Home The Silent Manor The Silent Manor part 59

The Silent Manor part 59

The Silent Manor part 59
Dayna Imrose lucky

একটি বিকেল মানেই দিনের ক্লান্তির মাঝে একটুখানি প্রশান্তির ছোঁয়া। দুপুরের তীব্র রোদের পর বিকেলে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। আকাশে তখন হালকা সোনালি রঙ ছড়িয়ে পড়ে, মাঝে মাঝে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। গাছের পাতায় পড়া আলো–ছায়ার খেলায় চারপাশ যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
গ্রামের বিকেল হলে দেখা যায় খোলা মাঠে শিশুদের হাসি-খেলা। কেউ ক্রিকেট খেলছে, কেউ বা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। পুকুরপাড়ে কয়েকজন বসে গল্প করছে, আবার কেউ মাছ ধরার জাল গুছিয়ে নিচ্ছে। গাছের ডালে পাখিরা কিচিরমিচির করে দিনের শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। হালকা বাতাসে ধুলোর গন্ধ, কাঁচা ঘাসের সুবাস মিশে এক অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে।

বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ধরণীতে। সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে আকাশে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছে। দিনের কর্মব্যস্ততার পর বিকেল আমাদের একটু থামতে শেখায়, ভাবতে শেখায় এবং প্রকৃতির সাথে নতুন করে সংযোগ ঘটায়।
কখনো কখনো বিকেল নতুন বার্তার আগমন নিয়ে আসে।তেমনি সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই সময়ে একটি সংবাদ নিয়ে হাজির হবে অরুণ।আহির ধুলিমাখা গুদামঘরের পাশেই বসে আছে একটি কাঠের চেয়ারে। রাফিদ তাঁর সামনে গম্ভীর মুখে বসে আছে।আজ কারখানার শ্রমিকদের তাড়াতাড়ি রাফিদ ছুটি দিয়েছে।শহরে তাঁদের আরো দুটি কারখানা। সেখানকার ম্যানেজার আজ কল করে জানিয়েছে সেখানকার কারখানায় ‘বড়সড় একটা ঝামেলা হয়েছে। তাঁকে অথবা আমজাদ কে যেতে হবে শহরে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আহির বেশ কিছুক্ষণ রাফিদ কে পরখ করে জানতে চাইল তাঁর গম্ভীরতার কারণ।রাফিদ শহরের কারখানার সমস্যাটা খুলে বললে।আহির সবটা শুনে রাফিদ কে শহরের উদ্দেশ্য যেতে বলে।রাফিদ না বোধক উত্তর দিল। সামনেই মায়ার বিয়ে। অনেক আয়োজন বাকি। আমজাদ একা সামলাতে পারবেন না বলে রাফিদ সমস্যা সমাধানের সময়টা আরো পিছিয়ে দিল।
আহির মাথা থেকে হ্যাট খুলে হাতে নিল।সেটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে।চোখ তাঁর হ্যাট এর দিকে থাকলেও ভাবনায় তাঁর মিলন।রাফিদ তাঁর ধ্যান ভাঙ্গাতে বলল “কি ভাবিস?
আহির চোঁখের স্থিরতার সাথে বলল “নতুন কি,মিলনের খু’নের কথা।”

