শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৫
অনামিকা তাহসিন রোজা
জিহানের কথাই সত্যি হলো। সেই ভার্সিটির পাশের গোডাউনে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেলো নিথর হয়ে থাকা মুনিরাকে। শ্রাবণ কোনোরকম ঝুঁকি
নিতে চায়নি। তাই পুলিশ সাথে করেই এনেছিল। তবুও একটু ভুল হয়েই গেলো। তানভীর না থাকলেও গোডাউনের ভেতরে দুজন ছিল। পুলিশের সামনেই শ্রাবণ আর জিহান থাকায় তাদের উপরে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে ছেলে দুটো। এতে কাঠের তক্তা দ্বারা শ্রাবণ কপালে একটুখানি আঘাত পেয়েছে আর জিহানও পিঠে আঘাত পেয়েছে। বড় কিছু হয়নি। সেই ছেলেদুটোকে পুলিশের গাড়িতে উঠিয়েছে তারা।
জিহান পাগলের মত ছুটে গিয়ে মুনিরার হাতে পায়ে বাঁধা দঁড়ি খুলে দিয়ে সজোরে জাপ্টে ধরলো। এতদিন পর প্রাণভোমরা কে ফিরে পেয়ে সস্থির শ্বাস ফেলল। তার মাথায় আর অন্য কোনো ভাবনা নেই। কিন্তু শ্রাবণের মাথায় সেই ভাবনা আসলো। তাই পুলিশকে ইশারা করে জিহানসহ মুনিরাকে দ্রুত হসপিটালে পাঠিয়ে দিল। বলা তো যায়না, মুনিরা কে ওরা কেমন অত্যাচার করেছে!
পুলিশরা বেশ ভালো করে তদন্ত করলো পুরো জায়গাটা। সবাই জানে যে তানভীরই আসলো কালপ্রিট। কিন্তু প্রমাণের অভাবে কিছু করতে পারছেনা। কারন ছোট হলেও একটা প্রমাণ লাগব যে তানভীর করেছে। শেষে শ্রাবণের মতামত নিয়েই পুলিশেরা সিদ্ধান্ত নিলো যে ওই ছেলে দুটোকে দিয়েই সাক্ষী দেওয়াবে। ব্যস! এখানেই জিহান আর মুনিরার ঝামেলা শেষ হলো আর শ্রাবণও সস্থির শ্বাস ফেলল।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এই পৃথিবীতে প্রত্যেক টা জিনিসেরই পজিটিভ ও নেগেটিভ দুই দিকই রয়েছে। বলা হয়, সৃষ্টির আদিকাল থেকে পুরুষেরা পৃথিবী জয় করে। কিন্তু কোথাও ঘটা করে এটা লেখা থাকে না যে, পুরুষেরাও কোনো কোনো সময় জানোয়ারের রূপ ধারন করে অমানুষের পরিচয় দিয়ে যায়।
সেদিন পুকুরপাড়ে কনিকার দিকে চোখ পড়েছিল গ্রামের যুবক নাপিত রাজুর। তার লোলুপ দৃষ্টি গিলে খেয়েছিল কনিকা কে। তখুনি রাজু প্রতিজ্ঞা করে যেভাবেই হোক কনিকাকে পেতেই হবে। লোভে অন্ধ হয়ে তাই মাঝরাতে খুপরি পেরিয়ে গোয়াল ঘরের পাশ দিয়ে এসে সে কনিকার ঘরে ঢুকে পড়ে। গ্রামগঞ্জের কুঁড়েঘরে ঢোকা কোনো ব্যপারই না। এখনো মোটামুটি কিশোরী কনিকা। এলোমেলো শাড়ির সাথে যেন শরীর পেঁচিয়ে না যায় তাই অর্ধেক শাড়ি খুলে একটু শান্তিতে ঘুমোচ্ছিল। কিন্তু রাজু সেই সুযোগে এসে এভাবে কনিকা কে দেখে আরো পাগল হয়ে যায়। মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। তাই সে প্রথমে কনিকার কাঁধে হাত রাখার চেষ্টা করে।
