষ ভুলে এমন কাপড় পড়েছে। সালমা বেগম এবার হাসি চেপে কপালে হালকা চাপড় দিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
—” আরে বাপু, আমি মজা করলাম। কেমন ঘাবড়ে গেলি দেখ তো! আয় সোফায় বোস, রুটি বানাচ্ছি। শ্রাবণ এখনো উঠেনি কেনো? আমার ছেলে তো এত দেরি করে উঠে না।”
ধারা শুকনো ঢোক গিলল। সামিউল শেখ বাঁকা হেসে বললেন,
—” হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার ছেলে তো হীরের টুকরো। অলসের হাড্ডি। সারারাত ফোন টিপেছে। আর এখন অফিস ফাঁকি দেয়ার জন্য এসব করছে বুঝলে।
ধারা সরল কন্ঠে বলে উঠলো,
—” আজ তো শুক্রবার বাবা।”
সামিউল শেখ মুখ কালো করে বউমার দিকে তাকালেন। কেনো যে তিনি জিততে পারেন না। সালমা বেগম ফিক করে হাসলেন। আর গর্বে বুক ফুলিয়ে বললেন,
—”সেটাই। আমার ছেলে নইলে মোটেই এমন আলসেমি করেনা হুহ। ইশ রে! বেচারা ছেলে টা আমার। সারা সপ্তাহ কী কষ্টটাই না করেছে।”
ধারা চুপচাপ সোফায় বসে মেকি হাসলো। সে আছে বড় ফ্যাসাদে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। না জানি কখন কী হয়ে যায়। এখন মনে হচ্ছে লোকটা কে ডেকে দিয়ে আসা উচিত ছিল। আরো কতক্ষন যে ঘুমোবে কে জানে। অবশ্য যেই সময়ে ঘুমোনোর কথা, সেই সময়ে বউকে ছাদ থেকে কোলে করে নিয়ে ঘরে এসে অশভ্যতা, দুষ্টুমি করলে তো এভাবেই অসময়ে ঘুমোতে হবে।
শ্রাবণের মাথায় রীতিমতো জেদ চেপেছে। সে ভীষন রকম ক্ষেপেছে বেচারি ধারার উপর। ঘুম থেকে উঠে পাশে ধারা কে না দেখে শ্রাবণের মন চাইছিল মেয়েটাকে কোলে তুলে আছাড় মেরে কোঁমড়ের দফারফা করতে। কিন্তু ধারার তো আগে থেকেই দফারফা হয়ে গেছে যা মনে পড়তেই ঘাড়ে হাত বুলিয়ে হাসলো শ্রাবণ। আশ্চর্য! তারও লজ্জা লাগছে। কি একটা অবস্থা। সবকিছু সামাল দিতে হবে বলে দেরি করল না শ্রাবণ। দ্রুত বাথরুমে গিয়ে গোসল সেড়ে নিল। আর আবিষ্কার করল, পুরো শরীরে পানি ঢালার সাথে সাথেই জ্বলছে। মেয়েটা একদম বিড়ালের মতোই নখের আঁচড় দিয়েছে। শ্রাবণের অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
সালমা বেগম সামিউল শেখ আর ধারাকে ডাইনিং এ বসতে বললেন। সামিউল পেপার গুছিয়ে চেয়ারে বসলেন। ধারাও মিনমিন করে ধীর পায়ে হেঁটে দাঁড়ালো সালমা বেগমের পাশে। সালমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
—” কীরে বোস! বসলি না কেনো?”
ধারা এবার ঠোঁট ভিজিয়ে মিহি সুরে বলল,
—” আমি আপনার সাথে বসব মা।”
সালমা বেগম হাসলেন। ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
—” আমার সাথে খাবি?”
