সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৭
মৃধা মৌনি
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ন’টা ছুঁই ছুঁই। বাইরে কনকনে শীতের থাবা জাঁকিয়ে বসলেও, অরুণিমাভ চৌধুরীর এই বিশাল, প্রাসাদসম অট্টালিকার ভেতরের পরিবেশটি নরম, আরামদায়ক উষ্ণতায় মুড়ে আছে। রাতের খাবার পর্ব সবে শেষ। দীক্ষা এবং বকুল নিজেদের খাবার ঘর সংলগ্ন লিভিং রুমে সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে। একটু আগে পর্যন্ত তাদের সাথে গল্পে মশগুল ছিল আরহাম এবং আয়ান, কিন্তু গেমে আসক্ত দুই ভাই কিছুক্ষণ আগেই চলে গেছে নিজেদের বেডরুমের দিকে। তারা শুয়ে পড়লেও যে তাদের ঘুম আসতে অনেক দেরি, সেকথা ইতিমধ্যে ওরাও জেনেছে।
দীক্ষার পায়ের পাতা দুটো বেশ ফুলে গেছে। তারই যত্নে একটি ছোট বাটিতে সরিষার তেল ঈষৎ গরম করে এনেছে বকুল। সেই উষ্ণ তেল দিয়েই আলতো হাতে সে এখন দীক্ষার পা মালিশ করছে। দীক্ষা চোখ বুজে আরাম পাচ্ছে। বকুলের হাত মৃদু, কিন্তু যত্নের ছোঁয়া মাখা।
দীক্ষা একমনে বকুলের মুখপানে চেয়ে আছে। কী নিষ্পাপ, সরল একটি মুখ! কত মায়া আর সরলতা দিয়ে যেন মুখটি গড়া।
তেলের মালিশ করতে করতে বকুল যখন গভীর মনোযোগে মাথা নিচু করে ছিল, তখনই দীক্ষা নীরবতা ভাঙল। তার কণ্ঠে কৌতূহল।
দীক্ষা বলে উঠল, ‘আচ্ছা বকুল, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
বকুল বলল, ‘বলো আপা।’
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
‘বিয়ের কথা উঠলেই তোর মুখটা অমন পাংশু হয়ে যায় কেন? বিয়ে-টিয়ে করতে চাস না নাকি?’
বকুলের হাত থেমে গেল। সে দ্রুত মাথা তুলে দীক্ষার দিকে তাকালো। এক মুহূর্তে যেন তার চোখে কীসের ছায়া পড়ল, যা দীক্ষার চোখ এড়ালো না। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সে হেসে ফেলল, কিন্তু সেই হাসিটা যেন মন থেকে এলো না।
‘চাই না। আজকাল বিয়ে করতে আমার ভয় করে। চারদিকে যা হচ্ছে… বড্ড ভয় লাগে, আপা।’
‘তবু করতে তো হবেই। আজীবন কুমারী থাকবি নাকি? একটা সময় গিয়ে সবারই জীবনে একজন সঙ্গী দরকার হয়। বিশেষ করে জীবনের শেষ সময়টায়… তখন পার্টনার ছাড়া আর কারো কাছেই তাদের জন্য অত সময় থাকে না, বুঝলি?’
বকুল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। তার প্রশ্নটা যেন সরাসরি দীক্ষার দিকে ফিরে গেল।
বকুল বলল, ‘তাহলে তুমি কাউকে নিয়ে কেন ভাবো না আপা? তুমিও শুরু করো না জীবনটা… তোমারও তো দরকার কাউকে! তাছাড়া বাবুকেও তো…’
দীক্ষা যেন মুহূর্তে তেতে ওঠে। তার শান্ত মুখটা শক্ত হয়ে পড়ে ঈষৎ!
‘ইশ, চুপ কর তো। আজাইরা কথা যত। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। আর না ভাই, কানে ধরে তওবা করছি।’
সরু গলায় বলল বকুল, ‘তুমিই না বললে, পার্টনার সবারই দরকার হয়।’
দীক্ষা চুপ করে রইলো, উত্তর নেই। বকুল সেই নীরবতার সুযোগ নিলো, চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক।
আবারও নিজের কাজ শুরু করল সে। ওভাবেই ছুঁড়ে দিলো পরবর্তী কথাখান, ‘আমার বেলায় জ্ঞান, নিজের বেলায় মানতে নারাজ! ভালোই!’
