Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৭

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৭

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৭
মৃধা মৌনি

ছাদের কোণে এসে দাঁড়িয়েছে তৃণা। আজ খুব হাওয়া দিচ্ছে। এমনিতেই গায়ে জ্বর, ঠান্ডা বাতাসে শরীরের সব লোমকূপ দাঁড়িয়ে পড়ে। কি ভীষণ বিচ্ছিরি লাগছে আশপাশ। তৃণা রান্নাঘরের দিকে এগোলো। একটু চা খেতে পারলে ভালো লাগত। আজ চারদিন পর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়েছে সে। যখন জ্ঞান ফিরেছিল, তখন প্রায় ভোররাত। শিশির ওকে জাপটে ধরে গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল। তৃণার এত খারাপ লাগে। সে আজ ম রেও যেতে পারত! অথচ শিশির কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে!

তৃণা ডেকে উঠাতে শিশির কাচুমাচু হয়ে বলল, ‘কখন যে ঘুমিয়ে পড়ছিলাম, খেয়াল নাই।’
জবাবে তৃণা কিছু বলেনি।
এই মানুষটা তার কলিজা থেকে উঠে গেছে।
কি জঘন্য ভাবে গায়ে হাত তুলেছে ছিঃ!
বাম চোখজোড়া পুরোটাই কালো, ঠোঁটের চারপাশে কালশিটে, বাহুতে র ক্ত জমে গেছে। আয়নায় তাকিয়ে তৃণা শিউরে উঠেছিল। এত বাজে হাল করেছে! অথচ মানুষটা তাকে সামান্য সরিটাও বলল না? অবশ্য বলেছে, ‘মেজাজটা এত গরম করে দাও না তুমি… আর এরকম উল্টাপালটা কথা বলো না দয়া করে…’
এর জবাবেও তৃণা শান্ত থেকেছে।
শরীর তো ভেঙেই গেছে। মনটাও গেছে।
সব ছেড়ে ছুঁড়ে খুব দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে তার। অনেক দূরে কোথাও.. শিশিরের নাগাল থেকে বহু দূরে…

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

রান্নাঘরে খুটখাট শব্দ হচ্ছে। সহেলি আপা বুঝি!
তৃণা উঁকি মারতেই জমে গেল। হাসিব ভাই ভাত ফুটাচ্ছেন। হাসিব ওকে দেখতে পেয়ে দাঁত বের করে হাসলেন। যেন এর আগে কিছুই হয়নি, স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন, ‘আরে তৃণা যে! খবর কি? ঘর থেকে বের হও না নাকি জামাই সেবা দিতেছিল?’
হাসিবের গলায় কটাক্ষ স্পষ্ট।
তৃণা নীরবে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই হাসিব পুনরায় বলে উঠলেন, ‘বলছিলাম, নিজের আখের গুছাও। পুরুষ মানুষ বিশ্বাস করাটাই উচিত না, যদিও আমি একজন পুরুষ হয়েই কথাটা বলতাছি। তোমার ভালো ভাইবাই…আজকে এমনে মা র ছে, কালকে মা র তে মা র তে মাইরাই ফেলাবে। তারপর কি? লা শ ফালাইয়া গুম… কয়েক মাস যাবে, সবাই সব ভুলে যাবে। নতুন করে জীবন গোছাবে। নতুন মাইয়া মানুষ বিয়া করবে। হের জীবনের কিছু হইবো? হইবো না। হারলে তুমিই হাইরা যাবা..’