—” হুম।”
—” আমি তো অনেক দেরিতে খাব রে মা। আগে বাপ-ছেলে কে খাবার বেড়ে দেব। ওদের খাওয়ার পর্ব শেষ করে খাব।”
ধারা মাথা এলিয়ে বলল,
—’ আমিও আপনার সাথে দাঁড়িয়ে খাবার বেড়ে দিই। তারপর আমরা একসাথে খাব।”
সালমা বেগম সন্তুষ্ট হলেন। মেয়েটার মানসিকতা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলেন না। এইতো ধীরে ধীরে একদম পরিপূর্ণ নারী হয়ে যাচ্ছে ধারা। পরিবেশ, বাস্তবতা, বুঝতে শিখেছে। একটা প্রাপ্তবয়স্ক ভাবটাও এসেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি এবার শ্রাবণের প্লেটটাও রাখলেন।
তখনি সিঁড়ি ভেঙে নামতে দেখা গেলো শ্রাবণকে। মেরুন রঙের টি শার্ট পড়ে ভেজা চুল হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে নিচে নেমে এলো শ্রাবণ। এসেই সালমা বেগম আর সামিউল শেখকে সালাম দিয়ে বসে পড়ল নির্ধারিত জায়গায় বাবার মুখোমুখি। ধারা তৎক্ষনাৎ মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ালো। সারা শরীরে বিদ্যুৎ চলছে। লজ্জা লাগছে প্রচুর। একবার আড়চোখে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণও একই সময়ে আঁড়চোখে তাকিয়েছে। ফলস্বরূপ চোখাচোখি হয়ে গেলো। ধারা আরো ভয় পেলো। শুকনো ঢোক গিলে সালমা বেগমের পেছনে দাঁড়িয়ে আঁচল খুটতে থাকলো। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে ধারার গতিবিধি লক্ষ্য করলো। মেয়েটার মধ্যে এখনো এত সংকোচ কীসের! তবে শাড়িতে ভীষণ সুন্দর লাগছে। সে এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্লেটে হাত রাখলো।
সামিউল শেখ এবার কিছু একটা মনে করে বলে উঠলেন,
—” আচ্ছা শ্রাবণ, কাল কখন ঘুমিয়েছিস তুই?”
সাথে সাথে হাত পা সব ঠান্ডা হলো শ্রাবণের। ধারাও চোখ বড় করে তাকালো। শ্রাবণ ঠোঁট ভেজালো। কিছু বলার আগেই সালমা বেগম তেঁতে উঠে বললেন,
—” আশ্চর্য! তুমি আবার কেনো এই কথা জিজ্ঞেস করছো? ”
সামিউল শেখ চোখ বুঁজে মাথা নেড়ে বললেন,
—” আহহা, বিষয়টা তা না। আসলে গত রাতে আমি যখন বাড়িতে ফিরলাম৷ তখন এতবার কলিং বেল বাজালাম, অথচ কেওই দরজা খুলল না। বউমা না হয় ঘুমিয়েছিল, কিন্তু শ্রাবণ এত তাড়াতাড়িও তো ঘুমায় না, তাই জানতে চাইলাম। শেষে ডুপ্লিকেট চাবি ইউজ করে বাড়িতে ঢুকেছি।”
ধারা এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে আরেকটু লুকোলো সালমা বেগমের পেছনে। শ্রাবণ গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখনি সম্মানের দফারফা হতো। কিন্তু ভাগ্যে দফারফা হওয়া থাকলে তো কেও তা খন্ডাতে পারবেনা। বেচারা শ্রাবণের সাথেও তাই হলো। সালমা বেগম সামিউল শেখের প্লেটে রুটি দিয়ে শ্রাবণের কাছে এসে প্লেটে রুটি দিতে গিয়ে চোখ গেলো শ্রাবণের ঘাড়ের দিকে। সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন সালমা বেগম,
—” কী রে শ্রাবণ! ঘাড়ে এটা কীসের দাগ? কিছু কাঁমড়েছে নাকি। একদম লাল হয়ে গেছে।”
গরম গরম রুটিটার এক টুকরো শ্রাবণ কেবলই মুখে নিয়েছিল। সালমা বেগমের কথা শুনে মুখ থেকে রুটিটা পড়েও গেলো তার। হয়ে গেলো! খাওয়া আর হলো না। তবে এক্ষেত্রে ধারা ভীষন সরল। প্রথমে কিছু বুঝলো না। চিন্তিত হয়ে তাকালো। সামিউল শেখও বুৃঝলেন না। শ্রাবণ ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
—” ওই..গত রাতে ছাদে গেছিলাম তো। বৃষ্টিতে কত পোকামাকড় বের হয়। হয়তো কোনো পোকাই কাঁমড়েছে!”
বলতে বলতেই ঘাড়ে হাত বুলালো শ্রাবণ। গলার দাগটা লুকোনোর বৃথা চেষ্টা।
সামিউল শেখের দৃষ্টি এবার তীক্ষ্ণ হলো। তিনি গত রাতের কথা ভাবলেন। তিনি যখন এসেছেন, তখনও শ্রাবণের ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। রাতের খাবারও নষ্ট হয়েছে। ছাদে তো যাওয়ার কথা নয়। তবে কী? অভিজ্ঞ সামিউল শেখ চট করে আন্দাজ করলেন কিছু। ভ্রু কুঁচকে চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করলেন,
—” তাই নাকি? পোকা কাঁমড়েছে? কত বড় পোকা ছিল বাপ?”