পরপুরুষের ছোঁয়া বিষাক্ত হয়। একমাত্র বাবা ও নিজ ভাইয়ের ছোঁয়াই মেয়েরা ছোট থেকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে। অস্বাভাবিক কোনো ছোঁয়া পেলে শরীর কেঁপে উঠে, যা মেয়েরা আঁচ করতে পারে। তাই সহজেই গুড টাচ আর ব্যাড টাচ সম্পর্কে একটা শিশুও ধারনা করতে পারে। তাই কনিকাও ঘুমের ঘোরে অস্বাভাবিক বিরক্তিকর অনুভূতি পেলো। তৎক্ষনাৎ ঘুম ভেঙে মুখের কাছে এক পুরুষকে দেখে সে রীতিমতো আঁতকে উঠলো। চিৎকার দিতে চাইলে রাজু তার মুখ চেপে ধরে। কনিকা ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয়না। তারপর হাতাহাতি শুরু হয়। কনিকা এই দিক দিয়ে অনেক দক্ষ। অনেক শক্তি রয়েছে তার।
গ্রামের মেয়েদের হাত পা ছোট থেকেই একটু শক্ত হয়। ছোট থেকে সবকিছুর মোকাবেলা করে বলেই হয়তো অত নাজুক হয়না। তাই নিজেকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ টা দিয়ে কনিকা আটকায়। শেষে এমন করতে করতে মেঝেতে পড়ে যায়, আর মাথায় আঘাত পায়। এতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বেচারা নাপিত রাজু হালকা নেশা করে এসেছিল। হুট করে কনিকা কে এভাবে অজ্ঞান হতে দেখে ভয় পায় বেচারা। ভাবে যে মেয়েটা মরে গেছে। তাই দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়। আর বাকি রাতটা কনিকা এভাবেই পড়ে থাকে। ভয়ে আতঙ্কে ভোরে ভীষন জ্বরে কাবু হয়ে ওভাবেই থাকে, তাই ঘুমও ভাঙেনা। সকালে ওভাবে মেয়েটাকে দেখেই ভয়ে চিৎকার দেন জরিনা। তিনি এখনো বুঝতে পারছেনা যে মেয়েটা কি ভালো আছে?
সারাটাদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কনিকা এখনো ঘুম থেকেই উঠলো না। শেষে বিকেলের দিকে চোখ মেলে তাকালে জরিনা খাতুন এসে পাশে বসে থাকে। ঘরের ভেতরে ম্লান আলো। জানালার চৌকাঠ দিয়ে ঢোকা সূর্যের আলোও ধুলোয় আটকে কেমন অস্বস্তিকর হয়ে পড়েছে। খাটের উপর কনিকা শুয়ে আছে একেবারে নড়াচড়া না করে। তার কপাল ভিজে আছে ঘামে, ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। ছোট্ট বুকটা দম নিতে নিতে কেঁপে উঠছে বারবার। কপালের কাটা দাগটা স্পষ্ট।
পাশে বসে আছেন জরিনা খাতুন। চোখেমুখে আতঙ্ক আর চিন্তার রেখা স্পষ্ট। এক হাতে পুরোনো খেজুরপাতার পাখা, সেটাই অবিরাম নেড়ে যাচ্ছেন কনিকার দিকে। অন্য হাতে ভিজে গামছা নিয়ে বারবার মুছে দিচ্ছেন কনিকার কপাল। তিনি কাতর স্বরে বিড়বিড় করে বললেন,
—” হায় আল্লাহ, এ কী হইল! এই বাচ্চা মেয়েটার গায়ে এত জ্বর উঠল কেমনে? কি যে হইছে রাইতে। কিছুই তো বুঝবার পারলাম না!”
