Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২০

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২০

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২০
মৃধা মৌনি

মধ্যদুপুরের সেই আলো যেন ঘরের কোণে এসে জমাট বেঁধে গেল। দীক্ষার সদ্য পাওয়া সুখ, তার পেজের হাজারো লাইক আর মন্তব্যের উচ্ছ্বাস— সব এক ফুৎকারে নিভিয়ে দিল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটা। নিস্তব্ধ, স্থির অথচ ভীষণ ভারী সেই ছায়া- সেটি আর কেউ নয়, তৃণা।

তৃণার চেহারায় এখন আর সেই রূপের অহংকার অবশিষ্ট নেই, যা সে একদা তার বোনের ঘর ভাঙতে ব্যবহার করেছিল। মুখটা ফোলা, কপালে আর চিবুকে কালচে আঘাতের দাগ। ঠোঁটের কোণ ফেটে শুকিয়ে আছে রক্তের রেখা। পরনের কামিজটার ভাঁজ আলগা, এলোমেলো, তাতে লেগে থাকা শুকনো কাদা-মাটি স্পষ্ট জানান দিচ্ছে- সে এক দীর্ঘ পথ হেঁটে এসেছে, অসম্মান আর প্রহারের চিহ্ন নিয়ে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে কোনো ঘর ছেড়ে এসেছে, মনে হচ্ছে সে কোনো রণক্ষেত্র থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে।
খালেদা বেগম ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে নিজের বুকে হাত চেপে ধরলেন। বকুল, কাজল আর শান্ত- যারা মিনিটখানেক আগেও হাসাহাসি করছিল, তারা পাথরের মূর্তির মতো জমে গেল। তাদের উৎসবের উঠোন মুহূর্তে পরিণত হলো এক শীতল, নীরব বিচারালয়ে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

দীক্ষা পাঁজরের কাছে এক তীব্র জ্বালা অনুভব করল। এই সেই মেয়ে- যার কাছে একদিন সে নিজের স্বামী আর সংসার তুলে দিয়েছিল। আজ সে কী নিয়ে এসেছে? আরও যন্ত্রণা? আরও অপমান? দীক্ষা পেটের ওপর হাত রেখে নিজেকে সামলে নিলো। তার চোখে এখন আর জল আসার শক্তি নেই, আছে শুধু তীব্র ঘৃণার এক স্থির শিখা। সে হেলান ছেড়ে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার গর্ভের ভার যেন তার মেরুদণ্ডকে আরও বেশি দৃঢ়তা দিল।
তৃণা ধীরে ধীরে, অতি সতর্ক পদক্ষেপে উঠোনে পা রাখল, যেন সে জানে তার পা ছোঁয়ায় এখানকার মাটিও অপবিত্র হয়ে যাবে। তার দৃষ্টিতে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু তীব্র ক্রোধ আর নিজের করুণ পরিণতির জন্য অন্যকে দায়ী করার এক উদ্ধত চেষ্টা।

এক পা ভেতরে পড়েছে কি পড়েনি, তার আগেই ধেয়ে এলো দীক্ষার উত্তাপ মিশ্রিত বাঁজখাই চিৎকার, ‘দাঁড়া…’
তৃণা টালমাটাল হলো। থমকে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে দীক্ষার দিকে তাকাতেই আবারও শুনতে পেল সেই বাঁজখাই গলা- যা ইহজীবনে কোনোদিন সে শোনেনি আর না শোনার কল্পনাও করেছিল!
দীক্ষা এগিয়ে এলো তরতর করে। একেবারে তৃণার মুখোমুখি, ‘খবরদার যদি এই বাড়িতে আর একটাও পা বাড়াস!’
‘তুই কে আমাকে ভেতরে যেতে না দেওয়ার? এটা তোর বাড়ি হলে আমারও বাড়ি! আমারও হক আছে।’
‘হক? কিসের হক? আর কেইবা তুই? তোকে এই বাড়ির কেউই পরিবারের একজন ভাবে না এখন আর। এবং জেনে রাখ, মা তোকে সন্তান হিসেবে বহু আগেই ত্যাগ দিয়েছে।’

‘মা?’ তৃণা খালেদা বেগমের দিকে তাকাল। তিনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন, কেমন দিশেহারা দৃষ্টিভঙ্গি। আজ বুঝতে পারছেন, সায়েমা বেগম কতবড় পাথর চাপা দিয়েছেন তার হৃদয়ে। খালেদা বেগম তৃণার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। তার ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, এরকম একটি সন্তান কিনা তার পেট থেকে জন্মালো! ও খোদা, এতবড় দায়ে তুমি বাঁধলা আমারে… মনে মনে আওড়ালেন তিনি। খুব নিচু স্বরে জড়ানো গলায় বললেন, ‘ওকে চলে যেতে বল দীক্ষা। আমার একটাই মেয়ে.. একটাই…’
তারপর ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে গেলেন নিজের ঘরের দিকে। কাজল তাকে ধরে নিলো যাওয়ার পথে। হঠাৎ করেই শরীরটা ভীষণ কাঁপছে তার। দিন দুনিয়া ঘুরছে ভনভন করে। গা ঘামছে। এটা কি স্ট্রোকের লক্ষণ?
দীক্ষা বলল, ‘শুনলি? এবার বিদেয় হ। তোকে কেন, তোর ছায়াও যেন আমি কক্ষনো আমার বাড়ির আশেপাশেও না দেখি।’

‘আপা…’ তৃণার কণ্ঠস্বর ভেঙে এলো এইবার।
সে আশা করেনি, নিজের মা তার সঙ্গে এতবড় বেঈমানী করবে! বড় বোনের মমতায় ছোটটার প্রতি বিন্দুমাত্র করুণাও রইলো না?
তৃণা একটা নিঃশ্বাস ফেলে। কোথায় যাবে সে? কই গিয়ে উঠবে? গত রাত থেকে যা যা হয়েছে…শেষ পররাষ্ট্র পুলিশ আসেনি। শিশির হাতে-পায়ে ধরে, টাকা খাইয়ে বাড়িওয়ালাকে থামিয়েছে। কথা দিয়েছে, আজকেই বাসা ছেড়ে দিবে সে। কিন্তু তৃণাকে নিয়ে আর একদন্ড বসবাস করবে না… কিছুতেই না।

অপরদিকে জ্ঞান ফিরলে তৃণা জানিয়েছে সে শুধু তার বাড়ি যেতে চায়। যেন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। শেষে ভোরের গাড়িতে করে তাকে রওনা করিয়েছে বাড়িওয়ালা আংকেল নিজের তাগিদে। সঙ্গে দিয়েছিল দারোয়ানকেও। সেই বয়স্ক বৃদ্ধ লোকও ঘুমন্ত তৃণার জায়গায় জায়গায় ছুঁয়েছে। তৃণা টের পেলেও প্রতিবাদ করতে পারেনি। এই শরীরটার প্রতি একটা ঘেন্না ধরে গেছে তার। যে যেভাবে পারছে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কেন? এতোটাই পতিতা হয়ে গিয়েছে সে!
বোকা তৃণারা জানেই না, পুরুষ মানুষের চোখে সেইসব নারীই সম্মানিত, যারা নিজেদের সম্মান ধরে রাখতে জানে সর্বদাই! নিজ ইচ্ছায় যে নিজের সম্মান বিলালো, তাকে কেউই ভালো চোখে দেখবে না বরং ফাঁক তালে সুযোগ খুঁজবে নিজেও একটু দলাই চটকাই করার জন্যে! তৃণার ব্যাপারটাও তাই হয়ে গেছে….
‘এখানে ভ্যাবদা মে রে দাঁড়িয়ে থাকলেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে, এই চিন্তা বাদ দিয়ে বের হ.. এক্ষুনি।’
তৃণা চোখ তুলে তাকাল, ‘আমি কোথায় যাব আপা?’
‘যেখানে থাকার জন্য আমাকে বের করে দিয়েছিলি, সেখানে গিয়ে থাকবি।’
‘ও আমাকে চায় না। ও তো তোকেই চায়…’

