Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৫

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৫

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৫
মৃধা মৌনি

বৃষ্টি পড়ছে নাকি?
এখন তো শীতকাল, এ সময় বৃষ্টি আসবে কোথা থেকে! কিন্তু বৃষ্টি তো হচ্ছে। যদিও তার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে না। চোখের উপর টিপটিপ করে পড়ছে।
অঞ্জলির মা এক মুঠো পানি ছিটিয়ে দিল তৃণার মুখে।
তৃণা ধড়মড় করে চোখ মেলতেই তিনি বড্ড বিরক্ত গলায় বললেন, ‘জ্ঞান ফিরছে মাবুদ! উঠো, উইঠা বসো।’
মাথার ভেতরটা ফাঁকা লাগছে। একদন্ড আশেপাশে তাকিয়ে তৃণা উঠে বসতেই তিনি খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসলেন, ‘হায় হায়! কাজ শুরুর আগেই জ্ঞান হারাইছ! কাজ যখন করবা, তখন কি হইবো? যাও যাও, উঠো। স্যারের নতুন মেহমান তোমার অপেক্ষায়। গিয়া পায়ে তেল ডলা দাও।’
তৃণার চোখেমুখে মুহূর্তেই অন্ধকার নেমে এলো।
এগুলো… সবই কি সত্যি??

না, স্বপ্ন না। দুঃস্বপ্নও না। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নির্মম বাস্তবতা। তাকে সেবা দিতেই হবে তাও দীক্ষাকে!
তৃণার বুকের ভেতরটা ধুকধুক করে উঠল।
কীভাবে কী হলো? কেন হলো? কখন হলো?
একটা প্রশ্নের উত্তর নিলে আরেকটা দাঁত বের করে তার উপর চড়াও হচ্ছে।
তবুও যন্ত্রমানবের মতো তৃণা পা টেনে টেনে গেল দীক্ষার ঘরের দিকে।
দরজা ঠেলে ঢুকতেই তার চোখ দু’টো ছবির মতো স্লো-মোশনে বড় হয়ে গেল।
দীক্ষা বিছানায় রাজকীয় ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার পাশে বকুল!
হ্যাঁ, বকুলও! কখন এল? কিভাবে এল? দু’জনেই সাজগোজে টপ-ক্লাস, গল্পে মশগুল। যেন রাজকীয় কোনো অতিথিশালা- তৃণা মাত্রই তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়ে ঢুকেছে!

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

তৃণার মুখ খোলার আগেই বকুল মাথা তুলে বলল, ‘এই যে কাজের মেয়ে, কোথায় ছিলে এতক্ষণ? আমার বোন তো ঘুমাবে। এসো, পায়ে তেল ডলো। কি তেল আনছ, দেখি তো!’
তৃণা দাঁড়িয়ে রইল। হতবুদ্ধি, অপমান, অবিশ্বাস- সব একসাথে তার ঘাড়ে চেপে বসল। তাকে ‘কাজের মেয়ে’ বলল! বকুল! যে বকুল কখনো তার সঙ্গে বসে বিস্কুট ভাগাভাগি করে খেত!
এদিকে দীক্ষা? একবারও মুখ তুলছে না। মোবাইলে চোখ গেঁথে রেখেছে। যেন তাকে দেখার মতো সময়টুকুও তার কাছে নেই। কিন্তু, তার মনের ভিতরে ঝড় বইছে যে। ভাবছে, এভাবে সব কীভাবে হলো? কোথা থেকে শুরু? কেন এসব হচ্ছে?

তৃণার চোখে তখনও অবিশ্বাসের ধোঁয়া। ঘরটার বাতাস ভারি, তার বুক আরও ভারি। বাইরে কেউ যেন অদৃশ্য ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে ঘোষণা করছে, বদলার দিন শুরু হয়েছে।
এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই, সময় যেন দীক্ষার হাত চেপে ধরে তাকে টেনে নিয়ে যায় কয়েক ঘণ্টা আগের সেই রৌদ্রজ্বল বেলায়… যেখানে সবকিছুর সূচনা লুকিয়ে আছে।
খালেদা চলে যেতেই দীক্ষা উঠানের মাঝ বরাবর পাতা বড় মোড়াটার সামনে হেলান দিয়ে বসল। দু’পা ছড়িয়ে দিয়েছে সে। পিঠে মোড়ার শক্ত তক্তার পরশ, গায়ে সকালের মিঠে রোদ- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আরাম ধরেছে শরীরে। রোদের উষ্ণতা গা গরম করে তুলছে, আর দীক্ষার চোখের পাতায় টান পড়ছে হালকা।
দীর্ঘক্ষণ চোখ বুঁজে থাকার পর, যখনই বন্ধ চোখের অন্ধকারে শিশিরের মুখ ভেসে ওঠে, অস্বস্তি লাগে। দীক্ষা চমকে চোখ মেলে।

আর চোখ মেলামাত্রই, সে ধড়মড়িয়ে সোজা হয়ে বসে যায়। হৃদপিণ্ড যেন হুড়মুড়িয়ে বুকের ভেতর থেকে বাইরে লাফ দিতে চাইছে। তার সামনে, কিছু দূরে দাঁড়িয়ে এক অচেনা মেয়ে তাকিয়ে আছে স্থির, গভীর, অদ্ভুত দৃষ্টিতে।
দীক্ষার বিস্ময় দেখে আগন্তুকটিও চমকে ওঠে। তারপর দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে নরম গলায় বলে,
‘ভয় পাবেন না। আমি… আমি নয়ন, নয়নতারা! আপনার সাথে একটু কথা বলতে এলাম।’
দীক্ষার ভ্রু কুঁচকে একত্র হয়ে আসে। এই মেয়ে কে? এখানে এল কখন? আর তার দিকে এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল কেন?