কনিকা ঘুমিয়েই আছে, কিন্তু ঘুমটা শান্ত নয়। ঠোঁট ফাঁক হয়ে কখনো অস্ফুট কিছু বলতে চাইছে, আবার কখনো হালকা কঁকিয়ে উঠছে। জরিনা খাতুনের বুক কেঁপে উঠছে প্রতিটি শব্দে। চোখের কোণে টলমল করছে অশ্রু, কিন্তু তিনি থামছেন না, একটানা পাখা দিয়ে বাতাস করছেন, যেন তার বাতাসেই হয়তো কমে যাবে মেয়েটার জ্বর। ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা। শুধু কনিকাকে ঘিরে ছুটে চলেছে জরিনা খাতুনের নিঃশব্দ আতঙ্ক আর মমতার অদৃশ্য ছায়া।
সূর্যের আলো কমে যাওয়ার আগেই বাস থেকে নেমে গ্রামের মাটিতে পা রাখে সাদিক। নেমেই বুক ভরে শ্বাস নেয়। কনিকা কে কতদিন পর দেখবে ভেবেই তো খুশিতে মন নেচে উঠছে। বাজারের একটা ছোট দোকান থেকে সে চা পাতা আর বিস্কুটও নিয়ে নেয়। নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। পাঁচ মিনিটের পথ এখান থেকে। হেঁটেই পৌঁছে যাবে।
কনিকা জ্বরের ঘোরে কিছু একটা বিড়বিড় করে বলছে। জরিনা খাতুন কান এগিয়ে দিয়েও বুঝলেন না। তাই মেয়েটার কপালে হাত বুলিয়ে ডাকতে থাকলেন,
—’ কনা রে! মা, উইঠা পড়! আইজ সারাদিন জ্বরে পইড়া থাকলি। খাওয়াও তো করোস নাই। উঠ মা। একটু কিছু খাইয়া নে, ভালো লাগবো। দেহি, উঠ উঠ!”
এবারে টেনেটুনে চোখ মেলে তাকালো কনিকা। কিছুক্ষণ পিটপিট করে তাকিয়ে থেকে আঁতকে উঠলো ভীষনভাবে। জোরপূর্বক শোয়া থেকে উঠে বসে নিজের হাত পা গলা দেখতে শুরু করে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে বুঝতে পেরে মনে মনে শুকরিয়া আদায় করে। বয়সের ভারে মিইয়ে পড়া জরিনা খাতুন বুঝলেন না কনিকার এমন আচরণের অর্থ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
—” কী হইছে রে মা?”
কনিকা এবার বড়বড় চোখ করে তাকায়। নিজেকে সামলিয়ে শুকনো ঢোক গিলে নেয়, এরপর ধীরে সুস্থে পুরো ঘটনা খুলে বলে জরিনা খাতুন কে। ভদ্রমহিলা হাজারবান শোকর আদায় করে। কত বড় বিপদ থেকে যে বেঁচে গেছে তারা! আর একটু হলেই তো জীবনের একটা বড় অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো। জরিনা খাতুন কনিকার কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
—’ তাইতো কই, তোর কপালে এইখান কীসের দাগ! কাটলো কেমনে? তাইলে এমনেই ব্যাথা পাইছোস! আহারে! কিছু হইতো না। আর এহন থেইকা সাবধানে থাকবি বুঝলি?’
কনিকা মাথা নাড়ালো। তবুও তার হাত পা কাঁপছে। অনেক অস্থির লাগছে। খুব ভয় করছে তার। ইশ! যদি কিছু হয়ে যেত, তখন? ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। বারবার সাদিকের চেহারা চোখের সামনে ভাসতে থাকলো কনিকার। মনে মনে ভাবলো কবে আসবে লোকটা।
উপরওয়ালা সহায় হলো। মাত্রই বাড়ির ভেতরে পা রেখেছে সাদিক। আশেপাশে কাওকে না দেখে সরাসরি ঘরেই ঢুকেছে। ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে থাকা কনিকা, আর পাশে বসে থাকা জরিনা খাতুন কে দেখে সে ভ্রু কুঁচকালো। কিন্তু কনিকার দিকে তাকিয়ে উৎফুল্ল মনে ডেকে উঠলো,
—” কনিকা!”