তৃণা চুপ। কিছু একটা জবাব দেওয়া প্রয়োজন, কিন্তু কি যে বলবে সে- ঠিক করে গুছোতে পারে না।
হাসিব এগিয়ে এসে একটা হাত রান্নাঘরের দরজায় রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন, তৃণার দিকে অনেকটা ঝুঁকে এসে বললেন, ‘আজকে বুঝলা না, কিন্তু একদিন বুঝবা। এই ব্যাডা তোমারে নিয়া কোনোদিন ঘর সংসার করতো না। তোমার বইনরে যেমনে তোমার লাগি ছাড়ছে, তোমারেও অন্য কারোর লাগি ছাইড়া যাইতো গা। কথাটা মিলাইয়া নিও।’

তৃণা আকাশ সমান চমকাল, থতমত কণ্ঠে বলল, ‘আ..আপ…আপনি কীভাবে জানেন?’
হাসিব রহস্য করে হাসলেন, ‘নিজেগোরে এত চালাক ভাবা ঠিক না। এই বিল্ডিংয়ের কে কোন জায়গায় কাম করে, কে কোন আবাসিক হোটেলে লাগাইতে যায়, কার কয় জায়গায় সেটিং- সব আমার জানা আছে। অতীত খুঁড়তে দুই মিনিট সময় লাগে। কত মিনিট? দুই মিনিট।’ হাসিব দুটো আঙুল তুলে দেখালেন, ‘বুঝছ, কয় মিনিট, দুই মিনিট! আর তোমার বেলায় লাগছে এক মিনিট এগারো সেকেন্ড। এর মধ্যেই জাইনা গেছি, তুমি কোন কাতারের মাইয়া.. তাই জন্যেই তো অফারটা দিলাম, মজা তুমিও পাইবা, অন্যরেও দিবা। বিনিময়ে তোমার পকেট ভরব, আরেকজনের পকেট খালি হইবো। পকেট ভরা যখন টাকা থাকব, একটা না দশটা শিশির তোমার পায়ের তলায়… পইড়া থাকব।’
তৃণা ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে হাসিবের মুখপানে তাকিয়ে রইল। হাসিব হাসলেন। সামান্য ঝুঁকলেন এবং অকস্মাৎ একটা চুমু খেয়ে বসলেন তৃণার ঠোঁটের উপরে। তৃণা আঁতকে ওঠে ছিঁটকে সরে দাঁড়াল। হাসিব উচ্চস্বরে হেসে উঠতেই সহেলি বেরিয়ে এলো ঘর ছেড়ে।

‘কি হইছে? মেলা লাগছেনি?’ কপাল কুঁচকে কথাটা ছুঁড়ল। এলোমেলো চুল হাতখোপায় বাঁধতে বাঁধতে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল তৃণার দিকে।
‘ভাত ফুটছে? না ফুটলে যাও,আমি ফুটাইতাছি। আর খব্বরদার, রান্নাঘর আইবা না। এইটা মাইয়া মাইনষের জায়গা। মাইয়াগো গায়ের গন্ধ এই ঘরের চিপায় চুপায়।’
হাসিব গদগদকণ্ঠে বললেন, ‘মেজাজটা চড়া ক্যান আমার বউয়ের? কিছু লাগবোনি?’
সহেলি ঝামটা মে রে তাকে সরিয়ে দিলো, ধমকে বলল, ‘সরো তো, ঘরে যাইতে কইছি না। রঙ্গ কইরো না।’ চোখের কোণ দিয়ে তৃণার দিকে একটা চোরা দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলো এরপর, বলল, ‘রঙ্গ দেখাইয়া মাইয়া মাইনষেরে আর কত পাগল বানাইবা? এমনেই ছেড়িরা টাকা ওয়ালা ব্যাডা দেখলে লোভ সামলাইতে পারে না। জিভ দিয়া বাইয়া বাইয়া পানি পইড়া যায়।’

তৃণা শিউরে উঠল। কি বিচ্ছিরি কথা!
সহেলি আপা তাকে মিন করল? এত খারাপ কথা বলল কীভাবে! তার স্বামী কি দুধে ধোয়া তুলশিপাতা?
অন্যসময় হলে একটা শক্ত জবাব নিশ্চয়ই দিতো সে। শারিরীক অসুবিধার কারণেই হোক আর যে কারণেই হোক- তৃণা নীরবে সরে এলো। আসতে পথেও শুনল, সহেলি সমান তালে চেঁচিয়ে হাসিব ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করছে। তাকে যতই রাগ রাগ ধমক দিচ্ছেন, ভদ্রলোক ততই হাসি হাসি মুখ করে গদগদ করছে। তৃণার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিঁড়ে। ভাগ্যে কি লিখে এনেছে, কে জানে!