“আজ কি পেলি?”
“ওসমান আহমেদ কে।উনি ছিলেন কামার‌।’
“খু’ন হয়েছে উনি” রাফিদ নিশ্চয়তার সাথে বলল।খুব স্বাভাবিক তাঁর ধরণ।যেন একজন মানুষ খু’ন হওয়াটা প্রকৃতির নিয়ম।
আহির নিষ্পলক চেয়ে বলল “তুই জানলি কিভাবে?
“বারে, আমার গ্রামের ঘটনা আমি জানব না!উনার থেকে সবাই দা কাঁচি,ছু’রি, তলো’য়ার বানাত।আমরাও বানাতাম।দেখ ঐতিহ্য অনুযায়ী আমাদের তলো’য়ার রাখতে হয়। এখানে কিন্তু সন্দেহের কিছু নেই।”
“আশ্চর্য,আমি তো তোর কথায় একদম সন্দেহ করিনি। তুই নিজে থেকে টেনে নিলি।” বলে আহির সোজা হয়ে বসল। এরপর কিঞ্চিত অবাক চোখে রাফিদ কে লক্ষ্য করল।চোখ গুলো তাঁর এলোমেলো।কি যেন কি ভাবছে রাফিদ।
আহির নিজ থেকে বলল “মিল’নের হ’ত্যার সাথে এই কামার ওসমান আহমেদ এর কোন যোগ সূত্র আছে।” এতটুকু বলে থেমে গেল। এরকম আড়ালে একবার রাফিদ কে দেখল। রাফিদ যেন আহির এর কথার কোন তোয়াক্কা করছে না।

আহির রাফিদ কে বলল “আচ্ছা, ওসমান আহমেদ কবে মা’রা যান? এবং কিভাবে মে’রেছে?আর কোন জায়গায়?”
রাফিদ ভেবে জবাব দিল “প্রায়ই ছ’মাস আগে। তাঁকেও কেউ ছু’রির আ’ঘাতে মে’রেছিল।রাতে‌। আমাদের বাড়ির পথে ফিরতেই পাশের ক্ষেতে উনার লা’শ পাওয়া গিয়েছিল”

আহির এবার গভীর ভাবনায় ডুব দিল। চেয়ারে হেলে বসে। সন্ধ্যার আঁধার এর থেকেও যেন তাঁর ভাবনা বেশ জটিল হল। দোকানি থেকে একটা ছোট বাচ্চা দু কাপ চা এনে তাঁদের দিল।আহির কিছুক্ষণ হয় চেয়েছিল চা।
চায়ে চুমুক দেয় আহির।চা ভালো লাগছে না।চিনি কম। পর্যাপ্ত জ্বাল পায়নি জলে।পানসে লাগছে।তবু সে কেন খাইছে জানে না।চায়ে চুমুক দেয়ার সাথে সাথে চোখ তুলে বারবার রাফিদ কে দেখল।উদাস দেখাচ্ছে তাঁকে।আহির তাঁর কারণ জানতে আগ্রহী নয়।সে ঘুরেফিরে মিলন কে নিয়ে ভাবছে। আগামী চব্বিশ থেকে বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে মিলন হ’ত্যার রহস্য উন্মোচন করবে ভেবে সে নিজের কাছে নিজেই যেন প্রতিজ্ঞা করল।
চা পান করা শেষ করল আহির। তাৎক্ষণিক তাঁদের পেছন দিক থেকে একটি গাড়ির হর্ন ভেসে আসল।আসটিন এ৪০।অরুন এসেছে।গাড়ি থামিয়ে ব্যস্ত পায়ে নেমে আহির এর সামনে গিয়ে সালাম দিল। মুখে আলোকিত হাঁসি তাঁর।আহির বলল “এত হাঁসি,মনে হচ্ছে কেস সমাধান করে ফেলেছো!”

“না স্যার,তবে সমাধান এর খুব কাছে।”
“কিভাবে?” আহির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।
অরুণ দাঁত কেলিয়ে হেঁসে বিনা অনুমতিতে আহির এর পাশের চেয়ারে বসে। “স্যার, আপনি যে ছু’রির কথা বলেছেন আর সেখানে জি এস লেখা,আমি এর অর্থ বের করেছি।” বলে আবার হাসল অরুণ।অরুণের হাসির কারণ আহির ধরতে পারল না।এত সাধারণ বিষয়ে কিভাবে হাসতে পারে!
“কি কারণ?
“স্যার,জি এস মানে Ghost Soldier. অর্থাৎ অশরীরী সৈনিক।” অরুণের মুখে কথাটি শুনে আহির হায় শব্দে মাথায় হাত দিল। এরপর বলল “তুমি এটা বলতে সেই কলকাতা থেকে আলিমনগর চলে এসেছো!আমি ভেবেছি কেস সমাধান!”