চোখ বন্ধ করে সাদিকের কথাই ভাবছিল কনিকা। হুট করে লোকটার কন্ঠ বাস্তবে কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই সে চমকে ওঠে। আঁতকে উঠে দৃষ্টি ফেলে সামনে। সাদিককে দেখে কিছুক্ষণ হতবিহ্বল হয়ে থাকে। জরিনা খাতুন তো দেখে কী করবেন তা বুঝতে পারলেন না। অস্থির হলেন সহসা,
—’ আয়হায় রে! এইডা কে আইছে? সাদিক রে! তুই আইবি আগে কইলি না ক্যান। আয় আয় ভেতরে আয়। আল্লাহ, দেখছোস কণা, কে আইছে দেখ!”
কিন্তু সাদিক এবং কনিকা দুজনেরই দৃষ্টি একে অপরের দিকে আটকে। কারো কানে কোনো কথা যাচ্ছেনা। সাদিক হতবিহ্বল হয়ে কনিকা কে দেখছে। মেয়েটা কি কষ্ট পাচ্ছে? মুখটা এমন হয়েছে কেনো? এত লালচে হয়ে আছে কেনো ফর্সা মুখটা!
আর কনিকা যথাসম্ভব নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু তা সম্ভব হলো না। এতক্ষণ ধরে দুর্বলতা লুকিয়ে কান্না আটকালেও প্রিয় কাছের মানুষটাকে কাছে দেখার পর আর কান্না আটকাতে পারল না। ঝরঝর করে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল কনিকা।
আরো বেশি চমকে গেলো সাদিক। কোনো কিছু পরোয়া না করে হাতের সবকিছু ছুঁড়ে দিয়ে দৌঁড়ে এসে কনিকার দুই গালে হাত রাখলো। চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে সারামুখে চোখ বুলিয়ে বলতে থাকলো,
—’ কী হইছে কণা? কী হইছে কও আমারে? কান্দো ক্যান? কেও কিছু কইছে? কী হইছে পাখি? কও না! খারাপ লাগতাছে? হ্যাঁ? কও আমারে। ”
কনিকা কোনো কথাই শুনলো না। শুধু সজোরে বাচ্চাদের মত কাঁদতে থাকলো। জরিনা খাতুন প্রথমে পাশে দাঁড়িয়ে সব কথাগুলো সংক্ষিপ্ত করে বললেন সাদিককে। সব শুনে সাদিক হতভম্ব হয়ে আতঙ্কিত নয়নে তাকালো। জরিনা খাতুন সাথে সাথে আশ্বাস দিলেন খারাপ কিছু হয়নি। সাদিক তবুও কনিকার দিকে কাতর নয়নে তাকিয়ে তার গালে হাত রাখলো। এতে কনিকা আরো কেঁদে উঠলো। ভদ্রমহিলা বুঝলেন এখানে থাকা ঠিক হবেনা। দুজনেই বাচ্চামো করছে। তাই তিনি মিষ্টি করে হেসে সাদিকের ফেলে দেয়া সব ব্যাগগুলো বিছানার একপাশে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কনিকা এখনো শব্দ করে জোরে জোরে কাঁদছে। সাদিক কোনোমতেই সামলাতে পারছেনা। দুহাতে বারবার চোখ মুছিয়ে দিয়েও চোখের পানির এই বন্যা থামাতে পারলো না। শেষে বাধ্য হয়ে সাদিক কনিকাকে জড়িয়ে ধরে, শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ছোট্ট শরীরটা। মাথায় হাত বুলিয়ে বারবার বলতে থাকে,
—” কাঁদে না পাখি। আমি আইছি তো। আর কিছু হইবো না। ওই ইবলিশ, বেয়াদবের হাত কাইট্টা মোহনপুরের বড় পুকুরে ভাইসা দিমু আমি। কথা দিলাম তোমারে। পাখি আমার! কাইন্দো না। আমার যে বুক পোড়ে!”