দীক্ষা চোখ পাঁকিয়ে কিছু একটা বলতে নিতেই, রুমের দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন অরুণিমাভ চৌধুরী। তাঁর হাতে বেশ কয়েকটি শপিং ব্যাগ। তিনি সবার জন্যেই ছোটখাটো উপহার নিয়ে এসেছেন।
উপহারের প্যাকেটগুলো একপাশে নামিয়ে রেখে সোফায় গা এলিয়ে তিনিও বসলেন। বকুলকে পা মালিশ করতে দেখে চিন্তিত মুখে তাকালেন দীক্ষার দিকে।
বললেন, ‘এ কী, এত পা ফোলা আপনার! ডাক্তারের কাছে যাবেন একবার?’
তার উদ্বেগ দেখে বকুল হেসে ফেলল।
‘প্রয়োজন নেই। এ সময় নাকি এরকম হয়। ফুপিও বলছিলেন। আমি তেল দিয়ে মালিশ করে দিচ্ছি, এতেই আরাম হবে।’
‘তৃণা কোথায়? তাকে ডেকে নিলেই হতো।’
জবাবটা দিলো দীক্ষা, ‘প্রয়োজন নেই, আজ এমনিতেই যা করা হলো, অনেক হয়েছে। মুখটা এতটুকুন হয়ে ছিল ওর।’
‘আর তাতে হৃদয় পুড়ে কয়লা হয়েছে আমাদের মানবতার দরদী আপার..’ সুর মেলালো বকুল।
দীক্ষা রাগ চোখে তাকাল তার দিকে।
অরুণিমাভ হাসলেন সামান্য। বকুল যেন দেখেও দেখল না দীক্ষার গোল গোল চোখ জোড়া।
বরং মাথানিচু করে নিজের মনে কাজ করতে করতে বলে দিলো, ‘ওরকম মুখ করে লাভ নেই। যা সত্য আমি তাই বলছি।’
‘খুব আমার সত্যবতী হয়ে গেছিস দেখি..’ দীক্ষা মুখ ভেংচালো।
‘সে তুমি যাই বলো আপা, আমি কিন্তু বলবোই। এতকিছুর পরেও ওর কষ্টে তুমি কষ্ট পাও! কেন আপা?’ বকুল আচানক মুখ তুলে তাকাল, ‘তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতদিনে ওকে ছিঁড়ে ফেলত, জানো? ভালোবাসার ভাগ দেওয়া যায় আপা?’
দীক্ষা হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল। বকুলের চোখজোড়া জ্বলছে জ্বলজ্বল করে। ওই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে রাখতে কেমন যেন অস্বস্তি হলো তার। সে তড়িঘড়ি মাথা নামিয়ে নিলো। শুনল, গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে বকুল। বাটি থেকে অল্প একটু তেল তুলে নিলো চার আঙুলে। ডলতে লাগল পায়ের গোড়ালির কাছাকাছি।
‘চোখ বন্ধ করে একবার ভাবো শুধু, তার কারণে আজ তুমি কোথায়, তোমার সাজানো স্বপ্নরা কোথায়, তোমার সন্তানের বাবা কোথায়- আপনাতেই আ গু ন জ্বলে উঠবে। যা ওকে দেখে নিভু নিভু করছে।’
কিছুই বলল না দীক্ষা। ঘরটার পরিবেশ মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। অরুণিমাভ এতক্ষণ দুই জনের কথোপকথন মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন চুপচাপ, দীক্ষার মুখে নেমে আসা বিষাদের কালো ছায়া তিনি আঁচ করতে পেরেই প্রসঙ্গ ঘুরাতে বলে উঠেন, ‘আরহাম আয়ান কোথায়? ঘরে? কে আছ, সবাইকে ডেকে নিয়ে এসো যাও।’
তারপর হাত লাগালো উপহারের প্যাকেট গুলিতে, ‘বকুল, এসো তো, নাম লিখা আছে উপরে, কোনটা কার, আলাদা করো।’
‘এগুলো কি?’ শুধালো দীক্ষা।
অরুণিমাভ উত্তর করলেন, ‘কি আবার! গিফট!’