দীক্ষা উঠোন ফাটিয়ে হাসল। এত মজার কথা সে তার ইহজীবনে শোনেনি যেন। হাসতে হাসতে তার দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অঝোর ধারার নোনাজল…
‘একটু দয়া কর আমার উপর…’ বলল তৃণা, কণ্ঠে আকুতি মিশিয়ে।
দীক্ষা হঠাৎ করেই হাসি থামাল। গলার পারদ সর্বোচ্চে তুলে বলল, ‘দয়া? তুই আমার কাছে দয়া চাইছিস? যেদিন তুই আমার স্বামীর ঘরে ঢুকেছিলি, সেদিন আমার ওপর কি তুই দয়া দেখিয়েছিলি? যেদিন আমার পেটে থাকা সন্তানের কথা জেনেও শিশিরের হাত ধরে বেরিয়ে গিয়েছিলি, সেদিন তোর মধ্যে কি মানুষের মমতা ছিল? তুই কোনোদিন আমার বোন ছিলি না, তৃণা। তুই ছিলি একটা বিষাক্ত সাপ! আর সাপকে আমি আমার ঘরে জায়গা দিতে পারি না! তুই পথে পথে ঘুরে বেড়াবি! তোর পাপের প্রায়শ্চিত্ত তুই করবি! এটাই বিধাতার বিধান!’
‘ওহ.. হ্যাঁ, দয়া কেন দেখাবি তুই! সব ভুল তো আমার একার! আমি শিশিরকে ভালোবেসে ভুল করছি, ওকে চেয়ে ভুল করছি, ওর সঙ্গে একসাথে থাকতে চেয়ে ভুল করছি, আর ও কিছুই করেনি। ওর কোনো পাপবোধ নেই। আমাকে পথে পথে ঘুরাবি, আর তুই আবার গিয়ে ওর সাথে চাটাচাটি করবি। খুশি হচ্ছিস তো ভেতরে ভেতরে? তোর তো চাওয়া ছিল এটাই, তাই না? তোর অভিশাপ লেগেছে আমার জীবনে! তুই তো অভিশাপ দিয়ে আমাকে ঘরছাড়া করলি!’

দীক্ষা চোখ সরু করে তাকাল। শান্ত অথচ পাথরের মতো কঠিন স্বরে জবাব দিলো, ‘অভিসম্পাত? তুই অভিসম্পাত খুঁজছিস, তৃণা? আমি কখনও তোর অমঙ্গল চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম, তুই তোর কাজের ফলটা যেন হাতে হাতে পাস। আজ আমার অভিশাপ নয়, তুই তোর নিজের পাপের ফল ভোগ করছিস। তোর তো আজ সুখে থাকার কথা ছিল। শিশিরের হাত ধরে নতুন সংসার সাজানোর কথা ছিল। সেই সংসার থেকে এমন র ক্তা ক্ত অবস্থায় ছুটে আসতে হলো কেন? তোর এত ভালোবাসার শিশির তোকে কী দিয়েছে? শুধু এই কপাল-ভাঙা দাগ?’
তৃণার মুখটা কুঁচকে গেল। আঘাতটা সরাসরি তার অহংকারে লাগল। তার রাগ, যা এতদিন শিশিরের ওপর ছিল, তা মুহূর্তে স্থানান্তরিত হলো দীক্ষার দিকে।

তৃণা ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, ‘আর কার জন্য এসব হলো? তোর জন্য! তুই ওকে আবার টেনে নিয়েছিস আপা! তুই ওর দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছিস! সেইদিন, যেদিন ও তোকে ছেড়ে দিচ্ছিলো, সেইদিনও তুই তোর পেটের বাচ্চাটাকে দেখিয়ে ওকে আঁটকাতে চেয়েছিলি। আর শেষমেশ সেটাই করে দেখিয়েছিস। যে কিনা আমার ভেতর নিজের ভালো থাকাটাকে খুঁজে পেয়েছিল একদা, তার থেকে আজ শুনি- ও নাকি আমাকে বলে, তোর চেয়ে হাজার গুণ ভালো ছিল দীক্ষা! তুই একটা স্বার্থপর শালি! হাহ, আমি নাকি স্বার্থপর!’
তৃণার এই কথা শুনে বকুল দ্রুত দীক্ষার পাশে এগিয়ে এল। বকুল ফিসফিস করে বলল, ‘আপা, তুমি ভেতরে যাও। শরীর খারাপ হবে তোমার।’
দীক্ষা বকুলের দিকে না তাকিয়েই তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ এখন জ্বলন্ত কয়লার মতো। সে হাত তুলে বকুলকে থামিয়ে দিলো।

দীক্ষা দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিলো, ‘শোন! কান খুলে শোন! এই পেটের বোঝা দেখিয়ে আমি শিশিরকে চাইনি। শিশির আমার কাছে একটা নর্দমার কীট ছাড়া আর কিছু নয়। আর তুই? তুই তো সেই কীটকেই নিজের মনে করে আঁকড়ে ধরেছিলি। তুই বলছিস আমি ওকে টেনে নিয়েছি? তোর মতো নির্লজ্জ, লোভী বোন থাকতে অন্য কোনও শত্রুর দরকার হয় না, তৃণা! যে ভালোবাসা আপন বোনের সাজানো সংসার, তার বিশ্বাস, তার সম্মান তছনছ করে শুরু হয়— সেটা ভালোবাসা নয়, সেটা হলো নোংরা, জঘন্য স্বার্থপরতা! তুই ঘর ভাঙার সময় একবারও ভাবিসনি, আজ সেই ভাঙা ঘরের কাঁচে তোর নিজের হাত-পা কাটছে কেন?’
তৃণার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে শুরু করল। সে এখন রাগে-অপমানে কাঁপছে। দীক্ষা যেন তার জীবনের সব ভুল, সব পাপকে নগ্ন করে দিচ্ছে সবার সামনে।

তৃণা চিৎকার করে উঠল। তার গলায় এখন কান্না আর হিংস্রতা মিশে একাকার।
‘আমার স্বার্থ! আমার লোভ! তুই আমাকে কী দিবি তার হিসাব করিস? তুই তো একটা অকর্মণ্য! তুই তোর স্বামীকে সুখী করতে পারিসনি, তাই সে আমার কাছে এসেছিল! তোর ওই ঠান্ডা, আবেগহীন জীবন ভালো লাগেনি তার! আমাকে বিয়ে করার কথা ছিল তার! আমাদের একটা নতুন জীবন হতো! তুই, তোর এই পেটের বোঝা দিয়ে ওকে বেঁধে ফেললি! তুই জানিস না, ও আমাকে বিয়ে করত, যদি তুই ওর পিছু ছাড়তিস!’
দীক্ষা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার ভেতরে এতদিন ধরে জমে থাকা অপমান, বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণা- সব একসাথে ফেটে বেরোলো।