কনিকা শান্ত হলো না। সজোরে আঁকড়ে ধরল সাদিকের শক্তপোক্ত পিঠটা, সেই বুকেই মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলল, আরো অভিযোগ করে বলল,
—” চোখ! ওর চোখও খারাপ! ওয় আমার দিকে খারাপ নজরে তাকাইছে। ওর চোখে আগুন ধরায় দিবা!”
সাদিক কনিকার চুলে আঙুল দিয়ে বুলিয়ে দিল। আশ্বাস দিয়ে বলে উঠলো,
—” কোদাল দিয়া ওর চোখ তুইলা ফালামু আমি। তারপর মার্বেল খেলুম।”
কনিকা বাচ্চাদের মত আবদার করে মিনমিন করে বলল,
—” হ্যাঁ তাই করবা। আমিও খেলুম। ওই শয়তানের চোখ উঠাইয়া মার্বেল খেলুম!”
সাদিক এবারে নিজের বুক থেকে কনিকার মাথা তুলে আনলো। দুহাতে কনিকার গাল মুছে দিয়ে অগোছালো চুল ঠিক করে দিল। লাল হয়ে যাওয়া চোখমুখের দিকে তাকিয়ে কাতর কন্ঠে অভিমান করে বলল,
—” এমনে কেও কান্দে পাগলি? কিছু হয় নাইতো! আমি আছি না? আমি বাঁইচা থাকতে তুই কাইন্দা ভাসাবি ক্যান? কান্দে না আর হু!”
কনিকা মাথা নাড়ালো। হিঁচকি তুলে শুকনো ঢোক গিলে সাদিকের ডান হাত টা উঠিয়ে নিজের গলার কাছে রেখে বলল,
—” তুমি যখন ছুঁয়ে দিতেছো, তখন তো একটুও খারাপ লাগে না। কিন্তু ওই শয়তান যখন ছুঁইছে, আমার বমি পাইছে।”
সাদিক মুগ্ধ হয়ে দেখলো কনিকাকে। কথাগুলোও শুনলো অভিভূত হয়ে। খুশিতে মন ভরে গেলেও প্রকাশ করলো না। চোখের কোণায় সদ্য আসা পানিটুকু মুছে নিয়ে নিল। এবারে দৃষ্টি গেলো কনিকার কপালের দিকে। সরু একটা দাগ হয়ে গেছে। লাল রেখাটা চোখে পড়তেই আবারো অস্থির হলো সাদিক,
—” ইশ রে! কাইটা গেছে না? কিচ্ছু হইবো না। ব্যাথা করতাছে পাখি? জ্বলতাছে তাই না? দেহি, একটু ফু দিয়া দিই!”
সাদিক নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে পাশে থাকা পানি ভর্তি জগ থেকে পানি নিয়ে রুমালটা ভিজিয়ে নিল। এরপর একটু একটু করে ফু দিয়ে কপাল টা মুছে দিলো। লাল রেখাটা মুছে গেলো, কিন্তু কাটা দাগটা দৃশ্যমান হলো। ব্যাথা পাচ্ছিল কনিকা। কিন্তু তবুও তা অনুভব করলো না। সে মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকলো অতি মনোযোগী হয়ে কপালে রুমাল দিয়ে মুছে দেয়া সাদিককে।
সাদিকের মুখটা দেখে কনিকার মনে হলো ব্যাথা টা সে না, এই লোকটাই পাচ্ছে। কিছুক্ষণ জ্বলজ্বল করা চোখ নিয়ে সে তাকিয়ে দেখলো সাদিককে। এরপর মুগ্ধ হয়েই যন্ত্রের মত ডেকে উঠলো,
—’ শুনো!”
সাদিক যে কপাল মুছতে গিয়ে কনিকার অনেকটা কাছে এসে গিয়েছে তা সে এই মুহুর্তে অনুভব করলো। কিন্তু কনিকা যে ডেকেছে। তাই সরলো না। সেভাবেই জবাব দিল,
—” হুম বলো!”