শিশিরের সঙ্গে আজকাল কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে তৃণা। এই ঘর, এই সংসার কিছুই ভালো লাগে না আর। মনটা উদাসীন, দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে বারংবার। কোথায় হারাবে? ভেবে পায় না। যাওয়ার জায়গা কেবল একটিই, গ্রামের বাড়ি! মায়ের কাছে…
কিন্তু সেখানে দীক্ষা আছে যে। তৃণা কি তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে? সবটা আবার আগের মতো করে দেওয়ার চেষ্টা করবে? নাকি এভাবেই মানিয়ে নিতে চেষ্টা করবে? কোনোকিছুই বুঝে আসে না তার।
শিশিরও আজকাল ঘরে মন দেয় না।

তার কাজ খুবই সুন্দর গতিতে দৌড়াচ্ছে বলা চলে। প্রতিদিনই দুটো তিনটে কাজ পায়, তাতে যা কামায় তার আশার বাইরে। তাই দিয়ে খুব সুন্দর জীবন চলে যায়। কিন্তু প্রথমদিন যেমন ঘরের জন্য এটা ওটা কিনে নিতে ইচ্ছে করেছিল শিশিরের, এখন আর ইচ্ছে হয় না। একটা সময় তৃণার কাছে যে সুখ, মানসিক শান্তি পেতো শিশির, আজ সেগুলো হাওয়ায় বিলীন। এই সব ছেড়ে যদি অনেক দূরে কোথাও চলে যাওয়া যেতো! শিশির মনে মনে ভাবে, আরও কিছু টাকা জমুক, এরপর সে কয়েকদিনের জন্য হাওয়া হবেই। অনেক দূরে কোথাও থেকে ঘুরে আসবে। মনে জমা সব বাষ্প উড়িয়ে দিয়ে আসবে খোলা আকাশে।

মকবুল ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক চূড়ান্ত রকমের ভালো হয়েছে শিশিরের। মানুষটাকে সে পাঁচ হাজার টাকাও দিয়েছে, তাকে এই লাইনে নামিয়ে দেওয়ার জন্য। মকবুল ভাই ভীষণ খুশি। অন্যদেরকে কাজে নামানোর পর আর পাত্তাই পাওয়া যায় না। টাকাপয়সা কামিয়ে রাতারাতি অহংকারী বনে চলে যায়। সেদিক দিয়ে এই ছেলেটা ভালো। নিজে সেধে টাকা দিয়েছে। আবার ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাইয়েছে।
মকবুল আর শিশির বসে আছে একটা টং দোকানের ছোট্ট বেঞ্চিতে। দু’জনের হাতে দুধ চা আর সিগারেট। দু’জনেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করায় ব্যস্ত।
শিশির তার মনের ফাস্ট্রেশন অনেকটাই মকবুল ভাইয়ের কাছে ঢেলে দিয়েছে। সব শুনে মকবুল স্বান্তনা স্বরুপ বলেছেন, ‘না, এভাবে তো হয় না। পুরুষ মানুষের ঘর দিয়া হচ্ছে শান্তি। তুমি ওর সাথে খোলামেলা কথা বলো। সুন্দর ভাবে সংসার করবে কিনা জিগাও। ভালো কথা, বিয়ে করে ফেলছ নাকি?’
শিশির অস্পষ্ট স্বরে না জানাল।

মকবুল চমকালেও প্রকাশ করলেন না।
মনে মনে ভয়াবহ দুটো গালিও দিলেন। বিয়ে ছাড়াই.. ভালোই! মুখে বললেন, ‘ভালো করছ, বিয়ে হয়ে গেলে আবার আরেক যন্ত্রণা। চাইলেও ঘাড় থেকে নামাইতে পারবা না। ভালো কথা, তোমার প্রথম বউয়ের খবর কি? সে কি একবারেই বিদায়?’
শিশির বলল, ‘হুম। আমাকে তালাক দিবে নিজে থেকে। দেক, আমিও অপেক্ষা করে আছি। যা ভালো লাগে করুক। আমি তো চাইছিলামই, সব ঠিক করে নিবো। তৃণাকে আস্তে আস্তে সরিয়ে দিবো। কথা শুনলে তো.. আবার আমার গায়ে…’