‘সে তো দেখতে পাচ্ছি বাট কেন? আই মিন কি উপলক্ষে?’
‘কোনো উপলক্ষ নেই, এমনি।’
‘এমনিতে কেউ কাউকে গিফট দেয়?’
‘আমি দেই, কারণ আমি স্পেশাল…’
অরুণিমাভ মৃদু হাসলেন, সেই হাসিতে যুক্ত হলো দীক্ষাও। লোকটা ভীষণ রকমের অদ্ভুত! এই মনে হয়, অনেক গাম্ভীর্য পূর্ণ, এই মনে হয় বাচ্চা স্বভাবের…একটু পাগলাটে! তবে বড়লোকেরা পাগলাটে ধরনেরই হয়, মা বলেছিল। আজ সামনে দেখছে…
অরুণিমাভের ডাকে সবাই চলে এলো লিভিং এরিয়াতে। আরহাম আয়ান এসেই অরুণিমাভের দিকে ছুটে গেল। ঝাপিয়ে পড়ল তার গায়ের উপর। তিনি দু’জনকেই দু’হাতে সামলানোর চেষ্টা করে হতচকিত হলেন, হাসলেন। বাচ্চা দুটি এমনই, বিশেষ করে আয়ান- তার জানের জান! একে একে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে জড়ো হলো সকল শ্রমিক শ্রেণীর ব্যক্তিগণ। নিরিবিলি লিভিং রুম সরগরম হয়ে উঠল সহসাই। সবার শেষে এলো তৃণা, ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখজোড়া, গায়ের কাপড়ে এলোমেলো ভাব, সন্ধ্যে থেকেই শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছিল তার। তাই সকাল সকাল শুয়ে পড়েছিল আজ না খেয়েই। মাত্র অঞ্জলির মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো। উঠে আসতে ইচ্ছে না করলেও আসতে হলো এবং বুঝলো কারো আন্ডারে থাকা কত যে মজার!
অরুণিমাভ একটা একটা প্যাকেট ধরে নাম ডাকছেন, যার নাম ডাকা হচ্ছে সে এগিয়ে আসছে, প্যাকেট নিয়ে চলে যাচ্ছে। দীক্ষা, বকুল, ওদের পরেই আসলো তৃণার পালা। প্যাকেট খুলে তৃণা হতভম্ব হয়ে গেল। এত সুন্দর শাড়ি! বেবি পিংকের ভেতর, স্টোন ওয়ার্ক করা। সফট।মোলায়েম শাড়ি- তৃণার হাত দিতেই গলে গেল। সারাদিনের যত মন ভার তাও সব গলে পড়ল। চোখেমুখে জ্বলে উঠল অন্যরকম এক দীপ্তিময় দ্যুতি। সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল দীক্ষা। তৃণার হাসি হাসি মুখটা তার হৃদয়ের কোথাও না কোথাও সূচ ফুটালো যত্ন সহকারে। চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব হলো। তার সবকিছু কে ড়ে নিয়ে কী করে হাসে ও? এত দুঃসাহস হয় কি করে! সে তো আজকাল মন খুলে হাসতে পারে না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে পারে না। তার তো শরীর চললেও মন থমকে গেছে। পৃথিবীর কোনো রঙে রঙিন হয় না হৃদয়ের আঙিনা। তবে তার হবে কেন? কেন?
দীক্ষা এগিয়ে এল। সব ভুলে টেনে নিলো ওই শাড়িটা, এত আকস্মিক, থতমত খেলো তৃণা। চোখ তুলে চাইলো দীক্ষার দিকে।
‘কি হলো?’ রুদ্ধ কণ্ঠে শুধালো সে।
দীক্ষা বলল, ‘এটা আমার পছন্দ হয়েছে বেশ। আমি নিচ্ছি।’
তৃণা হৈ হৈ করে ওঠে, ‘কেন কেন? ওটা তো আমাকে দেওয়া হইছে, আমার জিনিস তুমি নিবা কেন?’