বলতে বলতেই ধারার দিকে একবার তাকালেন সামিউল শেখ। শ্রাবণ সন্দিহান হয়ে তাকালো বাবার দিকে। সামিউল শেখের দৃষ্টি দেখে কিছু একটা বুঝলো শ্রাবণ। তাই মাথা নামিয়ে রুটির এক টুকরো আবার খেয়ে নিল। বাপের সাথে বাটপারির কথা বলবে না সে। ধারার এবার মনে পড়লো বিষয়টা। চোখ বড় করে শুকনো ঢোক গিলে ফেলল সে। এ কি সাংঘাতিক পরিস্থিতি! এমন হবে জানলে সে কখনোই গত রাতে শাড়িই পড়ত না।
এদিকে সালমা বেগম সত্যিই চিন্তিত। এভাবে হীরের টুকরোর ছেলের ঘাড়ে পোকা কাঁমড়ালো। বিষয়টা তো চিন্তার। তিনি এবার ঠোঁট কাঁমড়ে ধারার দিকে তাকালেন। বেচারি ধারা ভীষন ঘাবড়ে ছিল। সালমা বেগম হুট করে তাকাতেই সে খুব চমকে গেলো। আঁতকে উঠে মুখ ফঁসকে বলেই ফেলল,
—” না না, মা। বিশ্বাস করুন, আমি উনাকে কাঁমড় দিইনি। খাঁমচির দাগও আমি দিইনি সত্যি।”
এতক্ষণ অন্তত বেঁচে ছিল শ্রাবণ। এবারে মরার উপক্রম হলো। এ পর্যায়ে পুরো ডাইনিং টেবিল কাঁপিয়ে তুলে সামিউল শেখ আর শ্রাবণ শেখ অর্থাৎ বাপ ছেলে একসাথে বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করলো। সামিউল শেখ কাশতে কাশতে বেকায়দায় পড়ে বুঝলেন তিনি কম বয়সী বউমা এনে কেমন ভুল করেছেন। তাই পালাতে তিনি তাড়াহুড়ো করে বললেন,
—” সালমা আমি স্কুলে গেলাম। দেরি হয়ে যাচ্ছে! ”
সালমা বেগম থমকে তাকিয়ে আছেন। স্বামীর কথা শুনে পাথরের মত বললেন,
—” তুমি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক! ”
সামিউল শেখ দাঁড়াতে গিয়েও বসে পড়লেন। ও হ্যাঁ, তার তো স্কুলে যেতে হবেনা। তিনি তো অবসর নিয়েছেন। বেচারা শ্রাবণও হুঁশ হারিয়ে একই পদ্ধতি অবলম্বন করল। তাড়াহুড়ো করে আমতা আমতা করে বলল,
—” মা, আমারো দেরি হচ্ছে। অফিসে গেলাম!”
সালমা বেগম প্রথমবার নিজের ছেলের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। দাঁত খিঁচিয়ে বললেন,
—” আজকে শুক্রবার, হাদারাম!”
শ্রাবণও অসহায় মুখে বসে পড়লো আবার। এ পর্যায়ে বাবা ছেলে একে অপরের দিকে অসহায় মুখে তাকালো। বেচারি ধারা কেঁদে ফেলবে এমন অবস্থা। সে সবার দিকে একবার করে তাকালো। সে কি ভুল কিছু বলেছে? না তো! সে তো সব বলেনি। সালমা বেগম কাতর চোখে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের দিকে তাকালেন। সামিউল শেখ নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙালেন, বিড়বিড় করে বললেন,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩০
—” বেয়াদব ছেলে!”
বেচারা শ্রাবণ শুনলো বাপের গালি, অসহায় মুখে তাকালো বউয়ের দিকে। ঠোঁট চেপে তাকিয়েই রইলো। মেয়েটা তাকে এভাবে বেকায়দায় ফেলল। শেষমেশ আকামের কথা বাপ-মার সামনে বলে দিল। শ্রাবণ মনে মনে আবিষ্কার করল ধারার মুখে স্কচটেপ মেরে রেখে দেয়া অতি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
