শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৮
অনামিকা তাহসিন রোজা
তৃতীয় ব্যক্তি যখন কোনো সম্পর্কে প্রবেশ করে, তখন সেই বন্ধনে ফাটল ধরাটা নিতান্তই স্বাভাবিক। তাই প্রত্যেক মানুষই প্রতিটি সম্পর্কের বন্ধন ধরে রাখতে তৃতীয় ব্যাক্তিকে ঘৃনা করে। ধারা কি কোনোভাবে ইকরা কে তেমন ভাবে দেখছে? দেখতেও পারে। কিন্তু শ্রাবণ এখনো বোঝে নি সেটা। কারন ইকরা সামিউল শেখের চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে। ইকরার বাবা ইসমাইল শেখ প্রবাসী। তার স্ত্রী মারা গিয়েছে ইকরার জন্মের সময়ে। সেই সময়ে সামিউল শেখই ছিলেন ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছল। তাই দায়িত্ববোধ থেকেই হোক, বা মানবিকতাবোধ থেকেই হোক না কেনো, তিনি নিজে থেকে ইকরার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছিলেন। মেয়ের মত করে না দেখলেও ভাতিজির পরিচয়েই বাড়িতে জায়গা দিয়েছিলেন। তাই ছোট থেকেই শ্রাবণ আর ইকরা একসাথে বড় হয়েছে। সমবয়সী ছিল তারা। একই শ্রেনীতে একসাথেই পড়াশোনাও করেছে।
ইকরার এখনো মনে পড়ে, ছোটবেলায় গুটিগুটি পায়ে সে আর শ্রাবণ একসাথে হাত ধরে স্কুলে গিয়েছে। খেলাধুলা করেছে। হাওয়াই মিঠাই খেয়েছে। কত স্মৃতি জমিয়েছে তারা একসাথে। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে সময় আর সম্পর্কও বদলায়। দুজনে যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়াশোনা করে ফাইভ পাশ করল, তখন শ্রাবণ বয়েজ স্কুলে ভর্তি হয়ে যায়। আর ইকরাকে গার্লস স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয় সামিউল শেখ। যদিও একই কোচিং এ পড়তো তারা। এভাবে পুরো দশ বছরের স্কুল জীবনটা তারা একসাথেই কাটিয়েছে বলা যায়। এমনকি বিদেশও পাড়ি দিয়েছিল একসাথে। কিন্তু দেশ ছিল আলাদা। তাই ব্যস্ততায় যোগাযোগও অনেকদিন হয়নি।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
তবে হ্যাঁ, নারীর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ভালোবাসা এবং যত্ন। ছোট থেকেই শ্রাবণ ইকরার প্রতি একটা ভালো মনোভাব পোষণ করতো। ইকরার প্রতি যত্নশীল ছিল সে। একসাথে স্কুল যাওয়ার সময় ইকরা যতবার হোঁচট খেতো, ততবার ধমক দিয়ে হাত চেপে ধরতো শ্রাবণ। শ্রাবণ হয়তো বোনের চোখে দেখেছে ইকরাকে। প্রথম থেকেই দেখেছে। কিন্তু ওইযে ইকরার ক্ষেত্রে মেয়েলি সূত্রটা খেটে গেছে। যত্নে গলে গিয়ে অসময়ে মন দিয়ে বসেছিল শ্রাবণকে। মনটা যখন একটু একটু করে বড় হতে থাকলো। ক্লাস এইটের দিকে ইকরার শ্রাবণকে পছন্দ করে ফেলল। মনে মনে যে কতকিছু ভেবেছে শ্রাবণকে নিয়ে। কল্পনার জগতে কত যে আঁকিবুঁকি করেছে, তা তো আর কেও জানেনা।
ইকরা ভেবেছিল, এমনকি এই বাড়িতে পা রাখার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত ভেবেছিল যে শ্রাবণও হয়তো তার প্রতি দুর্বল। হয়তো কোনো একদিন নিশ্চয়ই মনের কথা বলবে। একে অপরকে কনফেন্স করবে। কিন্তু ধারনা কি ভুল? সে কি তাহলে মরিচীকার পেছনে ছুটেছে। এসব ভাবনায় মত্ত থাকা ইকরার টনক নড়লো শ্রাবণের কন্ঠে। সিঁড়ি দিয়ে ধারার হাত ধরে নামছে শ্রাবণ। সাথে ধারার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলছে। ইকরার বুক মোঁচড় দিলো। সে তো এভাবেই শ্রাবণের হাত ধরে চলার স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্ন টা বাস্তবে হতে পারলে কি খুব খারাপ হতো। এতদিন পর শ্রাবণকে দেখে বুক জুড়ালেও মনে শান্তি মিলল না ইকরার। কোনোমতে ঢোক গিলে মিষ্টি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে নিল সে।
শ্রাবণ ধারাকে সাথে নিয়ে এগিয়ে আসছে। ইকরাকে দেখেই হাসলো শ্রাবণ। এসেই ইকরার মাথায় একটা গাট্টা মেরে হেসে বলল,
—” কীরে? মিকি মাউস! কী অবস্থা? মেমসাহেব হয়ে গেছিস দেখছি!”