‘কথা? আপনি… আপনি কে? আর এখানে কীভাবে এলেন? কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে এভাবে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?’ দীক্ষার স্বরে এক ধরনের সতর্ক ভাব।
নয়নতারা মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, বরং এক ধরনের পুরোনো বিষাদের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল, কিন্তু দীক্ষার কাছ থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখল।
প্রথমেই নিজের পরিচয় দিলো না নয়নতারা। মিথ্যে করে বলল, ‘সকাল থেকে একটা কাজে বাইরে এসেছিলাম। ফিরতি পথে এই বাড়ির উঠোনের শান্তি দেখে কেমন যেন একটা ঘোর লেগে গেল। আমি আসলে… আপনার নীরবতা দেখতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আপনার চেহারায় এক ধরনের কষ্ট আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে একটা শান্তি। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম, তাই হয়তো খেয়াল করিনি যে আপনি চোখ খুলেছেন।’

‘আমার কষ্ট? আর শান্তি? আপনি বেশ দার্শনিক! কিন্তু কাজের কথা বলুন। আপনি কী চান? এই গ্রামের বাড়িতে অচেনা মানুষ তো এমনি আসে না।’ দীক্ষা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
হাসল নয়নতারা, দীক্ষা যথেষ্ট বুদ্ধিমতি একজন, আহারে বেচারা শিশির… কি রেখে কিসের পেছনে ছুটেছে…
‘ঠিকই বলেছেন। আমি আপনাকে চিনি। হয়তো আপনি আমাকে চেনেন না। কিন্তু আপনি আমার খুব চেনা একজন মানুষের খুব কাছের মানুষ ছিলেন…’
দীক্ষার মুখ থেকে হঠাৎ করেই যেন রক্ত সরে গেল। তার ফর্সা মুখে একটি অদৃশ্য মেঘের ছায়া নেমে এল। ‘খুব কাছের মানুষ’ বলতে সে কাকে বোঝাচ্ছে, তা এক ঝলকেই বুঝে নিতে পারল দীক্ষা।
‘কার কথা বলছেন আপনি?’

নয়নতারা এবার ধীরে ধীরে মোড়াটার কাছাকাছি মাটির ওপর বসে পড়ল। তার চোখ এখন স্থির দীক্ষার চোখে।
‘আমি যার কথা বলছি, তার নাম শিশির। আপনার… স্বামী।’
দীক্ষা চোখ বন্ধ করল। একটা দীর্ঘশ্বাস নিল, যেন তার ভেতরের বাতাস বিষাক্ত হয়ে গেছে।
‘তার কথা আপনার জানার কথা নয়। আর আমার তো নয়ই। কেন এসেছেন আপনি?’ কণ্ঠস্বরে তিক্ততা ফুটিয়ে তুলল দীক্ষা।
‘জানি। বেশিক্ষণ থাকবো না আমি, চলে যাব কিন্তু তার আগে কিছু কথা বলার আছে। আপনি হয়তো জানেন না, আপনার মতো আরও কিছু মানুষ আছেন, যারা শিশিরের জন্য… অনেক কষ্ট পেয়েছে। আর এই কষ্টগুলো সবটাই এক সুতোয় বাঁধা। আমি সেই সুতোর একটি ছোট গিঁট, যে আপনার কাছে এসেছে শুধু এটা বলতে যে, আপনি একা নন।’

‘হ্যাঁ আমিও জানি আমি একা নই। আমার সন্তান আমারই সঙ্গে আছে।’ দীক্ষা নিজের পেটের উপর একটা হাত রাখল, ‘আমার এখনকার জীবনে বাইরের কারো স্থান নেই। আর শিশিরের কথা… প্লিজ, আমাকে শুনতে দেবেন না। সে আমার কাছে মৃত।’
‘আমি জানি, আপনার কাছে তিনি মৃত। আমি আপনাকে কোনো আঘাত দিতে আসিনি। বরং এসেছি, আপনাকে একটা গল্প শোনাতে। এই গল্পটা শোনার পর আপনি হয়তো শিশিরকে ঘৃণা করা ছেড়ে দেবেন… হয়তো একটু করুণা করবেন।’ নয়নতারা শান্ত স্বরে বলল।

নয়নতারা এবার নিজের হাত দুটো জোড় করে বসে থাকল।
‘শুনুন, আমি যখন ছোট ছিলাম, আমাদের গাঁয়ে একটা লোক ছিল। সে নৌকা তৈরি করত। নাম ছিল তার ‘সোনাডিঙি’। নৌকাটা দেখতে খুব সুন্দর ছিল, মসৃণ কাঠ, পালগুলো নতুন কাপড়ের। কিন্তু লোকটা কখনোই সোনাডিঙি নদীতে নামাতো না। সে বলত, এতে আমার সব স্বপ্ন ভরা। নদীতে নামালে নোংরা হবে, মাঝির হাতে ছেঁড়া পাল হবে, শেষে ডুবে যাবে। সে বছরের পর বছর নৌকাটা ডাঙায় ফেলে রাখল। সবাই বলল, নৌকাটা বানানোর কোনো মানে হলো না। শেষে একদিন ঝড় এলো। নদীতে নয়, ডাঙাতেই সেই ঝড়। সোনাডিঙি নৌকোটা ডাঙাতেই উল্টে গেল, কাঠগুলো পচে গেল। স্বপ্নগুলোও মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল।’
দীক্ষা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল।