‘আমার ভালো লাগছে তাই।’ দায়সারা কণ্ঠস্বর দীক্ষার, ‘আপনি ওকে আরেকটা কিনে দিয়েন, সমস্যা আছে?’ অরুণিমাভের দিকে চাইলো সে।
অরুণিমাভ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘আরে না, সমস্যা কিসের, তুমি নাও, আমি ওকে কালকে…’
কথা শেষ করবার আগেই চেঁচিয়ে উঠল তৃণা, ‘না, বললেই হলো নাকি, আমার জিনিস তুমি কেন নিবে? এটা আমার, দাও আমাকে।’
‘দেবো না।’
‘দিতে বলছি।’
‘বললাম তো দেবো না। কি করবি তুই?’
তৃণা হাতা হাতি লাগিয়ে দিলো। দীক্ষার থেকে ওটা কেড়ে কুড়ে নিবে, যেভাবেই হোক। দীক্ষাও আজ নাছোরবান্দা। অনেক ত্যাগ দিয়েছে এতগুলো বছর, সেই ছোট থেকে বড় হতে হতে… আর না!
শক্ত করে চেপে রইলো শাড়িটা। এমন অবস্থা ছিঁড়েই যাবে বোধহয়। তৃণাই সামলে নিলো। ছেড়ে দিলো। চোখজোড়া ছলছল করছে ওর, কোনোরকমে বলল, ‘শেষ বারের মতো বলছি, দিয়ে দাও, নইলে আমার অভিশাপে ওই শাড়ি আর পড়তে হবে না। ওটা আমার.. একান্তই আমার জিনিস! অন্যটা আমি নেবো কেন?’
‘এরচেয়ে দামীটা দেবে…’
‘তাও না..’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ তাই..’
‘বেশ, এই নে…’ বলে ছুঁড়ে মা র ল দীক্ষা, পড়ল গিয়ে তৃণার মুখের উপর। তৃণা এমন ভাবে জড়িয়ে ধরল ওটা, যেন কোনো রাক্ষুসি এসে আবার টেনে নিয়ে যাবে। তাই দেখে হাসল দীক্ষা। চোখজোড়া ভরে উঠছে তার ও…
বাতাসে ঝুলে থাকা অস্বস্তিটা প্রথমে কেউ ধরতে পারল না। পরক্ষণেই দীক্ষা গভীর শ্বাস নিলো। বুকের ভেতর জমে থাকা বহু বছরের কষ্ট যেন হঠাৎই উপচে পড়ার পথ পেয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে তৃণার দিকে এগিয়ে এলো।
চোখে কেমন এক কাঁপা রাগ, ক্লান্তি, ব্যথা সব মিলেমিশে ঘুর্ণি তুলছে।
তৃণা শাড়িটা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে গুটিসুটি পায়ে।
দেখেই বোঝা যায়—ভয় পেয়েছে।
কিন্তু, দীক্ষার মুখে সেই ভয় পাবার জন্য কোনো কটুক্তি নেই… বরং এক অদ্ভুত শান্ত ভাব।
দীক্ষা থামল তৃণার একদম সামনে এসে।
‘একটা শাড়ির জন্য… এতো আগুন?’ গলার স্বরটা গম্ভীর, ভারি শোনালো।
তৃণা কিছু বলতে নিবে কিন্তু দীক্ষা হাত তুলে থামিয়ে দিলো তাকে, ‘না। আজকে তুই কিছু বলবি না। আজ আমি বলবো। অনেকদিন তো চেপে রেখেছি।’
সবার দৃষ্টি এই মুহূর্তে দীক্ষার দিকে। অরুণিমাভ বসে আছেন একদম স্থির হয়ে। বকুলের তেল মাখা হাত থমকে গিয়েছে বাতাসে। চারপাশের কর্মচারীরা শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে।
দীক্ষা তাকালো তৃণার বুকে আঁকড়ে ধরা সেই শাড়ির দিকে।
‘ওটা নিয়ে তোর এতো ব্যথা হচ্ছিলো? সামান্য একটা কাপড়ের জন্য? পছন্দ হয়েছে বলে আমি নিতে চাইলাম, এইটুকুতেই তোর পুরো দুনিয়া ভেঙে গেল, তাই না?’
তৃণা ধীরে মাথা নাড়ল, প্রতিবাদ করতে চাইলো, কিন্তু দীক্ষা এবার গলায় জমে থাকা আগুন ছড়িয়ে দিল।
‘তাহলে যখন তুই আমার ঘরটা নিয়ে গেলি, তখন আমার কেমন লেগেছিল, বলতে পারিস?’