সালমা বেগম হো হো করে হাসলেন। ছোট থেকেই শ্রাবণ ইকরাকে মিকি মাউস বলে ডাকে। ইকরাও হেসে ফেলল এতদিন পর চিরচেনা ডাকটা শুনে। ভাব নিয়ে বলল,
—” মেমসাহেব তো হতেই হবে। নইলে বিদেশী সাদা বেডা পটাবো কেমনে? ব্রিটিশ দুলাভাই চাস না?”
শ্রাবণ বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
—” তাও ঠিক। অবশ্যই চাই!”
এরপর ধারার দিকে ইশারা করে আরেকটু ভাব নিয়ে বলল,
—” যাকগে, ওকে দেখেছিস? আমার বউ! সুন্দর না?”
ধারা চমক খেলো। হুট করে কেও এভাবে বলে! ইকরার হাসি অল্প একটু কমলো। তবুও ঠোঁটের ব্যাসার্ধ ঠিক রেখে শুকনো ঢোক গিলে কোনোমতে বলল,
—” হ্যাঁ দেখেছি। খুব সুন্দর!”
এরপরে খানিক ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—” শয়তান বেডা! আমাকে না বলে ফট বিয়ে করে নিলি। একটা রোস্টও খেতে পারলাম না। তোর বিয়েতে চিকনি চামেলি ডান্সটাও দিতে পারলাম না। এমন বেইমানি না করলেও পারতি শ্রাবণ। অভিশাপ দিলাম, জীবনে ডিভোর্স পাবি না।”
শ্রাবণ ধারার দিকে তাকিয়ে হাসলো। সালমা বেগম এবার হা হুতাশ করে বলে উঠলেন,
—” তা আর বলতে! আর বলিস না ইকরা। রোস্ট খাওয়া তো দুরের কথা। ওর বিয়ের কোনো অনুষ্ঠানই করা হয়নি। কোনো আত্মীয়ই আসেনি। এভাবে ফট করে বিয়ে করলে কি কিছু হয়?”
ধারাও এবার মলিন হাসলো। একবার শ্রাবণের দিকে তাকালো। আরেকবার ইকরার দিকে তাকালো। এতটা খোলামেলা সাবলীল আলোচনা দেখে ধারার মনটা একটু সস্থি পেলো। নিজেকে মনে মনে ভুল ভেবে শাসালো। কেনো যেন উল্টোবাল্টা চিন্তা ভাবনা করে সে! শ্রাবণ এবার ধারাকে বলল,
—” ইকরার সাথে ছোট থেকেই ছিলাম বুঝলে। ও আমার প্রবাসী চাচ্চুটার মেয়ে। আমার পাশের ঘর টায় ও থাকতো। ভীষন পাজি মেয়ে ছিল। ছোটবেলায় তোমার মত অস্থির ছিল, বারবার হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তো! কতবার যে মরতে মরতে বেঁচেছে!”