‘আপনি… এই গল্প কেন বলছেন?’
‘শিশিরও ছিল সেই লোকটার মতো। সে একটা সুন্দর জীবন তৈরি করেছিল। আপনার মতো একজন বন্ধুকে স্ত্রী বানিয়ে, একটা পরিবার তৈরি করে। আপনার মতো নারীকে, ভালোবাসার মানুষকে সে নিজের জীবনে পেয়েও… নদীতে নামায়নি। সে চেয়েছিল সব কিছুকে নিজের কব্জায় রেখে শান্তিতে থাকবে। কিন্তু জীবন স্থির জল নয়, দীক্ষা। জীবন একটা নদী, যেখানে ভাসতে না পারলে… ডাঙার ঝড়েও ভেঙে পড়তে হয়। শিশির ভেঙে পড়েছে। খুব ভয়ঙ্করভাবে ভেঙে পড়েছে।’

নয়নতারা এবার দীক্ষার আরও কাছাকাছি এল।
‘আমি তার সাথে কিছু সময় কাটিয়েছি। আমি তাকে দেখেছি, কত সহজে সে আপনাকে, আপনার বোনকে, এমনকি আমার মতো সমাজের তথাকথিত ‘পতিতা’-দেরও ব্যবহার করতে পারে। সে শুধু আরাম খুঁজতো, শান্তি নয়। আর আমি… আমি তাকে সেই আরামের শেষ ঠিকানাটি দেখিয়ে দিয়ে এসেছি।’
দীক্ষা এবার নড়ল না। তার মুখ আরও মলিন হয়ে এল। তার ভেতরে হয়তো কিছুটা আশা ছিল যে, শিশির ফিরে আসবে, ভুল স্বীকার করবে। সেই ক্ষীণ আশাটাও যেন চূর্ণ হয়ে গেল।

‘কী বলতে চাইছেন আপনি, স্পষ্ট করে বলুন!’ দীক্ষা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
‘আমি বলতে চাইছি… শিশির আর নেই। না, সে মারা যায়নি। কিন্তু তার ‘পুরুষত্বের অহংকার’টুকু আর নেই। সে তার নিজের সৃষ্ট নরকেই এখন পড়ে আছে। সে এখন বিছানায় শুয়ে থাকা এক অক্ষম মানুষ, যার কাছে নারী কেবলই মাংসের টুকরো, আর সমাজ শুধু পায়ের তলার মাটি। সে আর কারও ওপরেই ছড়ি ঘোরাতে পারবে না। সে আর কারো জীবন নিয়ে খেলা করতে পারবে না। আমি তার শরীরের সেই অংশটুকুই ছিন্ন করে এসেছি, যা তাকে অহংকার দিত, যা তাকে নারীজাতির ওপর ক্ষমতা দেখাতে সাহায্য করত। এমনকি সে তো তার সন্তানকেও চাইনি, আর যাতে কোনোদিন সেই সন্তান তার জীবনে না আসে, সেই ব্যবস্থাই করে এসেছি। সন্তান নামক নিয়ামত থেকে শিশিরের জীবন বহু দূরে…’

নয়নতারার স্বর এতটুকু কাঁপল না। কিন্তু দীক্ষার চোখে এখন কোনো জল নেই। কোনো রাগ নেই। সে একদম জমে গেছে। তার শরীরের সমস্ত রক্ত চলাচল যেন বন্ধ হয়ে গেছে। তার চোখ খোলা, কিন্তু সেই চোখে দৃষ্টি নেই।
নয়নতারা তার হাত ধরে বলল, ‘আমি জানি, আপনার মনে এখন হাজারটা প্রশ্ন। আমি একজন পতিতা, যে টাকা দিয়ে শরীর বেচে, সে কেন আপনার স্বামীর ওপর এমন প্রতিশোধ নিতে গেল? এর কারণ একটাই, দীক্ষা। শিশিরের মুখে যখন শুনলাম, আপনার মতো একজন স্নেহময়ী নারীকে সে কত সহজে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে, আপনার মাতৃত্বকে সম্মান করতে পারে না, আপনার বোনকে ব্যবহার করে… তখন আমার বুকের ভেতরের আগুন জ্বলে উঠল। কারণ, আমার মতো শত নারী আপনার স্বামীর মতো ‘ভদ্র’ পুরুষদের হাতেই প্রতিদিন নির্যাতিত হয়। আপনারা, যারা আলোতে থাকেন, আর আমরা, যারা অন্ধকারে— আমাদের কষ্টটা আসলে একই সুতোয় বাঁধা। আমরা সবাই কোনো না কোনো পুরুষের লোভ, অহংকার আর কামের শিকার।’

নয়নতারা চোখ নামাল।
‘আপনার জীবনের এই সর্বনাশ, আপনার বোনকে ব্যবহার করা… সবকিছুর জন্য আমি জানি আপনি কষ্ট পেয়েছেন। হয়তো এই প্রতিশোধের মাধ্যমে আমি আপনাকে মানসিক শান্তি দিতে চেয়েছি। কিন্তু আপনার জীবনে শান্তি আনার জন্য আমি আরেকটা অন্যায় করে এসেছি। আমি… আমি খুব লজ্জিত, দীক্ষা। আমার মতো একজন মানুষের এই কাজে হয়তো আপনার আরও ঘৃণা হবে। আমি ক্ষমা চাইছি… আমার দিক থেকে।’