চারপাশ ডুবে গেল ঘন কালো গভীরতায়। তৃণার চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে, দীক্ষা এবার আর থামল না।
‘বল? তোর তো এতক্ষণ খুব কথা বের হচ্ছিলো মুখ দিয়ে, এবার বল, তুই যখন আমার সাজানো সংসারের উপর নিজের পা রেখে ঢুকলি, তখন আমার বুকের ভেতর কেমন ঝাঁঝ এসে ধরেছিল?
যেদিন তুই ওর পাশে দাঁড়িয়ে বউয়ের রূপ ধরলি, সেদিন কোথায় ছিল তোর লজ্জা?’
তৃণা সরে যেতে চাইলো, কিন্তু দীক্ষা আরেক পা এগিয়ে এলো।
‘এই এইটুকু কাপড় না পেয়ে তোর রাগ, তোর কষ্ট…
তোর চোখ দিয়ে পানি বের হবে হচ্ছিল, তাহলে আমি?
আমার বেলায় কি অন্ধ ছিলি? তখন তো বিন্দুমাত্র সংকোচ ও দেখিনি তোর ভেতরে..’
দীক্ষার গলা কাঁপছে যেন ভেতরে ভেতরে ফেটে আসছে টেনে ধরে রাখা ক্ষতগুলো।
‘শাড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে বলে নিতে চেয়েছি আর তাতে তুই কাঁদবি, তুই রাগ করবি, তুই কষ্ট পাবি…আমি পাই না? আমি মানুষ না?’
তৃণার দৃষ্টিটা এবার পুরো ধাঁধা লাগানো, সে জানে না কী বলবে, কীভাবে রুখবে। দীক্ষা এবার একদম ধীর কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, ‘একবার চোখ বন্ধ করে ভাবতো তৃণা…আজ যদি আমি তোর জায়গা থেকে কিছু নিয়ে নিই, তুই কেমন পুড়ছিস;
ঠিক তেমনই পুড়তাম আমি… যেদিন তুই আমার জায়গাটা নিয়ে নিলি।’
তৃণার চোখে পানি জমতে লাগলো।
‘কেউ নিজের জিনিস কাউকে ছিঁড়ে দিতে পারে না, তৃণা। যেমন তুই পারিস নি এই শাড়িটা দিতে, ঠিক তেমনই আমি পারি নাই আমার বর, আমার সংসার, আমার নাম, চিরজীবনের জন্য কাউকে দিয়ে দিতে! কিন্তু আমাকে দিতে হয়েছিল। অসহায় হয়ে, না চাইতেও, তুই আমার বোন হয়েই আমার থেকে সব ছিনিয়ে নিয়েছিলে। এটাই কি প্রথম? তুই তো সবসময় আমার পছন্দের জিনিস গুলি নিয়ে যেতি.. আমি কোনোদিন তোকে কিছু বলেছিলাম?’
তার চোখ চকচক করে উঠছে।
বকুলের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। কিছু বলবে ভেবেও শেষমেশ নীরবতাকেই গ্রহণ করে নিলো। বলুক, ভেতরের চাপানো কষ্টগুলো বের করে দিক এক এক করে.. অরুণিমাভ অশ্রুসিক্ত জ্বলজ্বলে চোখের দীক্ষার এই আ গু ন রূপ দেখছেন চুপ করে।
দীক্ষা এবার তৃণার ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এতটাই কাছে… তৃণার নিঃশ্বাস পর্যন্ত কাঁপতে লাগল।
‘কেন করলি তুই? বল! কেন আমার ঘরটা ভাঙলি?
তুই আমি তো এক মায়ের পেট থেকেই এলাম দুনিয়াতে, না রে? তুই আমার আপনজন ছিলি না? সেই তুই কেন আমাকে মাটিতে মিশিয়ে দিলি?’
দীক্ষার গলা ভেঙে যায়, চোখ থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে।
‘একটা শাড়ির জন্য তোর হৃদয় পুড়ছে না? তাহলে শোন, আমার হৃদয়ও ঠিক এমনই পুড়েছিল। সেই দিনের সেই আ গু ন আমি আজও নিভাতে পারিনি।’
তৃণা কেঁপে উঠল। শাড়িটা বুকে চেপে ধরার শক্তি কমে গেল। দীক্ষা আবার বলল, ‘আমি তোর কাছে উত্তর চাই। আজ—এখনই! কেন?’ চিৎকার করে বলল আবারও, ‘কেনোওওওও?’