বলেই হাসি আটকাতে পারল না শ্রাবণ। ধারাও শ্রাবণের থেকে চোখ সরিয়ে ইকরার দিকে তাকিয়ে হাসলো। সাবলীল ভাবেই হাসলো। কথা বললো না।
ইকরা এবার শ্রাবণ কে ধাক্কা দিয়ে বলল,
—” ফাজলামো করবিনা শ্রাবণ। তোর বউয়ের সামনে অপমান করছিস? সুন্দরী বউ পেয়ে অহংকার বেড়েছে না?”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
—” হ্যাঁ অবশ্যই৷ সুন্দর বউ থাকলে একটু অহংকার তো থাকবেই।”
সালমা বেগম শেষ রুটিটা প্লেটে তুললেন। আর দুহাত তুলে বললেন,
—” আহহা! থামো তোমরা। কী শুরু করলে? অভ্যাস আর বদলালো না তোদের। ছোটতে যেমন চুলোচুলি করতি, এখনো কর! যা তো,সর এখান থেকে!”
তারপর ধারাকে বললেন,
—” ধারা আয় তো মা। প্লেট গুলো টেবিলে একটু সাজিয়ে দে!”
ধারা মাথা নেড়ে এগিয়ে আসতে চাইলে ইকরা ধারার হাত খপ করে ধরে ফেলে। ধারা ভ্রু কুঁচকে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ইকরার মুখের দিকে তাকায়৷ এক মুহুর্তের জন্য থমকালো। ইকরা ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে সালমা বেগমের দিকে চেয়ে বলল,
—” আমি আছি তো আন্টি। কতদিন ধরে তোমায় কাজে হেল্প করি না। আজ বরং আমি করি। ধারা তো সবসময়ই করবে, তাই না ধারা? কী বলো?”
ধারা চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। দুজনের দৃষ্টি এক হলো আবারো। ইকরার ঠোঁটে মিষ্টি হাসিটা এবার কেনো যেন কৃত্রিম মনে হলো ধারার কাছে। তবুও ঠোঁট কাঁমড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—” হুম সেটাই। সবসময় তো আমিই করব। সারাজীবন তো আমাকেই করতে হবে। একদিন না করলে কিছু হবেনা।”
ইকরা হাসি এবারে ধপ করে নিভে গেলো। ধারা এবারে বাঁকা ঠোঁটে মিষ্টি হাসলো। শ্রাবণ খানিক দুরে থাকায় শুনতে পেলো না কারো কথা। কিন্তু এদিকে ধারার কথা টা সালমা বেগম শুনেছে। অবাক হয়ে তাকিয়েছেও বটে। মেয়েটা এত গম্ভীর কন্ঠে কথা বলা শিখলো কবে? ধারার দিকেই তাকিয়ে ছিল সালমা বেগম। ধারা এবার ছিটকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় ইকরার কাছ থেকে, সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
—” আমি বাবাকে ঘুম থেকে তুলে দিতে যাচ্ছি মা। বেশি বেলা করলে আবার শেষে শরীর খারাপ করে বাবার!”
বলে আবারো ইকরার দিকে তাকালো ধারা।
ইকরা এতক্ষণ একটা আত্মবিশ্বাসী মনোভাব ধরে রাখলেও ধারাকে এবারে অন্য চোখে দেখলো। মুখ গম্ভীর রেখে তাকিয়ে রইলো। ধারা আগের থেকেও মিষ্টি করে হেসে ইকরাকে বলল,
—” টেবিলে খাবার সাজানোর আগে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলে ভালো হয় ইকরা আপু। হাতমুখ ধুয়ে আসুন, আমি তোয়ালে রেখে যাচ্ছি।”
কথা শেষ হতেই ধারা আর কারো দিকে তাকালো না। সোজা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। এরপর ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে জোর গলায় বলে উঠলো,
—” আপনি আগে ঘরে গিয়ে টি শার্ট টা চেন্জ করে আসুন। তারপর খেতে বসবেন!”