দীর্ঘ নীরবতা। দীক্ষা স্থির, পাথরের মতো। তারপর, দীক্ষা খুব ধীরে ধীরে এক দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল। তার মুখে সেই জমে যাওয়া ভাবটা একটু একটু করে নরম হলো। সে নয়নতারার হাত থেকে নিজের হাতটা সযত্নে সরিয়ে নিল।
‘আপনার কিসের জন্য ক্ষমা চাইছেন, আমি জানি না। আর শিশিরের… শিশিরের কী হলো, না হলো, তা-ও আমার কাছে এখন আর কোনো ব্যাপার নয়। আমার জীবনে সে এখন কেউ নয়। আর আমিও তার কেউ নই। আমাদের সম্পর্কটা হয়তো এখনো কাগজের পাতায় বিদ্যমান রইলো, কিন্তু মনের দিক থেকে তা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অনেক আগেই।’ দীক্ষার স্বর অত্যন্ত শান্ত, প্রায় ফিসফিস করে উচ্চারিত হলো।

নয়নতারা চমকে উঠল। এই নির্লিপ্ততা তার প্রত্যাশিত ছিল না। সে ভেবেছিল দীক্ষা হয়তো কাঁদবে বা ঘৃণা করবে।
‘কিন্তু আপনার… আপনার তো রাগ হওয়ার কথা। সে আপনার জীবন নষ্ট করেছে।’
‘রাগ? কার ওপর রাগ করব? মানুষ ভুল করে। শিশির তার জীবনের ভুলগুলো করতে গিয়ে আমার জীবন থেকে তার অধিকারটুকু হারিয়ে ফেলেছে। আর যে মানুষটা নিজের সম্মান নিজে রাখতে জানে না, তার ওপর রাগ করার মতো শক্তি বা সময় আমার নেই, নয়নতারা। আমি এখন আমার বাচ্চার জন্য বাঁচি। আমার মনোযোগ সেখানে, যেখানে ভালোবাসা আছে, সম্পর্ক আছে। যেখানে বিষ নেই।’

দীক্ষা এবার হাসল। সেই হাসি করুণ হলেও শান্তিতে মোড়া।
‘আর আপনি… আপনি যে সাহস দেখিয়েছেন, সেটার জন্য আপনাকে ঘৃণা করতে পারলাম না। আপনার চোখ দুটো বলছে, আপনার ভেতরে অনেক কষ্ট আছে। কিন্তু সেই কষ্টের পাশে আপনার মানবতা এখনো বেঁচে আছে। আপনি আপনার মতো করে এক বিচার করেছেন। আমার কিছু বলার নেই।’
নয়নতারা চোখ ভরে দীক্ষাকে দেখল। এই নারী এত আঘাত সয়েও ভেঙে পড়েনি, বরং আরও দৃঢ় হয়েছে।
‘আপনি খুব শক্তিশালী নারী, দীক্ষা। জানেন, একটা ভাঙা কাঁচের টুকরোকে জোড়া লাগানো যায় না ঠিকই, কিন্তু সেই ভাঙা টুকরোগুলোকে ব্যবহার করে খুব সুন্দর মোসাইক আর্ট তৈরি করা যায়। আপনার জীবনটাও এখন তাই। শিশিরের প্রতারণা বা আমার এই চরম কাজ- এগুলো আপনার জীবনের ভাঙা টুকরোগুলো। কিন্তু আপনি এই টুকরোগুলো দিয়েই নতুন করে আপনার জীবন সাজাতে পারেন। আপনি সেই ক্ষমতা রাখেন।’ নয়নতারার কণ্ঠে গভীর শ্রদ্ধা।

নয়নতারা উঠে দাঁড়াল।
‘একটা কথা মনে রাখবেন, দীক্ষা। মানুষের পরিচয় তার কর্মেই, তার পেশায় নয়। আমি যে জগতে থাকি, সেখানে অনেকেই আমাকে খারাপ বলবে। কিন্তু আমি আপনাকে বিশ্বাস আর সাহস দিতে এলাম। আপনার মতো খাঁটি মানুষ সমাজের আলোতে থাকে। আপনি সেই আলোটা নিভতে দেবেন না। আমার মতো মানুষ হয়তো অন্ধকার জগতের বাসিন্দা, কিন্তু আমাদেরও একটা বিবেক আছে, যা আমাদের ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝায়। আপনি ভালো থাকুন।’
নয়নতারা দীক্ষার দিকে মাথা নোয়ালো।

‘আপনি একজন পতিতা… বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। মানুষে মানুষে কত তফাত! যারা ভদ্র সমাজ সেজে থাকে, তাদের মনের ভেতর দেখি বিষ। আর যারা এই জগতের, তাদের বুকে দেখি এত মমতা। আপনি চলে যান, নয়নতারা। খুব সাবধানে থাকবেন। আপনার জীবনেও শান্তি আসুক।’ দীক্ষা মুগ্ধ স্বরে বলল।
নয়নতারা আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে দ্রুত পা ফেলে উঠোন পেরিয়ে গেল। তার পেছনে পড়ে রইল দীক্ষা, এক নতুন উপলব্ধি নিয়ে মোড়ার ওপর বসে- মানুষের পরিচয় তার কর্মেই, কি করল, তাতেই। পেশায় নয়।