শব্দটা পুরো ঘরে বজ্রপাতের মতো পড়ল।
তৃণার ঠোঁট কাঁপছে। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
দীক্ষা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল, ‘বল!
একটা শাড়ি কেড়ে নেওয়ায় তুই পুড়ছিস, তাহলে আমার ঘর, আমার স্বামী কেড়ে নেওয়ার সময় তুই কি একবারও ভাবলি না আমার কথা? বিন্দুমাত্র সংকোচ হলো না?’
তৃণার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠছে অশ্রুতে, কিন্তু মুখে ভাষা নেই। দীক্ষা নিজের বুক চাপড়ে বলল, ‘এই যে ভেতরে ভেতরে আমি মরেছি… সেই মৃত্যুর দায়ভার কার?’
অরুণিমাভ উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু থেমে গেলেন। এটা শুধু দুই নারীর কথা নয়, এটা দুটো হৃদয়ের গভীরতম সংঘর্ষ।
দীক্ষা এবার আরও কাঁপা গলায় বলল, ‘বল তৃণা…
আজ পর্যন্ত তোকে আমি ব্যথা দিয়েছি? দি নাই, আজ কেন তোর শাড়িটা ছিনিয়ে নিয়েছিলাম জানিস? যেন তুই বুঝতে পারছিস, নিজের জিনিস কেড়ে নিলে কেমন লাগে। এই যে, এই হৃদয়ের ভেতরটা…’ ওর বুকের উপর হাত দিয়ে থাপড়ে দিতে লাগল দীক্ষা, ‘এই যে এখানে.. এখানে লাগে, ভীষণ লাগে। জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়। কয়লা চিনিস, কয়লা? হ্যাঁ ওটা.. ওটা হয়! তোর হচ্ছিল যেমন.. সামান্য একটা শাড়ি!
আর আমার তো তামাম দুনিয়া তুই…’
তৃণা চোখে পানি নিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কিছু বলতে গেল, ‘আপা… আমি… আমি তো…’
কিন্তু ঠিক তখনই তার মাথা ঘুরে উঠলো, দৃষ্টি ঝাপসা। চোখের সামনে সবকিছু দুলতে শুরু করল।
তৃণা দুই হাত দিয়ে মাথা ধরলো, ‘আপা… আমার… মাথা… ঘুরছে…’
দীক্ষা থমকে গেল। তৃণার পা কাঁপছে। এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড…তারপরই ঢপ্ করে পড়ে গেল মেঝেতে।
চিৎকার করে উঠল বকুল, ‘তৃণা!’
অরুণিমাভ ছুটে গেলেন তার দিকে। আরহাম থতমত খেলেও আয়ান কেঁদে উঠল ভয় পেয়ে। লিভিং রুমে এক লহমায় বিশৃঙ্খলা নেমে এল।
দীক্ষা স্থির দাঁড়িয়ে, তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু নামছে,
কিন্তু তার মুখে এক অদ্ভুত শূন্যতা।
মুহূর্তটায় যেন সব প্রশ্ন, সব অভিযোগ, সব ব্যথা- এক শ্বাসে থেমে গেছে।
পরের দিন। সূর্য সবেমাত্র শহরের উঁচু দালানগুলোতে আলো ফেলেছে, কিন্তু শিশিরের জীবন তখন নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা। সকাল এগারোটা নাগাদ তাকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাসে তোলা হলো। চারদিকে উকিলদের জটলা, বিচারপ্রার্থীদের চাপা গুঞ্জন, আর পুলিশের কঠোর চোখ। এই বিশাল কক্ষের প্রতিটি কোণায় যেন ভয় আর নিয়তির শীতল নিঃশ্বাস লুকোনো।
কাঠগড়ায় দাঁড়ানো শিশিরের শরীরটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। গত কয়েকদিনের শারীরিক নির্যাতনের প্রতিটি চিহ্ন তার চোখেমুখে, চলনে-বলনে স্পষ্ট। হলদেটে ফ্যাকাশে মুখ, রুক্ষ চুল, আর স্থির দৃষ্টি। এই সেই শিশির, যে একদিন সবার সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতো। যাকে দেখলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া একপাল যুবতীও দ্বিতীয় বার ঘাড় ফিরিয়ে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করত। এই সেই শিশির, যাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে দীক্ষা বলত, ওয়ার্ল্ড মোস্ট হ্যান্ডসাম বয়…!