মারের কথাটা চেপে গেল শিশির।
এসব বাইরের লোকের কাছে বলা যায় নাকি? কি লজ্জার কথা! তবু যেন মকবুল বুঝে নিলেন। আড়ালে হাসলেন, মনে মনে শুধালেন, ঠিক আছে, দুই নৌকায় পা দিলে এডিই কপালে জোটে..
মুখে বললেন, ‘যে মানুষ বিয়ার সিস্টেম বাইর করছে, তারে পাইলে… আমার কপালটাও শেষ। বাসায় গেলে হাউ কাউ, এইটা নাই, ওইটা নাই, এইটা দাও, ওইটা দাও। খালি দাও দাও। মানে আমি একটা টাকা ছাপাবার মেশিন! তাও তো আমার দিকটা বুঝবি.. তা বোঝে না। দিনরাত খেয়ে খেয়ে ধুমসি হচ্ছে। কি বিশ্রি লাগে! কতবার বলছি, রেখা ডায়েট ফায়েট করো, পার্লার যাও, নিজেরে গোছাও। কোথায় কি! বাচ্চা নিয়ে নাকি এসব হয় না। আচ্ছা, দুইটা বাচ্চা সামলানো এমন কি কষ্টের কাজ? তাও একটা কাজের মেয়ে ও আছে।’
‘মেয়ে মানুষের বাহানার শেষ নেই মকবুল ভাই। আমি বুঝতেছি, বিয়েটা করার পর। বিয়ের আগের দুনিয়া এক, বিয়ের পর আরেক।’

‘একদম। তোমার ভাবির কাছে যাইতেই ইচ্ছে করে না। রাতের বেলা যদিও বা ডাকি, একটা বাহানা দেখাইয়া দিবে না। সারাদিন নাকি খাটতে খাটতে রাতে ক্লান্ত লাগে। মানে সে একলাই খাটে, আর আমি নাকে তেল দিয়া ঘুমাই। যত্তসব।’
মকবুল বিরক্ত ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিলেন। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে কণ্ঠস্বর নিচু করে বললেন, ‘ভাগ্যিস কাজের মাইয়াটা ভালো। গেলে না করে না।’
শিশির চুমুক দিতে নিচ্ছিল, কথাটা শোনামাত্র তার হেঁচকি উঠল। মকবুল হেসে ফেললেন, ‘এইটুক শুনেই বিষম খাইলা মিয়া! বাদবাকি শুনলে তো ফিট খাবা।’

‘আরও আছে নাকি?’ শিশির চমকায়।
‘আবার জিগায়!’ যেন খুব গর্বিত মকবুল, ‘কত্ত আছে, তোমার ধারণা নাই।’
তারপর হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ল এমন ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে শিশিরকে টানলেন, ‘চলো, এক জায়গায় যাব।’
শিশির থতমত খেলো, ‘কোথায় মকবুল ভাই?’
‘আহারে বাবা চলোই না আগে.. উঠো তো উঠো। চা পরে খাইয়ো। এরচাইতেও ভালো জিনিস খাওয়াবো, চলো।’
মকবুলের টানাটানিতে শিশিরকে উঠতেই হলো।
ভরদুপুরে দুটিতে মিলে যাত্রা করল হোটেল রূপালির উদ্দেশ্যে।