‘চুপ কর! একটাও মিথ্যে কথা বলবি না! শিশির তোকে বিয়ে করত না! তুই একটা ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের জীবনটা নষ্ট করেছিস! তোর কাছে সে এসেছিল কারণ সে আমাকে আঘাত করতে চেয়েছিল, আর তুই তার হাতে নিজেকে একটা অস্ত্র হিসেবে তুলে দিয়েছিস! তুই জানিস না? যে লোক নিজের সন্তানের মা’কে গর্ভবতী অবস্থায় ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে, সে তোর মতো একটা বিশ্বাসঘাতক রক্ষিতাকে কখনোই নিজের বউয়ের মর্যাদা দেবে না! তোর মতো সস্তা জিনিসকে সে শুধু ব্যবহার করেছে! তুই তো ওর কাছে একটা রাতের ফ্লার্ট ছাড়া আর কিছু ছিলিস না! তুই তো ছোট থেকেই আমার সবকিছুতে ভোগদখল বসিয়েছিস,তোর জন্মই শুধু লোভ আর পাপ নিয়ে হয়েছে, ছিঃ!’

তৃণা আর সহ্য করতে পারল না। দীক্ষার এই কথাগুলো তার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে বিঁধল। শিশিরের বলা সব অপমান, সব লাঞ্ছনা- সব যেন দীক্ষার মুখে সত্য হয়ে বেরিয়ে আসছে। তার ভেতরের ক্রোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে সামনের মাটির ঢেলাটা দেখতে পেল। রাগে তার শরীর কাঁপছে, চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেল।
‘হা রা মী, তুই আমাকে সস্তা বললি!’
তৃণা হাতের কাছে থাকা শুকনো মাটির একটা ঢেলা তুলে সজোরে ছুঁড়ে মারল দীক্ষাকে লক্ষ্য করে। সেটা দীক্ষার গা ঘেঁষে টিনের দেয়ালে লেগে ধুলো হয়ে গেল।
বকুল আর কাজল একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বকুল দীক্ষাকে আড়াল করে দাঁড়াল, আর কাজল গিয়ে তৃণার হাত চেপে ধরল।

কাজল হাঁক ছাড়ল, ‘কী করছিস তুই! আপার পেটে বাচ্চা! তোর কি বিন্দুমাত্র কাণ্ডজ্ঞান নেই? সাহস হয় কীভাবে এই বাড়িতে এসে এমন নৃশংসতা করিস?’
তৃণা উন্মত্ত হয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তার পুরো শরীর ক্রোধে কাঁপছে। সে কাজলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো এক লহমায়, চিৎকার করে বলল, ‘তোরা সবাই ওর দলে! তোরা সবাই মিলে আমাকে শয়তান বানালি! তোদের আমি দেখাবো! আমি একা হয়েছি তো কী হয়েছে? আমি তোদের কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবো না! কাউকে না…’
দীক্ষা এক ধাক্কায় বকুলকে সরিয়ে দিলো। সে এবার আর স্থির নয়। তার ভেতরে বইছে মাতৃত্ব আর অপমানের এক মিলিত ঝড়।

‘তুই… তুই আমার কী করবি, শুনি? তুই তোর নিজের ভালোবাসার মানুষকেই রাখতে পারলি না, আর আমার নতুন জীবন তুই ভাঙবি? তুই তো একটা জঞ্জাল! একটা বেয়াদব! এই দেখ, আমার এই হাতে এখন শক্তি! আমার এই পেটে এখন নতুন জীবন! তোকে দেখে আমি ভয় পাবো ভেবেছিস? যা ছিল আমার হারানোর, সব তো তুই আর তোর লম্পট প্রেমিক মিলেই নিয়ে গেছিস! বিশ্বাস, ভালোবাসা, সম্মান— সব! এখন আমার হারানোর আর কিছুই নেই, শুধু পাওয়ার আছে! আর তুই? তোর এখন কী আছে?’
দীক্ষা তৃণার খুব কাছে এগিয়ে গেল। তাদের দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস এখন উন্মত্ত বাতাসের মতো গরম।
দীক্ষা ফিসফিস করে, কিন্তু অত্যন্ত ভয়ানক স্বরে বলল, ‘তোর এখন আছে শুধু শূন্যতা। তোর আছে শুধু সেই পুরুষের ঘৃণা, যাকে তুই ভালোবাসার নামে চুরি করেছিলি। সে তোকে আর ভালোবাসে না, সে তোকে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে! তোর আর ওর সম্পর্কটা কোনোদিনই ভালোবাসার ছিল না, তৃণা। সেটা ছিল কেবল পঙ্কিল কাদা! তুই সেই কাদার ভেতরে ডুবে মরবি! আর আমি? আমি আলোয় ফিরব! আমার সন্তানকে নিয়ে অনেক দূরে যাবো। যেখানে তোর মতো প্রতারকদের ছায়া কখনো পড়বে না!’

এইবার তৃণা সত্যি সত্যি ভেঙে পড়ল। দীক্ষার প্রতিটি কথা যেন সত্যের তীর হয়ে তাকে আঘাত করছে। সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল। তার মুখের আঘাতের চেয়েও বুকের ভেতরের যন্ত্রণা এখন অনেক বেশি।
‘সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে এতবড় ষড়যন্ত্র করলি… শিশির আমার সাথে… তুই আমার সাথে… মাও আমার সাথে… আজ আম দুধ মিলে গেছে আর আমি আঁটি ছিঁটকে পড়েছি রাস্তায়। কি চেয়েছিলাম আমি? কি এমন চেয়েছিলাম রে? শিশিরকে চেয়েছিলাম, তার সাথে একটা সংসার করতে চেয়েছিলাম, মানছি তোদের মাঝখানে আমি আসছি তাই বলে আমার অনুভূতি তো অসত্য না! সেগুলিতেও আবেগ ছিল, ভালোবাসা ছিল, স্বপ্ন-আশা-আকাঙ্ক্ষা সব ছিল। সউউউব…তুই তো তোর সন্তান পেয়েছিস তাই না? আমাকে থাকতে দিতি নাহয় ওর সঙ্গে… কেন ওকে আমার থেকে কাড়লি আপা? কেন?’