আদালতের কার্যক্রম শুরু হলো। পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাদকদ্রব্য চোরাকারবারিতে শিশিরের ভূমিকার বিস্তারিত তুলে ধরলেন। ইয়াবা এবং হিরোইন পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে সে সরাসরি জড়িত ছিল। ইয়াবা ও হিরোইনের পরিমাণ ছিল বাণিজ্যিক। পিপি কঠোর শাস্তি দাবি করলেন, যাতে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।
শিশিরের জন্য নিযুক্ত আইনজীবী কিছু মানবিক দিক তুলে ধরার চেষ্টা করলেন, শিশিরের স্বীকারোক্তি, তার অনুতাপ এবং তার কোনো পূর্ব রেকর্ড না থাকা। কিন্তু মাদক মামলার কঠোর আইনে এসব যুক্তি খুব দ্রুতই হালকা হয়ে গেল।
শিশিরের চোখ ঘুরতে লাগল। সে দেখল, আশেপাশে অনেকেই আছে কিন্তু দীক্ষা নেই। সে তো আর আসবে না। কেন তবু তার অবচেতন মনটা ভাবছিল, হয়তো দীক্ষা তার খবর পেয়েছে, হয়তো এসেছে আজ তাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য! শিশির মাথা নিচু করল।
জজ সাহেব তার রায় দিতে প্রস্তুত। এজলাসজুড়ে পিনপতন নীরবতা। শিশিরের কানে শুধু নিজের হৃদয়ের দ্রুত ধুকপুক শব্দ। হাতের তালু ঠান্ডা হয়ে শিরশির করছে। প্রচন্ড প্রস্রাবের বেগ ধরেছে। অতিরিক্ত চিন্তায় মানুষের যা হয় আর কি!
জজ সাহেব গম্ভীর ও স্পষ্ট কণ্ঠে রায় পড়া শুরু করলেন। তার কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই, আছে শুধু আইনের ধারালো যুক্তির প্রতিধ্বনি।
‘আসামী শিশির, পিতা… সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৩ (১) এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। জব্দকৃত ইয়াবা ও হিরোইনের বাণিজ্যিক পরিমাণ বিবেচনা করে এবং দেশের যুব সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে, আদালত মনে করেন, এখানে নমনীয়তার কোনো সুযোগ নেই। আসামীকে কঠোর সাজা প্রদান করা ন্যায়বিচারের দাবি।’
শিশিরের কান গরম হয়ে গেল। তার মনে হতে লাগল, কোনো কিছুই সে শুনতে পাচ্ছে না, আবার সবকিছুই যেন অত্যন্ত স্পষ্ট।
‘অতএব, আসামী শিশিরকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৬ (১) এর সারণির ক্রমিক ৯ ও ১০ অনুযায়ী, অবৈধ মাদকদ্রব্য পরিবহন ও বিতরণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। তাকে পনেরো (১৫) বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লক্ষ (১,০০,০০০) টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক (১) বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।’
পনেরো বছর! সংখ্যাটি শিশিরের মাথায় যেন হাতুড়ির মতো আঘাত করল। পনেরোটা বছর! জীবনের মধ্যাহ্নকাল, যৌবনের শেষ তেজটুকু এখন কারাগারের চার দেয়ালের গ্রিলে আটকে থাকবে। এই পনেরো বছরে পৃথিবী কত বদলে যাবে! সেলের বদ্ধ ঘরে বসে তার শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
রায়ের শেষ কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গেই শিশিরের শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। তার মনে হলো, তার পা দুটো আর তাকে ধরে রাখতে পারছে না। সে দেয়ালে হেলান দিতে গিয়েও পারল না।
তার চোখের সামনে তখন ভেসে উঠল শুধু একটি মুখ— দীক্ষা! তার মহারানী!