হোটেল রূপালি… নামটা যেমন নরম, ঠিক তার উলটো এখানকার বাতাস- ভারী এবং অস্বস্তিকর। দিনের উজ্জ্বল আলো এখানে প্রবেশ করতে ভয় পায় যেন। হোটেলের করিডোরগুলো নীরব কিন্তু শীতল, মনে হয় প্রতিটি দেয়ালে জমে আছে অজস্র চাপা দীর্ঘশ্বাস। এই রূপালি নামের আড়ালে চলে রূপের ব্যবসা। এখানে রুম ভাড়ার পাশাপাশি নারীর লাবণ্যও সময় ধরে কেনা যায়। এখানকার পরিবেশ কৃত্রিম ফুলের মতো, বাইরে থেকে চাকচিক্যময়, কিন্তু ভেতরে প্রাণহীন। শিশির হতভম্বের মতো মকবুলের পিছু পিছু হাঁটছে, ঘোর লাগা চোখে সে দেখছে লোকজনের চাপা আনাগোনা, ম্যানেজারদের শীতল, নিরাসক্ত চাহনি। সে ভাবতেই পারেনি, মকবুল ভাই তাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে আসবে। তার সেন্সে যেন কোনো কিছু কাজ করছে না, সবকিছু একটা ঘোরের ভেতর দিয়ে চলছে।

ম্যানেজার সবুজের সঙ্গে মকবুলের খাতির বহুদিনের। মকবুল তাকে টানতে টানতে সবুজের কাউন্টারের সামনে নিয়ে দাঁড়ালেন। হাসিমুখে সবুজকে ডেকে বললেন, ‘এই যে সবুজ, এ হলো আমার ছোট ভাই, শিশির। ভালো ছেলে, বুঝলা। এই লাইনে নামছে মাত্র। তোর সাথে পরিচয় করাই দিলাম। দেখে টেখে রাখিস।’
সবুজ হাসি মুখে হাত মেলাল, সেই হাসিটা কেমন যেন শয়তানিতে মাখা। শিশির সৌজন্যতা দেখাল বটে, কিন্তু তার পা তখনো মেঝের সঙ্গে সেঁটে আছে। সে যেন এই কক্ষপথে প্রবেশ করতে চাইছে না। কিন্তু মকবুল তাকে সময় দিল না।

‘আরে চলোরে বাবা, এত ভাবাভাবির কী আছে! মুখটারে না চিমসাইয়া সহজ করো। প্রথম তো, এমন লাগতেছে। এরপর আমার পায়ে হাত ছুঁয়ে সালাম করবা হা হা হা, কম তো দেখলাম। এখন চলো, তোমার জন্য একটা জিনিস রেডি রাখছি। আগে ফ্রেশ হও।’
মকবুল জোর করেই তাকে দোতলার একটি রুমে নিয়ে বসিয়ে দিল। রুমটা ছোট, কিন্তু ঝকমকে, তীব্র এসি চলছে। শিশির ছটফট করতে লাগল। তার ভেতরের সব নীতিবোধ যেন বিদ্রোহ করছে। সে উসখুস ভঙ্গিতে অপেক্ষা করতে থাকল, মকবুল কী করতে চায়।
খানিক বাদে দরজায় টোকা পড়ল। মকবুল দরজা খুলে মুচকি হেসে বেরিয়ে গেলেন। ঘরে ঢুকল অসম্ভব রূপবতী এক তরুণী।

তাকে দেখে শিশির যেন পাথর হয়ে গেল। এমন রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। মেয়েটির চোখে-মুখে অদ্ভুত এক কোমলতা, সারা শরীর যেন মাখনের মতো মোলায়েম, অথচ সাজপোশাকে কোথাও কোনো কার্পণ্য নেই। লাজুক ভঙ্গিতে মেয়েটি দরজা ভেজিয়ে শিশিরের দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই বরং লুকিয়ে আছে আজব ধরনের প্রশান্তি।

মেয়েটি শান্ত স্বরে বলল, ‘কেমন আছেন? আপনি নতুন?’
শিশির কোনো কথা বলতে পারল না। মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল কেবলমাত্র।
মেয়েটি এগিয়ে এসে শিশিরের পাশে বসল। তার শরীর থেকে ফুলের মতো সুবাস আসছে। সে ফিসফিস করে কিছু কথা বলল, যা শিশিরের কানে অচেনা এক প্রশান্তি এনে দিল।
মেয়েটি কোমলমতি, নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন? আমার দিকে তাকিয়ে দেখুন, আমাকে পছন্দ হয়নি?’