তৃণা বাধভাঙ্গা নদীর ন্যায় হুহু করে কাঁদছে।
সেই কান্না দেখে দীক্ষার হৃদয়ের কোথাও অদ্ভুত এক শান্তি অনুভূত হচ্ছে, দুঃখের বদলে- কি আশ্চর্য!
এক সময় যার চোখের একটি ফোটা জল ও সহ্য হতো না তার, আজ সেই চোখজোড়ায় বন্যা বয়ে গেলেও দীক্ষার কিছু আসে যায় না.. কিচ্ছু না! তার সমস্ত সহানুভূতি যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

দীক্ষা শান্ত অথচ বিষ মেশানো কণ্ঠে বলল, ‘অনুভূতি! তোর অনুভূতি ছিল! ছিঃ, তোর সেই অনুভূতি আমার সংসারকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে! তুই বলছিস কেন আমি ওকে তোর থেকে কাড়লাম? আমার এতই ফালতু প্রয়োজন, তৃণা? যে মানুষ একবার নিজের সন্তান আর স্ত্রীকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে, সে কোনোদিন কারো আপন হতে পারে না! শিশিরকে আমি নিইনি। সে একটা আবর্জনা, আর আবর্জনা আমি আর আমার সন্তানের জীবনে আর রাখব না! আর যদি তোর এই ধারণা হয় যে সে শুধু তোর জন্যেই আমাকে ছেড়েছিল তবে তুই এখনও বড্ড বোকা। শোন! পাপের বাপও আছে! তোকে দিয়ে আমার ঘর ভেঙেছিল, আর দেখবি, তোকেও সে অন্য কারো জন্যেই ছেড়েছে! তোর পাপের বাবাও আছে, যে তোর চেয়ে আরও বড় শয়তান! তোর চেয়ে আরও বেশি লোভী, আরও বেশি চরিত্রহীন! তোকে সে ছুঁড়ে ফেলেছে- কারণ বিধাতা কখনও পাপকে ছাড় দেয় না!’

দীক্ষার এই কথাগুলো শুনে তৃণার কান্না হঠাৎ থেমে গেল। তার চোখ দুটো বিস্ফোরিত হলো। দীক্ষা কি বলতে চাইছে? শিশির কি তাকেও অন্য কারো জন্য ত্যাগ করেছে? তৃণা ফোঁপাচ্ছে, চোখগুলো যেন রক্তবর্ণ। সে মাথা ঝাঁকাল, ‘না! না! ও আমাকে অন্য কারো জন্য ছাড়েনি! ও শুধু তোর জন্য, তোর পেটের এই… এই অভিশাপের জন্য আমাকে ছেড়েছে!’
দীক্ষা এবার আর কথা বলার প্রয়োজন বোধ করল না। তার ভেতরে এখন আর কোনো মমতা নেই। এই মেয়েটা এখনও মিথ্যের মায়াজালে ডুবে আছে, নিজের অপরাধবোধকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। তার পাপের ফলটা যে শারীরিক কষ্টের থেকেও মানসিক যন্ত্রণা— সেটা বোঝানো দরকার। আর সেটা বোঝানোর জন্য শব্দ যথেষ্ট নয়।
দীক্ষা এক লহমায় তৃণার খুব কাছে এগিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার হাতটা উঠে এলো।
ঠাঁস!

প্রথম আঘাতটা পড়ল তৃণার বাম গালে। এমন সজোরে, এমন আকস্মিক যে তৃণা স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার মাথা একদিকে হেলে গেল, চোখের জল ছিটকে পড়ল উঠোনের মাটিতে।
ঠাঁস!
পরের আঘাতটা পড়ল তার ডান গালে। দীক্ষার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। তার গর্ভের ভার যেন তার হাতকে আরও বেশি শক্তি জুগিয়েছে। প্রতিশোধের এই তীব্র আগুন দীক্ষার সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে।
দীক্ষা হাঁসফাঁস করতে করতে, রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে উঠল।

‘নে! এই নে তোর পাপের ফল! এই নে তোর সেই অহংকার ভাঙার দাম! যে হাত দিয়ে তুই আমার বিশ্বাস ছুঁয়েছিলি, সে হাতেই আজ তোকে আমি শিক্ষা দিলাম! তুই বললি শিশির তোকে ফিরিয়ে নেবে? সে তোকে বিয়ে করবে? কুত্তার বাচ্চা! সে একটা ফালতু, নর্দমার কীট! সে তোর মতো স্বার্থপর একটা মেয়েকে শুধু ব্যবহার করেছে! তোকে সে কখনোই স্ত্রীর সম্মান দিতো না, রক্ষিতা বানিয়ে রেখেছিল! তোর মতো সস্তা মেয়েমানুষের জন্য এই বাড়িতে কোনো জায়গা নেই! সে আমাকে অন্য কারো জন্য ছাড়ুক বা তোকে ছুঁড়ে ফেলুক— সে আমার কাছে অতীতের আবর্জনা! তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই! তার মতো প্রতারকের কাছে আমি কেন ফিরতে যাব? আমার কি এতই কমতি নাকি? আমার কিসের অভাব? আমার কি এতই প্রয়োজন যে আবার গিয়ে ফেলা থুতু চাটব? যা! আর একটাও মিথ্যে কথা বলবি না! তোর জীবন তুই নিজে ধ্বংস করেছিস! আমার ওপর দোষ চাপাবি না!’
তৃণা দুটো থা প্প ড়ে আর দীক্ষার সেই উন্মত্ত ক্রোধে পুরোপুরি চুপসে গেল। সে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল, গাল দুটো জ্বালা করছে, কান বেয়ে নামছে রক্তের উষ্ণ স্রোত। কিন্তু এর চেয়েও বেশি জ্বালা করছে তার ভাঙ্গা অহংকার। সে আর মাথা তুলে দীক্ষার দিকে তাকাতে পারল না।

বকুল এই দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেলল। সে জানে, এই থা প্প ড় গুলো শুধু তৃণার গালে পড়ল না, তা দীক্ষার নিজের ভেতরে জমে থাকা সব কষ্ট, সব আঘাতের বহিঃপ্রকাশ।
দীক্ষা হাঁপাতে হাঁপাতে পেটের ওপর হাত রেখে নিজেকে স্থির করলো। এবার তার কণ্ঠস্বর কর্তৃত্বপূর্ণ, শান্ত কিন্তু চূড়ান্ত।
‘এই ঘর, এই উঠোন, এই ভিটে— সব আমার। আমার আর আমার সন্তানের। আর কোনো বিশ্বাসঘাতকের এখানে ঠাঁই নেই। তোর মতো বিষাক্ত মানুষকে এই বাড়ির আলো-বাতাস ছুঁতেও দেবো না! যা! যা বলছি! এখনই আমার চোখ থেকে দূর হ!’