নয়নতারা দ্রুত পা ফেলে উঠোন পেরিয়ে যাওয়ার পরও দীক্ষা মোড়ার ওপর স্থির হয়ে বসে রইল। তার চোখ দুটি তখনো সেই পথটার দিকে, যে পথে একটু আগে চলে গেল এক অন্ধকার জগতের নারী। নয়নতারার বলা কঠিন কথাগুলো, শিশিরের করুণ পরিণতি, আর তার নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি, সবকিছু যেন দীক্ষার মস্তিষ্কের ওপর দিয়ে ঘূর্ণি তুলে গেল।
দীক্ষা নিজেকে এতটা সময় শক্ত রেখেছিল। সে জানত, নয়নতারা তার চোখের জল দেখলেই মনে করবে দীক্ষা দুর্বল। সে বুঝবে, এখনো শিশিরের স্মৃতি দীক্ষাকে কাঁদায়। কিন্তু না, শিশিরের জন্য নয়, দীক্ষার এই কষ্ট এখন হাজারো নারীর সম্মিলিত কষ্টের প্রতিধ্বনি। নয়নতারার কথায় তার নিজের প্রতি, নারীজন্মের প্রতি এক গভীর সহানুভূতি জেগেছে।

নয়নতারার শেষ কথাগুলো যেন কানে বাজছে, ‘মানুষের পরিচয় তার কর্মেই, তার পেশায় নয়।’
এই ভাবনার তোড়ে দীক্ষার হৃদয়ের গভীরে জমাট বাঁধা কষ্টের বাঁধ যেন সামান্য আলগা হলো। দু’টি টলমলে জলবিন্দু তার চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে নামল গালের ওপর। দীক্ষা দেরি করল না এক মুহূর্তও। সেই জল গাল ছুঁয়ে থুতনিতে আসার আগেই সে হাত দিয়ে দ্রুত মুছে নিল। চোখের পাতা পর্যন্ত স্পর্শ করতে দিল না। নিজের দুর্বলতার এক ফোঁটাও সে আর কারো কাছে প্রকাশ করতে চায় না। এই দীক্ষা সেই নরম, দুর্বল দীক্ষা নয় আর। জীবন তাকে কঠিন হতে শিখিয়ে দিয়েছে- কঠিন, কিন্তু নিষ্ঠুর নয়। সে এখন আত্মমর্যাদা এবং স্থিতিশীলতার প্রতীক।
ঠিক তখনই, উঠোনের এক কোণ থেকে এগিয়ে এলো বকুল। বকুল উঠোনে এসে দীক্ষার দিকে এক ঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারল, কিছু একটা ঘটেছে। তার শান্ত চেহারার ভেতরের অস্থিরতা সে ধরতে পারল।
‘কার সঙ্গে কথা বলছিলে আপা?’ বকুল মৃদু পায়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল। তার কণ্ঠে সবসময়ই থাকে এক ধরনের আন্তরিক জিজ্ঞাসা।

দীক্ষা চোখ মুছে নেওয়া হাতটা ম্যাক্সির পকেটে ঢুকিয়ে নিল। মুখে একটা কৃত্রিম হাসি টেনে বলল, ‘এমনিতেই। এক অচেনা মেয়ে এসেছিল। কী বলছিল… ঠিক বুঝতে পারলাম না।’
‘অচেনা মেয়ে? কোত্থেকে এলো? কী দরকার ছিল?’ বকুল কৌতূহলী হয়ে উঠল।
‘তা আর জিজ্ঞেস করিস না। মনে হলো… কিছুটা পাগল গোছের। কীসব গল্প বলছিল! তুই কোথায় ছিলি এতক্ষণ?’ দীক্ষা দ্রুত প্রসঙ্গ ঘোরানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু বকুলের চোখ দীক্ষার মুখের দিকে নিবদ্ধ। দীক্ষার চোখের কোল সামান্য ভেজা, আর তার মুখে যে হাসিটা ফুটেছে, সেটা আসলে হাসির মাস্ক- যা ভেতরের যন্ত্রণা ঢাকতে ব্যবহৃত হয়। বকুল কাছে এসে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, উঠোনে বিছানো পাটিটির ওপর।

‘কাঁদছো কেন আপা?’ বকুলের স্বর এবার নরম, সহানুভূতিপূর্ণ।
দীক্ষা মাথা সামান্য ঝাঁকাল, ‘কই, না! কী যেন পড়ল চোখে। চোখে একটু কুটকুট করছিল।’
বকুল দীক্ষার হাতটা আলতো করে ধরল। তার স্পর্শে আন্তরিকতা আর সহজ ভালোবাসা।
‘আর কীভাবে তোমায় বোঝাবো, তোমার চোখে পানি দেখলে আমাদেরও খারাপ লাগে আপা। অনেক খারাপ লাগে। আমরা সবাই তোমার সাথে আছি। আমরা তো জানি, তুমি কত কষ্ট পেয়েছো। কিন্তু তুমি তো আমাদের শক্তি। তুমি ভেঙে পড়লে আমরা কী করব?’
দীক্ষার গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কষ্টটাকে সে জোর করে ঠেলে নামিয়ে দিল। বকুলের সরল ভালোবাসার সামনে সে আর মিথ্যা অভিনয় করতে পারল না। সে কেবল হাসার চেষ্টা করল। সেই হাসিটা করুণ, যেন ঠোঁটের কোণে এসে কষ্টে আটকে গেছে।