পনেরো বছর পর যখন সে জেল থেকে বেরোবে, দীক্ষা কেমন থাকবে? সে কি তার জন্য অপেক্ষা করবে? নাকি সে ইতোমধ্যে অন্য কারো জীবনে নিজেকে খুঁজে নেবে? তার কান্না, তার হাসি, তার সেই মুখভঙ্গী, যখন সে কপট রাগ দেখিয়ে বলত, ‘রসকষহীন হাজবেন্ড!’
আজ তার চোখ ভরে উঠল জলে। এই বিচারালয়ের শত শত মানুষের সামনে, পুলিশের কঠোর চোখ এবং জজের গাম্ভীর্যের মাঝে, শিশির নিজের সব লজ্জা ভেঙে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
দীক্ষা! আমার মহারানী! আমাকে ক্ষমা করো! আমি সব হারিয়ে ফেলেছি! আমার দীক্ষা!
কাঁদতে কাঁদতে তার শরীরটা মেঝেতে এলিয়ে পড়তে চাইল। সে কোনো রকমে কাঠগড়ার কাঠটা ধরে রইল। তার চোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে যাচ্ছে না, তার ভেতরের সব অনুতাপ, সব কষ্ট যেন কান্নার মধ্য দিয়ে বেরোতে চাইছে।
প্রকৃতির বিচার এইভাবেই হয়। আজ আর তার কোনো উত্তর নেই, কোনো অজুহাত নেই। সে যে ভুল করেছিল, তার সাজা তাকে পেতে হলো। এই শাস্তি তো শুধু তার শরীরকে আবদ্ধ করল না, এটি তার হৃদয়কে চিরদিনের জন্য দীক্ষার স্মৃতিতে আবদ্ধ করে দিলো- যেখানে ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সেই ভালোবাসার মর্যাদা সে দিতে পারেনি।
পুলিশ দ্রুত এগিয়ে এলো। তারা শিশিরকে টেনে তোলার চেষ্টা করল।
ফেরত পাবার কি আর কোনো সুযোগ নেই? হে খোদা… সুযোগ নেই? এইসব কি স্বপ্ন হয়ে যেতে পারে না? আমায় ফিরিয়ে দাও… ফিরিয়ে দাও যেখানে আমি ফেলে এসেছি আমার অতীতের সেই স্বর্ণালি দিনগুলোকে…
শিশিরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো। তার কান্নার শব্দ, তার শেষ আকুতি কোর্টরুমের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল।
অরুণিমাভের ফ্ল্যাটের ঘরটি নীরব। বকুল ও অরুণিমাভ সদ্য অসুস্থ তৃণাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা দিয়েছে। ফ্ল্যাটে এখন শুধু দীক্ষা এবং আয়ান – আরহাম।
দীক্ষার মন ভারী। তার চিন্তাগুলো এখন এলোমেলো। তৃণাকে নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত, সে খুঁজে পাচ্ছে না। অস্থিরতা তার চোখেমুখে স্পষ্ট।
আয়ান ও আরহাম দু’জনেই ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। দীক্ষা তাদের দিকে এক পলক তাকালো, তারপর সোফায় পাথরের মতো বসে রইল।
হঠাৎ, তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে বকুলের নাম।
দীক্ষা দ্রুত কলটি রিসিভ করে।
ওপাশ থেকে ভেসে এল বকুলের কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর।
‘আপা..আপা ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছেন, তৃণা প্রেগন্যান্ট, ওর পেটে সন্তান!’
আকাশটা ভেঙে মাথার উপর পড়ল নাকি কাছে কোথাও বিকট শব্দে বাঁজ পড়ল? কিসের শব্দ হলো? দীক্ষার হাত থেকে ফোনটা আলগা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই।
ওপাশে বকুল ‘আপা আপা’ করছে।
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৬
দীক্ষা আস্তে ফোন কে টে রেখে দিলো। হাতজোড়া শক্তি হারিয়ে পড়ল যেন। শরীরের সব জোর কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে? বকুল কি বলল, ওর পেটে সন্তান, কার সন্তান? শিশিরের?
তারা দুই বোন একই পুরুষের সন্তানকে পেটে বহন করছে তবে? দীক্ষার হঠাৎ মনে হলো, তার এক্ষুনি সব ভাসিয়ে বমি হয়ে যাবে…এত ঘৃণা তার ইহজন্মে আর কোনো কিছুর ওপর জন্মেনি…