কাজল আর দেরি করলো না। সে দ্রুত এগিয়ে এসে তৃণার বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।
কঠিন স্বরে বলল, ‘উঠ! তোর মতো বেয়াদব এখানে দাঁড়িয়ে থাকার যোগ্য না! তুই তোর নিজের বোনের জীবনটা নষ্ট করেছিস! আমরা তোর মুখও দেখতে চাই না! চল, বের হ এখান থেকে!’
কাজল প্রায় টেনে হিঁচড়েই তৃণার দুর্বল, কেঁপে ওঠা শরীরটাকে দরজার দিকে নিয়ে গেল। তৃণা কোনো প্রতিরোধ করলো না, যেন তার ভেতরের সব শক্তি ফুরিয়ে গেছে। সে যেন এক মৃতদেহের মতো কাজলের হাতের টানে দরজার বাইরে চলে গেল।

কাজল তৃণার শরীরটা দরজার বাইরে ঠেলে দিয়ে দ্রুত ফিরে এলো। বকুল ততক্ষণে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে এখনও জল, কিন্তু দীক্ষার পাশে দাঁড়িয়ে সে যেন আজ এক নতুন শক্তি পেয়েছে।
বকুল দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে, উঠোনের বাইরে, রাস্তার ওপর দাঁড়ানো তৃণার দিকে তাকাল।
‘শোন, তৃণা। তুই ভাবছিস তুই সব হারিয়েছিস বলে আপা খুশি হচ্ছে। হ্যাঁ, হয়তো হচ্ছে। কিন্তু তোর আজকের এই অবস্থা— এইটা আমাদের কারো কাম্য ছিল না। তুই শুধু তোর রূপ, তোর ক্ষণিকের লোভের বশবর্তী হয়ে নিজের জীবনটা ধ্বংস করেছিস। তুই ভালোবাসা আর ভোগের পার্থক্য বুঝিসনি। শিশির তোর সঙ্গে যা করেছে, সেটা তোর পাপের প্রাপ্য শাস্তি। আজ না বুঝলেও একদিন বুঝবি, নিজের বোন আর মায়ের চেয়ে বেশি আপন পৃথিবীতে আর কেউ হয় না! এখন যা! ফিরে যা তোর সেই স্বপ্নের রাজ্যতে। আর কোনোদিন এই পবিত্র উঠোনে তোর নোংরা পা জোড়া রাখবি না!’

বকুল এরপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলো না। সজোরে দরজার পাল্লা দুটো টেনে এক করল।
ঠাঁস শব্দে আওয়াজ হলো সজোরে।
দরজা বন্ধ হওয়ার সেই আওয়াজটা যেন শুধু কাঠে কাঠে আঘাত করলো না, বরং তৃণার জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা, সব আশা-ভরসার ওপর পড়ল এক চূড়ান্ত আঘাত।
দীক্ষা বকুলের দিকে তাকাল। তার চোখে কৃতজ্ঞতা। বকুল এসে দীক্ষার হাত ধরল। তারা দু’জনেই ক্লান্ত, কিন্তু এখন তারা স্বাধীন। দীক্ষার নতুন জীবনের যাত্রা যেন আজই শুরু হলো— সব আবর্জনা পরিষ্কার করে, সব বিষাক্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে।

‘ধুর, গ্রেট মিস্টেক হয়ে গেল, এই বছরের সবচেয়ে বড় গ্রেট মিস্টেক…কয়টা চ ড় আমারও দেওয়া উচিত ছিল। পুরুষের হাতের চ ড়, খেয়ে একদম ফিট হয়ে থাকত, সেই হতো, গ্রেট মিস্টেক…’
ক্ষণে ক্ষণে বলে উঠছে শান্ত। সে দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘরের পাশের ডাব গাছ তলায়, হাতে জ্বলছে সিগারেট, পাশে কাজল ও দাঁড়িয়ে নীরব ভঙ্গিতে।
শান্তর কথায় বিরক্ত হলেও কিছু বলছে না।

গভীর টানে আরেকটি ধোয়া ছেড়ে আবারও বলতে চাইলো শান্ত, ‘কীভাবে এত গ্রেট মিস্টেক করলাম যে…’ তার আগেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো বকুল। চোখে রাগ, কণ্ঠে বাষ্প মিশে, ‘আর কতবার এক বুলি আওড়াবেন? ওই সময় তো ভোদাইয়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন হাত গুটিয়ে… এখন বলে লাভ কি?’
শান্ত আহাম্মক বনে গেল, ‘আমি ভোদাই?’ এগিয়ে এলো কয়েক পা।

বকুলও সমান তেজে বলল, ‘তা নয়তো কি? দেখছেন আপার এই অবস্থা, ওকে তো প্রথমেই টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে দরজা আঁটকানো উচিত ছিল। ওকে দেখে আপা উত্তেজিত হলো, ভাগ্যিস একটা বিপদ হয়নি।’
শান্ত মাথা চুলকে নিলো, ওই সময় পরিস্থিতি এত জটিল আর আকস্মিক ছিল যে, বোধবুদ্ধি সব হাওয়ায় মিলিয়ে ছিল। তার উপর দীক্ষার এই রূপ তার কাছে একেবারেই নতুন। সবসময় মিষ্টভাষী, ভদ্র-নরম দীক্ষা যে এভাবে আগ্নেয়গিরি রূপ নিতে পারে, তা যেন স্বপ্নেও ভাবতে পারে না শান্ত। তার দিকে, তার কথার দিকেই যত মনোযোগ ছিল তার।

বকুল বলল, ‘তখন হাবার মতো দাঁড়িয়ে রইছেন আর গ্রেট মিস্টেক গ্রেট মিস্টেক করছেন। এক কথা একশোবার শুনতে ভালো লাগে না। যান, বাড়িতে যান।’
‘তুই আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিস?’
‘না, ভদ্র ভাষায় গেট আউট বলছি।’
‘আমি বুঝলাম না, তুই তো এমন ছিলি না রে বকুল। আমাকে যা তা বলিস, আবার তাড়ায় দেস। হঠাৎ করে তোর হইছে টা কি?’
‘ভূত চাপছে মাথায়।’

‘তাই তো মনে হচ্ছে। কিন্তু ভূত না পেত্নী। পেত্নীর মতোই ব্যবহার…’
বকুল কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকাল, ‘আমি পেত্নী? আমার ব্যবহার পেত্নীর মতো?’
শান্ত মাথা ঝাঁকাল, যেন ভীষণ বড় সত্য একটা কথা বলে ফেলেছে সে, ‘অবশ্যই। মনে কষ্ট পাইলেও সত্যি- তোর আচরণ হইছে পাগলার কুকুরের মতো। দেখলেই ঘেউ ঘেউ…’
রাগে ফেটে পড়ল বকুল। বড় আপার সামনে কি সুন্দর গলে গলে কথা বলতে পারে আর বকুলের সামনে তেজ.. তোর তেজের আমি ডট ডট ডট!
বকুল চোখ রাঙাল, ‘আমি পাগল কুত্তা তো, ঠিক আছে। পাগল কুত্তারে যাকে তাকে কামড়ে দেয়, জানেন তো? ভাগেন তার আগেই…’

শান্ত কাজলের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, ‘তোর বোনের মাথার স্ক্রু ঢিল হয়ে গেছে বোধহয়, টাইট দিস। না পারলে আমাকে ডাকিস। আমি শান্ত- মানুষের ঘরে আমার পা ফেলার জন্য কত ধরাধরি, আকুতি মিনতি করা হয়, সেই আমাকে কিনা তোর বোন…গেট আউট বলে! দেখি, কোন শান্ত আসে এখানে… দেখি আমি!’
কাজল ও কিছু বলল না। বরং দ্রুত পা চালিয়ে অন্যদিকে চলল। ঘরের অশান্তিতেই ভালো লাগছে না, আবার এই অশান্তি…

বকুল ও মশা তাড়াবার মতো ভঙ্গি করে বলল, ‘আরে যান, সকাল হতে না হতেই মুখটা নিয়ে আবার ছুটে আসবেন, জানাই আছে… যান তো যান আর জ্বালা দিয়েন না।’
‘আমি জ্বালা দেই? আমি মুখ উঠায়ে চলে আসি? আচ্ছা!’
শান্তর এত রাগ লাগল। ডাব গাছে ধরাম করে ঘুষি দিলো, যাওয়ার সময় গাদা ফুলের চারা পায়ে পিষলো, দরজা খুলে বেরিয়ে ঠাস করে দরজাটা আঁটকালো। এত জোরে- বকুল ও কেঁপে উঠল সেই শব্দে।