‘আমি আর কাঁদছি না, বকুল। বিশ্বাস কর, আমার চোখে যা পড়েছে, তা আসলে আমার ভেতরের শেষ দুর্বলতাটুকু। আজ সেটা বের করে দিলাম। আর কোনোদিন নয়।’ দীক্ষার চোখ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল। ‘আমি এখন শুধু আমার বাচ্চার জন্য বাঁচব। আর কারো জন্য নয়।’
বকুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, ‘এই তো আমার দীক্ষা আপা! তুমি এভাবেই শক্ত থেকো। আমরা জানি, তোমার জীবনটা সোজা না, কিন্তু আমাদের হাতে হাতে ধরলে সব সোজা হয়ে যাবে।’
এই পারিবারিক নির্ভরতা, এই সহজ ভালোবাসা – দীক্ষাকে তার ভাঙা পৃথিবী থেকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। দীক্ষা বকুলের হাত ধরে হালকা চাপ দিল, কৃতজ্ঞতায় তার চোখ আবার চিকচিক করে উঠল, তবে এবার আর জল গড়িয়ে পড়তে দিল না।

ঠিক সেই মুহূর্তেই, উঠোনের বাইরে, পাকা রাস্তার ধারে একটা আওয়াজ হলো। আওয়াজটা খুব কাছে এসে থামল। কালো রঙের বড় একটি গাড়ি, যা এই গ্রামে সহজে চোখে পড়ে না। গাড়িটা এত নিঃশব্দে এলো যে তাদের দুজনের কেউই টের পায়নি, কিন্তু থামার পর ইঞ্জিন বন্ধের মৃদু শব্দটা স্পষ্ট শোনা গেল।
দীক্ষা এবং বকুল দু’জনেই কথা থামিয়ে অবাক হয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। এই নির্জন গ্রামে এমন কালো, ঝকঝকে গাড়ি সাধারণত আসে না।
‘কে এলো?’ দীক্ষা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল। তার হৃদপিণ্ড দ্রুত হতে শুরু করেছে। নয়নতারার বিদায়ের পরই এই রহস্যময় আগমনের কারণ কী?
বকুলও মাথা নেড়ে বলল, ‘জানি না তো আপা! হয়তো শহর থেকে এসেছেন। কিন্তু কার কাছে এসেছেন?’
দরজার ওপাশে যেন সময় থমকে গেছে। গাড়ির দরজা খোলার কোনো শব্দ নেই। ভেতর থেকে কেউ নেমেও আসছে না। শুধু কালো কাঁচের ওপাশে এক গভীর নীরবতা, যা দীক্ষার শান্ত জীবনে এক অজানা ইঙ্গিত নিয়ে আসছে।
দীক্ষা এবং বকুলের চোখে এখন উদ্বেগ। তাদের শান্ত, সাধারণ দিনটি হঠাৎ করেই যেন এক নতুন এবং অচেনা মোড় নিতে চলেছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ির পেছনের দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি পরা, শান্ত, সৌম্য চেহারার এক ভদ্রলোক ধীর পায়ে উঠোনে প্রবেশ করলেন। তিনি অরুণিমাভ চৌধুরী।
অরুণিমাভ সবার প্রতি একটা সম্ভ্রমসূচক সালাম জানালেন।
অরুণিমাভ চৌধুরী বললেন, ‘আপনারা হয়তো আমাকে চেনেন না। আমার নাম অরুণিমাভ চৌধুরী। আপনাদের এই নির্জন মুহূর্তে এভাবে এসে বিরক্ত করার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে কিছু জরুরি কথা বলার ছিল, যা আপনাদের সবার জানা প্রয়োজন।’

ততক্ষণে উঠোনে এসে জড়ো হয়েছেন খালেদা, বড় মামাও। এতবড় কালো গাড়ি নিজের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে- ব্যাপারটা একবার খতিয়ে দেখতেই সকলের আসা…
বড় মামা সবার পক্ষ থেকে এগিয়ে এলেন।
বড় মামা বললেন, ‘বসুন বাবা। আপনি… এতদূর এসেছেন! কী জানতে চান? আমরা তো সাধারণ মানুষ।’
অরুণিমাভ চৌধুরী বললেন, ‘আমি একজন শিল্পপতি, কিন্তু আজ আপনাদের কাছে কোনো ব্যবসার কথা বলতে আসিনি। এসেছি একটি মেয়ের জন্য। আপনাদের পরিবারের একজন সদস্য, তৃণা।’
তৃণার নাম শুনে দীক্ষার মুখ কঠিন হয়ে গেল।
দীক্ষা শীতল কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করে, ‘তৃণা! সে এখন আমাদের কেউ নয়, মিস্টার চৌধুরী। তার প্রসঙ্গ এখানে না আনাই ভালো।’

অরুণিমাভ চৌধুরী বললেন, ‘আমি জানি, সে আপনাদের সাথে চরম প্রতারণা করেছে। কিন্তু আমি আপনাদের কাছে এসেছি কারণ, গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে সে আমার বাড়িতে আছে।’
দীক্ষা শুধালো, ‘আপনার বাড়িতে?’
অরুণিমাভ চৌধুরী বললেন, ‘হ্যাঁ। সেদিন রাতে শহরের ফুটপাথে বিধ্বস্ত অবস্থায় তাকে দেখতে পাই। আমার বাড়িতে নিয়ে আসার পর সে দাবি করে, তার পরিবার বলতে কিছুই নেই। সে অস্বীকার করেছে যে তার কোনো বোন বা আত্মীয় আছে। শেষে আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি, কাজের বিনিময়ে।’
দীক্ষা এবার উঠে দাঁড়াল। তার চোখে রাগ এবং তীব্র বিতৃষ্ণা।