শ্রাবণ অবাক হলো। টি শার্ট তো সে মাত্রই বদলেছে। এই টি শার্টে কী সমস্যা! আবার চেন্জ করবে কেনো? জিজ্ঞেস করতে চাইলো সে। কিন্তু তার আগেই ধারা ধুপধাপ করে সিঁড়ি বেয়ে সামিউল শেখের ঘরের দিকে চলে গেলো।
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। এরপর ঠোঁট কাঁমড়ে কিছু একটা ভেবে ইকরার দিকে তাকালো। ইকরার পরনে নীল রঙের টপস দেখে নিজের দিকে তাকালো। কি আশ্চর্যকর অবস্থা! ধারা কি শ্রাবণ আর ইকরার পরনে একই রঙের পোশাক দেখে হিংসায় জ্বলে ছাই হলো? শ্রাবণ প্রথমে ভাবলো তার সরল বউকে দিয়ে জেলাসি সম্ভব না। কিন্তু এর আগেও তো এমন হয়েছে। এবারেও কি বউ রেগে গেলো? শীট! শ্রাবণ শেখ ভয় পেলো। বউয়ের কথা মত সুড়সুড় করে ইকরাকে বিদায় জানিয়ে ঘরে ছুটলো। যত দ্রুত সম্ভব সাদারঙা টি শার্ট পড়ে বউয়ের রাগ ভাঙাতে হবে।
অফিস থেকে অন্ততকালের জন্য ছুটি দেয়া হয়েছে মুনিরাকে। কথাটা শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও সত্যি। কারন জিহান শ্রাবণকে হুমকি দিয়েছে তার হবু বউকে ছুটি না দিলে সে আর বন্ধুত্ব রাখবে না। তবে এদিকে জিহান পড়েছে আরেক মহাবিপদে। তার হিটলার শ্বশুর সর্ত ঠুকে দিয়েছে যে বিয়ের আগে জিহান আর কোনো ভাবেই মুনিরার সাথে দেখা করতে পারবেনা। জিহানও মেনে নিয়েছে বাধ্য হয়ে৷ তবে ফোন আছে কী কারনে? ফোনের সৎ ব্যবহার করতে সক্ষম তারা। দিনরাত এক করে মুনিরার সাথে ভিডিও অথবা অডিও কলে যুক্ত জিহান।
আজও প্রতিদিনের মত বিছানায় শুয়ে শুয়ে জিহানের সাথে প্রেমালাপ জুড়ে দিয়েছে মুনিরা। একের পর এক বিষয় নিয়ে আলাপ করছে। বিয়েতে কে কী পড়বে? কী করবে? হানিমুনে কোথায় যাবে, এমনকি কত বছর পর বাচ্চা পয়দা করবে সেই পর্যন্ত ভেবে নিয়েছে। একেই বলে গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল! কথার এক পর্যায়ে ফোনটা নিয়ে পুরোপুরি শুয়ে পড়ল মুনিরা। ভিডিও কলে থাকা জিহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” দেশেই এখনো ঘোরা শেষ করতে পারিনি। আমরা হানিমুনটা দেশেই কোনো এক ভালো জায়গায় করি, কী বলো?”
ভ্রু কুঁচকালো জিহান। সেও বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। হবু বউয়ের মুখে এমন কথা শুনে হতবাক হয়ে বলল,
—” তুমি এত ছোটলোকি কথাবার্তা বলবে না মুনিরা! তোমার বাপের কাছ থেকে হাজার দশেক টাকা নিয়ে চলো সাজেক থেকে ঘুরে আসি।”
মুনিরা মুখ ভেঙচিয়ে টেনে টেনে বলল,
—” এহহ! আসছে আমার লাটসাহেব! সাজেক যাবে!তাও আবার দশ হাজার টাকা দিয়ে! খুব ভালো। বসে বসে স্বপ্ন দেখো তুমি। ভাঁওতাবাজি করার জায়গা পাও না, তাই না? ”
জিহান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—” তোমার বাপের কাছ থেকেই ভাঁওতাবাজি শেখা!”
চোখ গরম করে তাকালো মুনিরা। তর্জনী তুলে বলল,
—” খবরদার জিহান। আমার বাপকে নিয়ে একটা বাজে কথা বলবে না। গাছের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখব হুহ!”
জিহান পাত্তা দিল না। সে কিছু একটা ভেবে ফট করে বলল,
—” আচ্ছা শোনো না, আমি অন্য একটা কথা ভাবছিলাম!”
—” কী?”
—” হারামজাদা শ্রাবণের বিয়ে তো চল্লিশার অনুষ্ঠানের থেকে কম ছিল না। ওটা বিয়ে কম, মরাবাড়ি লেগেছিল বেশি। আমি ভাবছিলাম, এই ফাঁকে যদি শ্রাবণেরও আরেকবার বিয়ে হয়ে যায়, ভালোই হয়। আঙ্কেল কে একবার বলব নাকি?”