দীক্ষার বাড়ির কপাট বন্ধ হওয়ার শব্দটা কেবল কাঠের শব্দ ছিল না, সেটি ছিল তৃণার জীবনের ওপর পড়া এক চূড়ান্ত সীলমোহর। মাটির দিকে মাথা নত করে সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার গাল দুটো জ্বলছে, তার চেয়ে বেশি জ্বলছে তার ভেতরে জমে থাকা অহংকার। তার মা, তার বোন কেউ তাকে জায়গা দিল না। যাকে ভালোবাসার নামে কেড়ে নিয়েছিল, সেই শিশির তাকে শারীরিক নির্যাতন করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এখন সে কোথায় যাবে?
পথের ধারে এক ভাঙা বেঞ্চে সে ধপ করে বসে পড়ল। তার কাছে টাকা বলতে আছে মাত্র হাজার টাকার একটা নোট। বাড়িওয়ালার দারোয়ান মারফত শিশির করুণা করে তাকে দিয়েছিল। ওই টাকার ওপরেই এখন তার পুরো অস্তিত্ব নির্ভর করছে। এই টাকা দিয়ে সে কোথায় যাবে? তার থাকার জায়গা নেই, খাওয়ার সংস্থান নেই। তার নিজের ভুলে, নিজের স্বার্থপরতার আগুনে সে নিজেকেই পুড়িয়ে ছাই করে ফেলেছে।

হঠাৎই তৃণার মনে একটা জেদ চেপে বসল। না, সে হার মানবে না। সে বিশ্বাস করে, শিশিরকে সে বোঝাতে পারবে। তার ভালোবাসা মিথ্যা ছিল না। শিশির তাকে ছেড়ে যায়নি, সে শুধু সাময়িক রাগে অন্ধ হয়ে গেছে। দীক্ষা যা বলেছে, তা শুধু হিংসা থেকে। শিশির নিশ্চয়ই তাকে অন্য কারো জন্য ত্যাগ করেনি।
আমি ঢাকায় ফিরব- মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল তৃণা।
যে করেই হোক শিশিরকে খুঁজে বের করব। তাকে বোঝাব, আমার জীবনের ভুল শুধু তাকে ভালোবেসে ফেলার ভুল! সে আমাকে ভালোবাসে, আমি জানি! তাকে ছাড়া আমার এই মুহূর্তে আর কেউ নেই।
টাকা হাতে নিয়ে সে দ্রুত একটা বাসের সন্ধান করল, যা তাকে আবার ঢাকায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, সেই শহরে, যেখানে গত রাতে তার জীবনটা দু’টুকরো হয়ে গেছে।

ঢাকায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এলো। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত এবং ভীত তৃণা সোজা গিয়ে পৌঁছাল শিশিরের সেই ভাড়া করা বাসার সামনে, যেখানে গত রাতে তাদের তুমুল ঝগড়া হয়েছিল।
সে হাঁপাতে হাঁপাতে দরজায় ধাক্কা দিলো। দরজা খুলতেই সেই বাড়িওয়ালা সাহেব বেরিয়ে এলেন, যার সামনে গত রাতে তৃণা র ক্তা র ক্তি অবস্থায় পড়েছিল।
তৃণাকে দেখেই বাড়িওয়ালার চোখ কপালে উঠল। তার মুখটা ক্রোধে লাল হয়ে গেল।
‘এই, তুমি আবার এসেছ কেন? তোমার সাহস কত!’ বাড়িওয়ালা গর্জন করে উঠলেন।
তৃণা মিনতি ভরা গলায় বলল, ‘আঙ্কেল, আমি শিশিরের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। ও কোথায়? একটা বারের জন্য শুধু দেখা করতে দিন।’

‘কথা বলতে এসেছ? কাল রাতে কী নাটক করেছ, ভুলে গেছ? আরেকটু হলে পুলিশ কে আনতে হত। আমার বাড়ির সম্মান ধূলোয় মিশতো। তোমার মতো অশান্ত আর কুলাঙ্গার মেয়েকে আমি আমার বাড়ির ধারে-কাছেও দেখতে চাই না! যাও! এখান থেকে দূর হও। তোমরা দুজন মিলে আমার পুরো বাড়িটার নাম খারাপ করে দিয়ে গেছ। আশেপাশের সবাই কি কি বলছে, ছিঃ!’

বাড়িওয়ালা এক ঝটকায় তৃণাকে টেনে দরজার বাইরে বার করে দিলেন। তৃণা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না, সামনের সিঁড়ির ধাপের ওপর ছিটকে পড়ল। তার শরীরের আঘাতগুলো আবার নতুন করে টনটন করে উঠল।
‘আঙ্কেল, প্লিজ! প্লিজ শুনুন! ও আমাকে বলেছে ও আমাকে বিয়ে করবে…’
‘বিয়ে করবে? হাঃ! শিশির নামের ওই লম্পট ছেলেটা তোমাকে বিয়ে করবে? ও তো এই বাসা ছেড়েই চলে গেছে! আর কখনো এই এলাকায় ফিরবে কি না সন্দেহ!’ বাড়িওয়ালা ঘৃণাভরে বললেন।
তৃণা স্তব্ধ হয়ে গেল। চলে গেছে? শিশির চলে গেছে?

‘কোথায় গেছে আঙ্কেল? কোথায় গেছে ও?’ তৃণা এবার প্রায় চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
‘আমি কি জানি কোথায় গেছে। এসব ছেলেদের কোনো ঠিকানা বলতে কিছু আছে নাকি। আজ এখানে কয়দিন, কাল ওখানে কয়দিন, এদের কাজই বিয়ে ছাড়াই মেয়ে নিয়ে ফূর্তি করা- কি বাজে ব্যাপার, ছিঃ! যাও বিদেয় হও। এই এলাকায় ও তোমার ছায়া যেন আর না দেখি.. যদি দেখি না একদম পুলিশ ডেকে এনে ধরিয়ে দেবো। বিয়ে ছাড়া একসাথে থাকা…ছিঃ ছিঃ ছিঃ পাপে সমাজটা ভরে গেল, বাবারে…’
বাড়িওয়ালা সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলেন। দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজটা তৃণার কানে বাজল যেন এক মৃত্যুঘণ্টা।
হতাশায়, অন্ধকারে সিঁড়ির নিচে বসে পড়ল তৃণা। সে কী করবে? সে এখন কোথায় যাবে? তার জীবনে কি সব দরজা বন্ধ হয়ে গেল?