অরুণ হেঁসে বলল “কেন স্যার সমাধান হয়নি?
গর্দভ এর মত শোনাল অরুণের প্রশ্ন এবং অভিব্যক্তি দেখে তাই মনে হচ্ছে তাকে।অথচ সে দিব্যি তরতাজা,পরিপাটি সাহেব সাহেব একটা ভাবসাব নিয়ে বসে আছে। আজকের তাঁর অভিব্যক্তির সাথে বোকাসোকা চলণটা ঠিক গেল না। বয়সও কম নয়,আঠাশ ছুঁই ছুঁই।

রাফিদ অরুণ কে উদ্দেশ্য করে বলল “অরুণ, তুমি আবার কারো প্রেমে-টেমে পড়লে না তো! না মানে,কেউ যদি প্রেমে পড়ে তবেই সে উন্মাদ হয় আর সবকিছু গুলিয়ে ফেলে। আজকে তোমাকে দেখেও তাই মনে হচ্ছে।”
অরুণ যেন বেশ লজ্জায় পড়ল।অরুণ বরাবরই লাজুক‌।কোন মেয়ের সামনে আজ অবধি মাথা তুলে কথা বলেনি।বলতে পারে না।আহির এর চেম্বারে কখনো কোন মেয়েরা কেস নিয়ে আসলে অরুণ বিচলিত হয়ে যায়।সে কোন দিকে যাবে ঠিক যেন বুঝতে পারে না।অরুণের এরকম কাণ্ডে আহির বিরক্ত নয়,বরং আনন্দ পায়।
অরুণ বলল “আমার কোন পছন্দের মানুষ নেই। আমার দ্বারা কখনো প্রেম ভালোবাসা হবে না।”
আহির প্রসঙ্গ পাল্টে বলল “চল বাড়ি ফিরে যাই।মীর আজকে আমার সাথে মিথ্যা বলল।ও নাকি আবার তদ’ন্ত করবে।যখনি তোর বোনকে দেখল পথে,অমনি পথ ঘুরে চলে গেল আমায় একলা ফেলে।” বলল রাফিদের দিকে তাকিয়ে।
অরুণ বলল “স্যার,রাত হয়ে যাচ্ছে,আমি কি একা এখন শহরে ফিরব!যদি কোন জ’ন্তু জানো’য়ার আমাকে আক্র’মন করে!”
“তোমাকে দেখে যদি কোন জ’ন্তুর খিদে পায়, তবে আক্র’মণ করতেই পারে।” বলে আহির উঠে গাড়ির দিকে এগোলো‌।অরুণ হা করে আহির এর দিকে তাকিয়ে থাকল।রাফিদ ঠোঁট চেপে হাসলে।

মায়া তাঁর ঘরের এক কোণে বসে আছে। কিছুক্ষণ গুনগুন করে গান গাইছিল।বেসুরে। তৃষ্ণা এসে জিজ্ঞেস করে গিয়েছে কিছু লাগবে কিনা?মায়া মাথা নেড়ে জবাব দিয়েছিল ‘না।’
ছোট্ট বেলার কথা ভীষণ মনে পড়ছে।মা,বাবা ভাই,দাদী সবার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো ভীষণ মনে পড়ছে। সবকিছু ছেড়ে তাঁকে চিরজীবনের জন্য অন্যর পরিচয় বহন করে চলে যেতে হবে দূর দেশে‌।
স্মৃতির আঙিনা ও এক অচেনা গন্তব্য ধরে
ঘরের কোণে আধো-অন্ধকারে বসে আছে মায়া। চারপাশের পরিচিত দেয়ালগুলো আজ যেন বড্ড বেশি আপন হয়ে ধরা দিচ্ছে, অথচ এই ঘরটাই কদিন পর তার জন্য ‘পরের বাড়ি’ হয়ে যাবে। তার ঠোঁটের কোণে বিষণ্ণ এক সুর—একটু আগে গুনগুন করে গান গাইছিল, তা কোনো রাগপ্রধান গান নয়, বরং বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নার এক সুরহীন বহিঃপ্রকাশ। তৃষ্ণা যখন এসে জিজ্ঞেস করল কিছু লাগবে কি না, মায়া শুধু যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে ‘না’ বলেছে। আসলে তার যা প্রয়োজন, তা তৃষ্ণা বা অন্য কেউ দিতে পারবে না। তার প্রয়োজন মীর কে। তাঁর ভালোবাসা। তাঁর বেঁচে থাকার এবং খুশির সে-ই কারন কে।