মুনিরা কিছুক্ষণের জন্য তব্দা খেলো। এরপর হা করে তাকিয়ে বলল,
—” এক বউ থাকতে শ্রাবণ ভাই আবার বিয়ে করতে যাবে কেনো? পাগল নাকি! বেচারি ধারা মেয়েটার সংসার ভাঙতে চাও তুমি?”
জিহান চোখ সরু করে তাকালো,
—” তুমি কি ছোটতে হরলিক্স কম খেয়েছিলে?”
মুনিরা মুখ কুঁচকে জবাব দিল,
—” মোটেই না। অনেক খেয়েছি।”
—” তো, ব্রেনের এত বাজে অবস্থা কেনো? বিটিভির মত ঝিরঝির করছে। রিপেয়ারিং হয়নি মেবি। ড্যামেজ হয়ে গেছে।”
মুনিরা চোখ রাঙালো। জিহান ইশারায় শান্ত হতে বলে বলল,
—” আরে বলদি বেডি, বউ চেন্জ হবে এটা একবারো বলছি নাকি। জাস্ট বিয়ে টা আরেকবার হবে। স্বাভাবিকভাবে বিয়ে আর কি। আগেরটা তো কট খাওয়া টাইপ বিয়ে ছিল!”
মুনিরা এবারে বুঝলো। সজোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বিষয়টা আমলে নিলো। কিন্তু হতাশ হয়ে বলল,
—” আমার মনে হয়না শ্রাবণ ভাইয়ের ফ্যামিলি রাজি হবে। ওসব বাদ দাও। উনাদের বিষয়ে কথা না বলাই ভালো।”
জিহানও এবার ভাবলো। আসলেই! না বলাই ভালো। উনারা কী করবেন, সেটা একান্ত ব্যক্তিগত ব্যপার! এখানে এভাবে কথা বলাটা বা এমন প্রস্তাব দেয়াটা ভালো দেখায় না। বুঝলো জিহান। তাই মনে নিল মুনিরার কথাখানা।
সামিউল শেখ কে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে আর নিচে গেলো না ধারা। ঘরের দিকে এগোলো। কেবলই একটা সাদা শার্ট পড়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে শ্রাবণ। দরজা পেরোতেও পারেনি, এরমধ্যে ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকতে চাইলো ধারা। কিন্তু শ্রাবণকে দেখতে পায়নি। তাই অসাবধানতার কারনে দুজনেই একে অপরের সাথে সজোরে ধাক্কা খায়। বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী শ্রাবণ একটুও নড়েনি, কিন্তু ছোটখাটো গড়নের বেচারি ধারা ছিটকে পড়লো। কিন্তু শ্রাবণ তো দায়িত্বশীল। ফট করে বউয়ের সুনিপুণ কোঁমড় খানা চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। এক হাত দিয়ে ধারার মাথা ধরে নিজের বুকে চেপে ধরল। ধারা মুখ তুলে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণও কাতর চোখে তাকালো৷ বোঝাতে চাইলো, তোমায় হোঁচট খাওয়া থেকে বাঁচিয়েছি, এবারে খ্যামা দাও। কিন্তু হলো না। তাই শ্রাবণও ঠোঁট চেপে কাতর নয়নে তাকিয়েই রইলো বউয়ের দিকে। কিন্তু আজ কেনো যেন দৃষ্টিটা ভিন্ন ভাবে মিলিত হলো। আজ শ্রাবণের চোখে একরাশ অসহায়ত্ব, কাতরতা আর ধারার চোখে স্পষ্ট অভিমান, আগুন।
শ্রাবণ তবুও ছাড়লো না ধারা কে। কোনোমতে বলল,
—” একটু হলেই পড়ে যেতে। আস্তেধীরে চলো, অত তড়িঘড়ি করে কোথায় যাচ্ছো?”
ধারা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সরে আসলো। কোনো জবাব না দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লো। শ্রাবণ অস্থির হয়ে পিছু নিলো,
—” দেখো ধারা, আমি সাদা টি শার্ট পড়েছি। কেমন লাগছে.? এটা নতুন!”