কনিকা আরো একবার চোখ বুলিয়ে দেখলো সাদিককে। এরপর মিষ্টি হেসে সরল মুখে জিজ্ঞেস করল,
—’ আমি ব্যাথা পাইলে তোমার কষ্ট হয় সাদিক ভাই? আমার কান্না দেখলে খারাপ লাগে?”
সাদিক ভাই— ডাকটা শুনে প্রথমে ভ্রু কুঁচকালো সাদিক। কিন্তু কথাটা শুনেই থমকালো। শুকনো ঢোক গিলল। সে তো আর এখন বলতে পারবেনা, বোঝাতে পারবেনা যে কতটা কষ্ট হয়, কতটা খারাপ লাগে। এসব কি ভাষায় প্রকাশ করা যায়। গেলে হয়তো প্রকাশ করাই শেষ হতো না!
যেহেতু প্রকাশ করার কোনো উপায় নেই, তাই সাদিক কিছু বলল না। শুধু কনিকার কপালে অনুমতি ব্যাতিতই একটা শক্ত চুমু খেলো। কনিকা চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল। এইযে এতক্ষণ ধরে হওয়া এত যন্ত্রণা, এত বেদনা, এত কষ্ট সব যেন নিমিষেই কর্পূরের মত উড়ে গেলো। বাহ! এ তো দারুণ সুন্দর জাদু। অবাক হলো কনিকা। আবার অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করলো। মনে পড়লো জরিনা খাতুনের বলা কথাগুলো, সাদিককে যে সে ভালোবাসে সেটা স্বীকার করার মুহুর্ত টা। লজ্জা পেলো কনিকা।
জীবনে প্রথমবার সাদিকের সামনে লজ্জা পেলো। কি একটা মারাত্মক অবস্থা! এইতো শেষ হলো সব দুরত্ব! এইতো ভেঙে গেলো বিরহের দেয়াল। আর কোনোকিছুই বাকি রইলো না এই বিরোধে! খাঁচা থেকে ছাড়া পেয়েছে পাখি। বন্দিনী থেকে মুক্ত হয়ে আকাশে উড়ছে। এবার তবে রূপকথা লেখাও শুরু হবে।
আজ বোধহয় প্রায় সবারই মাথা ফাটানোর দিন। নইলে কাকতালীয় ভাবে কেনো শ্রাবণও কপালে ছোট্ট একটা ব্যান্ডেজ করে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসবে। এটা কোনো কথা? ড্রয়িং রুমে বসে শ্রাবনেরই অপেক্ষা করছিল ধারা। লোকটা কখন আসবে, কখন আসবে এই চিন্তায় বসে থাকা দায়। শেষে শ্রাবণ যখন বাড়িতে পা রাখলো, তখন তার কপালে ব্যান্ডেজ দেখে রীতিমতো আর্তনাদ দিয়ে ছুটে এলো ধারা। এসেই শ্রাবণকে পরোখ করতে থাকলো,
—” আপনি কি ব্যাথা পেয়েছেন? হায় আল্লাহ! কপালে যে ব্যান্ডেজ! আর কোথায় ব্যাথা পেয়েছেন দেখি তো!”
বলেই রীতিমতো সত্যি সত্যি পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শ্রাবণকে খুটিয়ে দেখলো ধারা। শ্রাবণ চোখ সরু করে মেয়েটার অস্থিরতা দেখছে।
শ্রাবণের শরীরের কোথাও আর কোনো ক্ষত না দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ধারা। সে এবার কাতর নয়নে তাকালো শ্রাবণের কপালের দিকে। মিনমিন করে তর্জনী উঁচু করে জিজ্ঞেস করল,
—’ এটা কীভাবে হলো? খাম্বার সাথে বাড়ি খেয়েছেন বুঝি?’