স্মৃতির মিছিলে শৈশব ভেসে উঠছে, কখনো তাঁর চোখের সামনে সিনেমার ফ্রেমের মতো ভেসে উঠছে ছোটবেলার দিনগুলো। মনে পড়ছে বাবার সেই শাসনমাখা স্নেহ, মায়ের আঁচলের সেই পরিচিত গন্ধ যা নাকে গেলেই সব ভয় দূর হয়ে যেত। ভাইটার সাথে তুচ্ছ কারণে ঝগড়া করা, আবার বিকেলের নাস্তায় ভাগ বসানো,এই ছোট ছোট মুহূর্ত গুলোই যে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয় ছিল, তা সে আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। দাদীর পানের বাটার সেই সুবাস আর রূপকথার গল্পগুলো যেন ঘরের বাতাসে এখনো ভাসছে। এই বাড়ি, এই উঠোন, জানালার পাশের ওই কৃষ্ণচূড়া গাছ,প্রতিটি জড় বস্তুর সাথে মায়ার প্রাণের সখ্য।অস্তিত্বের সংকট ও নতুন পরিচয় যেন।

বিয়ের পিঁড়িতে বসা মানে শুধু এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়া নয়, মায়ার কাছে এটি নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দেওয়ার মতো। চিরকাল যে পরিচয়ে সে বড় হয়েছে, যে নামে এই পাড়ায় পরিচিত ছিল, হঠাৎ করেই তা বদলে যাবে। এখন থেকে তাকে বহন করতে হবে অন্য একজনের পরিচয়, অন্য এক বংশের নাম। নিজের শিকড় উপড়ে অন্য কোনো দেশে, অচেনা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চিন্তা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে।
দূর দেশে পাড়ি জমানোর এই কঠিন বাস্তবতায় মায়া নিজেকে বড্ড একা অনুভব করছে। সেখানকার আকাশ কি একই রকম নীল হবে? সেখানকার বাতাস কি মায়ের হাতের স্পর্শের মতো স্নিগ্ধ হবে? এই প্রশ্নগুলো তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সে জানে, এটাই পৃথিবীর নিয়ম, এটাই জীবনের রীতিনীতি। তবুও বুকের পাজরে এক তীব্র মোচড় অনুভূত হয়। এক নিমেষেই পর হয়ে যাওয়া এই যে দীর্ঘ পথচলা, তার ভার মায়ার মতো অল্পবয়সী এক তরুণীর কাছে পাহাড়ের মতো ভারী মনে হচ্ছে।

মায়া জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকায়। তার চোখের কোণে জমে থাকা জলটা টপ করে গড়িয়ে পড়ল। এই জল শুধু বিচ্ছেদের নয়, এই জল নিজের প্রিয় সত্তাকে বিসর্জন দেওয়ার। স্মৃতির এই অলিগলি পেরিয়ে তাকে যেতেই হবে। হৃদয়ের মণিকোঠায় শৈশবের সেই অমলিন দিনগুলো সে সারাজীবন সযত্নে লালন করবে।হবু শশুর বাড়ি শহরে।শহরের সেই যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও হয়তো কোনো একদিন গুনগুন করে গেয়ে উঠবে সেই একই সুর, যা আজ এই নিঝুম সন্ধ্যায় তার ঘরের কোণে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