‘এগুলো আমাদের জানাতে এতদূর এসেছেন কেন, মিস্টার চৌধুরী? আমরা জানতেও চাই না ওর ব্যাপারে কিছু। সে কোথায় আছে, কী করছে- তাতে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। ও জাহান্নামে গেলেও আমাদের কিছু যায় আসে না।’
অরুণিমাভ চৌধুরী বললেন, ‘আমি জানি। কিন্তু তার চোখে আমি এক ধরনের দম্ভ, অহংবোধ দেখেছি। বিন্দুমাত্র অনুশোচনা খুঁজে পাইনি। আপনার পোস্ট ভাইরাল হলে আগ্রহ থেকেই আমি আমার লোকদের দিয়ে আপনার ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলে তারা আমাকে তৃণার সংযোগটা জানাল। তখন মনে হলো, এই মেয়েটাকে একটা শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।’

তিনি ধীরে ধীরে দীক্ষার দিকে এগিয়ে এলেন।
অরুণিমাভ চৌধুরী বললেন, ‘ওর শিক্ষা কেবল ওর একার নয়, বরং ওর মতোই হাজারও লজ্জাহীন নারীর জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। আর এই মেয়েটার জীবন ও নিজের হাতে সবটা নষ্ট করার আগে, ওকে সঠিক পথে ফিরাতেই ওর শিক্ষার দরকার। এবং এ জন্য আমার সাহায্য প্রয়োজন। আপনার সাহায্য।’
দীক্ষা বলল, ‘কিরকম সাহায্য?’

অরুণিমাভ চৌধুরী বললেন, ‘আমি চাই, আপনি আমার বাড়িতে চলুন। শুধু অতিথি হিসেবে। আপনি আপনার বাবু হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকুন। যারা প্রতারিত হয়, তারা উপরওয়ালার আশীর্বাদে ভীষণ ভালো থাকে। আর যারা প্রতারণা করে, তারা কখনোই ভালো থাকতে পারে না। আমি চাই, তৃণা তার চোখের সামনে দেখুক, যে বোনকে সে ঠকিয়েছে, সে কীভাবে একজন সম্মানিত শিল্পপতির বাড়িতে বিশেষ অতিথি হিসেবে রাজার হালে আছে। এই কঠিন বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমি তাকে জানাতে চাই, প্রতারণার ফল কী হয়। তাছাড়া এই সময়ে ডাক্তার, হাসপাতাল এগুলোর আশেপাশেই থাকা দরকার। সেখানে আপনার অযত্ন হবে না। আমি সে আশ্বাস দিলাম। আপনি রাজি হোন মিসেস…’

দীক্ষা তার আগেই হাত উঁচু করে তাঁকে থামিয়ে দিলো, ‘আপনি বললেই আমি যাব কেন? কোথা থেকে এসে আপনি একটা গল্প শুনিয়ে…’
‘আমি কোনো গল্প শুনাচ্ছি না, যা সত্যি তাই বলছি। আর আমাকে আপনার কি অভদ্রলোক মনে হয়?’
‘তৃণার ব্যাপারে আপনার এত গায়ে পড়ার কারণ কি? সে যা করেছে, আমার সঙ্গে করেছে… তাতে আপনার কি?’
‘কারণ…’
অরুণিমাভ চৌধুরী একদন্ড থামলেন।
এই মুহূর্তে তিনি ভীষণ অসহায় বোধ করছেন। মনে করতে চাইছেন না অতীতের ঘটা সেই দিনগুলির কথা… ভয়ংকর দুঃস্বপ্নময় দিন এবং রাত…

‘কি হলো, বলুন, আপনি কেন আগ বাড়িয়ে আমার হয়ে প্রতিশোধ নিতে চাইছেন? যেখানে আমি সব ছেড়ে দিয়েছি…’
দীক্ষার কথায় অরুণিমাভ মুখ তুলে তাকালেন।
চোখজোড়া কেমন যেন জ্বলজ্বল করছে তার। দীক্ষা সামান্য অবাক হলো। অরুণিমাভ হাতের ইশারায় তার ড্রাইভারকে ডাকতেই একটা পত্রিকার কাগজের কাটিং এনে তুলে দিলো তার হাতে। সেই কাগজের টুকরোটি তিনি দীক্ষার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।
গম্ভীর গলায় বললেন, ‘পড়ুন।’
অবাক হলেও কিছুই বলল না দীক্ষা।
কাগজটি হাতে নিলো। চোখ বুলিয়ে দেখল, তাতে একজন নারীর সুইসাইড কেস লেখা। আর এই নারীটি…বিশিষ্ট চৌধুরী পরিবারের একমাত্র মেয়ে, অরুণিমাভ চৌধুরীর একমাত্র ছোট বোন, তপস্যার সুইসাইড কেস।
দীক্ষা বিস্মিত নয়নে মুখ তুলে তাকাল।