ধারা বিছানার বালিশ হাতে নিয়ে ঝারতে থাকলো। কোনো দিকে না তাকিয়েই বলে উঠলো,
—” আপনার টি শার্ট, যা খুশি তাই পড়ুন। আমি আর কী বলব?”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এগিয়ে গিয়ে ধারার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—” রাগ করছো কেনো? কী হয়েছে?”
ধারা পুরোপুরি চেঁতে গেলো। জোর গলাতেই বলল,
—” আশ্চর্য! কী হবে আমার? কিছুই তো হওয়ার কথা না। বারবার এক কথা কেনো বলছেন? আমি কি বলেছি একবারো যে কিছু হয়েছে।”
ধারার এমন বকবকানি দেখে শ্রাবণ এবারে ফট করে মেয়েটাকে নিজের কাছে টেনে নিল। আগের থেকেও বেশি শক্ত করে ধরে ধারার চলন্ত ঠোঁটদুটোয় আঙুল রেখে মিষ্টি হেসে বলল,
—” হুশশ! হয়েছে হয়েছে। এমন অস্থির হলে চলে ম্যাডাম? আপনি কি জানেন যে কিছু একটা পুড়ছে। আমি সকাল থেকে পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি।”
ধারা ভ্রু কুঁচকালো,
—” মানে?”
শ্রাবণ আর জ্বালাতে চাইলো না মেয়েটাকে। কপালে আঙুল বুলিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
—” তুমি নিজেই উপলব্ধি করো তো বউ, কেনো এমন করছো হুম?”
ধারা নিজেও জানে না সে কেনো এমন করছে। সে নিজেও চিন্তিত হলো। কেনো সে এমন করছে? কিছুই তো হয়নি। কারন খুঁজতে গিয়ে ধারা আবিষ্কার করল যে ইকরাকে তার কোনোমতেই পছন্দ হচ্ছে না। কেনো যে ভালো লাগছে না। কেনো? শ্রাবণ তো বললই যে ছোটবেলার বন্ধু! তার সামনেই তো কথা বলল। তবে এমন অদ্ভুত আচরণ ধারা কেনো করছে। প্রশ্নটা নিজেকেই করল ধারা। সাথে সাথে মিইয়ে গেলো। আসলে বাচ্চামির জন্য সে এতক্ষণ অনেক দুর পর্যন্ত কোনো কারন ছাড়াই ভেবেছে।
বিষয়টা উপলব্ধি হতেই শান্ত হলো ধারা। কোনোমতে চোখ তুলে তাকালো শ্রাবণের দিকে। বাচ্চাদের মত মুখ করে জিজ্ঞেস করল,
—” ইকরা আপু আপনাকে ভাইয়া বলে না কেনো?’
শ্রাবণ ঠোঁট কাঁমড়ে হেসে ফট করেই বলল,
—” কারন, আমরা সমবয়সী। একই ক্লাসে পড়েছি।”
ধারা ঠোঁট উল্টিয়ে মাথা নাড়ালো। এমনিতে তো অন্য কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। শেষমেশ বলেই বসলো ধারা। শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলল,
—”ইকরা আপু ভীষন ফর্সা আর সুন্দর। উনি এত ফর্সা কেনো? বিদেশীদের মত।”
বলতে বলতেই নিজের হাতের দিকে তাকালো ধারা।
শ্রাবণ চোখ বড় করে তাকালো। কি সর্বনাশ! তার বউ ভেবেছে সাদা চামড়া দেখে শ্রাবণ শেখ হোঁচট খাবে? শ্রাবণ এবার হাসি আটকাতে পারলো না। হো হো করে হেসে জড়িয়ে ধরলো ধারাকে৷ ধারার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিয়ে কানে একটা ছোট চুমু খেয়ে মিনমিন করেই বলল,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৭ (২)
—” কবে বড় হবেন ম্যাডাম? কবে বুঝবেন আমার অস্থিরতা? কবে উপলব্ধি করবেন যে আপনি ছাড়া আমি একদম নিঃস্ব। এই আপনিই আমায় জাদু করে বশ করেছেন। এখন যে বিশ্বসুন্দরীকেও আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। দোষ তো আপনারই। নিজের চোখের মায়ায় আমায় আবদ্ধ করে বেঁধে ফেলেছো। এখন যে এই শিকল ছেঁড়া সম্ভব না।”