জানালা থেকে শো শো শব্দে দমকা হাওয়া আসছে।শীতল ভেজা পরিবেশ এর থেকেও যেন মায়ার মনটা তীব্র পরিমাণে শীতল আর স্তব্ধ হয়ে আছে। তাঁর আজকের মন খারাপের পেছনে শুধুমাত্র একজন দায়ী।মীর।
মীর কে দায়ী করে আবার ভাবে,সে তো মীর কে মুখ ফুটে ভালোবাসি কথাটি অবধি বলেনি।বলা উচিত?ভাবে, নিজেকে একা একা প্রশ্ন করে। খানিকক্ষণেই মনে পড়ে,মীর এর মনে যে অন্য কেউ।- মীর অন্য কাউকে ভালোবাসে-আমি যাকে ভালোবাসি সে অন্য কাউকে ভালোবাসে- পৃথিবীতে বোধহয় বিশ্রীদায়ক ভাবনাই এটা। পৃথিবীতে হয়ত বুকে জমা চরম যন্ত্র’ণা এটাই।

মায়া চোখের জল মুছে ফেলল।ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে। বালিশের উপর আদ্রিয়ান এর দেয়া চিঠি দুটো।একটা পড়েছে অন্যটি এখনো খুলে দেখেনি। আগ্রহ পাচ্ছে না মায়া। ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল।তবু আবার কি যেন কি ভেবে ছিঁড়ল না।বিয়ের পর লোকটি যদি জিজ্ঞেস করে আমার দেয়া প্রথম চিঠি কোথায়?ফেলে দিয়েছে? কিন্তু কেন, বিয়েতে রাজি ছিলে না তবু বিয়ে করলে কেন?
মায়া আর কিছু ভাবতে পারল না। এরকম পরিস্থিতি তৈরি হলে নির্ঘাত তার বাবার মাথা নিচু হবে।সে তা কখনোই চায় না।

দরজায় টোকা পড়ল।মায়া একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।সময় এখন ঠিক ন’টা।এমন সময় শেফালী হয়ত রাতে খাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছে।মন খারাপের শুকনো মুখটি কাউকে দেখাবে না ভেবে নিজেকে স্বচ্ছ করল।মুখে কিছুটা হাঁসি এনে দরজা খুলল। দরজা খুলতেই টালমাটাল হয়ে ঘরে ঢুকলো মীর।মায়া পথ ছেড়ে পাশে দাঁড়াল। নয়ত তাঁর গায়ে ধাক্কা লাগত।মীর কাঁপা হাতে দরজা লাগিয়ে দিল।মাথায় হ্যাট ছিল।খুলে সেটা মায়ার বিছানায় ছুড়ে মারল। এরপর ঘাড় ঘুরিয়ে বা দিকে দাঁড়ানো মায়ার দিকে তাকাল। ক্ষুধার্ত বাঘ যেভাবে শিকার করার জন্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাঁর লক্ষ্য স্থির করে,মীর ও যেন সেভাবে তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে। তাঁর শরীর থেকে হালকা ম’দের গন্ধ আসছে।

মায়া বলল “আপনি ম’দ খেয়েছেন?
মীর মায়াকে দেয়ালে ঠেলে তাঁর সম্মুখে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে বলল “একটু খেয়েছি। পুরোপুরি নে’শায় জড়িয়ে নিতে পারেনি।”
মায়া মুখ সরিয়ে বলল “আপনার শরীর থেকে গন্ধ আসছে।সরে যান।ঘর থেকে বেরিয়ে যান।কেউ দেখে ফেলবে।”
“দেখুক।লোকে দেখলে বলব,মায়া আমাকে রাতে ওর ঘরে ডেকেছে।তাই আমি এসেছি।”
“ছিঃ। আপনি আমার নামে মিথ্যা বদনাম করবেন! এখুনি চলে যান দয়াকরে,কেউ এসে পড়বে,রাতে খাওয়ার সময় হয়েছে,মা হয়ত ডাকতে আসবে।”
মীর ক্লান্ত কণ্ঠে বলল “আসুক। দোষ তো তোমার। তুমি আমাকে অযথা অসভ্য বলেছো,অ’সভ্য কত প্রকার,কি কি তাতো তোমাকে দেখাতে হবে তাই না।”