এই সময় অন্ধকারে এক পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে।
‘ওহ, বাহ! কে ইনি? আমাদের ছোট ম্যাডাম না? এখনো রাস্তায় বসে আছেন? কী ব্যাপার, আপনার বাবু কি নতুন শিকার খুঁজতে বেরিয়ে গেছেন?’ টেনে টেনে ব্যঙ্গ করে বললেন হাসিব, শুদ্ধ স্বরে- তৃণা মুখ তুলে তাকে দেখল নীরবে। প্রত্যুত্তর নেই।
হাসিব টিটকারির স্বরে বললেন আবারও, ‘তা আপনার বাবু আপনাকে নিয়ে যায় নাই ক্যানো? ফালায় গেছে ক্যানো? আমাদের জন্য নাকি? আমরা তো ছুঁয়েও দেখব না বাবারে বাবা। ছুঁতে গেলে আবার ফোসকা পড়ে নাকি আপনার…বিয়ে ছাড়া এক ঘরে থাকাতে পাপ নেই। আমরা ছুঁয়ে দেখতে গেলেই পাপ।’ বিশ্রি হেসে বলল, ‘একটা পতিতা কিনা সতীত্বের কথা বলে… হাহ!’

তৃণা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার মাথা নত হয়ে গেল লজ্জায়। সমাজের চোখে সে যে কত নিচে নেমে গেছে, হাসিবের এই কথাগুলো সেই নির্মম সত্যটা মনে করিয়ে দিলো।
‘এখানে বসে থেকে আর ঘরবাড়ি নোংরা কইরো না তো। আমরা পারিবারিক লোকজন। তোমাদের কারণে আমাদের উপরেও অনেক চাপ আসতেছে। বের হও ভাই…’ গলার স্বর বদলে আক্রোশ ভরা গলায় বললেন তিনি। যেন খুব অশুচি তৃণা, এমন ভাবে পাশ কাটিয়ে সিড়ির ধাপ ভাঙতে লাগলেন।
তৃণা উঠে দাঁড়াল, কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘হাসিব ভাই, উনি… উনি কোথায় গেছেন, জানেন? সত্যি কি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন?’

হাসিব থেমে ঠোঁট উল্টে বললেন, ‘তো কি এখানে বসে বসে পুজো দেবে নাকি! ওরকম একটা চরিত্রহীন মানুষকেই বা আমরা আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে মানবো কেন? দিয়েছে বাড়িওয়ালা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে। গেছে বোধহয় নিজের বাড়িরে ফিরে। ফূর্তি তো যথেষ্ট হয়েছে দু’জনের- খালি আমরা করতে গেলেই দা ব টি তুলে লাফঝাঁপ দেওয়া… নাটকের শেষ নাই বাপরে বাপ…’
শিশির তার বাড়িতে ফিরে গেছে! এই খবরটা তৃণার মাথায় যেন বিদ্যুৎ হানল। দীক্ষা মিথ্যে বলেনি! শিশির তাকে সত্যি সত্যিই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু সে কেন? সত্যিই কি অন্য কারো জন্যেই? নাকি দীক্ষা মিথ্যে স্বান্তনা দিয়েছে?

তৃণার সমস্ত শরীরে এক তীব্র ক্রোধ আর জেদ আবার ভর করে এলো।
এক সেকেন্ডও দেরি না করে, তৃণা কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়াল। হাতে থাকা খুচরো কিছু নোট আঁকড়ে ধরে সে আবার ছুটল। এখন তার গন্তব্য সেই বাড়িতে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল এই অধ্যায়টি।
রাত তখন গভীর। ঢাকার রাজপথে এখন কেবল নৈশপ্রহরী আর দু-একটি গাড়ির শব্দ। তৃণার বুকের ভেতর সেই ঘন রাতের চেয়েও কালো এক অস্থিরতা। তার পোশাক এলোমেলো, চেহারায় অবসাদ আর চোখে ভয়। এই শহরের কোনো ঠিকানাই আজ আর তার নয়।
বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তৃণার মনে হচ্ছে বুকটা অসময়ে থেমে যাবে। এই বাড়িই তার শেষ আশা। আঙুল কাঁপতে কাঁপতে কলিংবেল চাপল সে।
একবার… দু’বার… তিনবার…

তার অস্থির মন অপেক্ষায়, শিশির বোধহয় দরজা খুলবে। কিন্তু না। ঘুম ভাঙা চোখে, এলোমেলো চুলে সামনে এসে দাঁড়াল শর্মিলা। তৃণাকে দেখেই তার মুখের রঙ সাদা হয়ে গেল। বিস্ময়, ঘৃণা আর ক্রোধে তার চোখ জ্বলে উঠল।
‘তুমি?’ চিৎকার করে উঠল শর্মিলা।
শর্মিলার চিৎকারে যেন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তৃণার শেষ প্রতিরোধটুকু ভেঙে গেল। সে শর্মিলাকে এক প্রকার ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। পাগলের মতো বলতে লাগল, ‘শিশির কই? শিশির কই? ও কোথায়?’ এদিক ওদিক তাকাচ্ছে বারংবার— যেন শিশির লুকিয়ে আছে সোফা বা পর্দার আড়ালে।
‘এই! এই! এইভাবে কেউ ঢোকে? থামো!’ শর্মিলা তাকে থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তৃণা ততক্ষণে দৌড়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে গেছে।

শব্দে শব্দে জেগে উঠল পুরো বাড়ি। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল রুমেল। সায়েমা বেগমও দরজা খুলছেন। ঝুমা কোলে বাবুকে নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ঘরের দরজার মাথায়।
রুম খুঁজে, সোফার পেছনে তাকিয়ে, বারান্দায় উঁকি মেরে তৃণা শুধু একটাই নাম ডাকছিল বারবার, ‘শিশির… শিশির… কোথায়, কোথায় লুকিয়েছেন আপনারা ওকে…’
শর্মিলা চেঁচিয়ে উঠল, ‘রাত বিরাতে এ বাড়িতে ড্রামা করতে আসছ? বের হও অসভ্য মেয়ে! আমাদের পারিবারিক সম্মান ধূলোয় মিশিয়ে দিতে চাও?’

তৃণা থেমে গেল। তার চোখ ফাঁকা, নিঃশ্বাস হাঁপাতে থাকা। ঠিক সেই মুহূর্তেই সায়েমা বেগম এগিয়ে এলেন।
তীক্ষ্ণ, ধারালো চোখে তৃণাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখলেন সায়েমা বেগম, ‘হয়েছেটা কি?’ গম্ভীর স্বরে বললেন তিনি, ‘তুমি এখানে কেন? আর শিশির শিশির করে চেঁচাচ্ছো কেন? ও কি এ বাড়িতে আছে নাকি?’
তৃণা আকুল হয়ে জবাব দিলো, ‘আছে। অবশ্যই আছে। আপনারা ওকে লুকিয়ে রেখেছেন। এই বাড়ি ছাড়া ও আর যাবে কই? ও তো আর কোনোদিন ভাড়া বাসায় ফিরবে না।’
সায়েমা বেগম তীব্র কঠিন স্বরে বললেন, ‘ও জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাক, আমার কিছু আসে যায় না। কিন্তু একদম চেঁচাবে না তুমি। খবরদার! এটা আমার বাড়ি আর এটা ভদ্রলোকের পাড়া। তোমার কারণে আমার সংসার এমনিতেই এলোমেলো হয়ে গেছে।’

‘আমার কারণে নাকি আপনার ছেলের কারণে?’ তৃণা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো। তারপর নিজেকে সামলে নিলো। ‘আচ্ছা যাইহোক, ওসব এখন তুলতে চাচ্ছি না। আমি শুধু ওর খোঁজ চাই আম্মা।’
‘আম্মা?’ সায়েমা বেগমের চোখ কপালে উঠল। তার মুখটা ক্রোধে কঠিন হয়ে গেল।
‘এই মেয়ে, তুমি আম্মা কাকে ডাকো? তোমার সাহস তো কম না! যে আমার আরেকটা নিরীহ মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে, সে আমাকে মা ডাকার স্পর্ধা রাখে?’
শর্মিলা দ্রুত এগিয়ে এলো, ‘মাথার তার সব কি ছিঁড়ছে নাকি? কোথায় কী বলতেছ, হুঁশ খেয়াল আছে? নোংরামি করতে এসেছ?’