শিশির থতমত খেলো। কি বলবে, কি উত্তর দিবে, তার জবান কোথায়? ওমা, মুখ দিয়ে শব্দরা আসছে না কেন?
মেয়েটি ঘোরলাগা হাসি হাসল, শিশিরের হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হলো। এত সুন্দর, এত সুন্দর!
মেয়েটি মোলায়েম হাতে শিশিরের হাত ধরে তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। তার কোমলতায় শিশিরের সব দ্বিধা, সব ভয়, সব প্রতিরোধের দেয়াল যেন এক এক করে ভেঙে গেল।
দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা, তৃণার দুর্ব্যবহার, দীক্ষার স্মৃতি- সবকিছু মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। শিশির এক অব্যক্ত তৃষ্ণায় মেয়েটিকে কাছে টানল। অনেক, অনেক দিন পর সে যেন শরীরের সেই তৃপ্তি খুঁজে পেল। এই মুহূর্তে তার মনে তৃণা বা দীক্ষা- কারোরই কথা একবারের জন্যও মনে পড়ল না। সে যেন তার জীবনের সব অপ্রাপ্তি, সব ক্লান্তি, সব হতাশা এই উষ্ণ আলিঙ্গনে ভুলতে চাইল। তীব্র শারীরিক তৃপ্ততা তাকে এক নতুন, অন্ধকার জগতে প্রবেশ করিয়ে দিল।

শিশির যখন ঘরে ঢুকল, তখন সন্ধ্যা নেমেছে। গুনগুন করে একটা গানের সুর ভাঁজছে সে, সেই সুরে নতুন করে পাওয়া কোনো তৃপ্তির রেশ। সে এসেই শার্টটা আলগাভাবে খুলে বিছানায় ছুড়ে ফেলল, তারপর বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
তৃণা তখন রান্নাঘরে। নীরব, উদাসীন। শিশিরের কোনো কাজই তার চোখে পড়েনি, যেমনটা আজকাল আর পড়ে না। কিন্তু এবার শার্টটা যখন তার নজরে এলো, সে কেবল কাজ থামাল।
শার্টটা তোলার সময় তৃণার চোখ আটকে গেল কলারের ঠিক নিচে। সেখানে হালকা গোলাপি শেডের দুটো ঠোঁটের দাগ স্পষ্ট লেগে রয়েছে- যেন শিশিরের বিশ্বাসঘাতকতার স্বাক্ষর।
দাগটা বড় নয়, কিন্তু তা দেখার পর তৃণার মনে হলো তার নিঃশ্বাস বুঝি বন্ধ হয়ে এলো। সে শার্টটা নাকের কাছে নিয়ে গেল। পরিচিত সাবানের গন্ধ নয়, এই কাপড় থেকে আসছে বড্ড অচেনা, কড়া এক পারফিউমের গন্ধ।
একেই বুঝি প্রতারণা বলে?

প্রতারিত হলে বুকের ঠিক মধ্যখান দিয়ে কি যেন একটা ছিঁড়ে যায়?
শরীরের শিরায় শিরায় এক হিমশীতল স্রোত বইতে লাগল তার। এতদিন শিশিরের প্রতি তার যে চাপা রাগ ছিল তা যেন এক মুহূর্তে ঘৃণায় রূপান্তরিত হলো। এই গোলাপি দাগ তাকে বুঝিয়ে দিল, তার এই নির্বাসিত জীবনের আসল কারণ।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৬

তৃণা অদ্ভুত শান্ত চোখে বাথরুমের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখান থেকে শিশিরের গুনগুনানি ভেসে আসছে। হঠাৎ করেই দু’চোখের তারায় ভেসে উঠল দীক্ষার মুখখানা। আপাও বড্ড অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়েছিল একদিন!

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৮