মায়া মীর কে সরিয়ে খাটের এক পাশে গিয়ে দাঁড়াল‌‌। এরপর বিনীত কণ্ঠে বলল “তখন আপনাকে রাগের মাথায় বলেছি,তাই বলে আপনি সত্যি সত্যি অস’ভ্যতামী দেখাতে চলে আসবেন। আপনি ভারী বেয়াদব তো‌”
মীর মাথা ঝাঁকিয়ে দ্রুত মায়ায় দিক ছুটে গেল। তাঁর সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে বলল “আবার বেয়াদব বললে। তুমি মেয়ে যথেষ্ট বাজে।” এতটুকু বলে মীর থেমে দু কোমরে হাত দিয়ে বলল “বাঘের সাথে পাঙ্গা নিতে নেই বুঝেছো!এতে তোমারই ক্ষ’তি হবে।এমন ক্ষ’তি পরে,কাঁদলেও আর সে-ই ক্ষ’তির ক্ষতস্থান পূর্ণ হবে না।”
“আপনি মেয়েদের পেছনে ঘোরা বাঘ। শুধু অসহায় মেয়েদের শিকার করে খেতে চান।”

মীর কটমট চোখে তাকাল মায়ার দিকে।চোখ দুটো বড় বড় তাঁর উপর লাল।কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘামের সাথে মীর এর রুপ সত্যিই পাল্টে গেছে। “ধরে নাও তুমিও আমার শিকার।আজ তোমাকে শিকার করতে এসেছি।”
“ভালো হবে না বলে দিলাম।আমি কিন্তু চেঁচাবো।চলে যান দয়াকরে।”
“যেতে আসিনি মায়াবতী। আগামীকাল থেকে তোমার বিয়ের নিয়মনীতি শুরু।হাতে মেহেদি,গায়ে হলুদ, এরপর শেষ বিদায়”

“তাঁর চেয়ে আপনি শেষ বিদায় নিন।আর সহ্য হচ্ছে না আপনাকে।চলে যান,কেউ এসে পড়বে।”
মীর এবার একটু বিরক্ত নিয়ে বলল “সে-ই কখন থেকে মাছির মত ভনভন করেই যাচ্ছ,চলে যান,চলে যান। শোনো,আমি যেখানে যাই নিজের ইচ্ছায়, আবার ফিরেও আসি আমার ইচ্ছায়।অন্যর নিয়মে আমি চলি না।”
মায়া আর কিছু বলছে না।নির্বাক হয়ে একদিকে তাকিয়ে আছে।মীর সাথে আছে তাঁর। ভালো লাগছে। ভেতরে ভেতরে আনন্দ হচ্ছে।মীর এর সাথে যখনই দেখা হয়, মিষ্টি কথা নয়, শুধু ঝগড়াটা হয়,এই ঝগড়া টাই যেন তাঁর আনন্দের কারণ। এতটুকু নিয়েই সে আপাতত সন্তুষ্ট।