তৃণা কেঁদে ফেলল আচমকাই, ‘আপনারা প্লিজ আমার সাথে যা খুশি ব্যবহার করেন কিন্তু এখন না, প্লিজ, আমাকে বলেন না শিশির কোথায়? আমি উনাকে খুঁজে পাচ্ছি না। উনি আমাকে মাঝ রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন, মাও আমাকে ঘরে ঢুকতে দেননি। আমি এখন কী করব?’
শর্মিলা কটাক্ষ করে হেসে উঠল, ‘ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে নাকি? ওর তো ছাড়াটাই স্বভাব… তা এত পাগল হচ্ছ কেন? দীক্ষাকে যখন ছাড়লো, তখন তো কিছুই বলোনি। ও আচ্ছা আচ্ছা, নিজের ঘাড়ে পড়লে বোঝা যায় ব্যথা কতটা, তাই না?’

তৃণার জবাবের আগেই সায়েমা বেগম এবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে এগিয়ে এলেন।
সায়েমা বেগম রুমেলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, ‘ওকে চলে যেতে বল রুমেল। কে কাকে ছেড়ে কই গেছে, এসবের জন্য এই গভীর রাতে আমাদের বাড়িতে হৈ হল্লা করার কোনো মানে হয় না। বের করে দিয়ে দরজা লাগা।’
অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল তৃণা, সায়েমা বেগমের পায়ের উপর পড়ে গেল সহসাই। তার সমস্ত অহংকার, জেদ- সব যেন মুহূর্তে ভেঙে চুরমার।

‘এই মেয়ে এই… ছাড়ো… আমার পা ছাড়ো…’ খেঁকিয়ে উঠলেন সায়েমা বেগম।
তৃণা আরও শক্ত করে পা জোড়া চেপে ধরে বসল। তার কণ্ঠে এখন কেবল এক পরাজিত মানুষের আকুতি।
‘আম্মা, আপনি আমাকে তাড়িয়ে দেবেন না। আমি কোথায় যাব? আপনার ছেলে আমাকে মাঝরাস্তায় ফেলে দিয়েছে… আমার মা-দিদিও আমাকে ঘরে জায়গা দেয়নি। এই শহরে আমার চেনা জানা আর কেউ নেই। আপনি দয়া করেন আম্মা, দয়া করেন…’

সায়েমা বেগমের চোখে এক মুহূর্তের জন্য হয়তো মমতা দেখা গেল, কিন্তু সেই মমতা ছিল তীব্র কষ্টের। তিনি জানেন, এই করুণা দেখালে তাদের পরিবারে আরও সর্বনাশ নেমে আসবে। তিনি তার পা মুক্ত করার চেষ্টা করলেন না এবার বরং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
‘দয়া? তুমি আমার কাছে দয়া চাইছো, তৃণা? আমি তোমার চোখেই কেবল নিজেকে দেখতে পাচ্ছি। একদিন তুমিও তো দয়া দেখাওনি। যখন তোমার বোন অন্তঃসত্ত্বা ছিল, তার প্রতি তোমার ন্যূনতম মমতা ছিল না। যে মানুষ নিজের বোনের সর্বনাশ করে, যে মানুষ একটা কোমল প্রাণকে (দীক্ষার গর্ভের সন্তান) ভুলে অন্য পুরুষের হাত ধরে, সে অন্যের কাছে কীসের দয়া আশা করে?’
তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘আমি দয়া তার ওপরই করিনি, যে আমার পেটের সন্তান। আমার ছেলে শিশির, সে যখন আমার মেয়ের মতো বৌকে ঠকালো, তার ওপর আমার বিন্দুমাত্র দয়া ছিল না! তোমার মতো অন্যায়কারীর ওপর আমার কোনো দয়া হয় না। এটা তোমার কর্মফল। পৃথিবীতে কেউ কাউকে ঠকিয়ে সুখে থাকতে পারে না। লোভ আর বিশ্বাসঘাতকতার ফসল কখনও মিষ্টি হয় না, তা কেবল তিতা স্বাদ দেয়। এই কঠিন সত্যটা তোমার বোঝা উচিত ছিল, তৃণা। তোমাকে আজ যে কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে, এটা তারই প্রতিদান। আমি তোমার আম্মা নই, আর আমার এই বাড়িতে তোমার কোনো ঠাঁই নেই।’

সায়েমা বেগম এবার রুক্ষভাবে তার পা ছাড়িয়ে নিলেন।
তিনি রুমেলের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন, ‘রুমেল, আর এক মুহূর্তও না। এই অশুভ মেয়েকে টেনে বাইরে বের করে দাও। দরজা বন্ধ করো।’
রুমেল এগিয়ে এলেন। তার চোখেও ঘৃণা স্পষ্ট। তিনি তৃণার বাহু শক্ত করে চেপে ধরলেন।
‘উঠ! চল বাইরে!’ রুমেল এক ঝটকায় তৃণাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
তৃণা এবার রুমেলের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করলো।
‘না! না! আমাকে বের করে দেবেন না! আমাকে শিশিরের খোঁজ দিন! আমি যাব না! আমাকে থাকতে দিন!’ তার কান্না আর চিৎকারে বাড়িটা কেঁপে উঠল।
রুমেল তাকে টেনে হিঁচড়ে গেটের দিকে নিয়ে চললেন। তৃণা ক্রমাগত কাঁদতে থাকল। শর্মিলাও এবার নিজেকে সংযত রাখতে পারল না।

শর্মিলা গেটের কাছে এগিয়ে এসে তৃণার পিঠে সজোরে ধাক্কা দিলো।
‘যাও! বের হও! বের হও বজ্জাত মেয়ে। নারী জাতীর কলঙ্ক জানি কোথাকার। বলেছিলাম না, দু’জনের পরিনাম কি হবে, মনে আছে? শিশির ভিক্ষার থালা হাতে নেবে নাকি জানি না তবে তুমি রাতের রাণী হয়ে যাও। এত টাকাপয়সা পাবে… তোমার লোভের কুয়া ভরে যাবে তাতে। যত্তসব বাজারি মেয়েলোক…’

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৯

সেই ধাক্কায় তৃণা গেটের বাইরে অন্ধকারে ছিটকে পড়ল। রুমেল আর শর্মিলা দ্রুত গেট বন্ধ করে দিলো। ভেতরের কঠিন তালাটা পড়ে যাওয়ার শব্দে তৃণা বুঝল, তার জীবনের শেষ আশ্রয়ও আজ হাতছাড়া হলো।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২১