শ্রাবণের ইচ্ছে করলো সত্যি সত্যি ব্যাক গিয়ারে গিয়ে একটা বড়সড় খাম্বা বা ল্যাম্পপোস্টের সাথে বাড়ি খেয়ে মাথামুন্ডু ফাটিয়ে ফিরে আসতে। কিন্তু এমন হলে তো তার বউ কোমায় চলে যাবে। তাই ঝুঁকি নেবে না শ্রাবণ।
ধারা আবারো একই কথা জিজ্ঞেস করলে শ্রাবণ আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে নেয়। বাবা মা কাওকে না দেখে চট করে ধারাকে কোলে তুলে নেয়। বেচারি চেঁচালে রামধমক খায়,
—” শাট আপ ইডিয়ট! আর একবার তুমি আমার মানসম্মান নষ্ট করলে আমি তোমায় আঁছাড় মেরে সব হাড় গুঁড়ো গুঁড়ো করে পাউডার বানিয়ে দেব। গট ইট?”
ধারা বুঝেছে। তাই সজোরে মাথা ঝাঁকালো। মা হওয়ার বয়সে পাওডার হয়ে ইন্তেকাল করার কোনো ইচ্ছে নেই তার। শ্রাবণ সন্তুষ্ট হলো। ঘরে নিয়ে গিয়ে ধারাকে বিছানায় বসিয়ে দিল। এরপর নিজের শার্টের বোতাম খোলা শুরু করলো। বেচারি ধারা অন্যকিছু ভেবে নিল। তাই বিছানার একদম শেষ কোণে গিয়ে গুটিয়ে গেলো। চিৎকার করে বলল,
—” আআআআ! এটুকু বিষয়ে বোতাম কেনো খুলছেন? আমি তো আর চেঁচাব না!”
শ্রাবণ চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলো। বিষয়টা বুঝতেই ফিক করে হাসতে গিয়েও হাসলো না। মুখ গম্ভীর করে বলে উঠলো,
—’ আপনার মাইন্ড দিনদিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে, মিসেস শেখ। ভন্ডামি কম করুন। ভালো হয়ে যান। আমি একজন জেন্টেলম্যান। সবসময় পজিটিভ চিন্তাভাবনা করি। দরজা খোলা রেখে ওই মাইন্ডে শার্টের বোতাম খুলিনা। দিনের বেলা তো কখনোই না!”
ধারা ভ্রু কুঁচকে চোখ পিটপিট করে তাকালো। জেন্টেলম্যান? কে সে? শ্রাবণ শেখ? কখনোই না। ধারা এ বিষয়ে সহমত হতে পারলো না। তাই তাকিয়ে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করলো। শ্রাবণ এবারে পরনের শার্টটা ছুঁড়ে ফেলে আরেকটা কালো রঙের শার্ট পড়তে পড়তে বলল,
—'” আমাকে দেখে কিছু একটা শিখুন ম্যাডাম। আমার মত ভদ্রলোক পুরো এলাকায় একটাও পাবেন না। খুঁজে দেখুন যান। ”
ধারা আর প্রতিক্রিয়া দেয়াটা লুকোতে পারল না। মুখ ভেঙচিয়ে ব্যাঙ্গ করে বলে উঠলো,
—’ ইশ! শখ কত! ভদ্রলোক! আপনার ভদ্রতা জানা আছে। অনেক বেশি ভদ্র আপনি। এত ভদ্রতা আসলে কোনো ভাবেই নেয়া যায়না। হুহ!”
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৪
শ্রাবণ কাতর নয়নে তাকালো বউয়ের দিকে।নাহ! এভাবে তো হবে না। এমনিতেই সামনের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর প্লান করছিল সে। এখন যদি ঘরের বউ শত্রুর মত আচরণ করে, তবে তো মহাবিপদ! এভাবে চলতে থালে তো ভবিষ্যতে লাল হয়ে যাবে ! নাহ, শ্রাবণ মনে মনে ভেবেই নিল, আজ রাতে একটা হাই কুয়ালিটির পানিশমেন্ট তার বউয়ের জন্য বরাদ্দ রাখবে সে। ভদ্রতা কাকে বলে তা দেখিয়ে বউকে কান ধরিয়ে এক পা খাড়া করে দাঁড় করিয়ে রাখবে। ভাবতেই আত্মিক প্রশান্তি কাজ করছে শ্রাবণ শেখের।