মীর এর মাথা চক্কর দিল। চোখের সামনে সব ঝাপসা হতে শুরু করল। বুলবুল কে টাকা দিয়ে সন্ধ্যার দিকে ম’দ আনিয়েছিল। এখানকার একটা দোকানে ম’দ বিক্রি করে।বেশ দামি। এখানে ম’দ পাওয়া যায় সংবাদটাও বুলবুলই দিয়েছে।ও তখন এনে দিয়ে তাঁরা দু’জন মিলে খেয়েছে।মীর কখনো খায়নি।আজ খেয়েছে। শরীর খা’রাপও লাগছে।তবু নিজেকে সামলে বলল “আচ্ছা, তোমার যতদিন না বিয়ে হচ্ছে তোমার সামনে আর আসব না, কেমন!”
মীর এর কথাটা কেমন যেন শোনাল।মায়া অসন্তুষ্ট হল।তবু প্রকাশ করল না।কোন জবাব না দিয়ে বিছানায় বসল।মীর এর চোখের সামনে এবার পুরোপুরি সব ঝাঁপসা হয়ে উঠল।

মায়ার পেছনে মীর এর হ্যাট।মীর মায়ার উপর থেকে ঝুঁকে হ্যাট টা বলিষ্ঠ হাতে নিতেই মায়া ভয়ে কঁকিয়ে উঠল।হাত পা এক করে বলল “আমার সাথে কিছু করবেন না।আর আপনাকে অ’সভ্য বলব না।”
মীর হ্যাট নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল “এটা নিচ্ছিলাম।” এরপর মায়ার শরীরের উপর পুনরায় ঝুঁকে বলল “শোনো মেয়ে, আমার মেয়েদের শরীরের প্রতি আকর্ষণ নেই।আমি মীর চরিত্রহীন লম্পট না।যে একটা ফুলকে অপবিত্র করব।”
“তাহলে আপনি চলে যান এখুনি।এই বাড়ির সবাই সংস্কার মানে, আপনাকে আমার ঘরে দেখলে কেলে’ঙ্কারি হয়ে যাবে।”
মীর কিছু বলতে চাইল। কিন্তু তাঁর কণ্ঠনালী থেকে শব্দ বের হওয়ার আগেই বিছানায় ঢলে পড়ে।নেশায় তখন পুরোপুরি না ধরলেও এখন তাঁকে পুরোপুরি জড়িয়ে নিয়েছে‌।মীর নিথর দেহ নিয়ে তাৎক্ষণিক ঘুমিয়ে পড়ে মায়ার বিছানায়।

মায়ার চোখমুখে আত’ঙ্কের রেখা ফুটে উঠল।মীর কে ডাকল। তাঁর কোন সাড়াশব্দ নেই।মায়া ঠিক কি করবে বুঝতে পারল না।
ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে মায়া।কেউ চলে আসবে তাঁর ঘরে।হয়ত তাঁর দাদী,নয়ত শেফালী! শালুক আজকাল ঘনঘন মায়ার ঘরে আসেন।মায়া এদের ভয় পায়। তীব্র পরিমাণে। তাঁর থেকেও বেশি ভয়ের স্থান দখল করে রেখেছে আমজাদ চৌধুরী।
ভাবতে না ভাবতেই দরজায় টোকা পড়ল।মায়া আচমকা লাফিয়ে উঠল।চোখ দুটো মার্বেল এর মত হয়ে গেল। একবার মীর, আরেকবার দরজার দিকে তাকাল।

The Silent Manor part 58

দরজার অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন আমজাদ।মায়ার আর দু’দিন পর বিয়ে। একমাত্র মেয়েকে তাঁর কাছছাড়া করতে মোটেই ইচ্ছা করছে না। আজকাল মনটা বেশ উতালা থাকে তাঁর। সন্ধ্যা থেকে মায়ার কথা ভেবেছেন। ছোট্ট বেলার দৃশ্য গুলো কল্পনায় দেখেছেন। এরপর মনে পড়ে মায়া চলে যাবে আর দু’দিন পর।দিনে ব্যস্ততার জন্য মায়ার সাথে সময় কাটাতে পারেন না।তাই এখন এসেছেন।
আমজাদ গলা পরিষ্কার করে ডাকলেন মায়াকে।-

The Silent Manor part 60

1 COMMENT

Comments are closed.