অরুণিমাভ অন্য দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখে রোদচশমা তুলে দেওয়া। নিজের সিক্ত চোখজোড়া তিনি কাউকে দেখাতে প্রস্তুত নন। তবে কণ্ঠের বিষন্নতা লুকাতে পারলেন না কিছুতেই, ‘আমার বোনের গল্পটাও আপনার গল্পের মতোই। পার্থক্য এতটুকুই, আপনি মনের জোরে বেঁচে আছেন, আমার বোন নেই।’
নিস্তব্ধতা জেঁকে বসল হঠাৎ করেই। কেউ কোনো কথা বলছে না। বাতাসে ঘুরছে অদ্ভুত অস্বস্তি।
অরুণিমাভ নিজেই যে নিস্তব্ধতাকে নামিয়েছেন, নিজেই সেটাকে চিঁড়ে ফালা ফালা করলেন, ‘আমি আমার বোনের জন্য কিছুই করতে পারিনি। দুটো বাচ্চাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে গেছে যাওয়ার সময়। তাদের নিয়েই আজ আমার দুনিয়া। ওদের দিকে তাকিয়েই আমি বেঁচে আছি বলতে পারেন। বাবা মায়ের পর তপস্যাই আমার সবচেয়ে কাছের ছিল। আজ এতগুলো বছর পর যখন আপনার পোস্টটা অনলাইনে পড়লাম, ওর কথাই মনে হলো। মনে হচ্ছিল, এ আরেক তপস্যার ঘটনা। তাই অতিদ্রুত আপনার ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলে আমি তৃণার ব্যাপারটাও জানতে পারি আর তখনই সিদ্ধান্ত নেই, আপনাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাবো। সেখানে আপনিই ওকে সাইজ করবেন। এই দুনিয়াতে মানুষের মনের মূল্য এত কম হবে কেন?’

এবারেও জবাব এলো না কারো তরফ থেকেই।
দীক্ষা পুরোপুরি নীরবতাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এই লোকের মুখের উপর না বলতে পারছে না, আবার হ্যাঁ ও বলতে পারছে না। তৃণার মুখটা সে আরও একবার দেখতে চায় না। কিছুতেই না।
কিন্তু বকুল এগিয়ে এলো। আবেগাপ্লুত হয়ে দীক্ষার হাত ধরল। বলল, ‘আপা, তোমার কষ্ট দেখে আমাদেরও খুব খারাপ লাগে। তুমি যাও আপা। সেখানে তোমার ভালো হবে। আর ওকে শিক্ষা দেওয়া দরকার। তোমার চোখের সামনে ও যখন দেখবে, তুমি কত শান্তিতে আছো, তখন ওর বিবেক হয়তো একবার হলেও প্রশ্ন করবে।’
খালেদা বললেন, ‘হ্যাঁ দীক্ষা, উনি সত্যি বলছেন। তাছাড়া তোর শরীরটাও ভালো থাকা দরকার। শহরের ভালো চিকিৎসা পাবে তুমি। আমাদের চিন্তা থাকবে না। আর আমি মা তো সঙ্গে আছি।’

বড় মামা এগিয়ে এলেন, ‘ওকে তুই উচিত শিক্ষা দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আয়। ভুল মানুষই করে। কিন্তু সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে তওবা করতে পারে কয়জন? আমিও ভুল করেছিলাম একসময়,তখন বুঝতে পারিনি। কিন্তু যখন বুঝেছি, এরপর আর কোনোদিন তোর মামীর অযত্ন হতে দেইনি। কিন্তু যা হারিয়েছি, তাও তো আর ফিরে আসে নাই। আসবেও না। তবু মনের শান্তি আর কি.. ওর জীবনটা শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে, ও আজ না বুঝলেও একদিন বুঝবে। তুই ওর বড় বোন, তুই যা, ওকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিবি- ওর ভুল কতটুকু, দোষ কতটুকু…’

দীক্ষা মাথা ঝাঁকাল এবার।
শান্ত, দৃঢ় স্বরে জানাল, ‘আমি রাজি, মিস্টার চৌধুরী। তবে আমি আপনার বাড়িতে অতিথি হয়ে নয়, বরং নিজের সম্মান আর আত্মমর্যাদা নিয়ে থাকব।’
অরুণিমাভ চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন ‘এটাই যথেষ্ট, এটাই যথেষ্ট।’
দীক্ষা দ্রুত উঠে গিয়ে তার সামান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলো। বকুল তার ব্যাগটা হাতে তুলে দিল। খালেদা বেগমের যাওয়ার কথা থাকলেও এত তাড়াহুড়োয় তিনি যেতে পারলেন না, তাই বকুলই সঙ্গ ধরল। তিনি আসবেন,কিছুদিন পর।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৪

কিছুক্ষণের মধ্যেই দীক্ষা, তার পেটের ভেতরের সন্তান এবং বকুলের সাথে, অরুণিমাভ চৌধুরীর গাড়িতে উঠল। কালো গাড়িটি ধুলো উড়িয়ে গ্রামের শান্ত পরিবেশ ছেড়ে শহরের রাজপথে মিশে গেল।
পায়ের উপর মৃদু হাতের চাপ অনুভব করতেই দীক্ষার ধ্যান ভেঙে চূর্ণ হলো। সে সামনে তাকাল। তৃণা মাথা নিচু করে তার পায়ের পাতায় অলিভ অয়েল ঘষছে। দীক্ষা চোখ বন্ধ করে নিলো। আশ্চর্যজনক ভাবে, তার বিন্দুমাত্র দুঃখ লাগছে না, বরং তৃণার এহেন অপমানিত হওয়া কোথাও না কোথাও তার মনে পৈশাচিক আনন্দের সৃষ্টি করেছে।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৬